নবরূপা
পর্ব_১২
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
নতুন সকালের নতুন আলো জানালার ফাঁক গলে কবির মহলের সবচেয়ে সুন্দর ঘরে প্রবেশ করতেই নীহারিকার চোখ পিটপিট করে উঠলো। চোখমুখ কুঁচকে নিয়ে সে নড়েচড়ে উঠলো ঘুমের মধ্যেই। আশেপাশে হাতিয়ে কাঙ্খিত জিনিসটা খোঁজার চেষ্টা করলো, কিছুক্ষণ পর পেয়েও গেলো, এবং সাথে সাথে তা বাহুতে জড়িয়ে ধরে আবারো আবেশে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো। কিন্তু স্তব্ধ হয়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো ইরফান কবির, মোটামুটি চমকে গিয়ে আধশোয়া হয়ে রয়েছে সে। খুব ভোরেই ঘুম ভেঙেছিল তার, স্বভাব বসত দ্রুতই বিছানা থেকে উঠতে চেয়েছিল। কিন্তু নীহারিকার কাছে খারাপ লাগবে বলে শুয়েই ছিল চিত হয়ে। সিলিং ফ্যানের দিকে চোখ রেখে ভাবছিল অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত! হুট করে নীহারিকার নড়াতে সে ভেবেছে উঠে পড়েছে মেয়েটা। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণিত করে ও চারশ চল্লিশ ভোল্টেজের তীব্র শক দিয়ে নীহারিকা ঘুমের ঘোরে ইরফানের শক্তপোক্ত হাতটাকে কোলবালিশ মনে করে নিজের কাছে জড়িয়ে নিলো। খেয়ালই করলো না এটা কোলবালিশ নয়! আর অকারণেই চমকে দিলো বেচারা ইরফান কবিরকে।
ইরফান বেশ সময় নিয়ে তাকিয়ে দেখলো ঘুমন্ত নীহারিকা কে। নাহ! বেশ চমৎকার লাগছে নববিবাহিতা মেয়েটিকে। নাক ফুলটা চিকচিক করছে সূর্যের আলোয়! চোখের পাপড়ি কাঁপছে অকারণেই! অনেকটা কাছ থেকে নীহারিকা কে দেখে অজান্তেই মুচকি হাসলো ইরফান। এরপর জেগে গেলে নিজের বুকের কাছে ইরফান কবিরের হাত জড়িয়ে রাখতে দেখে নীহারিকা কতবার হার্ট অ্যাটাক করবে তা ভেবে সহানুভূতির খাতিরে ইরফান নিজে থেকেই খুব সাবধানে হাতটা সরিয়ে নিলো নীহারিকার বন্ধন থেকে। সরে গেলো খানিকটা! আবারো উপরে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—” আলো আঁধারের মধ্যিখানে নিবদ্ধ এক পুরুষ! কখনো কি সফল হতে পারে? পারে না আলোর পথে যেতে? আঁধার কি উপেক্ষা করা একটুও সহজ নয়?”
ভাবলো ইরফান। শুকনো ঢোক গিলে তাকালো নীহারিকার দিকে। এরপর ঝট করেই বিছানা থেকে নেমে পড়ে রীতিমতো ছুটে গেলো বারান্দায়। সেখানে রাখা টেবিলের ড্রয়ার থেকে বের করলো একটা কুচকুচে কালো রঙের পুরোনো ডায়েরী। খুব বেশি পুরোনো নয়! তবে ব্যবহৃত! সেই ডায়েরি টা সতর্কতার সাথে আলমারির একদম নিচ তাকে পুরোনো কাপড়ের ভিড়ে লুকিয়ে রাখলো ইরফান। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো ফিরে গেলো বিছানায়৷ এবারে আর শুয়ে পড়লো না। নীহারিকার বাহুতে হাত রেখে আলতো ঝাঁকিয়ে ডাকতে থাকলো,
—” নীহা, শুনছো? ওঠো! খুব বেশি ক্লান্ত তুমি?”
কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করার পরেও যখন নীহারিকার কোনো আওয়াজ পাওয়া গেলো না, তখন ইরফান বাধ্য হয়ে তার গালে হাত রেখে ডাকতে চাইলো। কিন্তু গালে হাত রাখতেই চমকে উঠলো ইরফান। যেন আগুনে ছুঁয়েছে সে। তার গলা এক ঝটকায় বদলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত ঘুম, সমস্ত ভাবনা উধাও।
ইরফান নীহারিকার কপালে হাত রাখল আবার। এবার সন্দেহ নেই—গা জ্বরে পুড়ছে। ঠোঁট শুকনো। নিঃশ্বাস ভারী। ইরফান নড়েচড়ে একদম বিছানার উপরে বসে পড়লো, এগিয়ে গেলো নীহারিকার দিকে, কণ্ঠে চাপা আতঙ্ক নিয়ে বলল,
—” নীহা, চোখ খোলো।”
নীহারিকা কেবল অল্প কুঁকড়ে উঠল। চোখ আধখোলা করল বটে, কিন্তু দৃষ্টি ঝাপসা। ফিসফিস করে বলল,
—” ঘুম পাচ্ছে!”
ইরফানের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিল। কাল রাতের এত আবেগ, এত টেনশন, বিদায়ের কান্না সব মিলিয়ে শরীরটা হয়তো ভেঙে পড়েছে মেয়েটার। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। দ্রুত উঠে গিয়ে টেবিল থেকে পানি আনল। ফিরে এসে নীহারিকার মাথা আলতো করে তুলে নিজের কাঁধে ঠেকাল।
—”একটু পানি খাও। প্লিজ।”
মেয়েটা ঠিকমতো গ্লাস ধরতেও পারছে না। ইরফান নিজেই ধীরে ধীরে ঠোঁটে ছোঁয়াল। কয়েক চুমুকের বেশি গেল না। তার কপালে আবার হাত রাখল। জ্বর বাড়ছে যেন। মনের ভেতর হালকা অপরাধবোধ খোঁচা দিল ইরফানের। তার কি কোনো ভুল ত্রুটি হলো? নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, মানসিক চাপ, সে কি খেয়ালই করেনি মেয়েটা কতটা ক্লান্ত? ও যে অসুস্থবোধ করছে বোঝেনি কেনো সে?
ইরফান নিজেকে মনে মনে দোষারোপ করে খুব নিচু স্বরে বলল
—”আমি আসছি!”
দ্রুত ফোন বের করে পারিবারিক ডাক্তারকে কল দিল ইরফান। গলার স্বর শান্ত রাখার চেষ্টা করলেও তাড়াহুড়োটা চাপা থাকল না। ডক্টর ইনফর্ম করে ফোন রেখে আবার বিছানার পাশে বসে পড়ল। নীহারিকার আঙুলগুলো মুঠোয় নিলো। এবার সে নিজেই শক্ত করে ধরল। ঘুমের ঘোরে নীহারিকা অস্পষ্টভাবে বলল,
—” আমার খুব খারাপ লাগছে। উঠতে পারছি না।”
ইরফান ঝুঁকে খুব স্থির কণ্ঠে বলল,
—” সমস্যা নেই। উঠতে হবে না। শান্ত থাকো, আমি আছি। কোথাও যাচ্ছি না।”
চোখে আর কোনো দ্বিধা নেই এখন ইরফানের। সকালের আলো জানালা ভরে ঢুকছে, কিন্তু ইরফানের সমস্ত মনোযোগ এখন এই জ্বরাক্রান্ত মুখটায়। আলো-আঁধারের দর্শন পরে ভাবা যাবে—এই মুহূর্তে তার পৃথিবী কেবল একটাই।
খানিকক্ষণ বাদে জ্যোতি আর ইয়াশা বেচারা হুসাইনকে সঙ্গী বানিয়ে ইরফানের ঘরের বদ্ধ দরজায় কান চেপে ধরলো, উদ্দেশ্য কোনোভাবে জানতে পারা ভেতরে সকাল সকাল কিছু হচ্ছে কিনা! দুজনে উঠেছে কিনা। এরমধ্যেই কলিং বেল বেজে উঠতেই সবাই একটু অবাক হলো। আরো বেশি অবাক হলো এত সকাল সকাল বাড়িতে ডক্টর আসতে দেখে। জ্যোতি আর ইয়াশা রীতিমতো হা করে তাকিয়ে রইলো ইরফানের ঘরের দিকে। এ কি অবস্থা! বাসর রাতের পরের দিনই ডক্টর? হাও স্ট্রেন্জ! আয়েশা বেগম ঘরে এসে নীহারিকার জামাকাপড় বদলে দিলেন, ইরফানকে আরো কিছু জ্ঞান দিয়ে খাবার তৈরী করতে চলে গেলেন।
আত্মীয় দের আনাগোনা বাড়তে থাকলো বৌভাতের জন্য। অথচ নীহারিকার অবস্থা খুব একটা ভালো না।৷ সকাল থেকে চোখদুটোও খুলতে পারেনি এখনো পর্যন্ত। অবস্থা একটু বেশি খারাপ দেখে ইয়াহিয়া কবির উপস্থিত সকল মেহমানদের অনুরোধ করলেন আজকের দিনটা তাদের বাড়িতে থেকে যেতে, কাল বা পরশু বৌভাতের অনুষ্ঠান হবে। নিভু চোখে, আধো জ্ঞানে নীহারিকা বুঝতে পারলো তার জন্য বৌভাতের অনুষ্ঠান পিছিয়ে দিয়েছে তার শ্বশুর! মনে মনে হাজারো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল সে।
সারাটাদিন বেশ ম্যাড়মেড়ে কাটলো নীহারিকার কাছে। কিছুই বুঝতে পারলো না সারাদিনে তার সাথে কী হয়েছে। তবে বিয়ে বাড়ির আমেজ টা বেশ সুন্দর করে চমৎকার নিয়মে ধরে রেখেছে জ্যোতি, ইয়াশা, হুসাইন, নাহিদসহ সকলে। নাচ-গান করে মেহমান দেরও খুশি রাখছে তারা। আয়েশা বেগম আত্মীয়দের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন, অনেকে রান্নাবান্না করেও খাচ্ছেন, সময় কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে তামান্না অনেক পরিশ্রম করেছে। তার অবস্থা একদম কাহিল! সে কোনোমতে ইনায়াকে খাবার খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল নিজের ঘরে। ছোট্ট ইনায়া যেন বড় হয়ে গিয়েছে। নিজে থেকেই বিছানা থেকে নেমে সে গুটিগুটি পায়ে পথ ধরলো তার বাবার নতুন ঘরে।
নতুন ঘরটা ভীষণ সাজানো! ইনায়া এটারও কৌতুহল নিয়ে ঝট করে দরজায় ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলল। দরজাটা ঠেলে খুলতেই ফুলের গন্ধটা আবারো নাকে এলো ইনায়ার। গোলাপ, বেলী, আর হালকা মোমের মিশ্র গন্ধ—ঘরটা আজ অন্যরকম। ছোট্ট পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকলো সে। বিছানার দিকে তাকাতেই থমকে গেল। দেখলো সে এক মনোহর দৃশ্য!
নীহারিকা শুয়ে আছে সাদা চাদরের উপর। মুখটা ফ্যাকাশে, কপালে ভেজা কাপড়। চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে কপালের পাশে লেগে আছে। ভারি সাজসজ্জা নেই, শুধু একরকম ক্লান্ত সৌন্দর্য। আর বিছানার ঠিক পাশে, মেঝেতে বসে আছে ইরফান। পিঠটা বিছানার গায়ে ঠেকানো। এক হাত তুলে বালিশের কাছে রেখে দিয়েছে, যেন কপালের কাপড়টা ঠিকঠাক থাকে। অন্য হাতে এখনও চেপে ধরা ভেজা তোয়ালে। মাথাটা সামান্য কাত হয়ে আছে বিছানার প্রান্তে। চোখ বন্ধ। ঘুমিয়ে পড়েছে সে। কিন্তু সেই ঘুমে আরাম নেই—একটা পাহারাদারের মতো ক্লান্ত ঘুম। কপালে হালকা ভাঁজ, যেন ঘুমের মধ্যেও দায়িত্ব ছেড়ে দেয়নি। ইনায়া কয়েক সেকেন্ড বোঝার চেষ্টা করলো। বাবা মেঝেতে কেন? পরির মত মেয়েটা বিছানায় কেন? এই ভেজা কাপড় কেন?
ইনায়া এগিয়ে এলো ছোট ছোট পদক্ষেপে।ইরফানের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ! বন্ধ চোখের পাতায় আঙুল ছোঁয়ালো। এই অভ্যাসটা ইনায়ার অনেক আগে থেকেই। ইরফানকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেলে সে হা করে নিজের বাবা কে দেখে আর মুখে ছুঁয়ে দেয়। এমনিতেই ইরফানের ঘুম হালকা,, তার উপর আবার অতিপরিচিত তার মেয়ের আঙুলের ছোঁয়া অনুভব করতেই ইরফান চমকে উঠে চোখ মেলল। মুহূর্তের জন্য বুঝতেই পারলো না সে কোথায়। তারপর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল নীহারিকার মুখে। তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে বসল। কোলে তুলে নিলো ইনায়াকে,
—” মা আমার! এখানে কেনো তুমি হুম? মিস করছিলে বাবা কে?”
বলেই চুমু খেলো ইরফান। আদর করলো মেয়েকে। ইনায়া গম্ভীর মুখ করে বিছানার দিকে তাকিয়ে থাকলো। নীহারিকা কে দেখলেই সে তাকিয়ে থাকে অকারনেই। তবে কাঁদে না! কিছুক্ষন চোখ বুলিয়ে ইনায়া তর্জনী তাক করলো নীহারিকার দিকে, আধোস্বরে বলল,
—” ঘুমাচ্ছে?”
ইরফান হেসে ফেলল,
—” হ্যাঁ মা, তোমার মাম্মা ঘুমাচ্ছে! “
ইনায়া বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। ছোট্ট আঙুল দিয়ে আলতো করে নীহারিকার হাত ছুঁয়ে দিল। বলল,
—” আমিও ঘুমাব।”
ইরফান হালকা হাসলো। কোলে তুলে নীহারিকার পাশে শুইয়ে দিলো ইনায়া কে। বুক, পেটে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলো। ইনায়া খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। তারপর সরে গিয়ে নীহারিকার পাশে গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল। ইরফান সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এ এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য! ইনায়া কেনো নীহারিকা কে এত আপন করে নিচ্ছে। কিছুক্ষণ ভাবতেই ইরফান একটা জিনিস লক্ষ্য করলো। সে জানে ইনায়ার পছন্দের খেলনা হলো ডিজনেয় প্রিন্সেস ডলগুলো! আর এই মুহুর্তে পার্পেল গাউনে ঘুমন্ত নীহারিকা কে দেখে ইনায়া রুপানজেল মনে করেছে বোধহয়! তাই নিজে থেকেই এত কাছে গিয়েছে। ইরফান ফিক করে হেসে ফেলে মেয়ের দিকে তাকালো, তবুও এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ভরে উঠলো তার হৃদয়! সে তো এটাই চেয়েছিল!
ইরফান আলতো করে আবার ভেজা কাপড়টা চিপে নিয়ে কপালে রাখলো নীহারিকার। এবার একটু বেশি যত্নে, যেন ইনায়ার সামনে তার দায়িত্বে কোনো ত্রুটি না থাকে। ঘুমের ঘোরে নীহারিকা সামান্য নড়লো। চোখ আধখোলা করলো। দৃষ্টি ঝাপসা। কিন্তু সে বুঝলো—কেউ আছে। ঝাপসা তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলার চেষ্টা করলেও পারলো না। ইরফান তৎক্ষণাৎ ঝুঁকে এলো। ইনায়ার কপালে চুমু খেয়ে নীহারিকার গালে হাত বুলিয়ে দিলো। ঘরের ফুলগুলো নীরব সাক্ষী হয়ে রইলো। বাসর রাতের রোমান্টিকতা আজ বদলে গেছে অন্যরকম কোমলতায়। আর ইরফান কবির— আজ প্রথমবার, সত্যিকারের এক ঘর এর স্বাদ পেল।
চলবে…
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা পর্ব ১১
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ১০
-
নবরূপা পর্ব ৯
-
নবরূপা গল্পের লিংক
-
নবরূপা পর্ব ৮
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা পর্ব ৩
-
নবরূপা পর্ব ৪