Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬৩


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

(কার্টেসী বা কপি করা নিষেধ। শেয়ারিং ছাড়া)
৬৩
আশুগঞ্জ মায়ার এলাকা। মাতৃভূমি যাবে বলে। ছোট শহর। তবে বেশ জমজমের। মেঘনা নদীর পাশেই এই ছোট শরীরটির অবস্থান। আশুগঞ্জকে বন্দরনগরী বলা হয়। বেশ কিছু কল কারখানা, বড় বড় ইন্ডিয়ান প্রজেক্ট, সরকারি বিদ্যুৎ পাম্প, কারণে বেশ উন্নত নগরী হিসাবেই ধরা হয় আশুগঞ্জকে। আশুগঞ্জ ছোট শহরটির দুটো সাইড বেশ পরিচিত। আশুগঞ্জ বাজার আর চরচারতলা। মায়ার পরিবার চরচারতলার বাসিন্দা। সেই সূত্রে এখানকার সবকিছুই মায়ার পরিচিত। তবে মাতৃভূমির চেনা জায়গায় গুলো যেন আজ হুট করেই অপরিচিত লাগছে মায়ার। তিক্ত মনে বিক্ষোভ করছে দৃঢ় বারবার। কিসের বিক্ষোভ প্রতিবাদ করছে মায়ার মন তা জানা নেই। তবে মন অচল হয়ে আছে। চোখে মুখে বিষন্ন ভগ্নহৃদয়ের বিষাদ। তারপরও চলল বাবার পিছন পিছন মায়া। মন ছটফটের অস্থিরতা নিয়ে বের হলো রাস্তায়। একা নয়! সঙ্গে শফিকুল ইসলাম আর জুঁইও রয়েছে। উদ্দেশ্য মায়ার নতুন কলেজ। সবসময়ের মতো এবারও মায়ার গায়ের সাদা কলেজ ড্রেস জড়ানো। শফিকুল ইসলাম কি করে, কিভাবে! ব্যবস্হা করল জানি নেই মায়া। তবে তিনি অবশেষে সফল হলেন মায়াকে জুইয়ের সাথেই একিই কলেজে ভর্তি করাতে। আজ মায়ার কলেজর প্রথম দিন। কিন্তু তার মনের অনূভুতি শূন্য কোঠায়। গায়ে বোরকা নেই। আর না আছে হাতে পায়ে মুজা। রিদের অবাধ্য নারী হয়েই বের হয়েছে বোরকা বিহীন একদম সাদামাটা কলেজ ড্রেসে কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে বাবার পিছন পিছন। চুপচাপ হাঁটছে। নতুন দিনের নতুন সূচনা করাতে শফিকুল ইসলাম মায়াকে নিয়ে যাচ্ছে কলেজে। মায়া সারা রাস্তায় চুপ থাকল। কথা বললো না। আসলে বলার মতো কোনো বাক্য মায়ার কাছে ছিল না। থাকলেও বা কি বলবে মায়া? তার জীবনের ঠিক এমন একটা দিনই তো শফিকুল ইসলাম হাফ ইয়ার ব্রেক করে মায়াকে খান বাড়িতে পাঠিয়ে ছিল। মায়া যেতে চাইনি। জোর করেই পাঠিয়ে ছিলেন তিনি। আজ আবারও সেদিনের মুখোমুখি হলো মায়া। আবারও মায়াকে অর্ধ বছরের মধ্যে খান বাড়ির থেকে চলে আসতে হলো৷ এবারও ইচ্ছা ছিল না অনেকটা বাধ্য হয়েই আসলো। পরিস্থিতির দায়ে পরে যাকে বলে। জীবনটা সত্যি অদ্ভুত! সেই ছোট থেকেই মায়া কিছু না করেও, অনেক কিছুর-ই শিকার হলো সে। দোষী হলো। অথচ নিজের অপরাধটায় জানে না মায়া। অপরাধের অপরাধীর হয়ে শাস্তি ঠিকই পাচ্ছে ষোল আনা। এসব শাস্তি শাস্তি খেলা মায়ার জীবনে কবে শেষ হবে জানা নেই মায়ার। হয়তো রিদকে ভুলতে পারলে হবে নয়তো এই শাস্তি সারাজীবনই বয়তে হবে তাঁকে। মায়া হাটতে হাটতে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সামনে তাকাল। আদৌ কখনো রিদকে ভুলতে পারব কিনা তাও তো জানে না। মায়া জীবনের প্রথম পুরুষ রিদ। রিদের বাহিরে মায়া অন্য কোনো পুরুষকে অন্য নজরে চোখ উঠিয়ে দেখার সুযোগও পাইনি। অবুঝে কাল থেকেই মায়ার সবটা জুড়ে রিদের বসবাস ছিল। আজও আছে। জীবনে হয়তো কখনো রিদকে ভুলা মায়ার পক্ষে সম্ভব হবে না। তবে মায়া চেষ্টা করবে স্বাভাবিক জীবন চাই লিড করতে। ধীরে ধীরে শিখে যাবে রিদকে ছাড়া, প্রেম হীন একাকীত্বের জীবন কাটাতে। মায়ার রিদের সাথে সম্পর্ক বিছিন্ন হওয়ার কারণটি এখনো জানানো হয়নি পরিবারের কাউকে। আসলে প্রয়োজন পরেনি। শফিকুল ইসলাম এমনিই কারণ ছাড়া রিদ মায়ার সম্পর্কটা ইতি টানছেন কাগজে কলমে। তাই মায়ার আগ বাড়িয়ে কাউকে সাফাই গাইতে হয়নি খান বাড়িতে না যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে। তবে হেনা খানের সাথে রোজ কথা হয় মায়ার। সকাল বিকাল ভিডিও কল করে মায়াকে নিয়ে কান্নাকাটি করেন। তিনি মনে করেন মায়া শফিকুল ইসলামের জন্য আটকে আছে আশুগঞ্জ। খান বাড়িতে আসতে পারছে না। তবে হেনা খানের কান্নায় মায়া নিজেও কাঁদে নিঃশব্দে। তারপরও একটা বার মুখ ফুটে বলে না “দাদী আমিও ফিরে যেতে চাই তোমাদের কাছে। আমাকে নিয়ে যাও প্লিজ। তোমাদের ছাড়া আমিও ভালো নেই দাদী। আপসোস মনের কথা গুলো মুখ অবধি আসে না মায়ার। গলায় আটকে যায়। কষ্টে তার বুক ফাটে তবুও মুখ ফুটে না। কারণ মায়া অনল নিজের সিদ্ধান্তে। খান বাড়িতে যাবে না মানে যাবে না। একদমই না। রিদের প্রতি মায়ার ভালোবাসা আলাদা। আর নিজের আত্মসম্মানবোধটা আলাদা। মায়া সবকিছু সহ্য করলেও, নিজের প্রহর আত্মসম্মানবোধ মাড়িয়ে কখনো পুনরায় খান বাড়ির দোয়ারে দাঁড়াবে না সে। কক্ষনও না। মায়া গরীব পরিবারের হতে পারে তাই বলে নূন্যতম আত্মসম্মানবোধ নিয়ে চলে তাঁরা। অবশ্যই মায়া রিদের অটলে সম্পত্তির লোভে নেই। তার শুধু রিদকেই চাই। শুধু রিদকে। রিদের অটল সম্পত্তির নয়। অর্থ-সম্পদ দুইদিনের মোহ-মায়া শুধু। আজ আছে তো কাল নেই। তবে মায়ার আজ দৃঢ় ভাবে মনে হলো হয়তো রিদের কিছু না থাকলেই ভালো হতো। অন্তত মায়ার ভালোবাসা দিকে আঙ্গুল তুলতে পারতো না রিদ। গরিব বলে মায়াকে লোভী চরিত্রে আখ্যায়িত করতে পারতো না রিদ। মায়ার ভালোবাসাটাও পবিত্র থাকতো। কলঙ্ক লাগতো না তাতে। মায়ার এবার সত্যিই রিদকে চাই না। সত্যিই মন থেকে চাচ্ছে তার সাথে রিদের ডিভোর্সটা হয়ে যাক। মায়া মুক্তি পাক। রিদ অন্য কাউকে নিয়ে সুখে থাকুক। জীবনের কখনো কোনো পরিস্থিতিতে রিদ সাথে মায়ার মুখোমুখি না হোক। এভাবেই দিন যাক মাস হোক। মাস যাক বছর পাড় হোক। তবুও রিদ মায়ার সামনে কখনোই না আসুক। দুজনের মুখোমুখি না হয়েই ডিভোর্সটা হয়ে যাক। এতেই মায়ার শান্তি। নয়তো মায়া রিদকে পুনরায় নিজের সামনে পেয়ে যদি নিজেকে সামলাতে না পারে। তাহলে মায়া সত্যি লোভী নারী বলে পরিচয় পাবে রিদের কাছে। রিদ ভাববে মায়া তার টাকার জন্য পিছনে পরে আছে। মায়ার ভালোবাসাকে কলঙ্ক করবে। যেটা মায়া চাই না। মায়া শান্তি চাই বলেই বিচ্ছেদের গোটা আটাশ দিন পাড় হলো নীরবে দুজনের জীবনে। দু’জন দুই প্রান্তেই আছে। কারও খবর, কারও কাছেই নেই। মায়া জানে না রিদ কোথায়, কিভাবে আছে? আর না জানার চেষ্টা করছে। কথায় কথায় শুধু এতটুকু শুনেছে রিদ নাকি বাংলাদেশে নেই। মেহুও বাংলাদেশে নেই। হয়তো দুজন একসঙ্গেই আছে। যেখানে আছে মায়ার ধারণা। কারণ মেহু ভাষ্য মতে রিদ খান তাঁর একমাত্র প্রেমিক পুরুষ। ভয়ানক প্রেম চলছে তাদের দু’জনের মধ্যে। আর রিদের ভাষ্য মতে মেহু আব্দুল্লাহ তার একমাত্র হবু বউ। আর মায়া? সে হলো তৃতীয় পারসন! লোভী নারী! রিদ খানের একরাতের সঙ্গী! এই সব কথা গুলো ফিহার বিয়ের দিনই বলেছিল রিদ আর মেহু দুজন মায়াকে। মায়া শুধু সেদিন শুনে গেল উত্তর করেনি।

—” আম্মু উঠো গাড়িতে, দাঁড়িয়ে আছো কেন।

আরাফ খানের ডাকে ধ্যান ভাঙ্গে মায়ার। এতক্ষণ যাবত হারিয়ে ছিল নিজের ভাবনার জগতে। মায়া থমথমে চোখে তাকাল চারপাশে। নিজের সামনে অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুঝল শফিকুল ইসলামের কথার মর্ম। মায়া কথা না বাড়িয়ে দ্রুত উঠল অটোরিকশায়। গাড়িটিও চলল মায়ার কলেজের উদ্দেশ্য। জুই মায়া পাশাপাশি বসা। শফিকুল ইসলাম বসল ডাইভারের সাথে সামনে। মিনিট দশকের মধ্যে কলেজের সামনে দাঁড় করাতেই সবাই নেমে পড়ল। শফিকুল ইসলাম মায়া জুই দুজনের মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে চলে গেলেন বাড়ির উদ্দেশ্য। মায়া উদাসীন ভগ্নহৃদয়ের চিন্তায় বিভোর থাকায় যে বিষয়টি লক্ষ করেনি! সেটি হলো নিজের উপর একঝাঁক অশুভ দৃষ্টির মেলাকে। ডিমের খোসা ছেড়ে প্রথম যখন পাখি বাচ্চা দুনিয়ায় মুখ দেখে আতংকে উঠে! ঠিক তেমনই যেন মায়ার অবস্থানটা হলো। রিদের নজর বন্দী কারাগার থেকে মুক্ত আকাশের নিচে স্বাধীন, একা বের হতেই যেন একঝাঁক অশুভ দৃষ্টির ভিড়ে পড়ে গেল মায়া। রিদ আগলে রাখার খোসা ছেড়ে বের হতেই তোপের মুখে পড়ল। যেখানে রিদ কারও নূন্যতম দৃষ্টি মায়ার উপর পড়তে দেয়নি। সেখানে আজ মায়া নিজেই সকলের কেন্দ্র বিন্দু হলো। যেমন করে রিদ মায়াকে বিগত আড়াই বছর আগলে রেখেছিল। মায়ার সেইফটির জন্য রিদ তার আশেপাশের মানুষজন, স্কুল থেকে কলেজের, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, দারোয়ান, এমনকি রাস্তা ঘাটেও রিদ মায়ার জন্য অদৃশ্য বডিগার্ড সেট করে রেখেছিল শুধু হেফাজতে জন্য। যারা প্রতিনিয়ত রিদের আদের্শে মায়ার প্রতিরক্ষা করে যেত। রিদ কাছে বা দূরে থাকুক না কেন মায়ার প্রতি মূহুর্তে খবর রিদের কাছে ঠিকই যেত। মায়া খোলা আকাশের ততটাই উড়তো যতটা রিদ আলাও করতো উড়তে। কিন্তু আজ যেন ভিন্ন! রিদের শুভ নজর বন্দী খোসা থেকে বের হতেই যেন অশুভ দৃষ্টিতে পড়ল। মায়া থমথমে খেয়ে চারপাশে তাকাল। সিনিয়র, সহপাঠী, আশেপাশের রাস্তাঘাটের সাধারণ মানুষজনের দৃষ্টির তাক করা তার দিকে। সবাই অদ্ভুত দৃষ্টির ভিড় কাটিয়ে উঠতে মায়া জুইয়ের হাত চেপে ধরে ভয়ে। জুই চমকে মায়ার ইতস্তত চেহারাটা দেখে আশেপাশে তাকিয়ে বুঝল ঘটনাটি। জুই মায়াকে আশস্ত করে মায়ার হাত চেপে ধরে সামনের দিকে পা বাড়ায় কলেজ গেইট ধরে। যেতে যেতে সংকীর্ণ গলায় মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলে..

—” মাক্স নেই তোর সাথে?
—” আছে!
—” বের কর।
জুইয়ের কথা অনুযায়ী মায়া ব্যাগ খুলে মাক্স বের করতেই জুই সেটি হাতে তুলে নেয়। মায়াকে দাঁড় করিয়ে নিজেই মায়ার মুখে মাক্সটি পড়িয়ে দিয়ে, গলার স্কাপ মাথায় টেনে দেয়। হাত বাড়িয়ে মায়ার কপালে এলোমেলো চুলে গুলো সুন্দর করে গছিয়ে দেয় দুপাশে। মায়াকে ঠিকঠাক করে বলে জুই…
—” পারফেক্ট! এবার ঠিক আছে। ক্লাসরুমে গিয়ে তোকে হিজাব বেঁধে দিব নে কেমন। ভয় পাসনা। আমি আছি তো। আর শুন! জায়গায়টা তোর জন্য নতুন। তাই একা একা কোথাও যাবি না। এই কলেজের ছেলেরা উগ্র টাইপের। বেশ ভালো না। ওয়াশরুমে গেলেও আমাকে বলবি আমি নিয়ে যাব। মনে থাকবে।

মায়া মাথা নাড়ায়। কলেজের এই সাইডটা মায়ার অপরিচিত বেশ। চেনা নেই। তাই মায়ার কাছে একা চলা অসম্ভব ঝামেলা ঠেকল। তাছাড়া কলেজ ঢুকতেই এতোগুলা মানুষের অদ্ভুত দৃষ্টিতে পড়াটাও ভালো লাগলো না। বিষন্নতা মায়া মুখে মাক্স, আর মাথায় হিজাব করতে ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু জুই ঠিকই মুখে মাক্স আর মাথা হিজাব করে বের হয়েছে। জুই মায়ার হাত ধরে সামনে এগোই। কলেজের দ্বিতীয় ভবনের তিনতলার কোনার ক্লাস রুমে গিয়ে বসল মায়াকে নিয়ে। পূব থেকেই ক্লাসের বেশ মানুষের উপস্থিত ছিল। জুই এগিয়ে মায়াকে নিয়ে দ্বিতীয় বেঞ্চে বসল। ব্যাগ থেকে পানি বের করে জুই নিজেও খেল মায়াকেও খাওয়াল। প্রথম দিন হওয়ার মায়া বেশ চুপচাপ জড়তা নিয়ে বসে আছে। ক্লাসের ছেলে মেয়ে সবার দৃষ্টির কেন্দ্র বিন্দু এক মূহুর্তেই অপরিচিত মায়া হয়ে উঠল। কৌতূহল বশত একে একে সবাই জুইকে একিই প্রশ্ন করতে লাগল, মেয়েটি কে? জুইয়ের কি হয়? এখানে পড়তে এসেছে কিনা? উত্তর জুই বলল! মায়া তার বোন! এখানে ট্রান্সফার হয়ে এসেছে পড়তে। জুই মায়াকে নিয়ে বেশ খুশ মেজাজ মেয়েদের সাথে বসে গল্প করতেই হঠাৎ ক্লাসের মধ্যে হুড়মুড় করে ঢুকলো একদল ছেলেরা। কোনো রকম জের না টেনে সোজাসুজি এসে ঘিরে দাঁড়াল তাদের বেঞ্চ। জুই কপাল কুঁচকে নিজের সহপাঠী ছেলেদের দিকে তাকাতেই দেখল সবাই ড্যাবড্যাব করে মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন চোখে সামনে অবিশ্বাস্য কিছু দেখতে পারছে সবাই। এমন একটা ভাব। মায়া ইতস্ততের হাসফাস করল এতো মানুষের দৃষ্টি কেন্দ্র বিন্দু হয়ে। জুই ব্যাপারটা বুঝে বিরক্তি নিয়ে বলে…

—” কি চাই তোদের? মেয়েদের বেঞ্চ ব্লক করে দাঁড়িয়েছিস কেন? এটা কি তোদের সাইড?

জুইয়ের কথা সবাই মজা করে হাসল। কৌতুক করে একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের মধ্য থেকে রিফাত নামক ছেলেটি হেসে বলল…
—” দোস্ত এই আগুন সুন্দরী মেয়েটা কে রে? বল না।
জুই বিরক্তিতে রেগে বলে…
—” তোরে আমি কোন জীবনের নিজের দোস্ত বানাইছিলাম হ্যাঁ। যে এখন দোস্ত,দোস্ত করছিস? আলগা ভাব আমার সাথে জমাতে আসবি না। যাহ এখান থেকে। ঝামেলা করিস না। আর মেয়েদের সারিতে তোদের ছেলেদের না আসা নিষেধ। তাহলে এসেছিস কেন হ্যা?

পাশ থেকে রিফাতের বন্ধু চয়ন রিফাতের কাঁধে চাপড় মেরে বলল…

—” আরে আমরা চলে গেলে কি হবে? কিছুই তো হবে না। কারণ অলরেডি কলেজে ডাক পড়ে গেছে তোমার আগুন সুন্দরী বোনের। কলেজ গেইটে এই রুমনীকে দেখেই নাকি গভীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে সিনিয়র ভাইয়েরা কয়েক জন। বাহিরের তাদের মধ্যে এখন গুঞ্জন চলছে কে আগে তোমার বোনকে প্রেমে প্রস্তাব দিবে সেটা নিয়ে। তবে যারা এখনও তোমার সুন্দরী বোনকে দেখেনি! তারাও অধীর অপেক্ষা বসে আছে দেখার জন্য। সাথে আমাদের ক্লাসের কিছু বন্ধুগণেরও পছন্দ হয়েছে তোমার বোনকে। তারা অলরেডি ক্রাশ খেয়ে বাঁকা হয়ে আছে। এই লাইনে কিন্তু আমিও আছি। আমাকে বাদ দিবেন না প্লিজ। এবার তুমিই বলো এতে আমাদের অপরাধ। সত্য মনে সত্য কথা গুলোই তো বলতে আসলাম। জানাতে আসলেন মনের সত্য অনূভুতি। তবে আমার যতটুকু ধারণা তোমার সুন্দরী বোন বেশি দিন সিঙ্গেল থাকতে পারবে না। যদি সে মিঙ্গেল হয় তাহলে ব্রেকআপ করায় নিবে কলেজ ছাত্রলীগের নেতার সোহান ভাই। কারণ তার চোখেও অলরেডি তোমার বোন পড়ে গেছে গেইট ধরে আসার সময়। এবার তো আল্লাহ বাঁচাতে পারে তোর বোনকে। কারণ সোহান ভাইয়ে ক্ষমতা কথা পুরো এলাকা বাসী জানে। তুমি জানো।

চয়নের কথায় মায়া ঘন পাপড়ি নাড়িয়ে পিটপিট করে তাকাল ছেলেটির দিকে। কপালে সূক্ষ্ম বিরক্তির ভাজ। প্রথম দিন হওয়ার মায়া আর মুখ খুলে কিছু বলল না। কিন্তু তবে জুইও চুপ থাকল না। প্রতিবাদী গলাম বলে উঠে…
–” হ্যাঁ জানি আমি। যাহ এবার তোরা গিয়ে বল তোর সোহান ভাইকে সাহস থাকলে আমার বোনের ব্রেকআপ করাতে। যাহ।
–” তার মানে সত্যিই তোর বোন মিঙ্গেল? কার সাথে?
—” রিদ খানের সাথে। যাহ এবার এখান থেকে।

জুইয়ের কথা মুখ বাঁকাল রিফাত। চিন্ততে না পেরে পুনরায় বলল…
—” রিদ খান আবার কে ভাই? বাড়ি কই? ঠিকানা দিয়ে যাস তো সাহস করে। দেখবি আমরা গিয়ে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আসব চান্দুরে। আমরা হলাম আশুগঞ্জের বিশিষ্ট সাহসী পোলাপান। সাহস আমাদের পকেটে থাকে বুঝলি। আমাদের ভয়ে ব্রেকআপ এমনই হয়ে যাবে তোর সুন্দরী বোনের।

রিফাতের গা ছাড়া কথায় রাগে কটমট করে উঠে মায়া। রিদকে নিয়ে সামন্য বাজে মন্তব্যও পছন্দ না তার। রাগে নাক ফুলিয়ে ক্ষেপ্ত দৃষ্টিতে রিফাতের দিকে তাকাতেই পাশ থেকে জুই বিরক্তি ভঙ্গিতে বলে উঠে…

—” ভাইয়ার বাড়ি ঢাকা। রিদ খান নাম বললে যে-কেউ তোদের উনার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে দিবে। অথযা আমাকে কষ্ট করে তোদেরকে ভাইয়ার বাড়ির ঠিকানা দিতে হবে না। যদি সহিসালামতে ঢাকা থেকে পুনরায় আশুগঞ্জ ফিরে আসতে পারিস। তাহলে আমিও তোর সাহসের প্রশংসা করবো কলেজ ঢল পিঠিয়ে কেমন। এবার দয়া করে আমাদের সাইড থেকে সর তোরা।

জুইয়ের কথায় কপাল কুঁচকাল রিফাত। সন্দেহের বসে সে কিছু বলবে তার আগেই পিছন থেকে তাদের বন্ধ রাকিব এগিয়ে এসে রিফাতে পাশাপাশি দাড়িয়ে মজা করে বলল..

—” এমন করে বলছিস যেন। ঢাকার গ্যাংস্টার রিদ খান। ঐ যে গুন্ডামি করে তার কথা বলছিস। গুন্ডা রিদ খান আর যায় হোক! তোর বোনকে দেখতে আসবে না সে। বেটার টাকার গরম। ক্ষমতার গরমে মাটিতেই পা পরে না। শালা গুন্ডামী করে…

তীব্র আঘাতে মৃদু চিৎকার করে উঠে ছেলেটি। বাকি কথা গুলো শেষ হলো না। তার আগেই ছিটকে হালকা ঝুকে গেল মায়ার আচানক আঘাতে। রিদকে বারবার গুন্ডা বলাটা মোটেও পছন্দ হয়নি মায়ার। তার মিস্টার ভিলেন কেন কেউ গুন্ডা বলবে? তাও মায়ার সামনে? সহ্য করতে না পেরেই সামনে থাকা পানির বোতলটি আচানক ছুড়ে মারে ছেলেটির মুখে। মায়ার হঠাৎ বিক্ষোভ ক্ষেপ্ত ভঙ্গি দেখে উপস্থিত সবাই থমথমে খেয়ে যায়। কেউ কিছু বুঝলো না মায়া হঠাৎ কেন এমনটা করল। তবে জুই বুঝল। মনে মনে তীব্র আফসোসও করলো। সবাই সামনে রিদের নাম বলায়। জুই মায়াকে মিঙ্গেল বলে ছেলেদের দৃষ্টি আর্কষণ কমাতে চেয়েছিল মায়ার উপর থেকে। মায়ার জীবন কেউ আছে ভেবে হয়তো ছেলে মায়া থেকে দূরে থাকবে। বিরক্ত করবে না। এমনটা চিন্তা করেই রিদের নামটা বলেছিল জুই। কিন্তু সবকিছুর বিপরীতে যে এমন কিছু হবে ভাবিনি সে। তাছাড়া আজকে মায়ার কলেজ প্রথম দিন ছিল। প্রথম দিনই ক্লাসে ঝামেলা করাটা ছিল সবার তোপের মুখে পড়ার কারণ। সবাই মায়াকে উগ্র মেজাজী মেয়ে বলে আখ্যায়িত করে দিল। কিন্তু জুই বুঝলো মায়ার বিষয়টি। রিদকে নিয়ে বাজে মন্তব্য পছন্দ না। মায়া সহ্য করতে পারে না। সেই জন্য চেতে উঠে কোনো কিছু না ভেবেই পানির বোতল ছুড়ে মারে ছেলেটির মুখে। পরিণত কি হবে তাও ভাবলো না। আঘাত প্রাপ্ত ছেলেটিও ততক্ষণে চেতে উঠে মায়ার উপর। ক্লাসে বেশ হৈচৈ পরে গেল। রাকিবকে ধরে থামাল রিফাত। শান্ত করলো। বুঝাল। সামান্য বোতল ছুড়ে মারায় রাকিবও ব্যথা পায়নি। তবে সবার সামনে অপমানিত বোধ করেছে। নতুন মেয়েটি আসতে না আসতেই তাকে কারণ ছাড়াই অপমান করল। বিষয়টি ইগোতে নিল রাকিব। রাগী কটমট চোখে তাকাল মায়ার ক্ষেপ্ত দৃষ্টিতে। মায়া জেদে অনড়। তবে জুইয়ের বাকি ক্লাসমিট মেয়েরাও এবার জুইয়ের পক্ষ নিল। বলল ছেলেরাই আগ বাড়িয়ে কথা বলতে এসেছে। মায়াকেও ডিস্টার্ব করছে। তাই মায়া যাহ করেছে ঠিক করেছে।জুই মায়া হাত চেপে ধরে অনেক চেতেই বলে…

—” রিফাত দেখ! ঝামেলা করবি না কিন্তু! আমি বা আমার বোনের সাথে টক্কর নিলে তোদের ছেড়ে দিব না কিন্তু। তুই আমারে ভালো করেই চিনিস। ছেড়ে দেওয়ার মতো মেয়ে কিন্তু আমি না। সোজা প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে বিচার যাবে তোদের নামে বলে দিলাম।

জুইয়ের কথায় রিফাত গলা টেনে মজা করে বলল…
—” আহ আমার প্রতিবাদী নারী! তোরে তো আমার এমনই পছন্দ। কিন্তু তোর বোনকে আরও পছন্দ হলো। সেই দেখতে। রাগ আছে। এতো সুন্দরী বোন কেউ বুঝি বাসায় রাখে পাগলি। ধুর বোকা মেয়ে।

রিফাতে মজা করা কথায় থমথমে খেয়ে যায় সবাই। তবে ক্লাসের পরিস্থিতি ঠিক করগে জুইয়ের ক্লাসের বেশ কয়েকজন বান্ধবীও ছেলেদেরকে বকে তাড়িয়ে দিল সেই যাত্রায়। তবে তারা ক্লাস থেকে বের হলো না। ক্লাসেই থাকল আর ঘুরেফিরে মায়ার দিকে তাকাতে থাকল। মায়া অস্থিরে ঝামেলায় বারবার রিদের কথায় মনে হলো। আজকের আগে এমন করে কেউ সাহস পায়নি মায়ার দিকে তাকানোর। কিছু বলা তো দূর থাক। ঝামেলাও হয়নি। মায়া গুমোট দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিজের রাগ নিবারণ করে শান্ত হলো। জীবনটায় যুদ্ধের। বাস্তব জীবনে প্রতি নিয়ত লড়াই করে বাঁচতে হয়। মায়াকেও শিখতে হবে বাস্তবতার জীবন। রিদ নেই মায়ার জীবনে। আর না আসবে। এমন সবকিছু মায়াকে একাই হ্যান্ডল করা শিখতে হবে। হয়তো ধীরে ধীরে শিখে যাবে। মায়া সারাদিন ক্লাস থেকে বের হলো না আর। জায়গায় বসে থেকে দুইটা পযন্ত ক্লাস করল। তাদের ঘন্টা বাজাতেই জুই মায়াকে নিয়ে দ্রুত সবার সাথে সাথে বের হলো। কারণ পিছনে পরলেও ছেলেরা তাদের ডিস্টার্ব করবে তাই। জুই নিজের সাথে হওয়া পূব অভিজ্ঞতা থেকে এমন বুদ্ধি খাটালো। মায়াকে নিয়ে মেয়েদের সাথে দলবেঁধে বের হতে গিয়েও বেশ বাঁধা পেয়েছে। পিছন থেকে বেশ কয়েক বার সিনিয়র ভাইয়া ডাকাডাকি করছে তাদের কাছে যেতে। কথা বলবে নাকি৷ কিন্তু জুই শুনেও না শুনার মতো করে মায়াকে নিয়ে দলের ভিতর দিয়ে চলে আসল। হয়তো কাল কলেজ গিয়ে কৈফিয়ত দিতে হবে সিনিয়র ভাইদের কাছে, কেন তাদের কাছে না গিয়ে চলে আসল সেটি নিয়ে৷ তবে কাল যা হবার হবে সেটা কালই দেখে নিবে। তারপরও জুঁই আজকে মায়াকে নিয়ে চলে আসল বাড়িতে। দুপুরে খাওয়ার করে পুনরায় রেডি হয়ে গেল টিউটরের কাজে। বিকাল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পযন্ত প্রাইভিট তাদের। জুই পূব থেকেই পড়তো আজকে থেকে মায়া যোগ হলো। জুই মায়া এবার দু’জনই হিজাব করে মাক্স পড়ে রাস্তায় বের হয়েছিল। কিন্তু এতেও তারা রাস্তায় এলাকার স্হানীয় কিছু ছেলেদের টিচের শিকার হয়। জুইকে তারা পূব থেকেই চিন্ত শুধু মায়াকে আজকে প্রথম দেখল। জুইয়ের পাশাপাশি এবার তাদের টিচের তালিকায় মায়া যোগ হলো। মায়ার চেহারা না দেখলেও তার ডাগর ডাগর আঁখি আর হলুদ ফর্সা হাত পা দেখে বুঝে নিল মেয়েটি অনাহেষে বেশ সুন্দরী হবে। মায়া একদিনই যেন হাঁপিয়ে উঠল বাস্তব লড়াইয়ে। এসবে সে অবগত নয়। বিশেষ করে ছেলেদের টিচ করা বিষয়টিতে। মায়া তখন চুপ থাকল। রাস্তার ছেলেদের সাথে কথা বলা মানে নিজের সম্মান কমানো। তারা নিজের ইজ্জতের চিন্তা করবে না কখনো। কারণ ইজ্জত ওয়া লোক কখনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের ডিস্টার্ব করে না। মায়া জুইয়ের চুপ থাকার কারণ হলো,
যেহেতু রোজকার একিই রাস্তা ধরে যেতে হবে তাদের দু’জনকে। সেহেতু রাস্তার ছেলের সাথে ঝামেলা না জড়ানোটায় উত্তর কাজ।
~~
রাত তিনটা। কান্নাময় নিঘুম আরও একটা রাত কাটলো মায়ার। শব্দ বিহীন কান্না ভিজলো বালিশ। বন্ধ চোখের পাতা বেয়ে নোনাজল গড়ালো বালিশের উপর। রোজকার মতোই অন্ধকারে তলিয়ে কেঁদে উঠে মায়ার মন। অস্থির মন রিদকে ভিষণ মিস করে বলে তাই। মায়া সবার সামনে না কাঁদার চেষ্টা করলেও রাতের আধারে ঠিকই কেঁদে উঠে। শব্দ বিহীন দীর্ঘ গুমোট কান্নায় কান্নায় মায়ার শ্বাস নিতে কষ্ট মনে হওয়া ধীরে উঠে যায় বিছানা ছেড়ে। জুইকে বেঘোরে ঘুমাতে দেখে গায়ে ওড়না টেনে খাল পা বাড়ায় বারান্দার দিকে। নিস্তব্ধ নিগার রাত। ফাঁকা রাস্তা। ল্যামপোস্টের আলোয় আলোকিত উজ্জ্বল সেই রাস্তা। মায়া বারান্দায় বে’তের সোফায় গা এলিয়ে বসে দৃষ্টি শূন্য আকাশে রাখল। জ্যাম হয়ে যাওয়া নাক পরিষ্কার করল ওড়নায়। দু’হাতে আঁজলে চোখে, গালে লেগে থাকা নোনাজল মুছল। শান্ত হওয়ার চেষ্টা করেও শান্ত হতে পারল না মায়া। পুনরায় গাল ভিজে উঠল। দু’হাতে মুখ চেপে ফুপিয়ে উঠল। কেন মায়ার সাথেই এমন হলো? কেন তার গোছানো স্বপ্ন গুলো ভেঙ্গে গেল? মায়া কি করে থাকবে সারাজীবন তার মিস্টার ভিলেনকে ছাড়া? মাত্র এক মাসেই দম বন্ধ হয়ে আসছে ওর। মরণ যন্ত্রণায় ন্যায় ছটফট করছে গুয়ে গুয়ে। বেঁচে থেকেও যেন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। এক মূহুর্তে জন্য মনে হয় মায়া মরে যাওয়া উচিত। কেন বেচে আছে সে? প্রত্যেকের জন্য এক্সট্রা বোঝা হয়ে। প্রথমে মায়ার বাবা তাঁকে বলল, মায়াকে লালন-পালন করতে পারবে না। খাওয়াতে পারবে না। খরচ নিতে পারবে না। তাই মায়া যেন খান বাড়িতে চলে যায়। সেদিন বাবার কথাটি ছোট মায়ার আত্মসম্মানে লেগেছিল বলেই হেনা খানের আর আরাফ খানের সাথে বিনা শব্দের খান বাড়িতে চলে গিয়েছিল অমতেই। এই নিয়ে আরিফও প্রচুর ঝামেলা করেছিল শফিকুল ইসলামের সাথে। তারপর থেকেই মায়া নিজের বাড়িতে আসলে আরিফ তার খরচ বহন করে। মায়াও নিজের বাড়িতে আসলে এক সাপ্তাহ বেশি থাকতে চাইতো না। চলে যেত। বাবার কথা ভুলেনি কিন্তু পরিবারের নাকি সদস্যের জন্য আসত। প্রথমে মায়া ভেবেছিল খান বাড়িতে গিয়ে তাকে হেনা খানের দেখাশুনার কাজ করতে হবে। পরে হেনা খানের আরাফ খানের ভালোবাসায় ভালোবাসায় সবকিছু ভুলে যায়। স্বাভাবিক হয় ঠিকই। কিন্তু নিজের বাবার সাথে মায়ার সম্পর্কটা আর আগের মতো ঠিক হলো না। একটা গ্যাপ রয়ে গেল। তবে মায়া ভেবেছিল জীবনে হয়তো আর কখনো বাবার বাড়িতে পুনরায় চিরতরে ফিরে আসতে হবে না। রিদের সাথে সংসারী হয়ে যাবে। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস। মায়াকে আবারও পুনরায় বাপের বাড়িতেই ফিরতে হলো বাধ্য হয়ে। কারণ স্বামীর ঘরেও মায়ার ঠায় হলো না। স্বামীও তাকে লোভী নিচু লেবেলের নারী বলে তাড়িয়ে দিয়েছে। মায়া অর্থের জন্য কি তার স্বামীর কাছে পড়ে ছিল? মায়া কি প্রেম করে বিয়ে করতে চেয়েছিল? নাকি বিয়ে করা স্বামীকে ভালোবাসতে চেয়েছিল। মায়ার দোষ কি এটা? যে সে তার স্বামীর সাথে ভালোবেসে সংসার করতে চেয়েছিল? এই জন্য মায়া লোভী? আচ্ছা মায়ার সাথে রিদের বিয়ে হওয়া নিয়ে মায়ার কি দোষ ছিল? বিয়ের সময় মায়া নিজেও তো খুব ছোট ছিল। অবুঝ ছিল! বিয়ে কি জিনিস জানতো না! বুঝতো না। তাহলে বাঁধা দিতো কিভাবে। মায়ার হাতে কি কিছু ছিল। ছিল না। তখন মায়া যদি বুঝতো তাহলে অবশ্যই বাঁধা দিতো। বিয়ে করতো না বলে নিষেধ করত। কিন্তু আফসোস! মায়ার হাতে কিছুই ছিল না। তারপরও অপরাধের শাস্তিটা সে সমানে সমান পাচ্ছে। না বাপের বাড়ি মায়ার আপন হলো। আর না স্বামীর বাড়ি। মায়া যাবে তো যাবে কোথায়? এখান থেকে পালিয়ে কার কাছে ঠায় নিবে? দুনিয়া সম্পর্কে ধারণা নেই। বয়স কম। যথেষ্ট পড়াশোনা নেই যে নিজেই চাকরি করে কিছু করে একা থাকবে। দুনিয়ার কিছু সে চিনে না। কে ভালো! কে খারাপ! তাও জানে না। কাকে বিশ্বাস করে মায়া তার হাত ধরে বাড়ি থেকে চলে যাবে। এমন বিশ্বাস্ত মানুষ তো মায়ার নেই। মায়ার মতো অসহায় মানুষ কি দুনিয়াতে দুটো আছে? যার আত্মসম্মানবোধ আছে অথচ নিজে কিছু করার তাগিদ নেই। কারণ মায়া জানে এই দুনিয়ায় মানুষ নিজের স্বার্থ ছাড়া এক পাও নড়ে না। বর্তমান যুগের মানুষ স্বার্থ বুঝেই নড়ে। নয়তো না। তাহলে মায়াকে কে বিনা স্বার্থে সাহায্য করবে একা একা বাঁচতে। মায়া এসব কিছু থেকে পালিয়ে যাবে তো কোথায় যাবে? আচ্ছা মায়া জীবনটা এমন হলো না নদীর ভাসমান নৌকার মতো। যে কখনো এই তীরে তো কখনো ঐ তীরে। নিদিষ্ট তীর বলতে মায়ার কিচ্ছু নেই। নিজের অবস্থানের কথা চিন্তা করে মায়ার ভিতরের সত্তাটা যেন তীব্র তিরস্কার করে উঠল। চেচাল। ধিক্কার জানালো মায়াকে, বলল ‘ সবার বোঝা হয়ে বেঁচে না থেকে মরে যা তুই মায়া। এই দুনিয়া তোর না। আর না এখানের মানুষজন। কেন বেচে আছিস বেহায়ামি করে। তোর বেঁচে থাকাতে কারও লাভ হচ্ছে না, ক্ষতি ছাড়া। মায়া তোর কি আত্মসম্মান নেই। বাবা-স্বামী ফিরিয়ে দেওয়ার পরও তাদের ঘাড়েই এখনো পড়ে আছিস? তোর জন্য কি, বিষ, ফাঁস কোনো কিছু নেই মায়া।

হীম শীতল হয়ে গা কেঁপে উঠে মায়ার। তিরতির করে ঘেমে উঠল কপাল। মায়ার কি সত্যি মরে যাওয়া উচিত? এতটা অবহেলিত মায়া? হৃদপিণ্ড চেপে উদ্বিগ্নতায় উঠে দাড়ালো মায়া। দিক বিবেচনা না করেই সোজা গেল কিচেন রুমে। রেখ থেকে চপিংবর্ডের নাইফ তুলে নিল। কেন তুলল তাও জানা নেই। তবে হাতে করে রুমে নিয়ে আসল। দরজা লাগিয়ে পুনরায় আগের জায়গায় বসল। কোলের উপরে ছুরিটাকে সূক্ষ্ম চোখে প্ররখ করতে লাগলো। চোখ তখনো ভেজা নোনাপানিতে। তবে অশান্ত মনে ভাবলো স্থির হয়ে। হাতের রগ কাটলে তো মানুষ মারা যাওয়ার চান্স কম। গলায় ছুরি চালালে নিশ্চয়ই মানুষ মরে যায়। মায়াও কি গলায় ছরিটা চালালে মরবে নাকি মরবে না? যদি রগ না কাটে তো? অবুঝতার নেয় ছুরি চেপে বসে রইলো। কেন বসে থাকলো তাও জানা নেই। বরং স্থির থেকে হাতের ছুরিটা ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে একটা সময় ঘুমিয়ে পড়লো জায়গায়। সকাল ঘুম ভাঙলো জুইয়ের ডাকে। মায়া চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে প্রথমেই দেখলো জুইয়ের আতঙ্কিত চেহারাটা। কি হয়েছে বিষয়টি বুঝতেই শুনা গেল জুইয়ের ভাঙ্গা স্বর। মায়া ছুরি হাতে বারান্দায় কেন? কবে আসল? এখানে ঘুমাল কেন? ইত্যাদি! ইত্যাদি! মায়া উত্তর করলো না তেমন কিছু। আসলে উত্তর করার মতো কিছু পেল না।
~~
দুপুর ১ঃ১৫ মিনিট। দুটো ক্লাস না থাকায় আজ একটু তাড়াতাড়ি ছুটি হলো তাদের। মেয়েদের সাথে দলবেঁধে রাস্তা পার হচ্ছে মায়া আর জুঁই। অটোরিকশার জন্য রাস্তার অপর পাশে দাঁড়াল মায়া। বাকি মেয়েরা যার যার মতো করে গাড়ি ধরে বা হেটে চলে যাচ্ছে বাড়িতে। মায়া দাঁড়িয়ে রইলো। জুই সামনে দোকানে গেল তাদের দু’জনের জন্য আইসক্রিম আনতে। কিন্তু হঠাৎই মায়ার সামনে আচানক ভাবে রিকশাসহ উল্টে পরে যায় দুজন মানুষ। মায়ার অনেকটা কাছাকাছি পড়ায় আঁতকে উঠে সে দ্রুত দৌড় লাগাল সামনে। রিকশা চালকের তেমন কিছু না হলেও পিছনে থাকা সুন্দর ছেলেটি অনেকটাই আঘাত পেল। ডাইভার লোকটি উঠে দ্রুত হাতে রিকশা টেনে ধরতেই মায়া আঘাত প্রাপ্ত ছেলেটির হাত ধরে টেনে তুলার চেষ্টা করল মানবতার খাতিরে। ছেলেটিও ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে উঠে দাঁড়াল মায়ার হাত ধরে। নিজের শার্ট প্যান্ট ঝেড়ে ময়লা ফেলছে। তখনই শুনা গেল মায়ার ভরাট সুর..

—” আপনি ঠিক আছেন? ব্যথা কি বেশি পেয়েছেন?

ছেলেটি চমকে তাকায় মায়ার দিকে। এতক্ষণ সাহায্য করাী মানুষটিকে ছেলেটি লক্ষ না করলেও এবার করল। হিজাব মাথায়! মাক্সের উপর দিয়ে মায়ার ডাগর ডাগর আঁখি জোড়ার দিকে স্থির চোখে তাকাল। মায়ার কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ। চিন্তার। ছেলেটির দৃঢ় দৃষ্টির মধ্যেই
ততক্ষণে আশেপাশের মানুষজনও জড়ো হয়ে যায় ছেলেটির এক্সিডেন্ট হওয়াকে ঘিরে। মানুষের ভিড়ে অনেকটা বাঁধ্য হয়েই ছেলেটি মায়ার উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চারপাশে তাকাতে হয়। জুইও ততক্ষণে চলে আসল মায়ার কাছে খানিকটা উত্তেজিত ভঙ্গিতে। মানুষের ভিড় থেকে মায়াকে নিয়ে রাস্তায় উঠে গেল। মায়াও সবকিছু খুলে বলল ছেলেটির আচানক এক্সিডেন্টের কথা। কোনো কারণ ছাড়া অকারণেই রিকশা উল্টে ছেলেটির এক্সিডেন্টের কথাটাও বলল। ছোট মানুষ হওয়ায় দুজনের মনেই তেমন সন্দেহ সৃষ্টি হলো না এই এক্সিডেন্টকে ঘিরে। বরং আইসক্রিম হাতে সামনে এগোল অন্য দিকে মনোযোগ না হয়ে। ছেলেটি সাধারণ পাবলিকে বুঝাল এখানে রিকশা চালকের দোষ নেই। গাড়ির চাকা হঠাৎ বেঁকে যাওয়ায় তাদের রিকশা উল্টে যায়। সাধারণ পাবলিকও বুঝল বিষয়টি। যে এক্সিডেন্ট করেছে তার সমস্যা না থাকায়। তারাও চলে যায় ঝামেলা না করে। সবকিছু মিটমাট করে আশেপাশে তাকিয়ে মায়াকে খুজল ছেলেটি। দূর প্রান্তে দুজন মেয়েকে হেটে চলে যেতে দেখে ছেলেটিও এগোল সে দিকে। বড় বড় পা ফেলে কয়েক সেকেন্ড মধ্যে মায়াদের কাছে পৌছাল। পিছন থেকে মায়াকে বেশ কয়েক বার, এই যে মিস! এই যে মিস! বলে ডেকে মায়াকে দাঁড় করালো। মায়া কপাল কুঁচকে ছেলেটির দিকে তাকাতেই। ছেলেটিও প্রসন্ন হাসি মুখে এগিয়ে মায়ার সামনে দাঁড়িয়ে কৃতজ্ঞতার স্বরুপ বলে উঠে…

—” আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়া হয়নি মিস। তাই পিছন থেকে ডাকলাম। ধন্যবাদ মিস। আমাকে বিপদের সময় সাহায্য করার জন্য। যায় হোক আমি রাফিন। আপনার নামটা?

মায়া খানিকটা হাসফাস করে একটু করে বলল..
—” ধন্যবাদ দিতে হবে না ভাইয়া। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলেও এমনটাই করতো মানবতার খাতিরে। তবে আপনি মনে একটু বেশি ব্যথা পেয়েছেন। হাত থেকে এখনো রক্ত ঝরছে আপনার। আশেপাশে ফার্মেসি পাবেন। দ্রুত ব্যান্ডেজ করে নিন।

মায়া মিষ্টি স্বরে কথায় আবারও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল ছেলেটি মায়ার চোখের দিকে। মনে হলো অনেকটা দিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল মায়াকে সামনে থেকে একটা বার দেখার জন্য। যেটা আজ পূরর্ণ হলো। মায়া বেশ থমথমে খেয়ে গেল ছেলেটির পুনরায় অদ্ভুত দৃষ্টিতে। জুইও পাশ থেকে সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকাল। ছেলেটির দৃষ্টি ঠিক মনে হচ্ছে না বিদায় মায়াকে নিয়ে চলে যেতে চাইল। মায়াও তাড়া দিয়ে বিদায় নিল ছেলেটির থেকে। মায়া দু-কদম এগোতেই পিছন থেকে ছেলেটি হালকা তেজি কন্ঠে মায়ার উদ্দেশ্য বলে উঠে..
—” আপনি বাস্তবে আরও বেশি সুন্দরী মিস। তাই সাবধানে থাকবেন। সবাই কিন্তু ভালো না।

মায়া জুই দুজন থমথমে খেয়ে যায় ছেলেটির এমন কথায়? মায়া বাস্তবে আরও বেশি সুন্দরী মানে? ছেলেটি কি মায়াকে আগে থেকে চিনে নাকি? মায়ার ছবি কি সে আগে দেখেছে? যে এখন সরাসরি পাথক্য বলে দিচ্ছে। যে মায়া ছবি থেকে বাস্তবে আরও বেশি সুন্দরী। মায়া সন্দেহ তীরে কিছু বলতে গিয়েও বলল না। অপরিচিত ছেলেদের সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলাটা বেমানান। তাই থেমে থাকা পা দুটো পুনরায় চালিয়ে এগোই বাড়ির উদ্দেশ্য। মায়ার যাওয়া দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসে রাফিন। পকেটে থেকে ফোন আর রুমাল বের করে, হাতের মাখানো কৃত্রিম রক্তটা রুমালে মুছতেই তখনকার রিকশা চালক লোকটি এগিয়ে আসল। রাফিন উদ্দেশ্য করে বলল…
—” বস গাড়ি বের করবো?
—” হুমম কর।
রাফিন ছেলেটিকে চলে যেতে বলেই ফোন লাগাল কাউকে। প্রথম রিং হতেই রিসিভ হয় রাফিনের কলটি। যেন ফোনের অপর পাশের মানুষটির রাফিনের ফোনের অপেক্ষায় বসে ছিল এতক্ষণ। রাফিন ফোন করতেই যেন জান ফিরে পায় নিজের মাঝে। ওপর পাশের কল রিসিভ হতেই আলতো হাসে রাফিন। অগোছালো কপালের চুল গুলো গোছিয়ে পিছনে দিতে দিতে বলে…

—” প্লান মাফিক অল ডান। কাজ হয়ে গেছে। আমার এন্ট্রি নেওয়া হয়ে গেছে মেয়েটির জীবনে। তবে রিদ খানের পছন্দের তারিফ করতে হবে। সেই কিউট মেয়েটি। আমার পুরো মুখটা দেখা হয়নি। তবে চোখ আর কপাল দেখেই বুঝলাম। ছবি থেকে বাস্তবে আকর্ষণ লাগল।
–“(….)
—” ইয়াহ! আই নো। ইউ জাস্ট চিল। এতো কাঠখড় পুড়িয়ে দুজনকে আলাদা করেছি। এক হতে দিব না। রিদ খানের দূরত্বটাই কাজে লাগাব আমি। মেয়েটির কথা শুনলে ভালো। নয়তো অন্য রাস্তা ধরব। তবে অবশেষে জয় আমাদের হবে। তাছাড়া রিদ খানের নাইকার সাথে এবার থেকে আমার রোজআনা দেখা হবে। কথা হবে। ভাব হবে। কারণ সাতরাজ খেলার দাবার গুটি এবার আমার হাতে। তাই রাজার রাজত্ব আমার হবে। এবং তার রানী। নিশ্চিত জিদ জেনেই মাঠে নেমেছি আমি। কাঁচা কাম করবো না। আচ্ছা আমি আসছি৷ বাকি কথা পরে হবে। রাখি বাই।
~~
মায়া আর জুই বাড়ির সামনে রাস্তায় পরিচিত কার পাকিং করা দেখেই চমকে উঠে দু’জন। একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। মায়া তৎক্ষনাৎ দৌড়াতে চাইল বাড়ির ভিতরে। কারণ মায়া খান বাড়ির গাড়ি গুলো চিনতে ভুল করল না তাই। একটা আরাফ খানের গাড়ি। অন্যটা তাদের সাথের বডিগার্ডের। অনেকদিন পর খান বাড়ির মানুষদের সাথে মায়ার দেখে হবে ভেবে, মায়া উৎফুল্লর মনে বাড়ির ভিতরে দিকে দৌড়ায়। কিন্তু তার আগেই পথে মধ্যে দেখা হয়ে যায় আরাফ খান আর হেনা খানের সঙ্গে মায়ার। মায়া খুশিতে দৌড়ে গিয়ে ঝাপটে ধরে আরাফ খানকে। তিনি আগে ছিল। আরাফ খান প্রথমে চমকে উঠলেও মায়াকে চিনতে পেরে তিনিও মায়ার মাথায় আদুরে হাত বুলায়। মায়া ফুপিয়ে কেঁদে উঠতেই পাশ থেকে হেনা খান মায়াকে টেনে নিজের বুকে নেন। মায়া হেনা খানের পেট জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ লুকিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে। হেনা খানও ঝরঝর করে কেঁদে উঠে শব্দ বিহীন। তবে কথা বলে না কষ্টে। আসলে বলার মতো কিছু নেই ।

ততক্ষণে জুইও এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। আরাফ খান জুইকে দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে আদুর করে কৌশল বিনিময় করল দুজন । হেনা খান তখনো কেঁদে মায়াকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আরাফ খান সেদিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে নিজেদের সাথে নিয়ে আসা মায়ার জন্য বিয়ের তথ্য গুলোর দিকে তাকাল। আজকে রিদের জন্য মায়ার পরিবারের কাছে বিয়ের তথ্য নিয়ে এসেছিল তাঁরা। রিদ আনুষ্ঠানিক ভাবে মায়াকে বিয়ে করতে চাই। সেই তথ্যই পাঠিয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মায়ার বাবা শফিকুল ইসলাম তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। রাজি হয়নি। উল্টো বলেছে, তিনি রিদের মতো ছেলের কাছে মেয়েকে পুনরায় বিয়ে দিবেন না। আগের বিয়েটারও শেষ করতে চাই ডিভোর্স দিয়ে। মায়াকে কোনো মতেই খান বাড়িতে পাঠাতে ইচ্ছুক নয় সে। আরাফ খান, হেনা খান অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু শফিকুল ইসলাম বুঝেন নি। নিজের সিদ্ধান্তে অটুট থেকেছে। সাথে এটাও জানিয়ে দিয়েছে রিদকে মেয়ের জামাই হিসাবে উনার পছন্দ না। মায়াকে তিনি অন্য কোথাও বিয়ে দিবেন। অজ্ঞাত শফিকুল ইসলামকে বুঝাতে ব্যথা হয়ে বাসায় ফিরে যাচ্ছেন তারা। কিন্তু নিজের স্ত্রীকে বুঝাতে পারছেন না। সেই থেকে কেঁদেই চলছে মায়ার জন্য। যবে থেকে শুনেছে মায়া খান বাড়িতে ফিরবে না আর। তখন থেকেই কেঁদে চলছে। উনাকে আর রিদকে সারাদিন দোষ দিয়েছে। তাদের জন্য মায়া আজ হেনা খানের কাছে নেই এই বলে। তাকে খান বাড়িতে একা থাকতে হয়। সবচেয়ে বেশি হেনা খান রিদকে জ্বালিয়েছে দোষ দিয়ে দিয়ে। রিদের জন্য মায়া চলে গেছে। কেন রিদ মায়াকে এনে দেয় না। যদি রিদ মায়াকে উনার কাছে খান বাড়িতে না এনে দেয়। তাহলে উনিও নাকি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন। আর আসবে না। এই বলে বলে রিদকে দোষী করেছে প্রতিনিয়ত। তবে কাল মধ্যে রাতে হুট করেই রিদ বাংলাদেশ ফিরে উনাদেরকে জানান। সে পুনরায় মায়াকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে করতে চাই। হেনা খান রিদের কথা খুশিতে আটখানা হয়ে সকালেই বিয়ের তথ্য সাজিয়ে চলে এসেছিল এখানে। কিন্তু মাঝ থেকে বেঁকে গেল মায়ার বাবা শফিকুল ইসলাম। বিয়ে দিবে না বলে। এবার আরাফ খান বাড়িতে গিয়ে রিদকে এই কথা গুলো জানালে যে কি তান্ডব হবে। সেটা ভেবেই ভয় পাচ্ছে তিনি। বিশেষ করে মায়ার পরিবারের জন্য। আরাফ খান আত্মীয়দের মধ্যে ঝামেলা চাই না। তাই নীরবে সারতে চেয়েছিল বিষয়টি। কিন্তু শফিকুল ইসলাম বেঁকে বসায় এবার রিদকে বুঝানো যাবে না। পরিস্থিতি কি হবে কি জানি। উনার করার তো কিছু নেই। কারণ আজকে শফিকুল ইসলামের সাথে কথা বলে, তিনি যতটা বুঝতে পেরেছে সে কখনোই রাজি হবে না মায়াকে রিদের হাতে তুলে দিতে। তাই তিনি এবার বিষয়টি রিদের হাতে ছেড়ে দিলেন। কারণ রিদ নিজেই তার বউয়ের ব্যস্হার করে নিবে। আরাফ খান এবার না জড়াক এই বিষয়ে।

মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে ভেবে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে আরাফ খান। ধীরে তাকালেন সামনে। ঢালা হাতে বিয়ের তথ্য গুলো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আট-দশ বডিগার্ড। তিনি ইশারা করে বলেন জিনিসপত্র গুলো গাড়িতে তুলতে রাখতেন। উনারা এখন চলে যাবে। বডিগার্ড গুলো যেতেই উনি হেনা খানকে তাড়া দিলেন বের হতে। হেনা খান কেদে মায়ার চোখে মুখে চুমু দিয়ে আদুর করে চলে গেলেন আরাফ খানের পিছন পিছন। তবে হেনা খানও হতাশ হলেন না। কারণ তিনিও জানেন, রিদ নিজের বউ নিজেই আদায় করে নিবেন শশুর থেকে। মাঝ থেকে উনিও মায়াকে পেয়ে যাবেন। হয়তো ঝামেলা হবে। দ্বন্দ্ব বাঁধনে দুই পরিবারের। তারপরও মায়াকে খান বাড়িতে নিয়ে আসবে রিদ। এতে যদি দ্বন্দ্ব হয় তাহলে হোক। কিছু দ্বন্দ্ব হওয়ায় ভালো। মায়া গেইট সামনে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল যতক্ষণ না পযন্ত খান বাড়ির গাড়ি গুলা চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য না হয় ততক্ষণ। মায়া কেঁদে বাসায় গেল। গিয়ে দেখল সবকিছুই স্বাভাবিক। তবে কেউ বসার রুমে নেই। পুরো ঘর খালি। হয়তো সবাই যার যার রুমে আছে। মায়া আর দাঁড়ালো না অনেকটা দৌড়েই নিজের রুমে গেল। খান বাড়ির থেকে মানুষ আসল অথচ কেউ মায়াকে বলার প্রয়োজনই বোধ করল না। আজকে দাদা-দাদি আসবে সেটা নিশ্চিয় আগে থেকেই মায়ার পরিবার জানতো। কারণ খান বাড়ির মানুষ জন আগে ফোন করে জানিয়ে ছিল নিশ্চয়ই। তাহলে মায়াকে কেন না জানিয়ে কলেজ পাঠাল অগোচরে। দেখা পযন্ত করতে দিল না। মায়া ঠোঁট ভেঙ্গে কেঁদে উঠে তখনই রুমে প্রবেশ করে ফিহা। একে একে মায়াকে সব বলে হেনা খান আর আরাফ খানের হঠাৎ আসার উদ্দেশ্যটা সম্পর্কে। সব শুনে মায়া স্তব্ধ নিবাক হয়ে যায়। কান্নাও থেমে যায়। খান বাড়ির থেকে মায়ার জন্য আনুষ্ঠানিক বিয়ে প্রস্তাব এসেছে তাও মায়ার জন্য? সত্যি? যে আনুষ্ঠানিক বিয়েকে ঘিরে এতো কিছু হলো। সেই বিয়ের প্রস্তাব মায়ার জন্য আসল? অবিশ্বাস ঠেকল মায়ার কাছে বিষয়টি। হতভম্ব নেয় কিছুক্ষণ তব্দা খেয়ে বসে রইলো। কিন্তু পর মূহুর্তেই মায়ার ভিতরের প্রতিবাদী সত্তাটা জেগে উঠল। মায়াকে কঠোর ভাবে শাসাল। বলল’ রিদের প্রতি দূর্বল না হতে। ভুলে না যেতে রিদ মায়ার আত্মসম্মানে প্রচুর আঘাত করেছিল সেটি। মায়াকে নিচু লেবেলের লোভী নারী বলে আখ্যায়িতও করেছিল। খান বাড়ি থেকে অপমান করে বেরও করে দিয়েছে। আর যায় হোক এতো কিছুর পর মায়া সেখানে ফিরবে না। কোনো কালেই না। করবে না সে রিদকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়ে। যেখানে মায়ার সম্মান নেই সেখানে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তাছাড়া রিদ নিজে বলেছে সে মায়াকে ভালোবাসি কখনো। সে মেহুকে চাই। তাহলে এখন মায়ার কাছে কি চাই তার? মায়াকে কি বাঁধা দিয়েছে তাঁকে মেহুকে বিয়ে করতে? দেয়নি তো। তাহলে করে নিক না মেহুকে বিয়েটা। মায়া এতেও খুশি হওয়ার চেষ্টা করবে নাহয়। তারপরও ফিরে যাবে না। মায়ার একমাস আগে রিদের সাথে নিজের আনুষ্ঠানিক বিয়েটা চাইতো। এখন চাই না। এখন মায়া রিদ থেকে কিছুই চাই না। থাকনা সে তার মতো। আর মায়ার নিজের মতো করে। মায়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে কাপড় হাতে ওয়াশরুমে যায় পাল্টাতে। মায়া নারাজ বা অখুশি হয়নি বাবার ডিসিশনে। বরং চুপ থেকে সম্মতিই দিল। যেটা কাল হলো মায়ার জন্য। কারণ যেতে যেতে আরাফ খান গাড়ির ভিতরই রিদকে সবটা জানাল আজকে ঘটনা গুলো।
~~
গোসল খাওয়ার দাওয়া শেষ করে প্রাইভেটের উদ্দেশ্য বের হলো মায়া আর জুঁই। বিকাল চারটা। গায়ে মায়ার কালো গাউন। কালো হিজাব দিয়ে। মুখে কালো মাক্স। বিষন্নতায় ঘিরা মায়া ধীরে হাটছে জুইয়ে সাথে। জুই বেশ করে বুঝতে পারছে মায়ার মনের অবস্থাটি। আজকে দুপুরে খান বাড়ির মানুষজন যাওয়ার পর থেকেই মায়াকে অনেকটা চুপচাপ দেখা যাচ্ছে। মায়ার মন ভালো করার জন্য জুইয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বলে উঠে…

—” ব্রিজের উপর যাবি রিক্তা?

মায়া সামনে রাস্তা দেখে হাঁটতে হাঁটতে বলল..
—” প্রাইভেটের কি হবে?
মায়ার উত্তরের খুশি হলো জুই। বলল..
—” কিছু হবে না। একদিন প্রাইভেট না পড়লে কিছু হবে না। চল আজকে ভৈরব যায়। ব্রিজের নিচ থেকে ফুচকা খেয়ে আসি। সন্ধ্যার আগেই চলে আসব। কেউ বুঝবে না বিষয়টি। বসায় এসে নাহয় আব্বু বলে দিব কেমন।
মায়া নিজ বাক্যে পুনরায় বলল…
—” ব্রিজের উপর দিয়ে হেটে যাবি নাকি গাড়ি করে?
—” আমার কোনোটাতেই সমস্যা নেই। তোর কি ইচ্ছা।
—” হেঁটে চল। বিকালে নদীটা সুন্দর দেখায় ব্রিজের উপর থেকে।
—” ওকে ডান!

দুজন পাশাপাশি ধরে হাটছে ব্রিজের উপর। বিকালময় সূর্যটা পশ্চিম আকাশে অনেক ঢলে আছে। ব্রিজের উপর থেকে মেঘনা নদীরকে অনেকটায় মোহাময় সুন্দর দেখায়। সারিবদ্ধ ভাবে থেকে থেকে গাড়ি আসা যাওয়া করছে দুই লাইন ধরে ব্রিজের। মায়া জুঁই পরিবেশটা উপভোগ করতে ধীরে ধীরে হাটতে লাগল। চারপাশে মৃদু মৃদু ঠান্ডা বাতাস বইছে। গাড়িঘোড়া পেপু শব্দও বেশ হচ্ছে। আবার নদীর উপর ভাসমান, নৌকা, জাহাজ, নিরিখে চলাচল করছে। মায়ার দৃষ্টি নিচে পানির উপর। তখনই হঠাৎ ডেকে উঠে জুঁই। কুচি ডাবের পানি খাবে বলে। মায়াও এতে সম্মতি দিল। দু’জন গিয়ে দাঁড়াল ভ্যান এর সামনে। জুই দু’জনের দু’টো ডাব কাটতে বলে দাড়ালো লোকটিকে। আশেপাশে ব্রিজের উপর বেশ অনেক মানুষের চলাচল আছে। আবার দুই একজন ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে ডাবের পানিও খাচ্ছে। মায়া জুই দুজন দু’টো ডাব হাতে তুলে নিল। মায়া ডাবের পাইবে চুমুক বসিয়ে সামনে থাকতেই হঠাৎ আঁতকে উঠল। ভয়ে শিহরিত হয়ে উঠল মায়ার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। প্রচন্ড ভয়ে প্রভাবে কি করবে বুঝতে না পেয়ে। মায়া হিতাহিত অজ্ঞ হয়ে আতঙ্কে ঠাস করে হাতের ডাব ফেলে উল্টে ঘুরে দৌড় লাগায় প্রাণপূর্ণ। কোথায় যাবে জানা নেই। শুধু জানে প্রাণের তাগিদে দৌড়াতে হবে। নিজের উত্তেজনায় মায় পিছন থেকে জুইয়ের ডেকে উঠার ডাক গুলো শুনলো না। কারণ মায়া জানে জুই এই মূহুর্তে সেইফ থাকলেও মায়া সেইফ না। আপাতত মায়া এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারলে তারপর জুইয়ের খবর নিবে সে। মায়া যেন জানটা হাতে নিয়ে দৌড়াতে চাইল সামনে। কিন্তু তাতেও বিশেষ লাভ হলো না। কিছু পথ দৌড়াতেই মায়াকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরলো প্রায় ত্রিশ চল্লিশ জন্যের মতো পারদর্শী বডিগার্ডরা। আতঙ্কে মায়া জায়গায় থেমে যায়। অস্থির চোখে পালানোর সুযোগ খুঁজে। কিন্তু পেল না। তাই ব্রিজের পাশে দেয়ালে চেপে দাঁড়াল। ঘনঘন নিশ্বাস নিল হাঁপাতে হাঁপাতে। তরতর করে ঘাম ছুটে গেল শরীরে তৎক্ষনাৎ। ভয়ে মায়া বার কয়েক শুকনো ঢুক গিলতেই, আচানক একটি কালো মার্সিডিস গাড়ি থামে মায়া থেকে খানিকটা দূরে। গাড়িটি দেখে আরও আতঙ্কে উঠে মায়া। পালানোর সুযোগ না পেয়ে কম্পন ধরে যায় শরীরে। ভীতু চোখে গাড়ির দিকে তাকাতেই, গাড়ি থেকে বের হয়ে আসে রিদ। একহাতে ধারালো অস্ত্রে অন্য হাতে সিগারেট। অতি শান্ত। অতি স্বাভাবিক। রিদ গাড়ি থেকে বের হয়ে হতে সিগারেটটি ধরাল। লাইটার পাশে ফেলে দিয়ে টান দিল সিগারেটে। কয়েক কদম হেঁটে গাড়ির সামনের ডিক্কি উপর লাফিয়ে বসল পা ঝুলিয়ে। মায়ার দিকে তখনো পযন্ত তাকাল না। ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেট রেখে হাতের ছুরিটি নিজের পাশে ডিক্কির উপর রেখে সব মনোযোগ দিল সিগারেট খাওয়াতে। রিদের প্রতি টান সিগারেটের সাদা ধোঁয়া উড়িয়ে দিচ্ছে খোলা আকাশের দিকে। মায়াকে দেখলো কি দেখলো না। তাও জানা নেই। তবে রিদের নিদারুণ অ্যাটিটিউড চোখে পড়ার মতো ছিল সবার। চেহারা শান্ত তারপরও নিষ্ঠুরতম একটা ভাব। থমথমে পরিবেশে কারও মুখে কথা নেই। রিদ সম্পূর্ণ সিগারেট শেষ করে পুনরায় লাফিয়ে নামল গাড়ির উপর থেকে। পাশ থেকে ছুরিটি হাতে তুলে এবার তাকাল মায়ার দিকে। মায়া রিদকে নিজের দিকে এগোতে দেখে আতঙ্কে উঠে আরও চেপে গেল ব্রিজের দেয়ালের সাথে। কিন্তু জায়গায় না থাকার মায়া পালাতে চাইল। সামনের দিকে দৌড় দিতে গেল বিশাল বডিগার্ডের বেড় পড়ল। আতঙ্কিত মায়া থামে। পিছন ঘুরে রিদের দিকে তাকাতে চাইলে তার আগেই শিকার হয় রিদের দাবাং হাতের তলে। রিদ মায়ার বাহু টেনে ব্রিজের সাথে ঠেসে ধরে গলায় দক্ষ হাতে ছুরি ঠেকিয়ে। মায়া কিছু বুঝে উঠার আগেই রিদ মায়ার গলায় ছুরি চাপায়। মায়ার কম্পিত শরীরে ভয়ার্ত চোখে ঝলঝল করে উঠলো রিদের হিংস্র রক্তিম লাল চোখ জোড়া। রিদের আছড়ে পড়া নিশ্বাস মায়া গ্রহণ করছে নিজের শ্বাসের সাথে। মায়া রিদের চোখের দিকে তাকাতে রিদ রাগে রি রি করে দাঁতে দাঁত পিষে বলে…

—” মেরে দেয়? দেয় মেরে! বাপ বেটি মিলে আমাকে মারার ধান্দা করেছিস? ছেড়ে দিব আমি তোদের ভেবেছিস? আমি বাঁচতে না পারলে তোদের বাপ-বেটিকে বাঁচতে দিব? জান নিয়ে দিব না? সবার আগে তোকে মারব। তোর জন্য আমার সবকিছু হারাম হয়ে যাচ্ছে। শান্তি পাচ্ছি না কোনো কিছুতে। যত নষ্টের মূল তুই।
.
(সরি এতো দেরি করে দেওয়ার জন্য!)
.

চলিত…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply