নবরূপা
পর্ব_১৪
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
ইনায়াকে তামান্নার ঘরে দিয়ে দৌঁড়ে রান্নাঘরে এসেছে নীহারিকা। তামান্না-ই সুজি খাওয়াচ্ছে ইনায়াকে, সে নিজেই আবদার করেছে চলে যাওয়ার আগে একটু ইনায়ার সাথে সময় কাটাতে। নীহারিকার জন্যে বেশ ভালোই হয়েছে বটে। নইলে কোলে ইনায়াকে নিয়ে সে মোটেই খাবার গরম করতে পারতো না। গায়ের কোটটা খুলে কোনোমতে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসেছে ইরফান। চুলের এখনো পানি শুকোয়নি পুরোপুরি। মুখে অদ্ভুত একটা হালকা হাসি লেগে আছে, যে হাসি খুব কাছের মানুষের জন্যই রাখা হয়।আজ সে ভীষণ আনন্দে রয়েছে৷ রান্নাঘর থেকে ট্রে তুলে আনতে আনতে নীহারিকার বুক ধড়ফড় করছে অকারণে। এ যেন পরীক্ষা। কারো জন্য প্রথমবার নিজের হাতে সাজানো টেবিল।
নীহারিকা একে একে প্লেট সাজাতে লাগলো। গরম ভাত, ডাল, ঝাল করে গরুর মাংস, চিকেন রোস্ট। আর পাশে ছোট্ট বাটিতে পায়েশ। শেষ বাটিটা রাখতে গিয়েই সে থেমে গেল। ইরফান স্থির চোখে তাকিয়ে আছে টেবিলের দিকে। রীতিমতো বিস্মিত স্বরে বলে উঠলো,
—” এইসব…সব তুমি বানিয়েছ?”
নীহারিকা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো।
—” হুম, তবে একা না। তামান্নাও হেল্প করেছে।”
ইরফান মাথা নেড়ে বলল,
—” এটা একটু অবিশ্বাস্য। গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি, পুরো রান্না তুমিই করেছো, তামান্না শুধু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে দিয়েছে!”
নীহারিকা লাজুক হেসে ঘাড়ে আঙুল বোলালো। ইরফান এবারে হালকা হেসে আবার বলল,
—” তুমি আসলেই রান্না পারো তো? মানে খাওয়া যাবে?”
নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে তাকালো ইরফানের দিকে। দুহাত কোঁমড়ে রেখে রাগান্বিত সুরে বলল,
—” আপনি যে এতটা বাজে লোক, আমি জানতামই না। আপনার কোনো ধারনা আছে আমি কত কিছু রাঁধতে পারি। বিয়ের আগে তো শুনেছিলেন!”
ইরফান আত্মসমর্পণ করার ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল,
—” ওকে কুল! মজা করছিলাম।”
বলেই সে এবারে খাবার হাত রাখলো। নীহারিকা এবারে শুকনো ঢোক গিলে ইরফানের পাশের চেয়ারে আস্তে করে বসে পড়লো। ঠোঁট কাঁমড়ে মিনমিন করে ডেকে বলল,
—” ইয়ে…একটা কথা বলব?”
ইরফান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—” হুম হুম বলো।”
নীহারিকা নখ খুটতে খুটতে বলল,
—” আপনার জন্য প্রথম রান্না করেছি। অনেক টেনশন নিয়ে রান্না করেছি তো, একটু নার্ভাস ছিলাম। তাই…খারাপ হলেও বকবেন না প্লিজ, খেয়ে নিন কষ্ট করে।”
কথাটা বলেই নীহারিকা চোখ নামিয়ে ফেলল। ইরফান চামচ নামিয়ে রেখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর খুব শান্তভাবে বলল,
—” শোনো, আজকের খাবারটা কেমন হলো সেটা গুরুত্বপূর্ণ না।”
নীহারিকা অবাক হয়ে তাকালে ইরফান কথা শেষ করে বলল,
—” গুরুত্বপূর্ণ হলো, তুমি বানিয়েছ। আমার জন্য। যত্ন করে আমার জন্যই রেঁধেছো, এটাই স্পেশাল! “
নীহারিকা মুচকি হেসে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। ইরফান একটু ঝুঁকে নরম গলায় বলল,
—” ইয়ে…এবার আমি একটা কথা বলব?”
নীহারিকা এগিয়ে এলো,
—” বলুন!”
—” তোমার এই বিষয়ের চেয়ে বড় একটা ঘটনা ঘটেছে। আমি কলেজ থেকে ফিরে দেখলাম, কেও আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কেও ইনায়াকে কোলে নিয়ে গিন্নিদের মত দৌড়াদৌড়ি করছে। দৃশ্য টা বেশ চমৎকার মনে হলো আমার! এখনো তার হাতের মেহেদী মুছে যায়নি, অথচ এমনভাবে সংসার গোছাচ্ছে যেন এই সংসারে সে অনেক বছর ধরে রয়েছে। আর আমি তাকে একটু ধন্যবাদ দিতেও পারছিনা। সুযোগই পাচ্ছি না। ভীষণ বিরহের কথা!”
ইরফান এমনভাবে নীহারিকা কে বলল যেন অভিযোগ করছে। কথাগুলো শুনে নীহারিকা কিছুক্ষণ পিটপিট করে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল। ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—” মানুষের দুঃখের কথা শুনে কেও হাসে? তুমি তো বড্ড অভদ্র!”
নীহারিকা ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়ালো, বলল,
—” আপনি আগে খেয়ে নিন। পরে বলছি আমি! “
ইরফান মাংস তুলে ভাতে মিশিয়ে প্রথম লোকমাটা মুখে দিল। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। নীহারিকা দাঁড়িয়ে আছে, আঙুলগুলো আঁচলে পেঁচানো। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেজাল্ট বের হতে যাচ্ছে। ইরফান ধীরে ধীরে চিবিয়ে গিলল। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে চোখ বন্ধ করল। এরপর নীহারিকাকে দেখে বলল,
—” খাম্বার মত দাঁড়িয়ে আছো কেনো আমার সামনে?”
—” খাবারের রিভিউ নিতে.. মানে…
নীহারিকার বুক কেঁপে উঠল।
—” খারাপ হয়েছে?”
ইরফান চোখ খুলে তাকাল তার দিকে। চোখে দুষ্টু ঝিলিক।
—” খুবই বিপজ্জনক।”
—” কী?”
—” এভাবে রান্না করলে তো আমি রোজ দেরি করে বাসায় ফিরব। যেন আবার এমন সার্ভিস পাই।”
এক মুহূর্ত চুপ রইলো দুজনে, এরপর এক অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। ইরফান হঠাৎ বলল,
—” বসো।”
—” না, আমি পরে খাব।”
ইরফান জিজ্ঞেস করলো,
—” মা-বাবা খায়নি?”
—” সবাই খেয়েছে।”
ভ্রু কুঁচকে তাকালো ইরফান,
—” তো আমরা দুজন একসাথে খেতে প্রবলেম কোথায়? বসো! “
ইরফানের দৃঢ়তা দেখে নীহারিকা ধীরে ধীরে চেয়ার টেনে বসল তার পাশে। ইরফান নিজের হাতেই পায়েশের বাটি এগিয়ে দিল।
—”এটা আগে চেখে দেখো।”
—”আমিই তো বানিয়েছি…!”
—” তবুও। আজ তোমারও তো প্রথম দিন। মিষ্টি মুখ করো আগে। দেখো চিনি ঠিক আছে কিনা!”
নীহারিকা চামচ তুলে একটু পায়েশ খেল। ইরফান তাকিয়ে রইল।
—”কেমন?”
নীহারিকা মৃদু হেসে বলল,
—” মন্দ না। কিন্তু…
ভ্রু উঁচিয়ে ইরফান বলল,
—” কিন্তু?”
নীহারিকা হতাশ হয়ে বললো
—” মিষ্টি কম হয়ে গিয়েছে বোধহয়। আমি কি একটু চিনি দিয়ে….
ইরফান সাথে সাথে বললো,
—” আরেহ না, কোনো দরকার নেই। ইটস ওকে।”
—” কিন্তু মিষ্টি তো কম…!”
—” সমস্যা নেই নীহা। আমি অন্যভাবে মিষ্টি পুষিয়ে নেব।”
নীহারিকা অবাক হয়ে বলল,
—” সেটা কীভাবে?”
ইরফান তৎক্ষনাৎ কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলো। নীহারিকার কৌতুহলী মুখটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আলতো করে হাসলো। ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,
—” অনেক উপায় রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে কার্যকরী উপায় টা… আমার পক্ষে খাটানো এখনো পসিবল না। তাই আপাতত আলাদা মিষ্টি নিতে হবে।”
—” কিন্তু কেনো?”
নীহারিকার কপালে টোকা মারল ইরফান। বলল,
—” কারন কার্যকরী উপায় টা অনেক…থাক লজ্জা পাবে। রাতে মনে করিয়ে দিও, তখন বলব!”
নীহারিকা আর কিছু বলল না। কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে কথার মানে বের করলো, সাথে সাথে তার মুখ লাজুকলতার মত গুটিয়ে লাল হয়ে গেল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ও নিজের লাল গালদুটো ঢাকতে সে বাকি তরকারির বাটি গুলো এগিয়ে দিতে দিতে বলল,
—” তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন আপনি।”
ইরফান মাথা নেড়ে বলল,
—” জো হুকুম মহারানী! “
নীহারিকা আড়ালে মুচকি হাসলো। নিচু গলায় বলল,
—” সবসময় এমন ভালো থাকবেন তো?”
ইরফান হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা তার আঙুলে আলতো ছোঁয়া দিল।
—” তুমি যদি এমনভাবে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকো, রান্না করে খাওয়াও, আর প্রতিদিন সুগার লেভেল বাড়িয়ে দাও, তাহলে চেষ্টা করব।”
নীহারিকা শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো। রোদটা জানালা দিয়ে ঢুকে টেবিলের ওপর পড়ছে। দুজনের উপরেই জ্বলজ্বল করছে রোদ্রমায়া! নীহারিকার হাসি দেখে ইরফানও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো, সেভাবেই তাকিয়ে রইলো অনেকটা সময়।
খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ হতেই নীহারিকা ইনায়াকে তামান্নার ঘর থেকে নিয়ে এলো। আর তখনি তার মনে পড়ল সেই কথাটা এখনো বলা হয়নি ইরফানকে। সে দ্রুত ইনায়াকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখলো ইরফান বিছানায় আরাম করে শুয়ে পড়েছে। হাতে ফোন। নীহারিকা এবারে ইনায়াকে ইরফানের কোলে দিয়ে দিলো, পাশে বসে বলল,
—” একটা জরুরি কথা ছিল। তখন বলতে ভুলে গিয়েছি।”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” কী?”
—” শুনেছি, বাবা আজ অফিসে কি একটা ঝামেলার কারনে আটকে গিয়েছেন। উনি আজ দেরিতে বাড়িতে ফিরবেন। আবার এদিকে নাকি তামান্নার মিরপুরে যাওয়ার কথা। ওকেও ড্রপ করতে হবে। তাই মা বলেছে আপনি যেন তামান্না কে মিরপুরে ড্রপ করে দিয়ে আসেন। বিকেলের পর!”
ইরফান সোজা হয়ে বসলো। নীহারিকার দিকে তাকালো পূর্ণদৃষ্টিতে, তার কোমল হাতজোড়া নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” আগে বলো, তুমি শাড়ি পাল্টালে কেনো?”
নীহারিকা অবাক হলো,
—” কি আশ্চর্য! কথা ঘোরাচ্ছেন কেনো? তামান্না কে দিয়ে আসবেন না?”
ইরফান চোখ বুঁজে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
—” ড্রাইভার পাঠিয়ে দেব।”
—” সে কি কথা! মা বলেছেন আপনাকে দিয়ে আসতে। আর তাছাড়া, ও এতদুর একা একা কেনো যাবে? কিছুদের জন্য যেহেতু যাচ্ছে তাই আপনার এগিয়ে দেয়া উচিত হবে।”
নীহারিকা বেশ স্বাভাবিক ভাবেই কথাটা বলল। ইরফান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। পৃথিবীতে অনেক সময় এমন কিছু সমীকরণ মানুষের জীবন তৈরী করে দেয়, যা ভীষণ জটিল এবং মন্দ। আগুন ও পানি কে একসাথে রাখা হলে কেও একজন ধ্বংস হবে নিশ্চিত। ইরফান তা বোঝে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
—” আমি ক্লান্ত নীহা।”
নীহারিকা জেদ ধরলো। এগিয়ে এসে ইরফানের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
—” আমি কোনো কিচ্ছু শুনতে চাইনা। আপনিই গিয়ে তামান্না কে দিয়ে আসবেন ব্যাস! বাবা ফিরে এসে যখন শুনবে আপনি কথা শোনেন নি, তখন খুব বকাবকি করবেন উনি। যেটা আমি দেখতে চাইনা। তাই আপনি যাবেন এটাই শেষ কথা। এই নিন কফি, খেয়ে তৈরী হয়ে নেবেন। আর অবশ্যই আসার সময় ইনায়ার জন্য খেঁজুর আনবেন।”
বলেই নীহারিকা হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। হাতে গরম কফির কাপটা ধরে ইরফান ঠোঁট কাঁমড়ে কিছু একটা ভাবলো। ঠোঁট গোল করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিন্তা করতে থাকলো কী করা যায়।
চলবে…
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা পর্ব ১০
-
নবরূপা পর্ব ১৫
-
নবরূপা পর্ব ৪
-
নবরূপা পর্ব ৩
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা পর্ব ১৩
-
নবরূপা পর্ব ৭
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ৯