দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৮৪
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
(কার্টেসী বা কপি করা নিষেধ। শেয়ার করবেন)
৮৪
হলুদ সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে মন্ত সবাই। হৈ হুল্লোড় মাতামাতির পরিবেশ! হবেই না কেন? খান বাড়িতে বিয়ে বলে কথা! সবকিছুতে মাতামাতি থাকবেই। আয়নের কথা মতোই এক সাপ্তাহ তারিখ ধরে বিয়ের দিন ধার্য করা হয়েছিল দুজনের। প্রথমে শফিকুল ইসলামের আয়নকে নিয়ে দ্বিমত ছিল শুভর জন্য। কিন্তু পরে যখন জানতে পারল দুজনের পূর্ব থেকে বিয়েটা হয়েছিল তাই তিনি বেশ একটা অমত করেনি। আপোষে মত দিয়ে বসে। কারণ আয়নকে উনার কাছে জামাতা হিসাবে বেশ পছন্দ ছিল পূর্ব থেকেই। নম্র ভদ্র আবার পেশায় ডাক্তার এমন ছেলে কার না পছন্দ নিজের মেয়ের জন্য। সেক্ষেত্রে শফিকুল ইসলাম ও জুইয়ের জন্য আয়নের সম্পর্কটা যুক্তি সংগত মনে করে ছিল। সত্যি কথা বলতে উনার ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া বা করা নিয়ে কোনো আপসোস নেই। ছেলের বউ থেকে শুরু করে মেয়েদের জামাতা পযন্ত আল্লাহ তালা উনার মন মতোন মিলিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ! শুধু রিদ ছাড়া! উনার কোনো কালেই রিদ পছন্দ ছিল না। পছন্দ হওয়ার মতোন কোনো কাজও করেননি গুন্ডামি ছাড়া। শফিকুল ইসলাম মায়ার অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে বেশ চিন্তায় থাকেন রিদের জন্য। উনার মনে ভয় হয় এই বুঝি রিদ মায়াকে আঘাত করে বসল বা মেরে ফেলে দিল অগোচরে। সবার আদুরে ছোট মেয়ে উনার অথচ সেই মেয়ের কপালেই জুটলো গুন্ডা খারাপ একটা ছেলে। যার কাজে ঠিক নেই! ভালোবাসা সংসার কি বুঝে না সেই ছেলের সাথে উনার মেয়ে কতদিন ঠিকে থেকে সংসার করতে পারবে আল্লাহ জানে? শফিকুল ইসলাম মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে ভেবে গুমোট নিশ্বাস ফেলে বাড়ির উঠানে স্টেজ দিকে তাকায়। যেখানে মায়া হলুদ রঙটা জামদানী শাড়ি পরে জুইয়ের পাশে হাসি মুখে বসে হলুদ লাগাচ্ছে জুইকে। দুই বোনের হাসিটা বেশ নজরে লাগার মতোন। একিই রকম দেখতে। শফিকুল ইসলাম জুইকে তৃপ্তিময় দৃষ্টিতে দেখে ফের মায়ার দিকে তাকাল হতাশ দৃষ্টিতে। মেয়েটার সুখ কতোদিন থাকে আল্লাহ জানে। শফিকুল ইসলাম মায়ার দিকে তাকিয়ে ফের দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই আরাফ খান এসে পাশ থেকে কাঁধ জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে বলে…
—” কি ভাবছ শফিক?
শফিকুল ইসলাম মায়া দিকে তাকিয়ে বলে..
—” ভাবছি! খান বাড়ির সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় না বলে বলে আমার একটা মেয়েকে সেখানে দিতে চায়নি। অথচ আমার ভাগ্যের কি লিলা দেখুন চাচা! আমার একটা মেয়ের জায়গায় বাকি দুজনও সেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। তবে বাকি দুজনের বিয়ে দেওয়া বা করা নিয়ে আমার ভিতরে কোনো আপসোস নেই। ফিহাকে ছেলের বউ হিসাবে পেয়ে যতটা সন্তুষ্ট আমি ঠিক ততটাই আয়নকে জামাতা হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট। কিন্তু এতকিছুর মাঝেও আমার ছোট মেয়েটার কপালটা আর গুঁজল না। অনিশ্চিত ভবিষ্যতেই পরে রইল।
শফিকুল ইসলামের কথার মানে বুঝল আরাফ খান। শফিকুল ইসলামের যে রিদকে পছন্দ না সেটাও তিনি জানেন। পছন্দ না হওয়ার কথায়। রিদ মানুষটায় এমন। কারও সাথে মিশতে চায় না। উগ্র আর বদমেজাজি টাইপের ব্যবহার করে সবার সাথে। তবে এতো কিছুর মাঝে যেটা সত্য সেটা হলো ‘ রিদের ভালোবাসা! রিদ সহজে কাউকে নিজের সাথে জড়ায় না। কিন্তু একবার জড়িয়ে পরলে আর ছাড়তে জানে না। ছাড়া জিনিসটাই বুঝে না! আপোষে না থাকলে জোর করে হলেও রাখবে তারপরও ছাড়বে না। রিদ নিজের ভালোবাসার মানুষের যত্ন করতে জানে। বাহিরে মানুষের জন্য রিদ খান যতোটা খারাপ ভয়ানক ঠিক ততটাই ভালোবাসার মানুষদের জন্য কমল। বিশেষ করে মায়ার জন্য! তাছাড়া রিদের ভালোবাসা মানুষ খুব কম। উনারা স্বামী স্ত্রী আর মায়া। এই তিনজন মানুষকে ঘিরেই রিদের ভালোবাসা বা জীবন সংসার। আরাফ খান চোখ আওড়িয়ে মায়ার হাস্যোজ্বল মুখটার দিকে আলতো হেঁসে মিহি স্বরে বলতে লাগল…
—” ভাগ্য আমার! আমি তোমার মতো আদর্শ বাবার আদর্শ ছেলে মেয়েদের পেয়েছি আমার বংশধরের জন্য। জোড়া আল্লাহ বানায় শফিক। যে যার জন্য উত্তম তিনি তার সাথে অপর জনের জোড়া মিলে দেন। সেক্ষেত্রে আমি বলবো আয়ন জুই, ফিহা, আরিফ, সবাই তাদের উত্তম সম্পর্ক পেয়েছে। এখন তুমি যদি তোমার ছেলে মেয়ের সবার সম্পর্ক একপাশে নিয়ে হার-জিতের কথা বলো তাহলে বলবো এখানে সবার থেকে ভাগ্যবতি মায়া। মায়া সম্পর্কের দিক থেকে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে। কেন বলছি জানো? আমার বয়স কম হয়নি শফিক। আমি দুনিয়া দেখেছি অনেক! সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আয়ন, আরিফ, জুই, ফিহা এরা সবাই বাস্তববাদি মানুষ। আল্লাহ না করুক জীবন কোনো কারণে যদি এরা হুঁচট খায় তাহলে একে অপরের সঙ্গে ছেড়ে তারা একা জীবন লিড করতে পারবে সহজেই। হয়তো ভালোবাসার জন্য কষ্ট পাবে কিন্তু তারপরও আত্মসম্মান ঠেঙ্গিয়ে বা বাস্তবতা মেনে এগিয়ে যাবে জীবনে। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে রিদ পারবে না। একদমই পারবে না। এখানে রিদ সবার থেকে বেশি বাস্তবতা বুঝলেও সে ছেড়ে যাওয়া বা দেওয়া এই একটা জিনিস কিছুতেই বুঝে না। রিদের কথা হলো ধরেছি তো ধরেছি! ছাড়াছাড়ি আবার কি? মানে ছাড়াছাড়ি বিষয়টা ওর পাল্লায় পরে না। এমনিতেই রিদ রাগী জেদি, ঘাড় ত্যাড়া মানুষ হলেও সম্পর্কের দিক থেকে সে কমল। সেখানে বিন্দুমাত্র আত্মসম্মানবোধ খুঁজে পাবে না। মুখে একশো বার বলবে থাকবো না। দরকার নেই। চলে যাবো। কিন্তু দিন শেষ দেখা যাবে সে ঠিকিই উপস্থিত আছে ভালোবাসার মানুষের কাছে আত্মসম্মান বোধ ছেড়ে। রিদ ছাড়াছাড়ি জিনিসটা সহ্য করতে পারে না কারণ মৃত্যু নেয় ছটফট করে। তাই সে মায়াকে আমৃত্যুও ছাড়বে না। এবার যে যতকিছুই করুক না কেন। এবার তুমি বলো সম্পর্কের দিক থেকে কে বেশি ভাগ্যবতি? মায়া নাকি বাকি সবাই?
শফিকুল ইসলাম আরাফ খানের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই তিনি এক গাল হেসে আশ্বাস করলো উনাকে। তিনি এক পলক আরাফ খানকে দেখে ফের মায়ার হাসি মুখের দিকে তাকাল। মায়ার মুক্ত ঝড়া হাসিই প্রকাশ করে সে স্বামীর ঘরে কতটা ভালো আছে। ভালো থাকলেই হয়! আল্লাহ যেন সবাইকে ভালো রাখে এই দোয়ায় তিনি করেন।
~~
আরাফ খান মায়া, টিয়া, ছায়া, মারিহা, নিহা, সোহাগসহ খান বাড়ির বাকি কাজিন সদস্যের নিয়ে আশুগঞ্জ থেকে ফিরল খান বাড়িতে। ফিহা আশুগঞ্জই আছে আরিফের বউ হয়ে জুইয়ের বিয়ে কাজে হাত চালিয়ে। সবকিছুই ঠিকঠাক যাচ্ছে। মায়া আজকে সারাদিন করে জুইয়ের সাথে নিজের বাড়িতে ছিল। সন্ধ্যায় খান বাড়ির থেকে জুইয়ের জন্য তথ্য নিয়ে আরাফ খান সবাইকেসহ আশুগঞ্জ পৌছায়। একে একে সবাই জুইকে হলুদ ছুঁইয়ে মায়া নিয়ে পুনরায় চলে আসল খান বাড়িতে আরাফ খান। মায়ার প্রথমে নিজের বাড়িতে থাকার আবদার জানিয়ে ছিল কিন্তু হেনা খানের নিষেধ, ও রিদের ভয়ে মায়াকে খান বাড়িতে নিয়ে আসে তিনি। রিদ দেশে নেই আজ সাত দিন হলো। তারপরও মায়ার খান বাড়ির থেকে অকারণে বের হওয়া নিষেধ রিদের পারমিশন ছাড়া। সেখানে মায়া আজ গোটা দিন পার করলো আশুগঞ্জ থেকে। রিদের কানে কথাটা গেলে খারাপ হবে সেই চিন্তায় মায়াকে নিয়ে আসেন তাঁরা। তবে এখানে মায়ার প্রতি হেনা খানের আলাদা নজরও হয়েছে। কারণটাও সিম্পল! তবে তারপরও কোথাও একটা কিন্তু কিন্তু ভাব থেকে যায়। মায়া সেদিনের পর আজ পযন্ত শারীরিক দূর্বলতা দেখা দেয়নি বেশ ভালোই ফুরফুরে হয়ে ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছে সারা বাড়ি। এখনো তাই আছে। বিগত ছয়দিনের ঝামেলায় তিনি একদমই মায়ার হসপিটালের রিপোর্ট গুলো আনতে পারেনি। কি আছে তাতে জানতেও পারেনি। তাই আজ তিনি মন খচখচ একজন সার্ভেন্ডকে পাঠিয়েছে মায়ার রিপোর্ট গুলো হসপিটালের থেকে নিয়ে আসতে। বাকিটা না-হয় তিনি রিপোর্ট দেখে কনফার্ম করবে। আয়নের হলুদের স্টেজ খান বাড়ির ছাদে করা হয়েছে। তবে এখনো ফাংশন শুরু করা হয়নি। করবে বারোটার পর। এখন সবেমাত্র আটটা ছেড়ে নয়টার ঘরে ঢুকল সময়। মায়া ঘুরঘুর করতে করতে রিদের রুমে গেল। ফ্রিজ খুলে তৃষ্ণার্তের মতোন আইসক্রিমের বক্স নিয়ে বসল ফ্লোরে। চামচ দিয়ে কুঁড়ে আইসক্রিম খেতে খেতে অপর হাতে টেনে নিজের মাথার হিজাব খুলে পাশে রাখল। বামহাতে চুলের খোপা খুলে চুল ছড়িয়ে বসল ফ্লোরে। হঠাৎ গরমের ভাবটা না বুঝে রিমোট চেপে রুমের এসির পাওয়ার বাড়িয়ে আইসক্রিম খাওয়ায় মন দিল আসুং ধরে বসে মায়া। দু’হাত ভরতি ভেলভেট চুড়ি গুলো যেন চকচক করছে মায়ার হলুদ হাতে। রিদ রুমে ঢুকতে ঢুকতে সেই মনোরম দৃশ্যটা চোখে পরে গেল। মায়াকে দেখতে দেখতে বামহাতে আলতো ধাক্কা দিয়ে দরজা লক করে তাউজারের পকেটে দু’হাত গুজে দাঁড়ায়। অনেকটা সময়ের পর বউটাকে ভাগে পেয়েছে সে। বিগত দুইটা ঘন্টা ধরে বউটাকে খুঁজে চলছে বাড়িতে। সব কামধাম ছেড়েছুড়ে বউয়ের জন্য শুধুর থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে চলে এসেছে মন ছটফট করতে করতে। অথচ বাড়িতে ফিরে শুনা গেল বউ তার নিখোঁজ, বাপের বাড়ি! বোনের বিয়ের আমেজে মজে আছে স্বামীর খবর না নিয়ে। বেয়াদব বউ তার! স্বামী বুঝে না। রিদ এগিয়ে এসে ঝুকে মায়ার আইসক্রিমের বক্সটা হঠাৎ টেনে নিতেই মায়া চমকে উঠে চোখ তুলে উপ-রের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল রিদকে বাড়ির কাপড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে৷ মায়া রিদকে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠে খুশিতে তৎক্ষনাৎ লাফিয়ে উঠে রিদের গলা ঝুলে পরে টুপ করে রিদের গালে চুমু খেতে খেতে বলে…
—” আপনি এসেছেন? আমি এত্তগুলা মিস করেছি আপনাকে…
রিদ মায়ার পিঠ জড়িয়ে বুকে নিতে নিতে বলে…
—” জ্বিই দেখেছি কতটুকু মিস করেছেন আপনি আমাকে।
মায়া মুখ তুলে রিদের দিকে তাকিয়ে বলে…
—” আপনি কখন এসেছেন?
—” সন্ধ্যায়!
মায়া অবাক হয়ে বলে…
—” আল্লাহ এতক্ষণ?
রিদ হাত বাড়িয়ে আইসক্রিমের বক্সটা পাশে রেখে মায়ার নাকে টেনে বলে…
—” জ্বিই ম্যাডাম এতক্ষণ!
রিদের নাক টানাতে মায়া অতিষ্ঠ হয়ে নাক ঘষতে ঘষতে দূরে সরে বলে…
—” উফফ! সবসময় আমার নাকের সাথে লাগে কেন আপনি? আমার নাক বড় হয়ে গেলে আপনার কপালেও কখনো বউ জুটবে না দেখিয়েন।
মায়ার কথায় দুষ্টুমি খেলে গেল রিদের চেহারায়। দুষ্টুমি কন্ঠে রিদ বলল…
—” তাই?
—” হুমম!
রিদ তাউজারের পকেটে এক হাত গুজিয়ে অপর হাতটা চুলে চালিয়ে বলল…
—” আমার কপালে এমনিতেও বউ নাই। বউ বাপের বাড়ি গেছে। আপাতত বউয়ের দরকারও নেই। যার এমন হট সুন্দরী একটা বিয়াইন থাকে সেই ব্যক্তির বউ বাপের বাড়ি থাকায় উচিত। সেক্ষেত্রে আমারও আছে। বউ কে চাই? আমার তো সুন্দরী বিয়াইন সাহেবাকে পেলেই হবে।
—” মানে?
–” মানে খুব সিম্পল! বউ আমার বাপের বাড়ি গেছে বোনের বিয়েতে। তাই আপাতত আমি সিঙ্গেল। যেহেতু বউ নাই। তাই সুন্দরী বিয়াইনের সাথে পরকীয়া চালাবো গোপনে। কি বলুন বিয়াইন সাহেবা? চলেন শুরু করি…
রিদের কথায় মায়া নাক মুখ ছিটকে দূরে সরে যেতে যেতে বলল…
—” ছিহ! এতো বাজে আপনি? বউ রেখে শেষে বিয়াইনের সাথে পরকীয়া? ছিঃ ছিঃ আস্তাগফিরুল্লাহ!
মায়ার নাক ছিটকানোতে রিদ হেয়ালি করে বলল…
—” ছিঃ কি আছে? আজব! সুন্দরী বিয়াইনদের উপর জম্ম সূত্রেই বিয়াইদের একটা দাবি আছে না? সেই ক্ষেত্রে আমার দাবিটা তো শত আনায় পূর্ণ। তাছাড়া আমার এই মূহুর্তে সুন্দরী বিয়াইনের সাথে পরকীয়া করাটা ফরজ হয়ে গেছে। এমনিতে সাতদিনের উপোষ আমি। তারপর আবার ঘরে বউ নাই। রাতে ঘুমাতে পারি না। অঙ্গ জ্বালা জ্বালা করে। তাই আজকে রাতে বউয়ের জায়গায় সুন্দরী বিয়াইনেকে গিলে খাবো। জম্ম সূত্রে বিয়াইদের দাবিও পূরণ হয়ে যাবে। কি বলুন বিয়াইন? চলুন শুরু করি..
রিদ হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসতেই মায়া পুনরায় ছিটকে দূরে সরে বলল…
—” নাউজুবিল্লাহর কথাবার্তা! ছিহ ছিহ!! অসভ্য বিয়াই আমার। আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! সরুন!
কথা গুলো বলতে বলতে মায়া রিদকে পাশ কাটিয়ে দরজা দিকে দৌড়াতে গেলে রিদ পিছন থেকে মায়াকে আঁটকে ধরে বলে…
—” আমি এক সাপ্তাহ পর বাসায় আসছি! আপনাকে সহজে পালিয়ে যেতে দিব ম্যাডাম? আগে আমার স্বার্থ পূরণ হোক তারপর বাকিসব।
কথাটা বলতে বলতে রিদ হালকা ঝুঁকে মায়াকে কোলে তুলে নিল। বিছানার দিকে এগোতে নিলে মায়া লজ্জায় আষ্টশ হয়ে রিদের বুকের টি-শার্ট টেনে মুখ লুকিয়ে হাত পা ছুটিয়ে বলে…
—” এই একদম না। ছাড়ুন বলছি। আমি আয়ন ভাইয়ার হলুদ অনুষ্ঠানে যাব। সবাই ছাঁদে। আমি সেখানেই যাব। ছাড়ুন!
রিদ মায়াকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে নিজের নাক মায়ার নাকে ঘষে নিচু স্বরে বলে…
—” তোমাকে ছাড়া বাহিরে সবার চলবে বউ। তাদের ফাংশনও শেষ হবে। কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমার এখানের কিছু চলবে না। না শুরু করা যাবে আর না শেষ।
~~
সুন্দর ভাবেই শেষ হয় আয়নের আর জুঁইয়ের বিয়ে। মেহেরবানের হাত ধরে বধূ বরণ করা হলো জুইয়ের। গায়ে খয়েরী রঙের লেহেঙ্গা পরে লম্বা ঘোমটা সহিত খান বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে আছে জুঁই। চারপাশ থেকে খান বাড়ির আত্মারা জুইকে ঘিরে বসে আছে বউ দেখায়। জুই নত মস্তিষ্কের মায়ার একহাত চেপে বসে আছে অস্থিরতায়। লজ্জা, ভয় আর অস্থিরতা জেগে আছে মনে। নিয়ম অনুযায়ী জুইকে চৌধুরী বাড়িতে বউ হিসাবে উঠানোর কথা থাকলেও নাহিদ চৌধুরী মৃত্যুতে মেহেরবানের মানসিক সুস্থ না থাকায় আয়নের বিয়ের অনুষ্ঠান তারা খান বাড়ি থেকেই করে। এতো আয়োজন মেহেরবানের দ্বারা একা সামলানো সম্ভব হবে না বলে তাই। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। মায়াও হাসি মুখে স্বাভাবিক ভাবে জুইয়ের পাশে বসে ছিল কিন্তু বিপত্তি ঘটল রিদের হঠাৎ আগমনে তান্ডবে। তখন সন্ধ্যা প্রায় সাতটা দশ। রিদের গায়ে তখনো অফিসিয়াল গ্যাটাপ ছিল। মূলত সে আয়নের বিয়েতে ছিল না। ত্যাড়ামি করে নিজের অফিসে চলে গিয়েছিল সবার না করার শর্তেও। এতোটুকু পযন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু বিপত্তি বাজল তখন যখন মায়ার হসপিটালের রিপোর্ট কার্ড গুলো হেনা খানের জায়গায় সার্ভেন্ডটি আসিফের কাছে পৌঁছে দেয় তখন। কাল রাতেই মায়ার হসপিটালের রিপোর্ট কার্ডটি আসিফের হাতে তুলে দিয়েছিল সার্ভেন্ড লোকটা। আসিফ বিয়ের ঝামেলা রিদের হাতে তখন পৌঁছায়নি এবং রিদকে পরে দিবে বলে রিদের একটা জরুরি ফাইলের সঙ্গে রেখে দিয়েছিল। যেটা আজ সন্ধ্যায় রিদ ফাইল চেক করতে গিয়ে দেখল। হসপিটালের রিপোর্টে মায়া নামটা দেখে রিদ প্রথমে চমকে ছিল। মায়ার অসুস্থতার কথা চিন্তা করে উদ্বিগ্নতার সহিত সেটি চেক করতেই রিদ বুঝল মায়া প্রেগন্যান্ট। বিষয়টি রিদের মাথায় ব্রজপাত হওয়ার নেয় ছিল। মায়া পুনরায় প্রেগন্যান্ট হওয়াটা ছিল ইম্পসিবল। যেটা রিদের কাছে অবিশ্বাস লেগেছিল। কিন্তু বারবার রিপোর্ট চেক করেও একি উত্তর পেয়ে রেগে উঠে রিদ। ধোঁকা জিনিসটা বরাবরই পছন্দ না তাঁর। বউকে সে ভালোবাসে তার মানে এই না যে সে সবসময় ছাড় দিবে। ধোঁকাদারি করার পর তো মোটেও নয়। খান বাড়িতে ঢুকেই রিদ সবার প্রথমে মায়াকে হাসি মুখে জুইয়ের পাশে বসা থাকতে দেখে রাগান্বিত ভঙ্গিতে রিদ সেদিকে এগিয়ে গিয়ে মায়া বাহু টেনে দাঁড় করিয়ে ঠাস করে থাপ্পড় বসায় মায়ার বামগালে। আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে যায় উপস্থিত সবাই। রিদের হঠাৎ থাপ্পড়ে অবুঝের মতোন গালে হাত দিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে মায়া। হেনা খান মায়ার পাশেই ছিল। রিদের থাপ্পড় মারাতে তিনি উত্তেজনা ভঙ্গিতে জুইকে রেখে মায়াকে নিজের বুকে টেনে নিতে নিতে রিদকে কর্ড়া গলায় বলল…
—” রিদ কি করছিস তুই? পাগল হয়ে গেছিস? মেয়েটাকে শুধু শুধু মারছিস কেন?
রিদ রাগে কটমট করে দাঁতে দাঁত পিষে হাতের রিপোর্টটাকে কচলায়। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আসিফকে উদ্দেশ্য করে চেচিয়ে বলে…
—” আসিফ! ড্রয়িংরুমে সবাইকে বাহিরে নিয়ে যা দ্রুত।
রিদের আদের্শ স্বরুপ তাই করল আসিফ। খান বাড়ির সদস্যরা ছাড়া বাকি সকল আত্মীয়দের বাড়ির বাগানের দিকে নেওয়া হলো। ভিতরে ড্রয়িং রুমে রইল হেনা খান, মেহেরবান, জুই, টিয়া, শাহেবা, নিহা, আর মারিহা। বাড়ির বাকি পুরুষরা আপাতত বাহিরে আছে আয়নকে নিয়ে। আরাফ খানও সেখানেই আছে। সকলে বের হয়ে যেতেই রিদ ফের মায়ার বাহু টেনে নিজের কাছে আনতে চাইলে বাঁধা দেয় হেনা খান। রিদ চেতে উঠে রাগে বশে হাতের রিপোর্টটা ছুড়ে ফ্লোরে ফেলতে ফেলতে মায়ার উদ্দেশ্য বলে…
—” তোরে আমার বারবার নিষেধ করার পরও তুই কেন আমাকে ঠেঙ্গিয়ে একবারের জায়গায় দুইবার করে প্রেগন্যান্ট হলি? তোকে বলেছিলাম না আমার বাচ্চা চাই না। তারপরও কেন তুই আমার কথা শুনলি না।
রিদের কথা বোধগম্য হতেই উপস্থিত সবাই থমথমে খেয়ে মায়ার দিকে তাকাল অবিশ্বাস চোখে। মায়া থাপ্পড় খেয়ে এতক্ষণ কান্না করলেও রিদের কথা এবার চুপ হয়ে যায়। খুশিতে চোখ মুখ জ্বলে উঠে। হেনা খানসহ বাসার সবার একিই অবস্থা। খুশিতে আটখানা হয়ে উঠে মায়ার প্রেগন্যান্ট এই সংবাদটি পেয়ে। মায়া পুনরায় কনসিভ করেছে বিষয়টি সবার কাছে বিশাল বড় কিছু পাওয়ার নেয় আনন্দের লাগলেও রিদের কাছে ছিল কাটা বিষে সমতুল্য কিছু। রিদের বেবি চাই না মানে চাই না। এখানে বউকে হারিয়ে তো মোটেও না। আগে বউ তারপর বাকি দুনিয়া। মায়া রিদের কথায় খুশিতে আটখানা হয়ে ঘোর মাঝেই অবিশ্বাস গলায় বলে ফেলল…
—” সত্যি আমার বাবু হবে?
মায়ার এই সামান্য কথায়ও রিদ চেতে উঠে। সেকি হেয়ালি করছে এখানে? তার সবকিছু ছেলেখেলা লাগে এই বেয়াদব বউয়ের কাছে? রিদ ত্যাড়ে আসতে চাইল মায়াকে মারতে। হেনা খান বাঁধা দিয়ে দাঁড়ায় মাঝে। তিনি মায়ার সঙ্গ দিয়ে রিদকে পরপর কর্ড়া শাসন করতেই রিদ নিজের কন্ট্রোল হারায়। হাতের কাছে যা পাচ্ছে তাই উল্টো ফেলছে ফ্লোরে। মোট কথা ছোট খাটো ভাঙচুরের একটা তান্ডব ঘটে গেল ড্রয়িংরুমে জুড়ে। উপস্থিত সবাই ভয়ে নিশ্চুপ হয়ে যেতে হেনা খান জোর গলায় বলে..
—” মেয়েটাকে আঘাত করছিস কেন? এই বাচ্চা কি তোর না? নিজের সন্তানকে মেনে নিতে এতো দ্বিধা কিসের তোর? সবকিছুতে তোর কথায় শুনতে হবে কেন অন্যকে?
রিদ চেচিয়ে উঠে বলে…
—” সন্তান আমার। আমি বলছি ওকে প্রেগন্যান্ট হতে? আগ বাড়িয়ে কেন প্রেগন্যান্ট হলো? আমার সুখ কি ওর সহ্য হয়না? দুই দিন পরপর আমার জন্য টেনশন কিনে আনে? চারটা মাস শান্তিতে সংসার করতে পারিনি এর মধ্যে দুইবার কনসিভ করেছে ওহ। আমি কি মরে যাচ্ছিলাম? এতো তাড়াহুড়ো কিসের ওর? কেন নিজের জীবনকে রিস্কে উঠাল। মিসক্যারেজের পরপর কনসিভ করা নিষেধ। ডাক্তারা পারসোনালি এই বিষয়ে পরামর্শ দেয় নিম্নে পাঁচ ছয় মাসের আগে বেবি প্ল্যানিং না করতে। সেখানে তোমার নাতনি আমাকে ঠেঙ্গিয়ে
দু’মাসে মাথায় পুনরায় কনসিভ করল কেন? এই রিপোর্ট কি লেখা আছে জানে? তোমার নাতনি উপযুক্ত নয় এখন বেবি নেওয়ার জন্য। প্রেগন্যান্সিতে অনেক কমপ্লিকেটেড আছে। ওর বয়স কম। তারপরও যদি এই বেবিটা সেচ্ছায় কন্টিনিউস করে তাহলে জীবনের রিস্ক ৯০%। হয় বাচ্চা নয়তো মা। এখন তুমি বলো তোমার নাতনীকে আমার কি করা উচিত। জানে মেরে দেওয়া উচিত না? ওর জন্য আমি কেন অশান্তিতে থাকবো? ওহ কনসিভ করেছে এটা ওর দোষ। আমি বলছি ওকে প্রেগন্যান্ট হতে? বলি নাই। তাই এই বাচ্চা আমার না কিন্তু বউ আমার। তাকে হেফাজত করার দায়িত্বও আমার। চল তুই হসপিটালের এখনই এবরশন করবি। এই বাচ্চা আমার না। তুই আমার।
রিদের কথা চমকে উঠে সবাই। হেনা খান বাঁধা দিতে গিয়েও বাঁধা দিতে পারে না মায়ার জীবনের কথা ভেবে। এতোকাল পরে খান বাড়িতে সুখ ধরা দিয়ে যে এই ভাবে চলে যাবে ভাবি তিনি। আল্লাহ বড় কঠিন পরীক্ষার সম্মোহনী করেছেন উনাদের। এই থেকে বের হওয়ার পথ জানা নেই। যদি তিনি বাচ্চাটার লোভ করে তাহলে মায়াকে হারাতে হবে। আর মায়াকে হারালে রিদকেও হারাতে হবে। হয়তো চিরতরে রিদ উনাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিবে তখন। এবং দেখা যাবে বাবা হয়ে নিজের সন্তানের মুখ দর্শন করবে না পযন্ত চিরজীবন। তার ছেড়ে ভালো রিদের কথায় মেনে নেওয়া। আল্লাহ দেওয়ার মালিক। তিনি নিশ্চয়ই এই কঠিন সমস্যা হতে বের করবেন। হেনা খান মনে মনে দোয়া করল। রিদ এগিয়ে এসে মায়ার হাত টেনে ধরতে চাইলে মায়া ভয়ার্ত ভঙ্গিতে উত্তেজিত হয়ে দৌড়ায় সিঁড়ি দিকে। মরে যাবে তারপর নিজের বাবুকে কিছু করবে না। এবার আসুক যতো ঝড়তুফান। মায়া ভয় পাবে না। মায়ার হঠাৎ দৌড়ে চমকে উঠে সবাই এই অবস্থায় মায়ার দৌঁড়ানো মানেই আরও রিস্ক। সবাই মায়াকে নিষেধ করল দৌড়াতে। মায়া শুনল না। রিদ থেকে পালিয়ে বাঁচতে ভয়ে সামনের দিকে দৌড়াতে গিয়ে পা বেজে হুঁচট খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ল ফ্লোরে। হাঁটুতে ব্যথা পেয়েও তার পরোয়ানা না করে তৎক্ষনাৎ উঠে আবারও সামনের দিকে দৌড়াতে চাইলে রিদ পিছন থেকে চেচিয়ে বলে…
—” রিত! রিত! প্লিজ দৌড়িয়েও না। তোমার জন্য ভালো হবে না। দাঁড়াও তুমি। রিত!
মায়া শুনল না। প্রাণপূর্ণ দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাইলে রিদ পিছন থেকে এসে মায়ার বাহু ধরে কাছে টানে। রিদ দু’হাতে আঁজলে মায়াকে বুকে নিতেই মায়া ধস্তাধস্তি করে জোর গলায় কেঁদে উঠে বলে…
—” আমি কক্ষুনো এবরশন করবো না। ছাড়ুন আমাকে। আমি আমার বাবু্কে চাই। আমি দিব না কাউকে আমার বাবুকে মারতে। আপনি আমার বাবুকে মারার চেষ্টা করলে আমিও আমার বাবুর সাথে মরে যাব। তখন থাকিয়েন আপনি একা একা। তারপরও আমি আমার বাবুকে ছাড়বো না।
মায়ার হাউমাউ কান্নাতে রিদ মায়াকে ছেড়ে দেয়। রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছে তার। ইচ্ছের করছে বউকে পিঠিয়ে সোজা করে দিতে। রিদ রক্তিম চোখে মায়ার দিকে তাকাল। চোয়াল শক্ত করে দাতে দাত পিষে বলল…
—” তোর আমাকে চাই নাকি বেবিকে?
মায়ার সহজ সরল উত্তর…
—” বেবিকে চাই।
মায়ার কথায় রিদ আরও তেতে উঠে। মায়ার জীবনে সে কখনো গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। যার অস্তিত্ব নেয় সেই বাচ্চার জন্য তাকে অমূল্য করে দেওয়াটা রিদের বেদনার কারণ হলো। রিদের কথা হলো মায়ার জীবনে রিদ আগে থাকবে তারপর বাকি দুনিয়া। কিন্তু মায়া রিদের উপরে সবাইকে রাখে বলে রিদ তেতে উঠে পাশের ফ্লাওয়ার ভাজটা মাথার উপর তুলে ফ্লোরে ফেলে মায়ার দিকে আঙ্গুল তুলে বলে..
—” তুই থাক তোর সন্তানকে নিয়ে আমি আর জীবনেও তোর কাছে আসব না। তোর মতোন বেয়াদব বউ আমার দরকারই নেই।
.
চলিত….
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৩
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৪
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬৮
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৯
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)