Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ২১


নবরূপা

পর্ব_২১

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

( সত্য উদ্ঘাটন – শেষ🔥)
গাড়ির কাছে এসে নীহারিকা দেখল ইরফান ঠিক আগের মতোই হেলান দিয়ে বসে আছে। চোখ বন্ধ। শ্বাস ধীর। নীহারিকা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।ড্রাইভিং সিটে বসে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল সে। আজকের দিনটা যেন এক মাসের সমান দীর্ঘ। ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই রাতের নীরব রাস্তা সামনে খুলে গেল। গাড়ি ধীরে ধীরে এগোতে লাগল ফাঁকা রাস্তায়। রাস্তার লাইটগুলো একটার পর একটা পেছনে পড়ে যাচ্ছে। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছে নীহারিকা। কিন্তু তার মাথার ভেতর তখন ঘুরছে অসংখ্য প্রশ্ন। হুজুরের কথা। তোমার স্বামীর প্রথম স্ত্রী দুর্ঘটনায় মারা যায়নি…তারপর ইয়াশার কথা মনে পড়ল। ব্রিজ। রাত একটা। গাড়ি নদীতে পড়ে যাওয়া। ইরফানের এলোমেলো অবস্থা। আর সবচেয়ে অদ্ভুত—ইরফান প্রথমে নাকি বলেছিল সে ড্রাইভ করছিল। পরে বলল তাহিয়া চালাচ্ছিল। নীহারিকার আঙুল স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে উঠল। গাড়ির ভেতর নিঃশব্দে সে নিজের সাথে কথা বলতে লাগল। তাহিয়া ড্রাইভ করছিল,গাড়ি ব্রিজে ধাক্কা খেল, গাড়ি নদীতে পড়ল, কিন্তু তাহিয়ার লাশ পাওয়া গেল ব্রিজের ধারেই। গাড়ি গেল নদীতে। আর ইরফান, বেঁচে গেল? নীহারিকার চোখ সরু হয়ে এলো। এটা কেমন দুর্ঘটনা? তার মাথায় আবার ভেসে উঠল ডায়েরির শেষ লাইনটা—তামান্না কে শেষ করতে হবে। গলা শুকিয়ে গেল তার। কেন এমন লিখবে ইরফান? আর যদি সত্যিই জাদু করা হয়ে থাকে তাহলে সেই সময়টাতে? তাহিয়ার মৃত্যুর সময়? গাড়ি একটা বাঁক নিল। রাস্তার আলো এসে পড়ল ইরফানের মুখে। নীহারিকা এক ঝলক তাকাল তার দিকে। লোকটা যেন শিশুর মতো নিস্তেজ হয়ে ঘুমাচ্ছে। এই মানুষটা কি সত্যিই খু”নি হতে পারে? তার বুকের ভেতর ব্যথা করে উঠল। সে ধীরে ফিসফিস করল,
—” না, উনি এমন করতে পারেন না।”
কিন্তু মনের আরেকটা কণ্ঠ বলল, তাহলে কে? তার মাথায় এবার একের পর এক ঘটনা জুড়ে যেতে লাগল। তাহিয়ার মৃত্যু।তারপর ইরফানের উপর জাদু। তারপর সেই ডায়েরির কথা। আর— তামান্না। তামান্নার নাম বারবার কেন আসছে? নীহারিকার শ্বাস ভারী হয়ে উঠল। হঠাৎই তার মনে পড়ল আরেকটা কথা। হুজুর বলেছিলেন, যে শুরু করেছিল, সে এখনও বেঁচে আছে। গাড়ির গতি একটু কমে গেল। নীহারিকার চোখে তখন অদ্ভুত এক হিসেব চলতে শুরু করেছে। যদি কেউ ইরফানকে ফাঁসাতে চায়? যদি কেউ তাহিয়ার মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বানিয়ে দেয়? আর তারপর, ধীরে ধীরে ইরফানকে পাগল বানাতে চায়? স্টিয়ারিংয়ের উপর তার আঙুল ধীরে টোকা দিতে লাগল। সে নিজেই নিজের মনে বলল, কার লাভ হবে এতে? একজন মানুষের। যে, ইরফানের খুব কাছে।
যে,এই বাড়ির ভেতরে আসা-যাওয়া করতে পারে। যে, সবকিছু জানে। নীহারিকার চোখে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল। তার ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল। এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো সে সব কিছু বুঝে ফেলেছে। কিন্তু সাথে সাথেই আবার মাথা নেড়ে ফেলল। না। এখনো নিশ্চিত না। প্রমাণ দরকার। সত্য দরকার। আজ রাতে এই সুতা বেঁধে ঘুমালে সব জানা যাবে।

গাড়ি ধীরে ধীরে তাদের বাড়ির গেটের সামনে এসে থামল। ইঞ্জিন বন্ধ করেও কয়েক সেকেন্ড বসে রইল নীহারিকা। তার চোখ এবার দৃঢ়। মনে মনে বলল,
” আজ রাতেই সত্য বের হবে। আর সেই সত্য হয়তো, এই ঘরের কারও জীবন পুরোপুরি বদলে দেবে।” নীহারিকা পাশে তাকালো। ইরফানের গালে হাত বুলিয়ে আলতো করে ডাক দিল। কিছুক্ষণ পর ইরফান এমনভাবে চোখ খুললো যেন চমকে গিয়েছে। এরপর নীহারিকার কথামত গাড়ি থেকে নেমে পড়লো।
★★

ইরফানের শরীর অস্বাভাবিভাবে প্রচুর ক্লান্ত। অবস্থা পরিলক্ষিত করে নীহারিকা তার জামাকাপড় বদলে দিয়ে ঘরে শুইয়ে দিয়ে এসেছে। দ্রুত আয়েশা বেগমের ঘরে এসে দাঁড়ালো নীহারিকা। আয়েশা বেগম শুয়ে শুয়ে ইনায়ার সাথে খেলছিলেন। নীহারিকা কে দেখে দ্রুত উঠে বসলেন,
—” কী হয়েছিল বউমা? হুট করে কোথায় গেছিলে দুজন? সব ঠিক আছে তো?”

নীহারিকা শুকনো ঢোক গিলে এগোতে এগোতে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—” কিচ্ছু ঠিক নেই আম্মা। কিছুই ঠিক নেই। তবে সব ঠিক করে নেব।”
বলেই ইনায়ার কাছে এসে বসে পড়লো নীহারিকা। হাতের মুঠোয় থাকা একটা তাবিজ ইনায়ার ডান হাতে বেঁধে দিতে দিতে বলল,
—” আমার একটা আবদার রাখবেন আম্মা?”

আয়েশা বেগম ভয়ে স্তব্ধ হয়ে রয়েছেন। নীহারিকার কথাবার্তা ঠিক লাগছে না তার কাছে। তাই গম্ভীর এবং ভয়ার্ত সুরেই বললেন,
—” বলো বউমা।”

নীহারিকা ঠোঁট আলতো করে কাঁমড়ে ভেবে বলল,
—” আজকের রাতটা ইনায়া আপনার সাথে ঘুমোক।”

আয়েশা বেগম সাথে সাথে মাথা নাড়লেন।
—” হ্যাঁ অবশ্যই। আমার নাতনি আমার কাছে বেশি ভালো থাকে। তাই না দাদুমণি?”
বলেই ইনায়াকে আদর করলেন আয়েশা বেগম। নীহারিকা অনুভূতিশূন্য দৃষ্টি ফেলে উঠে দাঁড়ালো। এরপর চলে যেতে চাইলে আয়েশা বেগম পিছন থেকে বলে উঠলেন আবারো,
—” কোথায় গিয়েছিলে বউমা? বললে না তো। কী হয়েছে?”
নীহারিকা থেমে গেল দরজার কাছে। ঘরের বাতাসে তখন অদ্ভুত নীরবতা। ইনায়া খিলখিল করে দাদীর আঙুল ধরে খেলছে, যেন পৃথিবীতে কোনো দুঃখ নেই। নীহারিকা ধীরে ঘুরে তাকাল। আয়েশা বেগমের চোখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা। নীহারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসলো আবার। তার চোখে তখন এক ধরনের ক্লান্ত স্থিরতা।
—” আম্মা…একটা প্রশ্ন করবো?”

আয়েশা বেগম একটু অবাক হলেন।
—”করো।”

নীহারিকা খুব শান্ত গলায় বলল,
—“তাহিয়া আপুর মৃত্যুর দিনটা…আপনারও কি মনে হয় ওটা শুধু দূর্ঘটনা ছিল?”
প্রশ্নটা শুনতেই আয়েশা বেগমের মুখের রং যেন এক মুহূর্তে ফিকে হয়ে গেল। তিনি একটু কেশে নিয়ে বললেন—
—” হ্যাঁ মা, ওটা তো দুর্ঘটনাই ছিল। সবাই তো জানে।”

নীহারিকা স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।
—” গত তিন বছরের মধ্যে কি এই পরিবারের কারো মৃত্যু হয়েছে মা? তাহিয়া ব্যাতিত আর কেও ছিল যার মৃত্যু টা স্বাভাবিক নয় “

আয়েশা বেগম এবার একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন।
—” তেমন কেও তো নেই।”

নীহারিকা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
—” একটু ভেবে বলুন আম্মা। “

কিছুক্ষণ চুপ রইলেন আয়েশা বেগম। তারপর বললেন,
—” তামান্নার বোন….
এই নামটা শুনে নীহারিকার চোখে ক্ষীণ একটা ঝলক খেলে গেল। অবাক হলো সে,
—” তামান্নার বোন? তামান্নার বোনও ছিল?’

আয়েশা বেগম মাথা নেড়ে বললেন,
—” হ্যাঁ বউমা। ওর জমজ বোন ছিল।”

নীহারিকা খুব ধীরে বলল,
—” কি আশ্চর্য! এই কথা আগে কেনো বলেন নি?”

আয়েশা বেগম একটু ভেবে বললেন,
—” সে তো অনেক দিন আগের কথা বউমা। আর তামান্নার বোন অসুস্থতায় মারা গিয়েছিল। হুট করে ঘটে যাওয়া মৃত্যুতে সবাই অনেক অবাক হয়েছিল। কিন্তু ও মারা গিয়েছিল বিদেশে। তাই আর এসব কেও মনেও রাখেনি। এমনকি তামান্নাও না। তারা দুইবোন অত ক্লোজ ছিল না। দেশে আসতো না সে।”

—” নাম কী তার?’

—”অনন্যা!”

নীহারিকা আর কিছু বলল না। তার চোখ তখন স্থির। মাথার ভেতর যেন হিসেবগুলো আবার নতুন করে সাজতে লাগল। বিড়বিড় করে বলল,
—” আপনাকে কে বলেছে আম্মা যে তামান্না মনে রাখেনি।”
আয়েশা বেগম কিছু বলার আগে সে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
—” ঠিক আছে আম্মা।”

আয়েশা বেগম উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
—” বউমা, তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছো। কী হয়েছে বলো তো?”
নীহারিকা দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
—” আজকে হয়তো কিছু জানতে পারবো আম্মা।”
—”কী?”
নীহারিকা তাকাল না। শুধু বলল,
—”সত্য।”
এরপর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। করিডোরে আলো ম্লান। ঘরের ভেতর ঢুকতেই সে দেখল ইরফান গভীর ঘুমে ডুবে আছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ। নীহারিকা দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করল। তারপর ধীরে বিছানার পাশে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল ইরফানের দিকে। এই মানুষটার জীবনে কত অন্ধকার ঢুকে গেছে, সে নিজেও জানত না। তার মুঠোয় তখনও শক্ত করে ধরা সেই সুতা। হুজুরের কথা আবার কানে ভেসে উঠল— ডান হাতের আঙুলে বেঁধে ঘুমিয়ে পড়বে… বাকিটা নিজেই জানতে পারবে।
নীহারিকা গভীর শ্বাস নিল। তারপর খুব আস্তে ইরফানের ডান হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল। ঘুমন্ত অবস্থাতেও লোকটার হাত কেমন উষ্ণ। সে নিজের ডান হাত এগিয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে সুতাটা দুইজনের আঙুলের চারপাশে পেঁচাতে লাগল।একবার…দুইবার…শেষে শক্ত করে গিঁট দিল। এক মুহূর্ত চুপ করে বসে রইল। তার বুক ধুকপুক করছে দ্রুত। আজ রাতে সে কী দেখতে চলেছে? কোন সত্য?
তাহিয়ার মৃত্যুর?নাকি… আরও ভয়ানক কিছু? অনন্যার সাথে কি এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে? নীহারিকা ধীরে ইরফানের পাশে শুয়ে পড়ল। ঘরের বাতি নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে। সে চোখ বন্ধ করল।
আর মনের ভেতর শেষবারের মতো দোয়া করল—
আল্লাহ… আমাকে সত্য দেখান। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম নেমে এল ধীরে ধীরে। আর ঠিক তখনই— নীহারিকার মনে হলো যেন কেউ তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের গভীরে,একটা রাতের দিকে। একটা ব্রিজের দিকে।যেখানে—কেউ একজন মরতে যাচ্ছিল।
★★

রাতের গভীর অন্ধকার ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসছে। জানালার বাইরে আকাশের রঙ বদলাচ্ছে। কালচে নীল থেকে ধূসর, ধূসর থেকে ফ্যাকাশে আলো। ঠিক সেই সময় দূরের মসজিদ থেকে ভেসে এলো ফজরের আযান—আল্লাহু আকবার…আল্লাহু আকবার। শান্ত, গভীর সেই সুর যেন নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। ইরফানের চোখ হঠাৎ কেঁপে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে খুলে গেল। প্রথম কয়েক সেকেন্ড সে বুঝতেই পারলো না সে কোথায়। মাথা ভারী লাগছে। শরীর যেন কারও মার খেয়ে এসেছে। সে কপাল কুঁচকে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো যেন অনেক দূরের কোনো স্বপ্ন থেকে ফিরে এসেছে। ফজরের আযান তখনও ভেসে আসছে—
হাইয়া আলাস সালাহ। ইরফান গভীর শ্বাস নিল। ঠিক তখনই তার ডান হাত নড়তে গিয়ে থেমে গেল। কিছু একটা আটকে আছে। সে নিচে তাকাল। তার আঙুলের সাথে আরেকটা আঙুল শক্ত করে বাঁধা। একটা কালচে সুতা। ইরফান ভ্রু কুঁচকে পাশ ফিরে তাকাল। আর তখনই তার বুক ধক করে উঠল। নীহারিকা তার পাশে শুয়ে আছে। কিন্তু, কিছু একটা অদ্ভুত। মেয়েটা একদম নিথর। চোখ বন্ধ। মুখ ফ্যাকাশে। তার বুক ওঠানামাও যেন বোঝা যাচ্ছে না। ইরফান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ডাকল,
—”নীহা..?”
কোনো সাড়া নেই। সে একটু জোরে বলল,
—” নীহারিকা, উঠো।”
তবুও কোনো নড়াচড়া নেই। ইরফানের বুকের ভেতর অজানা ভয় চেপে বসল। সে তাড়াতাড়ি উঠে বসল। হাত দিয়ে নীহারিকার কাঁধ আলতো ঝাঁকাল।
—” নীহা, শুনছো? নামায পড়বেনা?’
নিস্তব্ধতা। কোনো সাড়া নেই। ইরফানের গলা শুকিয়ে গেল। সে এবার নীহারিকার মুখের কাছে ঝুঁকে এলো। মেয়েটার নিঃশ্বাস আছে, কিন্তু খুব ধীর। এমন নিথর যেন গভীর অজ্ঞান।
—” নীহারিকা!” এবার তার গলায় স্পষ্ট আতঙ্ক। সে দ্রুত সুতাটা খুলতে গেল। কিন্তু গিঁটটা এত শক্ত করে বাঁধ্ যে খুলতেই সময় লাগছে। তার হাত কাঁপছে।
—” কি হয়েছে তোমার?”
তার মনে হঠাৎ কাল রাতের কথা ভেসে উঠল। হুজুর। অদ্ভুত সব ঘটনা। জাদু। তার বুকের ভেতর ধকধক করতে লাগল। অবশেষে সে সুতাটা খুলে ফেলল। তারপর দুই হাত দিয়ে নীহারিকার মুখ ধরল। মেয়েটার গাল ঠান্ডা।
—” নীহা…চোখ খোলো…!”
কোনো সাড়া নেই। ফজরের আযান শেষ হয়ে গেছে। ঘরের ভেতর আবার নীরবতা। ঠিক তখন, নীহারিকার আঙুলটা হালকা কেঁপে উঠল। খুব সামান্য। ইরফান থমকে গেল। সে আবার ঝুঁকে এল। হঠাৎ নীহারিকার ঠোঁট কেঁপে উঠল। তারপর খুব মৃদু, প্রায় ফিসফিস করা একটা শব্দ বের হলো,
—” তাহিয়া মরেনি..মরেনি…
ইরফানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। সে শুকনো ঢোক গিলে আবারো নীহারিকাকে ঝাঁকালো,
—” ওঠো। নীহারিকা ওঠো!”
নীহারিকার চোখ এখনও বন্ধ। কিন্তু তার ভ্রু কুঁচকে আছে। মনে হচ্ছে ভয়ংকর কিছু দেখছে। তার ঠোঁট আবার নড়ল।
—”গাড়ি…থামাও..!”
ইরফানের বুক ধক করে উঠল। তার মনে হঠাৎ অজানা আতঙ্ক জেগে উঠল। কারণ, নীহারিকা ঠিক সেই রাতটার কথা বলছে। যে রাতটা, তাহিয়ার শেষ রাত ছিল।

ইরফানের স্থির দৃষ্টি নীহারিকাতেই নিবদ্ধ থাকাকালীন হুট করেই ধপ করে চোখজোড়া খুলে ফেলল নীহারিকা। যেন কেও জোরেসোরে ধাক্কা দিয়ে তাকে জাগ্রত করেছে। আঁতকে উঠে নীহারিকা দ্রুত উঠে বসলো। ইরফান আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে রইলো, কেননা নীহারিকার চোখদুটো মারাত্মক লাল, যেন একটু ছুঁলেই গলগল করে রক্ত পড়বে। ইরফান ভয়ে নীহারিকাকে আবারো ডাকলো,
—” কী হয়েছে নীহা? ঠিক আছো?’

নীহারিকা আবারো চমকে তাকালো ইরফানের দিকে। কিছুক্ষণ বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো, যেন সামনে থাকা মানুষটাকে ঠিক চিনতে পারছে না। তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। হঠাৎই তার মুখ বিকৃত হয়ে গেল। সে এক হাত দিয়ে পেট চেপে ধরল। গলা থেকে অদ্ভুত শব্দ বের হতেই নীহারিকার শরীর কুঁচকে গেলো। ইরফান সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এলো।
—’ কী হয়েছে নীহা?”
কিন্তু উত্তর দেওয়ার আগেই নীহারিকা হঠাৎ বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার মুখ ফ্যাকাশে। ঠোঁট কাঁপছে। ইরফানকে ধাক্কা দিয়ে সে প্রায় দৌড়ে ওয়াশরুমের দিকে ছুটল। ইরফানও পিছু পিছু গেল। ওয়াশরুমে ঢুকেই নীহারিকা বেসিনের সামনে ঝুঁকে পড়ল। পরের মুহূর্তেই তার শরীর কেঁপে উঠল। গলগল করে বমি করল নীহারিকা। তীব্র বমির শব্দ বের হলো তার গলা থেকে। ইরফান দ্রুত তার পেছনে এসে দাঁড়াল। নীহারিকার কাঁধে হাত রাখল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে জমে গেল। বেসিনের মধ্যে ছিটকে পড়া তরলটা অদ্ভুত গাঢ়। গাঢ় লাল। ইরফানের বুক ধক করে উঠল।

—” নীহা? রক্ত!”
নীহারিকার শরীর আবার কেঁপে উঠল। সে আবার বমি করল। এইবার আরও বেশি। বেসিনের সাদা সিরামিকের উপর ছড়িয়ে পড়ল লাল রঙ। ঘন। রক্তের মতো। নীহারিকা নিজেও থমকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। তার চোখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
—” রক্ত আসছে…
তার গলা শুকিয়ে গেছে। ইরফানের হাত কাঁপতে লাগল।
—” কী হয়েছে তোমার? রক্ত কেনো?”
সে দ্রুত কল ছেড়ে দিল। পানি পড়ে লাল তরলটা ধুয়ে যেতে লাগল ধীরে ধীরে। কিন্তু নীহারিকার শরীর আবার ঝাঁকুনি খেল। আরেকবার বমি করলে সে। এইবারও লাল রক্ত মিশ্রিত।

কিছুক্ষণ থমকে দেখার পর নীহারিকা নাক চেপে ধরলো। কোনো সাধারন রক্ত নয় এসব, এমন বিশ্রী গন্ধ কেনো পাচ্ছে সে? নীহারিকা ইরফানের দিকে তাকালো। আধো স্বরে বলল
—” আপনি কি গন্ধ পাচ্ছেন না?”

ইরফান কিছুক্ষণ নাক টেনে বলল
—” কই না তো। কীসের গন্ধ?’

—” এইতো একটা বিশ্রী গন্ধ আসছে। পাচ্ছেন না আপনি? আমার তো গন্ধেই বমি আসছে।”

ইরফান বারবার মাথা নেড়ে বলল,
—” না নীহারিকা, পাচ্ছি না আমি! কোনো গন্ধই পাচ্ছি না।”

নীহারিকা এবারে অনুভূতিশূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আয়নার দিকে তাকালো। কিছুসময় ভেবে ফিসফিস করে যন্ত্রের মত বলে উঠলো,
—” আমার উপরে কালো জাদু করা হচ্ছে ইরফান। কেও করছে। কেও শুরু করেছে।”

ইরফান প্রায় ভয় পেয়ে গেল।
—” কী উল্টো বাল্টা বলছো নীহারিকা! কী হচ্ছে এটা?”
সে তাড়াতাড়ি নীহারিকার পিঠে হাত বুলিয়ে দিল। নীহারিকা হাঁপাচ্ছে। তার চোখের লালভাব আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। সে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে থমকে গেল। চোখ দুটো রক্তিম। মুখ ফ্যাকাশে। ঠোঁট কাঁপছে। তার মাথার ভেতর যেন এখনও সেই দৃশ্য ঘুরছে যেগুলো এতক্ষণ সে দেখেছে। নীহারিকা হঠাৎ দুহাতে বেসিন শক্ত করে ধরল। তার কণ্ঠ কাঁপছে।

হুট করেই সে মাথা এক ঝটকায় ঘুরিয়ে ইরফানের বুকে সজোরে ধাক্কা মারলো। হঠাৎ করে হওয়াতে ইরফান অনেকটা পিছিয়ে গেলো। অবাক হয়ে তাকাতে না তাকাতেই নীহারিকা আবারো তাকে ধাক্কা দিলো। কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—” তামান্না কোথায় হ্যাঁ? কোথায় ও? ওকে আমার চাই ইরফান। ওকে আমার চাই। তাহিয়াকে ও খু”ন করেছে ইরফান। ইনায়ার মাকে তামান্না খু”ন করেছে। শুনতে পাচ্ছেন আপনি? কী বলছি শুনেছেন?”

ইরফান স্থির হয়ে গেল।
—” কখনোই না। তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে নীহা। তামান্না কেনো করবে?’

নীহারিকা ধীরে মাথা তুলল। তার চোখ এখনও অস্বাভাবিক লাল। বাঁকা হাসলো সে। এক ঝটকায় ইরফানের কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল
—” আমি নিজ চোখে দেখেছি। এই ছয় ঘন্টা আমি ঘুমোইনি ইরফান। অতীত দেখছিলাম এই ছ ঘন্টা ধরে। এমনি এমনি চোখ লাল হয়নি আমার। অন্য জগতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ওরা আমায়। “
একটু থেমে নীহারিকা আবারো বলল,
—”ডোন্ট টেল মি, আমি যা হিসেব করেছি তা-ই সঠিক। আপনি নিজেও জানতেন তামান্না আসল কালপ্রিট। তাইনা? বলুন! বলুন! জানতেন না? বলুন!”

ইরফান চোখমুখ ফ্যাকাসে হতে থাকলো। কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে কঠিন স্বরে বলল
—” বাজে কথা বলো না নীহা। তামান্না এসব করেনি। ওর কী হবে এতে? লাভ কী ওর? কিছুই না। শুধু শুধু ওকে ফাঁসানোর চেষ্টা কোরো না তুমি নীহা। আমার কথা শোনো!”

আরো বেশি গর্জে উঠলো নীহারিকা,
—” মিথ্যা বলবেন না মিস্টার ইরফান কবির। এতক্ষণ সার্কাস দেখে চোখ খুলিনি আমি। নিজের সন্তানের নাম করে সত্যি টা বলুন। তামান্না-ই এসব করেছে আপনি জানতেন তাইনা? ও-ই তো মেরেছে তাহিয়াকে!”

—” তামান্না কিছু করেনি।”
—” করেছে!”
—” না, ও ইনোসেন্ট।”
—” তাহলে কি আমি শয়তান?”
—” শাট আপ নীহারিকা! “
—” সত্যি টা বলুন, ইরফান কবির। আমি জানি আপনি সব জানেন।”
—” আমি শুধু এটুকু জানি তামান্না নির্দোষ।”
—” মিথ্যে।”
—” এটাই সত্যি!”

নীহারিকা এবারে নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
—” তামান্না-ই করেছে। ও-ই করেছে। ওই আসল শয়তান। আর এটাই সত্যি। “

এবারে ইরফান এক ঝটকায় নীহারিকা কে সরিয়ে তার বাহু খাঁমচে ধরে পাল্টা গর্জনে তার থেকেও বেশি চিৎকার দিয়ে বলে,
—” তামান্না কিচ্ছু করেনি। কারন তামান্না জীবিত নেই নীহারিকা। ও মৃ”ত। ও অনেক বছর আগেই মরে গেছে।”

তৎক্ষনাৎ যেন সময় থেমে গেল। ওয়াশরুমের কল থেকে টুপটাপ পানি পড়ছে। দুজনেই নিঃশ্বাস ফেলছে ভারীভাবে। কিন্তু শব্দটা যেন আর কানে ঢুকছে না। নীহারিকার চোখ স্থির হয়ে গেল। তার লালচে দৃষ্টি ধীরে ধীরে ইরফানের মুখে স্থির হলো—যেন সে বুঝতে চাইছে লোকটা মজা করছে নাকি পাগল হয়ে গেছে।
কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দুজন। তারপর খুব ধীরে নীহারিকা প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল,
—” কীহ? তাহলে তামান্না সেজে কে ঘুরছে? ও কে?”

ইরফান কিছু বলল না। নীহারিকার ঠোঁট থেকে আপনা-আপনি অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এলো- অনন্যা? সাথে সাথে নিজের মুখই চেপে আতঙ্কিত চোখে তাকালো নীহারিকা। চোখ বড় হলো নিমিষেই। ইরফান কোনো প্রতিক্রিয়া দিলো না। তার চোখে তখন ক্লান্তি আর আতঙ্ক মিশে আছে। শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করলো সে। নীহারিকার ঠোঁট শুকিয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
—” মিস্টার কবির, প্লিজ আমায় এখন বলবেন না, অনন্যা-ই জীবিত। তামান্না সেজে অনন্যা এ বাড়িতে রয়েছে এত বছর ধরে। প্লিজ আমাকে এখন এটা যেন শুনতে না হয়।”

ইরফান ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বলল,
—” তুমি জানো? তুমি…অনন্যার কথা শুনেছো? কে বলেছে তোমায়?”

নীহারিকা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল,
—” তাহলে, ও অনন্যা।”

ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে পড়লো মেঝেতে। কিছুক্ষণ পাথরের মত স্তব্ধ স্থির থেকে হুট করেই শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলো। নীহারিকা তখনও শুন্যে তাকিয়ে রয়েছে। সেও এবারে ধীরে ধীরে বসে পড়লো ইরফানের পাশে। ধীর গলায় থেমে থেমে বলতে শুরু করলো
—” আপনাকে অনন্যা পছন্দ করে। পাগলের মত ভালোবাসে আপনাকে। সবাই জানতো অনন্যা দেশে ফেরেনি ।অথচ সে ফিরেছিল। আপনার বিয়ের আগে এসেছিল এখানে। এক দেখাতেই আপনার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। ভয়ানক প্রেম, খুব মারাত্মক ভালোবাসা। দূর থেকে এতটাই ভালবেসে ফেলল যে এ বাড়িতে থাকার জন্য, আপনার কাছে থাকার জন্য তামান্না কে অফার করেছিল পরিচয় এক্সচেঞ্জ করতে। নাম বদল করে একে অপরের জায়গায় বাঁচতে। কিন্তু রাজি হয়নি তামান্না। ছোট থেকেই জাদুবিদ্যা চর্চা করতো অনন্যা। ইন্ডিয়ায় গিয়ে জাদুবিদ্যায় দক্ষ হয়েছিল সে। দিনে দিনে ভয়ানক রূপে পরিণত হয়েছিল অনন্যা। আর তামান্না সবকিছু জানতো। তাই আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছিল। রক্ষা করতে চেয়েছিল আপনাকে আর ইনায়াকে। আর ঠিক এই কারনে অনন্যা নিজের যমজ বোন তামান্নাকেই মে”রে ফেলল। নিজের রক্তের সাথে বেইমানি করে সরিয়ে দিল রাস্তা থেকে। খুব কৌশলে এ বাড়িতে ঢুকে পড়লো তামান্না সেজে।”

একটু থামলো নীহারিকা। কান্নারত অস্থির ইরফানের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ ও শীতল কন্ঠে বলল,
—” আপনি তখনও কিছু জানতেন না। এমন করে চলতে থাকলো। অনন্যা এ বাড়িতে তামান্নার মতই ভালো সেজে থাকতে শুরু করেছিল। যখন আপনার বিয়ে হয়, তখন শত চেষ্টা করেও আটকাতে পারেনি অনন্যা। তাই সিদ্ধান্ত নেয় তাহিয়াকে মেরে ফেলার। অতদিনে দেরি হয়ে গিয়েছিল। আপনার সন্তান হয়। কিন্তু তবুও আপনাকে কালোজাদু করে অনন্যা। নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয় এবং আপনার হাতেই আপনার স্ত্রীর প্রাণ কেড়ে নেয়। সেই রাতে আপনি প্রথমে তাহিয়ার গলা টি”পে হ”ত্যা করেছিলেন, এরপর গাড়ির ব্রেক ফেল করিয়ে নিজে ঝাঁপ দিয়েছিলেন আর তাহিয়ার লাশ উধাও! জাস্ট ভ্যানিশ! হুঁশ ফিরতেই আপনি সব ভুলে যান যে কী হয়েছে। কিন্তু পরে, এরপরে আপনি জানতে পারেন যে তামান্না আসলে নেই। ও তো মৃত! এ হলো অনন্যা। ভয়ে আপনি কিচ্ছু করতে পারেন নি। কারন আপনি এখনো অনন্যারই হাতের মুঠোয় বন্দি। আপনি কাওকে কিছু বললে অনন্যা ইনায়াকে শেষ করে দেবে- এই হুমকিতে নিজেকে রক্ষা করেছে। এখনো করছে।”

ইরফান আর কাঁদছে না। সে স্থির হয়ে বসে আছে মেঝেতে। মাথা নিচু। দুই কাঁধ কাঁপছে হালকা হালকা।
নীহারিকা নিঃশ্বাস ফেলল ধীরে। তার চোখের লাল আভা এখনো মিলিয়ে যায়নি। কিন্তু দৃষ্টি ভয়ংকর স্থির। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। তারপর খুব আস্তে, ইরফান মাথা তুলল। চোখদুটো রক্তাভ। তাতে আতঙ্ক আছে, ক্লান্তি আছে—আর আছে এমন এক স্বীকারোক্তির ভার, যা বহু বছর ধরে বুকের ভেতর পাথরের মত জমে ছিল। ফিসফিস স্বরে সে বলল,
—” আমাকে বাঁচাও নীহা। আমি বাঁচতে চাই।”

নীহারিকা হাসলো। শীতল কন্ঠে বলল,
—” তামান্না ওরফে অনন্যা গত রাতে আমার উপরেও বান মেরেছে। আমি খুব জঘন্য বিশ্রী ম”রা মানুষের গন্ধ পাচ্ছি ইরফান। ওয়াশরুমে আয়নায় নিজেকে না দেখে ম”রা মানুষের বি”কৃত চেহারা দেখতে পাচ্ছি। ও কিন্তু আমায় টার্গেট করেছে। ইতোমধ্যে কাজ শুরুও করেছে।”
ঠোঁট ভেজালো নীহারিকা,
—” আপনি কেনো বিয়ে করেছেন আমি জানি না। আপনি কেনো আমায় এই জঘন্য দুনিয়ায় জড়ালেন আমি জানি না। আমি শুধু এটুকু জানি, একবার যখন পা রেখেছি এখানে, এর শেষ দেখে ছাড়ব আমি। শিরক করে পাপ করে কতটা দুর যেতে পারে আমিও দেখব।”

ইরফান ফিসফিস করে বলল,
—” অনন্যা মানুষ না নীহা। ও একটা শয়তান। নিজের বোনকে মে”রে তার র”ক্ত খেয়েছে ও। তার শরীর জ্বিনদের কাছে বিক্রি করেছে। তাহিয়াও শরীরও….
বলতে বলতে কেঁদে ফেলল ইরফান,
—” ও তাহিয়াকে ব”লি দিয়েছে।”

নীহারিকা এবারে ঠোঁট কাঁমড়ে ভেবে বলল,
—” বেশি দেরি করলে ও আপনার মেয়েকেও ব”লি দেবে।”

ইরফান স্তব্ধ হয়ে তাকালো। চোখ দুটো হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল। মনে হলো কথাটা তার বুকের ঠিক মাঝখানে গিয়ে আঘাত করেছে।
—” না!” ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বলল সে।
—” না নীহা…ইনায়ার কিছু হবে না..আমার সন্তানকে বাঁচাতে হবে!”
কিন্তু নিজের কণ্ঠের ভেতরেই সে ভরসা পেল না।
নীহারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মাথা নিচু।
তার চোখে তখন এক অদ্ভুত হিসাব চলতে শুরু করেছে। যেন মাথার ভেতর খুব দ্রুত অনেকগুলো জিনিস সাজাচ্ছে সে। তারপর ধীরে ধীরে সে বলল,
—” আতঙ্কিত হবেন না। আতঙ্ক দেখলে ও আরও শক্তি পাবে।”
ইরফান বিস্মিত চোখে তাকাল।
—” এটা কতটা ভয়ানক আর জঘন্য খেলা, তুমি বুঝতে পারছো নীহা?’
কাঁপা গলায় বলল সে,
—” ও সব জানে। আমরা কী ভাবছি তাও বুঝে ফেলে। আমি বহুবার চেষ্টা করেছি পালাতে, কিন্তু পারিনি।”

নীহারিকা এবার সোজা হয়ে বসল। তার চোখের লালচে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
—” না। ও সব জানে না।”

ইরফান থমকে গেল। নীহারিকা ধীরে ধীরে বলল,
—” যদি জানতো, তাহলে গত রাতে আমাকে বান মারত না। সরাসরি মেরে ফেলত।”
ওয়াশরুমে আবার নীরবতা নেমে এলো। নীহারিকা ঠান্ডা মাথায় বলল,
—” তার মানে একটা ব্যাপার পরিষ্কার।”
—” কী?” ইরফানের গলা শুকিয়ে গেছে।
—” ও ভয় পাচ্ছে।”
ইরফান যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।
—” অনন্যা.. ভয় পায়?”
নীহারিকা মাথা নাড়ল।
—” অবশ্যই পায়।”
তারপর খুব ধীরে বলল,
—” অন্ধকার যতই শক্তিশালী হোক, আলোকে পুরোপুরি মেরে ফেলতে পারে না। তাই ও ভয় পাচ্ছে।”
ইরফান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। নীহারিকা এবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—” আর একটা জিনিস বুঝেছি।”
—” কী?”
—” ও এখনো ইনায়াকে মারে নি।”
ইরফানের বুক ধক করে উঠল। বলল
—” কারণ?”
নীহারিকা উত্তর দিল,
—” কারণ ইনায়া ওর শেষ তাস। আপনি যদি কখনো ওর বিরুদ্ধে যান, যদি পালানোর চেষ্টা করেন—তখনই ও ইনায়াকে ব্যবহার করবে।”

ইরফান মাথা চেপে ধরল।
—” তাহলে আমরা কী করব?”

নীহারিকা ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন ভয় নেই—বরং ঠান্ডা দৃঢ়তা।
—” ও আমাকে ভয় পায় ইরফান।’

ইরফান হতভম্ব হয়ে তাকাল।
—” মানেহ?”

নীহারিকা বলল,
—” অনন্যা আমায় ভয় পায়। ও এমনি এমনি এ বাড়ি থেকে যায়নি। আমি ওকে ধরে ফেলব বলে পালিয়ে গিয়ে নিজের আস্তানায় জাদু করতে বসেছে।’

সে হাত ধুয়ে আয়নার দিকে তাকাল। নিজের লালচে চোখের দিকে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তারপর বলল,
—” ব্যপার না। আমার মনে হয়, একটু সাহস রাখলে সব করতে পারব।”

ইরফান ধীরে বলল,
—” মানে?”

নীহারিকা ঘুরে দাঁড়াল।
—” মানে এখন থেকে আপনি আগের মতই আচরণ করবেন।”

—” কী?”

—” অনন্যার সামনে কিছুই বুঝতে দেবেন না। আপনি ভয় পাচ্ছেন—এটাও না।”

ইরফান অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল। নীহারিকা এবার ফিসফিস করে বলল,
—” আর আমি খুঁজে বের করব, ওর শক্তির উৎস কোথায়।”

ইরফান কাঁপা গলায় বলল,
—” তুমি পারবে?”

নীহারিকার ঠোঁটে খুব হালকা, অদ্ভুত একটা হাসি ফুটল।
—” ও যদি জ্বিনদের সাথে চুক্তি করে থাকে.. তাহলে কোথাও না কোথাও সেই চুক্তির প্রমাণ আছে।”
আরও নিচু স্বরে বলল,
—” কালোজাদু কখনো বিনা দামে কাজ করে না, ইরফান।”

ওয়াশরুমের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। ইরফান ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—” আর ইনায়া?”

নীহারিকার চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
—” ইনায়াকে আজ রাতের মধ্যেই এই বাড়ি থেকে সরাতে হবে।”

ইরফান স্তব্ধ।
—” কীভাবে?”

নীহারিকা একটু ভেবে বলল,
—” কীভাবে সেটা বড় কথা নয়। মোটা কথা সরাতে হবে। হয় ওকে দূরে কোথায় রেখে আসুন আর না হয় মাদরাসায় বা এতিমখানায় দিয়ে আসুন।”

ইরফানের বুক কেঁপে উঠলো। তার সন্তানকে এতিমখানায় রাখতে হবে? সে এটা সহ্য করবে কীভাবে? ইরফান কাতর কন্ঠে ডেকে উঠলো,
—” নীহা…

—” এছাড়া উপায় নেই। ইনায়াকে তো বাঁচাতে হবে নাাকি? ওটুুকু বাচ্চা মেয়ে সহ্য করতে পারবেনা কিন্তু।”

ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলে জড়িয়ে ধরলো নীহারিকা কে। নীহারিকাও পাল্টা জড়িয়ে ধরতেই তার চোখ গিয়ে পড়লো তাদের বিছানায়। চোখ বড় হলো নীহারিকার। কারন বিছানাতে সে মরা শুকরের মাথা দেখতে পাচ্ছে। রক্তাক্ত হচ্ছে তার চোখ। সবই ভ্রম জানে সে। তাই দ্রুত চোখ খিঁচে বন্ধ করলো নীহারিকা। ফিসফিস করে বলল,
—” আমি পুরোপুরি ওদের কবলে যাওয়ার পূর্বেই সব করতে হবে ইরফান। এই মুহুর্তে হুজুরের কাছে চলুন।”

চলবে…

🙂 গাইস, আমি পরবর্তী পর্ব দুদিন পরে দিব। কারন আমি আজ থেকে বাসায় একায় থাকব। আর একা থেকে এসব লেখা সম্ভব না। পরবর্তী পর্ব আরো ডার্ক ও ভয়ানক হবে। তাই আমায় সময় দিন🔥

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply