Uncategorized

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৭৫


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

(কার্টেসী বা কপি করা নিষেধ। শেয়ারিং করবেন)
৭৫
ঠান্ডাময় পরিবেশ। ডিসেম্বরের শেষ দিকে। ঘন কুয়াসা চাদরে ঢাকা চারপাশ। প্রচন্ড কনকনে শীত প্রবাহ। কথা বললেও যেন মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হয়। আয়ন এমন শীতের রাতের গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মায়াদের বাড়ির রাস্তায় খানিকটা দূরে। রাত প্রায় একটার ঊর্ধ্বে! রাস্তার ধারে দোকানপাট বন্ধ। ল্যামপোস্টের আলোয় আলোকিত ঘন কুয়াশাময় রাস্তাটি। থেকে থেকে দুয়েক একটা অটোরিকশা যাতায়াত করছে যাত্রীদের নিয়ে। মাঝে মধ্যে একটা দুইটা মানুষের চলাচলও দেখা যাচ্ছে। আয়ন বিরক্তি ভঙ্গিতে গাড়ি সাথে ঠেস দিয়ে কানে ফোন চেপে দাঁড়িয়ে আছে। স্থির নয় অস্থির ন্যায় দাঁড়িয়ে। একটার পর একটা কল করেই যাচ্ছে জুইকে। অথচ মেয়েটার তার ফোন রিসিভ করছে না। অশান্ত অস্থির বুক নিয়ে এসেছে মেয়েটার কাছে শান্তি খুজতে কিন্তু সেই মেয়েটাই বিগত সময় ধরে নিখুঁজ। গায়ে এখনো বাসার সারাদিনে কাপড়টি জড়ানো তার। সারাটা দিন গেল ব্যস্ততায়। কাল থেকে আবার হসপিটালের জয়েন করতে হবে। এখন ব্যস্ততা নেই তা নয়। প্রচুর ব্যস্ততা আছে। কিন্তু কোনো কাজ করেই শান্তি পাচ্ছে না। বাবার কনস্ট্রাকশনের ঝামেলাটাও যেন মিটছে না। একটার পর একটা লেগেই আছে। তাছাড়া তার মনটা অস্থির হয়ে আছে দুটো কারণে। প্রথমত আজ প্রায় পাঁচদিন হচ্ছে জুইকে সে দেখে না। বিয়েতে যাও একটু দেখা হয়েছিল তাদের তারপর থেকেই মেয়েটা নিখুঁত। এমনকি রিদের রিসিপশনের দিনও জুই ঢাকা যায়নি। কি কারণে যায়নি তা জানে না। শুধু জানে মায়ের সাথে বাসায় ছিল। বিয়ের দুইদিন পর অনুষ্ঠিত হওয়া রিদের রিসিপশনের পার্টি শেষ হয়েছে আজ গোটা তিনদিন পার হলো। ব্যস্ততায় আর অস্থিতায় কাটছে তার এক একটা দিন। মায়ার বিরহ জেগে আছে মনে। প্রথম ভালোবাসা ভুলা সহজ নয়। কিন্তু আয়ন প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে নিজেকে জুইয়ের সাথে মানিয়ে নেওয়ার। অনেকটা সফলও হয়েছে। এখন মায়ার জায়গায় জুইকে নিয়ে ভাবতে পারে। খুব সহজেই পারে। জুইকে তার মনেও জায়গায় দিয়েছে নতুন করে প্রেমে পড়ার। হয়তো এখন গভীর প্রেমটা না থাকলেও একটা সময় পুরোপুরি হয়ে যাবে। সবেমাত্র নতুন প্রেমের সূচনা হয়েছে তার মনে। এতো তাড়াহুড়ো কোনো কিছুতেই নেই তার। কিন্তু রিদ মায়ার সংসার যেন তার হৃদয়ে পুড়ছে। অস্থিরতার নিশ্বাসটা বন্ধ হয়ে আসছে এই ভেবে যে, মায়াকে এখন তার ভাবনাতে রাখাও ঘুর পাপ। সে পাপ করতে চাই না। মায়াকে ভুলতে চাই। আর এর ভুলার জন্য সাহায্য চাই জুইয়ের। জুইকে কাছে টানলে হয়তো তার অস্থিরতাটা কমবে। মনে শান্তি মিলবে। জুইকে কাছে টানলে হয়তো মায়ার প্রতি গুমোট দূর্বলতাটা কিছুটা হলেও কমবে। আয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তি চোখ তুলে তাকায় ফোনের স্ক্রিনে। প্রায় অর্ধ শতেক কল করেছে সে জুইকে কিন্তু একটা কলও রিসিভ হলো না। আয়ন বিরক্তি চেপে এবার কল দিল ফিহাকে। প্রথমে কল করতে দ্বিধা হলেও শেষে ঠিকই উঠতে না পেরে কল দেয় ফিহাকে। আরিফ বাসায় আছে! হয়তো এখন ফিহার সাথেই রুমে আছে। স্বামী স্ত্রী মাঝে সে ঢুকতে চাইনি। কিন্তু তার কাছে এর চেয়ে বিকল্প কোনো রাস্তা নেই। কারণ জুইকে না হলেই নয়। সেতো অন্য মেয়েকে চাইছে না তাই না। নিজের স্ত্রীকেই চাইছে। তাই খানিকটা দ্বিধা নিয়ে ফিহাকে কলটা করল আয়ন। প্রথমবার রিসিভ না হলেও দ্বিতীয় বার ঠিকই রিসিভ করল ফিহা। ঘুম জড়ানো কন্ঠে ফিহা ‘হ্যালো ‘ বলতেই আয়ন সেটার উত্তর না করে বরং দ্বিধায় এক নিশ্বাসে বলে উঠে…

—” জুইকে নিচে পাঠা ফিহু। আমি রাস্তায় দাড়িয়ে আছি। আর খবরদার যদি জুই না আসে, তাহলে দশ মিনিট পর এগারো মিনিটে মাথায় তোর শশুর বাড়িতে সোজা ঢুকে বউকে কাঁধে তুলে নিয়ে আসব। আমাকে ভালো করেই চিনিস তুই। একটা কথাও নড়চড় হবে না বলে দিলাম।

এক নিশ্বাসে করে গুলো বলে ঠাস করে ফোন কেটে দিল আয়ন ফিহার মুখের উপর। বিস্ময়কর, হতবাক ফিহা হতবুদ্ধি হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকল। হঠাৎ কি হল তার ভাইয়ের কি? এমন করল কেন? আর এতো রাতে এখানেই বা কি করছে? জুইকে কেন চাই তার। হতবুদ্ধি ফিহা এলোমেলো ভাবনায় হঠাৎ ঠোঁট কামড়িয়ে হেঁসে উঠে। আয়নের ব্যাপারটা বুঝে কম্বলের নিচ থেকে বের হতে চাইল। কিন্তু নিজের অবস্থা পরিলক্ষিত করে খানিকটা লজ্জায় আরিফের ঘুমন্ত মায়াবী মুখটার দিকে তাকাল। লাজুকতার নেয় হেঁসে ঠোঁট ছুঁয়ায় আরিফের উম্মুক্ত বুকে। এতে আরিফ হালকা নড়েচড়ে দু’হাতে বেশ ঝাপটে ধরল ফিহাকে নিজের বুকে। ফিহা আস্তে ধীরে আরিফের বাঁধন ছাড়াতে চাইলে টান পরলো আরিফের বাহুবন্ধনে। হালকা ঘুমে চোখ মেলে তাকায় আরিফ। ফিহাকে জেগে থাকতে দেখে ঘুমন্ত চোখ কুঁচকে বলে…

—” কি ব্যাপার জেগে আছো যে?
—” একটু উঠবো তাই।
—” কেন?

ফিহা মিথ্যা বলে বললো…

—” মায়া কল করেছিল। জুইকে নাকি মিস করছে। কথা বলতে চাই। আমি ওদের কথা বলিয়ে দিয়ে আসছি। তুমি ঘুমাও।

ফিহার কথায় অবিশ্বাস করলো না আরিফ। তবে খানিকটা দ্বিধায় বলল…

—” এতো রাতে কথা বলতে চাই কেন?

—” হবে হয়তো কোনো কাজে। তাছাড়া তুমি তো জানো ওরা দুজন কতটা গলায় গলায় ভাব একে অপরের। এজন্য কথা বলতে চাইছে মায়া। আমি ফোনটা জুইকে দিয়ে চলে আসব। বেশিক্ষণ লাগবে না।

আরিফ আর না করল না। শুধু একটু করে বলল…

—” ঠিক আছে যাও। তবে তাড়াতাড়ি এসো।

—” আচ্ছা। তোমার পাশ থেকে গেঞ্জিটা দাও।

ফিহার কথা মতো আরিফ ঘাড় ঘুরিয়ে আবছা আলোয় হাতড়ে নিজের কালো টি-শার্টটি তুলে দেয় ফিহার হাতে। ফিহা সাচ্ছন্দ্যে সেটি পরে খাট ছেড়ে নেমে গেল জুইয়ের রুমের উদ্দেশ্যে। সাদা সেলোয়ার সাথে কালো আরিফের টি-শার্ট পড়ে চুল খোপা করতে করতে দরজা খুলে গেল পাশের রুমে। খটখট শব্দ করে বেশ কয়েক বার ডাকলো জুইকে। একটা সময় জুই ঘুমে ঢুলুঢুলু হয়ে দরজা খুলতেই ফিহা কর্ড়া গলায় বলে..
—” ফোন কই তোর?

ফিহার কথা বুঝল না ঘুমে নিভিয়ে পরা জুই। দরজা পার্ট ধরে দাঁড়িয়ে ঘুমন্ত চোখ টেনে খুলতে খুলতে বলল…
—” কিসের ফোন ভাবি?
—” তোর ফোন।

সম্পূণ ঘুমন্ত চোখে মেলে তাকিয়ে জুই বলে…

—” কি জানি কোথাও রাখছি মনে হয়। কেন তোমার ফোন লাগবে?

—” আমার না তোর লাগবে বলদি। আমার ভাইকে ঘন্টা পর ঘন্টা এই ঠান্ডা মাঝে রাস্তায় দাড় করিয়ে আরামে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিস তুই? এই তোর বিচার? স্বামীর জন্য মন কাঁদে না বুঝি?

ফিহার কথায় চমকে উঠে জুঁই তৎক্ষনাৎ বলে…
—” মানে?

—” মানে আয়ন ভাই তোর জন্য নিচে দাড়িয়ে আছে। যাহ দেখা করে আয়।

হতবাক জুই থমকে দাঁড়িয়ে রইল ফিহার কথা শুনে। এতো রাতে ডাক্তার সাহেব কেন আসল সেটাই বুঝতে পারছে না সে। তারপর আবার দেখা করতে হবে নাকি? কিন্তু কেন? জুইয়ের নির্বাকতা দেখে ফিহা ফের তাড়া দিয়ে বলল…

—” কি হলো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যাহ! নয়তো আয়ন ভাই যেকোনো সময় উপরে চলে আসবে। ভাই এতো রাতে তোর জন্য উপরে আসলে নিশ্চয়ই ব্যাপারটা ভালো দেখাবে না কারও চোখে। তাছাড়া তোর ফোন চেক কর। হয়তো ভাই কল করছে এখনো।

ফিহার কথায় জুই দৌড়ে গেল পড়ার টেবিলের দিকে। ড্রয়ার থেকে আয়নের দেওয়া ফোনটি হাতে নিয়ে স্ক্রিনের লাইট জ্বালাতেই দেখল পয়ষট্টি বার ফোন কল’স এসেছে ‘ডাক্তার সাহেব ‘ নামক সেইভ করা নাম্বারটি থেকে। বিস্মিত হতবুদ্ধি জুই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। আয়নের এতো এতো কল দেখে অপরাধী চোখে তাকায় দরজা দাঁড়িয়ে থাকা ফিহার দিকে। ফিহা জুইয়ের অপরাধীতা বুঝপ চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল…

—” যাহ তুই! আমি আছি, এদিকটা সামলে নিব।

ঘন কুয়াশায় মাঝে বাড়ির গেইট খুলে দেয় ফিহা। ইতস্তত জুই গায়ে হলুদ ওড়নাটা চাদরের নেয় জড়িয়ে মাথায় টানল। বেখেয়ালি ভাবে শীতের কাপড়ও নিতে ভুলে গেল। ভাসা চোখে সামনে তাকাতেই অদূরে রাস্তায় ল্যামপের আবছা আলোয় সাদা গাড়িটি দেখতে পেল। কনকনে ঠান্ডায় আরও একটু আগাতেই দেখল আয়নের ছাড়া মূর্তিটিকে। এদিকেই তাকিয়ে আছে। ইতস্তত জুই হাসফাস করে এগিয়ে গেল সেদিকে। আয়নের সামনে দাঁড়িয়ে নমনীয় কন্ঠে বলতে চাইল…

—” আপনি এতো রাতে এখ…

জুঁই কথা শেষ করার আগেই কব্জিতে টানল পড়ল। জুই চমকিত ভঙ্গিতে চোখ তুলে তাকানোর আগে গাড়ির দরজা সাথে ঠেসে ধরল আয়ন। হতবিহ্বল জুই কিছু বলবে তার আগেই দাঁতে দাঁত পিষে আয়ন। তেতু কন্ঠে বলে…

—” ফোন কই থাকে তোমার? কতবার ফোন করেছি আমি?

শুকনো ঢুক গিলে গলা ভিজানোর সময়টা পেল না জুই। আয়ন ওকে তুমি’ তুমি’ করে সম্মোধন করছে তাও রাগে? লোকটা প্রচন্ড রাগে ওকে তুমি করে ডাকল? এই তুমি নামক শব্দটাতেও যেন গভীর অধিকার বোধ প্রকাশ পেল। জুই ঠিক বুঝতে পারল। তবে বুঝতে পারল না আয়নের হঠাৎ এখানে আসার কারণটা। জুই হাতের বাহুতে ব্যথা অনুভব করলেও সেটা প্রকাশ করল না। বরং নরম থেকেই বলল…

—” ফোন সাইলেন্ট করে ড্রয়ারে তালা মেরে রেখেছিলাম। বুঝতে পারিনি আপনি এতো কল দিবেন। সরি!

—” তোমাকে ফোন আমি ড্রয়ারে তালা মারার জন্য দিয়েছিলাম? একটা দিন যেচে আমাকে ফোন করে খবর নিয়েছ? ভালো আছি কিনা নিজ থেকে জানতে চেয়েছ? এতো অবহেলা কেন আমার বেলায় জুই? চোখে পড়ে না আমাকে? নাকি স্বামী বলে অস্বীকার করতে চাও? কোনটা?

আয়নের পরপর রাগান্বিত কন্ঠে কেঁপে উঠছে জুঁই। আয়নকে এর আগে রাগতে দেখেনি তা নয়। দেখেছে! বরং এর থেকে বেশি রাগতে দেখেছিল যেদিন জুইয়ের সাথে আয়নের বিয়েটা প্রকাশ পেয়েছিল সেদিন। কিন্তু সেই রাগটা একা জুইয়ের উপর সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং সবাই সাথেই ছিল। কিন্তু আজ যেন আয়নের অধিকার বোধের রাগটা একান্ত জুইয়ের জন্য বরাদ্দ। পদে পদে চমক যেন পাচ্ছে জুই আয়নকে নিয়ে। আয়ন এইভাবে ওকে বলবে সেটারও ধারণা ছিল না। ওর বুকের চিনচিন ব্যথাটা এবার যেন তীব্র প্রহর অনুভব করল নিজের মাঝে। এমনটা না জুই আয়নের খবর নিতে চাইনি। বেশ চেয়েছিল এতদিন কল করে একটা খবর নিতে। কিন্তু আয়ন ব্যস্ত আছে বা জুইয়ের কলে যদি বিরক্ত হয় সেজন্য চেয়েও কল করতে পারেনি সে। বুঝাতে পারেনি নিজের দূর্বলতাটাকে। শুকনো গলায় জুই অপরাধী মুখে বলল…

—” আমি আপনার খবর নিতে চেয়েছিলাম ডক্টর।
কিন্তু আপনি বিরক্ত হবেন ভেবে কল করা হয়নি আমার।

জুইয়ের কথায় আয়ন কিছুটা নরম হলেও তেজ কমলো না। বরং আগের নেয় রাগ দেখিয়ে বলল আয়ন..

—” আমি বলছি আমি বিরক্ত হবো আপনার কল করাতে? বলি নাই। বরং আপনাকে ফোনটা দিয়েই ছিলাম আমাকে ফোন করতে। জ্বালাতন করতে। কিন্তু আফসোস! আপনি স্বামী জ্বালাতন বুঝেন না। আপনার এই বেখেয়ালিপনা আচরণ আমাদের সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে রেখেছে। আমার সবকিছু সরাসরি বলার পরও কিসের এতো চিন্তা আপনার? কেন সহজ হচ্ছে না আমার সাথে। কেন আমার হৃদয়ে আপনার নামে জায়গায় করে নিচ্ছেন না। এতো দূর দূর আচরণ করলে আপনার মনে হয়, আপনি আমার মনে আপনার নাম কখনো লিখতে পারবেন? সম্পর্ক এতো সহজ? পরিশ্রম না করলে কোনো কিছু পাওয়া যায়? ভালোবাসা! বিশ্বাস! ভরসা অর্জন করতে তো অপর পাশে ব্যক্তিটিকে বুঝতে হয়, সময় দিতে হয়, আগলে রাখতে হয়, সবসময় পাশাপাশি থাকতে হয়। তাহলে সম্পর্কে দৃঢ়তা বাড়ে। গভীর হয়। অথচ আপনি আমার প্রতি উদাসীন। কিন্তু কেন জুই? আজ পযন্ত শ্রম ছাড়া কিছু পেয়েছেন? আপনি যে লেখাপড়া করছেন সেটা কি পরিশ্রম ছাড়াই পাস করছেন? রোজ যে খাদ্য খাচ্ছেন সেটা কি শ্রম ছাড়াই পাচ্ছেন? ফসল ফলানো, বাজার করা, রান্না করা, এমন কি মুখে তুলতেও তো শ্রম করতে হয়। তাহলে সেখানে আমার বেলায় গুরুত্ব কোথাই জুই বলেবেন? আপনারই তো বোন মায়া! সম্পর্কে প্রতি তার টান ষোল আনা! সবাই ওর বিয়েটা ভাঙ্গতে চেয়েছিল। এমনকি রিদ নিজেও মায়াকে নিজের জীবনে জড়াতে চাইনি। দূরে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু মায়া খাল ছাড়েনি। রিদের শত আঘাত সয্য করেও রিদকে ভুলে গিয়ে দূরে যেতে চাইনি। বরং সবসময় রিদের আশেপাশে ঘুরঘুর করেছে। রিদের দেওয়া কষ্ট সয্য করে রিদের সাথেই থেকেছে। মায়ার নিজের সম্পর্কের প্রতি এতোটা শ্রম থেকেই আজ রিদ বাঁধ্য হলো ওর কাছে হার মানতে। মায়া নিজেকে রিদের হ্যাবিটসে পরিণত করেছে বলেই, আজ মায়া যতটা না রিদকে চাই তার থেকে হাজার গুণ রিদ চাই ওকে। আর এই সবটাই হয়েছে মায়ার চেষ্টায়। কিন্তু আপনি কোথাই জুই? আমি আমাদের সম্পর্কটা সহজ করতে চাইছি কিন্তু আপনি সেখানে কোথাও নেই। ভালোবাসায় সফল তারাই হয় যারা ভালোবাসার প্রতি নির্লজ্জ হয়ে অপর জনকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু আপনি আমার প্রতি উদাসীন। ভিষণ উদাসীন! আমার পিছনে আপনার মহা মূল্যবান সময়টা নষ্ট করতেই চাইছেন না। দেরি হলেও আজ বুঝলাম আপনি আমার না জুঁই। আমাকে আপনার লাগবে না। আপনি ভালোই আছেন। হয়তো আমাকে আপনার পছন্দ হয়নি এজন্য এমন আচরণ করছেন। আপনার তো আবার ঝামেলা বিহীন ফিয়েন্সে আছে ভালোবাসা জন্য। থাকুন আপনি আপনার হবু বরকে নিয়ে গেলাম আমি। রাত বিরাতে এসে আর জ্বালাব না আপনাকে। ফিহাকে দিয়ে আপনার কথা মতোই গোপনীয়তা রক্ষা করে ডিভোর্সের কাগজটা পাঠিয়ে দিব। আপনি সাইন করে দিবেন।

মায়ার প্রতি গুমোট ফিলিং আর জুঁইয়ের উদাসীনতাটা প্রচন্ড বিতৃষ্ণার বিদঘুটে ফিলিংস হচ্ছে আয়নের মনে। যার জন্য নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে বলে গেল সবকিছু একের পর এক। ভিতরকার তেতু ফিলিংসটা যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তার। সবকিছুই সয্য বাহিরে যাচ্ছে জুইয়ের উদাসীন ভাব দেখে। আয়নকে পছন্দ না হলে প্রথমে বলতে পারতো! আয়ন মেশার চেষ্টা করতো না। কিন্তু না কিছু বলেনি। উল্টো আয়নের সবকিছুতে নিরব সম্মতি দিয়ে গেল। সম্মতিই যখন থাকবে তাহলে অধিকার ফলাচ্ছে না কেন? কেন আয়নের ভিতরকার অবস্থা জানতে চাই না। আচ্ছা জানতে না চাক! কিন্তু আয়নকে মায়া নামক গুমোট ফিলিংস থেকে বের হতে সাহায্য তো করতে পারে। এমনটা না যে জুই কিছু জানে না আয়ন মায়াকে পছন্দ করতো সেটা নিয়ে। সবিই জানে! আয়ন নিজের মুখে কখনো জুইকে না বললেও আয়নের বিশ্বাস সে জানে। তার আচরণে সেটা প্রকাশ পায়। তাছাড়া ফিহার কাছ থেকে জুই সত্যিটা শুনেছে। ফিহা নিজে বলেছে আয়ন মায়াকে ভালোবাসত এই বিষয়ে নিয়ে জুইকে। এতো কিছু জানার পরও জুইয়ের চুপ থাকাটা, প্রকাশ করে সে আসলে আয়নকেই চাই না। আয়ন পুনরায় অন্ধকার পরে হাঁটছে। মায়ার মতো হয়তো জুইও অন্য কাউকে পছন্দ করে। সম্ভবত নিজের ফিয়েন্সে কে। আয়ন রাগে চেহারায় তিক্ততা প্রকাশ করে জুইকে ছেড়ে দিল। শক্ত জুই বরফের নেয় গলে গেল আয়নের সামনে। হঠাৎ করেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠল নত মস্তিষ্কের হয়ে। আয়ন বিরক্তি চোখে জুইকে দেখে বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানল। হয়তো জুই আয়নের ব্যথা দেওয়াতে কাঁদছে ভেবে একটু নরম হল আয়ন। শান্ত কন্ঠে ফের বলল…

—” আই এম সরি জুই! আপনাকে ব্যথা দেওয়াটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। রাগে নিজেকে সংযম করতে পারিনি। আপনার আমাকে পছন্দ না এটা আগেই বলতে পারতেন। আমি এতো দূরে অবধি আপনাকে টানতাম না। এগেইন সরি! যান, আপনি বাসায় চলে যান।

আয়ন আর দাঁড়াল না। কান্নারত জুইকে ফেলে আয়ন দুই কদম এগিয়ে গাড়ির দরজা টেনে খুলতেই পিছনে ঝাপটিয়ে ধরে জুই। আয়ন থমকানো ভঙ্গিতে দাঁড়াতেই জুই দু’হাতের বেড়িয়ে আয়নের পেট জড়িয়ে ধরে অস্থির ভঙ্গিতে কান্নায় ফুপায়। আয়নের পিঠের উপর কপাল ঠেকিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বলে জুঁই…

—” আমি আপনার প্রতি উদাসীন না ডক্টর বাবু! বরং ভিষণ মনোযোগী আপনাকে নিয়ে। কিন্তু মুখে বলতে গেলে কোথাও যেন থেমে যায় আমি। আমার নিজের পরিবার নেই। মায়ার পরিবার আমার হলেও সমাজ আমাকে কটাক্ষ করে এতিম বলে। অনেকবার তো আমার জন্য বিয়ে এসেও ভেঙ্গে গেছে আমার নিজস্ব পরিবার নেই বলে। এই সমাজের যাদের নিজস্ব পরিবার নেই তার সবথেকেও যেন কিছুই নেই। এমনকি এই নিয়ে আমাকে অনেক কথায় শুনতে হয় চলতে ফিরতে। আমাকে বলে আমি কাকাদের বাড়িতে আশ্রিত থাকি। আশ্রিত এতিম মেয়েদের নাকি বড় ঘরের ছেলেরা বিয়ে করে না। দয়া দেখায়। এই কথা গুলো কেউ আমার পরিবারের সামনে বলতে না পারলেও তাদের অগোচরে সবাই ঠিকই এতিম বলে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকায়। এজন্য আমি নিজেকে সবসময় শক্ত রাখি, মনের অনূভুতি গুলো প্রকাশ করতে ভয় হয়। এই ভেবে যেন আমাকে নিয়ে মানুষ অন্য কোনো কথা রটাতে না পারে। আমি আপনার প্রতি দূর্বল ছিলাম ডক্টর বাবু। আমাদের বিয়ের পর থেকেই আপনার প্রতিটা জিনিস আমাকে ভিষণ টানতো কিন্তু কখনো ভয়ে বলতে পারিনি পরিস্থিতির দায়ে। হসপিটালের যখন আপনি ডিভোর্সের কাগজ দেখালেন তখন সবথেকে বেশি কষ্ট আমিই পেয়েছিলাম সেদিন। কিন্তু শক্ত মনের হওয়ায় আপনাকে সেটা বুঝতে দেয়নি। ধীরে ধীরে আপনার আমার প্রতি পরবর্তীত আচরণ গুলোও আমাকে আনন্দ দিত! মনে নতুন অনূভুতি জাগাত কিন্তু নিজের কমতির জন্য আপনাকে কিছু বলতে পারতাম না। আমি এতিম বলে যদি আপনিও অবজ্ঞা করেন এই ভেবে সংযম থাকতাম। সারাদিন ফোন চেক করি আপনি কখন কল করবেন। কখন একটু করে আপনার কন্ঠ শুনব। আজও তাই করছিলাম কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে কিভাবে যেন চোখ লেগে যায় আর বলতে পারিনা। আমার মনের ভয়টার জন্য কখনোই আপনার সাথে সহজ হতে পারিনি ডক্টর। বলতে পারিনি আমি সত্যিই আপনাকে চাই। অনেক বেশি চাই। আমার ডিভোর্স চাই না। আমার শুধু আপনাকেই চাই!

ঠোঁট হাসি, বুক শান্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে চাইল আয়ন। জুইয়ের প্রতিটা কথায় যেমন শান্তি অনুভব করেছে ঠিক তেমনই অবাকও হয়েছে। জুই আয়নকে নিয়ে এতটা ভাবে সেটার ধারণা ছিলনা তার। আজ যেন সত্যি মনে শান্তি পাচ্ছে সে। আয়ন পেটের উপর রাখা জুইয়ের হাত দুটো আলতো ধরে ঘুরে দাড়াতেই জুই পিঠ থেকে মুখ উঠিয়ে হুমড়ি খেয়ে আছড়ে পরলো আয়নের প্রশস্ত বুকে। মুখ চেপে ভেজা গলায় বলল….

—” প্লিজ যাবেন না। আমি থাকতে চাই না আপনাকে ছাড়া। প্লিজ!

আঁজলে দু’হাতে জড়িয়ে নিল জুইকে নিজের মাঝে আয়ন। একহাতে পিঠ জড়িয়ে অন্যহাতটি রাখল জুইয়ের মাথায়। ভরসার গলায় আয়ন বলল…

—” যাচ্ছি না জুই। আমারও আপনাকে চাই। তবে সমাজের নোংরা কথা গুলো ইগনোর করুন। সবাই এক না জুই। আপনার পরিবার না থাকার পিছনে আপনি দোষী নন। তাছাড়া আপনাকে ভালোবাসা জন্য আদর্শ একটা পরিবার আছে। যারা আপনার কেয়ার করে, ভালোবাসে, আগলে রাখে, আপনি শুধু তাদের নিয়ে ভাবুন বাকি খারাপ চরিত্রের মানুষ গুলোকে এরিয়ে যান তাহলেই হবে। তবে কিছু জানতে চাই জুঁই। সত্যিই কি আপনি আমার সাথে সংসার করতেন চান?

মৃদু স্বরে সম্মতি জানায় জুঁই…
—” হুমম।

—” বুঝে শুনে উত্তর করবেন জুই। আপনার হ্যা কিন্তু আমার পরবর্তী পদক্ষেপ হবে। আমি সামনে বাড়লে কিন্তু এরপর আপনাকে পিছিয়ে যেতে দিব না। জোর করে বেঁধে হলেও আমার কাছে রাখব। তাই বলছি, শিওর তো আপনি আমার সাথে থাকতে চান সারাজীবন?

আয়নের কথায় সময় নিল না জুঁই। তৎক্ষনাৎ মৃদু স্বরে ফের সম্মতি দিয়ে বলে…
—” হুমম

ঠোঁট প্রসারিত করে দারুণ হাসল আয়ন। ঢিল থাকা হাতের বাঁধনটা শক্ত অনলে ধরলো জুইকে নিজের সাথে। দৃঢ় বন্ধনে নাক চেপে গেল আয়নের বুকের সাথে জুইয়ের। তারপর উফফ করল না জুই। আয়নের উষ্ণ বুকে মিশে রইল। মিনিট খানিকটা সময় যেতেই নিস্তব্ধ পরিবেশ ভেঙ্গে প্রথম কথা বলল আয়ন। ভারি দুষ্ট কন্ঠে আওড়ায়।

—” জুই আপনি তো ভারি রোমান্টিক হয়ে গেছেন! আপোষই শীতময় রাতে জড়াজড়ি করছেন। তাও আবার আমার মতো নিরীহ ছেলের সাথে। আপনার কি শীত বেশি লাগছে নাকি সিস্টেম বেশি চলছে জুই। কোনটা?

আয়নের কথার মর্ম বুঝতেই লজ্জায় ছিটকে দূরে সরতে চাইল জুই। কিন্তু আয়নের শক্ত বাহুর বেষ্টনীতে আটকে থাকায় সেটা সম্ভব হলো না। লজ্জা শরীরের কম্পন সৃষ্টি হতেই জুই ছটফট করেও যখন ছাড়া পেল না তখন ঠাস করে কামড় বসায় আয়নের বুকে। আয়ন ব্যথা পেল। আহ’ শব্দও করল কিন্তু তারপরও জুইকে ছাড়ল না। বরং জুইয়ের লজ্জা বাড়িয়ে ফের বলল…

—” মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আমার ইজ্জতের উপর হামলা করছেন কেন জুই? আপনি তো সাংঘাতিক মহিলা টাইপের মেয়ে। এই বুঝি আপনার মনে ছিল। আমার দিকে কুদৃষ্টি দেম। রাত বিরাতে আমার ভার্জিনটি নষ্ট করার ধান্দায় থাকেন। আমা… আহ’

জুই ফের কামড়ে ধরল আয়নের বুকের পাশ। একটা পর একটা নির্লজ্জ কথাবার্তা বলে যাচ্ছে এই অসভ্য ডাক্তার। সে কেন নজর দিবে একটা পুরুষ মানুষের ইজ্জতের দিকে? যাতা কথা বলে শুধু জুইকে হেনস্ত করাই এই লোকের কাজ। জুই ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করে বলল…
—” ছাড়ুন আমায়!

—” বললেই হলো ছেড়ে দিব? এতো সোজা! আমাকে মুডে এনে আপনাকে পালিয়ে যেতে দিব। শোধবোধ বলতে একটা কথা আছে না জুঁই । দুই কামড়ের বদলে চার কামড় তো প্রাপ্য আমার কাছ থেকে আপনি। চলুন হিসাব নিকাশ কষি এবার।
~~
আয়নের গাড়িটি এসে থামল আশুগঞ্জ উজানভাটি হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টের সামনে। যেখানে পূর্ব থেকেই তার জন্য রুম বরাদ্দ ছিল। আয়ন বের হয়ে জুইকেও বের করলো গাড়ির দরজা খুলে। ইতস্তত জুই প্রচন্ড অস্তিত্ব বোধ করে যখন দেখল আয়নের গাড়িটি এই মধ্যে রাতে হোটেলে আসতে। বিষন্ন জুইয়ের ডানহাতটি নিজের বামহাতে চেপে ধরে সামনে এগোল আয়ন। চারপাশটা জুইয়ের বেশ পরিচিত। নিজের এলাকা বলে এখানে আশেপাশে পরিচিত মানুষজনও থাকতে পারে এজন্য ভয়ও পেল সীমাহীন। ভয়ে তীব্র উত্তেজনায় জুই মাথার ঘোমটা টেনে নিল আরও একটু। মুখে ওয়ান টাইম মাক্সটি পরা। আয়ন পরিয়েছে। আয়ন জুইকে নিয়ে কাউন্টার ডেক্সে থেকে রুমের চাবি নিয়ে গেল নিজের জন্য বরাদ্দ কৃতি রুমটির মধ্যে। রুমের লক খুলে ভিতরে প্রবেশ করেই আয়ন রুমের লাইট জ্বালিয়ে জুইয়ের দিকে তাকাল। প্রচন্ড অস্তিত্বে জুইয়ের কপালে চিকন ঘাম আয়নের চোখে পরতেই কপাল কুঁচকায় সে। জুইয়ের নার্ভাসনেসটা বুঝতে না পেরে পকেটের থেকে ওয়ালেট, ফোন বের করে খাটের পাশের ছোট টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল…

—” জুই আপনি কি কোনো কারণে নার্ভাস? এনেথিং রঙ?

চমকে তাকাল আয়নের দিকে জুই। এতক্ষণ যাবত বেখেয়ালি ভাবে হোটেলের ভিআইপি রুমটা পযবেক্ষণ করছিল সে। আয়নের হঠাৎ ডাকে চমকে ধ্যান ভাঙ্গে। আয়নের দিকে আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে শুকনো ঢুক গিলল। সে নার্ভাস থেকে এই মূহুর্তে ভয়ার্ত বেশি। আয়নের বলাতে এখানে এসেছে ঠিক। তবে জুইয়ের বিন্দু মাত্র ধারণা ছিল না আয়ন তাঁকে হোটেল রুমে নিয়ে আসবে। জুই ভেবেছিল হয়তো রাতের নির্জন পরিবেশে দুজন একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে। এবং সকাল হওয়া আগে ওকে বাসায় পৌঁছে দিবে। কিন্তু এখন আয়ন ওকে হোটেল রুমের নিয়ে আসাতে প্রচন্ড অস্তিত্ব বোধ করছে ওহ। ভয়ও পাচ্ছে। আয়নকে ভালোবাসে না তা না। কিন্তু অসময়ে হুটহাট করে কিছু করতে চাই না ওহ। সবটাই সুন্দর ভাবে চাই। পরিবারকে জানিয়ে সামাজিক মোতাবেক ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে চাই। এখন এসবের জন্য প্রস্তুত নয় সে। জুই ভয়ার্ত মুখে করে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল ফ্লোরে। আয়ন নিজের করার প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে এগিয়ে আসল জুইয়ের দিকে। হাতটা বাড়িয়ে জুইয়ের মুখের মাক্স খুলে নিতে চাইলে তৎক্ষনাৎ জুই দু-চোখ হিচে বন্ধ করে এক নিশ্বাসে বলে…

—” প্লিজ প্লিজ আমার এসবের জন্য সময় চাই আমাকে একটু সময় দিন! প্লিজ।

সব কথা অপেক্ষা করে জুইয়ের মুখের মাক্স খুলে হাতে নিয়ে আয়ন কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করলো….

—” কিসবের জন্য সময় চাই জুই? কিসের কথা বলছেন? আর এতো সময় নিয়ে কি করবেন? একটা মা…

আয়নকে বলতে না দিয়ে জুই অস্তিত্বে হাসফাস করে বলল….

—-” আমার কিছু সময় লাগবে ডক্টর। এইভাবে এলোমেলো ভাবে সম্পর্ক করলে সবাই খারাপ চোখে দেখবে আমাদের। তাছাড়া এসবের জন্য আমি এখনো প্রস্তুত নয়।

জুইয়ের কথার সারাংশ সারমর্ম বুঝল আয়ন। হতবুদ্ধ আয়ন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল জুইয়ের দিকে। সে আসলে মাক্স খুলতে এতো সময় নিবে কেন এই কথাটি বলতো। অথচ সামান্য পিচ্চি একটা মেয়ে কত দূর অবধি চলে গেল। মেয়েটাকে এতো বেশি বুঝতে কে বলে? একটু কম বুঝলে হয় না? তখন আয়ন নাহয় হাতে কলমে শিখিয়ে পড়িয়ে নিত। তবে এই বুঝদার বউয়ের বেশি বুঝাতেও মজা আছে। এখন বেশি বুঝার সুবিধাটা নিবে আয়ন। দুষ্ট হেঁসে এগিয়ে গেল আয়ন, ঝুঁকে পরল জুইয়ের মুখের উপর।

—” এই ছিল বুঝি আপনার মনে? সারাদিন আমাকে নিয়ে নেগেটিভ ফিল করেন আর আমার ভার্জিনিটির দিকে কুনজর দেন। ইশশ আমি তো আজ আর ইজ্জত নিয়ে বাসায় ফিরতে পারবো না।

আয়নের কথায় তেলে বেগুনের জ্বলে উঠে জুঁই বলে…
—” মোটেও বাজে কথা বলবেন না। আমি আপনার মতো নির্লজ্জ নয়। বরং আমার মাথায় সবসময়ই সাধু চিন্তা ভাবনা ঘুরে আপনাকে নিয়ে। আমি মোটেও আপনাকে নিয়ে খারাপ চিন্তা ভাবনা করি না। বরং সবসময় ভালো চোখে দেখি আপনাকে।

—” সর্বনাশ জুই! স্বামীকে ভালো চোখে দেখা স্ত্রীদের সিস্টেমে সমস্যা থাকে। তারমানে আপনার সিস্টেমেও সমস্যা আছে?

নিজের কথায় নিজেই ফেসে গেল জুই। চালাক জুই বেকুব বনে গিয়ে আমতা আমতা করে এক আঙ্গুল দেখিয়ে বলে…

—” দেখুন?

আয়ন জুইয়ের মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বলে…

—” দেখান।

আয়নের দৃষ্টি বুঝে হতভম্ব জুই নিজের থেকে ধাক্কা দিয়ে আয়নকে দূরে সরিয়ে কপাট রাগ দেখিয়ে বলল…

—” অসভ্য লোক!

জুইয়ের মুখে অসভ্য লোক কথাটা শুনে আলতো হাসল আয়ন। জুইকে স্বাভাবিক করতে ফের এগিয়ে গেল টেবিলের সামনে। আর কথা বাড়াল না। শুধু হাসল মুড়ে মুড়ে। হাতের ঘড়িটা টেবিলের খুলে রেখে ফোনটা হাতে নিল। জুইয়ের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল…

—” নিন ফিহাকে ফোন করে বলে দিন আপনি সকালে বাসায় যাবেন। ওকে ঘুমিয়ে পরতে বলুন।

—” রাতে বাসায় যাব না আমি?
—” না।
—” যদি বাসায় কেউ আমাকে খুঁজে তাহলে?
—” তাহলে ফিহা সেটা সামলে নিবে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। আপনি শুধু ফোন করে বলে দিন আসতে পারবেন না। বাকিটা ফিহা নিজেই বুঝে নিবে।

জুই কথা না বাড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন নিল। আয়নের কথা গুলোর সঠিক মনে করে ঠিক তাই বলল ফিহাকে। আচার্যের বিষয় হল ফিহা একটা পাল্টা প্রশ্নও করল না জুইকে। এই রাতে কেন বাসায় যাবে না? কোথায় থাকবে কিছুই জানতে চাইল না। বরং সাবধানে থাকিস বলে ফোন রেখে দিল। জুই কথা বলতে বলতে আয়ন ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসল। জুইকে ফ্রেশ হতে পাঠিয়ে রুমে খাবার আনতে বলল । আয়নও আসার সময় খাবার ওর্ডার করে এসেছিল নিচে। আয়ন সোফায় বসে প্লেটে খারার বাড়তেই জুইও ততক্ষণে ফ্রেশ হয়ে আসল। আয়ন খাবারের জন্য জুইকে ডাক দিতেই জুই নাহুচের দ্বিধায় বলল….

—” আমি রাতে খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। আপনি খান! আমি খাব না।

—” রাতে একবার খেলে আবার খাওয়া যায়। আসুন আমার পাশে বসুন। অপেক্ষা করছি আমি।

অস্তিত্বে জুইয়ের আয়নের পাশে বসে অল্প সল্প খেল। আয়ন খেল পেট পুরো। প্রচুর খিদা লেগেছিল তার। দুপুর থেকে না খাওয়া সে। খাওয়াদাওয়া শেষে স্টাফ ডেকে সবকিছু বাহিরের পাঠাল। আয়ন কিছু কারণ অল্প সময়ের জন্য নিচেও গেল। মিনিট দশেকের ভিতর রুমে ফিরে দেখল জুই আশেপাশে কোথাও নেই। ওয়াশরুমের দরজা বাহির থেকে বন্ধ দেখে কপাল কুঁচকে আয়ন। এদিক সেদিক না তাকিয়ে সোজা গেল বারান্দায়। আবছা আলোয় দেখল জুই থাই গ্লাস ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আয়ন নিশ্চুপ হয়ে পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জুইয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে কুয়াশাময় কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলল…

—” জুই আমি আপনার বাবার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে। আমাদের উচিত! এখন তাদের আমাদের সম্পর্কে জানাটা।

জুই চমকে তাকায় আয়নের দিকে। উত্তেজনার ভয়ার্ত গলায় বলল…

—” প্লিজ এখন না। আরও কিছুদিন সময় যাক। বাবা হঠাৎ করে এমন একটা বিষয় শুনলে কষ্ট পাবেন। আমি আমার বাবাকে কষ্ট দিতে পারবো না। মায়ার বিয়েটা সবেমাত্র শেষ হলো। এখন আমি বাবার পাশে না থাকি তাহলে তিনি আরও ভেঙ্গে পরবেন। প্লিজ ডক্টর আরও কিছু দিন যাক। এখন কি বলা ঠিক হবে না বাবাকে।

জুইয়ের কথা বুঝল আয়ন। সদরে মেনেও নিল কিন্তু শর্ত দিল ‘ যতদিন আয়ন জুইয়ের পরিবারকে তাদের বিয়ে বিষয়টা না জানানো হচ্ছে, ততদিন জুই আজকের মতো করে ঠিক এইভাবে রোজ আসতে হবে আয়নের ডাকে এই হোটেল রুমে। জুই তার বউ! সেজন্য তার হোক আছে বলে দাবি করল। কিছু না হোক অন্তত একসাথে ঘুমানোর দাবিটা করল আয়ন। জুই না করতে গিয়ে দ্বিধায় পরে গেল। পুনরায় আয়নের কথার প্যাচে ফেসে গেল। বাঁধ্য হয়ে রাজিও হল। আসবে বলে ওয়াদা ও করল। আয়ন খুশিতে ঠাস করে জুইকে কোলে তুলে নিল। হতভম্ব জুই বিষয়টি বুঝতে বুঝতে আয়ন ওকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পরল। জুইয়ের আবাকতার মধ্যে দিয়েই আয়ন হাত বাড়িয়ে রুমের লাইট নিভিয়ে দুজনের গলা অবধি ব্ল্যাঙ্কেট টেনে নিল। জুইকে টেনে নিজের বুকে নিয়ে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে বলল…

—” ছটফট করবেন না জুই। আপনার পীড়াপীড়িতে আমার সবগুলো শীতের রাত শুকনো মুখে একাকিত্বের কাটছে বউ থাকতেও। তাই এবার থেকে আমি আর সিঙ্গেল ঘুমাব না। মিঙ্গেল যখন হয়েছি তখন তার মজাটাও নিব আমি।
~~
দুপুরে শেষ ভাগ। বিকাল তিনটা। মায়া মন খারাপে আজ কলেজ আসতে হলো। ফিহার বিয়ের পর থেকে পড়াশোনার সাথে দরশন নেই ওর। বিচ্ছেদ, বিয়ে করে পার হওয়া দীর্ঘ দেড়টা মাসের ঊর্ধ্বে কলেজে আসেনি মায়া। তাই আজ বিয়ের পঞ্চম দিনের মাথায় হেনা খান তাড়িয়ে পাঠাল কলেজ। এতে রিদের সম্মতি ছিল মায়ার পুনরায় কলেজ আসা নিয়ে। এমন না মায়া আর পড়াশোনা করতে চাই না। কিন্তু আরও কটা দিন যেত। নিজের বিয়ের আনন্দটা পুরোপুরি শেষ হতো তারপর না-হয় আস্তে ধীরে কলেজে আসতো সে। কিন্তু মায়ার মন খারাপটা কেউ বুঝল না। ধরে বেঁধে এক গাধা বডিগার্ড দিয়ে পাঠাল কলেজে। মায়া সারাদিন মন খারাপে ক্লাস গুলো শেষ করল টিয়া ছায়ার সাথে। রিদকে ভিষণ মিস করছে কেন জানি। তিনটার দিকে মায়ার ক্লাস শেষ হতেই টিয়া ছায়া থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে চড়ে বসল। ডাইভারকে বলে রিদের অফিসের দিকে গেল। উদ্দেশ্য রিদের সাথে দেখা করা। কিছু সময় থেকে ফের বাসায় চলে যাবে। মায়ার পিছন পিছন বডিগার্ডের গাড়িটিও ছুটল। পনেরো বিশ মিনিটের মধ্যে রিদের অফিসেও পৌঁছে গেল। মায়া গাড়ির থেকে নেমে কাঁধে নিজের কলেজ ব্যাগটি চাপিয়ে এগোল সামনে। লিফ্ট ধরে তিন তলায় উঠে ডানে মুড়ল। রিদের অফিসটি মায়ার বেশ চিনা। এর আগেও দুবার এসেছিল এখানে হেনা খান ও আরাফ খানের সাথে। তাই জানা আছে কোথায় কি। দুপাশে সারিবদ্ধ ভাবে রাখা ডেস্কে বসে অফিসে স্টাফরা কাজ করছিল। হঠাৎ হাঙ্গামাই তাদের মনোযোগ নষ্ট হয়। চোখ তুলে তাকাতেই দেখল দুজন অফিস পিয়ন একটি বোরখা পরিহিত মেয়েকে আটকাচ্ছে সামনে যেতে। বারবার মেয়েটির হাত ধরতে চাইলে মেয়েটি পিছিয়ে যাচ্ছে, নিজের হাত তাদের কাউকে ধরতে দিচ্ছে না। তাই পিয়ন গুলো ব্রাউন রঙ্গা মোটা লাটিয়ে দেখিয়ে মেয়েকে মরার উদ্দেশ্য তাড়া করে বের করে দিতে চাচ্ছে অপরিচিতা ভেবে। কিন্তু মেয়েটি যেতে চাইছে না বলেই এতো হাঙ্গামা হচ্ছে সেখানে। অফিসের উপস্থিত স্টাফরা সবাই কাজ ছেড়ে সেদিকেই তাকিয়ে আছে আর কৌতুহল বশত কানাখুসা করছে। মায়া বারবার বলছে সে ভিতরে যাবে রিদের সাথে দেখা করবে। সে রিদের স্ত্রী। কিন্তু মায়ার কথা বিশ্বাস করছে না পিয়ন গুলোর দু’জনের একজনও। তারা জানে রিদ খান বিয়ে করেছে তবে মায়াকে নয়। বরং মেহু আব্দুলাকে। অত্যাধুনিক মর্ডান মেয়ে মেহু আব্দুলকে। মেহু নিজেই তো অফিসের সবার কাছে রিদের গার্লফ্রেন্ড ও ভবিষ্যৎ বউ বলে দাবি করেছিল। জানিয়ে ছিল তারা বিয়ে করবে খুব শিগগির। তাই হলো! রিদের সাথে মেহু আব্দুলারই বিয়ে হল। যদিও তারা কেউ মেহুকে রিসিপশন পার্টিতে দেখেনি বউ হিসাবে কিন্তু তাতে কি? জানে তো মেহুই রিদ খানের বউ। তাছাড়া বোখরা পরিহিত টাইপের কোনো মেয়েকে কখনোই একজন উচ্চ বিলাসিহীন গ্যাংস্টা বউ বানাবে না। নিশ্চয়ই মেয়েটি মিথ্যা বলছে তাদের। নয়তো কোনো শত্রুর পক্ষে হয়ে মেয়েটি তাদের এই অফিসে ঢুকতে চাইছে। তাই মেয়েটিকে সহজে ছেড়ে দিলে রিদ খান রেগে যেতে পারে তাদের উপর। তাই সাবধানতা অবলম্বন করে মায়াকে আরও আটকে দেয়। যেতে দিচ্ছে না ভিতরে। মায়াও নিজের চেহারা তাদের দেখাচ্ছে না পযন্ত। যার ফলে সবকিছু তাল গোল করে ফেলে সবাই। মায়া যদি অফিস বয়দের নিজের চেহারাটা দেখাতো তাহলে এতোটা তালগোল হতো না পরিস্থিত। কারণ তারা সবাই মায়াকে চিনি হেনা খান ও আরাফ খানের সাথে এই অফিসে আসতে দেখেছি দুবার। কিন্তু তখন মায়া বোখরা পরতো না। সাধারণ কলেজ ড্রেস আসতো। হাঙ্গামায় পরিস্থিতি বেগতিক। অফিসের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে দেখে একজন বয়স্কর পিয়ন লাটি বাড়িয়ে ভারি মারল মায়ার বাহুতে। মায়া ব্যথায় অপমানে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে কিন্তু পিছিয়ে যায় না। এবার বিশৃঙ্খলা বেশি হওয়া বেশ কিছু স্টাফ এলোমেলো ভাবে উঠে পরল। এগিয়ে গেল সেদিকে। ভিড় জমাল। মায়া অপমানে ঘুরে মাথা নত করে কাঁদতে লাগল। মায়ার সাথে আগ্রত বডিগার্ডরাও সাথে আসেনি সবাই নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। পরিস্থিতি যখন খারাপ তখন রিদ ও আসিফ বের হয়ে আসে কক্ষ ছেড়ে। বিরক্তিতে মেজাজ ছিটকে আছে রিদের। অথযা অকারণে কাজের বিঘাত পছন্দ না তার। কিন্তু সুরগোলের জন্য বারবার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে তার। বাধ্য হয়ে বের হলো কি হয়েছে দেখতে। কিন্তু অফিসের স্টাফদের এলোমেলো হয়ে সামনে ভিড় জমাতে দেখে রাগে কটমট করে তাকায় সেদিকে। যারা যারা রিদের আগমন বুঝেছে তারা সবাই ছিটকে দৌড়ে গিয়ে নিজেদের ডেস্কে বসে কাছে মনোযোগ হতে চাইল। রিদ রাগে কটমট করে সামনে দিকে এগোয়। ছোট খাটো ভিড়ে জন্য স্পষ্ট বুঝতে পারছে না কিছু। কিন্তু পিয়নের ধমকানিতে বুঝল কাউকে শাসানোর হচ্ছে জোর তালে। রিদের পিছন পিছন আসিফ এগোই। পিয়ন গুলোর একজন ফের রাগান্বিত হাতে লাটি সাহায্যে মায়াকে ধাক্কা মারলো বের করে দেওয়ার জন্য। মায়া কাঁচের দরজার সাথে মিশে যেতেই রিদের চোখে পড়ল সবটা। স্পষ্ট হলো ছোট ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেগুনী রঙ্গা বোরখা পরিহিত মায়াকে। রিদ চমকায়। একজন পিয়ন ফের মায়াকে লাটিয়ে উঠিয়ে মারতে চাইলে মূহুর্তে চিৎকার করে খাক ছাড়ল রিদ ‘হেই ‘।

উপস্থিত সবাই কেঁপে উঠে পিছনে ফিরে তাকাতেই রিদ মূহুর্তেই ছুটে গেল সেদিকে। একহাতে মায়াকে ঝাপটে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে অপর হাতটি চালাল মায়াকে আঘাত করা পিয়নটির গলায়। দক্ষ হাতে ঠেসে ধরল কাঁচের দেয়াল সাথে তৎক্ষনাৎ। নিশ্বাস রুদ্ধ হওয়া পিয়নটি ছটফট করে রিদের হাত থেকে বাচতে চেষ্টা করলে রিদ হিংস্রত গর্জন ছেড়ে বলল…

—” হারামির-বাচ্চা মরার পাখ গজায়ছে? সাহস কি হয় আমার কলিজায় আঘাত করার। জানের মায়া নাই? মরার এতো তাড়া? যে সোজা আমার কলিজা ধরে টানাটানি করিস? এতো সাহস তোর।

রিদের গর্জে উঠা দাপটে চুপসে যায় সবাই। মায়া দু’হাতে রিদের পেট জড়িয়ে ধরে অপমানে ঘুরে ডুকরে কাঁদে। রিদের বাড়ন্ত রাগের উত্তেজনা দেখে সবাই ভিড় ছেড়ে ভয়ার্ত মুখে একপাশে গিয়ে দাঁড়াতেই রিদ পুনরায় খাক ছেড়ে দক্ষ হাতে পিষ্ট করে অর্ধবয়স্ক লোকটির গলা। পরিস্থিতি অনুকূল বুঝে মায়া ভয়ার্ত ভঙ্গিতে রিদের পিঠের শার্ট শক্ত করে খাচছে ধরে মুখ লুকায় রিদের প্রশস্ত বুকে মাঝে। কান্না ভেজা গলায় বলে….

—” আমার ভয় করছে মিস্টার ভিলেন। প্লিজ উনাকে ছেড়ে দিন না! পিয়ন কাকু আমাকে চিনেন নি তো। সবটা ভুল বুঝাবুঝি থেকে হয়েছে। প্লিজ উনাকে মারবেন না। ছেড়ে দিন।

মায়ার কথা গুলো রিদের কান অবধি গেলেও মস্তিষ্ক শান্ত করতে পারেনি। তার বউকে মারা মানেই ঘুর অপরাধ। সে পাপি হতে পারে কিন্তু তার বউতো পূণ্য! তাহলে তাকে কেন কেউ মারবে? কেন রিদের কলিজা ধরে টানাটানি করবে অন্য কেউ। এই আঘাত গুলো তার অবুঝ বউকে নয় বরং তাকে মেরেছে মনে হচ্ছে। ভিতর থেকে তীব্র হিংস্র সত্তাটা লাফাচ্ছে তার অবুঝ বউয়ের আঘাতকারীকে এক নিমিষেই মেরে ফেরতে। সে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। ছাড়তো ও না। কিন্তু মায়ার ডুকরে কাঁদার আকুতিতে কলিজা নড়ে উঠে তার। ধাক্কা মেরে লোকটিকে ফেলে দিয়ে মায়াকে কোলে তুলে নেয় চট করে। মায়াকে নিয়ে কক্ষ যেতে যেতে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা আসিফকে উদ্দেশ্য চিবিয়ে চিবিয়ে রিদ বলে…

—” নেক্সট মূহুর্তে যেন এদের দু’টোর কাউকে আমার অফিসে তীর সীমানায় না দেখি আসিফ।

তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় আসিফ…

—” জ্বিই ভাই।

রাগ, জেদ নিয়েই রিদ মায়াকে কোলে করে নিজের কক্ষ ঢুকে রুম লক করে দিল। মায়াকে ডেস্কের সামনে দাঁড় করিয়ে টেনে কাঁধ থেকে কলেজ ব্যাগটি খুলে টেবিলের উপর রাখল। মায়াকে আঘাত করা সেই হাতের বাহুটি টেনে রিদ দেখতে চাইল। কিন্তু মায়া বোখরা পরিহিত থাকাই দেখতে সুবিধা করতে পারছে না বলে রিদ একটানে হিজাব ধরে খুলে ফেলল তৎক্ষনাৎ। অস্হির রিদ এতেও মায়ার হাতের বাহু চেক করতে পারছে না বলে মায়ার বোখরার গলার কাছের তিনটে বোতাম ছাড়িয়ে, টেনে খুলে নিল মায়ার মাথা গলিয়ে বোখরাটি। কিন্তু এতেও রিদ সুবিধা করতে পারছে না। মায়ার ভিতরে লম্বা হাতার জামাটি দেখে মেজাজ চড়ে উঠে তার। রাগে কটমট করে মায়াকে দেখে তিক্ত কন্ঠে বলে রিদ…

—” বাল! এতো কিছু কেন পড়ছো? খুলাখুলিই শেষ হচ্ছে না। দেখি পিছন ঘুরো।

মায়ার সম্মতি না নিয়ে নিজেই মায়াকে পিছনে ঘুরিয়ে একটা জামার চেইন খুলে কমড়ে নামিয়ে নিল। লজ্জায় আষ্টশ মায়া তৎক্ষনাৎ রিদকে বাঁধা দিতে চাইলে, রিদ সেটা অবজ্ঞা করে মায়ার বাম কাঁধ পেরিয়ে জামাটি টেনে বাহুর নিচে নামাল রাগান্বিত হাতে। উম্মুক্ত মায়ার হাতের বাহুটি চেক করতে লাগল অস্থির ভঙ্গিতে। শক্ত মোটা লাটির ভারিতে মায়ার বাহুতে টকটকে লাল রঙ্গে ধারণা করে ফেলেছে ততক্ষণে। রিদের বুক জ্বলে উঠল মায়া ব্যথায়। অশান্ত হয় মন পারা। মায়ার সামান্য ব্যথাও যেন প্রচন্ড গায়েল করে রিদকে। অস্থির নেয় পাগল হয়ে যায়। রিদ কাতর ভঙ্গিতে ঝুকে পড়ে মায়ার ফর্সা বাহুতে। ব্যথিত জায়গায় অসংখ্য বার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিশেহারা করে তুলে মায়াকে। বেখেয়ালি মায়া শিহরিত হয়ে রিদের কাঁধে শার্টের কোণা আঁকড়ে ধরে
কম্পনিত হাতে। ভেজা কাঁপা স্বরে বলে…

—” কি করছেন? ছাড়ুন!

বিরক্তির চোখ তুলে তাকাল রিদ। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে মায়াকে শাসিত গলায় বলল…

—” এখানে কেন এসেছ?

রিদের ধমকে ঘোর অপমান বোধ করলো মায়া। সে না-হয় একটু মিস করছিল বলে এখানে একা চলে এসেছে তাই বলে এইভাবে অপমান করবে? অপমানে ঘুরে চোখের পাতা ফের ভেজল। রাগে দুঃখের রিদকে বলল…

—” মিস করছিলাম বলেই তো এসেছি। আজকের পর আর আসব না আপনার অফিসে যান। এক্ষুনি চলে যাব আমি।

মায়া চলে যেতে নিলে রিদ ফের বাহু টেনে ধরে আটকায়। ব্যথিত জায়গায় রিদের শক্ত হাতের চাপ পরতেই মায়া মৃদু স্বরে চিৎকার করে উঠে ব্যথায়। রিদ তৎক্ষনাৎ হাত ছেড়ে দিল। অস্থির চোখ দুটো স্থির করলো মায়ার লাল কালচে হয়ে উঠে বাহুর ব্যথায়। রিদ ক্ষুদ্ধ গলায় বলল…

—” দারোয়ানদের বললে না কেন তুমি আমার বউ।

—” বলেছিলাম তো!

—” বলার পরও ছাড়েনি হারামির বাচ্চারা।

মায়া ধীরে মাথা ‘না’ বোধক নাড়ালো। রিদ রাগে তেতে উঠলেও মায়ার কান্না ভেজা চোখ দেখে থেমে গেল। টেবিলের ফাইল একপাশে সরিয়ে মায়ার কমড় ধরে তৎক্ষনাৎ সেখানে বসাল। মায়াকে টেবিলে উপর পা ঝুলিয়ে বসিয়ে রিদ চেয়ার টেনে বসল মায়ার মুখোমুখি। লজ্জায় আড়ষ্ট মায়া ডান হাতে টেনে বাম কাঁধে কাপড়টি বাহুর নিচ থেকে উপরে তুলে নিল। মায়ার হাবভাবে রিদ কপাল কুঁচকা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মায়ার লজ্জা মিশ্রিত চেহারাটা দেখে হাত বাড়িয়ে বক্স থেকে টিস্যু নিল। রিদের ভাব মূর্তি বুঝায় দায়। রাগ, বিরক্তি, গম্ভীরতা সবকিছু যেন প্রকাশ পাচ্ছে তার আচরণে। রিদ টিস্যু চেপে আলতো হাতে মায়ার ভেজা চোখের পাতা ও গাল মুছে দিল নরম হাতে। অপর একটি টিস্যু দিয়ে মায়ার নাকের পানিও মুছতে মুছতে রিদ নরম গলায় বলল…

—” তুমি এখানে আসবে আমাকে বললে না কেন? তাহলে এতো সব ঝামেলা হতো বলো?

রিদের দিকে তাকিয়ে মায়া মিহির সুরে শুধায়…

—” কিভাবে বলবো? আমার কাছে কি ফোন আছে?

—” ডাইভার বা বডিগার্ডদের বলতে তারা তোমাকে ফোন দিতো। তাদের ফোন থেকে আমাকে কেন ফোন করলে না।

—” আমি অন্যের ফোন থেকে ফোন করবো না। আমায় একটা ফোন দিন না। ছায়া, টিয়া, এমনকি জুইয়ের তো ফোন আছে। শুধু আমারই নেই। আমি তো ফোন দিয়ে অন্য কিছু করবো না। শুধু আপনার সাথে কথা বলবো। তারপরও দিন না একটা ফোন কিনে। প্লিজ।

মায়া কথায় রিদ নাহুচ করে বলল…

—” একদম না। সবার সবকিছু থাকলে যে তোমার সেটা থাকতে হবে এমনটা না। তোমার কোনো ফোন-টোনের দরকার নেই। এমনিতেই বিয়ে সংসার করে করে পড়াশোনা আকাশে উঠাইছো। এখন তোমার হাতে ফোন দেওয়া মানে বাকি পড়াশোনাটাও শেষ করা। সারাদিন ফোন নিয়ে পরে থাকবা তুমি। তাছাড়া সবাই তোমার মতো বিয়ে করে সংসারি না। তাই বাকিদের অযুত দেখাবা না আমাকে। আগে ইন্টা পাস করো কোনো রকম! তারপর সারাজীবন ফোন চালাতে পারবা। এখন আমার সাথে কথা বলার প্রয়োজন হলে হয় অফিসে চলে আসবা। নয়তো ডাইভার বা অন্য কারও ফোন থেকে ফোন করলে আমি নিজেই যাব তোমার কাছে। তারপরও ফোনের কোনো দরকার নেই।

রিদের কথা বেশ পছন্দ হলো না মায়া। ক্ষুব্ধ মনে বলল…

—” আপনি সবসময় আমার সাথে এমন করেন কেন? কোনো কিছু করতে গেলেই না করেন।

—” তোমার শত্রুর আমি তাই এমন করি। হইছে এবার। দেখি দেখাও হাতটা।

রিদ ফের মায়ার কাঁধে জামা টেনে উম্মুক্ত করল হাতের বাহু। অস্তিত্ব মায়া রিদকে বাঁধা দিতে চাইলে রিদ চোখ রাঙ্গিয়ে তাকায়। লজ্জা মায়া নত জাত হয়ে অপর হাতে বুক বেঁধে কাঁধ আঁকড়ে ধরে। সবকিছু অপেক্ষা করে রিদ মায়াকে কোলে তুলে নিয়ে গেল রিদের রেস্ট রুমে। মায়াকে নিজের বিছানায় বসিয়ে রুমের ফ্রিজ থেকে আইস বরফের প্যাকেট নিয়ে মায়া হাতে আলতো ঘষতে ঘষতে বলল…

—” কিছু খেয়েছ?
—” হুমম।
—” কখন?
—” দুপুরে টিফিন টাইমে।
—” এখন কিছু খাবে? ওর্ডার করবো?
—” আচ্ছা।
—” ওকে আসিফকে বলে দিচ্ছে তোমার জন্য অফিস ক্যান্টিন থেকে খাবার নিয়ে আসবে। তুমি রেস্ট করো এখানে কেমন।
—” আপনি থাকবেন না আমার সাথে।
—” আপাতত না। কিছুক্ষণ পর আমার একটা মিটিং আছে। সেটা শেষ করেই চলে আসব। এখানে টিভি আছে প্রয়োজনীয় আরও জিনিস পত্র রাখা আছে। চাইলে ঘুমাতেও পারো একটু। এমনিতেই আমার জন্য রাতে ঘুমাতে পারো না। এখন ঘুমানোটা বেস্ট হবে। তুমি উঠতে উঠতে আমি দ্রুত চলে আসব কেমন।

মায়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। রিদ মায়ার সাথে আরও কিছুক্ষণ থেকে চলে যায় মিটিংয়ে জন্য। যাওয়ার আগে মায়ার কপালে উষ্ণ আদুর করে গেল। এর ভিতরেই আসিফ একজন মেয়ে স্টাফ দিয়ে মায়ার জন্য ট্রে-ভরে বেশ খাবার পাঠাল। বেশ সময় নিয়ে মায়া খাবার খেতে খেতে টিভি দেখল। অলসতায় একটা সময় ঘুমিয়ে পরল। ঘুম ভাঙল প্রায় দু-ঘন্টা পর হঠাৎ নিশ্বাস আঁটকে আসায়। মায়া গোঙ্গাল। ছটফট করে নড়তে গিয়ে বুঝতে কারও শক্ত বাহু বন্ধনে আবদ্ধ। আতঙ্কিত মায়া ঘুমের রেশ পুরোপুরি কাটিয়ে চোখ মেলে তাকাতেই বুঝল তার নিশ্বাস আঁটকে আসার কারণ হলো রিদ। মায়া গোঙ্গানিতে ছটফট করেও যখন রিদকে ধাক্কা দিয়ে নিজের উপর থেকে সরাতে সক্ষম হল না। তখন মায়া হাত পা ছুটাতে চাইল ছটফট করে। কিন্তু এতেও বাঁধা দেয় রিদ। মায়ার হাত দুটো বিছানায় চেপে ধরে ঠোঁট ছেড়ে গলায় নেমে যেতেই হাঁপিয়ে উঠে মায়া বুক ভরা নিশ্বাস টানলো নিজের মাঝে। রিদের মতলব বুঝতে পেরে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে আতঙ্কিত গলায় বলল…

—” প্লিজ প্লিজ! না না, মরে যাব! আমার সকালের চুল এখনো ভেজা, শুকায়নি। ইশশ আমার লজ্জা লাগছে ছাড়ুন! উফফ!

মায়া ব্যাকুলতা দেখে রিদ প্রসন্ন হাসল। মায়াকে ছাড়ল না। বরং হাতের বাঁধন আরও দৃঢ় করে মায়াতে মন্ত হতে হতে নেশাময় গলায় বলল…

—” কি করবো বউ বলো? তোমাকে দেখলেই আমার মতলব নড়ে যায়। তখন রাত আর দুপুর সময়টা মনে থাকে না। শুধু তুমি ছাড়া। আজকাল তোমাকে দেখলেই কন্ট্রোল হারিয়ে বসি। সত্যি বলছি বউ।
~
সম্পর্কে গভীরতা বাড়ে অটুট বিশ্বাস আর ভরসা থেকে। কিন্তু সেই বিশ্বাসে ঝং ধরলে মরীচিকার নেয় ধসে যায় সবকিছু। ভুল বুঝাবুঝি থেকে দূরত্ব সৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। এটা প্রকৃতিগত মানুষের স্বভাবেই চলে এসেছে। রাগ অভিমান মানুষের মধ্যে থাকে। অভিমানে অভিযোগ তুলে যদি একজন দূরে যা, তাহলে ভালোবাসার টানে হয়তো একটা সময় পুনরায় দুজন কাছে চলে আসে। এমনটাই হয় সত্যিকারে ভালোবাসায়। রিদের মায়াকে নিয়ে অসীম ভালোবাসাটা দিন বা দিন প্রকাশ পাচ্ছিল নতুনত্বে। আজকাল মায়াকে ঘিরেই ছিল তার নতুন দুনিয়া। ভালোই যাচ্ছিল তাদের একে অপরের দুষ্ট মিষ্টি ভালোবাসাময় সংসারটা। কিন্তু বিয়ে ছাব্বিশ দিনে মাথায় মায়া সেচ্ছায় আত্মহত্যা করাটা ছিল রিদের হার্ট অ্যাটাকের কারণ। তার ছেয়ে বড় চমকানো বিষয় ছিল যখন শুনলো মায়া…

( মানসিক বিষন্নতা কারণে আমি সত্যি কিছু লেখতে পারি না। হাতে লেখা উঠে না। চেষ্টা করলেও অগোছালো লেখা হয়। কিছুতেই গোছাতে পারি না। খাপছাড়া হয়। তাছাড়া আবার পারিবারিক একটা পর একটা ঝামেলা জন্য বিগত কয়েক দিন বেশ টেনশনে গেল। এবার সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ইনশাআল্লাহ একদিন পর পর গল্প দেওয়ার চেষ্টা করবো। অন্তত এতো দেরি করে গল্প দিব না। বুঝতে পারি গল্পের জন্য অপেক্ষা করে আপনাদের মন ক্ষুদ্ধ হয় আমার প্রতি। এবার মন রক্ষা করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।)

( চমকটা কি হতে পারে কেউ বলতে পারবেন?)

চলিত…

Share On:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 


0 Responses

Leave a Reply