নতুনপ্রেমেরগান (১৩)
সিয়াদাত বক্র হেসে বলে –”আমি তোমাকে আমার স্লিপিং পার্টনার করতে চাই।উইল ইউ বি মাই স্লিপিং পার্টনার?”
শব্দগুলো সুপ্রভার কানে উত্তপ্ত সিসা ঢালে।তার সর্বাঙ্গ কাঁপছে।তবে ভয়ে নয়। রাগ , ক্ষোভ, অপমানের তীব্রতায়। সুপ্রভা র’ক্ত চক্ষু নিয়ে তেড়ে আসে সিয়াদাতের দিকে।কুপিত কণ্ঠে বলে – “ আমি আপনাকে ভালো মানুষ ভেবেছিলাম মিস্টার সিয়াদাত শাহারিয়ার। কিন্তু না! আমি ভুল ছিলাম।আসলে আপনি একটা মুখোশধারী শ’য়তান।আপনি নাকি একজন প্রফেসর? শিক্ষকরা সম্মানীয় ব্যক্তি ,পিতার সমতুল্য হয় জানতাম। কিন্তু আপনার মধ্যে সেরকম কোনো সম্মানবোধ আমি দেখছি না। এমন নোংরা, কলুষিত মন নিয়ে আপনি কিভাবে স্টুডেন্টদের শিক্ষা দেন। যেখানে আপনার নিজেরই কোনো শিক্ষা নেই।”
সুপ্রভা থামে না ।তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখ দুটো জ্বলন্ত ভাটার ন্যায় জ্বলছে। সে ধারালো কণ্ঠে বলে— “আপনি কি ভাবেন, ক্ষমতা থাকলেই একজন নারীকে বিছানায় নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া যায়?এই অফিস আপনার হতে পারে। কিন্তু আমার আত্মসম্মান আপনার সম্পত্তি নয়।আপনি প্রফেসর পরিচয়ে সমাজে সম্মান পান।কিন্তু আজ আপনি যেটা বললেন, সেটা একজন প্রফেসরের মুখে বেমানানই নয়, ঘৃণিত অপরাধও বটে।আমি চাইলেই বোর্ড অব ডিরেক্টরসের কাছে লিখিত অভিযোগ করতে পারি।প্রয়োজনে নারী হ’য়রানি আইনে মামলা করতেও পারি।
সুপ্রভা আরও এক পা এগিয়ে আসে।সিয়াদাতের দিকে আঙ্গুল তুলে ক্রুদ্ধ স্বরে বলে–
“শিক্ষক পরিচয়ে আপনি ছাত্রদের কী শেখান আমি জানি না।কিন্তু একজন নারীকে অপমান করলে তার কী জবাব পাওয়া যায়, সেটা আপনাকে শিখিয়ে দিতে পারি।”
কথাটা শেষ করেই সুপ্রভা প্রায় তার টেবিলের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়।তার নিশ্বাস গরম হয়ে উঠেছে।গলা শুকিয়েও কাঠ হয়ে এসেছে।সে কখনোই এতো কথা বলে না। কিন্তু আজ তার কী হয়েছে সে নিজেও জানে না। সিয়াদাতকে দু চারটা কথা শোনাতে পেরে তার আনন্দ হচ্ছে। পৈশাচিক আনন্দ। কিন্তু যে মানুষটাকে এতো গুলো কদর্য কথা শোনালো , সেই মানুষটার মধ্যে কোনো হেলদোল নেই।সে অত্যন্ত ধীরে টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের জগ থেকে পানির গ্লাসে জল ঢালে।
তারপর গ্লাসটা আলতো করে সুপ্রভার দিকে বাড়িয়ে দেয়। ধীর গলায় বলে–
“নিশ্চয়ই গলা শুকিয়ে গেছে?”এতক্ষণ ধরে বক্তৃতা দিচ্ছো।একটু গলা ভিজিয়ে নাও। দেন স্টার্ট এগেইন।”
সুপ্রভা স্তম্ভিত হয়ে যায়।সিয়াদাত চেয়ারের পিঠে হেলান দেয়। স্মিত হেসে বলে –“তোমার চোখে, মুখে এত আগুন!অস্বীকার করবো না,দেখতে শুনতে, মন্দ লাগছে না।অনেকেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পায় না।আর তুমি আমার অফিসে দাঁড়িয়ে আমাকেই থ্রেট দিচ্ছো?আই লাইক ইট।তুমি শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার জন্য একদম পারফেক্ট।”
সুপ্রভার চোখ আরও লাল হয়ে ওঠে। সিয়াদাত সুপ্রভার দিকে একপল তাকিয়ে কুটিল হাসে।কটাক্ষ করে বলে – “মানতেই হবে তুমি অনেক ফার্স্ট ।আমি তোমাকে জাস্ট স্লিপিং পার্টনার করার অফার দিয়েছি। আর তুমি বিছানা পর্যন্ত চলে গিয়েছো? হাউ সুইট!”
সুপ্রভার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হয় না। সিয়াদাত বাঁকা হেসে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে– “ বিয়ের আগেই আমি ডিংডং করবো? যাহ্ দুষ্টু! ভাবতেই লজ্জা লাগছে।”
কথাটা বলেই সিয়াদাত টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা তুলে সুপ্রভার সামনে আলতো করে ঠেলে দেয়। গম্ভীর গলায় বলে– “পৃষ্ঠা পাঁচ পড়ো।”
সুপ্রভা ঝাঁঝালো গলায় বলে–
“আমি আপনার আর কোনো কাগজ পড়বো না।”
সিয়াদাত শক্ত গলায় বলে– “পড়ো।”
সুপ্রভা অনিচ্ছায় তাকাল। সেখানে বড় অক্ষরে লেখা—
Sleeping Partner (Equity Investment Agreement)
Non-operational Shareholder. Profit entitlement without managerial authority.
স্লিপিং পার্টনার (ইকুইটি বিনিয়োগ চুক্তি)
অ-পরিচালনাকারী শেয়ারহোল্ডার। ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা ছাড়াই লাভের অংশীদার।
বিষ্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে যায় সুপ্রভার। সিয়াদাত
ধীরস্থির কণ্ঠে বলে– “ স্লিপিং পার্টনার মানে ঘুমনোর সঙ্গী বা বিছানার সঙ্গী নয়।স্লিপিং পার্টনার (Sleeping Partner) বা নিষ্ক্রিয় অংশীদার হলেন এমন একজন বিনিয়োগকারী, যিনি কোনো ব্যবসায় মূলধন বা অর্থ বিনিয়োগ করেন কিন্তু ব্যবসার দৈনন্দিন পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা বা সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন না। তিনি লাভের অংশ পেলেও, তার দায় সাধারণত বিনিয়োগকৃত মূলধন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। এদের সুপ্ত অংশীদারও বলা হয় ।”
লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায় সুপ্রভার। তার মুখ থেকে টু শব্দটি বের হয় না।সে না জেনে বুঝেই সিয়াদাতকে যা নয় তাই বলে অপমান করেছে।সুপ্রভা ভাবে সিয়াদাত হয়তো তাকে কঠিন কথা শোনাবে।গালে চড় থাপ্পড়ও দিতে পারে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সিয়াদাত শান্ত গলায় বলে– “তোমার অসুস্থ বোধ হলে, আজকের মতো বাসায় ফিরে যাও। বিশ্রাম নাও। আমি পরে তোমাকে কাজের প্রতিটি ধাপ বুঝিয়ে দেব। ধীরে ধীরে, এক এক করে সবকিছু।”
বাসায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে সুপ্রভা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এই মুহূর্তে সিয়াদাতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার স্পর্ধা নেই তার।সে নিজেই বুঝতে পারছে, কতটা ভুল বোঝা আর তীব্র প্রতিক্রিয়ায় সে সিয়াদাতকে অপমান করেছে।সুপ্রভা কিছু না বলে নিঃশব্দে দরজার দিকে পা বাড়ায়। ঠিক তখনই পেছন থেকে সিয়াদাতের নরম গলা শোনা যায় – “ বাইরে ড্রাইভার দাঁড়িয়ে রয়েছে। তোমাকে নিরাপদে পৌঁছে দিবে।”
সুপ্রভা পেছন ফিরে তাকায় না। ফ্লোরের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কাঁপা গলায় বলে– “ ড্রাইভার লাগবে না।আমি একা যখন আসতে পেরেছি তখন একা যেতেও পারব।”
সুপ্রভা আর এক মিনিটও বিলম্ব করে না।এক প্রকার পালিয়ে আসে সিয়াদাতের সামনে থেকে।”
বাড়ি ফিরেই সুপ্রভা সিমিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করে দেয়। সিমি হাজারবার সুপ্রভাকে জিজ্ঞেস করে – “ কী হয়েছে? কেন সে কান্না করছে? অফিসে কিছু হয়েছে কি না? কেউ তাকে কিছু বলেছে কি না?”
কিন্তু সুপ্রভা নিরুত্তর।সে নিজের মতো কিছুক্ষণ কান্না করে রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। সিমিও সুপ্রভাকে জোর করে না।সিমি জানে সুপ্রভা তার কাছ থেকে কোনো কথা গোপন করে না।মন ভালো হলে সুপ্রভা নিজে থেকেই তাকে সবটা বলবে।
সিমি রাতের রান্না করছিল, তখনই সুপ্রভা গুটি গুটি পায়ে কিচেনে আসে।সিমি তাকে দেখে মিষ্টি হেসে বলে – “ ঘুম ভাঙ্গল তবে?”
তখন কান্না করতে করতে সুপ্রভা কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও জানে না। তন্দ্রা ঘোর কাটতেই দেখে রাত আটটা বেজে গেছে।সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে।জটজলদি ফ্রেশ হয়ে কিচেনে আসে। কপট রাগ দেখিয়ে বলে – “ তুই আমাকে ডাকিস নি কেন? ঘুমের জন্য নামাজ মিস হয়ে গেলো।”
সিমি দরদমাখা গলায় বলে – “ তোকে বারকয়েক ডেকেছি। কিন্তু তোর কোনো সাড়া পাই নি।তোকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন দেখে আমার খুব মায়া হচ্ছিলো।জোর গলায় ডাকতে ইচ্ছে করেনি।কাজা নামাজ পড়ে নিস।”
সিমি বিরিয়ানি রান্নার জন্য চাল ভাঁজছে।সুপ্রভা সিমির হাত থেকে খুন্তি নিয়ে চাল নাড়তে শুরু করে।সিমি দরাজ গলায় বলে– “ তুই তো খুব ভালো বিরিয়ানি রান্না করিস। আজকের বিরিয়ানি টা না হয় তুইই রান্না কর।দাভাই আসবে। দাভাইয়ের বিরিয়ানি খুব পছন্দ।তোর হাতের বিরিয়ানি হলে তো দাভাই একাই পাতিল খালি করে দিবে।”
সুপ্রভা ছোট করে জবাব দেয় – “ ঠিক আছে।
আমিই করছি।”
“ তাহলে আমি বরং যাই।আমার অন্য কাজ আছে।” বলেই সিমি দরজার দিকে পা বাড়ায়।সুপ্রভা পেছন থেকে সিমির হাত কেটে ধরে। শক্ত গলায় বলে — “ দাঁড়া সিমি।তোর সাথে আমার অনেক কথা আছে।”
সিমি বোধহয় ঠাহর করতে পারে সুপ্রভা কোন বিষয়ে কথা বলতে চাইছে। সে আমতা আমতা করে বলে–“ আমি তোর সব কথা শুনবো প্রভা।তোর প্রশ্নের উত্তরও দিব। কিন্তু এখন নয়।একটু অপেক্ষা কর।তোর সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবি।”
সুপ্রভা আর কথা বাড়ায় না। রান্নায় মনোযোগ দেয়। বিরিয়ানির সাথে সে আস্ত ডিম ভাজি, বেগুন ভাজি, স্যালাডও করে।রান্না শেষ হতেই সিমি খাবার ডেকোরেশনের কাজে লেগে পড়ে।সুপ্রভা হাতে হাতে সাহায্য করছিলো। ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে ওঠে। সিমির মুখ খুশিতে চকচক করে ওঠে। সিমি প্রসন্ন গলায় বলে– “ দাভাই এসেছে। সুপ্রভা দৌড়ে গিয়ে দরজাটা একটু খুলে দে । প্লিজ।”
সুপ্রভা মন্থর পায়ে এগিয়ে এসে দরজা খুলে দেয়।
দরজার অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে তার মেরুদন্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়।সে অবিশ্বাসী গলায় বলে– “ আপনিই সিমির দাভাই? এটা কীভাবে সম্ভব?”
চলবে???
[ সিমির দাভাই কে হতে পারে? সঠিক উত্তর দাতা পাবেন মোতালেবের গলায় চমলক্ব গান শোনার সুবর্ণ সুযোগ।আর হ্যাঁ যারা গল্পটা পড়ছেন, অবশ্যই কমেন্ট করবেন।১০০০ কমেন্ট হলে রাতে বোনাস পর্ব দিব ইনশাআল্লাহ]
® Nuzaifa Noon
Share On:
TAGS: নতুন প্রেমের গান, নুজাইফা নূন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৩
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৭+বোনাস
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১১
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১২
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৫
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৪
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৬
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১০