Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৪


নয়নারএমপিসাহেব

পর্ব:- ১৪
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি

সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল সময় যেন আজ হৃদয়ের সঙ্গে প্রতারণা করছিল। এতগুলো ঘণ্টা কেটে গেল, অথচ একবারও তরীর সামনে দাঁড়িয়ে ওর অভিমান ভাঙানোর সুযোগ পেল না সে। নোহানের সঙ্গে কথাবার্তা শেষ হতেই তাকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল। নির্বাচন সামনে, চারদিক থেকে চাপ যেন শিকল হয়ে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। হৃদয়ের এতটুকুও সময় হচ্ছে না তার অভিমানীনির অভিমান ভাঙ্গানোর। তবু বিকেলের শেষ আলো পড়তেই অদ্ভুত এক অস্থিরতা তাকে গ্রাস করল। কাজ ফেলে প্রায় ছুটে বাড়ি ফিরল সে। তবে ড্রয়িং রুমে পা রেখেই কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা মনে হল, এই সময়টায় সাধারণত তরী এবং হৃদি ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখে । কিন্তু আজ নেই।

হৃদয় হঠাৎ গলা তুলে অনিমা বেগমকে ডাকল,
__আম্মু! আম্মু…!

ছেলের কন্ঠ শুনে উপর থেকে অনিমা বেগম নেমে আসলেন,

__কি হয়েছে আব্বা? তুই এত দ্রুত ফিরে এলি ? আজ না তোর অনেকগুলো মিটিং আছে?

হৃদয় তার মায়ের দিকে তাকিয়েই দ্রুত বলল,
__ মিটিং কেন্সেল হয়ে গেছে আম্মু। তুমি আগে বলো বাঁদর ছানা কই? আই মিন হৃদি ওরা কোথায়?

অনিমা বেগম হয়তো ছেলের অস্থিরতা বুঝতে পেরেছেন, তাই তিনি হেসে জবাব দিলেন,

__তোর বাঁদর ছানা প্লাবন আর স্নেহার সাথে ঘুরতে গিয়েছে। কোথায় গেছে তা ঠিক জানি না। সাথে হৃদিও গেছে…..

মায়ের কথায় হৃদয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল মুহুর্তেই। বুকের ভেতর যেন আগুন দপদপ করে জ্বলে উঠল, কিন্তু সে নিজের রাগটাকে কন্ট্রোল করে নিল আজ। কেননা সকালে এমনিতেই সে তার বাঁদর ছানাকে হার্ট করেছে তাই এইবার সে নিজের রাগটাকে পুষলো না। অতঃপর কিছু না বলে গটগট পায়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। মিনিট পাঁচের মধ্যেই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল, গায়ে কালো হুডি, মুখে মাস্ক। ফোনটা হাতে নিয়ে দ্রুত হৃদিকে কল করে তাদের লোকেশন জেনে নেয়। তারপর গ্যারেজ থেকে বাইক বের করে দ্রুত গতিতে বাইক স্টার্ট দেয়। ইঞ্জিনের গর্জন যেন তার বুকের ভেতরের অস্থিরতার প্রতিধ্বনি। তরীর প্লাবনের সঙ্গে যাওয়াটা হৃদয়ের যে একদমই সহ্য হচ্ছে না, সেটা তার হাবভাবেই প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু আজ সে তরীকে কিছু বলবে না।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে প্রায়। আকাশের রঙ ধূসর থেকে ধীরে ধীরে কালচে হচ্ছে। হৃদয়ের বাইকও হাওয়ার নেই ছুটে চলছে নিজের গন্তব্যে।


ঐদিকে তরী এক পায়ে জুতো পরে ক্রমাগত দৌড়ে চলেছে, আরেক পায়ের জুতোর কোনো হদিস নেই।ভয়ে ওর শ্বাস কাঁপছে, বুক ওঠানামা করছে, গাল বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে। ওর থেকে একটু দূরেই প্লাবন ছুটছে, কিন্তু তার দৌড়ে যেন নিজের প্রাণ বাঁচানোর তাড়না। তরীর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না সে। তরী একবার সামনে তাকায়, আবার একবার পিছনে। পিছনে প্রায় পাঁচজন ছায়ামূর্তি হাতে চকচকে ধাতব জিনিস নিয়ে ওদের পিছু নিয়েছে পাঁচ মিনিট ধরে। তরী জানে না এরা কারা।

আজ দুপুরেই ও আর হৃদি প্লাবন আর স্নেহার সাথে ঘুরতে বেড়িয়েছিল। হৃদয়ের অমন ব্যবহারের পর তরী সারাদিন মন খারাপ থাকে। দুপুর বেলার দিকে প্রমীও চলে যায়। সেই নিয়ে তরীর মন খারাপ আরও একশোগুন বেড়ে যায়। তারপরপরই প্লাবন এবং ওর বোন স্নেহা খান বাড়িতে আসে । তারপর ওরা চারজন মিলে প্ল্যান করে শহরের কোলাহল পেড়িয়ে কিছুটা দূরেই নতুন একটা গোলকধাঁধা তৈরি করা হয়েছে সেটা দেখতে যাবে। তরীও ভাবলো একটু ঘুরে ফিরে আসলে মনটা ভালো হয়ে যাবে হয়তো!

কিন্তু কে জানত এই ঘুরতে বেরুনোটাই ওদের কাল হয়ে দাঁড়াবে। দীর্ঘ চল্লিশ মিনিটের রাস্তা পেড়িয়ে ওরা এইখানে আসে । জায়গাটা সুন্দর হলেও লোকজন হাতে গোনা। প্রথমে সবকিছু ভালো হলেও একটু সন্ধ্যা হতেই হঠাৎ করেই ছেলেগুলো ওদের অনুসরণ শুরু করে। হঠাৎ করে এতগুলো ছেলে ওদেরকে ফলো করায় ওরা চারজনই অনেকটা ভয় পেয়ে যায়। কেননা আজও ওরা পাকামো করে গার্ড সাথে আনেনি। ছেলেগুলোকে দ্রুত গতিতে নিজেদেরকে দিকে আসতে দেখে ভয়ে ওরা চারজন ছুটতে শুরু করে। তাদের দেখা দেখি ঐ ছেলেগুলোও তাদের পেছনে ছুটতে থাকে।

দৌড়াতে দৌড়াতে ওরা বুঝতেই পারেনি যে ওরা গোলকধাঁধার আরও ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ঠিক তখনই স্নেহা হৃদির হাত টেনে অন্য এক সরু পথে ঢুকে যায়। প্লাবন আর তরী পড়ে যায় অন্য পথে। দুর্ভাগ্যবশত গুন্ডাগুলোও ছুটে আসে তরী আর প্লাবনের দিকেই। তরীর পা এক পর্যায়ে ভেঙে আসে কিন্তু তার থেকেও অবাক বিষয় প্লাবন তরীকে ফেলেই একপ্রকার ছুটে পালাচ্ছে। তরী যেন এই প্লাবনকে চিনতেই পারছে না। প্লাবন তাকে ফেলে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। একবারও ফিরে তাকাচ্ছে না। তরীর বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল,
এই কি ওর প্লাবন ভাই?


অন্যদিকে হৃদি আর স্নেহা দৌড়াতে দৌড়াতে কোনোরকম গোলকধাঁধার বাইরে বেরিয়ে এসেছে। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। চারপাশে কোনো মানুষ নেই। ভয়ে ওদের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। হৃদি কাঁপা হাতে আবারও ডায়াল করে হৃদয়ের নাম্বারে।

বিপদে পড়ে হৃদিরা যখন তরীদের থেকে আলাদা রাস্তায় ঢুকে পড়ে তখনই ও বুদ্ধি করে হৃদয়কে ফোন করে সবটা জানায় এবং এটাও জানায় ও আর স্নেহা গুন্ডাদের থেকে পালিয়ে আসলেও তরী আর প্লাবন বিপদে আছে। অতঃপর হৃদয়কে যত দ্রুত সম্ভব এইখানে আসতে বলে।

বর্তমান….
হৃদি আবার হৃদয়ের নাম্বারে কল দিতে গেলে, ঠিক তখনই হঠাৎ বাতাস চিরে বিকট শব্দে একটা বাইক এসে থামল তাদের সামনে। চাকার ঘর্ষণে ধুলো উড়ে উঠল চারদিকে। হেডলাইটের তীব্র আলো, অন্ধকার ছিঁড়ে সোজা এসে পড়ল তাদের মুখে। হৃদি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল।

পরমুহূর্তেই ও শুনল এক গভীর, চেনা কণ্ঠ। হৃদি সেকেন্ডের গতিতে চোখ মেলে তাকালো , হৃদয় ততক্ষণে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে,

__ বনু… নয়ন কোথায়?

হৃদয়কে দেখে হৃদি কাঁদতে লাগল , পরমুহূর্তেই কাঁদতে কাঁদতে বলল,

__দাভাই…. তরী আর প্লাবন ভাইয়া এখনও ভিতরেই আছে। তুমি প্লিজ তরীকে ঐ গুন্ডাদের কাছ থেকে নিয়ে আসো। আমরা তোমাকে না বলে আর কখনও কোথাও যাব না, প্লিজ তুমি তরীকে নিয়ে আসো।

হৃদির বলা বাক্য শেষ হতে না হতেই দূর থেকে হেডলাইটের তীব্র আলো ছুটে এলো। মুহূর্তের মধ্যে দুইটা কালো গাড়ি এসে ব্রেক কষল তাদের সামনে। দরজা খুলে একে একে নেমে এল হৃদয়ের গার্ডসসহ শামীম, নোহান এবং তাহির। নোহান দ্রুত পা চালিয়ে এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
__হৃদি, তোরা ঠিক আছিস তো?

হৃদি মাথা নাড়ল, কিন্তু কথার বদলে চোখ ভরে উঠল জলে।
__ আমরা ঠিক আছি ভাইয়া, কিন্তু তরী….

হৃদয়ের বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করেই ঠাণ্ডা হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি ঘোলা অতঃপর সে সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,

__ নোহান, তোরা হৃদি আর স্নেহার সাথে থাক। আমি ভিতরে যাচ্ছি। কথা শেষ করেই সে গোলকধাঁধার মুখের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিল! ঠিক তখনই ভিতরের সরু পথ থেকে একটা ছায়া দৌড়ে বেরিয়ে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে, প্রায় হোঁচট খেতে খেতে এসে সোজা হৃদয়ের সামনে পড়ল সে।


হৃদয়ের চোখের সামনে প্লাবন দাঁড়িয়ে। তার শার্ট এলোমেলো, চুল ঘামে ভেজা, চোখে আতঙ্কের ছাপ। কিন্তু তার পাশে তরী নেই। এই দৃশ্যটা যেন সময়কে এক সেকেন্ডের জন্য থামিয়ে দিল। হৃদি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন, তারপর কাঁপা স্বরে বলে উঠল—

__প্লাবন ভাইয়া, তরী কই ওতো তোমার সাথেই ছিল?

চলবে…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply