নয়নার এমপি সাহেব
পর্ব:- ১১
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি
হৃদয় শক্ত হাতে তরীর গাল চেপে ধরে আছে। এইদিকে তরী ভয়ে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে হৃদয়ের দিকে। গালটা জ্বলছে ব্যথায়, কিন্তু নির্দয় হৃদয়ের ছাড়ার নাম নেই।
__আমার গাল ছাড়ুন… ব্যথা পাচ্ছি তো আমি…
ভাঙা কণ্ঠে বলল তরী।
ঐদিকে হৃদয় তখন রাগে ফুঁসছে। চোখ দুটো অসম্ভব লালচে হয়ে উঠেছে তার। হৃদয়ের এমন রুপ দেখে তরী আবারও অসহায়ভাবে বলল—
__ ছাড়ুন। সত্যিই ব্যথা পাচ্ছি।
হৃদয় আচমকাই গাল ছেড়ে দিয়ে তরীর চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে ফেলল। তরীর মাথাটা সামান্য পেছনে হেলিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল—
তোকে বলেছিলাম না প্লাবন থেকে দূরে থাকতে? তুই কোন সাহসে বেড়িয়েছিস বাড়ি থেকে। কাকে জিজ্ঞেস করে বেড়িয়েছিস? আমি বাড়ি থেকে বেরুতে না বেরুতেই তোর লাফালাফি শুরু হয়ে গেছে ওর সাথে! পরমুহূর্তেই হৃদয় অদ্ভুত ভাঙা কন্ঠে বলতে লাগল, তুই কি কখনো আমার কথা শুনবি না নয়ন?
এত করে বলার পরেও তুই গার্ড ছাড়া ওর সাথে বেরিয়ে গেলি! আমাকে এক দন্ডও শান্তি দিবি না তুই!
তরীর চোখ বেয়ে এইবার টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। বেচারি ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদো কাঁদো ভাবে হৃদয়ের রাগের আগুনে আরও এক বোতল ঘি ঢেলে দিয়ে আবেগে আটখানা হয়ে বলে উঠলো,,,
__প্লাবন ভাইয়া থাকতে আমার কিছুই হতে পারে না এমপি সাহেব। আমি জানি প্লাবন ভাইয়া আমার কিছুই হতে দেবে না…. ব্যস এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল। হৃদয়ের ভেতরের আগুন যেন দাবানলে রূপ নিল এবার। সে এক ঝটকায় তরীকে ছেড়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। সামনের লম্বা কাঁচের ফুলের ভেসটা ঠাস করে মেঝেতে ছুড়ে মারল। মুহুর্তেই সেটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
হৃদয়ের এহেন রাগের তোপে তরী ভয়ে এককদম পেছনে সরে যেতেই নিচ্ছিল, তখনই অনিচ্ছাকৃত ভাবে হৃদয় হাত ঘুরাতেই তার হাত শক্ত ভাবে আঘাত করে তরীর শরীরের উপরের অংশে। এক মুহূর্তে তীব্র ব্যথায় তরী চোখ খিঁচে বন্ধ বন্ধ করে ফেলল। আবার পরক্ষণেই লজ্জায় আর আতঙ্কে ও ঘুরে দাঁড়িয়ে দুহাত দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিতে চাইলো। লজ্জা আর ভয়ে বেচারির শরীর কাঁপছে, চোখে পানি জমে উঠেছে।
মুহুর্তের মধ্যেই পুরো ঘরটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
হৃদয়ও এক মুহূর্ত থমকে গেল। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় সে নিজেও একটু বেপাকে পড়ে গেছে, রাগের ঘোর কেটে যেতেই বুঝতে পারল কী হয়ে গেছে। মুহূর্তেই বুকের ভেতর কেমন করে উঠল তার। পরপর তরী ব্যথা পেয়েছে কথাটা মাথায় আসতেই সে অস্থির হয়ে উঠলো। দ্রুত তরীকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। এতক্ষণের কণ্ঠের রাগ মিলিয়ে গিয়ে এখন সেখানে ঢুকে পড়ল উদ্বেগ আর অস্থিরতা।
__কোথায় লেগেছে দেখি , বেশি লেগেছে?
হৃদয়ের এমন কথায় তরী তটস্থ, লজ্জা আর আতঙ্কে শরীরের উপরের সম্ভ্রমটুকু ও আরও শক্ত করে চেপে ধরল। চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে নিয়েছে মুহুর্তেই, ঠোঁট কাঁপছে অনবরত।
হৃদয় সেটা দেখে বিরক্তির সাথে আবার ওর হাত শক্ত করে ধরল।
__ দেখি হাত সরা। আমি দেখবো কোথায় লেগেছে তোর।
জবাবে তরী ধরফড়িয়ে বলতে লাগল,
__না না লাগে নি তো।
__মিথ্যা বলিস না নয়ন। তুই যেভাবে আঁকড়ে ধরেছিস তাতেই বুঝে গেছি। আমার সামনে লুকানোর দরকার নেই। তুই কোথায় ব্যথা পেয়েছিস, আমি জানবোই। আর এমনিতেও তোর শরীরের প্রত্যেকটা কোণা আমার চেনা আছে, তোর ছোট বেলায় নিজের হাতেই তোর সব পোশাকআশাক পাল্টে দিয়েছি আমি। বলেই হৃদয় একটু ঝুঁকে ওর খুব কাছে চলে এলো। তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা তরীর গালে এসে লাগছে। তরীর গলা শুকিয়ে গেল মুহুর্তেই, অতঃপর ও মিনমিনিয়ে বলল,
__আমি এখন আর ছোট নেই….
__নয়ন হাত সরাতে বলেছি তোকে।
হৃদয়ের স্বরটা এবার আদেশের শুনালো। তরী আবারও না করতে চাইলে, হৃদয় জোর করে ওর হাত একটু নামাতে নিলেও তরী ভাঙা কন্ঠে বলে উঠলো,
__ নাহ , প্লিজজজ। ওর চোখে পানি চিকচিক করছিল।
হৃদয় এক মুহূর্ত থমকে গেল। পরপর নরম গলায় বলল,
__কি হয়েছে কাঁদছিস কেন?
__আমি সত্যি বলছি ব্যথা লাগেনি আমার।
__আচ্ছা ঠিক আছে আমি দেখতে চাইছি না আর। তাও কাঁদিস না প্লিজ।
তরী ছলছল চোখে তাকালো হৃদয়ের দিকে, হৃদয় ওর সঙ্গে এইভাবে নরম গলায় কথা বলছে ও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। যেহেতু তরী দেখেছে হৃদয় এখন একটু শান্ত আছে, তাই ও এই সুযোগে হৃদয়ের শার্টের কোণ আঁকড়ে ধরে বলল,
__ আমি অনেক সরি , আমি আর কখনো আপনাকে না বলে আর গার্ড ছাড়া কোথাও যাব না সত্যিই।
হৃদয় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো, পরপর শব্দ করে চুমু খেল তরীর কপালে।
__এইরকম ভুল আর যেন না হয় বাঁদর ছানা। এটাই তোকে দেওয়া শেষ ওয়ার্নিং আমার। কথাটা মাথায় ভালো করে ঢুকিয়ে নে। আরেকবার এমন ভুল করলে তোকে আমি ক্ষতবিক্ষত করে ছাড়ব, মাইন্ড ইট।
হৃদয়ের ঝাঁঝালো কথায় তরী ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল।
রাতটা তখন ধীরে ধীরে নেমে এসেছে খান বাড়ির উপর। দেওয়ালঘড়ির কাঁটা ঠিক আটটার ঘরে এসে থেমেছে। পুরো বাড়িটা আজ অদ্ভুত রকম ফাঁকা। বাড়িতে আপাতত কেউই নেই। শুধু হৃদয় , তরী এবং হৃদি রয়েছে। বাকি সকলেই দাওয়াত এ গেছে।
হৃদয় সকালে যে বেড়িয়েছিল আর বাড়ি ফেরার সময় পায়নি। বিকেলের দিকে সে রাজনৈতিক কাজেই শহরের বাইরে গিয়েছিল। সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু সন্ধ্যা ঠিক সাড়ে ছয়টার দিকে হঠাৎ তার ফোনে একটা কল আসে। ওপাশ থেকে একজন চাপা গলায় খবর দেয়— তরী বাইরে বেড়িয়েছে আর সাথে একটা ছেলেও রয়েছে। আর আশেপাশেও কোনো গার্ড নেই।
ফোনের ওপাশের লোকটার কথা শুনে মুহূর্তেই হৃদয়ের বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠেছিল।
তরী বাইরে বেড়িয়েছে তাও কোনো ছেলের সাথে, হৃদয়ের যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। একমুহুর্তের জন্য মস্তিষ্কে ঝড় বইতে শুরু করেছিল তার।
অতঃপর সে শক্ত গলায় বলে—
__ ছেলেটার ছবি পাঠাও, এখনই।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফোনে একটা ছবি আসে।
আর সেই ছবিটা দেখেই হৃদয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। চোখে জমে ওঠে তীব্র রাগ। ফোনের স্ক্রিনে স্পষ্ট তরী আর প্লাবনকে দেখা যাচ্ছে। দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, হাতের মধ্যে ফোঁচকার প্লেট,
তরীর চোখে মুখে অসম্ভব খুশি। রাগে হৃদয়ের শরীর থর থর করে কেঁপে উঠলো, এত করে বলার পরও তরী প্লাবনের সাথে বেড়িয়েছে, এটা যেন হৃদয়ের সহ্য হচ্ছে না।
আর এক মুহূর্ত দেরি করেনি সে। ফোন পকেটে গুঁজে সোজা গাড়িতে উঠে পড়ে। ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই গাড়িটা ছুটে চলল তার গন্তব্যের রাস্তা ধরে। রাস্তার গাছগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল অতিরিক্ত গতির চাপে। হৃদয়ের মাথার ভেতর তখন একটাই দৃশ্য ঘুরছে, তরীর হাসিমুখ আর প্লাবনের পাশে দাঁড়ানোটা। রাগ, ঈর্ষা, অধিকারবোধ সব মিলিয়ে তার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছিল সেই মুহূর্তে।
ঘড়িতে তখন সাতটা চল্লিশ। হৃদয়ের গাড়ি খান বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেছে, হৃদয় গাড়ি থামিয়ে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। অতঃপর সোজা বাড়ির ভেতর ঢুকে যায়, আশে পাশে তাকানোর সময় নেই আজ যেন তার। বাড়ির ভিতরের চারপাশ নিস্তব্ধ। হলঘরে বাতি জ্বলছে, কিন্তু মানুষের শব্দ নেই। হৃদয়ও এক মুহূর্ত থামেনি।
সোজা পায়ে হেঁটে তরীর রুমের সামনে গিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তরী তখন পোশাক পরিবর্তন করছিল ।
সেই থেকে এখন রাত আটটা।
তরীর রুম থেকে বেরিয়ে হৃদয় সোজা চলে যায় হৃদির রুমের দিকে, হৃদয়ের পিছু পিছু তরীও ছুটে চলে হৃদির রুমের উদ্দেশ্যে। তরী হৃদির রুমের কাছাকাছি এসেই যেই দরজায় ধাক্কা দেবে তার আগেই হৃদয় শক্ত করে তরীর হাত টেনে ধরলো। সাথে সাথেই তরী প্রশ্নবোধক চাহনি নিক্ষেপ করলো হৃদয়ের দিকে। হৃদয় সেসবে পাত্তা না দিয়ে আস্তে করে নক করল।
তখনই ভেতর থেকে হৃদির দুর্বল কন্ঠ শোনা গেল,
__বলদী তুই কবে থেকে এত ম্যানার শিখেছিস ? যে আমার দরজায় নক করছিস?
জবাবে তরী কিছু বলবে তার আগেই হৃদয় বলে উঠলো,
__ভেতরে আসবো?
হৃদয়ের কথা শুনতে পেয়ে হৃদি তৎক্ষণাৎ জবাব দিল,
__দাভাই তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন ভিতরে আসো।
অতঃপর হৃদয় তরীকে সঙ্গে করে আস্তে সুস্থে রুমের ভেতরে প্রবেশ করলো।
হৃদয় প্রথমেই বোনের কপালে হাত ছুঁয়ে আগে জ্বরটা চেক করলো। তরী তখন হৃদির সাথে হৃদির কোমফোর্টের ভেতর ঢুকে বসে আছে।
__এখন তো জ্বর নেই। ঔষধ নিয়ে ছিলি?
হৃদি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝালো।
ঠিক আছে তাহলে এখন রেস্ট কর, বলেই হৃদয় তরীর দিকে নজর দিলো। তরী ঘাপটি মেরে আছে কম্ফোর্টের ভেতর হৃদয় ভালো করে তরীকে পরখ করে, গম্ভীর কন্ঠে বলল,,, পড়াশোনা নেই তোর। ভার্সিটি উঠেছিস পর থেকে তো একদিনও বই নিয়ে বসতে দেখলাম না তোকে? সারাদিন লাফালাফি করিস , পড়তে বসিস কখন?
হৃদয়ের ধমকে তরী কাঁচোমাচো মুখ করে তাকিয়ে রইল।
__দ্রুত বই নিয়ে আমার রুমে আয় , এক মিনিটও যেন দেরি না হয়। বলেই হৃদয় বেড়িয়ে গেল।
চলবে।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৯
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৬
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৫
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৩
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৭
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১০
-
নয়নার এমপি সাহেব গল্পের লিংক
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৮