Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ১১


নতুনপ্রেমেরগান (১১)

সুপ্রভার বুক ধক করে উঠে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সিমির দাভাই।আগের মতোই আপাদমস্তক ঢাকা।হাতে এখনো সুপ্রভার শাড়ির আঁচল বাধা। সুপ্রভা বলতে ইচ্ছে করে – “ এতোই যখন পর্দা করার শখ, তখন হাত দুটো উন্মুক্ত রেখেছেন কেন? দুইটা হাত মোজা পরে নিন।”

কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের ইচ্ছেকে দমিয়ে রাখাটাই শ্রেয় মনে করে সুপ্রভা। এমনিতেও লোকটা রসকষহীন। কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়ার আশাটাও ক্ষীণ।এই তো মিনিট দুয়েক আগে লোকটাকে একটা প্রশ্ন করা হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে কোনো হেলদোল নেই।সে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।বিরক্তিতে চোখ সরু হয়ে যায় সুপ্রভার।সুপ্রভা পুনরায় শুধোয় – “ আপনি এখানে?”

লোকটা মন্দ্র স্বরে বলে– “ অন্য কাউকে আশা করেছিলেন নাকি?”

সুপ্রভা কিছু বলতে উদ্যত হয় ঠিক তখনই ভেতর থেকে সিমির গলা শোনা যায় – “ কে এসেছে প্রভা?”

সুপ্রভা রিনরিনে গলায় বলে– “ তোর দাভাই।”

“ দাভাইকে ভেতরে আসতে বল।”

সুপ্রভা মৃদু গলায় বলে– “ ভেতরে এসে বসুন।”

লোকটা শ্রুতিকটু গলায় বলে– “ আমি বসতে আসি নি।”

সুপ্রভা ফট করে বলে উঠে– “ তাহলে কি নাচতে এসেছেন? নাচুন তবে!”

লোকটা কিছু বলে না। নিঃশব্দে প্যান্টের পকেট থেকে ছোট্ট করে মোড়ানো একটা টিস্যু বের করে সুপ্রভার সামনে বাড়িয়ে দেয়।

সুপ্রভা অবাক হয়ে হাতে নেয়। টিস্যু খুলতেই তার চোখ বড় হয়ে যায়।ঝলমল করে উঠে একটা স্বর্ণের কানের দুল। দুলটা সুপ্রভার নিজেরই।রাতে গাড়িতে ওঠার সময় হয়তো খুলে পড়ে গিয়েছিল। সে টেরই পায়নি যে এক কানে দুল নেই।

সুপ্রভা কাঁপা গলায় বলে– “এটা‌ তো সেম আমার কানের দুলের মতো দেখতে।”

লোকটা নিবিড় গলায় বলে– “ এটা আপনার কানের দুলের মতো দেখতে নয়।এটা আপনার‌ই দুল। সিটের কোণে আটকে ছিল। আরেকটা আপনার কানে রয়েছে।”

সুপ্রভা তড়িঘড়ি হাত তুলে কানে ছোঁয়। সত্যিই এক কানে দুল আছে, আরেকটা ফাঁকা।তার গাল লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়।সে ধীর কণ্ঠে বলে– “ আমি খেয়াল‌ই করিনি। ধন্যবাদ।”

লোকটা রাশভারী কণ্ঠে বলে– “দামি জিনিস। হারালে আফসোস হতো।”

সুপ্রভার বুকটা কেঁপে উঠে। দুলটার দাম হয়তো খুব বেশি না। কিন্তু তার কাছে অনেক দামি , অনেক মূল্যবান। তার‌ বাবার শেষ স্মৃতি। সুপ্রভার বাবা একজন কৃষক ছিলেন। নিজেদের অনেক জমিজমা ছিলো। সুপ্রভা ক্লাস নাইনে পড়াকালীন নিজের ক্ষেতের মসুর বিক্রি করে তিনি সুপ্রভাকে দুল জোড়া বানিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ের পর ঈশিতা চৌধুরী সুপ্রভাকে অনেক দামি দামি গয়না দিয়েছেন, কিন্তু সুপ্রভা কখনো সেগুলো ছুঁয়ে‌ও দেখেনি।এই ছোট্ট দুলজোড়া তার কানে থাকে সর্বদা। গতকাল থেকে তার উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গিয়েছে, সে আয়নায় নিজেকে দেখার সময়‌টুকুও পায়নি। ভাগ্যিস সুপ্রভা খেয়াল করার আগেই দুলটা পাওয়া গেছে। নয়তো দুলটার শোকে সুপ্রভার মনোবল ভেঙ্গে যেত।সে কিছুতেই শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারতো না। দুলটা ফিরে পেয়ে আনন্দে সুপ্রভার চোখে জল আসে।সিমির দাভাই সুপ্রভার দিকে একপল তাকিয়ে পরমূহুর্তেই সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মন্থর পায়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে।

সহসা সুপ্রভা ডেকে উঠে– “ এক মিনিট‌।”

লোকটা থামে, কিন্তু পেছন ফিরে তাকায় না।

সুপ্রভা নম্র কণ্ঠে বলে—“সকালে ঠিকমতো ধন্যবাদ দিতে পারিনি। আপনি আমার জন্য এতো কষ্ট করেছেন, আমার জন্য এতো কিছু এনেছেন।আবার এখন আমার অনেক মূল্যবান দুলটা ফিরিয়ে দিলেন।আপনাকে ধন্যবাদ দিলে সেটা কম হয়ে যাবে।আমি আপনার নিকট চির কৃতজ্ঞ থাকব।”

লোকটা রাশভারী গলায় বলে– “ আমি নিজ থেকে আপনার জন্য কিছুই করি নি।এটা আমার দায়িত্ব ছিলো।”

সুপ্রভা কপালে চোখ তুলে বলে– “ কিসের দায়িত্ব?”

এবার সে ধীরে পেছন ফিরে তাকায়। ধীরস্থির কণ্ঠে বলে–

“সিমি আপনাকে আমার দায়িত্বে দিয়েছিল।”

সুপ্রভাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই লোকটা হনহনিয়ে বেরিয়ে যায়।সে যাওয়ার মিনিট দশেক পর সিমি আসে।এদিক ওদিক নজর ঘুরিয়ে বলে – “ দাভাই কি চলে গিয়েছে?”

সুপ্রভা নরম গলায় বলে — “ হ্যাঁ। মানুষটাকে আমি যতোটা খারাপ ভেবেছিলাম ততোটাও খারাপ নয়। তবে কেমন যেন অদ্ভুত কিসিমের।পা থেকে মাথা পর্যন্ত রহস্যে ঘেরা।”

সিমি মজার ছলে বলে – “ দাভাইকে নিয়ে এতো ভাবিস না।প্রেমে পড়ে যাবি।”

সুপ্রভা সিমির দিকে কঠোর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। কুপিত কণ্ঠে বলে– এবার কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে সিমি।”

সিমি সুপ্রভার কাঁধে মুখ ঠেকিয়ে বলে– “ জাস্ট কিডিং ইয়ার।ডোন্ট বি সিরিয়াস।”

সুপ্রভা রাগ করে থাকতে পারে না।সশব্দে হেসে উঠে।সিমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সুপ্রভার ভুবন ভোলানো হাসির দিকে।


আজ সুপ্রভার জয়েনিং ডে। সিমি তাকে এমন ভাবে সাজিয়েছে দেখে মনে হচ্ছে সে অফিসে নয়,বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছে। নোমান মা’রা যাওয়ার পর সুপ্রভা কখনো রঙিন পোশাক পরে নি। সাদামাটা পোশাক পরেছে সর্বদা। কিন্তু সিমি আজ তাকে পার্পল কালারের শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক‌ও দিয়েছে। অফিসের‌ প্রথম দিনেই এমন সাজগোজ করে যেতে অস্বস্তি বোধ হয় সুপ্রভার। সে সাজগোজ নষ্ট করতে চায়, কিন্তু সিমি তার উপর চড়াও হয়।সুপ্রভা আচানক সিমিকে জড়িয়ে ধরে। আবেগ জড়িত গলায় বলে– “ থ্যাংক ইউ।
থ্যাংক ইউ সো মাচ সিমি। তুই আমাকে নতুন একটা জীবন উপহার দিলি।আমাকে নতুন করে বাঁচার সুযোগ করে দিলি।তোর এই ঋণ আমি কখনোই শোধ করতে পারবো না।”

সিমির সুপ্রভার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। মনে মনে বলে — “ আমি তোর জন্য কিছুই করি নি প্রভা। যা করার সে করেছে। আমি শুধু তার ইনস্ট্রাকশন ফলো করছি। আমরা দুজনেই যে তোকে ভালোবাসি।তোর ভালো চাই। তোর মুখের এক চিলতে হাসিতে যে আমাদের মুখেও হাসি ফুটবে।

সিমিকে বিদায় জানিয়ে সুপ্রভা বেরিয়ে পড়ে। রিকশা থেকে নেমে যখন সে বিশাল কাঁচঘেরা ভবনটার সামনে দাঁড়ায়।তার বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠে।ভবনের গায়ে বড় বড় স্টিলের অক্ষরে লেখা— SSS গ্ৰুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ।

এই প্রতিষ্ঠান মূলত গার্মেন্টস, রিয়েল এস্টেট, আইটি সলিউশন এবং ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট ব্যবসার সাথে জড়িত। দেশের ভেতরে যেমন সুনাম, তেমনি বিদেশেও তাদের শাখা রয়েছে। কর্মীদের জন্য আলাদা ট্রেনিং সেন্টার, আধুনিক অফিস স্পেস, কনফারেন্স রুম, এমনকি ছোট্ট একটা লাইব্রেরিও আছে।

সুপ্রভা দুরুদুরু বুক নিয়ে এগিয়ে আসে।গেটের সামনে ইউনিফর্ম পরা গার্ড ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করে— “ম্যাডাম, ইন্টারভিউ নাকি জয়েনিং?”

সুপ্রভা কাঁপা গলায় বলে— “জ… জয়েনিং।”

রিসেপশনে ঢুকতেই ঠাণ্ডা বাতাসে শরীর কেঁপে উঠে তার। চকচকে মার্বেল ফ্লোর, দেয়ালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কারের ফ্রেম, কর্মচারীদের পরিপাটি চলাফেরা ,সবকিছুতেই এক ধরনের প্রভাবশালী শৃঙ্খলা।

সুপ্রভা রিসেপশনের দিকে এগিয়ে যায়। রিসেপশনিস্ট হাসিমুখে বলে — “ম্যাম, আপনার নাম?”

সুপ্রভা বিবর্ণ গলায় বলে— “সুপ্রভা, সুপ্রভা রহমান।”

মেয়েটি কম্পিউটারে কিছু টাইপ করে। তারপর মাথা তুলে মৃদু হেসে বলে— “ওহ, ইয়েস ম্যাম। আপনার জন্য আলাদা নির্দেশনা আছে। চেয়ারম্যান স্যার নিজে বলেছেন আপনাকে সরাসরি তার কেবিনে পাঠাতে।এই করিডোর ধরে ডান পাশে শেষ কেবিনে চলে যান।”

সুপ্রভা মাথা নাড়িয়ে ধীরে ধীরে কেবিনের দিকে এগোতে থাকে।দরজার সামনে এসে ছোট্ট একটা স্বর দিয়ে বলে—“মে আই কাম ইন স্যার।”

ভেতর থেকে ভেসে আসে রাশভারী স্বর—“ইয়েস।”

গলার স্বরটা পরিচিত মনে হয় সুপ্রভার। কোথায়
গলায় স্বরটা শুনেছে, কবে শুনেছে‌ সেসব নিয়ে ভাবার সময় তার হাতে নেই। ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে। ভেতরে ঢুকতেই ঠাণ্ডা এয়ারকন্ডিশনের বাতাস মুখে লাগে। কেবিনটা প্রশস্ত। এক পাশে কাঁচের দেয়াল ।সেখান থেকে পুরো শহর দেখা যায়। ভারী পর্দা অর্ধেক টানা। মাঝখানে বড় এক্সিকিউটিভ টেবিল।

তার ওপাশে কালো লেদারের হাই-ব্যাক এক্সিকিউটিভ সুইভেল চেয়ার।চেয়ারটা জানালার দিকে মুখ করে আছে। সেখানে বসে থাকা মানুষটার শুধু পিঠটাই দেখা যাচ্ছে। প্রশস্ত কাঁধ। সাদা শার্টের নিখুঁত ভাঁজ। ডান হাতের আঙুলে একটা কলম ধরে রাখা।

সুপ্রভার গলা শুকিয়ে গেল।সে শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা গলায় বলল–“স্যার, আমি সুপ্রভা। সিমি আমার….”

কথা শেষ হওয়ার আগেই চেয়ারটা খুব ধীরে, প্রায় অলস ভঙ্গিতে ঘুরতে শুরু করল।সময় যেন হঠাৎ ধীর হয়ে গেল।চেয়ারটা অর্ধেক ঘুরল।তারপর আরও একটু।আর পরের মুহূর্তেই সামনের মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

চেয়ারম্যান স্যারের জায়গায় অতি পরিচিত মুখ দেখে সুপ্রভার পায়ের তলা থেকে যেন সত্যিই মাটি সরে গেল। চারপাশের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। সে এক পা পেছাতে গিয়ে টেবিলের কোণায় ধাক্কা খেল। হাতের ফাইলগুলো ঝপ করে মেঝেতে পড়ে ছড়িয়ে গেল। তার মুখ থেকে কাঁপা স্বরে বেরিয়ে আসে – “ আপনি‌ই চেয়ারম্যান স্যার?”

চলবে ইনশাআল্লাহ।।

[ চেয়ারম্যান স্যার কে? কাকে দেখে ভয় পেলো সুপ্রভা?
কমেন্ট করে জানান। সঠিক উত্তর দাতা একটা ইবুক গিফট পাবেন।]

® Nuzaifa Noon

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply