দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ২৬
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
২৬
—” আস্তাগফিরুল্লাহ ভাবি! কি কন এই গুলা? জানে মারবেন নাকি আমারে। মিস করাটা কি খুব জরুরি ছিল ভাবি আমারে? ইয়ে! না মানে। আমার মনে হয় আপনার মিস করাটা ভুল করে রং নাম্বারে লেগে গেছে তাই না ভাবি?
মায়া তুমুল গতিতে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে না বুঝালো। অথাৎ সে ঠিক নাম্বারেই লাগিয়েছে। আসিফ মায়ার মাথা নাড়ানো দেখে পুনরায় পাশে টেবিলে থাকালো ভয়াৎ দৃষ্টিতে। পরপর কয়েক বার নিজের মাঝে শুকনো ঢুক গিলে বিরবির করে বলে উঠে ” ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’….
আসিফের বিরবির কথা গুলো কানে আসলো না মায়া। মোলায়েম ঠোঁটে প্রছন্ন হাসির রেখা টেনে তাকিয়ে আছে আসিফের দিকে। আসিফ আঁড়চোখে আবারও সামনে তাকায় মায়ার পিছনে রিদের দিকে। রিদ খোলা কফি শপের বাহিরের টেবলে বসে আছে নিবাক বংগিতে। এই মূহুর্তে মায়ার অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতেও বিন্দু মাত্র হেলদোল হলো না তাঁর। রিদের মুখশ্রীতে কি নিদারুণ কঠিনতা বহুমান। সেই আগের ন্যায় গুরুগম্ভীর মুখে অনল বসে আছে। মায়ার উপস্থিতি কি টের পাইনি নাকি মায়াকে লক্ষ করেনি রিদ সেটা বুঝলো না আসিফ। যাকে ঘিরে পাষান্ড রিদ খানের মনে সার্বক্ষণিক অস্থিরতার তোলপাড় থাকে। এক মূহুর্তে দূরে থাকতে পারছে না বলে মাস পার হতে না হতেই পুনরায় দৌড়ে আসে বাংলাদেশের, সেই রিদ খান নিজের সামনে মায়াকে দেখে একটা বার চোখ তুলে তাকানোর প্রয়োজনও মনে হলো না তার। সে এতটাই নিজ কাজেই ব্যস্ত? অদৌ কি মায়ার সামনে থাকলে রিদ খানকে কোনো কাজ বা ব্যস্ততা কাবু করতে পারে? মায়া থেকে রিদ খানকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে? প্রশ্ন থাকলো আসিফের মনে কোঠায়? কই সেতো বিগত মাস ধরে দেখেনি মায়া নামক মেয়েটিকে এরিয়ে যেতে তাকে বরং দেখেছে দূরে থেকে মায়ার জন্য ছটফট করতে। বেসোমাল পাগলমো করতে। তাহলে আজ হঠাৎ এতটা ইগনোর কেন রিদ খানের? আসিফ আর কিছু ভাবতে পারলো না। তার আগেই মায়ার ডাকে ধ্যান ভাঙ্গে তাঁর। চমকিত বংগিতে তাকায় মায়ার উচ্ছ্বাসিত মুখশ্রীতে। মিনমিন গলায় বলে উঠে,…
—” ভাবি আপনি কলেজ ছেড়ে এখানে কি করছেন? আপনার গাড়ি কই?
আসিফের কথায় উত্তর করলো না মায়া। আবার চুপও খাকলো না। মুখ খুললো তবে পাল্টা প্রশ্ন করার জন্য আসিফকে। উৎসুক বংগিতে আদুরি গলায় বসে উঠলো…
—” ভাইয়া উনি কই?
—” উনি কে ভাবি?
আসিফ বুঝলো না মায়ার উনি বলা মানেটা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মায়ার মুখশ্রীতে। কিছু একটা ভেবে পর মূহুর্তে দৃষ্টি ঘুরিয়ে পুনরায় ফেললো রিদের মুখশ্রীতে। এবার আসিফের চোখে আটকালো রিদের কোমল স্বাভাবিক চেহারাটা। কিছুক্ষণ আগের সেই কঠিনতাটা আর নেই। আসিফ বুঝলো এই মূহুর্তে রিদের দৃষ্টি টেবিলের উপর থাকলেও সর্তক কান দুটোর মনোযোগ সবটা এই দিকেই রাখা তার। সেই সাথে বুঝলো মায়ার “উনি কই’ কথাটির অর্থ। কিন্তু রিদের ভয়ে কিছু বললো না মায়াকে। রিদের নিষেধাজ্ঞা আছে তাঁর উপর। রিদ বাংলাদেশের আছে এই বিষয়টি কাউকে জানাতে নিষেধ করেছে সে। অজ্ঞাত আসিফ প্রসঙ্গ পাল্টায়। মায়ার কথার উত্তর না দিয়ে সেও পাল্টা প্রশ্ন করে বলে…..
—” ভাবি আপনি একা এই রাস্তায় কি করছেন? ডাইভার কই আপনার?
—” আমি পালিয়েছি কলেজ থেকে ভাইভার কাকুর চোখ পাকি দিয়ে বান্ধবীদের সাথে। এখন বলুন উনি কই? আসেনি কেন আপনার সাথে?
আসিফ খানিকটা হাসফাস করে উঠে ভাই-ভাবি মধ্যেকার অবস্থায়। করুণ হাল তাঁর। একদিকে ভাই না করেছে তার তথ্য দিতে। অন্যদিকে ভাবি জেদ করছে সেই তথ্য আদায় করতে। সে একা নিরপেক্ষ প্রাণী। হাসফাস করে পুনরায় দৃষ্টি মেলে তাকায় রিদের দিকে। সাথে সাথে চোখাচোখি হয় রিদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সাথে। রিদ কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। আসিফ সেই দৃষ্টি বুঝে পুনরায় প্রসঙ্গ পাল্টায়। ধীর কন্ঠে বলে…
—” ভাবি আপনি বাসায় যান। আমি আপনার বাসায় যাওয়া ব্যবস্হা করে দিচ্ছি। আমাদের লোক আপানাকে বাসায় পা….
আসিফ থামে। মায়া থামিয়ে দেয় আসিফকে। দু’হাতের মুঠো ভরতি দুটো কোণ আইসক্রিম ধরা। একটা অর্ধেক খেলেও অন্যটা সম্পূর্ণ। নিজের মুঠো ভরতি আস্ত কোণ আইসক্রিমটা এগিয়ে দেয় আসিফের দিকে। ইশারায় বুঝিয়ে বলে উঠে…
—” নিন! নিন! খান। এটা ভালো আইসক্রিম আমি খাইনি। একদম ফ্রেশ। আপনি ভাইয়া না আমার তাই এটা আপনাকে দিলাম। আপনি খান। আমি নিজের কিনে এনেছি রাস্তার মোর থেকে। আপনি ভাইয়া বলে দিলাম নয়তো আমি আমার জিনিস কাউকে দেয়না। কিহল নিন! নিন!
আসিফ মায়ার হঠাৎ অতি ভদ্র ব্যবহারে সূচালো কারণ ধরতে পারলো না সে। কিন্তু রিদ ঠিকই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মায়ার দিকে। মায়ার মাথায় যে কিছু একটা চলছে সেটা ঠিক বুঝতে পারছে রিদ। কিন্তু সেটা কি? বুঝার জন্য চুপ রইলো। আসিফ আঁড়চোখে রিদকে এক পলক দেখে নিয়ে বলে…
—” ইয়ে ভাবি ধন্যবাদ। লাগবে না আমার। আসলে আমি এসব আইসক্রিম খাইনা।
—” খান না বললেই হলো? বোনরা দিলে ভাইয়া জাতিগত ভাবেই খেতে হয় জানেন না সেটা? কিছুক্ষণ আগে না আপনাকে আমি ভাই ডেকেছি, এই মূহুর্তে না আমি আপনার বোন হলাম। এরপরের মূহুর্তেই আপনি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছে ভাইয়া? আপনি জানেন না সম্পর্ক ছিন্নকারী মানুষ গুলো কখনো জান্নাতে যাবে না?
থমথমে খেয়ে যায় আসিফ। মায়া মুখে সম্পর্কে ছিন্ন কারীদের পরিণতি শুনে থমথমে গলায় বললো….
—” তাহলে কি আমি জাহান্নামে যাবো ভাবি?
—” অবশ্যই যাবেন। আপনি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন মাত্রই। তাতে কি আমি বোন হয়ে শেষ অবধি সম্পর্কের দ্বায়িত্ব পালন করবো। দরকার হলে আপনাকে জাহান্নামের রাস্তা অবধি এগিয়ে দিয়ে আসব। তারপরও সম্পর্কে ছিন্ন করবো না।
থমথমে খেয়ে যায় আসিফ। গভীরভাবে শোকে চিন্তায় পড়ে যায়। সামান্য আইসক্রিম ‘না’ রিজেক্ট করাতে যদি সম্পর্ক ছিন্ন হয় তাহলে তার জাহান্নামটাও নিশ্চিত। দ্রুত হাতে মায়ার থেকে আইসক্রিম তুলে ন্যায়। আইসক্রিম প্যাকেট ছাড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে কামড় বসায় তাতে। আপাতত সে জাহান্নামে যেতে চাচ্ছে না। তার হিসাবের খাতা এমনিতেই ভারি হয়ে আছে গ্যাংস্টারের ডানহাত হয়ে। নতুন করে আর ভারি করতে চাই না। আসিফ আইসক্রিম খেতে খেতে বলে” ভাবি আইসক্রিম খেয়ে সম্পর্ক বাচালাম। এবার আমার জাহান্নাম হবে নাতো?
মায়া মিষ্টি হেঁসে না বোধক মাথায়। আসিফ তা দেখে আবারও প্রশান্তিতে আইসক্রিমে কামড় বসায়। মায়া এবার নিজের আধ খাওয়া আইসক্রিমটার প্যাকেট ছাড়াতে ছাড়াতে তাতে কামড় বসাতে বসাতে বলে….
—” এবার বলে ফেলুন তো উনি কোথায়?
আসিফ এবারও মায়া প্রশ্নটা অতি সন্তপর্ণে এরিয়ে যেতে চাই। তাই প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে স্বাভাবিক বংগিতে আইসক্রিম খেতে খেতে বললো….
—” ভাবি আপনার গাড়ি চলে এসেছে। ঐতো ডাইভার চাচা অপেক্ষা করছে। চলুন আপনাকে গাড়ি অবধি এগিয়ে দিয়ে আসি…
আসিফের কথায় ভ্রুঁ কুঁচকে আসে মায়া। তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠে…
—” আপনি আমার আইসক্রিম খেয়ে আমাকে চলে যেতে বলছেন ভাইয়া?
মায়া কথায় খানিকটা ভীমড়ি আসিফ। খটকা লাগলো মায়ার হাবভাবে। অবাক হলো আংশিক। চট করে বলে বসলো…
—” কেন ভাবি আইসক্রিম খাইলে কি বলা যাবে না যাওয়ার জন্য? এটাতেও কি জান্নাত-জাহান্নাম আছে নাকি?
মায়া মোলায়েম কন্ঠে সহজ সরল স্বীকারোক্তিতে বলে…
—” আমি তো আপনাকে আইসক্রিম খাইয়ে ঘুষ দিছি ভাইয়া। আপনি আমার ঘুষ খেয়েছেন তো। এখন বলুন না ভাইয়া আপনার ভাই কই?
প্রচন্ড ভাবে ভীমড়ি খায় আসিফ। চোখ বড় বড় হয়ে যায় মূহুর্তেই। হতবাক কন্ঠে বলে…
—” আইসক্রিমটা আমাকে ভাই-বোনের সম্পর্ক বলে নয়। বরং ভাইয়ের খবর নেওয়ার জন্য ঘুষ দিয়েছেন ভাবি?
মায়া সভ্য সুলভ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় আসিফকে। মূহুর্তেই হতবুদ্ধি হয়ে যায় আসিফ। তাকে এই ভাবে ফাঁদে ফেললো। ভাই! ভাই! বলে এতো বড় ধোঁকা দিল ভাবি। একটা আইসক্রিম দিয়ে সোজা ঘুষখোর বানায় দিল তাঁকে। ধোঁকা দিল তো দিল, সেই সাথে এতো বড় অপবাদ দিল। ডাইরেক্ট সম্পর্ক ছিন্ন কারীর নামে। জান্নাত-জাহান্নাম কতকিছুই না বুঝালো বিগত দুই মিনিটে। আর তৃতীয় মিনিটে এসে সে শুনলো তার বিগত দুই মিনিটে পাতানো বোনটি তাকে বড়সড় একটি ধোঁকা দিয়ে দিয়েছে ইতিমধ্যে। আসিফ আহত হয় ভিষণ। কষ্টে জড়র্জিত হয়ে নিজের আধ খাওয়া আইসক্রিমটি সাথে সাথে মায়াকে ফিরিয়ে দিতে দিতে বলে…
—” আপনার আইসক্রিম খাবনা আমি। নিয়ে যান ভাবি।
মায়া একটা ভ্রুঁ কুঁচকে তাকায় আসিফের আধ খাওয়া আইসক্রিমটির দিকে। বলে” আমি কি আপনাকে অধেক খাওয়া আইসক্রিম দিছিলাম?
আসিফ নিজের আধ খাওয়া আইসক্রিমটির হাত গুটিয়ে নিতে নিতে বলে ” ঠিক আছে আপনি দাঁড়ান আমি আপনার জন্য নতুন আইসক্রিম নিয়ে আসছি।
আসিফের কথায় আহত হলো মায়া। নিজের একটা আইসক্রিমের ভাগ দিয়েও বশে আনতে পারলো না আসিফকে। মায়া জানতে চাই রিদ কোথায়? নিজের অজান্তেই রিদের জন্য মনটা ছটফট করে তার। তাই একটু খবর নিতে চাই। জানতে চাই রিদ ভালো আছে কিনা? রিদের তথ্য আসিফ ছাড়া অন্য কেউ ভালো জানে না। মায়ার ধারণা রিদ বাংলাদেশে আসলে আসিফকেও বাংলাদেশে দেখা যায়। আর এই কারণেই মায়া রিদের খবর জানতে চাই আসিফ থেকে। কিন্তু আসিফ বলতে নারাজ। মায়া মুখ ভার করে বলে…
—” এমন করছেন কেন ভাইয়া? বলুন না উনি কোথায়?
আসিফ চমকে উঠে মায়ার ছটফট দেখে। হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকায় সামনে রিদের দিকে। গম্ভীর মুখে দৃঢ়তা সঙ্গে বসে আছে রিদ। একবার মায়ার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেও মায়ার পর পর কথা গুলো শুনে বুঝতে পারে মায়ার কি চাই? তাই আসিফের দৃষ্টি তাঁর উপর পড়ার আগেই রিদ নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে ন্যায় মায়ার থেকে। মুখশ্রীতে গম্ভীর্য্য ভাব টানে ক্ষীণতা সাথে। তার ঠিক সামনেই বসে আছে আধবয়সী দুটো লোক। পেশাদার ব্যবসায়ী তারা সেই সাথে এই কফি শপের ওনার। চোখে মুখে ভয়াৎ আকুতি ভাব দু’জনের। সেই সাথে মিনতি বাক্য ঠোঁটে আওড়াচ্ছে রিদের সামনে। মায়া শুনলো না সেই কথা গুলো। না ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো রিদের নিষ্ঠুরতাকে। মায়া মন্ত নিজের কাতরতায়। আসিফ রিদের ভাবান্তর না দেখে দমে যায়। বলা সাহস হলো না ” ভাবি কষ্ট পাবেন না। ভাই আপনার পিছনেই রয়েছে দেখে নিন। কিন্তু বলা হলো না। মনে মনে চেপে গেল কথা গুলো। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে মুখে বললো সম্পূর্ণ ভিন্ন বাক্য ” ভাবি চলুন।
আসিফের একিই কথায় রাগ বাড়ে মায়ার। শান্ত শিষ্ট থাকা মায়া মূহুর্তেই রাগে তি তি করে উঠে। কপাট রাগ নিয়ে বলে উঠে…
—” না যাবনা আমি। আগে পেট থেকে আমার আইসক্রিম বের করুন তারপরও যাব আমি।
থমথমে খেয়ে যায় আসিফ। আমতাআমতা করে বলে…
—” জ্বিই ভাবি কি বলেন এসব? খেয়ে ফেলছি আমি সেটা কিভাবে বের করবো? আপনাকে বরং আমি নতুন আইসক্রিম এনে দিচ্ছি দাঁড়ান।
আগের ন্যায় জেদ ধরে বলে উঠলো মায়া…
—” একদম না। আমি কোনো নতুন আইসক্রিম- টাইসক্রিম নিব না। আপনি আমার আগের আইসক্রিমটা দিবেন, পেট থেকে বের করে, যেটা আপনি খেয়েছেন। আমার আইসক্রিম আস্তা বানিয়ে দিবেন। নয়তো আমি বাসায় গিয়ে দাদাজানকে নালিশ করবো আপনি আমার আইসক্রিম ছিনতাই করে খাইছেন মাঝরাস্তা থেকে হুহ।
আসিফ নিজের হাতে গলে যাওয়া আইসক্রিমটা এক পলক দেখে নিয়ে চোখ তুলে তাকায় মায়ার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে। তাঁকে কি সুন্দর ফাঁদে ফেলে আইসক্রিম খাইয়ে বলছে এখন সেটা পেট থেকে বের করতে? আদৌ কি এটা সম্ভব? এই ছিল তাঁর ভাবির মনে? সহজ সরল পোলা পাইয়া এইভাবে ধোঁকা দিল ভাবি তাঁকে শেষে। আসিফ মায়ার দিক থেকে দৃষ্টিতে সরিয়ে তাকায় রিদের দিকে। সাথে সাথে চোখাচোখি হয় রিদের কুঞ্জিত দৃষ্টির সাথে। সূক্ষ্ম বলিষ্ঠ রেখা দৃশ্যমান রিদের কুঞ্জিত কপালে। মায়া যে হঠাৎ এই ভাবে পুলটি নিবে সেই ধারণা রিদের আংশিক ছিল। কিন্তু তার জন্য যে এতটা ছটফট করবে সেই ধারণা ছিল না তার। আসিফ করুণ দৃষ্টি মেলায় রিদের দৃষ্টি সাথে। পারে না ঠোঁট উল্টিয়ে কেঁদে দিতে রাস্তায়। তাই রিদকে নিজের চোখের ভাষায় বুঝায় আসিফ যার অর্থ ” ভাই দেখছেন ভাবি কি ক? আমারে গোল খাওয়ায় বলে আইসক্রিম পেটে থেইক্কা বের করতে? এটা কি করা সম্ভব? কেমনে আইসক্রিম বাইড় করমু কন?
রিদ বুঝলো আসিফের চোখের ভাষা। তবে মুখে কিছু বললো না। মায়া আসিফকে অন্যমনস্ক ভাবে সামনে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাগে আরও ফুসফুস করে উঠে মূহুর্তেই। রাগে বিরুক্তি নিয়ে আসিফের দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে রিদকে দেখার আগেই রিদ দ্রুততার সঙ্গে টেবিলের উপর থাকা মেনুকাট দিয়ে নিজের চেহারা লুকায়িত করে ফেলে মায়া সামনে। লুকাচুরি খেয়ায় এবার মায়া দেখলো না রিদকে। বরং সামনে কিছু না দেখে একরাশ বিরুক্তি নিয়ে তাকালো আসিফের দিকে। মায়া আরও কিছু বলবে আর আগেই আগমন ঘটে ছায়া টিয়ার। দৌড়ে আসে মায়ার নিকট। হাঁপাতে হাঁপাতে মায়ার সামনে দাঁড়িয়ে টিয়া চট করে বলে উঠে…
—” বইন তুই কি দৌড়টা না দৌড়ালি আমাদের। একটুর জন্য গাড়ি নিচে পড়তে পড়তে বাঁচলাম। উফ!
মায়া চমকে উঠে টিয়ার দিকে তাকায়। দৌঁড়ানো ফলে এখনো হাঁপাচ্ছে মেয়েটা। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের চেহারায় রোদের তাপে লাল লাল আভা দৃশ্যমান। ছায়ারও সেইম অবস্থা। টিয়া বুকে হাত দিয়ে নিশ্বাস নেওয়ার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসলো ছায়া। কপাট রাগ দেখিয়ে বললো….
—” ঢং করিস? এইভাবে পাগলের মতো ছুটে আসলি কেন? একটু এদিক সেদিক হলেই তো এক্সিডেন্ট করতি? কেন এসেছিস এখানে?
ছায়া টিয়াকে দেখে যেন গলায় জোর বাড়লো মায়ার। আসিফের দিকে রাগে কটকম করে তাকিয়ে হাতের ইশারায় আসিফের দিকে আঙ্গুল তাক করে ছায়াকে দেখিয়ে বললো….
—” এই লোকটা আমার আইসক্রিম ছিনতাই করে খেয়েছে?
মায়ার আকস্মিক নালিশে আসিফ চমকালো! ভড়কালো ভয়াৎ হলো এই ভেবে যে এতক্ষণ একজনকেই সামলাতে তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল টর্চারে। এখন সাথে আরও দুজন যোগ হলো। তাঁর পরিণতি কি হবে ভেবেই গা ভাসিয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। রিদের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু বলতে পারবে না মায়াকে। এতে রিদ রেগে যেতে পারে। আর মাায়াকে না বলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না একের পর এক লাঞ্ছনের কারণে। আসিফ অসহায় বংগিতে করুণ দৃষ্টি বিলাপ করে তাকিয়ে থাকে রিদের দিকে। যার অর্থ ” ভাই কিছু করেন আমারে বাঁচান এখান থেকে। রিদ দেখেও যেন দেখলো আসিফের সেই দৃষ্টি বংগি। তার আগেই আসিফের কানে আসলো টিনার ক্ষেপ্ত গলা…
—” সাংঘাতিক লোক মাইরি। বাবার বয়সের লোক হাঁটু বয়সের মেয়ের থেকে আইসক্রিম ছিনতাই করে খাই। বলি! দেখতো ঠিকঠাক আছেন, ফকফকা ঝকঝকা তাহলে অকালে চুরিটা কেন ধরলেন হ্যা? আবার আইসক্রিম হাতে দাঁড়িয়ে আছেন বুইড়া চুর কোথাকার।
কথাটা বলতে না বলতে টিয়া এগিয়ে গিয়ে আসিফের হাত থেকে কেঁড়ে ন্যায় আধ খাওয়া গলিত আইসক্রিমটা। হতভম্ব হয়ে যায় আসিফ। তার সাতাইশ বছর বয়সে সে বুড়ো হয়ে গেল। রিদ ভাইয়ে থেকে তো সে তিন মাসের ছোট আছে তাহলে? সে বুড়ো হলো কোথায় থেকে? সে কালো না। আর না আনস্মার্ট। হ্যাঁ রিদ ভাইয়ের মতো সুন্দর না হলেও যথেষ্ট সুন্দর পুরুষ সে। ফেলে দেওয়ার মতো না। তাহলে তাঁকে মেয়েটা বুইড়া চুর বলছে কেন? আহ তার কি কষ্ট। শেষ পযন্ত তাকে একটা আইসক্রিমের দায়ে চুর সাব্যস্ত করল ভাবি? টিয়ার কথার পরপরই ক্ষীণ কন্ঠে শুধালো ছায়া। বলে উঠলো মায়াকে…
—” মায়া চল এখান থেকে। এসব লোকের ভীড়ে না থাকায় ভালো। চল।
মায়া গেল না। জেদ ধরে অনল দাঁড়িয়ে রইলো আসিফের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে। নিজের জেদে রাগ মুখ ছিটকে ধমক স্বরে পুনরায় বলে উঠলো….
—” কিহল বলুন উনি কোথায়?
আসিফ যেন শক্ত পাথর মূতিই ন্যায় রুপান্তিত হলো। করুণ দৃষ্টিতে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া একটা কথাও মুখ থেকে বের করছে না। বোবা হয়ে আছে। কারণ এই মূহুর্তে আসিফ মুখ দিয়ে যাহ বের করবে তাই বিপদ হবে। মুখ খোলে উত্তর দিলে রিদ রেগে যাবে। আর না দিলে মায়া রেগে যাবে। তাই আপাতত সে চুপ থেকে নিজের জীবনটা বাঁচাতে চাইছে সে। আসিফ মায়ার বারবার প্রশ্নে আবারও চোখ তুলে রিদের দিকে তাকায়। এবার রিদ ইশারা আসিফকে কিছু বুঝাতে চাইছে মায়ার অগোচরে। আসিফ উৎসুক হয়ে চোখ পিটপিট করে কপাল কুঁচকে তাকায় রিদের দিকে। রিদ নিজের হাতের মেনুকাটটা হালকা সরিয়ে গলা বরাবর অন্যহাত দিয়ে বুঝায় “গলা কেটে মারা গেছে সে ” আসিফ ঠিকঠাক বুঝলো না রিদের সেই ইশারা। তাই নিজের দৃষ্টি গাঢ় করে রিদের ইশারা বুঝার চেষ্টা করে আনমনে মায়ার সামনে বলে উঠে…
—” ভাই গলা কেটে মারা গেছে?
ঝংকার তুললো মায়ার কানে আসিফের কথাটি। “ভাই গলা কেটে মারা গেছে ” মূহুর্তেই যেন মায়াকে স্তব্ধ নিবাক করে দেয় আসিফের বেখেয়ালি ছোট কথাটি। রাগে ঝলঝল করা মায়া চোখ দুটো মূহুর্তেই যেন নিভে যায় দমকা হাওয়ার। সব রাগ ভাসিয়ে নিয়ে যা গভীর সমুদ্রের অতলে। হাড় হিম করা তুষারপাতের মতো ঠান্ডার স্রোত ভয়ে যায় অঙ্গে অঙ্গে। মায়ার চোখ জোড়া শীতল। চারপাশে চেচামেচি শব্দ কোনো কিছু কানে আসছে না। যেটা মস্তিষ্কের বারবার খানা দিচ্ছে সেটা হলো “ভাই গলা কেটে মারা গেছে ” কত নিষ্ঠুর শুনালো এই বাক্যটি মায়ার কানে। দম বন্ধকর বাক্য। মায়া বিশ্বাস করলো না সেই কথাটি। তবে বড্ড অশান্ত হয়ে উঠলো মন কৌঠায়। টানটান অস্থিরতা কাজ করলো। তোলপাড় হলো রন্ধ্রে রন্ধ্রে। পুনরায় মস্তিষ্কের খানা দিল আসিফকে ধ্বংস দেওয়ার বিষয়টি। মায়ার অশান্ত মন আরও অশান্ত হলো। শান্ত শিষ্ট দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিমা মূর্তিটি যে মূহুর্তেই রুদ্রচন্ডি হয়ে উঠলো আসিফের জন্য। আসিফকে ধ্বংস করার তাগিদের মূহুর্তেই হাত পা চালিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো আসিফের উপর মায়া। নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে খামচে ধরলো আসিফের দুই হাতে পেশি। মায়ার আকস্মিক আক্রমণের জন্য এই মূহুর্তে কেউ উপস্থিত ছিল না। তটস্থ হয়ে সবাই ভরকে যায় মূহুর্তেই। মায়াকে থামাতে এগিয়ে যায় ছায়া টিয়া দু’জন। মায়ার দুইবাহু টেনে ধরে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করে আসিফ থেকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না আসিফের। দুইহাতের কব্জি হতে লম্বালম্বি ভাবে গভীর আছড় কাটে আসিফের হাতে উপর। সে ধ্যানস্ত ছিল রিদের দিকে মায়ার হঠাৎ আক্রমণে তাল সামলাতে না পেরে দুই কদম পিছনে গেলেও মায়ার আক্রমণে প্রহার থেকে বাচতে পারেনি সে। ছায়া টিয়া মায়ার দুহাত ধরে টেনে আসিফ থেকে দূরে সরালেও মায়াকে থামানো যাচ্ছে না আসিফকে আক্রমণ করা থেকে। বারবার তেড়ে যেতে যাচ্ছে আসিফকে মারার জন্য। আর মুখে আওড়াচ্ছে অসম্ভব রাগান্বিত বুলি আসিফের জন্য…
—” অসভ্য লোক! রাক্ষস লোক! সাহস কি করে হয় তোর আমার রিদ ভাইয়া মৃত্য বলার। আজ তোর জান আমি খেয়ে ফেলবো। তুই আমার আইসক্রিম খেয়ে আমার সাথে মিথ্যা বলছ। বের কর! পেটে থেকে আমার আইসক্রিম বের কর। নয়তো তোর পেটে ডাইরিয়া হবে। তুই সারারাত বাথরুমে পড়ে থাকবি অভিশাপ দিলাম। রাক্ষস লোক সাহস কি করে হয় তোর আমার রিদ ভাইকে গলা কাটা বলা।
চলিত…….
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৩