নয়নারএমপিসাহেব
পর্ব:- ১৩
লেখনীতে:- Sanjana
গুটিগুটি পায়ে করিডোর পেরোচ্ছে তরী। হাতে দুকাপ ধোঁয়া ওঠা কফি, অথচ চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির রেখা, ভ্রু দুটো কুঁচকে আছে, ঠোঁট ফুলে উঠেছে। এত লোক থাকতে হৃদয় কেন যে সবসময় তাকেই ডাকে, সেটা ভেবে ও কিছুতেই কূলকিনারা পায় না। বন্ধুদের সঙ্গে দুদণ্ড বসে গল্প করবে, সেই সুযোগটুকুও যেন ওর ভাগ্যে জোটে না এই বজ্জাত লোকের জন্য। অতঃপর ও বিরক্তি নিয়েই এগিয়ে গেল হৃদয়ের দুতালার রুমের দিকে।
দরজার সামনে এসে প্রথমেই ও মুঠো বেঁধে দরজার দিকে একবার পাঞ্চ করার ভঙ্গি করল। তারপর নিচু গলায় বিড়বিড় করে বলে উঠল,
__অসভ্য, ইতর, নির্দয়, পাষণ্ড, বজ্জাত, লম্পট লোক!
__কাকে বলছিস তুই? হঠাৎ গম্ভীর স্বরে তরী চমকে উঠল, বুকের ভেতরটা ধক করে কেঁপে উঠেছে একমুহুর্তে।
ভয়ে ভয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই ওর চোখ চড়কগাছ। হৃদয় আর নোহান ঠিক ওর পেছনেই দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ তার বলা প্রত্যেকটা কথা তাদের কানে গেছে। তরীর এইবার ইচ্ছা করছে, নিজের মাথায় নরম কুশন দিয়ে দুইটা বারি মেরে মাথাটা ফাটিয়ে দিতে ।
তরীর অহেতুক ভাবনার মাঝেই নোহান হালকা হেসে বলে উঠলো,
__তরী, তুই কাকে এইভাবে গালাগাল করছিস? ভাইকে নাকি? হৃদয়কে উদ্দেশ্যে করে বলল নোহান।
নোহানের এমন খোঁচা মারা কথায় তরীর গলার পানি শুকিয়ে যাবে অবস্থা, বেচারি ক্রমাগত মাথা নাড়াতে লাগলো। যার অর্থ না সে হৃদয়কে কিছু বলেনি তো। তরীর চোখে মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক আর অস্বস্তির ছাপ, যা হৃদয় টের পেয়েছে হয়তো।
তাই তো সে আর কোনো কথা বলল না। নিঃশব্দে তরীকে পাশে সরিয়ে দরজা ঠেলে রুমে ঢুকে গেল। তার পেছন পেছন নোহান এবং তরীও ঢুকল, তরী নিঃশব্দ পায়ে ভেতরে এসে টেবিলের উপর কফির কাপ দুটো আস্তে করে রেখে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। ওর দৃষ্টি এদিকওদিক ঘুরে ঘুরে হৃদয়ের রুমটা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। ও আসলে বুঝতে পারছে না ও যাবে কিনা, কেননা হৃদয় যেতে বলেনি এখনও। আর তরীও যেন আজ খুব বাধ্য হয়ে গেছে। তবে তরীর এই বাধ্যতা হয়তো ওর ভাগ্যের সহ্য হল না। তাই তো ঠিক সেই মুহূর্তেই হৃদয় জোড়ে ধমকে উঠল,
__কী হয়েছে? এখনও দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বেড়িয়ে যাওয়ার জন্য কি এখন তোকে আলাদা করে বলতে হবে? দেখছিস না ইম্পর্টেন্ট কথা বলার আছে নোহানকে আমার। তাহলে এখনও কিসের জন্য দাঁড়িয়ে আছিস তুই?
হৃদয়ের হঠাৎ এইভাবে বলাতে তরী অপমানিত বোধ করল খুব। ছলছল চোখে শুধু একবার হৃদয়ের দিকে তাকালো।
এইদিকে তরীর ছলছল চোখ দেখে হৃদয়ের কঠিন মুখাবয়বটা তৎক্ষণাৎ নরম হয়ে আসলো। আসলে সে কথাটা এভাবে বলতে চায়নি। কিন্তু নোহানের সঙ্গে জরুরি কথা ছিল, তাড়াহুড়োতেই স্বরটা কঠিন হয়ে গেছে এবং এইভাবে বলে ফেলেছে।
এখন তার নিজের উপরই রাগ হচ্ছে।
এইদিকে নোহান একবার হৃদয়ের দিকে তাকাচ্ছে তো একবার তরীর দিকে তাকাচ্ছে। পরিস্থিতির টানটান নীরবতা বুঝে সে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই তরী আচমকা ঘুরে দরজার দিকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। দৌড়ে করিডোরে পৌঁছতেই চোখের কোণ বেয়ে টুপটুপ করে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।
__আমি তো যেতে চাইনি উনার রুমে। উনি বলেছেন বলেই তো গিয়েছি। আর কখনো যাবি না তরী। কখনোই না।
এদিকে রুমের ভেতর দাঁড়িয়ে হৃদয় স্থির চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত শূন্য লাগছে, সে কি না চাইতেও তরীকে আঘাত করে ফেলেছে? পরমুহূর্তেই হৃদয়ের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
হৃদয়ের ভাবনার মাঝেই নোহান বলে উঠলো,
__ভাই, তুমি তরীকে এইভাবে কেন বললে? এইভাবে বলা একদম উচিত হয়নি তোমার। এভাবে চলতে থাকলে তরী কিন্তু তোমার থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাবে। তখন কিন্তু সাফার তোমাকেই করতে হবে….
না হৃদয় কোনো উত্তর দিল না। নিঃশব্দে টেবিল থেকে কফির কাপটা তুলে নিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়াল। গরম ধোঁয়া তার চোখের সামনে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠল, কিন্তু তার মন ও দৃষ্টি যেন অন্য কোথাও পড়ে আছে। হৃদয়কে এমন নিশ্চুপ দেখে নোহানও আর কথা বাড়াল না। সেও ধীরে কফির কাপটা তুলে চুমুক দিল, কিন্তু তার চোখে স্পষ্ট কৌতূহল । কিছুক্ষণ পরে নীরবতা ভেঙে নোহানই বলে উঠলো,
__ভাই! তুমি না কি বলবে বলছিলে?
কথাটা শেষ হতেই হৃদয় ধীরে মুখ তুলল। এইবার দৃষ্টি তার কঠিন। সেই দৃষ্টি সরাসরি এসে পড়ল নোহানের উপর। মুহুর্তেই নোহান ভড়কে গেল, পরপর মিনমিন করে বলতে লাগল,
__আমি আবার কি করলাম ভাই? আমার দিকে এইভাবে তাকাচ্ছো কেন?
হৃদয় ধীরে ধীরে কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে রাখল। তার আঙুলগুলো কাপের গায়ে কিছুক্ষণ স্থির রইল, তারপর ভারী স্বরে বলল হৃদয়—
__দেখ নোহান, প্রমী যথেষ্ট ভালো মেয়ে। অনেক স্ট্রাগল করে পড়াশোনা করছে। ওর জীবনে এমন অনেক কিছুই আছে, যা তোর জানা নেই। আর সব জানার দরকারও নেই। তবে আমি এটুকু নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি মেয়েটা ভদ্র, সংবেদনশীল, এবং সবাইকে সম্মান দিতে জানে।
অতঃপর হৃদয় একটু থামল। চোখের দৃষ্টি তখনও স্থির, কিন্তু কণ্ঠের স্বরটা আরো কঠিন হয়ে উঠল,
__ আমি আশা করব, তুই এমন কিছুই করবি না যাতে ও কষ্ট পায়, কিংবা অসম্মানিত বোধ করে। আমি ওকে হৃদির মতো করেই আদর করি? তাই ওর সাথে কিছু ভুলভাল করার কথা মাথায়ও আনিস না। সেরকম কিছু যদি কখনো হয়….
শেষ কথাগুলো বলার সময় হৃদয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, গলায় চাপা সতর্কবার্তার রেশ,
__আমি খুব অসন্তুষ্ট হব। মনে রাখবি, একটা মেয়ের সম্মান সবার আগে। ভার্সিটি লাইফে যা করেছিস, করেছিস। কিন্তু এখন তুই যথেষ্ট বড় হয়েছিস। আশা করি আমার কথা বুঝতে পারছিস,
আমি কি বলতে চাইছি!
হৃদয়ের কথার পাছে নোহান এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর বাধ্য ছেলের মতো ধীরে মাথা নাড়ল। হৃদয়ের কথার গুরুত্ব সে ঠিকই বুঝেছে।
চলবে।
এই পর্বটা ছোট দিলাম, কেননা আগামী পর্বে ধামাকা আসছে।
উপন্যাস #গল্প
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১১
-
নয়নার এমপি সাহেব গল্পের লিংক
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৫
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১০
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৪
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৮
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৩
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৭
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৬