Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ২৮


নবরূপা

পর্ব_২৮

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে রীতিমতো অবাক না হয়ে পারলো না ইরফান। বিছানার পাশটা এখনো ফাঁকা। মেয়েটা সত্যি সত্যি সারারাতে ঘরে আসে নি আর? চিন্তা করতে করতেই উঠে বসলো ইরফান। আরো বেশি অবাক হলো আয়রন করা শার্ট প্যান্ট বিছানার এক পাশে সাইড করে রাখা আছে দেখে। এত সকাল সকাল কলেজ যাওয়ার জন্য জামাকাপড় কেনো গুছিয়েছে নীহারিকা তা বুঝতে পারলো না ইরফান। সে ঘুমু ঘুুমু চোখ নিয়েই ফ্রেশ হয়ে এলো। নিচে গিয়ে দেখলো আয়েশা বেগম ব্যস্ত হাতে খাওয়ার টেবিল সাজিয়ে রাখছেন। সহায়তা করছে ইনায়াকে কোলে নেয়া ইয়াশা। ইরফান ভ্রু কুঁচকে আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজলো নীহারিকা কে। কি আশ্চর্য! কোথায় গেলো মেয়েটা? ভাবান্তর না হয়েই সে সোফাতে বসে পড়লো। ইরফানকে দেখে ইয়াশা এবারে চেঁচালো,
—” ভাইয়া কলেজ যাবে না? দ্রুত খেতে এসো।”

ইরফান মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বোঝালো। এগিয়ে গিয়ে ইনায়াকে কোলে নিয়ে নিল। সদ্য ঘুম থেকে ওঠা বাচ্চামেয়েটাকে আদর করে দিতে দিতে ইয়াশাকে ফিসফিস করে বলল,
—” তোর ভাবি কই?”

ইয়াশা দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—” জানি না তো। আমি তো ভাবলাম ঘুম থেকেই ওঠে নি। দেখিনি এখনো।”

ইয়াশার উচ্চস্বর শুনে ইরফান চোখ রাঙালো। কিন্তু, আয়েশা বেগম শুনতে পেলেন, কথাটা পুরোপুরি না বুঝে জিজ্ঞেস করলেন
—” কী বললি ইয়াশা?”

ইয়াশার পায়ে লাথি মেরে ইরফান তড়িঘড়ি করে বলল,
—” না মা কিছু না।”

ইয়াশা নাকমুখ কুঁচকে তাকালো। বউয়ের খোঁজ জানতে এসেছে, এতে এত লজ্জা পাওয়ার কী আছে? আয়েশা বেগম এরই মাঝে গরম কফির কাপটা ইরফানের হাতে দিলেন, বললেন,
—” দুপুরে বাড়িতেই খাবি নাকি বাইরে থেকে খেয়ে আসবি?”

ইরফান বেশ ইতস্তত করে তাকালো। মূলত নীহারিকা রান্না শুরু করার পর থেকে ইরফান তো কখনো বাইরে খায়নি। তবে আয়েশা বেগম আজ কেনো জিজ্ঞেস করছে বোঝা গেলো না। ইরফান তবুও বলল,
—” বাড়িতেই খাব তো।”

আয়েশা বেগম মাথা নেড়ে বললেন,
—” ঠিক আছে। ইয়াশা, দে ইনায়াকে আমায় দে। তুই গিয়ে ইরফানেন ঘরটা গুছিয়ে দিয়ে আয় যা!”

ইরফান কফির কাপটা ঠোঁটে টেনে নিতে চাইছিল শুধু। আয়েশা বেগমের কথা শুনে অবাক হয়ে বলেই বসলো,
—” না, ও কেনো করবে? নীহা করে দেবে তো।”

আয়েশা বেগম নাকমুখ কুঁচকে তাকালেন ছেলের দিকে। হাসতে হাসতে বললেন,
—” হ্যাঁ তোর নীহা তো এখন বাপের বাড়ি থেকে উড়ে এসে গুছিয়ে দিয়ে যাবে তাই না?”

ইরফান চোখ বড় করে তাকালো। অস্পষ্ট স্বরে বলল,
—” মানে?!”

ইয়াশাও চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল,
—” ভাবি বাপের বাড়ি গেছে? কখন? কোথায়?কীভাবে? কেনো?”

আয়েশা বেগম বিরক্তিতে চ শব্দ করে ইয়াশার মাথায় গাট্টা মারলেন। এরপর ছেলেকে এমন থম মেরে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
—” কী রে? ওমন করে তাকিয়ে আছিস কেনো? ও নাকি তোকে গতকাল রাতেই বলেছে।”

হাতে থাকা কফির কাপটা ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখলো ইরফান। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে চুপ রইলো। আয়েশা বেগম নিজেই বললেন,
—” আমায় গতকাল দুপুরেই বলেছিল যে বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে চায়। আমি বলেছি আমার ছেলে পারমিশন দিলে চলে যেও। ও তো সকালে উঠে সব গোছগাছ করে আমার ঘরে গিয়ে বলল যে তোকে রাতেই বলেছে। আর তুই নাকি বিজি থাকবি, তাই যেন ও একা চলে যায়।”

ইরফানের দৃষ্টি স্থির হলো। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে সে বোঝার চেষ্টা করল কী হয়ে গিয়েছে, আর কী হচ্ছে। আর যা-ই হোক না কেনো, নীহারিকার মত একজন সাহসী, ম্যাচিইউর্ড মেয়ে যে এমন একটা কাজ করবে তা মাথাতেও আনে নি ইরফান। অকারনে গত সন্ধ্যা থেকে মুখ অন্ধকার করে রেখে সকালে তাকে কিছু না বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো? এতটা সাহস! এতটা আত্মবিশ্বাস! মনে মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হলো ইরফানের। নীহারিকা নিতান্তই বাচ্চামোর একটা কাজ করেছে বলে সে মনে করলো। এমনকি এটাও বুঝলো কীভাবে আয়েশা বেগমকে মিথ্যে বলে নীহারিকা চলে গেছে। বিষয়টা খুবই খারাপ লাগলো ইরফানের। রাগে, ক্ষোভে, অভিমানে ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিতে চুমুক দিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
—” হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি আজ বিজি থাকব অনেক। দুপুরে খেতে আসব না মা।”
বলেই ইরফান ইয়াশার দিকে তাকিয়ে বলল,
—” ইনায়াকে দেখে রাখিস একটু। জানি তোর পড়াশোনায় ডিস্টার্ব হবে। তাও একটু রাখিস। কলেজ থেকে এসে আমাকে দিয়ে দিস।”

ইয়াশা নিজেও অবাক হয়েছে। পরিস্থিতি সে একটু হলেও আঁচ করতে পেরেছে। আর ইরফানের গলার স্বর শুনেও নিশ্চিত হতে পারছে দুজনের নিদারুণ ঝামেলা হয়েছে। সে এবারে মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
—’ ইনায়া আমার পড়াশোনায় ডিস্টার্ব করে না হুহ! আমি ওকে সারাজীবনই দেখে রাখতে পারব। তুমি নিজের চরকায় তেল দাও।”

ইরফান আর এক মুহূর্তও বসে থাকল না। কফির কাপটা টেবিলে রেখেই উঠে দাঁড়াল। মুখের রঙ গাঢ় হয়ে গেছে। চোখদুটো কেমন কঠিন, ঠান্ডা। দ্রুত পায়ে সে নিজের ঘরের দিকে উঠে গেল। ঘরে ঢুকেই দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করল। শব্দটা একটু বেশি জোরেই হয়ে গেল, তার ভেতরের অস্থিরতার মতই। চারদিকে চোখ বুলালো সে, সবকিছু গুছানো। অস্বাভাবিকভাবে গুছানো। বিছানার চাদর টানটান করে বিছানো, জামাকাপড় আয়রন করে রাখা, টেবিল পরিষ্কার, যেন কেউ খুব হিসেব করে, খুব সচেতনভাবে সব রেখে গেছে। ইরফানের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। এভাবে যায় কেউ? কী কারনে নীহারিকা এমন করলো? কী কারনে? কোনো কারনও তো দেখিয়ে দিয়ে যায়নি সে। এমন তো না যে ইরফান জানার চেষ্টা করেনি। গত রাতে সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে নীহারিকার সাথে কথা বলার। তাহলে কেনো নীহারিকা নিজের ব্যক্তিত্ব ভুলে গিয়ে অকারনে অযৌক্তিক রাগ দেখিয়ে চলে গেলো? কেনো? এসব ভাবতে ভাবতেই ইরফান ধীরে ধীরে বিছানায় বসে পড়ল। তারপর হঠাৎই বিরক্তিতে উঠে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক হাঁটতে শুরু করল। মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, নীহারিকা কিছু না বলে চলে গেল কেন? রাতে তো একবারও কিছু বলেনি! কোনো ঝগড়াও হয়নি, তবুও? নিজে থেকেই দুরত্ব তৈরী করেছে নীহারিকা। তার চোখে হঠাৎ সেই গত রাতের দৃশ্যগুলো ভেসে উঠল। নীহারিকার অদ্ভুত নীরবতা, চোখ এড়িয়ে চলা, কেমন যেন দূরে দূরে থাকা, তখন গুরুত্ব দেয়নি সে। এখন সবকিছু একসাথে মাথায় আঘাত করছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। এত বড় সিদ্ধান্ত… একবার বলার প্রয়োজনও মনে হলো না? তার গলায় রাগ জমে উঠল।

ইনায়ার কথা চিন্তা না করে নীহারিকা কীভাবে চলে যেতে পারলো এটাও ভেবে পেলো না ইরফান। মেয়েটা কি ভেবে দেখেনি সে চলে গেলে ইনায়াকে কে দেখবে? এ-ই তার ভালোবাসা? এ-ই তার সন্তানের প্রতি মায়া?ওই ছোট্ট বাচ্চাটা সারাদিন কাকে খুঁজবে? ইরফান চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। বাঁকা হাসলো সে। কপালে হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভেবে দেখলো, আজ যদি ইনায়া নীহারিকার নিজের সন্তান হতো, তবে কি সে এভাবে ইনায়াকে রেখে যেতে পারতো? উহু। কখনোই না। বরং নিয়ে যেতো। কিন্তু নীহারিকা ইনায়াকে আপন ভাবেইনি। তাই ছুঁড়ে ফেলে রেখে গেছে। একবারো ভাবেনি কী হবে। ইরফান মনে মনে বিড়বিড় করল,
—” স্বার্থপর! “
এই জায়গাটাতেই তার ভেতরের ক্ষোভটা সবচেয়ে বেশি জ্বলে উঠল। ভেতরে অদ্ভুত একটা খালি খালি অনুভূতি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সে সেটা স্বীকার করল না। বরং রাগটা আরও বাড়িয়ে দিল নিজেই। নীহারিকার এই আচরণকে বাচ্চামি নয়, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলে সম্বোধন করল। সে বিড়বিড় করে উঠল।
—” এতটা ইম্যাচিউর হতে পারে কেউ?”
তার মনে হলো, নীহারিকা তাকে অবহেলা করেছে। তার জায়গাটাকে গুরুত্ব দেয়নি। সে হঠাৎই আলমারির দরজা জোরে বন্ধ করল। নীহারিকার গুছিয়ে দিয়ে যাওয়া কাপড়গুলো ছুঁড়ে ফেলে বলল,
—” ঠিক আছে। চলে গেছো, ওখানেই থাকো। আমি কোনো অন্যায় করিনি তোমার সাথে। তাই সেখানে গিয়ে তোমায় মানিয়ে নিয়ে আসারও প্রশ্ন ওঠে না। যা খুশি করো ইডিয়ট!”
তার চোখদুটো এবার পুরোপুরি শক্ত হয়ে গেল। একটা স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সে।
—” নিজে যখন এতটা সাহস করে চলে গেছো, তখন নিজেই ফিরে আসবে।”

তার বুকের ভেতরটা আবারও কেমন অস্থির হয়ে উঠল, কিন্তু সে সেটাকে রাগের আড়ালে চেপে ফেলল। ইরফান নিজেকেই বোঝালো, সে কারো পেছনে ঘোরে না। সে যেহেতু নীহারিকার সাথে কোন রকম অন্যায় করেনি, তার দিক থেকে যেহেতু কোনরকম খুঁত ছিল না, নীহারিকা নিতান্তই বাচ্চামো করে অকারণে অযৌক্তিক রাগ দেখিয়ে এমন একটা অদ্ভুত আচরণ করেছে, তাই সেও আর নীহারিকার জন্য পাগলামো করবে না। মেয়েটা যদি আশা করে থাকে যে ইরফান তাকে নিতে তার বাপের বাড়ি যাবে, তাহলে এটা ভুল। ইরফান মনে মনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, সে মোটেই নীহারিকা কে ফিরিয়ে আনতে যাবে না। কিন্তু সত্যিটা হলো, তার মাথার ভেতর বারবার একটা প্রশ্নই ঘুরছে- ” কেন গেল ও?” আর সেই প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে তার রাগটা আরও তীব্র হয়ে উঠল। সে শেষবারের মত ঘরটা চারদিকে তাকাল, এই ঘরেই তো ছিল নীহারিকা। এই ঘরেই গতকাল পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। আজ হঠাৎ সবকিছু এত ফাঁকা লাগছে কেন? ইরফান মুখ ফিরিয়ে নিল। এই অনুভূতিটা সে মানতে চাইল না। দৃঢ় গলায় নিজেকেই বলল,
—” না। আমি যাব না। একদমই না।”
তার সিদ্ধান্ত পাথরের মত শক্ত হয়ে গেল, নীহারিকা নিজে না আসা পর্যন্ত, সে এক পা-ও এগোবে না।


বিয়ের পর এটা দ্বিতীয়বার যখন নীহারিকা তার বাপের বাড়িতে এসেছে। রাবেয়া বানু রীতিমতো কাঁপতে কাঁপতে নীহারিকার কাছে ইরফানকে কালো জাদুর হাত থেকে বাঁচানোর ঘটনা গুলো শুনেছে। ভয়ে এখনো মাথা ঘুরছে ভদ্রমহিলার। নাঈমুল ইসলাম সব শুনে মেয়ের সাহসের জন্য বাহবা দিয়েছেন, এবং জানিয়েছেন যত দ্রুত সম্ভব জামাইকে বাসায় ডেকে আনতে। নীহারিকা শুধু হেসেছে। কিছু বলেনি। রাবেয়া বানু চা বানানো শেষ হলে দুটো কাপ নিয়ে নীহারিকার রুমে এলেন। বসতে বসতে বললেন,
—” তুই একা কেনো এলি বোকা মেয়ে? নানুমনিকে আনতে পারতি?”

নীহারিকা বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল। কথাটা শুনে বলল,
—” ইনায়া?”
—” হ্যাঁ!”
—” আনতে চেয়েছিলাম মা। পরে ইতস্তত বোধ করলাম। এভাবে নিয়ে আসলে যদি আমার শ্বাশুড়ি আপত্তি করতো, আর তাছাড়া আমি তো আর এখানে ঘুরতে আসিনি।”

রাবেয়া বানু মুখ কুঁচকালেন,
—” তবুও বাপু! তুই জামাইকেও আনিস নি, নানুমনিকেও আনিস নি। এটা কেমন কথা হ্যাঁ? অন্তত ইনায়াকে আনাটা তো তোর দায়িত্ব। তুই ওর মা না?”

নীহারিকা কাতর মুখে তাকিয়ে রইলো। সে অবশ্যই আনতো ইনায়াকে। কিন্তু ইরফানের ভয় পাচ্ছিল সে। এমনিতেই পালিয়ে এসেছে। ইনায়াকে নিয়ে এলে ইরফান নিশ্চয়ই বকাবকি করতো, রাগারাগি করতো। এমনও বলতে পারতো, কার অনুমতি নিয়ে তুমি আমার সন্তানকে নিয়ে গেছো?” ওমন ভয়ানক কথা শুনলে নীহারিকা ম’রেই যাবে। তাই সে আনে নি।

নীহারিকার ভীষণ মন খারাপ হলো। ঘড়ির কাঁটা বারোটা পার করেছে। ইরফান তো এতক্ষণে কলেজে চলে গেছে। লোকটা কি আমায় খোঁজে নি? আমায় না দেখে কিছু বলেনি? একটা কলও তো দিল না। অদ্ভুত হলেও সত্য নীহারিকা সকালে আসার পর থেকে ফোনের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। সে আশা করে ইরফান তাকে কল করে বকাবকি করবে, ফিরে যেতে বলবে। কিন্তু ইরফান কল করল না। গত রাতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরেও পিছু এসে ফিরিয়ে নেয়নি। দুটো সময়েই অভিমান হয়েছে নীহারিকার। মানুষটা একটু বেশিই নিরামিষ হয়ে গেছে না? কান্না পেলো মেয়েটার। দুপুর হয়ে গেছে। ইরফান নিশ্চয়ই জেনেছে সব। তবুও একটাবার কলও করলো না। তবে কি তাকে নিতেও আসবেনা।

হুট করেই নীহারিকার ভেতর থেকে এক সত্ত্বা যেন বলছে- ইরফান কেনো নিতে আসবে আমায়? আমার আচরণ তো অযৌক্তিক। সে কেনো, আমি তো নিজেও জানি না আমি কেনো এমন করছি। কেনো ইরফানের থেকে দুরত্ব নিতে ইচ্ছে করেছে, কেনো অভিমান করতে ইচ্ছে করেছে আমি তো তাও জানি না। তাকেও জানাইনি। তাহলে ইরফান কেনোই বা আসবে? আমি কেনো এত কিছু আশা করছি? এত আশা, আহ্লাদ তো মানায় না আমায় তাইনা?

তার ভাবনা চিন্তার মাঝেই ফোনটা টুং করে বেজে উঠলো। তড়িঘড়ি করে ফোন হাতে নিল নীহারিকা। নাহ, কল আসেনি, তবে একটা মেসেজ এসেছে ইরফানের থেকে। অনেক উৎফুল্লিত হয়ে নীহারিকা মেসেজটা ওপেন করল। যেখানে লেখা,

—” তোমার মত একজন দৃঢ় চিত্তের আত্মবিশ্বাসী মেয়ের কাছে এমন অযৌক্তিক আচরণ আশা করিনি। অত্যন্ত নিরাশ হলাম। আমার মেয়েকে আমি যোগ্য মা মনে হয় এনে দিতে পারিনি নীহারিকা। আমি তার জন্য এমন মা চাইনি, যে কিনা তাকে ফেলে চলে যেতে দুবার ভাবেনা, এক রাতের মধ্যে হারিয়ে যায়! মা হওয়া আসলেই কঠিন কাজ, তাই না?”

স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো নীহারিকা। মেসেজটা দশবারেরও বেশি পড়লো। আবারো পড়লো। বারবার পড়তেই থাকলো যতক্ষণ না পর্যন্ত ফোনের স্ক্রিনে চোখের পানি টপটপ করে পড়ে। কিন্তু চোখের পানি মোছার আগেই আবারো আরেকটা বার্তা এলো,

—” তোমার ঘোরাঘুরি শেষ করে ফিরে আসলে দয়া করে আগে আমার সাথে বিষয়টা খোলাসা করবে তুমি। দোটানা ভালো লাগছে না আর। হয়, পরিষ্কার করে নিজের সমস্যার কথা বলবে, আর নাহয় ওখানেই থাকো। আসার দরকার নেই। মোটেই আশা করবেনা যে আমি তোমায় নিতে যাব।”
শশশ
মেসেজটা পড়া শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল নীহারিকা। যেন শব্দগুলো এখনো বদলে যাবে, অন্য কিছু হয়ে যাবে। কিন্তু না, একই কথাগুলো, একই কঠিন, ঠান্ডা বাক্য। তার আঙুলগুলো কেঁপে উঠল। পরের মুহূর্তেই ফোনটা হাত থেকে পিছলে পড়ে গেল বিছানার উপর। একটা হালকা শব্দ হলো, কিন্তু সেই শব্দটাও যেন তার কানে পৌঁছালো না। নীহারিকা স্থির হয়ে বসে রইল। চোখ বড় বড় হয়ে আছে। ঠোঁট হালকা ফাঁকা। কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ খুব জোরে ধকধক করতে শুরু করল। ইরফান এটা কী বললো? তার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। এটা কি সত্যি? ইরফান এমনভাবে কথা বলল? যে মানুষটা এতদিন ধরে কখনো তার সাথে কড়া গলায় কথা বলেনি,যে মানুষটা রেগে গেলেও নিজেকে সামলে নেয়, সেই মানুষটাই আজ, এভাবে? নীহারিকার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। সে চেষ্টা করল পুরো কথাগুলো বুঝতে, যোগ্য মা না, মেয়েকে ফেলে চলে যাওয়া, থাকো ওখানেই। প্রতিটা শব্দ যেন ছুরির মত বিঁধতে লাগল বুকের ভেতর।

নীহারিকার গলা শুকিয়ে গেল। সে নিজেই বুঝতে পারছে না, সে ভুল করেছে, নাকি, সে শুধু কষ্ট পেয়েছিল? কিন্তু ইরফান তো সেটা জানেই না। এই কথাটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিল। ইরফান কিছুই জানে না। সে শুধু তার কাজটা দেখেছে, আর সেই অনুযায়ী বিচার করেছে। নীহারিকার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। তার মনে হলো, সবকিছু হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সে তো শুধু একটু দূরে সরে দাঁড়াতে চেয়েছিল, নিজেকে বুঝতে…নিজের অনুভূতিটাকে সামলাতে, কিন্তু সেটা কি এত বড় অপরাধ হয়ে গেল? তার চোখ বেয়ে টুপটাপ করে পানি পড়তে লাগল। সে কাঁপা হাতে মুখ ঢেকে ফেলল।
—” আমি তো…ইনায়াকে ফেলে যেতে চাইনি..!”
গলাটা ভেঙে গেল তার।
—” আমি তো..শুধু…!”
কথাটা শেষ করতে পারল না। কারণ সে নিজেই জানে না, সে আসলে কী করতে চেয়েছিল। এই প্রথমবার, নীহারিকা ভয় পেল। ভীষণ ভয়। ইরফান রাগ করেছে—এটা না। ইরফান তাকে ভুল বুঝেছে— এটাই তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। যদি সে সত্যিই মনে করে— নীহারিকা ভালো মা না?যদি সে সত্যিই ভাবে— সে দায়িত্বজ্ঞানহীন? তার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
—” যদি.. সে আমাকে আর না চায়..!?”

এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল। ঝট করে ফোনটা তুলে নিল আবার নীহারিকা। স্ক্রিন ঝাপসা হয়ে আছে চোখের পানিতে। সে আবার মেসেজটা পড়ল। প্রতিটা লাইন, আবার, আবার,
যেন নিজেকে শাস্তি দিচ্ছে। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
—” আমি কী করে এমন করে ফেললাম?”
মাথা নিচু করে বসে রইল সে। চারপাশে সব স্বাভাবিক—কিন্তু তার ভেতরে যেন ঝড় বইছে। সে বুঝতেই পারছে না— একটা ছোট্ট অভিমান কীভাবে এত বড় দূরত্ব হয়ে গেল। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার— সে জানে না, এই দূরত্বটা সে আর আগের মত করে ফিরিয়ে আনতে পারবে কিনা।নীহারিকা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হাত দুটো কাঁপতে কাঁপতে মুখে চেপে ধরল। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে যেন। ধীরে ধীরে মাথা নাড়িয়ে বিড়বিড় করে উঠল সে—

—” আমি তো শুধু মা হতে যাইনি। আমি তো স্ত্রী হতেও গিয়েছিলাম। আমি কি শুধু ইনায়ার দেখাশোনার জন্য গিয়েছিলাম? শুধু একটা দায়িত্ব, একটা ভূমিকা হয়ে থাকার জন্য? আমি তো ভেবেছিলাম আমি আপনার জীবনে একটু জায়গা পাবো, কিন্তু আপনি… আপনি কি কখনো আমাকে সেই জায়গাটা দিলেন? আপনি আগেই বলে দিয়েছিলেন, ভালোবাসেন না। তাহলে আমি কী ছিলাম আপনার কাছে? একটা প্রয়োজন? একটা দায়িত্ব? নাকি শুধু আপনার মেয়ের জন্য একজন মানুষ? আমি তো চেয়েছিলাম আপনি একবার, শুধু একবার আমায় আপনার করে দেখেন। আপনার চোখে, আমি কি কখনো আপনার স্ত্রী ছিলাম? আমি চেষ্টা করেছি, সব দিয়েছি, নিজের সবটুকু। অথচ, একটা ভুলেই, আপনি আমাকে এমনভাবে বিচার করলেন? আমি তো পালিয়ে যাইনি, আমি তো শুধু…একটু দূরে গিয়েছিলাম।।।নিজেকে সামলাতে, নিজেকে বুঝতে।”

একটা দীর্ঘ, কষ্টভরা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো নীহারিকার বুক থেকে। বিড়বিড় করল সে
—” কিন্তু আপনি একবারও জানতে চাইলেন না- কেন?”
এই প্রশ্নটার পর সে একদম চুপ হয়ে গেল। শুধু কাঁদছে। তার ভেতরে একটা সত্যি খুব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সে শুধু ভালোবেসে ফেলেনি, সে প্রত্যাশাও করে ফেলেছে। আর সেই প্রত্যাশা ভেঙে যাওয়ার শব্দটাই এখন তার বুকের ভেতর প্রতিধ্বনি হয়ে বাজছে।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply