নবরূপা
পর্ব_৪
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
ছোটবোনের পেছনে যত টাকার শ্রাদ্ধ হয়, ইরফান নিশ্চিত মাসেও সে নিজের জন্য এত টাকা খরচ করে না। বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের ফুড এরিয়াতে এক কোণায় টেবিলে বসে আছে ইরফান। হাতে ফোন, মাথায় চিন্তা। আগামীকাল থেকে আবারো কলেজ যেতে হবে। কয়েকদিন পর আবার ফার্স্ট ইয়ারের হাফ ইয়ারলি এক্সাম, সেসবের বিরাট প্রস্তুতি করতে হবে। এছাড়া ক্লাস টেস্টেরও কিছু খাতা জমা আছে। ওগুলো আজকের মধ্যে দেখে শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলো সে। এর মধ্যেই কোথা থেকে যেন দৌঁড়ে এলো ইয়াশা। হাতভর্তি শপিং ব্যাগ, যা দেখে ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার সে বুঝেছে ইয়াশা কেনো তাকে নিয়ে এসেছে। তাকে আনার প্রধান কারন হলো ব্যাগ ক্যারি করা। ইয়াশা ইরফানের হাতে ব্যাগ গুলো ধরিয়ে দিয়ে আবারো উধাও হয়ে গেলো। কসমেটিকস কেনা বাকি আছে তার। ইরফান সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছিল ও এভাবে বেরিয়ে কেনাকাটা করতে পারবে না। তার থেকে এক কাপ কফি নিয়ে বসে থাকা উত্তম।
ইয়াশার দেয়া ব্যাগ গুলো টেবিলের উপর রাখলো ইরফান। এই পর্যন্ত পনেরোটার বেশি ব্যাগ হয়েছে। বিচ্ছুটাকে আগামী ছয়মাস আর কাপড়ই কিনে দেবে না। হুট করে ইরফানের একটা কথা মনে পড়লো। আর এক সপ্তাহ পর বিয়ে। কাল তো আয়েশা বেগম এমনিতেই বিয়ের শপিং করতে আসবে, তাহলে এই মেয়ে আজ কেনো আসলো? মনে মনে ইয়াশার নাম কেটে দিলো ইরফান। ওর শপিং আজকেই শেষ। আর করতে পারবে না। কথাটা মনে করে ইয়াশাকে কলও দিলো ইরফান।
ইয়াশা তখন হাতের তালুতে লিপস্টিক মেখে চেক করতে ব্যস্ত। শেইড পছন্দ করা যে কতটা কঠিনের কাজ এটা কে বুৃঝবে। ইরফানের কল পেয়ে ইয়াশা ভড়কালো। ভ্রু কুঁচকে কল রিসিভ করে কানের কাছে নিয়ে গড়গড় করে বলল,
—” ভাইয়া, লিপস্টিক শেইড পছন্দ করতে পারছি না। একটু পছন্দ করে দিয়ে যাও প্লিজ।”
ইরফান তার কথার পাত্তা না দিয়ে বলল,
—” কাল কিন্তু মা আর বাবা বিয়ের শপিং করতে আসবে। তুই যা দরকার নিজের শপিং আজকেই কমপ্লিট কর। কাল যেন তোকে আমি না দেখি বাড়িতে। কলেজ মিস দিলে ঠ্যাং ভেঙে রেখে দেব। “
ইয়াশা প্রথমে মুখ ঝুলিয়ে ফেলল। পরবর্তীতে রাজি হলো। ইরফান এবারে বলল,
—” দ্রুত কাজ কমপ্লিট কর। আমারো কাজ আছে।”
এবারে ইয়াশা একটু উৎফুল্লিত নয়নে চেয়ে টেনে টেনে বলল,
—” কী কাজ ভাই…য়া?”
চোখ সরু করলো ইরফান। কিছু না বলে ফট করে কলটা কেটে দিলো। ইয়াশা কিছুক্ষণ ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকিয়ে রইলো ফোনের দিকে। তারপর ফিক করে হেসে দিলো। কিছুক্ষণ পর তার পাশে একটা মেয়ে এসে দাঁড়ালো। মেয়েটাও একটা লিপস্টিক হাতে চেক করতে শুরু করলো। ইয়াশার কোনোমতেই একটা শেইড পছন্দ হচ্ছে না বলে সে বারবার বিরক্ত হলো। তার অবস্থা টা পাশের মেয়েটা বোধহয় বুঝতে পারলো। সে এবারে নিজে থেকেই বললো,
—” শেইড পছন্দ হচ্ছে না বুঝি?”
ইয়াশা পাশে তাকিয়ে দেখলো লালরঙা ড্রেস পরিহিত মেয়েটা হাসিমুখে তাকিয়ে রয়েছে। তার সুন্দর হাসি আর মনোমুগ্ধকর আচরণে ইয়াশা কথা না বলে পারলো না। মাথা নেড়ে ফ্রি হয়েই বলল,
—” হুম। একটাও পছন্দ হচ্ছে না জানেন। আমার বড় ভাইটাকে এইজন্যই নিয়ে এসেছি। তার পছন্দ অনেক চমৎকার। অথচ হিটলার ব্যাটা ফুড এরিয়াতে গিয়ে বসে আছে আরাম করে।”
মেয়েটি ফিক করে হেসে ফেলল। কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইলো ইয়াশার দিকে, এরপর থুতনিতে হাত বুলিয়ে চিন্তা করতে করতে লিপস্টিক গুলোর দিকে তাকালো। চট করে একটা লিপস্টিক তুলে ধরলো ইয়াশার সামনে,
—” এটা ট্রাই করো তো।”
ইয়াশা হাতে এবারে ডিরেক্ট ঠোঁটের ট্রাই করলো। হতবাক হয়ে গেলো সে। চমৎকার তো। শেইড টা আসলেই চোখ ধাঁধানো সুন্দর। গোলাপি না, আবার গাঢ় লালও না, মাঝামাঝি একটা শেইড। ইয়াশা ভীষণ খুশি হয়ে গেলো। মেয়েটার হাত ধরে রীতিমতো জড়িয়ে ধরলো,
—” থ্যাংক ইউ আপু। থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনার পছন্দও তো ভীষণ ক্লাসিক। এটা আসলেই আমাকে মানিয়েছে। ইউ আর গ্রেট।”
মেয়েটি এবারে হেসে বলল,
—” ইটস ওকে। সত্যি বলতে, তুমি যা-ই পড়বে তাতেই ভীষণ সুন্দর লাগবে।”
কথা বলতে বলতেই কিছুটা দূর থেকে আর একটা মেয়ে ডেকে উঠলো,
—” কই রে তুই? আয়, কাজ হয়ে গেছে।”
মেয়েটা এবারে ইয়াশা কে ‘বাই’ বলে চলে যেতে থাকলো। কিন্তু ইয়াশার কিছু একটা মনে পড়তেই সে দাঁত দিয়ে জ্বিভ কাটলো। হাত উঁচু করে ডেকে উঠলো,
—” এক্সকিউজ মি আপু।”
কেবলই দরজার কাছে গিয়েছিল মেয়েটি। ইয়াশার ডাক শুনে পেছনে ফিরে তাকালো। ইয়াশা এবারে জিজ্ঞেস করলো,
—” আপনার নাম কী আপু?”
মেয়েটা হেসে বলল,
—” নীহারিকা। “
ইয়াশা নিজেও চেঁচিয়ে বলল,
—” আমার নাম ইয়াশা। নাইস টু মিট ইউ!”
নীহারিকা আর দেরি করলো না। জ্যোতি এদিকে তাড়া দিচ্ছে বলে কোনোমতে বাই বলে বেরিয়ে এলো ওখান থেকে। নীহারিকা বেরোনোর পর, খুশিতে গদগদ হয়ে ইয়াশা লিপস্টিক টা প্যাক করতে বললো। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তার মাথায় ঠোক্কর খেলো কিছু একটা। নীহারিকা? নামটা কোথায় যেন শুনেছে। কিন্তু কোথায় শুনেছে শতবার ভেবেও খুঁজে পেলো না। লিপস্টিক টা প্যাক করে তার হাতে দেয়া হলে ইয়াশার মাথায় এবারে বিষয়টা আসে। এই নাম তো সে গত রাতে আয়েশা বেগমের মুখেই শুনেছে। বিড়বিড় করলো ইয়াশা,
—” ভাইয়ার ফিয়ান্সের নামও তো এমন কিছু ছিল তাই না? নীহারিকা ছিল, নাকি অনামিকা ছিল? নাকি নবনীতা? নাকি অন্জুলিকা?”
নিজের ভাবনাতে নিজেকে থাপড়াতে মন চাইলো ইয়াশার। ধুর! অন্জুলিকা কেনো হতে যাবে? কিন্তু এমনই কিছু একটা ছিল, যা সে মনে করতে পারছে না। আপাতত লিপস্টিক পাওয়ার খুশিতে ব্যপার টা ভুলে গেলো সে।
এদিকে অনেকক্ষন যাবৎ শপিং করার পর জ্যোতি পুরোপুরি হাঁপিয়ে গিয়েছে। পেটে মোঁচড় দিয়ে খিদের কথা জানান দিচ্ছে পেটে বসবাসকারী দায়িত্বশীল ইঁদুরেরা। জ্যোতি এবারে মাথা এলিয়ে দিলো নীহারিকার ঘাড়ে। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল,
—” দোস্ত, এই ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার জন্য আমি পঁচিশ হাজার টাকা খরচ করলাম। এর কোনো মানে হয় বল তো!”
হাসলো নীহারিকা। বলল,
—” অবশ্যই মানে হয়, যদি তুই ওকে বিয়ে করিস। বউ হওয়ার পর রাদ ভাইয়ার মুখের সামনে চৌম্বক ধরবি, আর পেটে সুড়সুড়ি দিবি, সব টাকা পেটের মধ্য থেকে গড়গড় করে বেরিয়ে আসবে।”
পরিকল্পনা টা ভালো লাগলো জ্যোতির। নীহারিকাকে জড়িয়ে ধরে খুশি মনে এগিয়ে যেতে থাকলো ফুড এরিয়ার দিকে। প্রচন্ড পরিমাণে খিদে পেয়েছে তার। বড়সড় একটা মিল না নিলেই নয়। কিন্তু হুট করেই জ্যোতি নিজের মাথায় গাট্টা মারলো। নীহারিকাকে বলল,
—” উপস সরি দোস্ত, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। তুই এখনো কিছু কিনলি না কেনো?”
নীহারিকা বলল,
—” তুই আগে খাওয়া শেষ কর। একটু রেস্ট নিয়ে নে। তারপর আমি কিনব। আমার অত কেনাকাটা নেই। এমনিতেই কাল নাকি বিয়ের কেনাকাটা করতে আসবে।”
জ্যোতি বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে ‘ওকে’ বলল। কাল তো তাকেও আসতে হবে তাহলে। কিছু টাকা বাঁচাতে হবে। ফুড এরিয়াতে ঢোকার সাথে সাথেই জ্যোতির গোয়েন্দারূপ চোখ গিয়ে পড়লো ডান দিকের টেবিল টাতে। কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে থাকার পর জ্যোতি নীহারিকার হাত ধরে বলল,
—” হ্যাঁ রে দোস্ত, আমি মনে হয় চরমভাবে তোর হবু বরের উপর ক্রাশ খেয়েছি বুঝলি। কিছু মনে করিস না। আমি নির্দোষ!”
নীহারিকা চোখ কুঁচকে তাকাতেই জ্যোতি আবারো বলে,
—” সিরিয়াস ভাই, আসলেই। যেদিকে তাকাচ্ছি সেদিকেই তোর হবু বরকে দেখতে পাচ্ছি। ওই দেখ, ওখানে বসে থাকা জেন্টেলম্যান ভাইয়াটাকে দেখে তোর বর মনে হচ্ছে। দেখ, একটা আপুর সাথে বসে আছে।”
বলেই লুকিয়ে আঙুলের ইশারা করে দেখালো জ্যোতি। নীহারিকা এবারে চোখ কুঁচকে রেখেই সেই ডান দিকের টেবিলে তাকালো। সাথে সাথে চোখজোড়া স্তম্ভিত হলো তার, আপনাআপনি চমকে গিয়ে ফট করে মাথা ঘুরিয়ে নিলো। শুকনো ঢোক গিললো বেচারি। আয়হায়! ইরফান কবির? এখানে? কেনো? কীভাবে? এবার কী হবে? জ্যোতি মলিন মুখ করে তাকালো নীহারিকার দিকে। বলল,
—” আ’ম সরি দোস্ত। আমি মোটেই এত পাগল হইনি যে যাকে তাকে তোর বর ভেবে বসব। কিন্তু ক্রাশটা ভালোই খেয়েছি। নাহলে যাকে তাকে তোর বরের মত লাগবে কেনো আমার কাছে?”
নীহারিকা এবারে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। পালানোর পথ খুঁজে জ্যোতির হাত ধরে দাঁত খিঁচিয়ে নিচু স্বরে বলল,
—” ওরে পাগলি, তুই ভুল দেখিসনি। ওটা উনিই।”
এবারে জ্যোতি অবাক হলো। চট করে আবারো সেদিকে তাকালো। খুশিতে চেঁচিয়ে ওঠার আগেই নীহারিকা ওর মুখ চেপে ধরে বলল,
—” চল বেরিয়ে যাই। চল প্লিজ।”
নীহারিকার তাড়াহুড়ো দেখে জ্যোতি মুখ কুঁচকে তাকালো,
—” কেন ভাই? চল না কথা বলি। আরে তোর হবু বর-ই তো। চল না প্লিজ প্লিজ। ভাই সামনাসামনি দেখতে আরো জোস! কি সুদর্শন! হোয়াট আ হ্যান্ডসাম ম্যান!”
—” না না নাে প্লিজ জ্যোতি। আমি উনার সামনে পড়তে চাচ্ছি না। কথাটা বোঝার চেষ্টা কর। আমার অবস্থা দেখ।’
—” আরে তাতে কী হয়েছে? তোর অবস্থা তো মাশাআল্লাহ সুন্দর-ই। আয় না, পরিচয় করিয়ে দে না প্লিজ!”
—” না না জ্যোতি প্লিজ।”
—” প্লিজ নীহু, আয় না। প্লিজ। চল না।”
এমন জোরাজুরি চলতে থাকলো দুজনের মধ্যে। নীহারিকার রীতিমতো কান্না পাচ্ছে। ইয়াশা কেবলই খিদে পাওয়ায় এসে বসেছিল ইরফানের পাশে। এতক্ষণ যাবৎ কী কী শপিং করল সবকিছুর বর্ননা দিতে ব্যস্ত ছিল। এমনকি একটু আগেই লিপস্টিক কিনতে গিয়ে একজন চমৎকার আপুর সাথে পরিচিত হওয়ার ব্যপার টাও বলেছে ইরফানকে। ইরফান কোনো প্রতিক্রিয়া না দিয়ে বসে বসে ছোট বোনের বকবক শুনেছে আর কফির কাপে চুমুক দিয়েছে।
এদিকে জ্যোতি আর নীহারিকার এমন রেষারেষির মাঝে কিছুটা আওয়াজ পেয়েই সেদিকে চোখ রেখেছিল ইয়াশা। সাথে সাথে ইরফানের বাহু ঝাঁকিয়ে বলল,
—” আরে এটা তো সেই আপুটাই। দেখো ভাইয়া, ওই আপুটাই আমাকে লিপস্টিক চুজ করে দিয়েছিল।”
ইরফান দেখলো না। এদিক সেদিক মেয়েদের দিকে তাকানোর অভ্যাস নেই তার। কপাল কুঁচকে বোনকে চুপ থাকতে বলল,
—” শাটাপ। চেঁচাবি না।”
—” তুমি একবার দেখো না আপু টাকে। অনেক মিষ্টি আপুটা। চলো না মিট করিয়ে দিই। “
ইরফান এবারে ভ্রু কুঁচকে তাকালো বোনের দিকে। ইয়াশা বুঝতে পেরে জ্বিভ কেটে বলল,
—” উপস, সরি সরি। আরে, সেভাবে তো বলিনি।”
ইরফান আবারো কফির কাপে চুমুক দিলো। বোনটা তার আস্ত পাগল! এদিকে জ্যোতিকে কোনোমতে এখান থেকে বের করেই ফেলছিল নীহারিকা, কিন্তু ইয়াশা এবারে হাত উঁচিয়ে ডেকে উঠলো,
—” নীহারিকা আপু?”
সাথে সাথে শ্বাস আটকালো দুটো মানুষের। নাম শুনে ইরফানের ঠোঁটের কাছে কফির কাপ থেমে গেলো, আর এদিকে নীহারিকার রেশারেশি থেমে গেলো। সে অপর দিকে ঘুরে ছিল, কিন্তু পেছন থেকে যে একটা মেয়ে ডাকলো তা সে বুঝেছে। কোনোকিছুর হিসেব মেলানোর আগেই সে ঠোঁট ভিজিয়ে কোনোমতে আড়চোখে তাকালো জ্যোতির দিকে। জ্যোতি খুশি হলো মেয়েটা ডাকলো বলে। ইরফান আস্তেধীরে কফির কাপটা নামিয়ে রাখলো। “নীহারিকা” নামটা কর্ণকুহরে পৌঁছেই তাকে চমকে দিয়েছে। এই প্রথম বারের মত কোনো কিছুর আকাঙ্খায় ও কৌতুহলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। দেখলো দুটো মেয়ে- একজন এদিকে তাকিয়ে আছে, আরেকজন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে আছে। আর বোঝা গেলো, সেই অন্যদিকে মুখ ফেরানো মানুষটাকেই দরকার তার।
নীহারিকা চায়নি। কিন্তু ধরা যেহেতু পড়েই গেছে, তাই কোনোমতে ধীরে ধীরে এদিকে ফিরে চোখ তুলে তাকালো। সাথে সাথে চোখে চোখ মিলে গেলো দুজনের। আশ্চর্য হলো ইয়াশা। ডাক দিলো সে। অথচ নীহারিকা তাকিয়েছে ইরফানের দিকে। কেনো? ইয়াশা আহাম্মক বনে ইরফানের দিকে তাকাতে একই কারবার দেখে আবারো চমকালো। কাহিনী টা কী জানতে সে এবারে তাকালো জ্যোতির দিকে। জ্যোতি কিছু একটা ইশারা করলো। মেয়েদের একটা অন্যরকম ইশারার ভাষাও রয়েছে, যা অন্য কেও বুঝতে সক্ষম না। অপরিচিত বলে পুরো বিষয়টা ধরতে না পারলেও একটু ধরতে পেরেই সবটা বুঝতে পারলো ইয়াশা। ভ্রু উঁচিয়ে ” ওও” বলে উঠলো। পরমুহূর্তেই আবারো আনন্দে লাফিয়ে উঠে ইরফানের বাহু ধরে বলল,
—” ভাইয়া, আপুটাকে চেনো নাকি তুমি? এটা-ই ভাবি নাকি?”
কথাটা শুনেও না শোনার ভান করলো ইরফান। কিছুক্ষণ ব্লাঙ্ক মাথায় বসে রইলো। কী করা দরকার বুঝলো না। এরপর নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে আসলো এদিকে। নীহারিকার হাতের তালু ঘেমে গেছে। সে জ্যোতির হাত শক্ত করে ধরে রইলো। কিন্তু বেইমানি করলো জ্যোতি। সুন্দর করে জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দৌঁড়ে ইয়াশার কাছে চলে গেলো। ইয়াশাকে নিজের মতোই মনে হয়েছে জ্যোতির, তাই তার সাথে পরিচিত হওয়াও যাবে, আর এই চাপামুখো দুটোকে স্পেসও দেয়া হবে।
—” কেমন আছেন নীহারিকা?”
ইরফানের প্রশ্ন হুট করে ছুঁড়ে দেয়াতে অপ্রস্তুত হলো নীহারিকা। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
—” আছি মোটামুটি। আ..আপনি?”
ইরফান কিছু বলল না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তাকে চুপ থাকতে দেখে নীহারিকা নিজেই বলল,
—” আমি জানতাম না যে আপনি এখানে। “
নীহারিকার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকালো ইরফান। মলিন হয়ে যাওয়া মুখটা কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বলল,
—’ জানার কথাও নয়। আপনি এত নার্ভাস হচ্ছেন কেনো?”
নীহারিকা জোরেসোরে মাথা নেড়ে কপালের ঘাম মুছলো। তাদের এই অবস্থা দেখে ওদিকে টেবিলে পাশাপাশি বসা ইয়াশা আর জ্যোতি হাসি আটকাতে ব্যস্ত হলো। মূলত ওরা দুজনই একে অপরের শপিং গুলো দেখাচ্ছে, আর কোন ব্রান্ডের কুয়ালিটি কেমন, কে কোথা থেকে কিনলো সেসব আলোচনা করছে। ওদের দুষ্টুমি বুঝতে পারলো ইরফান। চোখ দিয়ে ধমকালো ইয়াশাকে। ইয়াশা থোরাই না পাত্তা দিলো। বরং ভ্রু উঁচিয়ে খেপালো ইরফানকে। বুড়ো আঙুল দিয়ে ফিসফিস করে ” বেস্ট অফ লাক ” বলল। ইরফান বুঝলো এখানে থাকলে মান সম্মান আর থাকবে না। তাই নীহারিকা কে বলল,
—” চলুন ওদিকটায় যাই।”
নীহারিকা কিছু বলার আগেই ইরফান এগিয়ে গেলো। অগত্যা তাকেও ইরফানের পিছু নিতে হলো। মনে মনে জ্যোতিকে গালি দিলো নীহারিকা, কিন্তু মনে মনে ছোটবোন ইয়াশাকে খুশি হয়ে আরেকদিন শপিং করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো ইরফান কবির।
নীহারিকা কে নিয়ে ধীরে ধীরে ফুড এরিয়ার কোলাহল ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছে ইরফান। লিফটের দিকে না গিয়ে সোজা হাঁটলো টপ ফ্লোরের কিনারের দিকে, যেখানে শপিং মলের ভেতরের বিশাল খোলা জায়গাটা নিচ পর্যন্ত নেমে গেছে। ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিচের তলা দেখা যায়, মানুষগুলো ছোট ছোট পিঁপড়ের মতো নড়াচড়া করছে, আলো–ছায়ায় মিলেমিশে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা।
রেলিংয়ের কাছে এসে দাঁড়াল দু’জন। নীহারিকা দু’হাত দিয়ে রেলিং আঁকড়ে ধরেছে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু চোখে কিছু ঢুকছে না। এত আলো, এত মানুষ—সব মিলিয়ে তার মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগছে। ইরফান খু্ব একটা দূরে নয়, ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে। খুব কাছেও না, আবার দূরেও না—যতটুকু হলে নিরাপদ লাগে। সে রেলিংয়ে এক হাত রাখল, নিচের দিকে তাকাল। ব্যস্ত লোকজনের ভিড়, দোকানের ঝলমলে আলো, চলমান এস্কেলেটর—সবকিছু যেন নির্বিকারভাবে চলেই যাচ্ছে। অথচ এই ছোট্ট জায়গাটায় দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষের ভেতরে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা জমে আছে।
নীহারিকা নীরবতা ভাঙলো না। বাতাসে তার নিঃশ্বাসের শব্দটুকু টের পাচ্ছে ইরফান। ইরফান বলার মত কিছু খুঁজে না পেয়ে কন্ঠটা ভীষণ শান্ত করে বলল,
—” এখান থেকে তাকালে, সবকিছু খুব ছোট মনে হয়, তাই না?”
নীহারিকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
—” হুম। মানুষগুলোকে…খুব ছোট দেখায়। পিঁপড়ের মত।”
—” কিন্তু কাছ থেকে দেখলে, প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা গল্প আছে। আলাদা ভয়, আলাদা আশা।”
নীহারিকা এবার তাকালো। নিচে নয়—ইরফানের দিকে। খুব অল্প সময়ের জন্য। তারপর আবার চোখ নামিয়ে নিল। রেলিংয়ের ধাতব ঠাণ্ডা স্পর্শটা তার তালুতে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। সে হালকা গলায় বলল,
—” আমি ভাবিনি যে, এভাবে দেখা হয়ে যাবে।’
ইরফান নিচের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল,
—” আমিও তো ভাবিনি আপনি আমাকে দেখে এভাবে এড়িয়ে পালাতে চাইবেন।”
নীহারিকা হালকা হাসল। সেই হাসিতে অস্বস্তি আছে, লজ্জাও আছে। বলল,
—” পালানোটা অভ্যাস হয়ে গেছে।”
—” এভাবে পালাই পালাই করলে তো মুশকিল। এমন করলে আপনাকে বেঁধে রাখা ছাড়া আর উপায় দেখছি না আমি।”
নীহারিকা অবাক হয়ে তাকালো। তাকে বেঁধে রাখবে? এ কি ভয়ানক কথা! নীহারিকার দৃষ্টি দেখে তার সামনে প্রথমবারের মত শব্দহীন হাসলো ইরফান। মুগ্ধ হয়ে সেই হাসি দেখলো নীহারিকা। ইরফান ভাবলো, ভয় পেয়েছে মেয়েটা। তাই বলল,
—” সবসময় দঁড়ি দিয়ে বাঁধতে হয় না, অন্যভাবেও তো বাঁধা যায়। বরং আরো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে বাঁধা যায়। সেই বাঁধন অদৃশ্য, কিন্তু মজবুত।”
নীহারিকা বুদ্ধিমতী। বোকা নয়। না বলা কথাটা বুঝলো এবারে। হয়তো প্রথমেই বুঝতো। কিন্তু কেনো যেন আজ এই মুহুর্তে তার মাথা কাজ করছে না। হাত পা অজান্তেই কাঁপছে। কেনো? কারন কী? জানা নেই। ইরফান জিজ্ঞেস করলো নিজে থেকেই,
—” শপিং করতে এসেছেন বুঝি?”
—” না না, আমার ফ্রেন্ড শপিং করতে এসেছে তো। তাই সঙ্গ দিতে আমিও আসলাম। যদি এটাসেটা কিছু পছন্দ হয় তাহলে নেব।”
ইরফান মাথা ঝাঁকালো। নীহারিকা বলল,
—” ইয়াশা যে আপনার বোন হয়, আমি তো জানতাম না। ওকে দেখিনি আগে।”
—” ও নিজেও দেখেনি আগে। তাই চেনে নি। তবে আজ যে আপনাকে দেখেছে, এতে ভীষণ লাভ হলো আমার।”
মুখ ফঁসকে কথাটা বলল ইরফান। সাথে সাথেই ঠোঁট ভেজালো। এখন এই লাভের কারন কী বলবে তা খুঁজতে শুরু করলো। কিন্তু নীহারিকা আর গভীরে গেলো না। জিজ্ঞেস করলো না। বরং বলল,
—” আপনি বুঝি ইয়াশাকে সঙ্গ দিতে এসেছেন?”
ফিক করে হাসলো ইরফান,
—” হ্যাঁ। জোর করে নিয়ে এলো। হাবিজাবি কী কী যেন কিনলো মেয়েটা!”
অবাক হলো নীহারিকা। মানুষটাকে যেদিন প্রথম দেখলো, একটুও হাসে নি সেদিন। বরং মুখ গম্ভীর করে পুরোটা সময় ছিল। অথচ আজ হাসছে। আপন মনে হলো হাসিটা। ভীষণ চেনা মনে হলো। ভালো লাগলো নীহারিকার। এই তো, হাসলে কত সুন্দর লাগে মানুষটাকে। অথচ লোকটা হাসে না কেনো? কেনো সবসময় মুখ গম্ভীর করে থাকে কে জানে।
ইরফান আর কিছু বলল না। কেবল রেলিংয়ে রাখা হাতটা একটু শক্ত করল। এই ভিড়ের মাঝখানে, আট তলার কিনারায় দাঁড়িয়ে, নিচে এত মানুষ, উপরে আলো ঝলমলে দোকান—তাদের দু’জনের চারপাশে একটা অদ্ভুত নীরবতা আবারো তৈরি হলো। ঠিক এই নীরবতার ভেতরেই, প্রথমবারের মতো, নীহারিকা অনুভব করল, এই মানুষটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটা অস্বস্তিকর না। আর ইরফান বুঝল—ভিড়ের মাঝেও, কিছু মানুষকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যায়।
কিছুক্ষণ পর নীহারিকার চোখ পড়লো রেলিঙের উপর। তার আর ইরফানের হাতটা পাশাপাশি রাখা। দুজনেই একসাথে হাত রেখে হাজারো লোকের সমাগম দেখছে। যদিও এখানে দেখার কিছু নেই। কিন্তু কিছু কিছু সময়ে নীরব স্তব্ধ আকাশ দেখতেও ভালো লাগে, আবার মেঘের ভীড়ে হারিয়ে যাওয়া আকাশ দেখতেও ভালো লাগে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ভীষণ মন খারাপ হলো নীহারিকার। ইরফানের ফর্সা সুন্দর হাতের পাশে নিজের শ্যামলা হাতটা বেশ বেমানান লাগলো তার। তাই ধীরে হাতটা সরিয়ে নিল।
ইরফান খেয়াল করলো। সত্যি বলতে সে আড়ালে এতক্ষণ পাশাপাশি হাত দুটোই দেখছিল। ভালো লাগছিল তার, কিন্তু হুট করে হাত সরিয়ে নেয়াতে তা খেয়াল করে ইরফান কিছুক্ষণ চুপ রইল। এরপর নিজেই নীহারিকার হাতটা মুঠোয় নিলো, প্রথম বারের মত স্পর্শ করলো নীহারিকার হাত। এরপর মুঠোয় থাকা ছোটখাটো হাতটা নিয়ে আগের জায়গায় এনে ইরফান শান্ত কন্ঠে বলল,
—” হাতে হাত রাখতে শিখুন নীহারিকা। নইলে মনে মন মেলাবেন কী করে?”
নীহারিকার শ্বাস আটকে আসার উপক্রম। হঠাৎ করে হাতটা এমনভাবে, একদম নিজের বলে দাবি করার মতো করে ধরাটা আশানুরূপ ছিল না। তার শরীরটা হালকা কেঁপে উঠল। হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা করল না সে। পারলও না। ইরফানের কথাটা কানে বাজতেই থাকল, হাতে হাত রাখতে শিখুন। এই শেখার কথা কেউ তাকে কোনোদিন বলেনি। বরং শিখিয়েছে, হাত গুটিয়ে রাখতে। নিজের জায়গা ছোট করতে। বেশি চাইতে নেই, বেশি ধরতে নেই—সবসময় যেন কেউ সবকিছু কেড়ে নেবে।
নীহারিকা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিজের আর ইরফানের জোড়া হাতের দিকে তাকাল। তার শ্যামলা আঙুলগুলো ইরফানের ফর্সা আঙুলের ভেতরে হারিয়ে গেছে। আশ্চর্য, এবার আর বেমানান লাগছে না। বরং.. ঠিকঠাক।
নীহারিকা সময় নিলো। ধীরে সুস্থে বলল,
—” আপনি কি জানেন, আমি কখনো কারো হাত এভাবে ধরিনি?”
ইরফান তাকালো না। তাকালে হয়তো এই মুহূর্তটা ভেঙে যাবে। কেবল কণ্ঠটা নরম রেখে বলল,
—”জানি।”
—”কী করে জানেন?”
—” আপনার হাতের কাঁপুনি অনুভব করে। ঠান্ডাতেও কেও এভাবে ঠকঠক করে কাঁপা-কাঁপি করে না নীহারিকা। রিলাক্স।”
নীহারিকার গলা বুঁজে এলো। লোকটা তো মারাত্মক বুঝদার! এত কিছু নিজে থেকে বুঝে গেলে তো বড্ড অসুবিধে! এই মানুষটা কেন এমনভাবে দেখে? কেন এমন কথা বলে, যা সে নিজেও নিজের কাছে স্বীকার করেনি কখনো? সে হালকা করে হাতটা নাড়াল। ছাড়ানোর জন্য না, শুধু নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে এটা সত্যি কিনা। ইরফান তার মুঠোটা আরও একটু শক্ত করল, কিন্তু তাতে কোনো দাবি নেই, আছে শুধু আশ্বাস।
নীহারিকার গলা কাঁপছে। তবুও এক বুক সাহস নিয়ে বলেই ফেলল,
—” অদৃশ্য সেই মজবুত বাঁধনের সাথে এভাবে হাত আঁকড়ে ধরলে কি খুব মন্দ হবে?”
ইরফান এবার তাকালো। সরাসরি। চোখে কোনো হাসি নেই, কোনো চটুলতা নেই। কেবল গভীর স্থিরতা।
—” খুব একটা মন্দ হবে বলে আমার মনে হয় না। আপনার কী মনে হয়?”
নীহারিকার চোখের কোণে জল জমে উঠল। সে মাথা একটু ঘুরিয়ে নিচের দিকে তাকাল, যেন কেউ দেখে না ফেলে। হাতের বাঁধন টা আরেকটু শক্ত হলো। পুরুষালী হাতের এমন আশ্বাসের জোয়ারে নীহারিকার শ্বাসের গতি বাড়লো। এই অনুভূতিটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। এই অনুভূতিটাই সবচেয়ে সুন্দর।
—( ✨ শেষের নোটটা সবাই পড়বেন।)
চলবে…?
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা গল্পের লিংক
-
নবরূপা পর্ব ৭
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা পর্ব ৩
-
নবরূপা পর্ব ১
-
নবরূপা পর্ব ৮