Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ৫


নতুন প্রেমের গান (০৫)

“ বিয়ে মানে? আপনি এসব কী বলছেন মা? আমি আপনার ছেলের ব‌উ। নিজের ছেলের ব‌উয়ের বিয়ে দিতে চাইছেন আপনি?”

সুপ্রভার চোখের পানি দেখে ঈশিতা চৌধুরীর বুক ধক করে উঠে।তিনি এক পা এগিয়ে এসে আলতো করে সুপ্রভার হাত দুটো ধরেন। নরম গলায় জিজ্ঞেস করেন–

“ আমি কি তোকে শুধুমাত্র আমার ছেলের ব‌উ হিসেবে দেখি সুভা? তুই তো আমার মেয়ে।মেয়ে বলেই তো তোর জন্য চিন্তা হয়।”

পানিতে সুপ্রভার দু চোখ ঝাপসা হয়ে আসে । সুপ্রভা অভিমানী গলায় বলে–

“ এটা আপনার মুখের কথা, মনের কথা নয় মা।
আপনি যদি সত্যিই আমাকে নিজের মেয়ে মনে করতেন, তাহলে এভাবে আমাকে পর করে দিতে চাইতেন না।”

ঈশিতা চৌধুরী সুপ্রভাকে নিজের বুকে টেনে নেন।
মাথায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে দরদমাখা গলায় বলেন –

“ পাগলী মেয়ে একটা।বিয়ে হলেই মেয়েরা পর হয়ে যায় না কি! তোর জন্মদাত্রী মা কি তোকে পর করে দিয়েছে? দেয় নি তো? নোমানের সাথে বিয়ের পরেও তোর খোঁজ খবর করেছে।তোর জন্য পছন্দের খাবার রান্না করে পাঠিয়েছে।তোর কষ্টে কেঁদেছে, তোর সুখে হেসেছে।তোর জন্মদাত্রী মা যেমন তোকে পর করে দেয়নি, তেমন‌ই আমিও তোকে পর করে দিব না । বরং বিয়ের পর তোর প্রতি আমার ভালোবাসা বাড়বে বৈ কমবে না।”

সুপ্রভার বুকের ভেতর জমে থাকা কান্নাটা আর চেপে রাখতে পারে না। সে ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নেয়। জড়ানো গলায় বলে–

“ মাতৃস্নেহে আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন আমি একটা বিধবা মেয়ে।মাত্র পাঁচ মাস আগে আমার স্বামী মা’রা গিয়েছে।এর‌ই মধ্যে দ্বিতীয় বিয়ে? সমাজের লোকেরা কী বলবে?এটা অসম্ভব মা।আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।আমি আপনার কথা রাখতে পারছি না মা।”

ঈশিতা চৌধুরী হালকা হাসেন। বিদ্রুপ কণ্ঠে বলেন –

“ সমাজ কী বলল আর কী বলল না,সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, সুভা। একদিন না খেয়ে থাকলে সমাজের লোকেরা তোকে খাইয়ে দিবে না। অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে সেবা শুশ্রূষা করবে না। তাছাড়া সমাজ তোর রাতের কান্না শোনে নি, তোর নিঃশব্দ কষ্ট দেখে নি। তাহলে এখন সমাজের কথাই বা আমি কেন শুনব?”

“ তবুও মা আমরা তো সেই সমাজেই বাস করি, তাই না?”

ঈশিতা চৌধুরী তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন–

“তোর জীবনে যখন এতো বড় একটা ঝড় বয়ে গেল, তখন সেই সমাজ কোথায় ছিল? তুই যেই সমাজের কথা বলছিস সেই সমাজ বিধবার জন্য সহানুভূতি দেখায় শুধু মুখের কথায়। কাজে এলে মুখ ফিরিয়ে নেয়।তাদের কাছে শোক মানে একটা সাজা ।যেটা ঠিকঠাক ভোগ না করলে মানুষ চরিত্রহীন বলে দাগিয়ে দেয়।”

ঈশিতা একটু থেমে আবার বলে ওঠেন–

“সমাজ বিধবার মাথার ওড়নার দৈর্ঘ্য মাপে, পোশাকের রঙ দেখে বিচার করে। হাসলেই বলে এত তাড়াতাড়ি হাসে কী করে! চুপ থাকলে বলে নাটক করছে। নতুন করে বাঁচতে চাইলে বলে লজ্জা নেই।সমাজ কেবল আঙ্গুল তোলে, কাঁধে হাত রাখে না।সমাজ বিধবার শোকের মেয়াদ গুনে, কিন্তু তার হৃদয়ের শূন্যতা গোনে না। সমাজ কখনো জিজ্ঞেস করে না‌ সে আদৌ বাঁচতে পারছে কি না। তাই সমাজ কী বলল, তা আমার কাছে মূল্যহীন।তুই মানুষ, সমাজ না। তোর বেঁচে থাকা আমার কাছে বেশি দামি। মানুষ কী বলবে এই ভয়ে যদি আমি তোকে সুখের হাতছাড়া হতে দিই, তাহলে আমি তোর মায়ের যোগ্যই হব না।”

সুপ্রভার চোখ ছলছল করে ওঠে।ঈশিতা চৌধুরী সৌরভের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ঈশরা করতেই সৌরভ এসে সুপ্রভার কাঁধে হাত রাখে।নির্ভীক চিত্তে বলে–

“ মাও‌ইমা কিছু ভুল বলছে না বোন। তিনি তোর ভালোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি , আম্মা দুজনেই তার সাথে একমত পোষণ করেছি।সমাজের কথা বাদ দিয়ে একবার নিজের জীবনের কথা ভাব। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখ বোন।”

সুপ্রভাকে নিরুত্তর দেখে ঈশিতা চৌধুরী আলতো হাতে সুপ্রভার দুই বাহু চেপে ধরেন। দৃঢ় কণ্ঠে বলেন –

“সমাজ কী বলবে এই ভয়ে কত মেয়ে সারাজীবন পাথর হয়ে বেঁচে থাকে জানিস? তারা হাসতে ভুলে যায়, নতুন করে বাঁচতে ভুলে যায়। পান থেকে চুন খসলেই সমাজের লোকেরা তার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় , সে আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়।সে একটা বিধবা মেয়ে। মেয়েটা বেঁচে থেকেও প্রতিনিয়ত ম’রে।যে সমাজ ধীরে ধীরে একটা মেয়েকে মৃ’ত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, সেই সমাজের মুখে ঈশিতা চৌধুরী থু থু দেয়।”

সুপ্রভা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করে বলল– “ কিন্তু মা আমি তো আপনাদের সাথে ভালো আছি , সুখে আছি। আমি নতুন করে আর কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাই না মা।বাকি জীবনটা আপনাদের সাথেই কাটাতে চাই।”

সুপ্রভা চৌধুরীর ভ্রু কুঁঞ্চিত হয়।তিনি ক্রুদ্ধ গলায় বলেন–

“ তুই কি বুড়ি হয়ে গিয়েছিস? তোর কি চার পাঁচ টা ছেলেমেয়ে রয়েছে? তোর বয়স কত হ্যাঁ? মাত্র বাইশ বছর।তোর বয়সী মেয়েদের এখনো বিয়ে হয়নি।তোর এখনো গোটা জীবনটাই পড়ে রয়েছে।তোর জীবনটা এভাবে নষ্ট করে দিস না সুভা। আমি , তোর বাবা তোকে সারাজীবন আগলে রাখার জন্য বেঁচে থাকবো না। আমাদের বয়স রয়েছে।যখন , তখন আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যেতে হবে। আমি তোর বাবাকে কথা দিয়েছিলাম, তোকে একটা সুন্দর জীবন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। তোর অগোছালো জীবনটা গুছিয়ে দিতে না পারলে আমি ম’রেও শান্তি পাবো না রে মা।”

এতোক্ষণে নিঃশব্দে সবটাই দেখছিলেন, শুনছিলেন সুপ্রভার মা আলেয়া বেগম। কিন্তু তিনি আর চুপ করে বসে পারলেন না। অধৈর্য হয়ে বললেন–

“ তুই কবে কবে এতোটা বেয়াদব হয়ে গেছিস সুপ্রভা? গুরুজনদের মুখে মুখে তর্ক করছিস? আপা, ভাইজান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তোর ভালোর জন্যই নিয়েছে। এখানে আমি কোনো ভুল দেখছি না।নিজেকে বড় লায়েক ভাবতে শুরু করেছিস তাই না? নিজেই নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে শিখে গিয়েছিস।”

মায়ের কথায় সুপ্রভার বুকটা হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। তার ক্রন্দনরত চেহারা দেখে আলেয়া বেগমের গলার স্বর নরম হয়ে আসে—

“ বিধবা হওয়া কোনো অপরাধ না, মা। তুই কোন পাপ করিস নি। মৃ’ত্যু তোর স্বামীর কপালে লেখা ছিল, তুই লিখে দিস নি।স্বামী মা’রা গেছে বলে বাকি জীবন একা কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া টা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। একটা মেয়ের জীবনে স্বামী মানে শুধু সম্পর্কের একটা নাম নয়। স্বামী মানে ভরসার একটা ঠিকানা।একটা মজবুত খুঁটি। বৃদ্ধা বয়সে ছেলে মেয়ে সবাই হাত ছেড়ে দিলেও একজন স্বামী তার স্ত্রীর হাত ছাড়ে না।তাকে বুক দিয়ে আগলে রাখে।”

র‌ওনক চৌধুরী‌ও সুপ্রভাকে অনেক বোঝান। সুপ্রভাকে নতুন জীবন শুরু করার জন্য আকুতি মিনতি জানান। এতো গুলো মানুষের অনুরোধ, আকুতি মিনতির ভারে সুপ্রভার শক্ত করে বাঁধা মনটা ধীরে ধীরে আলগা হয়ে আসে। সুপ্রভা মাথা নিচু করে অভিমানী গলায় বলে–

“ তোমরা কেউই যখন চাইছো না আমি এই বাড়িতে থাকি, তখন আমার আর কিছুই বলার নেই। তোমরা যা ভালো মনে করো , তাই করো।”

সুপ্রভার কথা শুনে আনন্দে সকলে চোখে পানি চলে আসে। সৌরভ উৎফুল্ল গলায় বলে–

“ মিয়া বিবি রাজি , তো কেয়া কারেগা কাজি।”

ঈশিতা চৌধুরী পরম মমতায় সুপ্রভার চোখের জল মুছে দেন। দরদমাখা গলায় বলেন –

“ অনেক কান্নাকাটি হয়েছে । এবার সৌরভের জন্মদিন সেলিব্রেশন করা যাক?”

সুপ্রভা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। ঈশিতা চৌধুরী আদেশের সুরে বলেন –

“ ঝটপট চেঞ্জ করে আয়। কান্নাকাটি করে চেহারার যে হাল করেছিস, দেখতে একদম পারফেক্ট কাজের বেটি রহিমা লাগছে।”

সুপ্রভা অস্পষ্ট ভাবে হেসে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে আসে। সবে নিজের রুমে পা রাখতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে নোরার তিক্ত গলা শোনা যায় —

“ খুব তো বলেছিলে তুমি আমার ভাইয়াকে ভালোবাসো। আমার ভাইয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পুরুষ তোমার জীবনে আসবে না ।তুমি সারাজীবন ভাইয়ার স্মৃতি নিয়েই কাটিয়ে দিবে। ।এতো তাড়াতাড়ি ভাইয়ার প্রতি সব ভালোবাসা ফানুস হয়ে উড়ে গেল? না কি এতো হট, ড্যাশিং ছেলে দেখে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছো না?”

সুপ্রভার ঠোঁট কাঁপে অপমানে। ইচ্ছে করে নোরার দুগালে ঠাটিয়ে চড় দিতে। কিন্তু এই মুহূর্তে সে নিজের ইচ্ছাকে ধামাচাপা দেওয়াই শ্রেয় মনে করে। সুপ্রভা গভীর শ্বাস নেয়। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে —

“তুমি জানো ছেলেটা কে? বাবা মা কার সাথে আমার বিয়ের কথা বলছেন ?”

“ জানি তো।”

“ কে সে?”

“ সে আর কেউ নয়। আমার ক্রাশ ইভেন মেয়েদের হার্টথ্রব প্রফেসর শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার।”

চলবে ??

[আপনারা চুপিচুপি গল্প পড়ে চলে যান, অথচ রিয়েক্ট কমেন্ট করেন না।আমার পেজ থেকে অন্যদের পেজে রিচ বেশি। এরকম হলে আমি আর গল্পটা কন্টিনিউ করবো না। যারা পড়বেন কাইন্ডলি রেসপন্স করবেন।
বেশি বেশি কমেন্ট করবেন]

® Nuzaifa Noon

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply