নয়নারএমপিসাহেব
পর্ব:- ১৫
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি
প্লাবনের ঠোঁট কাঁপছে, চোখ দুটোতে আতঙ্ক। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল হয়তো, কিন্তু তার আগেই ঝড়ের মতো তার কলার চেপে ধরল হৃদয়। লোহার মতো শক্ত আঙুলের চাপ পড়তেই প্লাবনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসল।
হৃদয়ের চোখে তখন শুধুই আগুন।
ধারালো স্বরে সে ফিসফিস করে উঠল,,,
নয়ন কোথায়? স্বরটা এত ভয়ংকর শোনাল যে প্লাবন হকচকিয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ। একে তো বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে সে আগে থেকেই ভয় পেয়ে ছিল এখন হঠাৎ হৃদয়ের এমন রুদ্ররূপ! সব মিলিয়ে প্লাবনের শরীরের প্রতিটা স্নায়ু ভয়ে কাঁপতে লাগল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, আমি….. আমি কিছু করিনি। সত্যি বলছি। ওই লোকগুলো আমাকে চলে যেতে বললে, আমি কোনো রকমে জান বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছি….
তার এইকথায় হৃদি চিৎকার করে উঠল মুহুর্তেই,
__কিহহহ! কি বলছো তুমি প্লাবন ভাইয়া? হৃদি যেন বজ্রাঘাতে কেঁপে উঠল। ওর চোখ বিস্ফারিত, কণ্ঠ ভাঙা,
__তুমি তরীকে ওইখানে একা রেখে চলে এসেছো প্লাবন ভাইয়া? ওই গুন্ডাদের কাছে? তুমি এমন কিভাবে করতে পারলে প্লাবন ভাইয়া? ঐ এতগুলো লোকের মাঝে আমার তরী … হৃদির বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। ভয়, রাগ আর হতাশা মিলেমিশে চোখের কোণে আগুনের মতো জ্বলছে। হঠাৎই ও ছুটে ভিতরের অন্ধকার পথের দিকে যেতে নিল, কিন্তু তখনই তাহির দ্রুত হাত বাড়িয়ে তার কবজি চেপে ধরল।
__কোথায় যাচ্ছো?
হৃদি ছটফট করল,
__ছাড়ুন! তরী ভেতরে….
তাহিরের শক্ত হাত হৃদির হাতটা আরও শক্ত করে আটকালো।
এদিকে,
হৃদয় আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। প্লাবনের কলার ছেড়ে সে এমন জোরে ধাক্কা দিল যে প্লাবন ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল ধপাস করে।
তারপর আর কোনো কথা না বলে হৃদয় ঝড়ের বেগে ছুটে গেল অন্ধকার গোলকধাঁধার ভেতরে। তার পিছু পিছু ছায়ার মতো ছুটল তার গার্ডরাও।
ঐদিকে কিছুটা আলোঅন্ধকার গোলকধাঁধার ভেতরটা যেন হঠাৎ আরও ঘন হয়ে উঠল। আলো অন্ধকার আর আতঙ্কে মিলেমিশে এক অদ্ভুত ভারী আবহ তৈরি করেছে। তরী দিশেহারা হয়ে এদিকওদিক ছুটছে। কখনো বাঁ দিকে তো কখনো ডান দিকে। কিন্তু প্রতিটা মোড় যেন একই রকম। সামনে অচেনা পথ, পেছনে ধেয়ে আসা পদশব্দ। ওর শ্বাসপ্রশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে, বুকটা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ভাগ্য যেন আজ তার বিপরীতেই দাঁড়িয়েছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ছেলেগুলো তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল।
তরী থেমে গেল। না থেমে উপায়ও নেই। সামনে দেয়াল, চারপাশে লোকগুলো, পেছনে অন্ধকার।
ওদের মধ্য থেকে একজন এগিয়ে এলো চোখে বিকৃত লালসা, ঠোঁটে কুৎসিত হাসি। সে ধীরে ধীরে তরীর চারপাশে চক্কর কাটতে কাটতে বলল,
__এইবার কোথায় যাবে সুন্দরী? লোকটার কণ্ঠে নোংরা মজা। সে আবার দাঁত বের করে হাসল,
__উফফ, তোমার এই রূপে তো আমরা মরে যাচ্ছি সুন্দরী। আমাদেরকেও একটু উপভোগ করাও তোমার এই রূপ…. কথাটা শেষ হতেই লোকটাসহ বাকিরা সবাই একসাথে হেসে উঠল। একটা কর্কশ, বিকৃত, হাসি। ভয়ে তরীর বুক কেঁপে উঠছে। চোখে জল টলমল করছে। ঠোঁট কাঁপছে। ও আরও পিছিয়ে গেল। কিন্তু পেছনেও দেয়াল।
কয়েক মিনিট আগের ঘটনা, ও আর প্লাবন যখন পালাতে চাইছিল। তখনই দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ একজন গুন্ডা প্লাবনের সামনে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে গেল।
অতঃপর নোংরা কন্ঠে প্লাবন কে বলে,
এই ছেলে জানে বাঁচতে চাইলে এই মালটাকে আমাদের দিয়ে নিজে কেটে পর। না হলে এই বন্দুকের সব গুলি দিয়ে তোর শরীর ছিদ্র করে ফেলবে। তারপর ভোগ করবো এই সুন্দরীকে। সেই মুহূর্তটা এখনো চোখের সামনে ভাসছে তরীর। ও ভেবেছিল এমন পরিস্থিতিতে প্লাবন ওকে রেখে কিছুতেই যাবে না। কিন্তু না, প্লাবনের চোখে তখন নিজের প্রাণ বাঁচানোর আতঙ্ক ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আর পরের মুহূর্তেই— সে সত্যিই দৌড়ে পালিয়ে গেল এই নরকসম অবস্থার মধ্যে তরীকে একা ফেলে। এইসব ভাবতেই তরীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুজল। এখন নিজের উপরই তীব্র রাগ হচ্ছে ওর। কেন ও আর হৃদি হৃদয়কে কিছু না জানিয়ে এসে পড়লো এইখানে। ও কাঁদতে কাঁদতে উপরওয়ালাকে মনে করতে লাগলো। হয়তো এইদিনটাই ওর জীবনের শেষ দিন। ছেলেগুলো ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে কাছে এগোতে লাগল। তরীর পিঠ ঠেকে গেল ঠান্ডা দেয়ালে। তার আঙুলগুলো কাঁপছে, শরীর কাঁপছে। মনে মনে উপরওয়ালাকে ডেকে চলেছে অনবরত। তখনই একজন গুন্ডা বিকৃত হেসে ধীরে ধীরে হাত বাড়াচ্ছিল তরীর ওড়নার দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন দিক থেকে বজ্রপাতের মতো এক গর্জন ভেসে এল— ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু টাচ হার!
গোলকধাঁধার ভেতরের অন্ধকারটা তখনও পুরো কাটেনি, কিন্তু পরিস্থিতির তীব্রতা যেন মুহূর্তেই বদলে গেল। আগত কণ্ঠটা ছিল ধারালো। শব্দটা কানে পৌঁছাতেই তরীর শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে উঠল। ও ঝটকা মেরে পিছনে ফিরল। আর পরের মুহূর্তেই তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল অশ্রুতে। ওর থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে হৃদয়। হালকা আলো অন্ধকারে হৃদয়ের চেহারা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কালো হুডি, মাস্ক লাগানোয় তার চেহারা বোঝা মুশকিল, কিন্তু ঐ চোখ দুটো তরীর খুব চেনা। সেই চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে। হৃদয় এক ঝটকায় মাস্ক খুলে ফেলে দিল।
এইমুহুর্তে গুন্ডাগুলোরও তাকে চিনতে দেরি হলো না। মুহূর্তেই ওদের মুখের রঙ বদলে গেল। ওরা পালিয়ে যাওয়ার আগেই চারদিক থেকে হৃদয়ের গার্ডরা ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাইকে চেপে ধরল।
তরী আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়লো।
হৃদয়ও আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করল না। বজ্রগতিতে এগিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়াল।
__বাবুই! তুই ঠিক আছিস তো? কোথায় লেগেছে বল আমাকে। বলতে বলতে সে নিজেই তরীর কাঁধ, বাহু, মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। যেন চোখের এক ফাঁকেও কোনো আঘাত লুকিয়ে আছে কিনা খুঁজে বের করতে মরিয়া। তরী কিছু বলল না। শুধু কেঁদে চলেছে অনবরত। হৃদয়ের বুকের ভেতরটা অস্থিরতায় ছটফট করছে। তার কণ্ঠ আরও নরম হয়ে এল—
__কি হয়েছে বাবুই? বল না আমাকে, ওরা কিছু করেছে, তোকে কষ্ট দিয়েছে?
তরী মাথা নেড়ে বোঝাল না। ওর এইটুকু ইশারাতেই যেন হৃদয়ের বুকের ওপর থেকে পাহাড় নেমে গেল। হৃদয় পারছে না গুন্ডা গুলোকে এখানেই জ্যান্ত পুতে ফেলতে কিন্তু ও পারছে না কেননা তরী এখন তার সাথে আছে। সে শুধু ইশারায় গার্ডদের নির্দেশ দিল। হৃদয়ের ইশারায় এক মুহূর্তেই গুন্ডাগুলো টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে নেওয়া হল।
চারপাশ আবার নিঃশব্দ হয়ে উঠলো, এখন আর তরীর ভয় নেই শুধু তরীর কাঁপা শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। হৃদয় ধীরে ধীরে ওর ছোট্ট মুখটা দুহাতে আগলে নিল। তারপর উন্মাদের মত একের পর এক চুমু বসাতে লাগল কপালে, চোখে, গালে, নাকে।
__সরি সোনা। আমার আসতে একটু লেট হয়ে গেছি খুব ভয় পেয়েছিলে তুমি? আই এম ভেরি সরি। প্লিজ কান্না অফ করো….
হৃদয়ের কথায় তরীর কান্না একটু থামল। ও নিঃশব্দে হৃদয়ের বুকে পড়ে রইলো কিছুক্ষণ। যেন এই বুকটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
কিন্তু—
এই শান্তি বেশিক্ষণ টিকল না হৃদয়ের কপালে। হঠাৎই সকালের ঘটনা ঝলসে উঠল তরীর মনমস্তিষ্কে। হৃদয় কিভাবে ওকে রুম থেকে চলে যেতে বলেছিল। অপমানে তরীর ছোট মুখটা থমথমে হয়ে গেল। এই যে কিছুক্ষণ আগেই এতবড়ো বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, এক নিমিষে সব ঘটনা ভুলে গেল ও। এখন শুধু হৃদয়ের প্রতি তীব্র অভিমান জ্বলে উঠলো ওর মনে, হয়তো সেই সাথে হৃদয়ের একটু দেরি করে আসাটাও অভিমানকে চারগুণ বাড়িয়ে দিল। মুহূর্তেই ও ঝটকা মেরে সরে দাঁড়াল হৃদয়ের থেকে। চোখ আবার ভরে উঠল জলে।
হৃদয় হতভম্ব। বুঝতে পারছে না কি হলো হঠাৎ। সে এক পা এগোতে নিলেই তরী হাত তুলে থামিয়ে দিল,
__আমার কাছে একদম আসবেন না আপনি। একদম ছুবেন না আমাকে। আমার থেকে দূরে থাকুন। অতিরিক্ত কান্নার ফলে ওর কণ্ঠ কাঁপছে, তবু জেদ চেপে বসেছে ওর ঘাড়ে। ও আবারও বলে উঠলো,
__আপনাকে অনেক ধন্যবাদ যে আপনি আমাকে সাহায্য করেছেন। এখন আমারটা আমাকে বুঝে নিতে দেন। আমি যেভাবে এসেছি ঠিক সেভাবেই চলে যেতে পারব।
কথাগুলো শুনে হৃদয়ের কপালে ভাঁজ পড়ল মুহুর্তেই। পরের মুহূর্তেই তার মনে পড়ে গেল সকালর ঘটনা। তার নিজের বলা কথাগুলো যেন এখন ছুরির মতো ফিরে এসে বুক বিঁধছে। সে না চাইতেও তরীকে তখন হার্ট করে ফেলেছিল খুব। হৃদয় নিজের ভুল বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল , তরীর খুব কাছে। এতটাই কাছে যে তরীর নিঃশ্বাসের শব্দ সে শুনতে পারছে। আস্তে করে হাত বাড়িয়ে ওর তুলতুলে গালে হাত রেখে বলল,
__সরি বাবুই! খুব সরি। সকালের জন্য খুব খুব খুব সরি। প্লিজ রেগে থাকিস না আর। তুই চাইলে আমাকে মার, কাট, যা ইচ্ছা কর। কিন্তু এখন বাড়ি ফিরে চল প্লিজ! হৃদয়ের চোখে স্পষ্ট অনুনয়।
কিন্তু না এইবার তরী হৃদয়ের আদুরে কথায় গলল না। ঝটকা মেরে তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে পাঁচ কদম দূরে গিয়ে দাঁড়াল। পরপর মুখ ঘুরিয়ে নিল,
তারপর অভিমানি গলায় বলতে লাগল,
__আপনি চলে যান। আমি নিজেরটা বুঝে নিতে পারব। আমি ঠিক ফিরে যাব। আপনার আর কোনো সাহায্য করতে হবে না আমাকে।
এমনিতেও আপনি আমাকে অনেক করুণা করেছেন। আপনার বাড়িতে আমরা থাকছি, আমার খরচাপাতি দিচ্ছেন! এখন থেকে সেটা আর দিতে হবে না। আমি আম্মুকে বলে দেব, এতদিন পর্যন্ত আমার যা খরচ দিয়েছেন, সব যেন আপনাকে দিয়ে দেয়।
এতক্ষণ হৃদয় শান্ত থাকলেও এখন আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারল না সে। একে তো এই মেয়ে তাকে না বলে প্লাবনের সাথে এইখানে এসেছে। এতকিছুর হওয়ার পর এখনও তাকে জেদ দেখাচ্ছে, হৃদয়ের রাগটাও যেন তিরতির করে বেড়ে গেল, সে রেগে কিছু কদম এগিয়ে তরীর গাল চেপে ধরে বলল,
__একা যেতে পারবি তাই না? আমার প্রয়োজন নেই তোর। তাহলে যা এখনি আমার চোখের সামনে থেকে সরে যা , জাস্ট গেট লস্ট।
চলবে।
এই একটা গল্পের চক্করে এত হেনস্থা হচ্ছি। সত্যি যতদিন যাচ্ছে এই গল্পটা লেখার ইচ্ছা মরে যাচ্ছে। জানি না আর কতদিন কন্টিনিউ করবো।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৪
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৪
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৫
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১২
-
নয়নার এমপি সাহেব গল্পের লিংক
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৭
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১১
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৬