Golpo romantic golpo নবরূপা

নবরূপা পর্ব ১৬ ( রহস্যে পদার্পণ 🔥)


নবরূপা

পর্ব_১৬ ( রহস্যে পদার্পণ 🔥)

কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা

কথা রেখেছে ইরফান। বিশ মিনিটের মধ্যে এসে পৌঁছেছে বাড়িতে। তবে প্রতিবারের মত দরজা নীহারিকা খুলে দিল না। ইরফান ইয়াশাকে দরজা খুলে দিতে দেখে একটু অবাক হয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো। মুখে বলল,
—” তোর ভাবি কই?”
—” এতক্ষণ আমার ঘরেই ছিল। কিছুক্ষণ আগে তোমাদের ঘরে গিয়েছে। ইনায়া কাঁদছিল তো।”
ইরফান চোখ বড় করে তাকালো। চিন্তার ছাপ স্পষ্ট তার কপালে,
—” সে কি! ইনায়া কাঁদছিল কেনো?”
ইয়াশা হেলেদুলে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
—” কি জানি! হুট করে কাঁদতে শুরু করেছে। ঠিকঠাকই ছিল। আমি আর ভাবি তো চমকে উঠেছি। পরে ভাবি ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করল! আমি নিজের ঘরে চলে এসেছি।”
ইরফান আর দেরি করল না। জুতো খুলে দ্রুত পা চালালো নিজের ঘরের দিকে। সন্ধ্যার আলো নেমে এসেছে, ঘরের ভেতর আধো-অন্ধকার। ইরফানের বুকের ভেতরটা অকারণে ধকধক করছে। ঘরের দরজাটা অল্প খোলা। সে ধীরে ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। বিছানায় বসে আছে নীহারিকা। কোলের ওপর ইনায়া, ঘুমে ঢুলছে। ছোট্ট মুখটা ভেজা, মনে হয় কেঁদে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েছে। নীহারিকা ধীরে ধীরে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

ঘরে আলো জ্বালানো নেই। শুধু টেবিল ল্যাম্পের হলদে আলোয় দুজনের ছায়া লম্বা হয়ে বিছানায় পড়েছে। নীহারিকা ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারা করল যেন ইরফান কথা না বলে। ইরফান এগিয়ে এসে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
—”কাঁদছিল কেন?”

নীহারিকা মুখ তুললো। চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু গভীর। ধীরেসুস্থে ইনায়াকে শুইয়ে দিল বিছানায়। দু পাশে দুটো বালিশ দিয়ে ইরফানের বাহু টেনে বারান্দায় নিয়ে এলো সে। ইরফান অন্ধের মত অনুসরণ করলো স্ত্রীর দেখানো পথ। নীহারিকা আরেকবার উঁকি মেরে ইনায়া ঠিক আছে কিনা দেখে বারান্দার দরজা লাগিয়ে দিয়ে বলল,
—” হুট করেই কাঁদছিল। হয়তো কোনো কারনে ভয় পেয়েছিল। চিন্তার কিছু নেই!”

ইরফান মাথা নাড়লো। এমনিতেও সে চিন্তা করে না এখন। ফিসফিস করে বলল,
—” আমি কি আসতে দেরি করলাম নাকি?”
—” না।”
নীহারিকা মাথা নাড়ল। বলল,
—” আমি দ্রুত আসতে বলেছি, কারন আপনার সাথে আমার কথা আছে।”
কথাটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু কণ্ঠে যেন অন্য অর্থ লুকানো। ইরফান এবার খেয়াল করলো, নীহারিকা দুহাত মুঁচড়াচ্ছে অস্বস্তিতে। তার চোখ সেখানে আটকালো এক সেকেন্ড।
—” কিছু হয়েছে তোমার?”
গলা খুব নিচু।

নীহারিকা তাকালো তার দিকে।
—” হুম।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। বাতাস ভারী হয়ে উঠলো অদৃশ্য কিছুতে। ইরফান ধীরে এগিয়ে আসলো এক কদম, বলল,
—” কী হয়েছে?”

নীহারিকা এবারে ঠোঁট ভিজিয়ে ইরফানের চোখের দিকে কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে বলল,
—” আপনাদের ফ্যামিলি অ্যালবাম দেখেছি আজ।”

ইরফান অনুভূতিশূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছোট করে বলল,
—” ওও। ইয়াশা দিয়েছে?”

—” হ্যাঁ।”
আবার নীরবতা। ইরফানের বুকের ভেতর পুরোনো স্মৃতির কাঁটা নড়েচড়ে উঠলো। সে জানে- অ্যালবামের কিছু পাতা অসম্পূর্ণ। ইচ্ছাকৃতভাবে।
—” সব দেখেছ?”
এবার প্রশ্নটা সরাসরি। নীহারিকা চোখ সরালো না।
—” যা দেখার দরকার ছিল।”
এই একই বাক্য, কিন্তু এবার স্বর আলাদা। ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেললো খুব আস্তে।
—” নীহা…
সে বাক্য গুছিয়ে নিতে পারছে না। কোনোমতে কন্ঠনালি থেকে শব্দ বের হলো।

ইরফানের বলার আগেই নীহারিকা ধীরে বলল,
—” আমি কখনো তাহিয়া আপুর ছবি দেখিনি। ভেবেছিলাম অ্যালবামে থাকবে। কিন্তু তার কোনো ছবিই নেই সেখানে। সব ছবিগুলো ছেঁড়া আর আপনার ছবিগুলোও…

নীহারিকা শেষ করার আগেই এবারে ইরফান নীহারিকার কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বলল,
—” ছবিগুলো আমিই ছিঁড়েছি।”

অবাক হলো নীহারিকা। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো,
—” আপনি? মানে? কেনো?”

ইরফান সময় নিলো। গায়ের শার্টের উপরের দুটো বোতাম খুলে নিজেকে রিলাক্স করলো। অন্ধকার হয়ে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—” নীহা, আমি জানি। জীবনের সকল অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু মুছে ফেলা যায় না। কিন্তু কিছু স্মৃতি…বাঁচতে দিলে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যায়।”
কথাগুলো বলতে কষ্ট হচ্ছে তার। স্পষ্ট বোঝা গেলো। নীহারিকা ঠান্ডা চোখে শান্তভাবে শুনছে।

ইরফান আবারো বলল,
—”আমি জানি এমন অযৌক্তিক কাজ করাটা আমার জন্য মোটেই শোভনীয় নয়। কিন্তু তাহিয়া মারা যাওয়ার কিছু মাস পর্যন্ত আমি খুব ডিপ্রেশনে ছিলাম। ভেঙে পড়েছিলাম ভীষণ। বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম। যখন বুঝতে পারলাম যে অন্তত নিজের সন্তানের জন্য হলেও আমাকে বাঁচতে হবে, তখন আমার মন চাইলো আগের সবকিছু শেষ করে দিতে, অতীতকে মুছে দিতে। মনের কথা শুনলাম। আর এমন পাগলামো করলাম! তবে, আমি কাউকে ঘৃণা করে কিছু করিনি নীহা।”

ইরফান এবারে নীহারিকার দিকে ঘুরে তাকালো। ভাঙা কন্ঠে বলল,
—” বিশ্বাস করো, আমি নিজেকে বাঁচাতে করেছি। নিজেকে শান্ত করতে এমন করেছি। তুমি ওসব দেখে ভয় পেও না। আমিই চাইনি তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলতে।”

ঘরের বাতাস আরও নীরব হলো। নীহারিকা এবার খুব ধীরে জিজ্ঞেস করল,
—” আর ইনায়া?”
প্রশ্নটা ভারী। ইরফান চোখ বন্ধ করলো এক মুহূর্ত।
—” ও আমার সব। ওর জন্যই আমি দাঁড়িয়ে আছি এখনো।”
তারপর চোখ খুলে নীহারিকার দিকে তাকাল।
—” তুমি কী ভাবছ?”
নীহারিকা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকলো। তার মাথায় হিসেব চলছে—ছেঁড়া ছবি। একই পাতা কাটা। লালচে দাগ। তামান্নার কাছে অ্যালবাম থাকা। আর ইরফানের আলমারির সেই লুকোনো কালো ডায়েরি। হ্যাঁ একটু আগে সে ইরফানের আলমারিতে একটা কালো ডায়েরি দেখেছে। সে সবকিছু এখনই বলল না।

কিছুটা সময় নিয়ে নীহারিকা শুধু নরম গলায় বলল,
—”আমি আপনার স্ত্রী। আপনার অতীতের সাথে লড়াই করতে আসিনি আমি। কিন্তু তার ছায়া যদি বর্তমানকে ছুঁয়ে থাকে…আপনাকে ছুঁয়ে থাকে, তবে সেটা জানতে চাই।”

কথাগুলো ধারালো নয়, কিন্তু সোজা। ইরফান তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এই মেয়েটা আবেগে ভাসছে না। চুপচাপ দেখছে। হিসেব করছে। তারপর কথা বলছে। বুকের ভেতর হালকা শঙ্কা আর অদ্ভুত স্বস্তি একসাথে জন্ম নিল ইরফানের।
—” তুমি কী জানতে চাও?”
সে জিজ্ঞেস করলো।

নীহারিকা এবার হালকা হাসলো। এগিয়ে এসে ইরফানের শার্টের বাকি বোতামগুলোও ধীরে ধীরে খুলে দিল, সাথে বলল,
—” আজ আপাতত কিছু না।”
তারপর শার্টটা ঝেড়ে শুকোতে দিয়ে ইরফানের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
—” আপনি মোমবাতি আর বেলী ফুল এনেছেন?”

ইরফান এক মুহূর্তের জন্য থমকালো। এই মোড় ঘোরানোটা সে আশা করেনি। কেমন যেন হুট করে এক পরিবেশ থেকে আরেক পরিবেশে নিয়ে গেলো নীহারিকা!
—” হ্যাঁ, এনেছি।”

নীহারিকার চোখে ঝিলিক। হাত পেতে বাচ্চাদের মত বলল,
—” তো দিন।”

ইরফান হাসলো,
—” মোমবাতি ব্যাগে আছে নীহা। আর বেলী ফুল টা…!”
বলে সে পকেট থেকে ফুল বের করে নীহারিকার হাতে দিল,
—” এইযে আপনার ফুল!”

নীহারিকা ফুলগুলো হাতে বুলালো। আনমনে বলল,
—” মোমবাতি দিয়ে কী করব জানেন?’

ইরফান আগে থেকেই আগ্রহী। আরেকটু কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” কী করবে?”
—” আজ রাতে একটু আলো জ্বালাবো।”

ইরফান অবাক হয়ে তাকালো।
—” কেন?”
নীহারিকা তার দিকে এগিয়ে এসে খুব আস্তে বলল,
—” আলোতে অনেক সময় ছায়া স্পষ্ট দেখা যায়।”

ইরফান ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলে নীহারিকা ফিক করে হেসে ফেলে। বলে,
—” মজা করছিলাম। মোমবাতির কাজ আপনি পরে বুঝতে পারবেন মিস্টার কবির!”

বাক্যটা বলেই সে বারান্দা থেকে বেরিয়ে গেল। ইরফানও বারান্দার দরজা আটকে ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে রইলো। ঘুমন্ত ইনায়ার কপালে হাত বুলিয়ে দিয়ে চুমু খেলো কপালে। বাতাসে অদ্ভুত গন্ধ- বেলী ফুলের আগাম আভাস,আর কোনো এক গোপন প্রশ্নের।


রাত গভীর হয়েছে। বাড়িটা ধীরে ধীরে একদম স্তব্ধ হয়ে গেছে। করিডোরে আলো কমিয়ে দেওয়া, রান্নাঘরের বাসন ধোয়ার শব্দ থেমে গেছে অনেক আগেই। বাইরে দূরের কুকুরের ডাক ভেসে আসে মাঝে মাঝে। ইরফান ইনায়াকে কোলে নিয়ে ইয়াশার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ।ইনায়া বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে আধোঘুমে বিড়বিড় করছিল। ইয়াশা এসে খুব আদর করে ওকে নিয়ে নিল। ইরফান মাথা নেড়ে মেয়ের কপালে শেষবার চুমু খেয়ে ধীরে দরজা টেনে দিল।

করিডোর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা টান কাজ করছিল।
আজকের সন্ধ্যার কথাগুলো, অ্যালবাম, নীহারিকার চোখের দৃষ্টি—সব একসাথে ভিড় করছে মাথায়। মেয়েটা তার সাথে এত অদ্ভুত ভাবে কথা বললো কেনো! সে দরজার সামনে এসে হাত রাখল সবে।৷ দরজা খুললো স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে। কিন্তু সামনে তাকাতেই সে অবাক হয়ে গেলো। পুরো ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। ডুবে আছে ঘন ছায়ায়। এক ফোঁটা আলো নেই। জানালার পর্দা টানা। বাতাসে মৃদু বেলী ফুলের গন্ধ। ইরফান থমকে গেল। সে ভেতরে ঢুকতেই তার পায়ের শব্দ স্পষ্ট হলো। এত নিস্তব্ধতা অস্বাভাবিক লাগলো ইরফানের কাছে। সে আন্দাজ করে সামনে এগিয়ে গলা নিচু করে ডাকলো,
—” নীহা?”

কোনো উত্তর নেই। সে আরও এক পা ভেতরে ঢুকতেই, হুট করে একটা ক্ষুদ্র শিখা জ্বলে উঠল।
মোমবাতির আলোতে আলোকিত হলো পুরো ঘর।
অন্ধকার ভেদ করে ছোট্ট হলুদ আলোটা ধীরে ধীরে স্থির হলো। আলোর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে নীহারিকা। ইরফান তাকে দেখে চোখ সরাতে পারলো না। মেরুন রঙের শাড়ি পরিহিত নীহারিকার চুল খোলা, কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। তার চেহারা মোমের আলোয় আরও নরম, আরও গভীর লাগছে। কপালে টিপ নেই, ভারী গয়না নেই, তবুও জ্বলজ্বল করছে সে। মোমবাতিটা হাতে ধরে নীহারিকা ইরফানের চোখের দিকে তাকালো। ইরফান শুকনো ঢোক গিলল। গাঢ় কাজল দিয়েছে মেয়েটা। সে কি জানে কতটা সাংঘাতিক রুপসী লাগছে তাকে? সেই চোখ দুটো স্থির। অন্যরকম। মোমবাতির আলো মুখে পড়ে তার চোখের ছায়াকে আরও গভীর করে তুলেছে। যেন আলো-আঁধারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজেই।

ইরফানের নিঃশ্বাস এক মুহূর্ত থেমে গেল। সে ফিসফিস করে বলল,
—” তুমি…হঠাৎ..! “

নীহারিকা কোনো উত্তর দিল না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর আরও দুটো মোমবাতি জ্বালালো। ঘরটা এখন আধো আলোয় ভাসছে। দেয়ালে দুজনের ছায়া লম্বা হয়ে উঠেছে। ঝুড়ি থেকে বেলী ফুলের গন্ধ ঘন হয়ে উঠেছে। ইরফান দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। এই দৃশ্যের জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। নীহারিকা এবার মুখ তুললো। দৃষ্টিটা সরাসরি, অচঞ্চল। এই দৃষ্টি লাজুক নববধূর নয়। এটা এমন কারও, যে ভাবছে। যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ইরফান ধীরে দরজা বন্ধ করলো পেছনে ঘুরে। ছিটকিনিতে হাত রেখে বড় করে শ্বাস নিল। সে নিশ্চিত হতে পারছেনা নীহারিকা এমন রূপে কেনো ধরা দিয়েছে? তবে স্বামী হিসেবে তার বুক কাঁপছে। তার ভয় লাগছে নিজেকে হারিয়ে ফেলার। কাঠের হালকা শব্দে নীরবতা আরও গাঢ় হলো। সে কয়েক পা এগিয়ে এলো। মোমের আলোতে দুজনের মুখ এখন খুব কাছাকাছি দৃশ্যমান।
ইরফান লক্ষ্য করলো, নীহারিকার ঠোঁট শুকনো নয়, কাঁপছে না। চোখে জল নেই। কিন্তু প্রশ্ন আছে। আর অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।

ইরফানের অস্বস্তি দেখে নীহারিকা মুচকি হাসলো। আরেক কদম এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল আলতো স্বরে,
—” আমি মেরুন রঙ কখনো গায়ে দিই না। কালো চামড়ায় ভীষণ বিশ্রী লাগে। কিন্তু হুট করে মনে হলো আপনি যেহেতু উপহার দিয়েছেন, তাই স্ত্রী হিসেবে এটা প্রত্যাখ্যান করলে আপনাকে অপমান করা হবে। তাই…

ইরফান আবারো শুকনো ঢোক গিলল। হাতের তালু ঘামছে তার। সে এখনো নিশ্চিত নয়। তবে নীহারিকা নিজেও জানে না সে কী করছে। অজান্তেই ইরফানের স্বামী রূপটা সে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনছে তা কি এই মেয়ে বুঝতে পারছে? মাঝরাতে এভাবে সেজেগুজে কোনো স্ত্রী যদি স্বামীর সামনে হাজির হয়, তবে একটা কারনেই। কিন্তু নীহারিকা কি আসলেই তা-ই চাইছে? নাকি পরীক্ষা নিচ্ছে ইরফানের। ইরফান আকাশ পাতাল চিন্তা ভাবনা করে অন্যদিকে তাকিয়ে ধীরকন্ঠে বলল,
—” ধন্যবাদ আমার উপহার গ্রহণ করার জন্য। তবে তুমি যেভাবে বললে মোটেই বিশ্রী লাগছে না।”

নীহারিকা হাসলো। নিজের দিকে এক পলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—” তবে কেমন লাগছে?”

ইরফানের এমনিতেই শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এই মুহুর্তে মেয়েটা কী শুরু করল? সে তো আর বলতে পারবে না তোমায় আগুনসুন্দরী লাগছে! তোমার এই রূপ আমার হৃদয় ঝলসে দিচ্ছে। কংক্রিটের হৃদয়ে আঘাত হানছে নরম আবেশে। সে কি আর এসব বলতে পারবে? প্রতিবন্ধকতার বেড়াজালে পড়ে ইরফান তাই ছোট্ট করে বলল,
—” ভীষণ সুন্দর লাগছে।”

নীহারিকা হাসলো নরম হয়ে। ইরফান সেই হাসি দেখলো। এটা সাধারণ হাসি নয়। স্বাভাবিক হাসি নয়।।নীহারিকা লজ্জা পাচ্ছে। তার গালে লাল আভা স্পষ্ট। ইরফান খেয়াল করেও কিছু বলল না। হুট করে তার গরম লাগতে শুরু করলো। মোমবাতির জন্য নীহারিকা ফ্যানও বন্ধ রেখেছে। নিজেকে লুকোতে ও পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে হালকা হাসার চেষ্টা করলো। বলল
—” তুমি কি আসলেই মোমবাতি দিয়ে এই মাঝরাতে জাদু করবে?”

নীহারিকার ঠোঁটে খুব সামান্য হাসি ফুটলো।
—” হ্যাঁ।”
নিচু স্বর। মোমের শিখা কেঁপে উঠলো হালকা বাতাসে। আলোতে দুজন একে অপরকে নতুন করে দেখলো। আজ কোনো ভিড় নেই। কোনো শব্দ নেই। কোনো আড়াল নেই। শুধু আলো। আর দুই জোড়া চোখ। রাতটা যেন অপেক্ষা করছে— কিছু উন্মোচনের।

ইরফান অস্থির হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। নিজেকে খুব কষ্ট করে সামলিয়েছে সে। যতই হোক না কেনো, নীহারিকা তার স্ত্রী। মাঝরাতে একটা অনুভূতি কাজ করাটাও স্বাভাবিক। এটা শুনতে অদ্ভুত হলেও সত্য, বিয়ের রাতেও তারা এক হতে পারেনি। আজ পর্যন্ত তারা আর পাঁচটা সাধারণ দম্পতির মত কাছে আসেনি। মিলন হয়নি দুটি হৃদয়ের। মানসিক দুরত্ব খুব একটা না থাকলেও শারিরীক দূরত্ব তারা বজায় রেখেছে অনেকটা। ইরফানের এই নিয়ে একটু আগ পর্যন্ত অভিযোগও ছিল না। নীহারিকা বাসর রাতে সময় চেয়েছিল। সেও সময় দিয়েছে। কিন্তু নীহারিকা যদি এমন করে নিজে থেকে তাকে উন্মাদ করতে উঠে পড়ে লেগে যায়, তবে তো ভীষণ মুশকিল। আগুন যদি নিজে এসে ধরা দেয়, তবে সেই আগুনে না পুড়ে উপায় কী?

ইরফান অস্থির শ্বাস ফেলে দ্রুত বিছানায় বসে পড়লো। নীহারিকা দেখলো তা স্থির নয়নে। কিছু না বলে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে। ইরফান বালিশ উঁচু করে আধশোয়া হয়ে হেলান দিয়ে স্থির ফ্যানটার দিকে চোখ রাখলো। নীহারিকা এবারে আয়নার মধ্য দিয়ে অস্থির ইরফানকে একবার দেখে নিয়ে হাসলো। নিজের শাড়ির আঁচলে আঙুল ছুঁলো, আটকে থাকা সেফটি পিন টা খুলে ফেলল। এরপর ধীর কন্ঠে ডেকে উঠলো,
—” আপনি অবাক হচ্ছেন তাই না?”

ইরফান সেদিকে না তাকিয়েই বললো,
—” একটু।”

নীহারিকা ফিক করে হাসলো। স্তব্ধ রাতের এই নীরবতায় তার হাসিটা বুকে গিয়ে ঠেকলো ইরফানের। হাত মুঠো হয়ে এলো তার। নীহারিকা এবার কোমড়ের কাছের সেফটি পিনে হাত দিয়ে বলল,
—” সময় নেয়া শেষ আমার মিস্টার কবির। আপনি এমন অস্থির হলে তো মুশকিল! আমি কি স্ত্রীর অধিকার পাব না? শুধু আপনার সন্তানের মা হয়েই রইবো? এতটা আত্মত্যাগ করা একটা নারীর পক্ষে সম্ভব নয়!”

ইরফানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। এই স্বর, এই আত্মবিশ্বাস, এটা সেই লাজুক, সময় চাওয়া মেয়েটা নয়। এটা তার স্ত্রী। নীহারিকা আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই কথা বলতে লাগল, যেন নিজের প্রতিচ্ছবিকেও সাক্ষী করছে। আর ধীরে ধীরে শাড়ি ঠিক করে আটকে রাখা সেফটি পিন গুলোও খুলতে থাকলো।

—” আমি ভয় পেয়েছিলাম। নিজেকে, আপনাকে, এই সম্পর্ককে। মনে হয়েছিল আমি প্রস্তুত না। কিন্তু, প্রতিদিন আপনার দিকে তাকিয়ে বুঝেছি, আপনি কখনো চাপ দেননি। কখনো দাবি করেননি। অপেক্ষা করেছেন।”
সে এবার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। মোমের আলোতে তার চোখদুটো শান্ত, পরিষ্কার।
—” আজ বুঝলাম, অপেক্ষারও একটা শেষ আছে। আর ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, তাহলে সেটা অর্ধেক রেখে দেওয়া যায় না। আর…”

ইরফান উঠে বসলো সোজা হয়ে। তার চোখে বিস্ময়, টান, দ্বিধা—সব একসাথে ফুটে উঠেছে। ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
—” আর?”

নীহারিকা কয়েক পা এগিয়ে এলো। শাড়ির আঁচলটা কাঁধে ঠিক করল। এবারে একদম কাছে এসে ইরফানের পাশে বসে পড়লো। মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” আবিষ্কার করতে পারলাম, আপনার কাছে না গেলে পাশেও থাকতে পারবনা। আমি কোনো আবেগে ভেসে আসিনি। আপনাকে পরীক্ষা করতেও না। আজ আমি আপনাকে চাই—আপনার স্ত্রী হিসেবে। পূর্ণভাবে। কোনো ভয় ছাড়া।”

এক মুহূর্তের নীরবতা। মোমের শিখা কেঁপে উঠল। দেয়ালে দুজনের ছায়া আরও কাছে এলো। নীহারিকা উঠে দাঁড়িয়ে আবারো আয়নার কাছে গেলো। হাত বাড়িয়ে দিল। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
—” এসে দাঁড়ান আমার কাছে। এতদিন দূরে থেকেছেন যথেষ্ট। আমি আর দূরে থাকতে চাই না।”

ইরফানের গলা শুকিয়ে গেছে। তবু সে উঠে দাঁড়াল। ধীরে। খুব ধীরে। ইরফান কে যেন সত্যিই জাদু করেছে নীহারিকা। দুজনের মাঝখানের ফাঁকটা ছোট হতে হতে শেষ হলো। নীহারিকা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো।
—” আজ আমাকে সময় দিতে হবে না। আজ আমিই সময় নিয়ে আপনার কাছে এসেছি।”
ইরফানের চোখ নরম হয়ে এলো। সে হাত বাড়িয়ে নীহারিকার গাল ছুঁলো। আলতো করে ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—” তুমি কি নিশ্চিত? হুট করে কেনো?”

নীহারিকা তার হাতটা নিজের গালে চেপে ধরল। তারপর খুব ধীরে মাথা নামিয়ে ইরফানের বুকে কপাল ঠেকালো। এটা কোনো উন্মত্ততা নয়। এটা কোনো হঠাৎ জ্বলে ওঠা আগুন নয়। এটা দীর্ঘ অপেক্ষার পর ধীরে জ্বলা প্রদীপের মতো। ইরফান দূরে সরালো না, আলতো করে জড়িয়ে ধরলো। প্রথমবার। মাঝখানে আর কোনো দেয়াল নেই। কোনো অনিশ্চয়তা নেই।

ইরফান আলতো করে নীহারিকার কপালে চুমু খেয়ে তার মাথায় থুতনি ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—” প্রশ্নের জবাব পেলাম না। কী হয়েছে তোমার হুট করে?”

ইরফানের বুকে মাথা ঠেকিয়ে রাখা নীহারিকা ফট করে চোখজোড়া খুলল। শুকনো ঢোক গিলে বলল,
—” আপনি আমায় এনেছিলেন ভবিষ্যত রাঙানোর জন্য, আমি যদি আপনার অতীত কেও একটু সাজাতে পারি, তবে ক্ষতি কীসের?”

মোমবাতির আলো স্থির হলো। রাত নিঃশব্দে তাদের ঘিরে রইল। ইরফান সন্দিহান দৃষ্টিতে আয়নার দিকে তাকালো। নীহারিকা এবারে তার বুক থেকে মাথা তুলে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” একটা কথা বলুন আমায়।”
একটু থেমে জিজ্ঞেস করেই বসলো,
—” আমাকে ভালোবাসেন?”

ইরফান থমকালো না। তবে চুপ করে তাকিয়ে রইলো। কিছু সময় নিয়ে বলল,
—” তোমার মন রাখার জন্য মিথ্যে বলব না। এখনো তেমন কিছু…এত দ্রুত ভালোবাসা হয়না নীহা। তবে তোমায় সম্মান করি। স্ত্রী হিসেবে!”

এবারেও মুচকি হাসলো নীহারিকা। চোখের দৃষ্টি এবার তীক্ষ্ণ হলো। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
—” তাহিয়া কে ভালোবাসতেন?”

দৃষ্টি পুরোপুরি বদলে গেলো ইরফানের। নীহারিকার থেকে এক পা পিছিয়ে দাঁড়ালো সে। কড়া গলায় বলল,
—” এমন মুহুর্তে এসব কথার মানে কী নীহা?”

নীহারিকা বুঝলো পরিস্থিতি বিগড়ে যাচ্ছে। তাই দেরি না করে দ্রুত এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো ইরফানকে। ইরফানের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মুখ ডোবালো তার ঘাড়ে। ইরফান আহাম্মকের মত দাঁড়িয়ে থাকলো। কী হচ্ছে তার সাথে বুঝতে পারলো না। কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর ইরফান নিজের ঘাড়ে ভেজা কিছু অনুভব করলো। অবাক হয়ে রীতিমতো অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলল,
—” তুমি কাঁদছো?”

জবাব এলো না নীহারিকার থেকে। সে আরো শক্ত করে ইরফানকে জড়িয়ে ধরলো। এবারে ধৈর্যের সীমা পার হলো ইরফানের। সে জোরপূর্বক নীহারিকা কে মুখোমুখি করালো। দুগালে হাত রেখে আকুল গলায় বলল,
—” কি আশ্চর্য! কাঁদছো কেনো? আমি তো ধমক দিইনি তোমায়। এমন মুহুর্তে এসব কথা কেও বলে বোকা? কেঁদো না।”
বলতে বলতেই নীহারিকার চোখের পানি মুছে দিলো ইরফান। একটুতেই চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে মেয়েটার। ইরফান অবাক হয়ে তা দেখলো। এতই ভয় পেলো মেয়েটা? নাকি প্রথম থেকেই কান্না আটকে রেখেছিল?

নীহারিকা এবারে নিজের গাল থেকে ইরফানের হাত সরিয়ে নিজেই এগিয়ে এসে পা উঁচু করে ইরফানের গালে হাত রাখলো। চোখে চোখ রেখে নাক টেনে কান্নাভেজা কন্ঠে বলতে থাকলো,
—” দোহাই লাগে আপনার, মিস্টার কবির। মিথ্যে বলবেন না আমায়। বিয়ের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবেন না। ভালো না বাসলেও স্ত্রী হিসেবে এটুকু সম্মান আমাকে করবেন প্লিজ। আমি আশা করব আপনি আমায় আজ পর্যন্ত একটা মিথ্যে কথাও বলেন নি।”

ইরফান কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো নীহারিকার দিকে। তার চোখে বিস্ময় নেই এখন—আছে গভীর ক্লান্তি, আর এক ধরনের ধরা পড়ে যাওয়ার অনুভূতি।
সে ধীরে নীহারিকার হাত দুটো নিজের গাল থেকে নামিয়ে এনে শক্ত করে ধরে ফেলল। কণ্ঠস্বর আর আগের মতো কড়া নয়।
—” আমি কখনো তোমায় মিথ্যে বলিনি, নীহা। তুমি কী জানতে চাইছো?”

নীহারিকা আবারো জিজ্ঞেস করলো,
—” তাহিয়াকে ভালোবাসতেন?”

ইরফান গভীর শ্বাস নিলো,
—” আমার সন্তানের মা হিসেবে…

—” আপনার স্ত্রী হিসেবে ভালোবাসতেন কিনা?”

ইরফান আবারো থামলো। নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে রয়েছে।

  • ” হুম ভালোবাসতাম!”
    ইরফানের কন্ঠনালী থেকে শব্দগুলো খুব সরলভাবে বের হলো। কোনো নাটক নেই। কোনো লুকোচুরি নেই।৷ নীহারিকার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তবু সে চোখ সরালো না। ইরফান এবার খুব ধীরে বলল,
    —” কিন্তু ভালোবাসা সবসময় গল্পের মতো শেষ হয় না। কিছু ভালোবাসা ভেঙে যায়। কিছু মানুষ চলে যায়। কিছু সম্পর্ক, শেষ হয়ে যায়! আমি অতীতকে অস্বীকার করিনি কখনো। করবও না। কারণ সেটা আমার জীবনের অংশ। কিন্তু সেটার মানে এই না যে আমি সেখানে আটকে আছি।”

নীহারিকার চোখ ভিজে উঠছে আবার। সে ফিসফিস করে বলল,
—” তাহলে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি আপনার জীবনে?”
এই প্রশ্নে কোনো অভিযোগ নেই। আছে ভয়। ইরফান এবার একেবারে কাছে টেনে নিল তাকে। দুগালে হাত রেখে চোখে চোখ রেখে বলল,
—” তুমি আমার বর্তমান। আর ভবিষ্যৎ। এটা আমি নিশ্চিত জানি।”

ইরফান দীর্ঘ শ্বাস ফেলল।
—” ভালোবাসা একদিনে জন্মায় না। কিন্তু যে মানুষকে সম্মান করা যায়, যার জন্য অপেক্ষা করা যায়, যার কান্না সহ্য হয় না, তাকে ভালোবাসতে সময় লাগে না খুব বেশি। আমি সেই পথে আছি, নীহা। তোমার দিকে এগোচ্ছি। আমি নিশ্চিত, আমি তোমায় ভালোবাসবো।”

নীহারিকার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
—” আমি আপনার বিকল্প হতে চাই না। আমি চাই না আপনি কাউকে ভুলে আমাকে জায়গা দিন। আমি চাই… নিজের জায়গাটা। আলাদা করে।”

ইরফানের চোখে এবার দৃঢ়তা।
—” তুমি কারও জায়গা নিচ্ছ না। তুমি নিজের জায়গা বানাচ্ছ। আর সেটা আমি তোমায় দিচ্ছি না, তুমি নিজেই নিচ্ছ।”

মোমবাতির আলোয় নীহারিকার মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি ফুটে উঠল। কিন্তু তার কণ্ঠ এখনো কাঁপছে।
—” আমি ভয় পাই। যদি কোনোদিন মনে হয় আমি শুধু দায়িত্ব… শুধু সামাজিক সমাধান…!”
ইরফান আর শুনতে চাইলো না। আলতো করে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
—” দায়িত্বকে এভাবে জড়িয়ে ধরা যায় না। দায়িত্বের জন্য মানুষ রাত জেগে মাথায় হাত রেখে বসে থাকে না। দায়িত্বের কান্না গলায় কাঁটা হয়ে আটকে থাকে না।”
এক মুহূর্ত থামল।
—” আমি অতীতকে সম্মান করি। কিন্তু তোমার কাছে মিথ্যে বলে তোমাকে জেতাতে চাই না। আমি যদি কখনো বলি ভালোবাসি—সেটা হবে নিঃসন্দেহে। আজ না হোক, কাল। কিন্তু সেটা সত্যি হবে।”

নীহারিকা চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল,
—” তাহলে আজ আমাকে শুধু এটুকু দিন, যে আমি আপনার জীবনে দ্বিতীয় কেউ নই।”
ইরফান কোনো উত্তর দিল না কথায়। সে তার হাত তুলে নিজের বুকে রাখল।
—” এখানে এখন তুমি আছো। অতীত স্মৃতি হয়ে থাকে, বাস করে না।”
এইবার নীহারিকা নিজে থেকে তাকে জড়িয়ে ধরল। কান্না থেমে গেছে। শ্বাস ভারী, কিন্তু স্থির। আজকের রাতটা আর শুধু হৃদয়ের আহ্বান নয়। এটা ছিল সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর রাত। আর সেই সত্যের ভেতর দিয়েই— দূরত্ব আরও একধাপ কমে গেল।

ইরফান এবারে চোখ বুঁজে নীহারিকা কে জড়িয়ে ধরলেও নীহারিকার চোখ খোলা। সে আয়নার দিকে তাকালো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। চোখের কোণ থেকে পানির ফোটা তর্জনী দিয়ে ছিটকে ফেলে বাঁকা হাসলো। ইরফানের বুকে চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” সরি মিস্টার কবির। আমার মিথ্যে কান্না দিয়ে আজ আপনাকে কাছে না আনলে আমি আপনার ভবিষ্যতও ঠিক করতে পারবনা। যেই মহাবিপদ এগিয়ে আসছে আপনার জীবনে, সেটা কাটানোর দায়িত্বটা তো আমার-ই। আপনি ভালো না বাসলেও আমি তো আপনার বধূ! নববধূ!”


মোমবাতির আলো অনেকক্ষন আগেই নিভে গিয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়েছে। ঘরজুড়ে আর কোনো শব্দ নেই। শুধু দুজন মানুষের শ্বাসের ওঠানামা। নীহারিকার শেষ কথাটা ইরফান শোনেনি। সে চোখ বন্ধ করে তাকে জড়িয়ে রেখেছিল, অবশেষে কোনো দেয়াল ছাড়া, কোনো হিসেব ছাড়া। ঘড়ির কাটা সাড়ে চারটায় এসে থেমেছে। পাশাপাশি শুয়ে রয়েছে ইরফান ও নীহারিকা। ইরফান ঘুমিয়েছে কিনা নীহারিকা জানে না তবে। নীহারিকা একটুও ঘুমোয়নি। তার চোখ স্থির সিলিং ফ্যানের দিকে। খাটের পাশে অবহেলায় পড়ে থাকা অগোছালো শাড়িটা টেনে গায়ে জড়িয়ে নিলো নীহারিকা। আলতো দৃষ্টিতে পাশে তাকালো। ইরফান তার দিকেই পিঠ করে ওপাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে। নীহারিকা আবারো উপরের দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। সে এবারে স্মৃতিচারণ করতে থাকলো কয়েক ঘন্টা আগের দৃশ্য।

ইরফান সত্যি সত্যি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল তখন। নীহারিকা কে কাছে টেনে নিয়ে চুমু খেয়েছিল গলায়। কোলে তুলে শুইয়ে দিয়েছিল বিছানায়। এরপর ধীরে নিজের শার্টের বোতাম খুলেছে। মোমের আলোয় তার বুক উন্মুক্ত হতে থাকলে নীহারিকার দৃষ্টি হঠাৎ থেমে যায়। তার শ্বাস কেঁপে উঠলো। সে শোয়া থেকে খুব কাছে উঠে এসে দেখে ইরফানের বুকের উপর, কাঁধের নিচে, পাঁজরের পাশে—অস্পষ্ট কিছু দাগ। পুরোনো, ফ্যাকাশে। নীহারিকার আঙুল থমকে যায় সেই দাগে,
—” এগুলো কীসের দাগ?”
তার কণ্ঠ বদলে গিয়েছিল। কিন্তু অস্থির ইরফান তখন জবাব দেয়নি, উল্টো নীহারিকার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়েছিল। সেভাবেই বলেছিল,
—” আমি জানি না কীসের দাগ! এখন আমায় পাগল করে দিয়ে বিরক্ত কোরো না!”

নীহারিকা এড়িয়ে যায়নি বিষয়টা। সে এখন আবারো তাকালো ইরফানের দিকে। চাদরে ঢেকে আছে ইরফানের শরীর। গায়ে এখনো শার্ট নেই। নীহারিকা আলতো করে পিঠ থেকে চাদর সরালো তার। সাথে সাথে শুকনো ঢোক গিলল। বুকের মত পিঠেও অস্পষ্ট কালসিটে কিছু দাগ। এগুলো মোটেই জখমের দাগ নয়! মনে হচ্ছে যেন কেও কালি মাখিয়ে দিয়েছে। নীহারিকা খুব ধীরে হাত বাড়িয়ে আঙুল ছুঁইয়ে দিল একটি দাগে। অদ্ভুতভাবে কোমল ছোঁয়া পেতেই ইরফানের ঘুম হালকা হলো, কেঁপে উঠলো সে। নীহারিকা হাত সরিয়ে নিলো দ্রুত। ইরফান আবারো গভীর ঘুম তলিয়ে গেলে নীহারিকা খুব কাছে ঝুঁকে দাগগুলো পর্যবেক্ষণ করলো। নীহারিকা এবার আরেকটা দাগে আঙুল বুলালো। তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেছে। এবার সেখানে রহস্য, উদ্বেগ, আর একফোঁটা ভয়।

ইরফানের ঘুম অনেকটা হালকা হয়ে এলো নীহারিকার স্পর্শে। সে এবারে এপাশে ফিরে নীহারিকা কে টেনে নিলো বুকের কাছে। জড়িয়ে ধরে মুখ ডোবালো তার ঘাড়ে। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,
—” সারারাত জ্বালিয়ে শান্তি হয়নি? এখন আবার সিডিউস করছো কেনো?”

নীহারিকা হাসলো। ভেজা চোখ তার। স্বামীর প্রথম স্পর্শে আগুনে জ্বলেছে সে। একটু সুখ, একটু ভয় সবকিছু মিলিয়ে মিশ্র অনুভূতিতে ভাসছে সে। অথচ দোষ দিচ্ছে তাকেই। মুখে কিছু বলল না নীহারিকা। ইরফানের পিঠে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে কান্নাভেজা কন্ঠে ভাঙা গলায় বলল,
—” আপনার শরীরে এসব কীসের দাগ ইরফান? বলুন না প্লিজ। কবে থেকে হয়েছে এসব?”

ইরফান হয়তো ঘুমে ডুবে যাচ্ছে। কোনোমতে সে জড়ানো কন্ঠে বলল,
—” আমি জানি না নীহা। সত্যি জানি না। হুট করে একদিন গোসল করার সময় লক্ষ্য করি। তখন লালচে ছিল আর কম ছিল। ডক্টরের কাছে গিয়েছিলাম, বলেছিল স্কিনের কোনো প্রবলেম নেই। ছেঁয়াচেও নয়। হয়তো বা রক্ত জমাট বেঁধেছে আঘাত লেগে।”

নীহারিকা মনোযোগ দিয়ে শুনলো। দৃঢ় কন্ঠে বলল,
—” তারপর? এরপরে কী হলো?”

ইরফান কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারো বলল,
—” পরে তো দাগগুলো কালচে হয়ে গেলো। আর বেড়ে গিয়ে এমন হলো। আমি আর এসবে পাত্তা দিইনি। বাঁচবোই বা কয়দিন!”

নীহারিকা ভ্রু কুঁচকালো,
—” বাজে কথা বলবেন না। বাঁচার ইচ্ছে না থাকলে আমাকে কেনো এনেছেন হুম? যখন এনেই ফেলেছেন, তখন হাজার বছর বাঁচার মানসিকতা গড়ে তুলুন, নিজের যত্ন নিন।”

ইরফান ঘুমের ঘোরেই হাসলো। নীহারিকাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে চুমু খেলো। বিড়বিড় করে বলল,
—” ঠিক আছে ম্যডাম। এখন ঘুমোতে দিন। কাল কলেজ আছে।”

নীহারিকা আর কিছু বলল না। তবে ঘুমোলোও না সে। ইরফানের চুলে হাত বুলিয়ে দিল। চিন্তায় ডুবে গেলো আবার। অজানা আশঙ্কায় বুক কাঁপলে সে চোখ খিঁচে বন্ধ করে জাপটে ধরে ইরফানকে। বিড়বিড় করে বলে,
—” আ’ম সরি ইরফান।’

চলবে….

🔥 কত বড় পর্ব দেখেছেন? কেমন হয়েছে আজকের পর্ব? পর্বের কোনো অংশ অশালীন লাগলে আমায় জানাবেন। তবে আমার লেখা প্রত্যেক টা অংশেরই প্রয়োজনীয়াতা আছে। এরপর থেকে সব পর্বে অনেক মিস্ট্রি থাকবে। তবে দু এক পর্বে সব রহস্য সমাধান হয়ে যাবে এমনটা ভাববেন না। একটু সময় লাগবে। বিরাট রহস্য!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply