Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৬


নয়নারএমপিসাহেব

পর্ব:- ১৬
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি

__একা যেতে পারবি তাই না? আমার প্রয়োজন নেই তোর। তাহলে যা এখনি আমার চোখের সামনে থেকে সরে যা , জাস্ট গেট লস্ট।

হৃদয়ের কথায় তরী সত্যি সত্যি অন্ধকার পথ দিয়ে যেতে লাগলো। একরকম জেদ চেপে বসেছিল ওর ঘাড়ে। অন্ধকার সরু পথটার দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য ওর বুকটা ধক করে উঠেছিল বটে, তবুও ও থামেনি। ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল সামনের দিকে। ওর এখন এত সাহস কোথা থেকে আসলো কে জানে? হয়তো হৃদয় পাশে আছে বলেই এত সাহস।

কারণ ও জানে এই অন্ধকারে, এই বিপদে হৃদয় ওকে কখনোই একা ফেলে যাবে না। ওদের মধ্যে যতই দুশমনি থাকুক না কেন হৃদয় কখনোই ওকে রেখে চলে যাবে না।

আর হলও ঠিক তাই। পেছন থেকে আচমকা ধুপধাপ পায়ের শব্দ শোনা গেল। তারপরই
ঠাস করে হৃদয় ঝড়ের মতো এগিয়ে এসে এক টানে ওকে পাঁজাকোলে তুলে নিল।

অপ্রস্তুত তরী প্রথমে হতভম্ব, তারপরই ক্ষেপে উঠল। দুমদাম করে কিলঘুষি দিয়ে গেল হৃদয়ের বুকে। যেন সকালের জমে থাকা অভিমান, রাগ, অপমান সব একসাথে মুঠো বেঁধে ঝরে পড়ছে তার ছোট ছোট মুঠো থেকে। আবার হয়তো আজ সুযোগ পেয়েছে বলে একটু হাতটা চালিয়ে নিচ্ছে ভালো করে।

তরীকে ছটপট করতে দেখে হৃদয় দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

__আমাকে অশান্তি না দিয়ে তুই একদণ্ডও শান্তিতে থাকতে পারিস না, তাই না? আমি যা বলব, তার ঠিক উল্টোটাই তোর করতে হবে। যখন আমি থাকব না, তখন বুঝবি…. । কথাটা শেষ হতেই তরীর হাত থেমে গেল, মুহূর্তে। কেন জানি বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল ওর। হৃদয়ের কথাগুলো ওর খুব খারাপ লাগলো। তাই আর কিছু বলল না। নিঃশব্দে চুপ করে পড়ে রইল তার বুকে।

অতঃপর কিছুটা এগোতেই গোলকধাঁধার শেষপ্রান্ত পেরিয়ে হৃদয় তরীকে সহ গোলকধাঁধার বাইরে বেরিয়ে আসলো। বাইরে অপেক্ষা করছিল বাকিরা।
হৃদয়ের কোলে তরীকে দেখে সবাই একসাথে ছুটে এল।

__কি হয়েছে তরীর? সব ঠিক আছে তো? উদ্বিগ্ন গলায় বলল নোহান।

হৃদি এগিয়ে এসে, অন্যদের মতো হইচই না করে ধীরে হাত বাড়িয়ে তরীর গালে ছোঁয়ে দিল। পরপর নরম স্বরে বলল—

__তুই ঠিক আছিস তো? আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম!

তরী মাথা নাড়ল উপর নিচ। তারপর আড়চোখে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল—

__আমাকে নামিয়ে দিন।

হৃদয় নামাল না। উল্টো কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তরীর দিকে। পরপর সে তার এসিস্ট্যান্ট তাহিরের উদ্দেশ্যে বলল,

__তাহির….

হৃদয়ের গম্ভীর কন্ঠ শুনে তাহির সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এল।
__জ্বী ভাই?

__তুমি হৃদিকে নিয়ে বাড়ি যাও। আমি নয়নকে নিয়ে আসছি। আর নোহান তুই স্নেহা এবং প্লাবন কে তাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আয়। শামীম তুই তো গাড়ি এনেছিস?

জবাবে শামীম মাথা নাড়িয়ে বলল,
__হ্যাঁ

অতঃপর তাহির এবং নোহানও মাথা নেড়ে সায় জানালো।
পরপর নোহানের গাড়িতে স্নেহা এবং প্লাবন উঠে গেল। শামীমের গাড়িতে শামীম নিজে। অন্যদিকে তাহিরের গাড়িতে শুধুই হৃদি বসলো। কেননা হৃদিকে নিয়ে তাহির সোজা খান বাড়িতে যাবে। আর নোহান স্নেহা এবং প্লাবন তাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসবে। কিছুক্ষণ মিনিটের মধ্যেই গাড়ি তিনটে ধীরে ধীরে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল।

আবারও চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে উঠলো। তরী তখনও হৃদয়ের কোলে গুটিগুটি মেরে পড়ে আছে। হৃদয় তরীকেসহ ধীর পায়ে বাইকের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর অত্যন্ত যত্নে ওকে বসিয়ে দিল সিটে। এইদিকে তরী বিস্ময়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কারণ হৃদয় আজ পর্যন্ত কাউকে তার বাইকে বসায়নি ইভেন সে নিজেও খুব একটা বাইক চালায় না। ছয় মাসে একবার দুবার।
কিন্তু আজ সে নিজে থেকে তরীকে বসিয়ে দিল তার বাইকে। বিষয়টা তরীর কাছে একদম অবিশ্বাস্য, তার কারণও আছে হৃদয় যখন নতুন নতুন বাইক নিয়ে ছিল হৃদি এবং ও কতদিন হৃদয়ের পিছে পিছে ঘুরে ছিল শুধুমাত্র একবার বাইকে উঠার জন্য, কিন্তু পাষান্ড হৃদয় তখন তাদের পাত্তাই দেয়নি। আর আজ সে নিজে থেকে তরীকে তার বাইকে বসিয়েছে তাই হয়তো তৈরি বিষয়টা হজম করতে পারছে না।

উপরন্তু হৃদয় হেলমেটটা হাতে নিয়ে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল তরীর দিকে। তার চোখে তখন আর রাগ নেই, আছে শুধু এক অদ্ভুত নীরব যত্ন।


__আমি আপনার বাইকে করে যাব, হৃদয় ভাইয়া?

তরীর এহেন প্রশ্নে হৃদয় ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

__এখানে আর অন্য কাউকে দেখতে পাচ্ছিস তুই?

শিশুসুলভ সরলতায় তরী দুদিকে মাথা নাড়ল। সত্যিই তো আর কিছু নেই।

__তাহলে চুপচাপ বসে থাক। সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দিল হৃদয়। অতঃপর তরীকে সেই অবস্থাতেই রেখে সে বাইকে উঠে বসল। পরক্ষণেই তরীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই তরীর দুহাত টেনে নিজের পেটের ওপর রাখল। আচমকা টানে তরীও হুড়মুড়িয়ে পড়ল হৃদয়ের উপর। ওর ছোট শরীরটা গিয়ে ঠেকল হৃদয়ের পিঠে। মাত্রাত্মিক বিস্ময়ে তরীর চোখ গোল গোল হয়ে গেল । পরপরই নিজের অবস্থান বুঝে ও একদমই স্থির হয়ে রইল।

লুকিং গ্লাসে তরীর লাজুক অভিব্যক্তি ধরা পড়তেই হৃদয়ের ঠোঁটে ধূর্ত আর তৃপ্ত এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। পরমুহুর্তেই হৃদয়ের বাইকটা শোঁ শোঁ শব্দ তুলে সামনের পথে ছুটতে লাগল। বাতাসের ঝাপটা, গতি আর হৃদয়ের উষ্ণ পিঠ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা তরীকে ঘিরে ধরল। ধীরে ধীরে ও মাথা ঠেকিয়ে দিল হৃদয়ের পিঠে। কিছু সময়ের ব্যবধানে ওর চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠলো আজকের দিনের প্রত্যেকটা ঘটনা । ভয়, আতঙ্ক আর শেষমেশ হৃদয়ের আগমন। ভাবতেই শরীর শিউরে উঠে তরীর। যদি আজ হৃদয় সময়মতো না আসত তাহলে কি হতো তার সাথে? এইসব ভেবে তরী অজান্তেই আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল হৃদয়কে। সেই সাথে আজ যেন এক নির্মম সত্য উপলব্ধি করল তরী‌। এতদিন ধরে ও শুধুই মরীচিকার পেছনে ছুটে গেছে। প্লাবন যে এমন বিপদের মুহূর্তে তাকে ফেলে পালিয়ে যেতে পারে, তা ওর কল্পনারও বাইরে ছিল। আজকের এই প্লাবন যেন একেবারেই অচেনা ছিল তরীর কাছে। তরী এক অচেনা মানুষকে আবিষ্কার করলো আজ। আর সেই উপলব্ধির মাঝেই আরেকটি সত্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল তরীর সামনে হৃদয় তাকে যতই অপছন্দ করুক, যতই রূঢ় আচরণ করুক, তবু ভরা বিপদে সে কখনোই ওকে একা ফেলে যাবে না।

হয়তো হৃদয় তরীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছে, সে সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,

__কি হয়েছে?

তরী মাথা নেড়ে বলল,
__কিছু না তো।

হৃদয়ের কণ্ঠ এবার খানিক কঠিন হলো—
__তাহলে তোর শরীর এইভাবে কাঁপছে কেন?
তরী কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর ধীরে মাথা তুলে, কাঁপা স্বরে বলতে লাগল,

__আপনাকে ধন্যবাদ। আজ আপনি না আসলে আমার সাথে কি যে হতো, আমি হয়তো আর বেঁচে থাকতাম না আ…. বাকিটুকু আর শেষ করতে পারল না ও। হঠাৎই তীক্ষ্ণ শব্দ তুলে হৃদয় ব্রেক কষল। আচমকা ঝাঁকুনিতে তরীর শরীরটা সামান্য দুলে আবার এসে ঠেকল তার পিঠে। বিস্মিত চোখে ও তাকাল হৃদয়ের দিকে, এই মুহূর্তে হৃদয় আবার কি নিয়ে রেগে গেছে তরী বুঝতে অক্ষম।

তরী মিনমিনে কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
__কি হয়েছে?

হৃদয় তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিল না। লুকিং গ্লাসের সাহায্যে তরীর চোখের দিকে সে গভীর, দহনময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর ভারী স্বরে উচ্চারণ করল—

__আমার অতিরিক্ত তোর দিকে অন্য কারোর দৃষ্টিও আমি সহ্য করবো না। সেখানে তোকে কেউ স্পর্শ করার সাহস দেখালে তার পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তার প্রমাণও তুই পেয়ে যাবি।

চলবে।

রিচেক দেয়নি।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply