নতুন প্রেমের গান (০৭)
“আমি আপনাকে বিয়ে করব না মিস্টার ভন্ড প্রফেসর। দিবাস্বপ্ন দেখা বন্ধ করুন।আপনাকে বিয়ে করার থেকে রিক্সাওয়ালা বিয়ে করা ঢের ভালো।”
সুপ্রভার কথা শুনে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে সিয়াদাত বাঁকা হাসে। উন্মাদ প্রেমিকের ন্যায় বলে–
“ আমি এক্ষুনি রিক্সা কিনতে যাচ্ছি।তোমার জন্য না হয় পার্ট টাইম রিক্সাওয়ালা হয়ে গেলাম।”
সুপ্রভা চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেয়। কপট রাগ দেখিয়ে বলে— “ দেখুন মিস্টার….” সুপ্রভার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সিয়াদাত তার কথার ডাবল মিনিং বের করে —
“আমি তোমার চোখে অসভ্য বেহায়া নির্লজ্জ হতে পারি লাল চমচম । কিন্তু ক্যারেক্টারলেস নই যে বিয়ের আগে সব দেখব।”
সুপ্রভা কী বলবে ঠাহর করতে পারে না। সে প্রসঙ্গ পাল্টে শক্ত গলায় বলে– “ আপনি আমাকে লাল চমচম বলে ডাকবেন না। খুবই বিশ্রী শোনায়।
একজন প্রফেসরের মুখে এমন বিশ্রী কথা শোভা পায় না।”
সিয়াদাত আবেগ জড়িত গলায় বলে– “ তুমি দেখতে ঠিক লাল চমচমের মতোই মিষ্টি।তাই তো তোমাকে ভালোবেসে , আদর করে লাল চমচম বলে ডাকি।”
সুপ্রভা দমে যায় না । বরং তেজি গলায় বলে – “ আমি আপনার প্রেমিকা বা বউ নই যে আমাকে ভালোবেসে আদর করে ভিন্ন নামে ডাকা লাগবে।”
সিয়াদাত মুচকি হেসে বলে– “ ওকে ফাইন।এখন তোমাকে লাল চমচম বলে ডাকব না।একটা পরপুরুষের মুখে সত্যিই লাল চমচম নামটা তোমার জন্য অস্বস্তির। কিন্তু বিয়ের পর তোমার শাসন বারণ কিছুই আমাকে টলাতে পারবে না।আমার বউকে ভালোবেসে আদুরে আদুরে নামে ডাকব।তখন তোমার কিছুই করার থাকবে না।”
সুপ্রভা বিবর্ণ ঠোঁটে হাসে। মনে মনে বলে– “ আপনি অবুঝ নন, সবটা বোঝেন। বরং আমার থেকে অনেক অনেক জ্ঞান আপনার।সবটা ভালো বোঝেন।এরপরও কেন যে এমন অবুঝের মতো করছেন, আমি জানি না।আমাকে বিয়ে করার স্বপ্ন আপনার স্বপ্নই থেকে যাবে।আর মাত্র কিছুক্ষণের অপেক্ষা। এরপর আমি সবাইকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবো।আমার টিকি টাও খুঁজে পাবেন না আপনি।”
“ হ্যাঁ রে সুপ্রভা।কে ফোন করেছে? কার সাথে কথা বলছিস?”
আলেয়া বেগমের কথা কর্ণগোচর হতেই সুপ্রভা তড়িঘড়ি কল কেটে দেয়।আমতা আমতা করে বলে– “ ওই অফিস থেকে কল করেছিল। তাদের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই, অযথা মানুষকে কল করে বিরক্ত করে।”
আলেয়া বেগম বোধকরি সুপ্রভার কথা বিশ্বাস করতে পারলেন না।তিনি সুপ্রভার দিকে জহুরি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন।সুপ্রভা দারুন অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেল।সে তড়িঘড়ি করে নোরার দিকে এগিয়ে যায়।নোরা এখনো সৌরভকে কথা শোনাচ্ছে। আর সৌরভ পরাস্ত সৈনিকের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভাইয়ের এমন পরাজয় দেখে চমকায় সুপ্রভা। সৌরভ এই বাড়িতে এসে নিজেকে যতোটা শান্ত, ভদ্র দেখায় সে ততোটাও সজ্জন নয়। গ্ৰামের ছোট, বড় ,জোয়ান বুড়ো সকলে তাকে ভয় পায়।তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস কারো নেই।সুপ্রভা লক্ষ করেছে গ্ৰামে দাপিয়ে বেড়ানো তার বা’ঘ ভাইটা এই বাড়িতে আসলেই কেমন যেন নির্জীব বেড়াল হয়ে যায়। বিশেষ করে নোরার সামনে ।
নোরার গলার স্বরটা ক্রমেই চড়া হয়ে উঠছে।
প্রতিটা শব্দ যেন সৌরভের আত্মসম্মানে একেকটা আঘাত।সুপ্রভার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে।
সুপ্রভা গলা উঁচিয়ে বলে–
“ দ্বিতীয় বার তোমার গালে তুলতে বাধ্য করো না নোরা।আমি নিজের অপমান মুখ বুজে সহ্য করি বলে আমার ভাইয়ের অপমানও যে মুখ বুজে সহ্য করব।এটা তোমার ভুল ধারণা।”
নোরাও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়।সে দ্বিগুণ উত্তেজনা নিয়ে বলে–
“ তোমার ভাই যেচে এসেছে কেন আমাকে কেক খাওয়াতে? যাকে দেখলেই আমার বমি পায়,
আমি তার হাত থেকে কেক খাব? এটা ভাবলে কী করে তোমরা?তোমার ভাই কি কখনো আয়নায় নিজের চেহারা দেখে না? “
ভাইয়ের অপমানে সুপ্রভার বুক ভারী হয়ে উঠে।
নোরার অসহিষ্ণু আচরণ তার চোখে জল এনে দেয়।সে নিস্পৃহ গলায় বলে—
“ আমার ভাইয়ের গায়ের রং কালো, কিন্তু মনের রং নয়। তুমি খুব ভালো করেই জানো গায়ের রং পরিষ্কার করার জন্য দোকানে অনেক প্রসাধনী পাওয়া যায়।কিন্তু আফসোস মনের রং পরিষ্কার করার জন্য কোনো প্রসাধনী পাওয়া যায় না।যদি পাওয়া যেত, বিশ্বাস করো আমার শরীরের র’ক্ত বিক্রি করে হলেও আমি তোমাকে মন পরিষ্কার করার প্রসাধনী কিনে দিতাম।এমন কালো মন নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাও কী করে? তোমার মতো….” আচানক সৌরভ এক হাতে সুপ্রভাকে জড়িয়ে ধরে।সুপ্রভা সম্পূর্ণ কথাটা শেষ করতে পারে না।সৌরভ বোনকে শান্ত করার চেষ্টা চালায়–
“ শান্ত হ বনু।”
“ আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে তোমাকে যা নয় তাই বলে অপমান করছে, আর তুমি বলছো আমাকে শান্ত হতে?ও তোমাকে কেন কালা টাকি বলবে? তুমি কি পাতিলের তলার মতো কালো? কালো নও তো। তাহলে ও কেন তোমাকে অপমান করবে?”
“ নোরা ছোট মানুষ বনু। কী বলতে কী বলে ও নিজেই বোঝে না।”
সুপ্রভা অবাক গলায় বলে – “ নোরা ছোট মানুষ ?”
সৌরভ কিছু না বলে মুচকি হেসে সুপ্রভার গালে কেকের টুকরো পুরে দেয়। হৃষ্টচিত্তে বলে–
“ কেক খা। দারুন মজা হয়েছে।”
সুপ্রভা ফিসফিস করে বলে– “ তোমার অভিসন্ধি মোটেও ঠিক লাগছে না আমার। ব্যাপার কী বল তো?”
“ কোনো ব্যাপার না বনু।তুই অযথাই আমাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছিস।”
সুপ্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলে – “ তুমি অপাত্রে নিজের সুন্দর মনটা বিকিয়েছো ভাইয়া।নোরা একটা বি’ষ মরিচ।তার ঝাল এমন, যা স্পর্শ করলে শুধুই মুখই নয়, তোমার সর্বাঙ্গ অঙ্গার হয়ে যাবে।”
খাওয়া দাওয়া শেষ করেই সৌরভ তার মাকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার তাড়া দেয়। কিন্তু ঈশিতা চৌধুরী তাদেরকে যেতে দেন না।রওনক চৌধুরীও রাতটা তাদের বাড়িতে থাকার অনুরোধ জানান।সুপ্রভাও খুব করে চাইছিল তার মা ভাই এ বাড়িতে থাকুক। আলেয়া বেগম সবার অনুরোধ ফেলতে পারেন না।রাতটা এ বাড়িতে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। মা , ভাইয়ের সাথে আরো কিছু মুহূর্ত কাটাতে পারবে ভেবে খুশিতে সুপ্রভার চোখ ঝলমল করে উঠে। সুপ্রভা বুকে পাথর চাপা দিয়ে সবার সাথে হাসিমুখে গল্প করে। এটা ওটা বানিয়ে খাওয়ায়।হাসি ঠাট্টা আনন্দের মধ্যে দিয়ে কখন যে এ বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ঘণ্টা বেজে ওঠে, সুপ্রভা ঠাহর করতে পারে না। এ বাড়ি ছেড়ে থাকার, বাড়ির মানুষগুলোকে ছেড়ে থাকার কষ্টে বুকটা ভারী হয়ে আসে তার।সুপ্রভা অস্থির হয়ে রুমের মধ্যে পায়চারি করে। অপেক্ষায় থাকে সবার গভীর ঘুমের।
সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হতেই সুপ্রভা টেবিলের উপর একটা চিরকুট রেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। বাড়ির বাইরে পা রাখতেই আপনজনদের মুখগুলো তার চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়। আর আশ্চর্যজনক ভাবে শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার বদনখানাও তার চোখের সামনে ভাসছে। তাদের প্রথম দর্শনের মূহুর্ত কিছুতেই ভুলতে পারছে না। সুপ্রভা সিয়াদাতের দিকে চা এগিয়ে দিয়েছে।সিয়াদাত চায়ের কাপ না নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে সুপ্রভার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।। চোখ বন্ধ করলেই মনিটরের পর্দার মতো চোখের সামনে সবটা ভেসে উঠছে সুপ্রভার।সুপ্রভা বিরক্ত হয়।তিক্ত গলায় বলে—
নোমান মা’রা যাওয়ার পর সবে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিলাম। নতুন করে সবটা শুরু করতে চেয়েছিলাম।এরই মধ্যে ঝড় হয়ে আপনি আমার জীবনে প্রবেশ করলেন। আপনার সাথে আমার দেখা না হওয়াটাই বোধহয় ভালো ছিল।আপনি আমাকে শেষ পর্যন্ত ঘর ছাড়া হতে বাধ্য করলেন মিস্টার ভন্ড প্রফেসর।আমি আপনাকে কখনো ক্ষমা করব না।কখনোই না।”
চলবে ???
[ আপনাদের কি মনে হয় , সুপ্রভা কি সত্যিই চলে যাবে? না কি কেউ তাকে আটকাবে?সবাই কমেন্ট করে জানাবেন।]
® Nuzaifa Noon
নতুনপ্রেমেরগান
বোনাস_পর্ব
নুজাইফা_নূন
সুপ্রভা দুরুদুরু বুকে বাসে বসে রয়েছে। বাস ছাড়তে এখনো মিনিট দশেক বাকি।এই দশ মিনিট তার কাছে দশ বছরের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে।সে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এই শহর ছাড়তে চাইছে।সে চোখ নামিয়ে রাখে। হাতের আঙুলগুলো আঁচলের ভাঁজে জড়িয়ে শক্ত করে চেপে ধরে।হঠাৎ পাশের সিটে কেউ এসে বসে পড়ে।হালকা একটা ঝাঁকুনিতে সুপ্রভা চমকে ওঠে। চোখ তুলে তাকাতেই দেখে মাঝবয়সি এক পুরুষ, মুখে অচেনা দৃঢ়তা। চোখে কেমন যেন কৌতূহল মেশানো হিসাবি দৃষ্টি।লোকটা বসেই নির্বিকার গলায় বলে—
” একা যাচ্ছেন?”
সুপ্রভা কিছু বলে না। আঁচলের কোণটা আরও শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে।তার বুকের ধুকপুকান যেন দ্বিগুণ হয়ে যায়।
পুরুষটি একটু ঝুঁকে চারপাশ দেখে নিয়ে আবার বলে—
“একা যাচ্ছেন বুঝি? না কি হাজবেন্ড আছে সাথে?”
সুপ্রভা ঠোঁট কামড়ে ধরে।এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, জোরে বলে উঠবে— আপনার কী দরকার?কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেয়। সংযত গলায় বলে—
” জ্বি , একা।”
সুপ্রভা কথাটা বলতেই লোকটার ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠে।লোকটা প্রসন্ন গলায় বলে- ” আপনি আনম্যারিড বোধহয়।”
সুপ্রভা নিচু স্বরে বলে- ” জ্বি না।”
লোকটা অবাক গলায় বলে – ” বলছেন আনম্যারিড ।
আবার হাজবেন্ডও সাথে নেই। ঝগড়া হয়েছে না কি?”
সুপ্রভা বিরক্তি নিয়ে বলে- ” হাজবেন্ড মা’রা গিয়েছে।
আমি বিধবা। উত্তর পেয়ে গেছেন? হয়েছে শান্তি?”
বিধবা শব্দটা শুনে খুশিতে ঝলমল করে উঠে লোকটা র মুখশ্রী। লোকটা উৎসাহের সহিত বলে – ” আমি মোতালেব। আমারও বউ নেই।আমাকে বিয়ে করবেন?”
সুপ্রভা কটমটে দৃষ্টিতে মোতালেবের পানে চায়। মোতালেব ত্বরিত চোখ নামিয়ে নেয়।কিয়ৎক্ষণ পর সুপ্রভার দিকে তাকিয়ে ফাটা বাঁশের গলায় গান গাইতে শুরু করে –
” তোমারও জামাই নাই আমারও বউ নাই।চলো দুইজন সংসার কইরা খাই।চলো দুইজন সংসার কইরা খাইইইইইইই।চলো দুইজন সংসার কইরা খাই।”
Share On:
TAGS: নতুন প্রেমের গান, নুজাইফা নূন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৪
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৬
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৩
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৫
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২
-
নতুন প্রেমের গান গল্পের লিংক