Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ২৪


নবরূপা

পর্ব_২৪

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

গাড়ির ব্যাক সিটে রীতিমতো ক্লান্ত হয়ে বসে শ্বাস ফেলছে একজোড়া মানব। একজনের চোখে সফলতার আমেজ, আরেকজনের চোখে আতঙ্কের শেষ চিহ্ন। ইরফান সিটে ঘাড় এলিয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলছে। চোখজোড়া বন্ধ তার। শরীর একটুও নড়াচড়া করার মতও শক্তি নেই তার মাঝে। নীহারিকা সেই সময় সমস্ত জাদুটোনা শেষ করার সাথে সাথে ইরফানের অনুভূত হয়েছে কেও যেন তার শরীর থেকে কিছু একটা টেনে বের করে নিয়ে গেছে। শরীরটা অচল লাগছে তার। শারিরীকভাবে অত্যন্ত বাজে অবস্থা! এদিকে নীহারিকাও তার পাশে ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা এলিয়ে দিয়েছে পেছনে। চোখ বুঁজে ঘন নিঃশ্বাস টানছে সে। কষ্ট হচ্ছে কিনা বোঝার উপায় নেই তবে দুজনেই ক্লান্ত। হয়তো এত পরিশ্রমের পর সফল হতে পেরে শান্তিতে দুদন্ড নিঃশ্বাস ফেলছে।

ইরফান অনেকটা সময় পর নীহারিকার দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল
—” আমার শরীরটা এমন লাগছে কেনো নীহা? মনে হচ্ছে যেকোনো মুহুর্তে জ্ঞান হারাবো।”

নীহারিকা চোখ না খুলেই জবাব দিল,
—” মাঝেমাঝে শরীরে জ্বিন ভর করতো আপনার। একটা অস্থায়ী বাসা বানিয়ে নিয়েছিল তারা। ওইসব আজেবাজে জিনিস থেকে মুক্তি মিলেছে বলেই এখন শরীর হালকা ও দুর্বল লাগছে। আজ রাতের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তার কারন নেই।”

ইরফান অবাক হলো না। তবে অনুভূতিশূন্য দৃষ্টিতে শ্বাস ফেলতে ফেলতে তাকিয়ে দেখলো নীহারিকা কে। মেয়েটা কি অদ্ভুত তাইনা। হুট করে তার জীবনে এসে হুট করেই আপন হয়ে গেলো। হুট করেই নিজের করে নিয়ে সবকিছু সমাধান করে দিল। ইরফানের চোখ সরলো না নীহারিকার থেকে। সে দেখলো নীহারিকা ঘেমে গেছে। তার গলা, ঘাড় থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। ইরফান এক চুলও দৃষ্টি না সরিয়ে নিজের শার্টের হাতা দিয়েই আলগোছে সেই ঘাম মুছে দিল।

অপ্রত্যাশিত স্পর্শে নীহারিকা চোখ মেলে পাশ ফিরে তাকাল। চোখে কোনো অনুভূতি নেই। নেই কোনো উচ্চাকাঙ্খা। শুধু সম্মোহনী দৃষ্টিজোড়া অকারনেই আলগোছে মিলে গেলো। ইরফান কিছু বলতে চায়। মুখ দেখে বোঝা গেলো। কয়েক মুহুর্ত পর সেভাবেই চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেসও করে বসলো,
—” নীহা, একটা কথা ভেবে দেখলাম।”
—” কী?”
—” আমার এই কালো জীবনে তুমি না আসলে কী হতো আমার? আমি কি ম”রে যেতাম না? পুরো জীবনটাই বরবাদ হয়ে যেতো না? আমার মেয়েটার কী হতো?”

নীহারিকা কিছু বললো না। আবারো ভারি শ্বাস ফেলে কপালের ঘাম মুছে শুকনো ঢোক গিলে বলল,
—” প্রত্যেকটা মানুষই পৃথিবীতে আসে কোনো না কোনো উদ্দেশ্যে। একেক জনকে পাঠানো হয় একেক উদ্দেশ্য সফলের জন্য। হয়তোবা আমি আপনার বা আপনাদের জন্যই এসেছি। তাই আমার না থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ভাগ্যের লিখন মোছা সহজ না।”

ইরফান শুনলো কিনা বোঝা গেলো না। সে আবারো কাতর স্বরে জানতে চাইলো,
—” তুমি না থাকলে কী হতো আমার?”

নীহারিকা দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
—” আমি আসব বলেই এসব হয়েছে। আমার আসার কথা না থাকলে হয়তো এসবও ঘটতো না। জীবনের সব ঘটনাই একে অপরের সাথে জুড়ে থাকে। অনন্যা এসেছে বলে তামান্না মারা গেছে, তামান্না মারা গেছে বলে আমি এসেছি, আমি এসেছি বলে অনন্যার মত শয়তানকে শেষ করতে পেরেছি।”

ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সামনের সিট থেকে পানির বোতল টা নিয়ে নীহারিকার হাতে দিয়ে খেতে বলল। দ্বিমত পোষণ করল না নীহারিকা। ঢকঢক করে অর্ধেক পানি খেলো, বাকি অর্ধেক দিল ইরফানকে। ইরফানও তৃপ্তি ভরে পানির পিপাসা মেটালো। মনে হলো যেন জীবনটা ফিরে পেয়েছে। পানি খেতে গিয়ে ইরফানের চোখ গেল নিজের ডান হাতের দিকে। সাথে সাথে সে প্রশ্ন করলো,
—” নীহা তখন তুমি এই তাবিজটা আমায় পড়িয়ে দিয়েছিলে যে।”

নীহারিকা তাকালো। মাথা নেড়ে বলল,
—” হুম। ওটা খুলতে পারেন এখন।”

ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—” তুমি এটা আমায় দিয়েছিলে কেনো?”

নীহারিকা কিছুক্ষণ চুপ রইলো। অনেকটা সময় পর ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
—” আপনার বর্তমান ও ভবিষ্যত নিরাপত্তার জন্য। এই তাবিজ হাতে না থাকলে ওখানে যা যা ঘটেছে সেসবের প্রভাব আপনার উপরে পড়তো। নিশ্চিত করতে পারতাম না যে ভবিষ্যতে আবারো আপনার উপর জ্বিনের আঁছড় পড়বেনা। ওই জায়গাটা ভয়ানক, জাদু দ্বারা আচ্ছাদিত। সবকিছুতেই আঁচ ছিল। কিন্তু এটা থাকার কারনে এখন নিশ্চিন্ত থাকতে পারছি যে আপনি সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত, সাথে আপনার রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়রাও, বিশেষত ইনায়া এখন বিপদমুক্ত।”
বলেই নীহারিকা মুচকি হাসলো, যেন খুব খুশি সে। কিন্তু কুঁচকানো ভ্রুজোড়া আরো কুঁচকে গেলো ইরফানের।

ইরফান হাতের তাবিজটা খুলে নিয়ে ফট করে জিজ্ঞেস করল চিন্তিত সুরে,
—” তাহলে তুমি কেনো তাবিজটা নাওনি নীহা? তোমারও তো বিপদ হতে পারতো।”

নীহারিকা এবারে এমনভাবে তাকালো যেন সে এই প্রশ্নটাই এড়িয়ে যেতে চাইছিল। তবুও আমতা আমতা করে বলল,
—’ আমার দরকার ছিল না। আমার উপর পুরো বান মারতে পারেনি তো। তাই নিইনি।”

ইরফানের অসন্তুষ্ট মুখ দেখে এবারে একটু উচ্চস্বরে নীহারিকা বলল,
—” উফ আপনি আর জেরা করবেন না তো। আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। দ্রুত এখন ইনায়াকে ওখান থেকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে যাই চলুন। আপনি গিয়ে টানা ১০ ঘন্টা ঘুমোবেন, আর আমি মা কে সব খুলে বলব এবারে। চলুন দ্রুত।”
★★

প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে তামান্না রূপি অনন্যা যে বান্ধবীর বাড়িতে ঘুরতে যাওয়ার নাম করে কালো জাদু করার আস্তানায় যেত- তা বুঝতে বাকি রইলো না কারোর। আয়েশা বেগম সব কিছু শুনেই আঁতকে উঠেছেন। ইয়াহিয়া কবির তো অবাক হয়ে তাকিয়েই রয়েছেন নীহারিকার দিকে। এসব কী শুনতে হচ্ছে তাকে? তার বাড়িতে এত কিছু হয়ে যাচ্ছিল আর সে জানতোই না। আয়েশা বেগম সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেলেন তামান্নার জন্য। ইশ! বেচারি মেয়েটা অকারনেই কষ্ট পেয়ে চলে গেলো দুনিয়া ছেড়ে। নীহারিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” বাবা, মা। আপনারা আর চিন্তা করবেন না। এখন সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। আপনাদের ছেলে ও ইনায়া সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত। আর কখনোই এ বাড়িতে এমন খারাপ কিছু হবেনা ইনশাআল্লাহ। সব ঠিক করে দিয়েছি।”।

ইয়াহিয়া কবির মাথা দুলিয়ে বললেন,
—” কিন্তু মা, তুমি আমাদের আগে কেনো বলোনি এসব? কাওকে কিছু জানাওনি কেনো?”

নীহারিকা প্রশ্নটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ঘরের ভেতর হালকা নিস্তব্ধতা নেমে এলো। আয়েশা বেগমের চোখ ভেজা, ইয়াহিয়া কবিরের দৃষ্টি স্থির—উভয়েই অপেক্ষা করছে তার উত্তরের জন্য। নীহারিকা ধীরে নিঃশ্বাস নিল। তারপর মাথা নিচু করে শান্ত গলায় বলল,
—” কারণ, তখন বললে আপনারা বিশ্বাস করতেন না। আর আমার সাধ্যও ছিল না আপনাদের বিপদে ফেলার।”

কথাটা শুনে দুজনেই থমকে গেলেন। নীহারিকা আবার বলল,
—” এসব বিষয় হুট করে কাউকে বললে সেটা গল্পের মত শোনায়। ভয়ংকর গল্প। কিন্তু বাস্তব না।”
সে একবার ইরফানের দিকে তাকাল। ইরফান আসার পর থেকেই চুপচাপ সোফায় বসে আছে। তার চোখে এখনো ক্লান্তির ছাপ।

নীহারিকা ধীরে ধীরে বলল,
—” আর শুধু বিশ্বাসের বিষয় না, সময়েরও একটা ব্যাপার ছিল।”

ইয়াহিয়া কবির ভ্রু কুঁচকে বললেন,
—” মানে?”

নীহারিকা এবার একটু গম্ভীর হলো।
—” অনন্যা, মানে জেনু অনেক আগেই সবকিছু প্ল্যান করে রেখেছিল। ও জানতো কাকে কখন আঘাত করতে হবে। আমি যে খুব একটা সহজসরল মেয়ে না, তা বোঝার সাথে সাথে ও ভয়ে আমাকেও.. যাইহোক, এর উপর যদি আমি আগে কিছু বলতাম, ও সতর্ক হয়ে যেত।”

আয়েশা বেগম কাঁপা গলায় বললেন,
—” তখন কী হতো?”

—” হয়তো আমরা কেউই বাঁচতাম না।”
ঘরের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা। কথাটা যেন দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো। ইরফানের বুক ধক করে উঠল। নীহারিকা এবার ধীরে বলল,
—” আমি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম। পুরো বিষয়টা বুঝতে, ওর শক্তি কতদূর, ও কী চায়, সব।”

মেয়েটা একটু হাসল মৃদু করে।
—” আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। সত্যি বলতে তামান্নারূপী অনন্যাকে প্রথম দেখাতেই আমার সাধারন মনে হয়নি। সেও বুঝেছিল, আমি সন্দেহ করছি। তাই তাড়াহুড়ো করে এত কিছু! আর আমি সেই সময়টারই অপেক্ষা করছিলাম।”

ইয়াহিয়া কবির ধীরে বললেন,
—” কোন সময়?”

নীহারিকা এবার সরাসরি তাকাল তার চোখে।
—” যেদিন ও নিজের শক্তির চূড়ায় যাবে। কারণ তখনই ও সবচেয়ে দুর্বল হয়।”

আয়েশা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
—” এটা আবার কেমন কথা?”

নীহারিকা ব্যাখ্যা করল,
—” কালো জাদুর একটা নিয়ম আছে। যখন কেউ চূড়ান্ত আচার করতে যায়, তখন তার সমস্ত শক্তি এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকে। তখন তাকে আঘাত করলে, একবারেই শেষ করা যায়।”

ইরফান ধীরে মাথা তুলল। বলল,
—” তাই তুমি অপেক্ষা করছিলে, আর ইচ্ছে করে সেই সময়টাতে ওর আস্তানায় গেলে।”

নীহারিকা হালকা মাথা নেড়ে বলল,
—” হ্যাঁ।”
তার চোখে তখন ক্লান্তির ছাপ।
—” একটু দেরি হলে সব শেষ হয়ে যেত।”

আয়েশা বেগম হঠাৎ এগিয়ে এসে নীহারিকার হাত ধরে ফেললেন। তার চোখ ভেজা।
—” মা রে, তুমি একা এত কিছু সামলালে?”

নীহারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু হাসল।
—” একা না। আল্লাহ আছেন তো। আর…
নীহারিকা ইরফানের দিকে তাকালো,
—” আপনার ছেলেও তো ছিল। সে বিপদে না পড়লে আমি নিজেও জানতাম না যে আমি এতটা সাহসী।”

ইয়াহিয়া কবির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার কণ্ঠে আবেগ ঝরে পড়ল,
—” তোমার আর ইরফানের বিয়ের উদ্দেশ্য ছিল এক, হলো আরেক। তবে যা হয় ভালোর জন্যই হয় যা দেখছি। তুমি আমাদের কত বড় বিপদ থেকে বাঁচালে মা, আমরা বুঝতেও পারিনি।”

নীহারিকা মাথা নিচু করল।
—” আমি যা করার দায়িত্ব ছিল, তাই করেছি বাবা। সংসারটা আমারো।”

ইরফান এবার ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ স্থির নীহারিকার উপর। সে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,
—” আমি বিশ্রাম নিতে যাচ্ছি।”
আর এক মুহুর্তও না দাঁড়িয়ে ইরফান চলে গেলো ঘরের দিকে। ইনায়াকে ওরা আগেই ঘুম পারিয়ে রেখেছে তার দাদির ঘরে।

ঘরের বাতাসটা যেন হালকা হয়ে গেল। কিন্তু সেই শান্তির মাঝেও, নীহারিকার চোখে এক ঝলক অদ্ভুত ক্লান্তি আর অদেখা রহস্য রয়ে গেল। যেন সব শেষ হলেও, তার ভেতরে এখনো কিছু না বলা গল্প বাকি আছে। ইয়াহিয়া কবিরও উঠে দাঁড়ালেন। নীহারিকার মাথায় হাত রেখে বললেন,
—” তুমি আমাদের পরিবার, আমাদের জীবনে আলো ফিরিয়ে দিয়েছো বউমা। আমি বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, তুমি এ বাড়ির জন্য একটা জ্বলন্ত শিখা, যা সব অশুভ আঁধারকে নিঃশেষ করতে সক্ষম। তোমাকে এ বাড়ির বউ করে এনে জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি।”

ইয়াহিয়া কবির প্রস্থান নিলেন বসার ঘর থেকে। আয়েশা বেগম ভীষণ আবেগপ্রবণ মানুষ। তিনি এগিয়ে এসে রীতিমতো নীহারিকা কে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন,
—” একটাই অনুরোধ থাকবে মা। এভাবেই আগলে রেখো এই সংসার টাকে। আমি আর বাঁচবোই বা কদিন? আমার ছেলে আর নাতনিটা কিন্তু তোমার ভরসায় থাকবে। এভাবেই থেকো সারাজীবন। কখনো ছেড়ে যেও না! “

নীহারিকা হেসে বলল,
—” আপনার ছেলে আমার স্বামী, আর আপনার নাতনি আমার মেয়ে। আমার জীবন তো তাদের জন্যেই মা।”

একটু সময় নিলেন আয়েশা বেগম। এবারে একটু কাছে এসে ফিসফিসিয়ে আড়াল করে সতর্কতার সুরে বললেন,
—’ নীহারিকা… মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি।”

নীহারিকা তটস্থ হলো,
—” জ্বি মা বলুন।”

ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করলেন ভদ্রমহিলা,
—” দেখো, আমি তো তোমার মা-য়ের মতই তাইনা। তাই জড়তা করলাম না। সরাসরিই জিজ্ঞেস করি। ইরফান কি তোমায়…মানে তোমাদের কি সম্পর্ক স্বাভাবিক নেই?”

নীহারিকা চমকাল এমন কথা শুনে। ভদ্রমহিলা কীসের ইঙ্গিত দিয়েছেন বুঝে বলল,
—” জ্বি আছে তো মা। সব ঠিক আছে! “

ভ্রু কুঁচকে তাকালেন আয়েশা বেগম,
—” বাচ্চা নিবে কবে তাহলে? তাড়াতাড়ি নাও।”

নীহারিকা যেন মুহূর্তের জন্য জমে গেল। আয়েশা বেগমের কথাটা খুব স্বাভাবিক, খুব সাধারণ। কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও যেন ধাক্কা দিল। সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল। ঠোঁট নড়ল, কিন্তু শব্দ বের হতে একটু সময় নিল।
—” মা… আমি… আমি বাচ্চা নিতে চাই না।”
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশটা যেন হঠাৎ থমকে গেল। আয়েশা বেগম একদম স্তব্ধ। তার চোখ বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে।
—” কী? কী বললে? বাচ্চা নিবে না মানে? কেনো মা? এ কেমন কথা! সংসার তো তখনই পূর্ণ হয়, যখন নিজের একটা সন্তান আসে।”

নীহারিকা এবার মাথা তুলল। চোখ দুটো ভিজে উঠেছে, কিন্তু সে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছে। সে মুচকি হেসে বলল,
—” সংসার পূর্ণ হওয়ার জন্য নিজের সন্তান দরকার হয়—এই কথাটা সবাই বলে মা। ঠিকই বলে। কিন্তু আমার কাছে সংসার তো আগেই পূর্ণ।”

আয়েশা বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,
—” কিভাবে?”

নীহারিকা একটু এগিয়ে এলো। কণ্ঠটা নরম, কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা৷ বলল,
—” ইনায়া আছে না মা।”
এই এক কথায় যেন সবকিছু থেমে গেল।
—” আমারই তো সন্তান ও।”
কথাটা শেষ করতে গিয়ে গলা কেঁপে উঠল নীহারিকার।
—” আমার কাছে ও-ই আমার মেয়ে।”

আয়েশা বেগম চুপ রইলেন অনেকক্ষন। তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন নীহারিকার অভিব্যক্তি। তাই নিজেই নীহারিকা ধীরে ধীরে বলতে লাগল,
—” আপনি ভাবছেন আমি হয়তো নিজের সন্তান চাই না বলে ভুল করছি। কিন্তু মা, আমি ভয় পাচ্ছি।”
—” কিসের ভয়?”
—” যদি আমার নিজের সন্তান আসে, আমি কি পারবো দুজনকে সমানভাবে ভালোবাসতে? মানুষ তো মানুষই মা। কখনো না কখনো নিজের সন্তানের দিকে একটু বেশি টান চলে আসতে পারে।”

চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পড়তে লাগল মেয়েটার। তবুও বলল,
—” আর সেই এক ফোঁটা কম ভালোবাসা যদি ইনায়ার ভাগে পড়ে ? ও তো আগেই মা-হারা। আমি কি ওর সেই অভাবটা আবার নতুন করে বাড়াতে পারি?”

আয়েশা বেগমের মুখের অভিব্যক্তি ধীরে ধীরে বদলাতে লাগল। নীহারিকা আরও কাছে গিয়ে তার হাত ধরল।
—” আমি ওকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি মা। যদিও মুখে বলিনি কখনো, কিন্তু মন থেকে দিয়েছি। ওর জীবনে আর কোনো অভাব থাকতে দেবো না। আমি ওর মা হবো, পুরোপুরি। বিশ্বাস করুন, আমি মন থেকে ওকে নিজের সন্তানই মনে করছি, ইনশাআল্লাহ করব।”

নীহারিকার কণ্ঠে এবার একরাশ কষ্ট মিশে গেল। সে বলল,
—” আমি চাই না ও কখনো অনুভব করুক যে সে কারো জায়গা ভাগ করে নিচ্ছে। আমি চাই ও জানুক—সে-ই আমার সব। আমি চাই, ও জানুক, আমিই ওর মা।”

কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। কিন্তু যেন অনেকটা সময় কেটে গেল। হঠাৎ আয়েশা বেগম গভীর শ্বাস ফেললেন। তার চোখেও পানি জমেছে। ধীরে ধীরে তিনি নীহারিকার মুখে হাত রাখলেন।
—” মা রে, তুই এতটা ভেবে রেখেছিস?”

নীহারিকা মাথা নুইয়ে ফেলল। আয়েশা বেগম তাকে বুকে টেনে নিলেন এবার। আগের থেকে আরও শক্ত করে। হুট করে চোখে পানি নিয়েই ফিক করে হেসে বললেন,
—” গতকাল পাশের বাড়ির ভাবি বলছিল, দেখবেন ভাবি সময়ের সাথে সাথে আপনার নাতনি ঠিকই সৎ মায়ের খেলা দেখতে পাবে। তখন কেমন করে যে বুকটা ধ্বক করে উঠেছিল রে নীহা, তা তোকে আমি বোঝাতে পারবনা। অথচ এদিকে আমার বউমা নিজের সুখটাই ছেড়ে দিচ্ছে আমার নাতনির জন্য।”

নীহারিকা হেসে বলল,
—” সুখ তো ওর মাঝেই মা। ছেড়ে তো দেব না। “

নীহারিকা কথাটা শুনে মৃদু হেসে ফেলল, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সে খেয়াল করল আয়েশা বেগম আর আগের মতো ‘তুমি” মিলিয়ে কথা বলছেন না। একেবারে আপন করে, নিজের মেয়ের মতো করে ‘তুই’ বলছেন, আর ‘নীহারিকা’ না, ছোট করে ‘নীহা’ ডেকে উঠছেন।
এই ছোট্ট পরিবর্তনটাই যেন নীহারিকার ভেতরটা নরম করে দিল। কী অদ্ভুত! একটা শব্দের বদলেই মানুষ কতটা কাছে চলে আসে! তার বুকের ভেতরটা হালকা হয়ে গেল। মনে হলো, এ বাড়িটা এখন আর শুধু দায়িত্ব না, সত্যিই নিজের। চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু লুকাতে মুখটা একটু ঘুরিয়ে নিল সে। মনে মনে ধীরে বলল— এভাবেই যদি সারাজীবন থাকে, তাহলে আমার আর কিছুই চাই না।

আয়েশা বেগম তখনও তাকে জড়িয়ে ধরে আছেন। সেই উষ্ণতায় নীহারিকার বহুদিনের এক শূন্যতা যেন ধীরে ধীরে ভরে উঠছে। সে আলতো করে বলল,
—” মা।”
এই একটা শব্দেই কেমন কেঁপে উঠলেন আয়েশা বেগম। নীহারিকা এবার একটু দূরে সরে তার দিকে তাকাল। চোখে মায়া, ঠোঁটে নরম হাসি।
—” আপনি না…তুই করে আর নীহা বলে ডাকলে ভালো লাগে আমার। মনে হয়, সত্যিই আপনার মেয়ে হয়ে গেছি।”

আয়েশা বেগম চোখ মুছে হেসে ফেললেন,
—” পাগলি মেয়ে একটা, তুই তো অনেক আগেই আমার মেয়ে হয়ে গেছিস। শুধু বলাটা বাকি ছিল।”

নীহারিকার বুকের ভেতরটা কেমন হালকা হয়ে গেল।
সে ধীরে আয়েশা বেগমের হাতটা নিজের হাতে চেপে ধরল। আয়েশা বেগম তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটার চোখে যে জেদটা দেখছেন, সেটা সাধারণ না। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই, নীহারিকার চোখের গভীরে এক ঝলক ছায়া খেলে গেল। খুব দ্রুত, কিন্তু স্পষ্ট। যেন সে কিছু জানে, কিছু এমন, যা এখনো কেউ জানে না।

আয়েশা বেগম কাঁপা গলায় বললেন,
—” আল্লাহ তোকে অনেক বড় মনের বানিয়েছে নীহা। আমি গর্ব করি তোকে নিয়ে।”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply