Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৬


নতুনপ্রেমেরগান (১৬)

সুপ্রভা কাগজটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। ছোট্ট কয়েকটা শব্দ, অথচ সেই শব্দগুলোই যেন তার বুকের ভেতর ঢেউ তুলে দেয়। মনে হয় কেউ অদৃশ্য হাতে তার হৃদয়ের তারগুলো ছুঁয়ে দিয়েছে।সে মেকি রোষ দেখিয়ে বলে—

“আপনি সত্যিই খুব খারাপ মানুষ, মিস্টার ভন্ড প্রফেসর।মানুষকে এভাবে বিপদে ফেলে দেন কেন?”

সুপ্রভা প্রশ্নটা করার সাথে সাথেই পিছন থেকে পরিচিত রাশভারী একটা কণ্ঠ ভেসে আসে—

“আমি আবার কী করলাম?”

সুপ্রভা চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়ায়। দরজার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিয়াদাত। তার চোখে সেই চিরচেনা দুষ্টু ঝিলিক।

সুপ্রভার বুকের ভেতরটা ফের কেঁপে ওঠে।
সে কাগজটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে বলে—
“আপনি তো চলে গিয়েছিলেন!”

সিয়াদাত ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার চোখ স্থির হয় সুপ্রভার মুখে।সে ধীরস্থির গলায় বলে—

“চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু একটা সমস্যা হয়ে গেল।”

সুপ্রভা অনিচ্ছা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করে—
“কী সমস্যা?”

সিয়াদাত একটু ঝুঁকে আসে। তার গলার স্বর খাদে নেমে আসে—

“এই বাড়িতে একটা মেয়ে আছে। যার হাতের রান্না খুব ভালো।আর তার থেকেও বড় সমস্যা হলো,মেয়েটাকে ছেড়ে যেতে গেলেই আমার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ফাঁকা হয়ে যায়।”

কথাটা শুনে সুপ্রভার নিঃশ্বাস থেমে আসে।
তার মনে হয়, এই মানুষটা সত্যিই তার সর্বনাশ করে দিচ্ছে।কারণ সে যতই দূরে সরে যেতে চায়, ততই যেন অদৃশ্য কোনো টানে আবারও সিয়াদাতের কাছেই ফিরে আসে।

সুপ্রভা নিজেকে ধাতস্থ করে কড়া গলায় বলে—

“আপনি দয়া করে আমার থেকে দূরে থাকুন মিস্টার ভন্ড প্রফেসর। আপনার এসব অদ্ভুত কথা আমি শুনতে চাই না।”

সিয়াদাত মৃদু হেসে ফেলে। নরম গলায় বলে –

“অদ্ভুত তো তোমাকে লাগে সুপ্রভা। আমি কাছে এলেই তুমি রেগে যাও, আর আমি দূরে গেলেই তোমার চোখে সেই অদ্ভুত শূন্যতা চলে আসে।”

সুপ্রভা চমকে তাকায়।আমতা আমতা করে বলে–

“আ… আপনি এসব কী বলছেন?আমার চোখে শূন্যতা আসবে কেন?”

সিয়াদাত আরও এক পা এগিয়ে আসে। দুজনের মাঝের দূরত্বটা মুহূর্তেই কমে যায়।সুপ্রভা তড়িঘড়ি সরে যেতে চায়। কিন্তু চেয়ারের সাথে আটকে যায়। তার বুকের ভেতরটা যেন ঝড়ে কাঁপছে।সে রূঢ় গলায় বলে—

“আপনি যেটা করছেন , এটা ঠিক না হচ্ছে না কিন্তু।”

সিয়াদাতের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে গাঢ় হয়ে ওঠে।
সে নিচু গলায় বলে—

“ঠিক আর ভুলের হিসাব অনেক করেছি জীবনে। কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছি,কিছু মানুষ আছে যাদের থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করলেই তারা আরও বেশি করে হৃদয়ের ভেতর ঢুকে যায়।তুমি চাইলেই আমি দূরে থাকব। একদম দূরে।কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দাও সুপ্রভা।আমি চলে গেলে সত্যিই কি তোমার কিছুই হবে না?”

ঘরের ভেতরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়।সুপ্রভা কোনো উত্তর দিতে পারে না।কারণ সে নিজেও জানে না ,এই মানুষটা তার জীবনে ঠিক কী হয়ে উঠছে।

সিয়াদাত সুপ্রভাকে তাড়া দেয় — “ কী হলো ? বলো? আমি না থাকলে সত্যি‌ই তোমার কোনো কষ্ট হবে না?”

সুপ্রভা নিজেকে শক্ত করে কঠিন গলায় বলে– “ কষ্ট কেন হবে? আপনি কে আমার? আপনার সাথে না আমার কোনো র’ক্তের সম্পর্ক আছে। আর না কোনো ভালোবাসার সম্পর্ক আছে।আপনি না থাকলে আমার কষ্ট পাবার প্রশ্ন‌ই আসে না। বরং আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচবো।যবে থেকে আপনার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, তবে থেকেই আপনি আমার সুখ শান্তি সব কেড়ে নিয়েছেন।আপনার জন্য আমার ঘর, সংসার সব ছেড়ে চলে এসেছি। ভেবেছিলাম অচেনা শহরে এসে একটু শান্তি পাবো। কিন্তু আপনি সেখানে এসেও হাজির হয়েছেন। বিশ্বাস করুন আমি আর নিতে পারছি না। ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।আপনি প্লিজ
আমাকে মুক্তি দিন।আমাকে নিজের মতো বাঁচতে দিন।”

সিয়াদাত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখে সেই চিরচেনা দুষ্টু ঝিলিকটা নেই। বরং সেখানে রয়েছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সুপ্রভার প্রতিটা শব্দ যেন নিঃশব্দ তীর হয়ে এসে তার বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে বিঁধেছে।সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঠোঁটের কোণে ম্লান এক হাসি টেনে বলে—

“আমি জানি, এগুলো শুধু তোমার মুখের কথা ,হৃদয়ের নয়।মুখে যতই বলো তুমি আমাকে ঘৃণা করো।বলতে থাকো আমি তোমার কেউ না।আমি না থাকলে তোমার জীবনে কিছুই বদলাবে না।তবুও আমি জানি, তোমার মনের গোপন কোনে আমার জন্য একটু জায়গা ঠিকই আছে।কারণ চোখ কখনো মিথ্যে বলে না, সুপ্রভা।
তোমার চোখের ভাষা আমি পড়তে শিখেছি।

তুমি হয়তো নিজেকে বোঝাও আমি তোমার কাছে অচেনা, অপ্রয়োজনীয়।কিন্তু তোমার হৃদয় জানে
আমার উপস্থিতি তোমার চারপাশে অদৃশ্য এক উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়।তুমি চাও না আমি চলে যাই।
চাও না এই দূরত্বটা সত্যি হয়ে উঠুক।”

সুপ্রভা কী বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারে না। সে আমতা আমতা করতে থাকে।তার ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু শব্দ বেরোয় না।মনে হয় যেন হঠাৎ সব কথা কোথাও গিয়ে আটকে গেছে।

সিয়াদাত স্মিত হেসে বলে– “ নীরবতা সম্মতির লক্ষণ।তোমার নীরবতায় বলে দিচ্ছে তোমার হৃদয় আমাকে অনেক আগেই মেনে নিয়েছে।”

সুপ্রভা তখনো নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সিয়াদাত সুপ্রভার দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বলে – “ আমার চোখের দিকে তাকাও সুপ্রভা।আমার চোখে চোখ রেখে বলো কী চাও? তুমি যদি সত্যিই আমাকে না চাও, ওকে ফাইন।আমি তোমাকে চিরদিনের জন্য মুক্তি দিয়ে দিব।তোমার ছায়াও মাড়াব না আমি। তুমি শুধু হ্যাঁ অথবা না বলো।”

সুপ্রভা কিছু বলে না।সিয়াদাত অধৈর্য গলায় বলে– “এখনই তোমাকে কিছু বলতে হবে না, সুপ্রভা।তুমি সময় নাও, নিজের মনকে জিজ্ঞেস করো।তোমার ভেতরের সত্যিটা খুঁজে দেখো।যদি তোমার উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়,তবে আগামীকাল সকালে অফিসে চলে এসো।আমি ধরে নেব, সেটাই তোমার সম্মতি।আর যদি তোমার উত্তর না হয়,তবুও ভয় পাওয়ার কিছু নেই।তোমাকে কোম্পানির কোনো টাকা শোধ করতে হবে না।বরং কোম্পানির সাথে তোমার যে দুই বছরের চুক্তি হয়েছে, সেই দুই বছরের স্যালারির সম্পূর্ণ টাকা তোমাকে দিবে।সো টাকার কথা ভেবে তোমাকে কোন ডিসিশন নিতে হবে না। তোমার মন যেটা বলবে, তুমি সেটাই করবে।”

সিয়াদাত সুপ্রভাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বেরিয়ে যায়।সুপ্রভা অস্থিরতায় ছটফট করতে থাকে।খেতে বসেও সুপ্রভা খেতে পারে না। অজানা কারণে তার গলা দিয়ে খাবার নামতে চায় না।সে খাবারের প্লেটে পানি ঢেলে দেয়। এঁটো বাসনগুলো পরিস্কার করে রুমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।চোখ বন্ধ করে ঘুমনোর চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুম আসে না।সারারাত বিছানার এপাশ ওপাশ করতে করতে কেটে যায়।


ফজরের আযানের মিষ্টি ধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই বিছানা ছাড়ে সুপ্রভা।সে কালবিলম্ব না করে ওয়াশরুমে চলে যায়। চটজলদি ফ্রেশ হয়ে এসে ফজরের নামাজ আদায় করে নেয়। নামাজ শেষ করতেই নিজেকে অনেক হালকা লাগে সুপ্রভার। সে রাতভর অনেক ভেবেছে। অনেক ভেবেচিন্তে নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে SSS গ্ৰুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিতে সে যাবে।তাকে যেতেই হবে।সুপ্রভা জায়নামাজ টা গুছিয়ে রেখে কিচেনে উঁকি দেয়।সিমি ব্রেকফাস্ট তৈরি করছে।সুপ্রভা সিমির হাতে হাতে সাহায্য করে। ব্রেকফাস্ট শেষ হতেই সিমি সুপ্রভাকে রেডি হ‌তে তাড়া দেয়।সুপ্রভা বিনাবাক্যে রেডি হতে চলে যায়।সিমি একটু অবাক হয় বৈকি।সুপ্রভার অভিসন্ধি ঠাহর করতে পারে না সে।

মিনিট ত্রিশেক পর সুপ্রভা বেরিয়ে আসে।তাকে দেখে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায় সিমির। সুপ্রভার পরনে কালো শাড়ি, চোখে গাঢ় কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, লম্বা চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া।ফর্সা গায়ে কালো রং সুপ্রভার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে শতগুণে।সিমি সুপ্রভার দিকে এগিয়ে যায়। উৎফুল্ল গলায় বলে– “ মাশাআল্লাহ। তোমাকে চমৎকার লাগছে প্রভা।কারো নজর না লাগুক।”

সুপ্রভা লাজুক হাসে। সিমি সুপ্রভার হাত দুটো নিজের মুঠোয় পুরে নেয়। মিষ্টি হেসে বলে– “ আজ তোকে আমি একা ছাড়ছি না প্রভা। আমিও তোর সাথে যাবো। তুই দুই মিনিট দাঁড়া।আমি চট করে রেডি হয়ে আসছি।”

সিমির কথা শুনে সুপ্রভা খুশি হয়ে যায়। উদগ্ৰীব
কণ্ঠে বলে– “ তুই সত্যিই যাবি সিমি?”

সিমি সুপ্রভার হাতে নিজের ফোনটা দিয়ে বলে– “
ফোনটা রাখ।দাভাই কল দিতে পারে।আমি দু মিনিটে আসছি।”

সুপ্রভা সোফায় গিয়ে বসে।দু মিনিটের কথা বলে দশ মিনিট হয়ে গেছে। তবুও সিমির দেখা নেই।সুপ্রভা বিরক্ত হয়ে ওয়াইফাই কানেক্ট করে ফেসবুকে ঢোকে। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ একটা ভিডিও তার সামনে আসে। ভিডিও টা দেখেই সুপ্রভার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে।তার হাত থেকে ফোনটা ফ্লোরে পড়ে যায়। সুপ্রভা ভয়ার্ত গলায় বলে– “ তবে কি সবটা শুরু করার আগেই শেষ হয়ে যাবে?”

চলবে ??

® Nuzaifa Noon

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply