নয়নারএমপিসাহেব
পর্ব:- ১৮
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি
সেই ঘটনার পর কেটে গেছে পাঁচ দিন। এই পাঁচদিনে তরীর মধ্যে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। চঞ্চল তরী যেন হঠাৎ করেই খুব চুপচাপ হয়ে গেছে। সারাদিন দরজা বন্ধ করে ঘরে পড়ে থাকে। ভার্সিটিতে যাওয়া তো দূরের কথা, জানালার পর্দাটাও ঠিকমতো সরায় না। বাড়ির সবার চোখেই পড়ছে ওর এই পরিবর্তন। কিন্তু কেউ কিছু বলছে না, সবাই ভাবছে সেদিনের ঘটনাটা হয়তো এখনও ও মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু এইদিকে যে তরীর মনে অন্য কিছু চলছে, সেটা কেউ বুঝতে পারছে না, ওর মনের ভেতর একরকম ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সেই ঝড়ের নাম হল অচেনা অজানা অনুভূতি।
হৃদি মাঝে মাঝে সন্দিহান চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। ওর মনে হয়, ব্যাপারটা শুধু ভয়ের না। আরও কিছু আছে। এমন কিছু, যেটা তরী নিজেই লুকিয়ে রাখতে চাইছে।
অন্যদিকে এই পাঁচদিনে তরী একবারের জন্যও হৃদয়ের সামনে যায়নি। বাড়িতে হৃদয় আছে শুনলেই দরজায় খিল এঁটে বিছানায় শুয়ে পড়ে ঘুমের ভান করে।
এইদিকে হৃদয় ব্যস্ত নির্বাচনের কাজ নিয়ে, মিটিং, ফিটিং নিয়ে। তবে বাড়ির লোকদের মুখে সে শুনেছে তরীর পরিবর্তনের কথা। কিন্তু সে কিছু বলছেনা এখন। সময় হলে ধরবে সে এই মেয়েকে।
দুপুর বারোটা।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা জমে আছে। তরী বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে যেন ওর শরীরটা প্রাণহীন। চুলগুলো ছড়িয়ে আছে বালিশে, মুখটা আধখানা চাপা। ওর পিছনেই কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হৃদি। চোখমুখ কুঁচকে আছে বিরক্তিতে। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে ও, তবু তরীর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। শেষমেশ হৃদি ধুপধাপ পায়ে সামনে এসে দাঁড়াল, ঠিক তরীর মুখের সামনে।
__সমস্যা কি তোর? এইরকম অদ্ভুত বিহেভিয়ার কেন করছিস?
হৃদির ধমকে তরী ধীরে মুখ তুলল। চোখে ক্লান্তি, গলায় ম্লান সুর,
__ কি করেছি আমি?
__ কি করেছিস তুই জানিস না?
__না, জানি না তো।
হৃদি যেন এবার ধৈর্য হাঁড়াল।
__দেখ তরী, আমাকে একদম রাগিয়ে দিবি না। সোজাসুজি বলে ফেল তোর মনে কি চলছে। নয়তো দেখবি আমি দাভাইকে গিয়ে সব বলে দিব।
হৃদির অহেতুক হুমকিতে তরী ধীরে উঠে বসল। চুলগুলো কানে গুঁজে দিয়ে সরাসরি তাকাল ওর দিকে।
__ কি হয়েছে? এইভাবে রেগে যাচ্ছিস কেন? তাহির ভাইয়া কিছু বলেছে?
তাহিরের নাম শুনেই হৃদির রাগ আরো বেড়ে গেল, ও ফোঁস ফোঁস করে উঠল।
__খবরদার! ওই অসভ্য লোকটার নাম আমার সামনে একদম নিবি না। আর তুই আমার কথা না বলে, নিজের টা বল ? তোর কি সমস্যা।
__ আমার কি সমস্যা হবে আবার?
__সেটা তুই বল! তোকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। মাথার মধ্যে কিছু তো একটা গোটলা পাকাচ্ছিস আমি নিশ্চিত। এখন সেইটা কি আমাকে বলে ফেল।
তরী এবার একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল।ওর সাথে কি হচ্ছে ও নিজেই বুঝতে পারছে না। এক অদ্ভুত অনুভূতি ওকে জড়িয়ে ধরছে। সেই অনুভূতির উপর ওর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অকারণেই বুক ধড়ফড় করে আজকাল। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হল এই অনুভূতিটা জন্মাচ্ছে এমন একজনকে ঘিরে, যে মানুষটা ওর জন্য নিষিদ্ধ। হঠাৎ করেই কেন সেই মানুষটার প্রতি ওর এত অনুভূতি জন্মাচ্ছে সেটা তরী ভেবে পাচ্ছে না?
আগে তো এমন ছিল না।
নিজের এই অচেনা আবেগ এখন ওর কাছে বোঝা মনে হচ্ছে আজকাল। ও তো কখনো এমনটা চায়নি। কখনো এমনটা ভাবেওনি। তাহলে কেন এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে ওকে?
তরীর ভাবনা অনুযায়ী, ও প্লাবনকে পছন্দ করত। তাহলে আজকাল প্লাবনের বদলে অন্য একজনের মুখ কেন ভেসে উঠছে চোখের সামনে? কেন সেই চোখ, সেই কণ্ঠস্বর, সেই স্পর্শ বারবার মনে পড়ছে? তাহলে কি প্লাবন শুধুই ওর বয়সের আবেগ ছিল? নাহলে! একদিনের মধ্যেই সবচেয়ে পছন্দের মানুষটা অপছন্দের তালিকায় চলে গেল কীভাবে? আর যে মানুষটা সবসময় অপছন্দের তালিকায় ছিল, সে কেন ধীরে ধীরে সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে মনে জায়গা করে নিচ্ছে? তরীর নিজের ভাবনা এখন নিজের কাছেই সন্দেহজনক লাগে। আদতে ঐ মানুষটা কোনোদিন ওর অপছন্দের লিস্টে ছিল তো? নাকি সেটা এতদিন ওর ভুল ধারণা ছিল?
ওর মাথা ধরে গেল মুহুর্তেই এতকিছু ও আর ভাবতে পারছে না। কিন্তু ও এতটুকু জানে , ঐ মানুষটার সাথে ওর নিজেকে কল্পনা করা অবাস্তব। কারণ কিছু অনুভূতি যতই সত্য হোক, সব সত্য বাস্তব হওয়ার জন্য জন্মায় না। যেখানে হৃদয় নিজেই ইনায়াকে ভালোবাসে, সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের মনে এমনসব অদ্ভুত কল্পনা জন্ম দেওয়া নিঃসন্দেহে অপরাধ। এই উপলব্ধিটুকু বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ছে তরীর মনে। মুহূর্তেই ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা শূন্য হয়ে গেল। মনখারাপের একটা নরম ছায়া ধীরে ধীরে নেমে এল মুখশ্রীর উপর। চোখের কোণে জমল অনুচ্চারিত কষ্ট।
হৃদি পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। ও হয়তো তরীর এই নীরব পরিবর্তনটুকু এড়িয়ে যেতে পারল না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তরীর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। হৃদির কণ্ঠ এবার মায়াময়,
__কি হয়েছে? তুই এমন মনমরা হয়ে থাকছিস কেন? আমাকে বল প্লিজ….
তরী একপলক তাকাল হৃদির দিকে। সেই দৃষ্টিতে যেন অসংখ্য প্রশ্ন, অসংখ্য দ্বিধা। তারপর দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে মৃদু গলায় বলল ,
__আমি জানি না আমার কি হয়েছে! কেন এমন হচ্ছে আমার সাথে সেটাও আমি জানি না।
হৃদি ভ্রু কুঁচকে একটু ঝুঁকে এল তরীর দিকে।
__ মানেএ? কি হয়েছে তোর? তুই কি সেদিনের ঘটনার জন্য এখনও মন খারাপ করে আছিস?
তরী ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
__ না তো।
__তাহলে?
কিছুক্ষণ চুপ রইল তরী। যেন শব্দগুলো গলা দিয়ে বেরোতেই চাইছে না। তারপরও খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস স্বরে বলল ও,
__আমি এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ফেঁসে গেছি হৃদি! না পারছি এই অনুভূতি থেকে বেরিয়ে আসতে, না পারছি এটাকে পুরোপুরি বুঝতে।
কথাগুলো বলেই ও চোখ নামিয়ে নিল। আঙুলের ডগা দিয়ে চাদরের ভাঁজ কুঁচকে দিতে লাগল। যেন সেই ভাঁজের মধ্যেই নিজের অস্থিরতাকে লুকিয়ে ফেলতে চাইছে।
এইদিকে হৃদির মুখের অভিব্যক্তি ধীরে ধীরে বদলে গেল। বিরক্তিতে ওর চোখ মুখ মুহুর্তেই কুঁচকে গেল। ও যেটা ভাবছে সেটা যদি হয়, তাহলে আজ ও দুইটা কড়া কথা শুনিয়ে দেবে তরীকে।
চলবে।
দেরীতে দেওয়ার জন্য দুঃখিত 🙏 কয়েকদিন পেইজে এক্টিভ ছিলাম না, তাই পান্ডু লিখে রেখেও গল্প দেয়নি। কাল থেকে চেষ্টা করছি রেগুলার দেওয়ার।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১০
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৯
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৭
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১১
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৬
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৮
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৩
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৩