নতুনপ্রেমেরগান (১২)
“প্রফেসর শেখ সিয়াদাত শাহারিয়ার আপনি সত্যিই এই কোম্পানির চেয়ারম্যান?নাকি আমাকে ভয় দেখানোর জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন?”
সিয়াদাত ধীরে কলমটা টেবিলে রেখে চেয়ারের পিঠে হেলান দেয়।বক্র হেসে বলে– “ সারপ্রাইজ কেমন লাগলো?”
সুপ্রভা এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না এই কোম্পানির চেয়ারম্যান সিয়াদাত শাহারিয়ার।সে পুনরায় শুধোয় —“ আপনি সত্যিই এই কোম্পানির চেয়ারম্যান?”
সিয়াদাত বাঁকা হাসে। রাশভারী কণ্ঠে বলে– “বাইরের নেমপ্লেট দেখো নি ?”
সুপ্রভা নিচু স্বরে জবাব দেয় — “ জ্বি দেখেছি। SSS গ্ৰুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ লেখা ছিলো।”
সিয়াদাত ধীরে ধীরে টেবিলের উপর রাখা ক্রিস্টালের পেপারওয়েটটা আঙুলে ঘুরাতে থাকে। তার চোখদুটো তীক্ষ্ণ, অথচ ঠোঁটে রহস্যময় হাসি।গলায় ধীরস্থির কণ্ঠস্বর — “SSS ফুল মিনিং কী জানো?”
সুপ্রভা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। বাইরের নেমপ্লেটে SSS গ্ৰুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ লেখা দেখে তার বুকটা কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু SSS এর পূর্ণরূপ Sheikh Siaadat Shahariar এটা তার ছোট্ট মস্তিষ্ক ঠাহর করতে পারেনি।সুপ্রভার মাথা চক্কর দিয়ে উঠে।তার মনে হয় মেঝেটা যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে পায়ের নিচ থেকে।যে মানুষটার থেকে পালানোর জন্য সে নিজের আপনজন, পরিচিত শহর ছেড়ে অচেনা শহরে পাড়ি জমিয়েছে , এখন
সেই মানুষটার সামনেই সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ব্যাপার টা সিনেমাটিক, রোমান্সকরও বটে। কিন্তু সুপ্রভার মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় না।
সিয়াদাত নিজেই উত্তর দেয়—“Sheikh Siaadat Shahariar । আমার নামেই এই সাম্রাজ্য। আমার বাবা সাদমান শেখ এই কোম্পানির মালিক।”
সুপ্রভার বুক ধড়ফড় করছে।বড়ই অশান্তি লাগছে।সে কাঁপতে থাকা গলায় বলে– “ আমি যদি জানতাম এটা আপনার কোম্পানি, এখানে চাকরি করতে আসা তো দূরের কথা।এই শহরেই পা রাখতাম না।”
সিয়াদাত সুপ্রভার চোখের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলে — “ তুমি যে শহরেই যাও না কেন, এই সিয়াদাত শাহারিয়ার চোখের আড়াল হওয়ার সাধ্য তোমার নেই। যেখানেই যাবে, সেখানেই সিয়াদাত শাহারিয়ারকে পাবে।”
সুপ্রভার হৃদয় হঠাৎ অদ্ভুতভাবে জোরে ধড়ফড় করতে শুরু করে। সে বুঝতে পারে এই মানুষটা শুধুই ক্ষমতাবান নয়, মানুষ টা সম্মোহন জানে। তার চোখের মধ্যেও এক অদ্ভুত আকর্ষণ, এক রহস্যময় জাদু আছে, যা তাকে অচেতনভাবে টানছে। কিছু সময় এই মানুষ টার চোখের সামনে থাকলে সুপ্রভা হয়তো সত্যি সত্যিই তার প্রেমে পড়ে যাবে।যেটা সুপ্রভা চায় না। সে জোরালো গলায় বলে– “ আমার চাকরির কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আজই রেজিগনেশন দেব।”
বলেই সুপ্রভা দরজার দিকে এগিয়ে যায়। সিয়াদাত কুটিল হাসে।নিবিড় গলায় বলে বলে—“দাও।”
সুপ্রভার পা থেমে যায়। কিন্তু পেছন ফিরে তাকায় না। দরজার দিকে মুখ করে তেজি গলায় বলে–
“আমি সিরিয়াস।”
সিয়াদাত ছোট করে জবাব দেয় – “আমিও।”
সিয়াদাতের অভিসন্ধি মোটেও ঠিক লাগে না সুপ্রভার।সে ত্বরিত পেছন ফেরে।সিয়াদাত টেলিফোনে কারো সাথে কথা বলছে।সে টেলিফোন রাখার মিনিট দুয়েক পরেই কেবিনের বাইরে থেকে মেয়েলি সুরেলা কণ্ঠ শোনা যায় –
“ মে আই কাম ইন স্যার?”
সিয়াদাত গম্ভীর গলায় বলে– “ ইয়েস ।”
মেয়েটা সিয়াদাতের হাতে একটা নীল রঙের ফাইল দিয়ে যায়।সিয়াদাত ফাইল টা খুলে টেবিলের উপর রাখে। মৃদু গলায় বলে– “কন্ট্রাক্ট পেপার টা ভালো করে পড়েছিলে?”
সুপ্রভার ভ্রু কুঁচকে যায়। সে অবাক গলায় বলে —“মানে? কিসের কন্ট্রাক্ট পেপার?”
সিয়াদাত ফাইলটা ঘুরিয়ে দেয় তার দিকে।পাতার নিচে স্পষ্ট তার নিজের সিগনেচার।তার হাতের লেখা। তার সই। যেখানে ইংরেজিতে লেখা—
Clause ৭.৩
Minimum Employment Period: 24 Months.
Early termination will require compensation equal to 18 months’ gross salary. ( ধারা ৭.৩
ন্যূনতম চাকরির মেয়াদ: ২৪ মাস।
নির্ধারিত সময়ের আগে চাকরি ত্যাগ করলে কর্মীকে ১৮ মাসের মোট বেতনের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।)
সুপ্রভার বুক ধক করে ওঠে। তার গলা শুকিয়ে আসে। কাঁপা গলায় বলে– “ আমি এসব কিছুই জানিনা।আমি না পড়েই সিগনেচার করে দিয়েছি।”
সুপ্রভা একটু থেমে আবারও বলে– “মানে আমি এখন চাকরি ছাড়তে চাইলে…”
সিয়াদাত ডেবিল হেসে বলে– “তোমাকে আঠারো মাসের পুরো স্যালারি একসাথে কোম্পানিকে ফেরত দিতে হবে।”
সুপ্রভার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। চোখের সামনে সবটা ব্লার হয়ে আসে।সুপ্রভা ভয়ার্ত কন্ঠে বলে– “ এটা অন্যায়। আপনি জোর করে আমাকে এখানে আটকে রাখতে চাইছেন।”
সিয়াদাত চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসে।
নির্লিপ্ত গলায় বলে– “ তোমাকে জোর করা হচ্ছে না মিস সুপ্রভা।তুমি চাইলেই চাকরি ছাড়তে পারবে। শুধু কোম্পানিকে আঠারো মাসের বেতন দিতে হবে।এটা কর্পোরেট বাস্তবতা। তুমি অ্যাডাল্ট পার্সোন। নিজের সিগনেচারের দায়িত্ব তোমার।”
সুপ্রভার চোখে এবার সত্যিকারের আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে।এই শহরে নিজের বলতে তার কেউ নেই।কোনো সঞ্চয় নেই।এত টাকা দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তার সামনে দুটো পথ খোলা রয়েছে । হয় ঋণ পরিশোধ করা।না হয় তো সিয়াদাত শাহারিয়ার সাম্রাজ্যের ভেতরে আটকে থাকা। সুপ্রভা কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।বড্ড অসহায় লাগে নিজেকে। সুপ্রভা দু কদম পিছিয়ে যায়।মনে মনে বলে– “ আমাকে এ কোন পরীক্ষায় ফেললে আল্লাহ? যার থেকে পালাতে চেয়েছি , তুমি তার সাথেই আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে দিতে চাইছো? আমি এখন কী করব? এই অচেনা শহরে আমাকে কোন বিপদের মুখে ঠেলে দিলে তুমি?”
সুপ্রভা নিজেকে ধাতস্থ করে নিজেকে নিজেই আশ্বাস দেয় — “ তুই চাকরি টা কর সুপ্রভা। চাকরি টা করলেই যে সারাক্ষণ তোকে সিয়াদাত শাহারিয়ার চোখের সামনে থাকতে হবে, এমনটা তো নয়। তাছাড়া সিয়াদাত শাহারিয়ার একজন প্রফেসর।সে নিশ্চয়ই ইউনিভার্সিটি ছেড়ে এই কোম্পানিতে সবসময় থাকবে না? তুই নিশ্চিতে কাজ করতে পারবি। তুই চাকরিটা কর সুপ্রভা । বিধবা পরিচয় থেকে বেরিয়ে নিজের আলাদা একটা পরিচয় গড়ে তোল।”
সুপ্রভা চোখ মুছে নরম গলায় বলে– “ চাকরিটা করব আমি।”
সিয়াদাত ঈষৎ হেসে ফাইলের আরেকটা পৃষ্ঠা উল্টায়। যেখানে লেখা–
Clause ৯.১
Employee will work directly under the Chairman’s Special Supervision for strategic projects.( ধারা ৯.১
কৌশলগত (স্ট্র্যাটেজিক) প্রকল্পসমূহের ক্ষেত্রে কর্মী সরাসরি চেয়ারম্যানের বিশেষ তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন।)
বিষ্ময়ে সুপ্রভার চোখ বড় হয়ে যায়।সে হতবাক কণ্ঠে বলে–“মানে আমি সরাসরি আপনার অধীনে?”
“Exactly.”
এক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।সে ভয়ে ভয়ে বলে– “আ আমি অন্য কোনো প্রজেক্টে কাজ করতে পারি না?”
সিয়াদাত চেয়ারের হাতলে আঙুল বুলাতে বুলাতে শান্ত স্বরে বলে—“না।কৌশলগত প্রজেক্টগুলো সরাসরি আমার তত্ত্বাবধানে চলে। আর তুমি এখন সেই টিমের অংশ।আমি তোমাকে যা যা করতে বলবো তুমি সেগুলো করতে বাধ্য।”
সুপ্রভার শরীর কেমন ঝিমঝিম করছে।হাতপা কাঁপছে।সিয়াদাত সুপ্রভার দিকে একপল তাকিয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। মৃদু গলায় বলে– “ তোমার জন্য আরো একটা সারপ্রাইজ আছে?”
সুপ্রভা ধীর গলায় বলে– “ কী সারপ্রাইজ?”
“আমি তোমাকে আমার স্লিপিং পার্টনার করতে চাই।উইল ইউ বি মাই স্লিপিং পার্টনার?”
চলবে??
[ আপনারা অনেকেই চুপিচুপি গল্পটা পড়ে চলে যান। কিন্তু রিয়েক্ট কমেন্ট কিছুই করেন না। গল্পের রিচ কমে গেছে দেখে আমারও লেখার আগ্রহ কমে গেছে। এরকম হলে আর দুয়েক এক পর্বে গল্পটা শেষ করে দিব।আপনারা কি চান গল্পটা শেষ করে দিই?]
® Nuzaifa Noon
Share On:
TAGS: নতুন প্রেমের গান, নুজাইফা নূন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নতুন প্রেমের গান গল্পের লিংক
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৯
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৭+বোনাস
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৫
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৩
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ২
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৪
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১৩
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১০
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১১