Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ২০


নবরূপা

পর্ব_২০

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

( সত্য উদ্ঘাটন -১🔥)
মাটির উঠানটা সন্ধ্যার আলোয় আরও অদ্ভুত লাগছে। আকাশে লাল আভা ছড়িয়েছে, মাগরিবের আজান শেষ হয়েছে একটু আগে। হালকা বাতাসে শুকনো পাতা সরে সরে শব্দ করছে। নীহারিকা ইরফানের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। লোকটা এখনও অর্ধেক অবিশ্বাসে, অর্ধেক বিরক্তিতে। নীহারিকার কথা শুনে তার রীতিমতো বিরক্তই লেগেছে। এসব উদ্ভট কথাবার্তা কেনো সত্যি হবে? গত আট মাস ধরে তার সাথে যা ঘটছে, তা নীহারিকা কীভাবে জানলো? শুধু ওই ডায়েরীর মাধ্যমেই? ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে সামনে স্তব্ধ অদ্ভুত ভঙ্গিতে থাকা মাটির বাড়িটির দিকে। শেষ বারের মত নিচু গলায় বলল,
—” তুমি কোথায় এনেছো আমাকে নীহা?”

নীহারিকা ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
—” তান্ত্রিক বা সাধক বললে ভুল হবে, বাইরের পৃথিবীর কাছে একজন সাধারন মসজিদের মৌলবি, হুজুর। উনি অনেকের সাহায্য করেছেন। এ পর্যন্ত অনেকের শরীর থেকেই এসব নামিয়েছেন।”

ইরফান বিরক্ত হয়ে নিচু গলায় বলল,
—” আমি এসব বিশ্বাস করি না!”

নীহারিকা শান্ত গলায় পাল্টা জবাব দিলো, তবে এবারে একটু আবেগি ভঙ্গিতে,
—” আমাকে একটু বিশ্বাস করুন। আর তাছাড়া জ্বিন, কালো জাদু – এসবে বিশ্বাস তো করতেই হবে মিস্টার কবির। এগুলো তো মিথ্যে না।”

ইরফান কিছু একটা বলতে চাইলো ঠিক তখনই সেই বোরখা পরা মহিলা এসে বলেল,
—” হুজুর অপেক্ষা করছেন।”

নীহারিকা ইরফানের হাত ধরে এগোতে চাইলে ইরফান শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁত চেপে শক্ত কন্ঠে বলে,
—” নীহা আমার ভালো লাগছে না। এগুলো কী শুরু করেছো তুমি?”

নীহারিকা এবারে আর কোনো কথাই শুনলো না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে রীতিমতো জোরপূর্বক ইরফানের বাহু টেনে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ঘরটার ভেতরে ঢুকতেই আগের সেই গন্ধ আবার নাকে লাগলো। ধূপ, আতর, শুকনো ভেষজ আর পুরনো কাঠের মিশ্র গন্ধ। কিন্তু এখন ঘরের পরিবেশ আগের চেয়েও ভারী। মাটির মেঝেতে গোল করে সাদা চুনের দাগ টানা। মাঝখানে পিতলের বড় বাটি। পানির ভেতরে কালো কিছু গুঁড়ো মিশে আছে। চারপাশে কয়েকটা তেলের প্রদীপ জ্বলছে। বৃদ্ধ হুজুর তক্তপোশে বসে ছিলেন আগের মতোই। তার হাতে তসবি। ইরফান ঢুকতেই তিনি মাথা তুললেন। দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর খুব ধীরে বললেন,
—” দীর্ঘদিন ধরে তোমাকে ধরে রেখেছে।”

ইরফানের কেনো যেন এখানে ঢোকার সাথে সাথে অস্বস্তিবোধ শুরু হলো। তবুও ভ্রু কুঁচকে বলল,
—”আপনি কী বলতে চাইছেন?”

হুজুর শান্ত গলায় বললেন,
—”বসে পড়ো।”

ইরফান দ্বিধা করলেও নীহারিকা চোখ গরম করে তাকালে শেষ পর্যন্ত বসে পড়লো চুনের গোল বৃত্তের মাঝখানে। নীহারিকাকে ইশারা করে হুজুর বললেন,
—” তুমি বাইরে বসো আম্মাজান। দোয়া পড়তে থাকো। আল্লাহর যিকির করতে থাকো। ভেতরে যা হবে, তার সময় কেউ যেন ব্যাঘাত না ঘটায়।”

নীহারিকার বুক কেঁপে উঠলো। একবার ইরফানের দিকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালে নীহারিকা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো ইরফানের চোখের মণি বড় হয়ে আসছে। কিন্তু কেমন যেন অদ্ভুত আবেশে, অদ্ভুত কামনায় তাকিয়ে রয়েছে নীহারিকার দিকে। নীহারিকার মনে হলো ইরফানের চোখদুটো বলছে- আমি এখানে থাকব না, নিয়ে যাও আমায়। কিন্তু তার থেকেও অদ্ভুত বিষয় এই চোখ ইরফানের মনে হচ্ছে না। নীহারিকা শুকনো ঢোক গিলে আর কিছু বলতে পারলো না। দ্রুত বাইরে এসে বারান্দার মাটিতে বসে পড়লো। হাত দুটো মুঠো করে চোখ বন্ধ করলো। তার ঠোঁটে ফিসফিস করে দোয়া পড়তে থাকলো। কখনো কল্পনাতেও আনতে পারেনি তাকে আজকে এ পর্যায়েও এসে দাঁড়াতে হবে।

নীহারিকা সেই সময় ইনায়াকে নিয়ে জ্যোতির বাড়িতে গিয়েছিল। সেখানে সব কিছু শেয়ার করার পর জ্যোতি তাকে এই হুজুরের ঠিকানা দেয় আর যত দ্রুত সম্ভব যোগাযোগ করতে বলে। গ্রামে থাকা জ্যোতির ফুফুরও একই দশা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জ্যোতি নীহারিকা কে বিষয়টা ধরিয়ে দেয়, নাহলে তার মাথায় কখনো এটা আসতো না যে তার স্বামীকে কেও কালো জাদু করেছে। কি সাংঘাতিক অবস্থা! নীহারিকা বিড়বিড় করে বলল,
—” আল্লাহ…আপনি ওকে রক্ষা করুন…!”

ভেতরের ঘরে তখন প্রদীপের আলো দুলছে। হুজুর পিতলের বাটিতে হাত ডুবিয়ে কিছু পানি তুলে ইরফানের কপালে ছিটালেন। তারপর খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট সুরে আয়াত পড়তে শুরু করলেন। শব্দগুলো ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। ইরফান প্রথমে বিরক্ত মুখে বসেছিল। সময়ের সাথে সাথে বিরক্তি রাগে পরিণত হলো। শ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার শরীর কেমন অস্বস্তিতে কেঁপে উঠলো। তার কপালে ঘাম জমতে লাগলো।
—” গরম লাগছে!” ইরফান ফিসফিস করে বলল। হুজুর পড়া থামালেন না। বরং তসবির পুঁতি দ্রুত ঘোরাতে লাগলেন। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে যেন। হঠাৎ ইরফান কুঁকড়ে উঠলো। চিৎকার দিয়ে তার মাথা দুহাতে চেপে ধরলো। চোখ দুটো সম্পূর্ণ লাল হয়ে উঠছে। চোখের মণি পুরো চোখকে গ্রাস করেছে। হুজুর এবার সামনে রাখা ছোট্ট কাঁচের শিশি খুললেন। তার ভেতরের কালচে তেল আঙুলে নিয়ে ইরফানের কপাল ও বুকের মাঝখানে ছুঁইয়ে দিলেন। তারপর শক্ত কণ্ঠে পড়তে লাগলেন কিছু আয়াত। শব্দগুলো এবার আরও তীব্র। ঘরের প্রদীপগুলো কেঁপে উঠলো হালকা। ইরফান হঠাৎ গর্জে উঠলো, চেঁচিয়ে বলল,
—” থামুন। থামুন।”
কণ্ঠটা যেন তার নিজের না। হুজুর চোখ বন্ধ রেখেই বললেন,
—” বের হয়ে যা। এটা তোর জায়গা না।”
ইরফানের শরীর কাঁপছে। সে যেন শ্বাস নিতে পারছে না। তার গলা দিয়ে অদ্ভুত কর্কশ শব্দ বের হচ্ছে। হুজুর এবার পানির বাটি থেকে একমুঠো পানি তুলে তার মুখে ছিটালেন।
—” আল্লাহর নামে আদেশ দিচ্ছি, ছাড় একে। কী চাস তুই? কে পাঠিয়েছে তোকে? কোন সাধকের হয়ে এসেছিস?”

এক মুহূর্ত নীরবতা। কয়েক মুহুর্ত পেরোনোর পর হঠাৎ ইরফান পুরো শরীর নিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়লো। মাটিতে হাত ঠেকিয়ে হাঁপাতে লাগলো। ঘরের বাতাস যেন হালকা হয়ে গেল ধীরে ধীরে। হুজুর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি আবার কিছু আয়াত পড়ে পানিতে ফুঁ দিলেন। সেই পানি ইরফানের মাথায় ঢেলে দিলেন। ইরফান এবার নিস্তেজ হয়ে বসে রইলো। চোখ বন্ধ। শ্বাস ধীর। বাইরে বসে থাকা নীহারিকার তখন মনে হচ্ছে প্রতিটা সেকেন্ড ঘণ্টার মতো দীর্ঘ।ভেতর থেকে ভেসে আসা শব্দে তার বুক কেঁপে উঠছিল বারবার। কখনো ইরফানের গলা, কখনো হুজুরের তীব্র তিলাওয়াত। তার হাত কাঁপছিল দোয়া পড়তে পড়তে।
তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। হঠাৎ ভেতরের শব্দ থেমে গেল।

পুরো জায়গা নিস্তব্ধ। নীহারিকার বুক ধক করে উঠলো। ঠিক তখনই টিনের দরজাটা ধীরে খুলে গেল। বোরখা পরা মহিলা দাঁড়িয়ে বললেন,
—” ভেতরে যান।”
নীহারিকা কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘরের ভেতরে ঢুকতেই সে দেখলো, ইরফান মাটিতে বসে আছে। মাথা নিচু। কিন্তু তার মুখে যে ক্লান্ত শান্তি, সেটা নীহারিকা আগে কখনো দেখেনি।

নীহারিকা দ্রুত ইরফানের বাহু জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নিল। হুজুর ধীরে বললেন,
—” তোমার স্বামীর প্রথম স্ত্রী দূর্ঘটনায় মারা যায়নি। খু”ন করা হয়েছে তাকে।”

নীহারিকা তেমন প্রতিক্রিয়া দিলো না। মাথা নেড়ে বলল,
—” জানি হুজুর।’

বৃদ্ধ এবারে মাথা নেড়ে বললেন,
—” যথেষ্ট জানো না। আরো কিছু জানানো প্রয়োজন…! আজ তাকে মুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু কাজ এখানেই শেষ না।”

নীহারিকার বুক কেঁপে উঠলো।
—” মানে?”

বৃদ্ধ গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন।
—” যে শুরু করেছিল, সে এখনও বেঁচে আছে।”

নীহারিকা কিছু না বুঝে তাকিয়ে রইলো। ঘরের ভেতরের বাতাসটা তখনও ভারী। প্রদীপের হলুদ আলো দুলছে দেয়ালে, আর তসবি ঘোরানোর ক্ষীণ শব্দটাও যেন এখন থেমে গেছে। হুজুর কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তার চোখ স্থির হয়ে রইলো ইরফানের দিকে, যেন তিনি শুধু মানুষটাকে না, তার চারপাশের অদৃশ্য ছায়াকেও দেখছেন। তারপর খুব ধীরে বললেন,
—” যে কাজটা করা হয়েছে, সেটা সাধারণ শত্রুতার কাজ না।”
নীহারিকার বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠলো।
সে শক্ত করে ইরফানের বাহু ধরে আছে। ইরফান এখনও মাথা নিচু করে বসে, ক্লান্ত, নিঃশেষ হয়ে। হুজুর আবার বললেন,
—” কেউ ইচ্ছা করে অন্ধকার পথ বেছে নিয়েছে। কালো আমল…কালো জাদু। ইসলামে যেটা সবচেয়ে বড় গুনাহগুলোর একটি। যে এটা করেছে, সে শুধু তোমার স্বামীর ক্ষতি করতে চায়নি। তার ঘর ভাঙতে চেয়েছে। তার জীবন, তার ঈমান—সবকিছু ধ্বংস করতে চেয়েছে। আর এই জাদুর প্রভাব কিন্তু গত এক বছর ধরে আছে তার উপর। কিন্তু তোমার স্বামী নিজেই চুপ ছিল। এমনও হতে পারে সে নিজেও জানতো যে তার মাঝে কোনো সমস্যা রয়েছে। কিছু একটা সমস্যা রয়েছে। কিন্তু মূল কারন ধরতে না পারায় সে কিছু করতেও পারেনি।”

নীহারিকা ঠোঁট ভিজিয়ে কিছু একটা ভাবলো। ধীরে জিজ্ঞেস করলো,
—”আপনি কি বলতে পারবেন এসব কে করেছে হুজুর?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
—” নাম স্পষ্ট না। কিন্তু এটা নিশ্চিত, এই কাজ কোনো অশিক্ষিত মানুষের না। কেউ একজন আছে, যার কাছে এসব বিদ্যা আছে, অথবা এমন কারও কাছে গেছে। আর অবশ্যই তোমাদের ঘরের মানুষ। কেননা, যেই জাদু করা হয়েছে, সেটার জন্য এমন কিছু উপকরণ প্রয়োজন যা শুধু ঘরের লোকেরাই জোগাড় করতে পারবে।”

ঘরের বাতাসে যেন ঠান্ডা একটা শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো। হুজুর এবার একটু সামনে ঝুঁকলেন।
—”তোমার স্বামীর উপর যে জাদু করা হয়েছিল, সেটা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার জন্য বাঁধা হয়েছিল। তার মনকে দুর্বল করা, তাকে সন্দেহে ভরিয়ে দেওয়া, ভয় দেখানো, অসুস্থ করা, আর শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাওয়া।৷ এমনকি..

একটু থামলেন তিনি। এবারে ভীষণ সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
—” এমনকি তাকে দিয়ে খু”নও করানো যেতে পারে।”

নীহারিকার চোখে তখন ভয় আর ক্রোধ মিশে গেল এক নিমিষে।”
—” মানে?”

—” মানে, সেই জাদুর প্রভাবে সে বা তারা চাইলে তোমার স্বামীকে দিয়ে খু”ন করাতে পারে। শুধু তাই নয়, জগৎের সব অপরাধ করানো সক্ষম। অথচ তার কিছু মনেই থাকবেনা। বরং স্মৃতি থেকে সেই অংশ মুছে গিয়ে হয়তোবা কাল্পনিক কিছু তৈরী হবে।”

নীহারিকা রীতিমতো মুখ কুঁচকে তাকিয়ে রয়েছে। অবিশ্বাস্য কথাবার্তা গুলো শুনেই অস্বস্তি হচ্ছে তার। বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—” মানুষের হিংসা বড় ভয়ানক জিনিস, মা। কখনো ভালোবাসা থেকে জন্মায়, কখনো প্রতিশোধ থেকে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই স্থায়ী হয় না। আজ তাকে মুক্ত করা গেছে, কারণ সময় ছিল।”

নীহারিকা ধীরে বলল,
—” তাহলে বিপদ শেষ?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
—” না!”

একটা শব্দ। কিন্তু সেই শব্দে যেন ঘরের সব আলো নিভে যাওয়ার মতো অনুভূতি হলো নীহারিকার।

—” যে এটা করেছে, সে এখনও আছে। আর সে জানবে, তার কাজ ভেঙে গেছে। জ্বিন বলো আর যা-ই বলো, তারা কিন্তু স্বার্থ ছাড়া মানুষের পোষ মানে না। কিছু না কিছু বদলে দিতে হয় তাদের। তোমার স্বামীকে জাদু করা হয়েছিল একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এবং আমার সাধনা মতে সেই উদ্দেশ্য ইতোমধ্যে সফলও হয়েছে। শুধুমাত্র যে জাদুটা করিয়েছে, সে জ্বিনদের কথা রাখেনি, পারিশ্রমিক হিসেবে যেই পাওনা ছিল, তা পরিশোধ করেনি বিধায় এখনো ইরফান কবির এমন অবস্থায়। এমনকি আর কিছুদিন দেরি হলে হয়তো ইরফানের রুহ টাই তারা নিয়ে যেতে পারে।”

নীহারিকার আঙুল শক্ত হয়ে গেল ইরফানের হাতে। আঁতকে উঠলো মেয়েটা,
—” তাহলে?”

হুজুর এবার গম্ভীর গলায় বললেন,
—”তাকে খুঁজে বের করতে হবে।”

নীহারিকা ভ্রু কুঁচকালো।
—” খুঁজে বের করে..!”

—” তার সামনে সত্য তুলে ধরতে হবে। তাকে দিয়ে অসম্পূর্ণ কাজটা সম্পূর্ণ করাতে হবে। জানতে হবে, কাজের বিনিময়ে সে জ্বিনদের কী দেবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল। সেই পারিশ্রমিক মেটাতে হবে জলদি। ইসলামে এসব জাদু, তাবিজ, জ্বিন দিয়ে ক্ষতি করা—সবই হারাম। এটা শিরকের কাছাকাছি পাপ। যে করেছে, সে নিজের আত্মাকেই অন্ধকারে বিক্রি করেছে।”

বৃদ্ধের চোখ কঠিন হয়ে উঠলো।
—” তাকে এখানে আনতে হবে।”

নীহারিকা অবাক হয়ে তাকালো।
—” এখানে?”
—” হ্যাঁ। তার শুদ্ধতা প্রয়োজন।”
তিনি সামনে রাখা কোরআনের দিকে ইশারা করলেন।
—” যদি সে অনুতপ্ত হয়, যদি সত্য স্বীকার করে। তাহলে তাকে তওবা করানো যাবে। তার করা অন্ধকার আমল ভাঙা যাবে। না হলে…!”
তিনি বাকিটা বললেন না। কিন্তু নীরবতার ভেতরেই কথাটা স্পষ্ট। না হলে অন্ধকার থামবে না। নীহারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তার মাথায় তখন অনেক মুখ ভেসে উঠছে—তামান্না…অদ্ভুত ডায়েরির লেখা…তাহিয়ার রহস্যময় মৃত্যু…সে খুব ধীরে বলল,
—” যদি সে না আসে?”

হুজুর তাকালেন তার চোখে।
—” তাহলে সময়ের সাথে সাথে হয় তোমার স্বামী মানসিক ভারসাম্যহীন হবে, আর নইলে মা”রা যাবে।”

নীহারিকা চোখ খিঁচে বন্ধ করে শুকনো ঢোক গিলল। ঠোঁট ভিজিয়ে শ্বাস ফেলল আবারো। তিনি ছোট একটা কাপড়ে মোড়া জিনিস এগিয়ে দিলেন।
—” এটা ঘরে রাখবে। কোরআন পড়বে নিয়মিত। আর স্বামীকে নামাজে দাঁড় করাবে। আল্লাহর ঘর যত শক্ত হবে, অন্ধকার তত দূরে থাকবে।”

নীহারিকা কাপড়টা হাতে নিল। তার চোখে তখন আর ভয় নেই। বরং ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে দৃঢ়তা। সে নিচু গলায় বলল,
—” আমি তাকে খুঁজে বের করে এনে দেব হুজুর।”

হুজুর কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন তার দিকে।
তারপর মৃদু মাথা নেড়ে বললেন,
—” মনে রেখো, আবারো বলি, সবচেয়ে ভয়ানক শত্রু সবসময় বাইরে থাকে না।”
ঘরের প্রদীপের আলো আবার দুলে উঠলো। আর নীহারিকার মনে হঠাৎ একটা শীতল প্রশ্ন জেগে উঠলো, তবে কি সেই মানুষটা…বাড়ির ভেতরেই থাকে?

নীহারিকা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইরফানকে ধরে নিয়ে এসে গাড়িতে বসালো। কোনোমতে সিটবেল্ট টা বেঁধে গাড়িতে উঠতে গেলেই তার সংবিৎ ফিরে এলো। এলোমেলো চোখে তাকিয়ে নীহারিকা আবারো ছুটে গেলো সেই ঘরের দিকে। দ্রুত কোনোমতে গিয়ে বসে পড়ল, অস্থির হয়ে বলল,
—” হুজুর আপনি তো সাধনা করে সব কিছু টের পান। অনেক কিছু জানতে পারেন। আপনি কি…আপনি কি কোনোভাবে এটা বলতে পারবেন যে উনার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু কীভাবে হয়েছে? সেই দিনের সমস্ত ঘটনা, সত্য ঘটনা আপনি কি জানতে পারেন কোনোভাবে?”

হুজুর হাসলেন। হাসার সাথে সাথে কিছু একটা হাতে জড়ালেন। একটা সুতা এগিয়ে দিয়ে বললেন,
—” এটা নাও আম্মাজান।”

নীহারিকা হাতে নিলে হুজুর এবারে বললেন,
—” শোয়ার আগে তোমার স্বামীর ডান হাতের আঙুলের সাথে তোমার ডান হাতের আঙুল এই সুতা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ঘুমিয়ে যাবে। বাকিটা তুমি নিজেই জানতে পারবে।”

নীহারিকা সুতা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। পাতলা কালচে রঙের সুতা। সাধারণ দেখালেও যেন অদ্ভুত ভার আছে এতে। সে ধীরে উঠে দাঁড়াল। বৃদ্ধ হুজুর তখন চোখ বন্ধ করে তসবি গুনছেন নীহারিকা খুব নিচু গলায় বলল,
—” দোয়া করবেন।”
হুজুর চোখ না খুলেই বললেন,
—” সত্য জানার শক্তি সবাই পায় না। প্রস্তুত থেকো।”
এই কথাটা বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে রইল নীহারিকার।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply