নবরূপা
পর্ব_৮
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
জীবনটা ঘড়ির কাঁটার মত। ঘড়ির কাঁটা যেমন বারবার ঘুরে ফিরে একই স্থান অতিক্রম করে, তেমনি অনেকে বিশ্বাস করে জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোও পালাক্রমে কোনো না কোনো ভাবে আবারো আমাদের জীবনের উপর দিয়ে চলে যায়। আজ এই মুহুর্তে তামান্নারও ঠিক একই রকম অনুভূতি হচ্ছে।
ইরফান কবিরের প্রথম স্ত্রী তাহিয়ার সাথে তার ছিল অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ, তবে পুরোপুরি অ্যারেঞ্জ না। ইয়াহিয়া কবির কলেজের অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল। ছাত্রজীবনে তার কাছের বন্ধুর একমাত্র মেয়ে তাহিয়ার সাথে হুট করেই বিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল সম্পর্ক গভীর করা। বন্ধুত্বের সম্পর্ক আত্মীয়তায় রূপ দিয়ে বন্ধন দৃঢ় করা। পেরেছিলেনও বটে। তবে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সেই সময় ইরফানের বিয়ে তেমন জমজমাট ভাবে হয়নি, খুব তাড়াহুড়ো হওয়ায় শুধু টুকটাক কেনাকাটা দিয়েই সম্পূর্ণ বিয়ে চালিয়েছিলেন তারা। সেবারও তামান্না এসেছিল শপিং এ, আর এবারও। তাই এই মুহুর্তে নীহারিকার আয়েশা বেগমের সাথে শাড়ি পছন্দ করার দৃশ্যটা তামান্নার কাছে অচেনা কিছু লাগলো না। শুধু আগেরবার নীহারিকার জায়গায় ছিল তাহিয়া। অজান্তেই হাত মুঠো হয়ে এলো তামান্নার। তাহিয়ার জায়গা যেহেতু নীহারিকা নিয়েছে, তবে সম্পূর্ণ ইতিহাস পুনরাবৃত্তি ঘটে গেলে কি খুব বেশি মন্দ হবে?
ইরফান যথাসম্ভব চেষ্টা করছে সবার আড়ালে কিছু একটা করতে। তার চোখ ঘুরঘুর করছে সজ্জিত শাড়িগুলোর মধ্যে মেরুনরঙা শাড়িটায়। ওটা পড়লে নীহারিকা কে বেশ ভালো লাগবে ভেবেই সে নিতে চাইছে ওটা। কিন্তু মনের কথা মনেই রয়ে গেলো। লজ্জায় বলতেও পারছে না সে, কিন্তু একটুখানি ভেবে সে দেখলো, বলতে না পারলেও করতে ঠিকই পারবে। তাই সতর্কতার সাথে ইয়াশার বাহু টেনে তাকে এক পাশে নিয়ে এলো। কানে কানে রাজ্যের সব লোভ দেখিয়ে কাজ সেড়ে ফেলল ইরফান। ফলস্বরূপ হেলেদুলে এসে ইয়াশা ঝুঁকে পড়লো শাড়িগুলোর উপর, এরপর সুন্দর করে কাঙ্খিত শাড়িটা হাতে তুলে অন্য হাতে নীহারিকার হাত বগলদাবা করে “লা লা লা” করে হেলেদুলে ট্রায়াল রুমের দিকে এগোতে থাকলো।
হুট করে হাতে টান লাগায় চমকালো নীহারিকা, এরপর অনায়াসে তাকে টেনে নিয়ে যেতে দেখে অবাক হয়ে ইয়াশাকে বলল,
—” আরে, এ কি! কোথায় যাচ্ছো?’
ইয়াশা সামনে এগোতে এগোতেই বলল,
—” ট্রায়াল রুমে।”
—” কিন্তু কেনো?’
—” এই শাড়িটা ট্রাই করতে।”
বলেই হাত উঁচু করে শাড়িটা দেখালো ইয়াশা। নীহারিকা একটু চোখ বুলিয়ে মলিন মুখে বলল,
—” শোনো ইয়াশা, এটা মেরুন রঙ।’
ইয়াশা আবারো দেখে নিশ্চিত হয়ে বলল
—” হুম তো?”
নীহারিকা শুকনো ঢোক গিলল। ঠোঁট চেপে হেসে বলল
—” এই রং আমায় মানাবে না বোনটি। দেখো তুমি, আমার হাতের সাথে মেলাও। কত জঘন্য লাগছে। এই রঙের কাপড় তোমার গায়ে সুন্দর মানাবে। আমি তো কালো!”
ইয়াশা চোখ বড় করে তাকালো নীহারিকার দিকে। কিছু একটা বলতে চাইলো বোধহয়। কিন্তু এরই মাঝে বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সের মত জায়গায় এক বুক সাহস নিয়ে দোকানদারের সাথে দর-কষাকষি করা আয়েশা বেগম পাশে হাত দিয়ে নীহারিকা কে না পেয়ে এপাশ ওপাশ তাকালেন, ইয়াশার সাথে দেখে গলা উঁচিয়ে ডাকলেন,
—” বউমা, এদিকে এসো। গেলে কোথায়? এই লাইট পিংকটা ট্রাই করো তো।”
নীহারিকা হেসে বলল,
—” হ্যাঁ আসছি আন্টি।”
কিন্তু সাথে সাথে তার বাহু চেপে ধরলো ইয়াশা। সেও বলল
—” মা, তুমি এদিকে দেখো। আমার এই শাড়িটা ভাবির জন্য পছন্দ হয়েছে। ভাবি আগে এটা ট্রাই করুক।”
রাবেয়া বানুও এতক্ষণ দেখছিলেন। ইয়াশার হাতের শাড়িটা আর নীহারিকার মলিন মুখটা দেখে তিনি শুকনো ঢোক গিলে অন্যপাশে ফিরলেন। অজান্তেই চোখের পানি ছিটকে বের হলো তার। একমাত্র মেয়েটার জন্য কষ্ট হলো ভীষণ! মেরুন, কালো, খয়েরী, লাল – এসব রঙের শাড়ি নীহারিকার ছোটবেলা থেকেই পছন্দ। তার এখনো মনে পড়ে ছোট্ট নীহারিকা খুব আনন্দের সাথে গাঢ় রঙের শাড়ি পড়তো। কিন্তু পরে আয়না তে নিজেকে দেখার পরই বুক ফেটে কান্না করতো। বারবার করে বলতো, এই রঙ আমায় মানায় না কেনো মা? কেনো এত বিশ্রী দেখায়? সকলের মত সুন্দর লাগে না কেনো? সেই সময়ে নীহারিকার গায়ের রঙ আরো চাপা ছিল। সময়ের সাথে একটু পরিবর্তন হলেও আজও এই রঙের কাপড় পড়তে নীহারিকা এখন ভয় পায়। বারবার মনে হয় খারাপ দেখাবে, আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারবেনা।
সবার আড়ালে চোখের পানি মুছলেন রাবেয়া বানু। আর কেও না জানুক, তিনি জানেন নীহারিকার মলিন মুখটার কারন। আর এটা দেখে তার থেকে বেশি কষ্ট হয়তো আর কেও পাচ্ছে না। আয়েশা বেগম আদরের মেয়ের কথা ফেলতে পারলেন না। বাধ্য হয়ে বললেন,
—” ঠিক আছে, তাহলে বউমা তুমি বরং আগে ইয়াশার পছন্দ করা শাড়িটাই পড়ে এসো। ট্রাই করে দেখো ভালো লাগছে কিনা,তারপর কিন্তু আমার পছন্দ গুলোও দেখতে হবে।’
নীহারিকা জোরপূর্বক হাসলো মিষ্টি করে। ইয়াশার মুখের দিকে তাকিয়ে না করতে পারলো না। রাবেয়া বানুর দিকে চোখ রেখে শাড়িটা হাতে নিলো। এরপর ইয়াশা দৌঁড়ে আবারো চলে গেলো শাড়ি দেখতে। কিছুক্ষণ সেখানেই থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো নীহারিকা। ফোন স্ক্রোল করার অভিনয় করছিল ইরফান, কিন্তু আড়চোখে বারবার নীহারিকা কে দেখে সে দোটানায় পড়ে গেলো। মেয়েটা হুট করে বরফের মত জমে গেলো কেনো। তার কি শাড়িটা পছন্দ হয়নি? কিন্তু ইরফানের যে ভীষণ পছন্দ হলো। নীহারিকার এমন মুখ দেখে তামান্নাও ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। বুঝলো না কারনটা।
নীহারিকা ধীর পায়ে ট্রায়াল রুমের দিকে এগোলো। প্রতিটা কদমে যেন পা ভারী হয়ে আসছে। ট্রায়াল রুমের পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে সে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। ছোট্ট জায়গাটা, চারপাশে আয়না, সাদা আলো—সবকিছু এমন নিষ্ঠুরভাবে স্পষ্ট যে লুকোনোর কোনো সুযোগ নেই। শাড়িটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। মেরুন রঙটা গভীর, গাঢ়, রাজকীয়। ঠিক সেই রঙ, যেটা সে ছোটবেলায় সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত, আর সবচেয়ে বেশি ভয় পেত।
আস্তে আস্তে শাড়িটা পরলো নীহারিকা। নিজ হাতে পড়ার অভ্যাস আছে, তবু আজ আঙুলগুলো কেমন কাঁপছে। আঁচলটা ঠিক করতে করতে বুকের ভেতর অজানা একটা চাপ জমে উঠল। সব ঠিকঠাক করে শেষে আয়নার সামনে দাঁড়াল সে। একদম সামনে। কয়েক সেকেন্ড দেখলো সে। তারপর চোখ সরিয়ে নিতে চাইল, পারল না। মেরুন শাড়ির ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে সে চিনতে পারছে না। রঙটা সুন্দর, শাড়িটা দামী, কাটিং নিখুঁত—সবই ঠিক আছে। তবু কেন যেন মনে হচ্ছে, এই সুন্দর জিনিসটার ভেতরে সে নিজেই একটা ভুল।
নিজের বাহুর দিকে তাকালো নীহারিকা। শাড়ির গাঢ় রঙের পাশে নিজের ত্বক আরও গাঢ় মনে হচ্ছে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে কেঁপে উঠল। দেখছো? মানায়নি। বলেছিলাম তো। ফর্সা হলে কত সুন্দর লাগতো। কোথা থেকে যেন পুরনো কথাগুলো কানে বাজতে লাগল। কেউ এখানে নেই, তবু মনে হচ্ছে আয়নার পেছনে দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ তাকিয়ে আছে। বিচার করছে। তুলনা করছে।
নীহারিকা হাত বাড়িয়ে আয়নার কাঁচে ছুঁয়ে দিল। কাঁচ ঠান্ডা। ঠিক নিজের ভেতরের অনুভূতির মতো। চোখ ভিজে এলো। সে চোখ নামিয়ে ফেলল, কিন্তু অশ্রু আটকাতে পারল না। একটা ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল। তারপর আরেকটা। ঠোঁট কামড়ে ধরল সে, শব্দ না করে কাঁদার চেষ্টা করল। বাইরে কেউ যেন না টের পায়। এত বছর পরও কিছু বদলায়নি। এখনো এই রঙ পড়লে নিজেকে লুকোতে ইচ্ছে করে তার। শাড়িটা যে খারাপ লাগছে, তা না। নিজেকে খারাপ লাগছে।
নীহারিকা অনেকক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করল এটা একটা শাড়ি মাত্র। একটা রঙ মাত্র। কিন্তু মন মানছে না। বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বাইরে হালকা কোলাহল, মানুষের কথা, হাসি—সবকিছু দূরের মনে হচ্ছে। এখানে শুধু সে আর তার প্রতিচ্ছবি। আর সেই পুরনো ভয়, যেটা কখনো পুরোপুরি তাকে ছেড়ে যায়নি।
শেষমেশ আঁচলের এক কোণ দিয়ে চোখ মুছে নিল নীহারিকা। গভীর একটা শ্বাস নিল। নিজেকে সামলে নিয়ে খুব আস্তে বলল,
—” বোকার মত কাঁদার কিছু নেই। যা সত্যি, যা বাস্তব, তা-ই। বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে।”
তবু আয়নার সামনে থেকে সরে যেতে তার পা উঠল না সঙ্গে সঙ্গে। আরও কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল সে। এরপর ঠোঁট গোল করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজব! সে তো আর আগের মত দুর্বল নেই। গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করা মানুষদের ঘৃনা করতে শিখেছে সে। তাহলে কীসের এত ভয়? আর ইরফান কবির তো তাকে দেখেছেই। সব কিছু ভেবে নীহারিকা ট্রায়াল রুম থেকে পর্দাটা সরিয়ে ধীরে শাড়ির কুচি ঠিক করতে করতে বেরিয়ে আসলো।
একদম সেই মুহূর্তে ইরফান ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। কী দেখছিল, নিজেও জানে না। আঙুলের ফাঁকে ফোনটা আলগা হয়ে ছিল এমনিতেই। হঠাৎ করেই চোখের কোণায় নড়াচড়া টের পেল সে। অভ্যাসবশত মাথা তুললো—আর ঠিক তখনই যেন সময় থমকে গেল। মেরুন শাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে এক মুহূর্তের জন্য চিনতেই পারলো না ইরফান। তার চোখ স্থির হয়ে গেল। বুকের ভেতর কোথাও একটা অদ্ভুত ধাক্কা খেল। আঙুলের চাপ আলগা হতেই ফোনটা হাত ফসকে নিচে পড়ে গেল—ধপ করে শব্দ তুলে মেঝেতে আছড়ে পড়লো। কিন্তু সে শব্দে কারও খেয়াল গেল না।
কারণ সেই মুহূর্তে তাকিয়ে থাকার মতো দৃশ্য ছিল সামনে। শাড়ি পরিহিত নীহারিকা। শাড়িটা তার গায়ে অদ্ভুতভাবে মানিয়ে গেছে। মেরুন রঙটা আর ভারী লাগছে না, বরং তার ত্বকের সাথে মিশে গিয়ে একধরনের গভীর সৌন্দর্য তৈরি করেছে। লাজুক ভঙ্গিতে ঠিক করা আঁচল, একটু নিচু করা চোখ, ঠোঁটের কোণে অজান্তেই জমে থাকা স্নিগ্ধতা—সব মিলিয়ে সে যেন কোনো সাজানো বঁধু নয়, বরং জীবন্ত অনুভূতি। দোকানের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা নেমে এলো। তারপরই,
—”আল্লাহ! ভাবি নাকি?’
—”এত সুন্দর!”
—”বউমা, কী দারুণ মানিয়েছে!”
একসাথে কয়েকটা কণ্ঠ ভেসে এলো। আয়েশা বেগম বিস্ময়ে হাত চাপা দিলেন মুখে। ইয়াশা তো প্রায় লাফিয়ে উঠল,
—” আমি তো আগেই বলেছিলাম! বলেছিলাম না এই রঙটা ভাবির জন্য পারফেক্ট! আমার চয়েজ আছে বস!”
বলেই নিজেকে বাহবা দিলো ইয়াশা।
জ্যোতি হাততালি দিয়ে উঠল,
—” ও মাই গড, নীহু! তুই সিরিয়াসলি ব্রিদ-টেকিং! কি জোস লাগছে!”
আয়েশা বেগম ইয়াশার মাথায় গাট্টা মেরে বললেন,
—” হ্যাঁ রে ইয়াশা, তোর পছন্দ কবে থেকে এত হাইফাই হলো বলতো। এ তো একদম ঠিকঠাক ভাবে মানিয়ে গেছে নীহারিকা কে। কি মিষ্টি লাগছে।’
বলেই তিনি মাথা ঘুরিয়ে ইয়াহিয়া কবির কে খুঁজলেন।
দুই কর্তা গল্পে মশগুল ছিল। আয়েশা বেগম ডেকে বললেন,
—” হ্যাঁ গো, ইরফানের বাবা। দেখো তো বউমাকে কেমন লাগছে? “
ইয়াহিয়া কবির চোখের চশমা ঠিক করে বললেন,
—” রাজরাণী লাগছে। মাশা-আল্লাহ! “
—” তাহলে এটাই ফাইনাল করলাম।”
সবাই একসাথে বলে উঠলো,—” নিশ্চয়ই! “
নাঈমুল ইসলামের চোখও মেয়ের রূপ দেখে টলমল করে উঠলো। সবাই হেসে উঠলো। নীহারিকা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে যেন বুঝতেই পারছে না—এই প্রশংসাগুলো কি সত্যি তার জন্য? অজান্তেই নিজের আঁচলের দিকে তাকালো। আবার আয়নার দিকে একবার তাকাতে ইচ্ছে করলো। এই একই শাড়ি, এই একই রঙ—তবে কি সে ভুল দেখছিল এতক্ষণ? তার চোখ খুঁজে নিল একটামাত্র মুখ। রাবেয়া বানু। মেয়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, চোখে জল টলমল করছে। ঠোঁট কাঁপছে। এক হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছেন, যেন কান্নার শব্দ বেরিয়ে না পড়ে। এতদিনের জমে থাকা কষ্ট, ভয়, অপরাধবোধ—সবকিছু যেন এই এক দৃশ্যে গলে যাচ্ছে। মেয়েকে পছন্দের রঙের শাড়ি পরিহিত এবং কনের মত দেখতেই তার চোখ চিকচিক করতে শুরু করেছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন,
—” আমার মেয়েটা… আমার মেয়েটা কত সুন্দর..!”
নীহারিকার বুকের ভেতর হঠাৎ মোচড় দিল। চোখ ভিজে এলো আবার। কিন্তু এবার কান্নাটা অন্যরকম।
তারপর সে বেশ অস্বস্তি নিয়ে ধীরে ঘুরে তাকালো ইরফানের দিকে। ইরফান তখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এক পা এগোতে পারেনি, এক শব্দও বের হয়নি মুখ থেকে। চোখদুটো স্থির, বিস্ময়ে ভরা। যেন এই প্রথমবার সে নীহারিকাকে দেখছে। কোনো বিচার নেই, কোনো তুলনা নেই—শুধু নিখাদ মুগ্ধতা। নীহারিকা এক মুহূর্ত থমকে গেল। এই মানুষটার চোখে নিজেকে এমনভাবে দেখবে—এটা সে কল্পনাও করেনি। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে একটা ক্ষুদ্র, অনিশ্চিত হাসি ফুটে উঠল।
সবাই নীহারিকার দিকে নজর দিলেও তামান্নার নজর ছিল ইরফানের উপর। একই ভাবে নীহারিকাকেও দেখলো সে। এরপর মুচকি হেসে এগিয়ে গেলো ইরফানের দিকে। পড়ে যাওয়া ফোনটা উঠিয়ে ইরফানের দিকে দিয়ে বলল,
—” ইরফান ভাই, আপনার ফোন!”
ইরফান চমকে তাকালো পাশে দাঁড়ানো তামান্নার দিকে। ফট করে ফোনটা নিয়ে দেখলো কিছু হয়েছে কিনা। স্ক্রিন সব ঠিক আছে দেখে সে পকেটে পুড়ে নিলো ফোনটা, এরপর তামান্নার দিকে তাকিয়ে বলল,
—” কেমন লাগছে তোমার ভাবিকে দেখো তো!”
তামান্না আবারো তাকালো নীহারিকার দিকে। ঠোঁট কাঁমড়ে হাসলো, বলল,
—” তাহিয়া আপুর মত লাগছে না, কিন্তু সুন্দর লাগছে।”
ইরফানের মুখের কোণের চাপা হাসিটা মুহূর্তেই থমকে গেল। তামান্নার কথাটা কানে ঢোকার পর যেন কোথাও একটা খটকা লাগলো। সে এক পলক নীহারিকার দিকে তাকালো, তারপর ধীরে ঘুরে তামান্নার দিকে মুখ করলো। গলার স্বরটা খুব নিচু, কিন্তু অস্বাভাবিক রকম স্পষ্ট।
—” তাহিয়ার সাথে তুলনাটা না করলেই ভালো হতো, তামান্না।”
তামান্না চমকালো না, তবে চোখের পাতা একটু নড়লো। ভয় পেলো অল্প। কথাটা বলা উচিত হয়নি তা বলার পরে টের পেলো। ইরফান এক ধাপ এগিয়ে এলো। কণ্ঠে রাগ নেই, অথচ কথাগুলো ভারী করে বলল
—” একজন মানুষকে আরেকজনের ছায়ায় দাঁড় করানো খুব সহজ। কিন্তু সেটা অন্যায়। তাহিয়া যেমন ছিল, নীহারিকা তেমন না। আর হওয়াও দরকার নেই। আশা করি, তাহিয়ার মত হলে কার সমস্যা হবে তা তুমি নিজেই জানো!”
তামান্না চমকালো। শুকনো ঢোক গিলে বলল
—” অতীত ভুলে যাচ্ছেন না কেনো ইরফান ভাই?’
বাঁকা হাসলো ইরফান,
—” আমি ভুলে যেতেই চাইছি। তুমিই টেনে হিঁচড়ে বের করছো। খুব ভালো হয় যদি, আমার হবু স্ত্রীর পেছনে গোয়েন্দাগিরি না করে নিজের পথ দেখো। আশা করব, একই ভুল দু’বার করে ফাঁসবে না। এবারে আমি মায়া দেখাব না তামান্না।’
তামান্না অপ্রস্তুত হলো। একটা ছোট কথার বিপরীতে এতগুলো খোঁচা দেবে ইরফান, তা ভাবেনি সে। একটু থেমে ইরফান আবার বলল,
—” আর ওনাকে সুন্দর লাগছে কি না—ওটা তুলনা দিয়ে বোঝা যাবে না। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলেই যথেষ্ট।”
তামান্না চোখ নামিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে যে মুচকি হাসিটা ছিল, সেটা মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। ইরফান কথা শেষ করে আর কিছু বলল না। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই কথাগুলো যেন আরও স্পষ্ট হয়ে থাকলো, কঠিন নয়, অথচ এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। ওদিকে আয়েশা বেগম ইতিমধ্যেই আনন্দে দোকানদারকে বলছেন শাড়িটা প্যাক করতে। রাবেয়া বানু নীরবে মেয়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখে এখনও জল। নীহারিকা দূর থেকেই সবটা দেখছিল। ইরফান আর তামান্নার কথোপকথনের কিছু বোঝেনি সে। সে কিছু বুঝতেও চায়নি, তবু দেখে বুকের ভেতর কোথাও একটা হালকা কাঁপুনি উঠলো। অজান্তেই সে শাড়ির আঁচলটা একটু শক্ত করে ধরল। আর তামান্না? সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। খুব অল্প কয়েক মুহুর্ত, কিন্তু ঠিক সেখানেই গিয়ে লাগলো, যেখানে সবচেয়ে বেশি লাগে।
চলবে…
রিয়েক্ট পূরণ হয়নি। ১ হাজার হয়নি। তাই দেরিতে দিয়েছি। আজ তো অনেক বড় পর্ব দিলাম। আজকেও রেসপন্স না পেলে জানি না কী করব। কিন্তু এটা নিয়ে অনেক পরিকল্পনা আছে। আশা করি পাঠকেরা মর্যাদা রাখবে।
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা পর্ব ৭
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ১
-
নবরূপা পর্ব ৪
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা গল্পের লিংক
-
নবরূপা পর্ব ৩