Golpo romantic golpo Uncategorized দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৮০


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

(কার্টেসী বা কপি করা নিষেধ। শেয়ার করবেন)
৮০
শুভ এসেছে জুই আর মায়াকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে নিজেদের বাড়ি। মুক্তা ছেলে মাহাদীর ছয় বছর উদযাপন উপলক্ষে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে হচ্ছে বলে। বেশ আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে মায়াদের পরিবার সকলেই আমন্ত্রিত। সেই সুবাদে রাতের পার্টিতে সবাই যেতে চাইলেও মায়া রুম থেকে বের হতে নারাজ। যাবে না বলে রুমের দরজা কুন্ডলী বেঁধে বসে আছে। মুক্তা বারবার ফোন করে চিল্লাচিল্লি করছে মায়ার না যাওয়া নিয়ে। হতশা রেহানা বেগম দুই মেয়ের মধ্যে পিষ্ট। তিনি মায়ার বেদনা বুঝতে পারছেন কিন্তু তার মানে এই না যে দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা রুমের দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে মায়া। খান বাড়ির থেকে মায়াকে নিয়ে আসা হয়েছে আজ গোটা পনেরো দিন হলো। অথচ একটা দিনের জন্য মেয়েটা মন খোলে কারও সাথে কথা বলছে না। উনারা গেলেও কথা বলে চুপ থাকে নয়তো কাতা মুড়ে শুয়ে থাকে। স্বাভাবিক থেকেও যেন স্বাভাবিক নেই। রাতে ঘুমাইও একা। এমকি জুইকেও আজকাল সয্য করতে পারে না। অকারণে রাগারাগি করে। আগ বাড়িয়ে জুই মায়া সাথে কথা বলতে গেলে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়। নয়তো রাগারাগি করে। তিনি বুঝেন মায়া সন্তান হারানো বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছে না কিন্তু তাই বলে জুইয়ের সাথে কেন খারাপ আচরণ করবে? এতে জুইয়ের কি দোষ? জুই তো কিছু করেনি বরং জুইতো মায়াকে সাপোর্ট করতেই এগিয়ে যায়! সেখানে মায়ার জুইয়ের সাথে অহেতুক নারাজিটা তিনি বুঝেন না। তারপরও তিনি এক প্রকার বাধ্য হয়ে চুপ থাকেন। মায়াকে আপাতত কিছু বলে না। আরও কিছু দিন গেলে না-হয় তিনি এই বিষয়ে মায়াকে আবারও বুঝাবেন। সন্তান দেওয়া নেওয়া আল্লাহ হাতে। মায়ার হঠাৎ মিসক্যারেজ বিষয়টিতে উনারা সবাই ভিষণ কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু যাহ হওয়ার তা হয়ে গেছে ভাগ্যের লেখা কেউ গুছাতে পারে না। তাই বলে মেয়েটা যদি দিন বা দিন এইভাবে ভেঙ্গে পরে তাহলে উনার মেয়েকেই বাঁচানো দায় হয়ে পরবে। রেহেনা বেগম মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ার রুম থেকে বের হয়ে যান। কারণ ইতিমধ্যে মায়া যাবে না বলে নিষেধ করে দিয়েছেন। রেহেনা বেগম যেতেই জুই নিজের রুম থেকে বের হয়। এতক্ষণ যাবত সে দরজার আড়াল থেকে শুনেছে মায়া আর রেহেনা বেগমের কথা। মায়া যাবে না সেটা জুই জানে। কিন্তু জুই একবার মায়ার সাথে কথা বলতে চাই। সেদিন পার্টিতে যাহ কিছু হয়েছে সবটাই ভুল বুঝাবুঝি আর পরিস্থিতির শিকার। জুই নিজে শুনেছিল মায়া আর আয়নের উত্তেজিত মূহুর্তের কথা গুলো। সেতো প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইনি কিন্তু বারবার একিই জিনিস শুনার পর সে এক মূহুর্তে জন্য বিশ্বাস করে নেয়। এছাড়া জুই আর কি করবে? জুই তো জীবনের প্রথম এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল। বিশ্বাস করতে পারছিল না বলেই তো রিদকে জিগ্যেসা করেছিল সবকিছু সত্যি কিনা? কিন্তু রিদের নিস্তব্ধ নিবাক থাকাটাকে জুই নিরব সম্মতি মেনে নিয়ে ভুল করলো। তারপরও জুই দেখতে চেয়েছিল রুমের ভিতরে আসলে কে আছে কিন্তু রিদের বাঁধা দেওয়াতে দেখতে পারেনি বলে, জুইয়ের সেখানে দ্বিতীয় ভুলটা হয়। তখন পরিস্থিতিটা এমন ছিল যে জুইয়ের পুরো মাথা হ্যাং হয়ে যায়। বিশ্বাসের ঘরে অবিশ্বাসের খেলা করে এক মূহুর্তের জন্য তাই সেদিন রাতে মায়ার উপস্থিতিটা পার্টি বাহিরে সজ্ঞানে নিতে পারেনি। মায়ার কপালে রক্ত দেখে জুইয়ের মনে হয়েছিল রিদ মায়াকে রাগের বশে আঘাত করেছে রুমের বিষয়টি নিয়ে। এরপর যখন মায়া জুইয়ের কাছে এসেছিল সাহায্যে জন্য তখন জুইয়ের দ্বিতীয় বার মনে হয়েছিল, মায়া জুইকে বুঝাতে চাইছে, আয়ন আর মায়ার মধ্যে কিছু হয়নি সেটা নিয়ে। মানসিক বিষন্নতার চাপে জুই মায়ার অর্ধেক কথায় রেগে যায়। মায়ার মুখে আয়নের নামটি শুনে ঠিক থাকতে পারেনি। রাগে কষ্টে মায়াকে ধাক্কা মেরে ঐভাবে অভিশাপ দিয়ে ফেলে নিজের অজান্তে। জুইয়ের ভুল সেদিন রাতেই ভেঙ্গেছিল যখন মায়া আর আয়নকে সবাই ধরাধরি করে হসপিটালের নিয়ে যায়। তখন থেকেই জুই ভিতরকার অপরাধে গুমরে মরছে ধুঁকে ধুঁকে। টানা তিনদিন জুই হসপিটালের ছিল আয়নের পাশে কিন্তু আয়নের হুশ ফিরার পরও জুইয়ের সাথে কথা বলেনি। এমনকি একটু জন্য তাকাইনি পযন্ত। জুইয়ের ভুল করেছে, সে বুঝতে পারছে, এরজন্য সবার কাছে ক্ষমা চাইতে পযন্ত প্রস্তুত। কিন্তু কেউ জুইকে ক্ষমা করতে চাইছে না। বরং চুপ থেকে ওর অপরাধীতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। জুই কি করবে সেতো অপরাধী। তার ভুলের কি ক্ষমা নেই। জুইয়ের দরকার ছিল আপনজনদের উপর বিশ্বাস ধরে রাখা। কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যে জুইয়ের জায়গায় সেদিন অন্য কেউ হলেও হয়তো সেটাই করতো। দ্বিধায় জুই চাপিয়ে রাখা দরজা টেনে খুলে গেস্ট রুমে ঢুকল। এই রুমে মায়া থাকে! হসপিটাল থেকে এসেছে পর থেকে আলাদা রুমেই থাকছে দুজন। মায়ার শূন্য ঘরটাতে জুই দৃষ্টি বুলাতেই দেখল মায়া ওয়াশরুম থেকে বের হচ্ছে হাতে ভেজা টাওয়াল। দুজনের চোখাচোখি হতেই মায়া তৎক্ষনাৎ রাগে চেঁচায় জুইয়ের উপর…

—” কেন এসেছিস আমার রুমে তুই? কি চাই তোর এখানে?

প্রতিবারই মায়ার এমন করে জুইয়ের সাথে হসপিটাল থেকে এসেছে পর থেকে। জুইয়ের সামান্য সানিধ্য যেন পছন্দ না মায়ার। অপরাধী জুই করুণ চোখে তাকাল মায়ার রাগান্বিত মুখটার দিকে। মায়ার সাথে বনাবনি না হওয়াতে কষ্ট গুলো যেন জুইয়ের চোখে ভাসমান হলো চকচক করা পানির নেয়। আর কতো অপেক্ষা করবে মায়া ওকে? অনেক তো হলো! এবার কি ক্ষমা করা যায় না? দরজার সামনে থেকে জুই দ্বিধায় বললো…

—” যাবি না?
মায়া তৎক্ষনাৎ উত্তর করলো…
—” বলেছি তো যাব না। তারপরও কেন আসলি পুনরায় জানতে?
—” মুক্তা আপু বারবার ফোন করছে তোর জন্য। শুভ ভাইয়াও নিচে বসে আছে। মাহাদীর তোর জন্য নাকি কান্নাকাটি করছে খালামুনি খালামনি বলে বলে। চল না আমাদের সাথে! এমন করছিস কেন?

জুইয়ের করুন কন্ঠের কথায় মায়া চেতে উঠে বলে…

—” আমি এমনিই! ভিষণ খারাপ মেয়ে। এজন্য তোদের সাথে খারাপ ব্যবহার করছি। কেন তুই জানিস না? পর কোনো দিন আপন হয়না? আমি না তোর পর তাহলে কেন বারবার এতো অপমান হতে আছিস আমার কাছে? না করিনা আসতে? তাহলে আছিস কেন?

মায়ার কটাক্ষ কথায় ফুপিয়ে কেঁদে উঠে জুঁই। নিজের করা ভুলের জন্য আর কতো ক্ষমা চাইবে ওহ। অনেক তো হলো আর কতো? এবার কি ক্ষমা করা যায়না? ভুল তো মানুষ ধারায় হয়। জুই না হয় একটা ভুল করেছে এই ভুলের কি কোনো ক্ষমা নেই? গুমরে কেঁদে উঠা জুই অশ্রু ভেজা চোখে বলল..

—” একটা ভুলের জন্য আর কতো অপেক্ষা করবি তুই আমাকে? তখন পরিস্থিতিটা বুঝার অবস্থা ছিল না আমার। হ্যাঁ আমি ভুল করেছি মানছি। তারজন্য ক্ষমাও চাচ্ছি! কিন্তু তোরা কেউ আমার দিকটা বুঝতে চাচ্ছিস না? কি করবো আমি? কি করলে তোরা বুঝবি সত্যিই আমি ভুল করেছি! জেনেশুনে কিছু করেনি। সবটায় পরিস্থিতি শিকার ছিল আমার।

জুইয়ের পরপর একিই কথায় বিরক্ত বোধ করে মায়া। এগিয়ে এসে হাতের ভেজা টাওয়ালটা বিছানার উপর রাখতে রাখতে বলল..

—” আমি খারাপ মানুষ তাই তোকে বুঝতে ইচ্ছা করে না। এবার যাহ বের হ! ভালো লাগছে না, একটু ঘুমাব আমি।

মায়া হৃদয়হীন কথায় মূহুর্তে আরও ডুকরে কেঁদে উঠে জুঁই। কাতর গলায় বলে…

—” কেন এমন করছিস রিতু? কেন বুঝতে চাচ্ছিস না আমি সত্যি পরিস্থিতির শিকার ছিলাম মাত্র।

জুইয়ের কথায় মায়া শক্ত গলায় শুধিয়ে বলল…

—” কোনটা পরিস্থিতির শিকার জুই তুই আমাকে বুঝা! তোর নিজের স্বামীর উপর অবিশ্বাস করাটা? নাকি বোন হয়ে আমাকে অভিশাপ দেওয়াটা? আমাকে বল না জুই! তোর সবকিছু আমি মেনে নিতাম, তোর উপর আমার রাগও ছিল না প্রথমে। কিন্তু তোর একটা অভিশাপের জন্য আমি আমার বাবুটাকে হারিয়েছি জুই। তুই আমার আপনজন হারানোর দোয়া করেছিলি না? দেখ তোর দোয়া কবুল হয়েছে, আমি আপনজন নয় নিজের রক্তকে হারিয়েছি। তোর দোয়ায় আজ আমার কিছুই নেই। স্বামী, সন্তান সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব আমি। তুই জানিস! এই সন্তানটার জন্য কতো স্বপ্ন, কতো প্ল্যানিং ছিল আমার? জানিস না তুই! আমার একমাত্র সম্বল ছিল আমার সন্তান উনাকে(রিদ) বাঁধার। উনার সন্তান চাইনা বলে বিয়ের আগেই আমাকে কঠোর নিষেধ করেছিল তারপরও আমি হার মানেনি! উনাকে ঠেঙ্গিয়ে আমার বাবুকে দুনিয়াতে আনতে চেয়েছিলাম। উনার নতুন দূর্বলতা চাই না। দাদা-দাদীর মৃত্যুর পর আমাকে নিয়ে একা থাকতে চাই ভিনদেশে। আর আমি উনাকে বাঁধতে চাই পরিবারের সাথে নতুন দূর্বলতা দিয়ে। আমি জানি উনি আমাকে ছাড়বে না। আবার উনি উনার গ্যাংস্টার জীবনও ছাড়বে না। মূলত এজন্যই আমি উনার দূর্বলতা বাড়াতে চেয়েছিলাম। আমার জন্য না-হয় সন্তানের জন্য হলেও নিজের জীবনের মায়া করে পাপের পথ থেকে ফিরে আসতে চাইবে। পরিবারের টানে বেশি বেশি বাসায় থাকতে চাইবে দূরে যাবে না। এই ভেবে উনাকে ধোঁকায় রেখে একা সন্তানের প্ল্যানিং করেছিলাম আমি। কিন্তু তোর দোয়ায় ফলে আমার বাবুটাও হারিয়ে গেল। উনি আরও সর্তক হয়ে গেল। এবার আমি জান দিলেও সে আমাকে বেবি নিতে দিবে না। তাকেও আমার পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা হলো না। এবার তুই বল তোর কোন অপরাধটা জন্য আমি তোকে ক্ষমা করবো? আমি বিষ খাওয়াতে তোর হাত না থাকলেও আমার মনে হচ্ছে তোর অভিশাপের জন্য এসবকিছু হয়েছে। তুই যদি আমাকে আপনজন হারানোর অভিশাপ না দিতি তাহলে আজ হয়তো আমার বাবু আমার কাছে থাকতো। আমিও বিষ খেতাম না। তুই পরিস্থিতি শিকার না জুই! যদি হতি তাহলে আজ আমার জায়গায় তুই থাকতি। একটু হলেও বুঝতে পারতি আপনজন হারানোর কষ্টটা। তুই কিছুই হারাসনি জুই! সবকিছু হারিয়েছি আমি। আজ পরিস্থিতির শিকার আমি। আমার সন্তান, আমার প্রথম মা হওয়ার অনূভুতিটা হারিয়ে নিঃস্ব আমি। না স্বামীকে বুঝাতে পারবো দ্বিতীয় সন্তানের জন্য! আর না বাবা আমাকে উনার কাছে ফিরত পাঠাতে চাই! এবার আমিও বাবার অমতে আর উনার কাছে যেতে চাই না। গিয়েও বা কি করবো? উনাকে ক্ষমা করা সম্ভব না। উনি যাহ করেছে কিছুই ভুলেনি আমি। আর না ভুলতে পারবো! আমার কর্মফল আমি ভুগছি। তাই তোদের মতোন মহান মানুষদের সাথে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। প্লিজ আমাকে আমার মতোন থাকতে দেয়। বারবার একিই জিনিস বলতে ভালো লাগে না। তাই আমার থেকে তোরা দূরে থাক। এতে তোদেরই ভালো। এবার যাহ তুই! বের হ! আমি যাব না কোথাও!

মায়া থামে। জুঁই নিবাক স্তব্ধ হয়ে যায় মায়ার কথায়।মায়ার মনে এতো কিছু ছিল তা জানা ছিল না জুইয়ের। জুই ভুল করেছে ওর মায়াকে অভিশাপ দেওয়াটা ঠিক হয়নি। তাছাড়া মায়া নিজের মনের কথা অন্যকে খুব কম বলে। তীব্র অপরাধ বোধের দহনে জুঁই আরও দ্বিগুণ জ্বলে চোখে অশ্রু কণা হয়ে গাল বেয়ে পড়ল ওর। মায়া জুঁইয়ের নড়চড় না দেখে বিরক্তি ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে জুইকে রুম থেকে ঢেলে বের করে দিয়ে মুখের উপর দরজা আটকিয়ে দিল। ঠাস করে দরজার ছিটকি লাগিয়ে পিছনে ঘুরে মুখ চেপে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল দীর্ঘ সময়ের শক্ত থাকার মুখোশ খুলে ফেলে। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে ফ্লোরে হাঁটু মুড়ে বসে মাথা গুজে ডুকরে কেদে উঠে। মায়া কারও সাথে রাগ করতে চাই না। এমনকি জুইয়ের উপরও না। কিন্তু মায়া কি করবে জুইকে দেখলেই মনে হয় জুইয়ের অভিশাপেই হয়তো মায়া নিজের বাবুকে হারিয়েছে। জুই সেদিন মায়ার আপনজন হারানোর বদদোয়া না দিয়ে মায়ার মরে যাওয়ার দোয়া দিলে হয়তো ভালো হতো। মায়া কাউকে ক্ষমা করবে না। রিদকে তো ভুলেও না। মায়াকে এমন পরিস্থিতিতে দাঁড় করানোর মানুষ গুলা তো তারাই, তাহলে মায়া কেন তাদের ক্ষমা করবে। মায়ার বাবা-ই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মায়াকে আর খান বাড়িতে পাঠাবে না বলে। মায়া সমর্থন করে বাবা সিদ্ধান্তকে।
~~

ঘর ভরতি মানুষের ভিড়ে বিরক্তিতে হাঁপিয়ে উঠছে মায়া। বাচ্চাদের চিল্লাচিল্লি আর মানুষের কলরবে অতিষ্ঠ ওহ। বার্থডে পার্টি এখনো শুরু হয়নি। হবে রাত দশ-টা পর। সবেমাত্র আটটা। বিকাল থেকেই মায়া ঘাপটি মেরে বসে আছে চুপচাপ। এখানে আসতে চাইনি ওহ। কিন্তু মুক্তা আর শাহিনের চাপে বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে। শফিকুল ইসলাম, রেহানা বেগম, জুই সবাই মায়ার আশেপাশেই আছে তবে বাকি মেহমানদের সাথে সখ্যতার বজায় রেখে। ফিহা ঢাকায় আছে নিজের পরিবারের কাছে। আরিফ ও সেখানেই আছে ছেলের মতোন দায়িত্ব পালন করছে সবকিছুতে। আয়নের এক্সিডেন্ট পরে হঠাৎ করে নাহিদ চৌধুরীর মৃত্যুতে পাগল প্রায় সবাই। মানসিক শারীরিক ভাবে ভেঙ্গে পরেছেন মেহেরবান। মায়ের পাশে শক্ত হাতে দাঁড়িয়ে রইয়ে ফিহা। আসলে পরিস্থিতি মানুষকে কোথায় দাঁড় করায়। কিছু দিন অবধি যেখানে সবাই হাসিখুশি ছিল সেখানে কালক্রমে যেন আজ কালো ছায়া নেমে এসেছে সবার উপর। সবাই কিছু না কিছু নিয়ে কষ্ট পাচ্ছে। আল্লাহ ভালো জানে এই কষ্ট লাঘব টানবে কখন। মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে ভেবে চোখ তুলে মায়া চারপাশটা এক পলক দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিরবে। যেখানে মন ঠিক নেই সেখানে বাহিরের চাকচিক্যও যেন বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্য সময় হলে মায়া সবাই থেকে বেশি এনজয় করতো! কিন্তু আজ যেন মায়ার সবকিছুতে বিষাক্ত বিষের নেয় লাগছে। মায়ার নিঃস্ব সময় চাই একান্ত নিজের জন্য মানসিক চাপ থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জন্য। মনের চাহিদা বড় চাহিদা। মন সায় না দিলে বাহিরের আনুষ্ঠানিকতাও তিক্ত লাগে। যা এই মূহুর্তে লাগছে মায়ার। সবেমাত্র মায়া সন্তান হারিয়ে বাসায় ফিরে আসল স্বামী ঘর ছেড়ে সেখানে মায়ার মানসিক স্বস্তির চাই। কিছু সময় চাই নিজেকে গুছানোর। বাকি কিছু চাই না। মায়া দম মেরে আরও কিছু সময় বসে রইল একজায়গায়। অবশেষে অসয্যের নেয় অধৈর্য ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়। কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ ড্রয়িং রুমের এক কোণা ধরে বের হয়ে যায় মুক্তা শশুর বাড়ি থেকে। এখন কাউকে কিছু বললে কেউ মায়াকে বিদায় দিবে না তাই চুপচাপ বের হয়ে গেল সে। বাড়ির সবাই মেহমানদারিতে ব্যস্ত! তাই মায়াকে বিশেষ কেউ লক্ষ করলো না। বাড়ির গেইট ধরে রাস্তায় একা নেমে এসে মায়া গায়ের কালোর মধ্যে ব্রাউন চাদরটা বোখরার উপর দিয়ে টেনে নিল। অন্ধকারময় রাস্তায় ল্যামপোস্টের আলো জ্বলছে। মায়া সেই আলোয় রাস্তার পাশ ধরে সামনে এগোল। মুক্তা শশুর বাড়ি থেকে মায়াদের বাড়ির বেশি দূরে নয় কাছেই। এইতো পনেরো মিনিটের রাস্তা। তাছাড়া রাস্তার পাশের দোকান পার্ট সব খোলা। মানুষজনের চলাচলও বেশ। মায়া বিষন্ন মনে একা একা হাঁটল রাস্তা ধরে। বাহিরে বেশ শীত পরছে। একটু জায়গায় হাঁটলেই সামনের থেকে রিকশা পাওয়া যাবে। রিকশা নিয়ে বাসায় যেতে অসুবিধা হবে না। বাসার এক্সট্রা চাবিও আছে ওর কাছে। মায়া সামনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই লক্ষ করলো পথ মানুষের দৃষ্টি নিজের উপর। প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পর মূহুর্তে ঠিকই বুঝল। হাত ব্যাগ থেকে ওয়ান টাইম মাক্স নিয়ে হিজাবের উপর দিয়ে পরে নিল। এতক্ষণ যাবত অনুষ্ঠানে ছিল বিদায় নেকাব বা মাক্স পরেনি, মুখ খোলা ছিল। বেখেয়ালি-পনায় রাস্তায় নেমেও মায়ার মুখ খোলা ছিল সেটা বুঝতে পারেনি। কিন্তু হঠাৎ করে পথ মানুষের দৃষ্টিতে বুঝল। দ্বিধায় মায়া আর সামনে হাঁটল না। জায়গায় দাড়িয়ে পড়ল। একা বেশ দূর অবধি হাঁটা ঠিক হবে না বলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একটা রিকশা নিল। গোটা পনেরো মিনিট পর বাড়ির রাস্তায় এসে রিকশা থামতেই মায়া ছোটখাটো ভিড় দেখল নিজেদের গেইটের সামনে। দৃষ্টি মাঝে তীক্ষ্ণতা বজায় রেখে মায়া রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে সামনে এগোল গায়ের চাদরটা টেনে। বাড়িতে কেউ নেই। কিন্তু বাড়ির সামনে অপরিচিত সাদা গাড়িটি কার বুঝতে পারছে না মায়া। তারপরও মায়া সামনে এগিয়ে গাড়ির মালিককে দেখতে চাইল কিন্তু হঠাৎই গেইটে ধ্রাম ধ্রাম ভারি শব্দে এক মূহুর্তের জন্য হকচকিয়ে গেল মায়া। কেউ জোরহাতে আঘাত করে গেইট ভাঙ্গতে চাইছে সেটা বুঝতে সময় নিল না মায়া। কিন্তু মায়া এতোটা বুঝতে পারছে না কে এমন করছে? আর কেনই বা? তাড়াহুড়ো মায়া পা চালিয়ে দৌড়াল সেদিকে আঘাত কারী ব্যক্তিটিকে থামাতে। নয়তো আজ মায়াদের বাড়ির গেইট আস্ত থাকবে না বলে। মায়া দৌড়ে আবছা আলোয় লোকটিকে পিছন ডেকে রাগান্বিত স্বরে বলল..

–” এই যে, কে আপনি? বাসায় কেউ নেই দেখতে পারছেন না? অসভ্যে মতো…

মায়া থামে। থামে নয় ওকে থামতে হয় অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটির হঠাৎ দর্শনে। যতোটা স্বতঃস্ফূর্ত সাথে মায়া কথা গুলো বলল ততোটাই আতংকিত গলায় নিভেও গেল। রিদ রক্তিম চোখে পিছন ঘুরে মায়া দিকে তাকাতেই আতংকিত মায়া তৎক্ষনাৎ উল্টো ঘুরে সোজা দৌড়াল সামনের দিকে রিদের হাত থেকে বাঁচতে। মায়ার রিদকে চাই না। মোটেও চাই না। মায়া সারাজীবন একা থাকবে তারপরও এমন স্বামী ঘর সে করবে না। যে স্বামী বউ রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করে। যার জন্য মায়ার বাবু মারা যায় সেই স্বামী কাছে মায়া ইহ জীবনের ফিরতে চাই না। কক্ষনো ফেরতে চাই না। মরে যাবে তারপরও ফিরে যাবে না। মায়া অদূরে দৌড়ল। রিদ মায়া হঠাৎ দৌড়ে তৎক্ষনাৎ হাতের হকিস্টিক ফেলে ছুটল মায়া পিছন পিছন। বউকে সেও এমনই ছাড়াবে না। অনেক হিসাব নিকাশ কষা আছে তার। তাকে অসুস্থ ফেলে এমন বেয়াদব বউ বাপের বাড়ি আসে কি করে? এই বেয়াদবির রগটা যদি সে না ভাঙ্গে তার নামও রিদ খান না? মায়া প্রাণপূর্ণ সামনে দৌড়িয়েও পাড় পেল না পুরুষালি দৌড়ে সাথে। রিদ পিছন থেকে মায়াকে ঝাপটা জড়িয়ে ধরে কোলে তুলে নিল এক মূহুর্তে। মায়া ছটফট করলো। রিদের সাথে যাবে না বলে এলোপাতাড়ি রিদকে আঘাত করতে লাগল। ছটফট করতে করতে চেঁচাল রিদের উপর…

—” অসভ্য লোক! ছাড়ুন আমাকে! একদম ছুবেন না! ছাড়ুন বলছি! কেন এসেছেন এখানে? আর কি চাই? সব নিয়েও শান্তি হয়নি আপনার? ছাড়ুন বলছি বাজে লোক!

মায়া পরপর চেঁচাল, রিদকে আঘাতও করলো! কিন্তু তারপরও রিদ ছাড়ল না। জোরপূর্বক মায়াকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো নিজের সাথে। মায়াও হার মানল না। রিদের সাথে যাবে না মানে যাবে না। এবার যার হওয়ার হোক। দিশাহারা মায়া হাত-পা ছুটাতে ছুটাতে হঠাৎই কামড়ে ধরলো রিদের হাতে। ‘আহ’ চিৎকার করে রিদ খেই হারিয়ে মায়াকে ছেড়ে দিতেই মায়া তৎক্ষনাৎ আবারও দৌড়াল পালিয়ে বাঁচতে। রাগে কটমট করে রিদ হাত ঝাকায়। এমনিই তার রাগ আকাশ ছুঁয়ে আছে। মায়া যেন তার রাগটা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বারবার পালিয়ে বাঁচতে যেয়ে। পালিয়ে বাঁচবে কোথায়? অসংখ্য বেয়াদবির হিসাব সে করবে না? এমনই এমনই ছেড়ে দিবে? এতো সহজ? মায়া পিছন পিছন রিদও তৎক্ষনাৎ দৌড়ে মায়াকে আটকাল নিজের সাথে। জোরপূর্বক মায়াকে পেচিয়ে টেনে নিয়ে আসল গাড়ি কাছে। মায়া তখনো চিল্লাচিল্লি করছে রিদের সাথে যাবে না বলে। রিদ শুনলো না মায়ার বারণ। একহাত মায়াকে টেনে অন্যহাতে গাড়ির দরজা খুলতে গেলে মায়া আবারও রিদের হাতে কামড়িয়ে ধরে। ‘শিট’ বলে চেচিয়ে রিদ মায়াকে ছেড়ে দিলে সেই সুযোগে মায়া আবারও পালাতে চাইল রিদ থেকে কিন্তু এবারও সফল হলো না। কারণ তার আগেই রিদ মায়ার বাহু টেনে গাড়ির সাথে ধাক্কায় দিয়ে দাঁড় করায়, শক্ত হাতে মায়ার গাল চেপে ধরে ঝুকে রাগে রি রি করে বলে..

–” বারবার কামড়াচ্ছিস কেন? চোখে পরে না আমাকে? তেজ দেখাস? তোর তেজের ধার ধারি আমি?

দুহাত বেঁধে রিদের বুকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সারতে চাইল মায়া। কিন্তু পারলো না। ধাক্কাধাক্কিতে ছটফট করে মায়া বলল…

—” তোহ কেন এসেছেন এখানে? আমি বলেছি আপনাকে আসতে? দ্বিতীয় বউ ভাত দেয় না, যে আমার কাছে চলে এসেছেন? আমার অসয্য লাগছে আপনাকে! চলে যান এখান থেকে। যান বলছি!

—” বাপের বাড়িতে এসে সাহস বেড়ে গেছে তোর না? সাহস দেখাস আমাকে হ্যাঁ? কেন আসলি আমাকে হসপিটালের রেখে এখানে! আমার অসুস্থতা চোখে পরেনি তোর? এতো তুচ্ছ লাগে আমাকে?

রিদের অসুস্থতার খবরটি কানে যেতেই মায়া থামে। ছটফট করা থেকে স্থির হয়। সত্যি মায়া জানতো না রিদ অসুস্থ ছিল। জানলে কখনো আসতো না। আসলেও অন্তত দুদিন পর আসতো। এইভাবে হুটহাট চলে আসতো না রিদের খবর না দিয়ে। মায়া হুশ ফিরার পর রিদকে নিজের পাশে দেখেনি বলে মায়া মনে করেছিল রিদ হয়তো হসপিটালের নেই। সত্যি মায়া জানতো না রিদ অসুস্থ ছিল। এই বিষয়ে মায়ার পরিবারও মায়াকে কিছু বলেনি কেন? বিষন্ন মায়া অধৈর্য্য গলায় বলল…

—” আপনি অসুস্থ ছিলেন?

মায়া কথায় রিদ আরও খানিকটা ঝুঁকে পড়ে মায়ার উপর। হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে মায়ার গাল চেপে ধরে বলে…

—” কি মনে হয়? আমি সুস্থ থাকলে তোকে এতোদিন বাপের বাড়ি থাকতে দিতাম? উঠিয়ে নিয়ে যেতাম না?

মায়া নিভে গেল রিদের কথায়। অল্পের জন্য দম মেরে গেল। রিদ রাগান্বিত চোখে মায়ার মুখের নিজের দৃষ্টি বুলাই। গায়ে বোখরা! মুখের ওয়ান টাইম মাক্সটি জোড়াজুড়ি কারণে খোলে গেছে। তাতে মায়ার
মুখে সাজ না থাকলেও ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিকটা চোখে পড়ল তার। রিদ তেতে উঠে। যেখানে রিদ ভালো নেই সেখানে তার বউ কিভাবে সাজুগুজু করে রাস্তায় বের হয়? এই সাহস দেয় কে? রাগান্বিত রিদ তেতে উঠে তৎক্ষনাৎ মায়া ঠোঁটের উপর ফোল্ড করা শার্টের হাতা চেপে ধরে ঘষাঘষি করে মুছতে মুছতে তিরতির মেজাজে বলল…

—” কই গেছিলি তুই? আমি নেই তোর এতো সাজ কিসের? কাকে দেখাস এই সাজ হ্যা?

ঠোঁট তীব্র জ্বালায় ফুপিয়ে উঠে মায়া। রিদকে ধাক্কিয়ে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল…

—” উফ! ব্যথা পাচ্ছি আমি, ছাড়ুন! বেশ করেছি সেজেছি। আমার মনে রঙ লাগছে এজন্য সেজেগুজে রাস্তায় হাঁটছি। দরকার হলে আরও হাঁটবো, আপনি কে বলা? আমার যা খুশি তাই করে বেড়াব! আপনি একদম আমার থেকে দূরে থাকবেন। যান।

মায়ার দু’হাত একত্রিত করে একহাতে গাড়িতে চেপে ধরল রিদ। রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলে…

—” আমি দূরে থাকবো? আমি? কয়টা নাগর জুটিয়েছিস এখানে হ্যা? আমাকে চিনিস না? আমার না হলে প্রাণে বাঁচবি তুই? জান খেয়ে ফেলবো না! চল আমার সাথে, দেখি তোর কোন নাগর আটকায় আজ আমাকে।

রিদ মায়া হাত টেনে ধরে নিয়ে যেতে লাগলে মায়া তাড়াহুড়োয় চেঁচিয়ে বলে..

—” ছাড়ুন বলছি! আমি যাব না আপনার সাথে। ছাড়ুন। আপনাকে অসয্য লাগে আমার কেন বুঝতে পারছে না। ছাড়ুন! আমি যাব না।

মায়া পরপর চিৎকার অপেক্ষা করে রিদ মায়াকে টেনে জোরপূর্বক গাড়িতে উঠিয়ে দরজা লক করে দিল। মায়া গাড়ি দরজা ভিতর থেকে টেনে ধাক্কাতে লাগল। রিদ সামনে থেকে ঘুরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি টানল পিছন দিকে। রিদ স্টিয়ারিং হ্যান্ডেল ধরে গাড়ি ঘুরাতে চাইলে মায়া দু’হাতে রিদকে বাঁধা দেয় গাড়ি চালাতে। জোড়াজুড়িতে রিদ গাড়ি চালাতে সুবিধা করতে না পেরে রাগের বশে রিদ উল্টো হাতে মায়ার গালে থাপ্পড় বসাতেই মায়া হেলিয়ে সিটের পরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। গালে হাত দিয়ে কেঁদে বলে…

—” কতক্ষণ জোর করে আটকিয়ে রাখবেন আমাকে? কতদিন? আমি আবারও সুইসাইড করার চেষ্টা। বারবার করবো! যতোদিন না আপনার থেকে মুক্তি পাচ্ছি আমি ততদিনে চেষ্টা করেই যাব। দরকার হলে নিশ্বাস আঁটকে মারা যাব। তারপরও আপনার থেকে মুক্তি চাই আমার। আপনি খুনি! আমার বাবুকে আপনি মেরেছেন। আমি আপনার সাথে থাকতে চাই না। মুক্তি দিন। যেতে দিন আমাকে।

গাড়ির ব্রেক কষল রিদ। চেপে রাখা রাগটা যেন তরতর করে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মায়ার কথায়। কিছুতেই যেন শান্ত থাকতে পারছে না সে। রাগান্বিত হাতে রিদ মায়ার বাহু টেনে নিজের কোলে বসিয়ে ঘাড় চেপে মায়াকে মুখোমুখি করে বলল…

—” কেন এমন করছিস? আমাকে দিয়ে তোর হয় না? এতো কিছু কেন লাগবে তোর? না করেছিলাম না সন্তান চাই না আমার তারপরও কেন সন্তানের জন্য মরিহা হয়ে উঠেছিস? আমি বলেছিলাম তোকে প্রেগনেন্ট হতে? তাহলে কেন প্রেগনেন্ট হলি?

সন্তানের জন্য দারুণ ছটফট প্রকাশ পেল মায়ার চোখে মুখে। বেদনায় ডুবন্ত মায়ার রাগ জেদ সবকিছুই যেন প্রকাশ পাচ্ছে রিদের বিপরীতে। সন্তানকে হারিয়ে পাগল সে। এমনই সে কাউকে ছাড়বে না যতক্ষণ না সবকিছুর কৈফিয়ত মায়া পাচ্ছে।

—” বেশ করেছি প্রেগনেন্ট হয়েছি! দরকার হলে আরও হবো! একশো বার হবো। ওহ আমার বাবু ছিল! কেন মারলেন আপনি ওকে! দরকার হলে ওকে নিয়ে আমি অনেক দূরে চলে যেতাম, আপনার কাছে আসতাম না। তারপরও কেন আমার বাবুটাকে বাঁচালেন না! কেন মরতে দিলেন? কেন?

—” আমার থেকে এখন তোর কাছে সন্তানই সব? বেবি দুনিয়াতে আসার আগেই তুই আমাকে ছেড়ে দেওয়ার প্ল্যানিং করেছিলি? আমার উপরে তোর জীবনে সবকিছুর গুরুত্বপূর্ণ হয়। তুই শুধু আমাকে গুরুত্ব দিতে জানিস না।

—” এজন্য মেরে দিয়েছেন আমার বাবুকে?

—” ফর গড সেক রিত! তোমার বাবু আমি মারেনি। তোমার অতিরিক্ত বিষ খাওয়ার ফলে নষ্ট হয়ে গেছে বেবি।

—” আমার বিষ খাওয়ার মতোন পরিস্থিতি আপনি আর আপনার দ্বিতীয় বউ সৃষ্টি করেছেন। আমাকে মরতে বলে রুম থেকে বের করে দিয়েছেন। বন্ধ রুমে বাসর পযন্ত করছেন। আপনার জায়গায় যদি আমি হতাম তখন আপনি….

মায়া কথায় রিদ ভয়ার্ত ভঙ্গিতে মায়াকে টেনে বুকে জড়িয়ে নিল দু’হাতে। দীর্ঘ সময়ের খালি শূন্য বুকটা পূরণ করতে মায়াকে নিজের প্রশস্ত বুকে পিষ্ট করে দিশেহারা গলায় বলল রিদ…

—” প্লিজ রিত এমনটা বলে না। আমি পাগল হয়ে যাব। আমি সত্যিই পাগল যাব বউ। তোমাকে ছাড়া আমার নিশ্বাসটাও চলে না। অচল আমি। তোমাকে নিয়ে ওরকম বাজে কিছু কল্পনা করলেও আমি পাগল হয়ে যায়। প্লিজ বউ! শুধু আমার হয়ে থাকো! শুধু আমার।

রিদের বুকে টায় পেয়ে মায়ার মনও নরম হলো। আঁজলে আদলে রিদের বুকে মুখ গুঁজে দীর্ঘ সময়ে শক্ত থাকার মুখোশ খুলে ডুকরে কেঁদে উঠল মায়া দু’হাতে রিদের শার্ট আঁকড়ে ধরে। ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল..

—” আমার বাবু! আমার বাবু!

মায়া আঁজলে রিদের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল। রিদও চুপচাপ বসে থাকল সিটে গা এলিয়ে। দুজনই নিশ্চুপ। কাঁদতে কাঁদতে মায়া হঠাৎ করেই রিদকে ছেড়ে ছিটকে দূরে সরল। এতক্ষণ আবেগের বশে সবকিছু ভুলে বসেছিল মায়া। কিন্তু আর না। মায়ার খুব করে মনে আছে রিদ ঘরে দ্বিতীয় নারী ছিল অর্ধনগ্ন অবস্থায়। তাছাড়া যেখানে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে সেখানে মায়া আবেগী কেন হবে? কি দরকার? রিদ মায়ার হঠাৎ রিয়েকশনে কপাল কুঁচকে তাকাতেই মায়া শক্ত গলায় শুধালো ‘ সে বাড়ি যেতে চাই! রিদ সাথে মায়া থাকতে চাই না। দরজার লক খুলে দিতে মায়া চলে যাবে।

রিদের সোজাসাপটা নিষেধ ‘মায়াকে সে রেখে যাবে না। বরং নিজের সাথে নিয়ে যাবেই। দুজনের দ্বিমতে দমে গেল না মায়া। রিদ গাড়ি স্টার্ট করতে চাইলে মায়া বাধা দিয়ে বলে ‘ মায়া এমনই যাবে না রিদের সাথে। মায়ার বাবাকে রাজি করিয়ে মায়াকে নিতে পারলে সে যাবে নয়তো আজীবন মায়া নিজের বাড়ি থাকবে তারপরও রিদের সাথে যাবে না। মায়া ওর বাবার অমতের বিরুদ্ধে আর যাবি না রিদের সাথে। যদি রিদ পারে মায়াকে শফিকুল ইসলাম কাছ থেকে রাজি করিয়ে নিতে নয়তো না।
মায়ার শর্তে রিদ রেগে যায়। জীবনের আজ পযন্ত সে কাউকে জবাবদিহিতা করেছে কিনা বলা দায়। সেখানে নিজের বউয়ের জন্য শশুরের মত নেওয়াটা তার নীতির বাহিরে। রাগান্বিত রিদ মূহুর্তেই চেতে উঠে গাড়ি থেকে বের হয়। সামনে থেকে ঘুরে মায়ার পাশের দরজাটা খুলে মায়াকে টেনে বের করে ধাক্কা দিয়ে বলে…

—” যাহ লাগবে না তোর মতোন বউ আমার। তোরা বাপ-বেটি দুটোই হৃদয়হীন। আমাকে কবরে পাঠিয়েই শান্তি হবি। যাহ তোর বাপকে বলিস আসবে না রিদ খান তাঁর কাছে। থাকিস তুই একা। আমার থেকে তোর বাপ তোর কাছেই সব! তাহলে থাক তুই তোর বাপের বাড়ি যাহ! আসবো না আমি তোকে নিতে।

রিদের কথায় মায়াও আর দাঁড়াল না। পাষাণ মানুষটাকে কিছু বলে লাভ নেই সে শুনবে না। সবসময় জোড়াজুড়ি আর গুন্ডামী করা বুঝে। মায়া উল্টো পথে হেটে নিজের বাড়ির গেইটের সামনে দাঁড়াল। রাগে কষ্ট কাঁদতে কাঁদতে হাত ব্যাগ থেকে চাবি বের করে গেইটের তালা খুলতে খুলতে আবারও শুনলো রিদের রাগান্বিত চিৎকার। রিদ মায়াকে চলে যেতে দেখে সর্বশক্তি দিয়ে গাড়ির চাকায় লাতি মেরে মায়ার পিছন থেকে চেচিয়ে বলে…

—” শালার জিন্দিগি ছেহ! এজন্যই আমি মাইয়া মানুষকে নিজের জীবনের জড়াতে চাইনি। তোরা মানুষের মন বুঝিস না। শালার সিঙ্গেল লাইফের বাঁশ দিয়েছিস। না পারছি ছাড়তে! আর না পারছি শান্তিতে থাকতে। সব অশান্তি গোড়া তোরা নারী জাতি। তোরে বলেছিলাম আমার লাইফে আসতি? কে আসলি? যা লাগবে না তোকে আমার! যাহ তুই! ইহ জীবনে আসবো না তোকে নিতে আমি! দেখিস তুই।

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply