নবরূপা
পর্ব_১০
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
বিয়ের সময়টা যতটা আনন্দের হয়, ঠিক ততটাই কষ্ট হয় বিদায়ের সময়টায়, ততটাই নীরব আর ভারী।হাসি, আলো, কোলাহল—সব যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে বিদায়ের মুহূর্তে। নীহারিকা তখন গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। চোখ নামানো, হাত দুটো মায়ের আঁচল শক্ত করে ধরে আছে। এতক্ষণ যে মেয়েটা স্থির ছিল, সেই মেয়েটার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে ভেঙে পড়ছে। এত এত বছর মায়ের আদরে, বাবার ছায়ায় থাকা মেয়েটা এভাবে চলে যাবে ভাবতেই কষ্ট হয় নাঈমুল ইসলামের। নিলয় আজ একদম চুপচাপ, সে পারছে না নিজের ভেতরকার অস্থিরতা কে মুক্তি দিয়ে জাপটে ধরতে আদরের বোনকে। আড়ালে চোখের পানি মুছে সে বোনের বাহুতে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “ভালো থাকিস, আমরা তো তোকে দেখতে যাব কাল।”
রাবেয়া বানু আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। মেয়ের মুখটা দুহাতে ধরে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলেন।
—” ভালো থাকিস মা, নিজের যত্ন নিবি। কাউকে কিচ্ছু বলতে ভয় পাবি না।”
কথাগুলো বলার সময় তার গলাটা কেঁপে উঠলো। চোখের পানি টুপটাপ পড়ে নীহারিকার হাতে।
নীহারিকা কিছু বলতে পারলো না। শুধু মাথা নেড়ে চোখের পানি ঝরতে দিল। এতদিন যাকে ‘মা’ বলে ডেকেছে, আজ সেই ডাকটার ভেতরেও বিচ্ছেদের একটা টান। বাবার দিকে তাকাতেই বুকটা আরও মোচড় দিল। নাইমুল ইসলাম চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন এতক্ষণ। মেয়ের চোখে পানি দেখে আর শক্ত থাকতে পারলেন না। ধীরে এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখলেন।
—” আমার মেয়েটা অনেক সাহসী। আমি জানি।” বললেন তিনি।” একদম ভয় পাবি না, চিন্তা করবিনা, এই বাড়িটা তোর জন্য সবসময় খোলা।”
নাঈমুল ইসলামের কন্ঠই নীহারিকার বাঁধ ভেঙে দিল। হাউমাউ করে কান্না না এলেও, নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো সে। বাবা-মায়ের বুকের আবেশ, বাড়ির উঠোন, ছোট ছোট স্মৃতি—সব একসাথে তাকে আঁকড়ে ধরছে।
আয়েশা বেগম এগিয়ে এসে নীহারিকার হাত ধরলেন। গলায় দৃঢ়তা, চোখে মমতা।
—” আর কেঁদো না বোকা মেয়ে। এখন থেকে তো তুমি আমাদের মেয়েও। দুদিন পর তো এখানে বেড়াতে আসবে আবার! কাল সবাই যাবে আমাদের বাড়িতে।”
শেষবারের মতো ঘরটার দিকে তাকালো নীহারিকা। যে ঘরে সে বড় হয়েছে, যে আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে নিয়ে প্রশ্ন করেছে—সব আজ পেছনে রয়ে যাচ্ছে।
নাঈমুল ইসলাম ইশারা করতেই ইরফান এগিয়ে এসে ভেঙে পড়া নীহারিকা কে বাহুতে জড়িয়ে নিলো আলতো করে। ধরে নিয়ে এসে গাড়িতে বসিয়ে দিলো। নাঈমুল ইসলামের হাত আঁকড়ে ধরল ইরফান, বলল,
—” আপনি চিন্তা করবেন না বাবা। যেভাবে নিয়ে যাচ্ছি, সেভাবেই সারাজীবন থাকবে ইনশাআল্লাহ! “
নাঈমুল ইসলাম চোখ বুঁজে মাথা নাড়লেন। গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই নীহারিকার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে শুরু করলো। ইরফান কিছু বলল না। কাঁদতে দিলো নিজের মত করে। একটু হালকা হলেও ভালো! গাড়ি চলতে শুরু করলো। জানালার বাইরে ক্ষীণ আলো, মানুষ, পরিচিত গাছপালা—সব দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছে। নীহারিকা মুখ ফিরিয়ে চোখ মুছলো। ইরফান কিছু বললো না। শুধু নীরবে পাশে বসে আছে—এই নীরবতাটুকুই এখন সবচেয়ে বড় আশ্বাস।
কবির মহল এখান থেকে বেশ দূরে। ঘন্টাখানেক লাগে পৌঁছাতে, আর ট্রাফিক জ্যাম থাকলে তো দেড় থেকে দু ঘন্টা সর্বনিম্ন। বিশ মিনিট পরেও যখন নীহারিকার চোখের পানি থামার কোনো নাম নেই, ইরফান কিছু না বলেই নীহারিকার কাঁধে হাত রেখে তাকে কাছে টেনে নিল। নীরবে নিভৃতে আগলে নিল। নীহারিকা আশ্রয় পেয়ে ইরফানের বুকের কাছটায় মাথা ঠেকিয়ে পাঞ্জাবি আঁকড়ে ধরে লুকিয়ে নিলো নিজেকে, ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকলো। ইরফান কাঁধের হাতটা উঠিয়ে নীহারিকার ঘোমটার উপর থেকেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো আলতো স্পর্শে।বিড়বিড় করে বলল
—” হয়েছে, আর কেঁদো না। মাথা ব্যাথা করবে তো।”
নীহারিকা কান্নার মাঝেও অবাক হলো। “আপনি” সম্বোধন থেকে “তুমি” হয়ে গেলো কেনো? নাক টেনে কান্নার রেশ কমালে ইরফান নিজে থেকেই বলে,
—” তুমি করেই বলব এখন থেকে। আগে তো বউ ছিলে না, তাই আপনি বলেছি। তুমি কি এখনো “আপনি” শোনার আশা করো? আমাকে খুব ভদ্র মনে হয়?”
নীহারিকা সত্যি সত্যি মাথা নেড়ে সরল মনে বোঝালো, – হ্যাঁ, খুব ভদ্র মনে হয়। ভাবলো, ইরফান কবির তো ভদ্রই। এখানে মনে করার কী আছে? প্রথম দিনেই বুঝেছে কত ভদ্র মানুষটা। অথচ তাকে ভুল প্রমাণ করে ফিচেল হাসলো ইরফান। আরো নিচু স্বরে বলল,
—” আমি একটুও ভদ্র নই নীহা।”
দ্বিতীয় বারের মত অবাক হলো নীহারিকা। নীহা কে? এটা কি নতুন কোনো ডাকনাম দিল তার সদ্য বিবাহিত স্বামী। বেশ তো! নামটা ছোটখাটো! ভালো লাগলো নীহারিকার। তবে ডাক টা পছন্দ হলেও আগের বাক্য টায় ভ্রু কুঁচকালো। ভদ্র নয় মানে? ভদ্র বলেই তো বিয়েতে রাজি হয়েছে সে। এখন ভদ্র নয় বলছে কেনো? এ তো বিরাট প্রতারণা। এ বিষয়ে পরে একটা রেষারেষি করবে বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো নীহারিকা। আপাতত কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে বলে কিছু বলল না। শুধু মনে মনে দোয়া করল,
— আল্লাহ, আমার পরিবার কে ভালো রেখো। বাবা যেন সুস্থ থাকে, মা যেন টেনশন না করে। ভাইয়া যেন ক্যারিয়ার গোছাতে পারে। আমি যেন নতুন জীবন ভালো করে কাটাতে পারি।
নীহারিকা এখনো সেভাবেই রয়েছে। শুধু ইরফানের কথা শোনার জন্য কান্নার শব্দ কমিয়েছিল। ভেজা চোখগুলো পিটপিট করে সে তাকিয়ে রয়েছে সামনের রাস্তায়। ইরফানের বুকে ঠেকানো মাথাটা সে এখন ওঠাবেই না, লজ্জায় মরিমরি অবস্থা হবে নইলে। তাই কান্না থামিয়ে নাক টেনে টেনে পাঞ্জাবিতে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি করতে থাকলো নীহারিকা। রাস্তায় ফাঁকে ফাঁকে ল্যাম্পপোস্টের আলো গাড়িতে নীহারিকার মুখে পড়ছে মাঝে মাঝে, আর সেই আলোতেই স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলো ইরফান। চেহারা চকচক করছে মেয়েটার। কাঁদার পর মেয়েদের দেখতে খুব মিষ্টি লাগে বুঝি?
কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামলো। কবির মহল। বিশাল গেটের সামনে গাড়ি থামতেই নীহারিকা আলতো করে ধীরে সরে এলো। ইরফান এক পলক দেখে হাসলো, আগে নেমে পড়লো। চারপাশে আলো ঝলমল করছে, বাড়িটা যেন নতুন করে সাজানো, কিন্তু নীহারিকার চোখে তখনো জল চিকচিক করছে। ইরফান দরজার পাশে এসে দাঁড়ালো। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, কিন্তু যত্ন নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল।
—” নামো!”
নীহারিকা তার দিকে তাকালো। চোখ ভেজা, মন ভরা। তবু সেই বাড়ানো হাতটা ধরলো সে। এই প্রথমবার, কবির মহলের মাটিতে পা রাখলো নীহারিকা—একটা নতুন নাম, নতুন পরিচয়, আর অজানা ভবিষ্যৎ নিয়ে।
আয়েশা বেগম তড়িঘড়ি করে আগেই বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। আর ইরফান নীহারিকার হাত চেপে ধরে এগোতে থাকলো। আত্মীয় স্বজনরা অনেকে ভিড় করে ফেলেছে।খুবই মিষ্টি একটা মুহুর্ত। এর মাঝেই হুসাইন এসে সবাইকে ঘরে ঢুকিয়ে দিলো। কারন নীহারিকা কে যেন কেও এখন বিরক্ত করতে না পারে। ইয়াহিয়া কবির আগেই বলে দিয়েছেন, নতুন বউ আসলে কেও যেন ভিড় না করে। আগে বউ ঘরে ঢুকবে, ফ্রেশ হবে। তারপর সবাই বউ দেখবে। দরকার পড়লে আজ আর দেখাদেখিরও দরকার নেই। একদম সকালে দেখুক। এমনিতেও কাল বউভাত।
ইরফান তাই বেশ সহজেই নীহারিকা কে নিয়ে সদর দরজা পার করতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন উড়ে এসে ফড়িং এর মত কোঁমড়ে হাত রেখে দাঁড়ালো ইয়াশা, পাশে এসে ব্রেক কষলো জ্যোতি, সে নীহারিকা কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সকালেই কনে পক্ষ থেকে রিজাইন নিয়ে বরপক্ষে সামিল হয়েছে। মুখে দুষ্টু হাসি দুজনেরই। ইরফান বিভ্রান্ত হয়ে তাকাতেই ইয়াশা ইরফান ও নীহারিকার পাশে গোল গোল ঘুরতে ঘুরতে বলতে থাকলো,
—” হ্যালো নিউ কাপল! আমি জানি আপনারা এখন খুব ক্লান্ত। বিশেষ করে আমার ভাবি। কিন্তু আমাদের কবির মহলে একটা বিশেষ নিয়ম রয়েছে, যেটা না মানলে আসলে নতুন দম্পতিকে ঢুকতে দেয়া হয়না। তাই আপনাদের কেও এই নিয়ম মেনে বাড়িতে ঢুকতে হবে।”
ইরফান চোখ সরু করে নিজের ছোট বোনের দিকে তাকালো। বিচ্ছুটা আবারো নতুন কোনো ভন্ডামি করছে। নীহারিকা অবশ্য বেশ গুরুতর দৃষ্টিতে তাকালো, বিষয়টা সিরিয়াস লাগছে তার কাছে। জ্যোতিও ইয়াশার কাঁধে হাত রেখে বলল,
—” সহমত।”
নীহারিকা না থাকলে ইরফান দুটো থাপ্পড় মারতো ইয়াশা কে। ভদ্রতার খাতিরে সেটাও পারছে না বলে সে দাঁত খিঁচিয়ে বলল,
—” কী নিয়ম ম্যডাম? বলে উদ্ধার করুন।”
ইয়াশা মুখ কুঁচকে তাকিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
—” ওয়েট! এত তাড়া কেনো? বাসর ঘর তো সাজানোই হয়নি এখনো। গিয়ে কি গোলাপ ছাড়া প্রেমালাপ করবে?”
খুকখুক করে কেশে উঠলো ইরফান। চোখ গরম করে তাকালো ইয়াশার দিকে। নীহারিকা এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে আলগোছে হাত ছাড়িয়ে নিলো ইরফানের মুঠো থেকে। ইরফানের হাত ছাড়িয়ে নিতেই যেন ইয়াশার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। ঠিক এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিল সে। হাততালি দিয়ে উঠলো ইয়াশা।
—” ওকে! নিয়ম শুরু করার আগে জানিয়ে দিচ্ছি, এই নিয়মটা একদম সিরিয়াস। কবির মহলের বহু পুরনো রেওয়াজ।”
ইরফান সন্দেহভরা চোখে তাকালো। বলল,
—” এই রেওয়াজটা ঠিক কবে থেকে শুরু হলো? আজ দুপুরে না তো?”
জ্যোতি ঠোঁট চেপে হাসি লুকিয়ে বলল,
—” নিয়মের বয়স নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। নিয়ম ইজ নিয়ম। নিয়মটা কয় মিনিট আগে চালু হয়েছে সেটা বড় কথা না৷ বড় কথা হলো, নিয়ম মানতেই হবে।”
নীহারিকা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইয়াশা একদম ঘোষণার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
—” নিয়ম নম্বর এক— নতুন বউ নিজের পায়ে হেঁটে সদর দরজা পার করতে পারবে না।”
নীহারিকার চোখ বড় হয়ে গেল।
—”মানে?”
ইয়াশা নিষ্পাপ মুখ করে বলল,
—” মানে, ইয়ে আর কি..বর সাহেবকে তার বউকে কোলে করে ভেতরে নিতে হবে।”
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। ইরফানের গলা একটু বেশি জোরে বেরিয়ে গেল।
—” হোয়াটটটট?”
ইয়াশা ভ্রু নাচিয়ে বলল,
—” হ্যাঁ। একদম কোলে। সিনেমাটিক স্টাইলে। নাহলে কবির মহলে ঢোকা নিষেধ।”
নীহারিকার মুখটা মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠলো। কান পর্যন্ত রঙ ছড়িয়ে গেল। সে জ্যোতি কে ইশারা করলো না সূচক! কিন্তু জ্যোতি এখন বরপক্ষ হওয়ায় দাঁত বের করে হাসলো শুধু। ইরফান এবার বুঝলো, পালানোর কোনো রাস্তা নেই। চারপাশে আত্মীয়স্বজন নেই, তবে কাজের লোক আর কাজিন মহলের ক’জন—সবাই কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে। ইয়াহিয়া কবিরের হুকুমে কেউ ভিড় করেনি ঠিকই, কিন্তু এই দৃশ্য মিস করবার মানুষও নেই।
ইরফান দাঁত চেপে ইয়াশার দিকে তাকালো।
—” তুই পরে মরবি।”
ইয়াশা খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠলো।
—” আগে নিয়ম পালন করো, পরে হ”ত্যার কথা ভাববে।”
ইরফান ইয়াশাকে টেনে এনে পাশে দাঁড় করালো। কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” ট্রাকটাপা দিয়ে মেরে দিব তোকে বেয়াদব। ইনায়া দেখলে কী ভাববে?”
ইয়াশা চোখ পিটপিট করে বলল,
—” ওকে তো ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি।”
ইরফান থতমত খেলো৷ আবারো ইয়াশার বাহু চেপে ধরে বলল,
—” ঝামেলা করিস না তো। নীহারিকা আনকম্ফোর্ট ফিল করবে। দরজা ছাড়। যেতে দে।”
—” কিন্তু নিয়ম…
—” শাট আপ। নীহারিকা কে ফ্রি হতে দে। কী শুরু করেছিস? বেচারি ভয় পেয়ে যাবে।”
—” কিন্তু ভাইয়া…!”
ইরফান রীতিমতো চোয়াল শক্ত করে বলল,
—” আমি জানি তুই এগুলো কার বুদ্ধিতে করছিস। ভালো করে শোন, জোর করে কিছুই হয় না। সময় দে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন ঢঙ না করে রাস্তা ছাড়!”
ভাই-বোনের এই রেষারেষির মাঝেই হাজির হলো প্রাণবন্ত হুসাইন, গলায় ক্যামেরা ঝুলছে তার। অনেক গুলো ছবি তুলেছে সে সারাদিনে। এসেই লম্বা করে সালাম দিল নীহারিকা কে। বলল,
—” কি আশ্চর্য! নতুন ভাবি এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে কেনো?”
জ্যোতি আগ বাড়িয়ে হতাশ কন্ঠে বলল,
—” উনারা টিকিট পায়নি এখনো। নিয়ম বাকি রয়েছে।”
এর প্রতিউত্তরে ইরফান কিছু বলার আগেই আবারো ঝড়ের গতিতে হাজির হলো ইরফানের বেস্ট ফ্রেন্ড নাহিদ। সে এসেই হৈ হৈ শুরু করলো,
—” ও ওয়াও! দোস্ত আইসো গেছোস তুই? হোয়ার ইজ ভাবি?”
রকস্টার টাইপ ড্রেস পরিহিত নাহিদকে দেখে নীহারিকা চমকালো। সবাই হতাশ হয়ে শ্বাস ফেলল। নাহিদ আসলে প্রচুর চঞ্চল আর প্রাণবন্ত। সবাই তো এটা ভেবে পায় না, এটার মত একটু চুনোপুঁটি মাছ কীভাবে ইরফানের মত হাঙ্গরের বেস্ট ফ্রেন্ড হয়। মানে কীভাবে মেলে এই বন্ড? নীহারিকা কে দেখেই মুখে হাসি নিয়ে এলো নাহিদ,
—” হোয়াটস আপ ভাবি? অল ওকে। হেই গার্লস, সাইড দাও। ভাবি কে আসতে দাও নি কেনো?”
এবারে ইয়াশা অভিযোগ বাক্সের মত নাহিদকে পেয়ে সব অভিযোগ ঢেলে দিয়ে কান্নারত সুরে বলল,
—” দেখুন না নাহিদ ভাই, ভাইয়া কেমন নিরামিষ বুড়োর মত ব্যবহার করছে! আমাদের ওই স্পেশাল নিয়মটা ভাইয়া মানতে চাইছে না।”
মূলত নাহিদের বুদ্ধিতেই এই নিয়ম বানিয়েছিল সে।
নাহিদ এবারে সানগ্লাস ছুঁড়ে ফেলে চোখ বড় করে তাকালো ইরফানের দিকে। যেন এইমাত্র সে কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধ ধরে ফেলেছে।
—” বন্ধু, এসব..এসব কী শুনছি আমি!”
ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই ঝড় আসারই বাকি ছিল। নাহিদ দুই হাত কোমরে রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে এক পা এগিয়ে এলো।
—” মিস্টার ইরফান কবির, প্রেমে পড়লে নাকি মানুষ সাহসী হয়। আর বিয়ের পর নাকি আরও সাহসী! কিন্তু আপনি তো দেখছি উল্টো পথে হাঁটছেন!”
ইরফান চোখ ঘুরিয়ে বলল,
—” নাহিদ, শুরু করিস না। আমি খুব ক্লান্ত।”
—”ক্লান্ত?”
নাহিদ প্রায় চিৎকার করে উঠলো।
—” এইটা কোন ধরনের অজুহাত? ইতিহাসে কোথাও লেখা নেই—নববিবাহিত বর ক্লান্ত থাকায় নিয়ম বাতিল। এটা কবির মহল, ভাই! এখানে নিয়ম মানতেই হবে!”
নীহারিকা অপ্রস্তুত হয়ে একবার ইরফানের দিকে তাকালো, একবার নাহিদের দিকে। তবে নাহিদ কে বেশ মজাদার মনে হলো তার। ইরফানকে নাজেহাল হতে দেখে হাসি পাচ্ছে ভীষণ। জ্যোতি আর ইয়াশা চোখাচোখি করে মনে মনে হাততালি দিচ্ছে। নাহিদ এবার বুক চাপড়ে বলল,
—” শোন, দোস্ত। আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড। মানে—এই বাড়িতে আমারও একটা নৈতিক দায়িত্ব আছে। আজ যদি তুই ভাবিকে কোলে না তুলিস, কাল থেকে আমি আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পারব না।”
ইরফান দাঁত খিঁচিয়ে বলল,
—” তুই আয়না দেখিসই বা কেন?”
—” কারণ আমি সুন্দর!”
নাহিদ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল। ইরফান চোখ সরু করে তাকালো। নাহিদ চোখ পিটপিট করে ইরফানের প্রতিক্রিয়া দেখে হঠাৎ নীহারিকার দিকে ঘুরে ভদ্রভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,
—” ভাবি, আপনি কিছু মনে করবেন না। আমাদের এই ভাইয়াটা বাইরে থেকে গম্ভীর, ভেতরে ভেতরে পুরো ভ্যানিলা আইসক্রিম।”
নীহারিকার ঠোঁট কেঁপে উঠলো। হাসি চেপে রাখতে পারলো না সে। এইটুকুই যথেষ্ট ছিল। নাহিদ আবার ইরফানের দিকে ফিরে একদম গোপন বৈঠকের সুরে বলল,
—” আরেকটা কথা বলি? আজ না করলে কিন্তু কাল ইয়াশা আর জ্যোতি নতুন নিয়ম বানাবে। তখন বলবে—ভাইয়াকে ভাবির সামনে গান গেয়ে নাচতে হবে।”
ইয়াশা সঙ্গে সঙ্গে থুতনিতে হাত বুলিয়ে বলল,
—” আইডিয়াটা খারাপ না কিন্তু!”
ইরফানের কপালে হাত চলে গেল। নাহিদ এবার চূড়ান্ত চাল দিল। খুব সিরিয়াস মুখ করে বলল,
—” সত্যি করে বল তো, তোর কি হাতে পায়ে শক্তি নেই। দুটো সিলিন্ডার ওঠাতে পারিস, ভাবিকে পারবিনা? এহহ ছিহ! এই তোর জিম যাওয়ার উপকারিতা? ছ্যাহ!”
ইরফান মুখ কুঁচকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” তুই বোঝার চেষ্টা কর, তোর ভাবি ভয়…
কথা টেনে নিল নাহিদ, জোরে বলল,
—” কে ভয় পাবে? পাগল নাকি। ভাবি, আপনি কি ভয় পান?”
হুট করে তার দিকে প্রশ্ন আসায় থতমত খেলো নীহারিকা। কথার মর্ম না বুঝেই আমতা আমতা করে বলল,— না। নাহিদ খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলো ইরফান। তারপর গভীর শ্বাস নিল। নীহারিকার দিকে তাকালো সে। মেয়েটার চোখে লজ্জা আছে, অস্বস্তি আছে—কিন্তু ভয় নেই। ইরফান হালকা গলায় বলল,
—” লাস্ট। একদম লাস্ট।”
নাহিদ দু’হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” আলহামদুলিল্লাহ! ইতিহাস রচিত হলো!”
ইয়াশা আনন্দে লাফিয়ে উঠলো।
—” ইয়েস! কোলে নাও! কোলে নাও!”
ইরফান এবার নীহারিকার দিকে ফিরে নিচু স্বরে বলল,
—” ভয় পেও না। আমি আছি। যদি একটুও অস্বস্তি লাগে, সঙ্গে সঙ্গে বলবে।”
নীহারিকার বুক ধক করে উঠলো। এত মানুষের সামনে, এইভাবে—কিন্তু অদ্ভুতভাবে ভয়টা খুব বেশি হলো না। সে শুধু চোখ নামিয়ে আস্তে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। আর সেই ছোট্ট সম্মতিটুকুই যথেষ্ট ছিল।
ইরফান এক পা এগিয়ে এসে খুব সাবধানে নীহারিকার হাত আর হাঁটুর নিচে হাত ঢুকিয়ে দিল। এক মুহূর্তেই নীহারিকা নিজেকে তার কোলে পেল। লজ্জায় মাথা নিচু করলো নীহারিকা, সঙ্গে সঙ্গে সে ইরফানের পাঞ্জাবি আঁকড়ে ধরলো।
ইয়াশা চাপা গলায় বলল,
—” ওয়াও! কবির মহল অফিশিয়ালি আপগ্রেডেড!”
নাহিদ নিজেকে বাহবা দিয়ে হুসাইন কে ইশারা করলো। সাথে সাথেই ক্যামেরার সৎ ব্যবহার করে ফটাফট অনেকগুলো ক্লিক করে ফেলল সে। ইরফান একটুখানি দোলালো নীহারিকা কে, মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করে তাকালো নিচের দিকে।
বিড়বিড় করে বলল,
—” ভাত খাও না? এত হালকা কেনো?’
অত্যন্ত ধীরে বলায় কেও শুনতে পেলো না কথাটা। শুধু যার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে সে শুনেছে ও লজ্জাও পেয়েছে। নীহারিকা দৃষ্টি ওঠালো না আর। হৃদপিণ্ড তখন পাগলের মতো ছুটছে। লজ্জা, অস্বস্তি, আর কোথাও একটা অদ্ভুত নিরাপত্তা—সব মিলেমিশে যাচ্ছে। ইরফান ধীরে ধীরে সদর দরজার পার করে এগোলো। প্রতিটা পা যেন খুব হিসেব করে ফেলছে। দরজার চৌকাঠ পেরোনোর ঠিক আগে সে থামলো এক মুহূর্ত। নীহারিকার দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল,
—” স্বাগতম, নীহা…আমার বাড়িতে, আমার জীবনে।’
এই প্রথমবার, কবির মহলের ভেতরে প্রবেশ করলো নীহারিকা। কারো কোলের আশ্রয়ে, নতুন জীবনের একেবারে প্রথম ধাপে। নিজের সংসারে!
চলবে…
কত বড় পর্ব দিয়েছি দেখেছেন?👀 বলুন কেমন হয়েছে?
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা পর্ব ১
-
নবরূপা গল্পের লিংক
-
নবরূপা পর্ব ৪
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ৮
-
নবরূপা পর্ব ১১
-
নবরূপা পর্ব ৯
-
নবরূপা পর্ব ৩