ননদকে দেখতে এসে, অজান্তেই প্রফেসর শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার চোখ আটকে যায় বিধবা ভাবীর দিকে। সিয়াদাত নিজেকে সামলাতে চায়, কিন্তু তার চোখদুটো অজান্তেই বারবার ঘুরে যায় বিধবা সুপ্রভার দিকে। ভার্সিটির সবথেকে সুদর্শন প্রফেসর শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার। তার সুন্দর ও মার্জিত চেহারা, গেটাপ, গম্ভীর কণ্ঠস্বর , এটিটিউডের জন্য অল্পকিছু দিনেই মধ্যেই তরুণীদের হার্টথ্রব হয়ে ওঠে সে। কিন্তু এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই সিয়াদাত শাহারিয়ার। ক্লাস চলাকালীন হোক, বা অন্য সময়ে সিয়াদাত কখনোই মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে নি। এমনকি বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাওয়া তেও তার ছিলো নিরেট অনীহা।কিন্তু মায়ের কাছে হার মানে সব দৃঢ়তা।
মোহনা শেখের আবেগী ব্ল্যাকমেইলে শেষমেশ তাকে আসতেই হয় চৌধুরী বাড়িতে। চৌধুরী বাড়ির একমাত্র কন্যা নোরা চৌধুরী।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠা অহংকার, জেদ আর একরোখা স্বভাবের মেয়ে সে। বাইরে ঝলমলে রূপ, ভেতরে ধারালো কুৎসিত অহম এই তার পরিচয়।
অন্যদের মতো সিয়াদাত শাহারিয়ার তারও ক্রাশ।নোরা যখন জানতে পারে সিয়াদাত তাকে দেখতে আসছে, তখন আনন্দে শরীর কেঁপে উঠে তার।সে এক মিনিটও বিলম্ব না করে পার্লারে চলে যায়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে আয়নার সামনে নিজেকে ভেঙে-গড়ে নতুন এক রূপে সাজিয়ে তোলে।আয়নায় নিজের রুপ দেখে নিজেই মোহিত হচ্ছে বারংবার।কিন্তু যার জন্য এতো আয়োজন সেই মানুষটা একটাবারও নোরার দিকে চোখ তুলে তাকায় নি।তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে সাদামাটা সুতি থ্রিপিস পরিহিত সুপ্রভার দিকে।মুখে প্রসাধনীর লেশ মাত্র নেই। তবুও কতো স্নিগ্ধ , কতো মোহনীয় লাগছে।মনে হচ্ছে যেন সদ্য ফোঁটা গোলাপ।সিয়াদাত খুব বেশি সময় তাকিয়ে থাকতে পারে না। কেমন যেন নেশা ধরে যায়।হৃদয়টা অচেনা কোনো তালে নেচে উঠে।
সুপ্রভার হাতে চায়ের ট্রে।একে একে সবাইকে চা দিয়ে সিয়াদাতের সামনে চায়ের কাপ এগিয়ে দেয় সে। কিন্তু সিয়াদাতের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।তার দৃষ্টি আটকে যায় সুপ্রভার হরিণীর ন্যায় কাজল-কালো চোখ দু’টোর গভীর খাদে।ভীত হরিণীর চোখ যেমন সুন্দর হয়, তেমনই তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভীত তরুনীর চোখ দুটোও ভয়ংকর সুন্দর লাগছে।
যে মানুষটা সারাজীবন নৈতিকতার কাঠিন্যে নিজেকে বেঁধে রেখেছে,যে প্রফেসর কোনোদিন কোনো নারীর দিকে দৃষ্টির ঔদ্ধত্য দেখায়নি।আজ সেই প্রফেসর নির্লজ্জের মতো একটা বিধবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।একজন প্রফেসরের এমন নির্লজ্জতা বেমানান।তবুও সিয়াদাতের মন মানতে চায়না।তার ভেতরের মানুষটা বেহায়ার মতো সব নিয়ম ভেঙে চুপচাপ তাকিয়েই থাকে।
সুপ্রভা দারুন অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যায়।এদিক ওদিক তাকিয়ে মৌনতা ভেঙ্গে সুরেলা কণ্ঠে বলে–
“ আপনার চা।”
শব্দটা সিয়াদাতের বুকের গভীরে আছড়ে পড়ে। হঠাৎই সে সম্বিত ফিরে পায়। চোখ সরিয়ে নেয় অপরাধীর মতো।চায়ের কাপটা নিতে গিয়ে তার আঙুল ছুঁয়ে যায় সুপ্রভার আঙুলে। এক মুহূর্তের সেই স্পর্শেই সিয়াদাতের শরীরটা কেঁপে ওঠে। এত বছরের সংযম , নৈতিকতার পাঠ সব যেন এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে যায়। সে পুনরায় সুপ্রভার দিকে তাকিয়ে বলে–
“থ্যাংক ইউ।”
প্রত্যুত্তরে সুপ্রভা কিছু বলে না। নিঃশব্দে কিচেনে চলে আসে।
এতোক্ষণে সবটাই নোটিশ করছিলো নোরা। সিয়াদাতের হাবভাব মোটেও সুবিধাজনক লাগছে না। সুপ্রভার দিকে ওমন করে তাকানোর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো অভিসন্ধি আছে তার। বিরক্তিতে চোখ সরু হয়ে আসে নোরার। ইচ্ছে করে সুপ্রভার চুলের মুঠি ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিতে। কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানে এটা কখনোই সম্ভব নয়।তার বাবা মা সুপ্রভাকে বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসেন।সুপ্রভাকে বাড়ি থেকে বের করার কথা বললে তারা নোরাকেই বাড়ি থেকে বের করে দিবেন।নোরা বারকয়েক শ্বাস নেয়।লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে সিয়াদাতের উদ্দেশ্য প্রশ্ন ছুড়ে দেয়–
“ আমাকে কেমন লাগছে স্যার?”
নোরার কথা সিয়াদাতের কর্ণগোচর হয় না।সে ঈশিতা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে রিনরিনে গলায় বলে–
“আন্টি!এইমাত্র যে মেয়েটা সবার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিল,সে কে?”
“ ও সুপ্রভা। আমার বড় ছেলে নোমানের স্ত্রী। চৌধুরী বাড়ির বড় বউ।”
ঈশিতা চৌধুরীর কথা শুনে সিয়াদাতের মুখের রং ফিকে হয়ে আসে। পৃথিবীতে এতো মেয়ে থাকতে,অন্য কারো স্ত্রীর দিকেই কেন চোখ গেল?প্রশ্নটা সিয়াদাত নিজেকেই ছুড়ে দেয়। বুকের ভেতর কোথাও যেন তীক্ষ্ণ একটা খোঁচা লাগে। লজ্জা, ঘৃণা,অনুতাপে সে নিঃশ্বাসটা চেপে ধরে। নিজের দৃষ্টিকে নিজের কাছেই অপরাধী মনে হয়। সিয়াদাত তৎক্ষণাৎ চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার মনস্থির করে। ঠিক সেই মুহূর্তেই মোহনা শেখ বলে উঠেন —
“ নোমান তো আরো পাঁচ মাস আগে মা’রা গিয়েছে।তাহলে শুধু শুধু মেয়েটাকে এ বাড়িতে রেখেছেন কেন আপা? ছেলেটাই যখন থাকলো না, তখন ছেলের বউ দিয়ে কী হবে?”
মোহনা শেখের প্রশ্নে মুখটা পাংশুটে রুপ ধারণ করে ঈশিতা চৌধুরীর। কিন্তু তার দাপট ভাঙ্গে না। বরং তিনি আয়েশী ভঙ্গিতে চায়ের কাপে চুমুক দেন। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলেন—
“ আমি কথা দিয়ে কথা রাখতে জানি মোহনা। সুভাকে যখন চৌধুরী বাড়ির বউ করে নিয়ে আসি, তখন সুভার মৃ’ত্যু পথযাত্রী বাবাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম , সুভাকে সারাজীবন মাতৃস্নেহ দিয়ে আগলে রাখার।আমি, আমার হাজব্যান্ড দুজনের কেউই সুভাকে ছেলের বউয়ের নজরে দেখি না ।ও আমার আরেক মেয়ে।নোরাকে যতোটা ভালোবাসি, ঠিক ততোটাই ভালোবাসি সুভাকে।আমার ছেলের হায়াত শেষ হয়ে গিয়েছিল বিধায় আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গিয়েছে। তবে নোমান সুভাকে আমাদের জন্য রেখে গিয়েছে।আমরা সুভাকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছি।সুভাকে নিয়ে আমাদের যখন কোনো সমস্যা নেই, তখন আশেপাশের মানুষেরও সমস্যা থাকার কথা নয় মোহনা।”
ঈশিতা চৌধুরীর কথা শেষ হতেই ঘরটায় এক মুহূর্তের জন্য থমথমে নীরবতা নেমে আসে।মোহনা শেখের মুখের হাসিটা জমে যায়। চোখের দৃষ্টিতে যে কৌতূহল ছিল, তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় অপমানের তীক্ষ্ণ ছায়ায়।তিনি সোফার পিঠে হেলান দিয়ে বসেন। চায়ের কাপটা টেবিলে রাখার সময় শব্দটা অযথাই একটু বেশি জোরে হয়।গলার স্বরটা পূর্বের তুলনায় নরম হয়ে যায় –
“ আমরা বরং কাজের কথায় আসি আপা। নোরা মাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।কী মিষ্টি দেখতে।ভাইজান তো এখনো আসলেন না।ভাইজান এলে এক্ষুনি বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে রাখতাম। গুরুজনেরা বলেন শুভ কাজে দেরি করতে হয় না।”
মোহনা শেখের মুখের কথা মুখে থাকতেই আগমন ঘটে নোরার বাবা রওনক চৌধুরীর।তার একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং ছিলো। মিটিং শেষ করে এক মিনিটও বিলম্ব করেন নি।গাড়ি নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন।তাকে দেখেই মোহনা শেখ মিষ্টি হাসেন। খুশি খুশি গলায় বলেন–
“ আপনাকে নিয়েই কথা হচ্ছিলো।”
রওনক চৌধুরী রসিকতা করে বলেন –
“ ঈশিতা আমাকে আবার দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে না কি? আমি ভাই এক নারীতে আসক্ত পুরুষ। দ্বিতীয় বিয়ে করার শখ নেই আমার।”
মোহনা শেখ হো হো করে হেসে উঠেন। পরক্ষণেই সিয়াদাতের গম্ভীর মুখ দেখে হাসি গিলে ফেলে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলেন–
“এতোদিন মেয়েকে নিজের কাছে রেখেছেন। আদর ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছেন।এবার আমাদেরকেও একটু সুযোগ দিন মেয়েকে আদর ভালোবাসা দেওয়ার।”
রওনক চৌধুরী হৃষ্টচিত্তে বললেন –
“ আপনারা যে আমার মেয়েকে সিয়াদাতের বউ করতে চেয়েছেন, এটা চরম সৌভাগ্য আমার। পার্সোনালি সিয়াদাত আমার খুবই পছন্দের । সিয়াদাতের হাতে নোরাকে তুলে দিতে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
মোহনা শেখ বেজায় খুশি।আনন্দে চোখ দুটো ঝলমল করে উঠে তার।তিনি উৎফুল্ল গলায় বলেন–
“ আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে,তাহলে আগামী সপ্তাহে আমরা নোরা আর সিয়াদাতের চার হাত এক করে দেই?”
“ একটু বেশিই তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে না? আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা। পুরো শহরের মানুষ জানবে রওনক চৌধুরীর মেয়ের বিয়ে হচ্ছে।আমার মনে হয় আগামী সপ্তাহে নয় বরং আগামী মাসে হলে বেটার হবে। ততোদিনে নোরা, সিয়াদাত একে অপরকে চিনতে জানতে পারবে। তাহলে বিয়েটাও ….” সম্পূর্ণ কথাটা শেষ করতে পারে না রওনক চৌধুরী।তার আগেই সিয়াদাতের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা যায় —
“আমি নোরাকে নয় ,সুপ্রভাকে বিয়ে করতে চাই।
নতুন প্রেমের গান
সূচনা_পর্ব
নুজাইফা_নূন
চলবে কি?
[ রেসপন্স পেলে গল্পটা কন্টিনিউ করা হবে।অন্যনায় এ পর্বেই সমাপ্তি।যারা পড়বেন, কাইন্ডলি রেসপন্স করবেন]
Share On:
TAGS: নতুন প্রেমের গান, নুজাইফা নূন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৩
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৪
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২
-
নতুন প্রেমের গান গল্পের লিংক