Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬২


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

(কার্টেসী বা কপি করা নিষেধ। শেয়ারিং ছাড়া)
৬২
সন্ধ্যা ৭ঃ১০। ধরনীর বুকে অন্ধকার। বরের গাড়ির থামল আরিফের বাসার গেইটের সামনে। আরিফ গাড়ির দরজা খুলার আগেই মায়া গাড়ির দরজা খুলে বের হয়ে যায়। আশেপাশে নারী-পুরুষের ভিড় ঢেলে গেইট ধরে সোজা বাড়িতে ঢুকে গেল নিজের রুমের উদ্দেশ্য। কারও দিকে তাকাল না। কথা বলল না। আরিফ কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। সুরু চোখে মায়ার চলে যাওয়ার দিকে এক পলক তাকিয়ে জুইকে’ বলল ‘ ফিহাকে নিয়ে বের হতে। জুই তাই করল। ফিহাকে গাড়ি থেকে ধরে বের করল। আরিফ পিছনে দাঁড়িয়ে রইল। আত্মীয়স্বজন ও আশেপাশে বাড়ি ঘরে মানুষজন জড়ো হয়ে আছে গাড়ির সামনে বউ দেখবে বলে। সম্পর্কে আরিফের ভাবিরা ফিহাকে ধরে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলো। ফিহা কাঠপুতুল ন্যায় নত মস্তিষ্কের দাঁড়ালো ছোট উঠানের বিছানো পাঠির উপর। আরিফকেও ফিহার পাশাপাশি দাঁড় করালো সবাই। নিয়ম-নীতির পালন করার জন্য রেহেনা বেগমের নতুন ডালা হাতে এগিয়ে আসলো। চারপাশে নারী-পুরুষ, বাচ্চা-কাচ্চা ভিড় জমে আছে বর বউকে ঘিরে। জুই নতুন বোল ভরতি খালি পানি রাখল ফিহার সামনে। রেহেনা বেগম ধান, দূর্বা, ফুল একত্রে ছিটিয়ে বরণ করল ফিহা আরিফকে। ফিহা খালি পানিতে হালকা পা ঢুবিয়ে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে আরিফের কোলে চড়ে। ফিহাকে বসা রুমে বসানো হলো আগাত অতিথিরা বউ দেখবে বলে। দীর্ঘ সময় নিয়ে ফিহাকে বউ দেখানো ও হলো। রাত দশ-টা নাগাদ রেহেনা বেগম ফিহাকে জুইয়ের রুমে পাঠাল খাবার দিয়ে। জুই ফিহাকে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে দেখল পূবে থেকেই রুম অন্ধকার করে বারান্দায় বসে আছে মায়া। রুমের আলো জালাল। তীব্র কান্নার ফুঁপানো শব্দ কানে আসতেই দুজন চমকে উঠে, একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। বুঝতে পারল মায়ার কান্না শব্দ। ফিহা তৎক্ষনাৎ জুইয়ের হাত চেপে ধরে পাশে ইশারা করে। জুইয়ের অবস্থাও সেম। মায়ার হঠাৎ কান্নার কারণটা বুঝতে পারছে না দু’জনই। মায়ার মনে অবস্থা জানতে চাই কিন্তু সবার সামনে না। জুইয়ের নিজের পাশের কাজিনদের ছলেবলে কৌশল খাটিয়ে বলল’ ফিহাকে ড্রেস চেঞ্জ করাবে, তাই তারা কিছু সময়ের জন্য নিচে যেতে। জুইয়ের কথা অনুযায়ী সবাই চলে যেতেই ফিহা তৎক্ষনাৎ এগোল মায়ার দিকে। হালকা অন্ধকারময় বারান্দায় দেখল মায়া অগোছালো অবস্থায় ফ্লোরে বসে বে’তের সোফায় মাথা গুঁজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। ফিহা ভারি লেহেঙ্গায় দ্রুত বসল মায়ার পাশে। মায়ার মাথা হাত রেখে উত্তেজিত কন্ঠে প্রশ্ন করল ‘ কি হয়েছে মায়া? কাঁদছিস কেন তুই?
মায়া নিরুত্তর। ততক্ষণে জুইও রুমের দরজা লাগিয়ে এসে বসল মায়ার অপর পাশে। ফিহার মতো করে সেও একি ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল মায়াকে। মায়া উত্তর করলো না। আর না নড়াচড়া। বরং ফুপিয়ে উঠা কান্নায় এবার শরীরটা নড়ছিল তীব্র। ফিহা মায়ার হাত টেনে নিজের মুখোমুখি বসায়। মায়ার বিধস্ত নাজেহাল চেহারাটা দেখেই আঁতকে উঠে দুজন। পুরো মুখ মেকাপে লেপ্টে জমে গেছে ঘাম ও চোখের পানিতে। দুচোখের পাতাও লাল হয়ে ফুলে গেছে। দু-গালে থাপ্পড়ের জায়গায় গাঢ় কালচে হয়ে আছে। খোঁপা থেকে এলোমেলো চুলে বের হয়ে পুরো পাগল বেশ বসে আছে। ফিহা আঁতকে উঠে আঁজলে মায়ার গাল ধরে বলে…

—” মায়ু সোনা কি হয়েছে তোর? আমাকে বল! এ কি হাল বানিয়েছিস নিজের? কাঁদছিস কেন? বল না আমায় বোন। কেউ কিছু বলে তোকে?

কাঁপা কাঁপা ঠোঁট ভেঙ্গে ফুপায় মায়া। বুক ফাটা আতনাদে অঝোরে চোখের পানি গাল বেয়ে গলার নিচ অবধি গড়াচ্ছে। ফিহা মায়া গাল মুছে দিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করে ‘কি হয়েছে জানতে’। মায়া বলল না। বরং ঢলে পড়লো ফিহার বুকে। দু’হাতে ফিহার কমড় জড়িয়ে ধরে শব্দ করে ডুকরে কেঁদে উঠে মায়া। অঝোরে ফুপিয়ে বলে..

—” আমি হেরে গেছি ফিহা আপু। আমার ভালোবাসা হেরে গেছে। আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। আমার সংসার করতে চাওয়া আশাটা অপূর্ণ রয়ে গেছে। আমি আর কখনো উনাকে পাবো না। উনি আমাকে নিজের জীবন থেকে আজ চিরতরে বের করে দিয়েছে। আমি অযোগ্য! আমাকে একরাতের বিছানা নেওয়া যায় কিন্তু সংসার করা যায় না। আমাকে আঘাত করেছে। অপমানের সহিত বের করে দিয়েছে নিজের জীবন থেকে। আমার সংসার চাই না। আমার উনার ভালোবাসাও চাই না। আমার কিচ্ছু চাই না। আর না কখনো ফিরতে চাই উনার জীবনে। আমার কষ্ট হচ্ছে আপু। নিজের ফিলিং গুলোও সামলাতে পারছি না আমি। কষ্ট আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে গলা ফেটে পাগলের মতো চিৎকার করলে হয়তো নিজের ভিতরের কষ্ট বের হবে। নয়তো না। আমার কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে আপু। আমার উনার প্রতি ফিলিং গুলো আমি কন্ট্রোল করতে পারছি না আপু। হয় তোমরা আমাকে উনাকে ভুলার উপায় বলে দাও! নয়তো আমার কষ্ট গুলো কমিয়ে দাও। আমি নিতে পারছি না। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। কান্নাও থামাতে পারছি না। প্লিজ আপু তোমরা আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলো। কয়েকটা দিনের অসহ্য যন্ত্রণা থেকে আমাকে মুক্তি দাও। প্লিজ আমাকে মুক্তি দাও আপু। আমি মুক্তি চাই।

মায়ার কান্নায় কেঁদে উঠে জুই ফিহা দুজনই। বুঝতে পারে রিদের সাথে মায়ার ভয়াবহ কিছু হয়েছে। মায়ার কথা যতটুকু বুঝলো। রিদ মায়াকে নিজের জীবন থেকে চলে যেতে বলেছে। হয়তো দুজনের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়েছে। যেটা মায়া মেনে নিতে পারছে না। পারার কথাও না। মায়ার উঠতি বয়সের আবেগ ভালোবাসা সবটায় রিদ। মায়া রিদের বাহিরে কাউকে দেখার সুযোগই পায়নি। রিদ নিজেই দেখতে দেয়। তাছাড়া অল্প বয়সের কিশোরীদের মনোবল খুবই নরম হয়। বেশ আবেগি হয়। তাদের বিবেক বুদ্ধি চেয়ে আবেগটায় কাজ করে বেশি। মায়া তরুণ কিশোরী। তাই রিদের প্রতি নিজের আবেগ ভালোবাসাটা সামলাতে পারছে না। হয়তো মায়ার জীবন রিদ নেই এই জিনিসটাই মেনে নিতে পারছে না। ফিহা মায়ার বিষয়টি বুঝতে পারলেও, রিদের বিষয়টি বুঝতে পারছে না। রিদ অবুঝ নয়। অবশ্যই না বুঝে কোনো কিছু করবে না। তাছাড়া তাদের পুরো পরিবার দেখেছে রিদের মধ্যে মায়ার জন্য পাগলামো। মায়াকে দুবার বিয়ে করে নিজের স্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে সবাই সামনে। তাহলে এখন হঠাৎ করে এমনটা কেন করলো?৷ এটাই প্রশ্ন! ফিহা আর কিছু ভাবতে পারলো না। মায়াকে দুহাতে ঝাপটে ধরলো বুকে। জুইও কেঁদে উঠে মায়ার আতনাদের কান্নায়। পিছনে থেকে সেও মায়াকে জড়িয়ে ধরে ফ্লোরে বসে। ফিহা মায়া আশস্ত করে জানতে চাইল আসলে কি ঘটেছিল তাদের মধ্যে। মায়া তেমন কিছুই বলল না। শুধু এতটুকু বলল তাদের মধ্যে সম্পর্কের ছিন্ন হয়েছে ব্যস। আজকে মেহুর মায়ার কাছে আর পর মায়া গিয়েছিল রিদের কাছে। তখনই ঘটে সবটা। আর সেই সবটা মায়া চেপে গেল ফিহা থেকে। আপাতত কাউকে কিছু বলার মানসিক নেই। ফিহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়াকে আশস্ত করে বলে…

—” দেখ মায়ু! রিদ ভাইয়ের সাথে তোর কি হয়েছে আমি জানি না। তবে এতটা বলতে পারি রিদ ভাই অকারণে কোনো কাজ করবে না। আমরা চিনি রিদ ভাইকে। ছোট থেকে দেখে আসছি উনাকে। আমার মনে হয় তোর কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। রিদ ভাই তোকে নিয়ে সাংঘাতিক পজেসিভ। আমরা সবাই দেখেছি সেটা। রিদ ভাই সবসময় নারী, সংসার, খান বাড়ির, সম্পর্কের বন্ধন, বাংলাদেশ থেকে দূরে থাকতো! কিন্তু একটা সময় তোর জন্য ভাই সে সবকিছু সাথে জড়িয়েছে। রিদ ভাইেয়র সম্পর্কধরদের মধ্যে আমরা পড়ি না তুই ছাড়া। আমার মনে হয় তো…

ফিহা কথা শেষ হতে না দেখে মায়া ভেজা গলায় শুধালো…
—” আমার ভুল হচ্ছে না আপু। উনি নিজেকে আমাকে বলে উনি আমাকে নয় মেহু আপুকে ভালোবাসেন। তাকে বিয়ের করতে চাই। আমি নাকি উনার টাইপের না। উনার সাথে আমার নাকি যায় না। আমি অযোগ্য নারী উনার পাশে। আমার সাথে এক রাতের বিছানায় যাওয়া যায়। কিন্তু বউ করে সংসার করার যায় না। আমার লেবেল নিচু। তাই নিচু লেবেল অনুযায়ী স্বপ্ন দেখতে! কাউকে ভালোবাসতে। সংসার করতে। উনার অপেক্ষা না করতে। খান বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতেও বলেছে। এত কিছুর পরও বলবে আমার ভুল হচ্ছে।

কথা গুলো বলতে বলতে শরীর কাপিয়ে অঝোরে ডুকরে কেঁদে উঠে মায়া ফিহার বক্ষতলে। মায়া কথা
জুই চমকে উঠে এতক্ষণে মুখ খুলে বলল…
—” জিজু তোকে সত্যি এসব কিছু বলেছে রিতু?
—” হুমমম।
জুই কেঁদে উঠে মায়ার কান্না দেখে। ধীরে ধীরে মায়ার কান্নার বেগ বাড়তে লাগল। জুই ফিহা কি বলে মায়াকে সান্ত্বনা দিবে তারও ধারণা নেই। জুই মায়ার বাহু টেনে নিজের বুকে আনল। দুহাতে মায়াকে জড়িয়ে ধরতেই মায়া কান্নায় অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল…
—” জুন্নু আমার ভিষণ কষ্ট হচ্ছে। আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। তুই আমার কষ্টটা কমিয়ে দে না। আমার শান্তি চ চাই । আ আম আমি…..

কথা গুলো বলতে বলতে জুইয়ের বুকে জ্ঞান হারায় মায়া। অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর দীর্ঘ সময় নিয়ে কান্নার ফলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মায়া জ্ঞান হারাতেই ডুকরে কেঁদে উঠে জুই। মায়ার বেহাল দূরদর্শা নিতে পারছে না তাঁরা কেউ। ফিহাও নিশব্দে কেঁদে উঠে।দু’জন ধরাধরি করে মায়াকে বিছানায় শুয়াল। বাড়ি ভরতি মেহমান, আত্মীয়স্বজন। এমনত অবস্থায় মায়ার কথা জানালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যাবে। মায়াকে নিয়ে কানা খসা করবে। খারাপ বলবে। তাছাড়া এখনো মায়া ঠিকঠাক ভাবে তাদের কিছু জানায় নি আসলে তাদের দু’জনের মধ্যে কি হয়েছে আজ। ফিহা পরিস্থিতি সামল দিতে জুইকে বুঝাল। আপাতত মায়ার পাশে থাকতে। কাউকে কিছু না জানাতে। কাল মায়ার থেকে সবটা জেনে তারপর নাহয় বাড়ির গুরুজনদের জানাবে। জুই সম্মতি দিল। মায়ার ড্রেস করাল। কপাল ভিজিয়ে মুখ মুছে দিল। ফিহাও রাত বারোটা পযন্ত মায়ার পাশে বসে রইল।
~~
রাত বারোটা দিকে ফিহাকে দেওয়া হয় আরিফে ঘরে। ফুলে ফুলে ভরপুর বাসর ঘরে ঢুকতে চমকে উঠে ফিহা। জড়তায় নিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে লেহেঙ্গার দুপাশ। আরিফের খালাতো ভাবি, বোনরা ফিহাকে বিছানা বসিয়ে দরজা চাপিয়ে চলে যেতেই ফিহা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়া। নাটক করা শেষ। এবার রিয়েলিটি চলবে। ফিহা হাত বাড়িয়ে বিছানা উপর থেকে সবগুলো লাল গোলাপের পাপড়ি ঝেড়ে ফেললো ফ্লোরে উপর। গোছগাছ করে পরিপাটি করলো নিজের বিছানাটি। ডেসিং টেবিলের সামনে থেকে টেনে নিজের টলি ফ্লোরে রেখে গোলাপি রঙের শাড়ি হাতে নিল। সেম কালারের ব্রাউজ, পেটিকোট নিল। টাওয়াল হাতে সোজা ঢুকল ওয়াশরুম। ঘন্টা খানিকটা সময় বাঁধিয়ে গোসল শেষ করল মুখের মেকাপ আর চুল ঠিক করে। গোসল শেষে মাথায় সাদা টাওয়াল বেঁধে বের হতেই দেখল আরিফ বিছানার পাশে বসে। দৃষ্টি তার দিকেই তাক করা। গায়ের শেওরানি খুলে সাদা পাঞ্জাবি পড়া। ফিহা দেখেও না দেখার মতো করে আয়ন সামনে দাঁড়াতেই শুনা গেল আরিফের গলা…

—” এই অসময়ে গোসল করলে কেন? নতুন জায়গায়! এখানের পানিও নতুন তোমার জন্য। সমস্যা হবে তো তোমার।

ফিহা উত্তর করলো না। বরং আরিফের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অপেক্ষা করে রোজকার মতো হাতে পায়ে লোশন মাখল। ভেজা চুল টাওয়ালে ভালো ভাবে মুছল। কবাট থেকে নকশীকাঁথা বের করে সোফার উপর রেখে সুন্দর সাবলীল ভাষা বলে উঠে…

—” যাও উঠো! সোফায় গিয়ে শুও। আমার ঘুম পাঁচ্ছে। আমি ঘুমাব। আম্মু বলেছে কাল একটু সকালে উঠতে। তাই এখন ঘুমাতে চাচ্ছি। যাও! আমার বিছানা থেকে উঠো।

ফিহার সহজ সরল কথায় শকট খায় আরিফ। তার সদ্য বিয়ে করা বউ তাকে বিছানা থেকে উঠিয়ে দিচ্ছে সে কি শকট হবে না।
—” আমি সোফায় কেন শুবো। আমি তোমার সাথে বিছানায় শুবো৷ তাছাড়া এটা আমার বিছানা।

—” উহুম! তোমার বিছানা ছিল কবুল বলার আগ পছন্দ। এখন এটা আমার। তোমার যা কিছু আছে এখন থেকে সব আমার। তাই আমার বিছানায় তোমার জায়গায় নেই। যদি বলো তুৃমি বিছানা ছাড়া ঘুমাতে পারো না। তাহলে সুন্দর করে রুম থেকে বের হয়ে যাও। অন্য কোনো রুমে গিয়ে আরাম করে বিছানা ঘুমাও। কেউ তোমাকে ডিস্টার্ব করবে না। কিন্তু তুমি যদি এই রুমে, এই বিছানায়, আমার সাথে ঘুমাতে চাও? তাহলে আমি চিৎকার করে করে বাড়ির সকল মানুষজনকে দরজার বাহিরে দাঁড় করবো। সাথে কেঁদেকুটে এই নালিশ দিব যে, তুমি আমার উপর জোর খাটাচ্ছো আমার পিরিয়ড চলছে জেনেও। এখন এটা যদি বাড়ির মেহমানরা শুনে তখন তোমার আদর্শ, নীতি, ইজ্জত কই যাবে বুঝতে পারছো তো?

ফিহার বেগিত কথা চমকে উঠে আরিফ। ফিহা অভিমান ঠিক আছে! তাই বলে বাসর ঘরে স্বামীকে বের করে দিবে মিথ্যা অপরাধ দিয়ে। তাছাড়া আজকে তাদের বাসর। প্রকাশ না করলেও এই রাতটা জন্য দু’জন অপেক্ষা ছিল। এই রাতটা কি রোজ রোজ আসবে তাদের জীবনে? এই ভাবে নষ্ট করা কি ঠিক হবে? আরিফ ফিহাকে বুঝাতে চাইল। গোছানো কথা বলল…

—” তোমার রাগ, তোমার অভিযোগ কোনো কিছুই আমি অস্বীকার করছি না ফিহু। তুমি তোমার জায়গায় ঠিক আছো। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকেও বাঁধ্য করেছে, তোমাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। বাঁধ্য দুজন ছিলাম। অতীত আমাদের বিষাক্ত। কিন্তু তাই বলে অতীত ধরে জীবনের বর্তমান সময় গুলো নষ্ট করার মানেই বোকামি। আমি কোনো বোকামি করতে চাই না ফিহু। তোমার জন্য আমি আমার বর্তমান সুখের মূহুর্ত গুলো নষ্ট করব না অবশ্যই।

—” তুমি যেটাকে সুখের মূহুর্তে বলছ! সেটা এই মূহুর্তে আমার কাছে বিষাক্ত বিষ মনে হচ্ছে। তোমার আর আমার আম্মু জন্য আজ আমি অনেক কিছুই হারাতে পারতাম আরিফ। আমি মরতে গিয়েছিল তোমাদের দুজনের ডিপ্রেশনে। তুমি তোমার আদর্শে অটুট। আম্মু উনার বাস্তবতায়। মধ্যে থেকে আমি পিষ্ট ছিলাম তোমাদের দু’জনের যুক্তিতে। তোমরা কেউ আমার দিকটা বুঝতে চাও নি। আর না আমি তোমাদেরকে বুঝাতে পারছিলাম। বিগত কয়েকটা দিন আমার মরণ যত্ন সামিল কেটেছে। মরতে না গেলে হয়তো আজও তোমরা দুজন বুঝতে আমার দিকটা। আমার ভালোবাসাটা। আজ যদি আমি মরে যেতাম! তাহলে তোমরা ঠিকই ভালো থাকতে আমাকে ছাড়া। হয়তো দুইদিন কাঁদতে। কিন্তু আমার জন্য তোমাদের জীবন থেমে থাকতো না। দিন শেষ আমি তোমাদের জন্য সবকিছুই হারাতাম। যে বাসর ঘরের মূহুর্তেটাকে তুমি সুন্দর মূহুর্তে বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছো? আজ আমি মরে গেলে, তোমার এই বাসর ঘরে আমার জায়গায় অন্য নারী বসে অপেক্ষা করতো তোমার। আমার সংসারটাও অন্য কারও হতো। আমার তোমাকে এই জীবনে, ঐ জীবনে, দুই জীবনেরই পাওয়া হতো না কখনো আরিফ। পরিবারের চাপে তুমি বিয়ে করলেও! জীবনের একটা সময়ে গিয়ে তুমি ঠিকই আমাকে ভুলে যেতে আরিফ। আমার মা তুমি দুজনই স্বাথপর। জীবন আমার অথচ ডিসিশন তোমাদের হাতে। তাই আমিও তোমাদের কাউকে ক্ষমা করবো না। মা হিসাবে কিছু বলতে না পারলেও স্বামী হিসাবে তোমাকেও ছাড়ব না আরিফ। ভালোবাসে ছিলাম দু’জন। অথচ ভালোবাসার লড়াই শুধু আমি একা করে গেছি। তুমি ছিলে না আমার সাথে। বরং আমাকে মৃত্যু মুখে টেলে দিয়েছো বারবার। ইগনোর করেছ। যোগাযোগ বন্ধ রেখেছ। বারবার ফিরিয়ে দিয়েছ। আমি ভুলিনি কিছু আরিফ। সবকিছুর শোধ এবার আমি তুলব তোমার থেকে। তাই
প্রথমে ভেবেছিলাম, তোমাকে বিয়ে না করে শাস্তি দিবে। পরে দেখলাম! আমাকে বিয়ে না করে তুমি এমনিতেই ভালো থাকবে। কারণ পারিবারিক সমস্যা কথা চিন্তা করে হলেও তুমি তোমার মনকে বুঝিয়ে মানিয়ে নিবে। আমাকে ভুলেও যাবে। তাই আগে নিজের জায়গায়টা শক্ত করলাম। তোমাকে শাস্তি দেওয়ার ধরণটা একটু পরিবর্তন করলাম। তোমার বউ আমি হতে চেয়েছি। হয়েছিও। তুমি করতে চাও নি। সমস্যা নাই। আমার জায়গায় সারাজীবনের জন্য বাঁধা হয়ে গেছে তোমার জীবনের। ব্যাস শেষ! তোমার কোনো এক্সপেক্টেশন আমার কাছে থাকবে না। এই রুমের বাহিরে নাম মাত্র বউ আমি তোমার। এই রুমের ভিতরে তুমি তোমার মতো, আমি আমার মতো। আমার তোমার পরিবার দরকার ছিল। যেটা আমি পেয়ে গেছি তোমাকে বিয়ে করে। তোমার পরিবার আজ থেকে আমার পরিবার। প্রতিটা সদস্য আমার আপনজন হবে শুধু তুমি ছাড়া। তুমি কি করবে সেটা তুমি জানো। তবে ভুলেও আমার সাথে জোর খাটাতে আসবা না। তাহলে চিৎকার করে আব্বু আম্মু ডাকবো এই রুমে। ইজ্জত বাঁচাতে চাইলে সবসময় আমার থেকে দূরে থাকবা। আর একটা কথা, এই রুম, এই রুমের প্রতিটা জিনিসপত্র আজ থেকে আমার শুধু তুমি ছাড়া। এবার যাও গিয়ে ঘুমাও। উঠো।

ফিহার মনের জমানো গাঢ় কষ্টটা বুঝল আরিফ। ফিহা নিজের দিক থেকে ঠিক। কিন্তু আরিফেরও একটা দিক আছে। আরিফ উঠে এগিয়ে আসতে চাইল ফিহা দিকে। অসহায় কন্ঠে বলল চাইল…
—” ফিহু আমার পরিস্থিতি…
আরিফকে বলতে না দিয়ে বিরক্তি সুরে বলল ফিহা..

—” তোমার পরিস্থিতির হিসাব গিয়ে সোফায় করো যাও৷ আমি ঘুমাব।

অগাত আরিফ দীর্ঘ নিশ্বাস সাথে উঠে গিয়ে সোফায় বসল। কাকে যে বুঝাবে মনে দুঃখটা। আদৌ ফিহাকে কখনো নিজের পরিস্থিতিটা বুঝতে সক্ষম হবে কিনা তাও জানা নেই তাঁর। ফিহা সুইসাইড এটেম খবরটি আরিফের কানে আসায় তার কি অবস্থা হয়েছিল। সে কতটা থমকে গিয়েছিল একমাত্র সেই জানে। আরিফ সোফায় শুয়ে গায়ে কাঁথা টানল। চোখের উপর হাত রাখতে গিয়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকাল বিছানায়। ইতিমধ্যে ফিহা গায়ে কাঁথা টেনে শুয়ে পড়েছে আরাম করে। রুমের লাইটও নিভিয়ে দিয়েছে। আরিফ বাকা হয়ে ফিহা দিকে কাত হয়ে শুলো। অন্ধকার রুমে বিছানার দিকে তাকিয়ে থাকল বিষন্ন মনে। আজ এই রাতটা ভালোবাসাময় হতে পারত। ভুল বুঝাবুঝি না হয়ে। বাড়ি ভরতি মেহমান বিদায় সিনক্রিয়েট করতে চাই না সে। তবে ভালোই ভালোই বউভাত শেষ হলেই ফিহাকে নিয়ে আরিফ চট্টগ্রামে চলে যাবে। দু’জন একা থাকবে। তখন দেখবে আরিফ ফিহা রাগ, অভিযোগ কতটা আছে তার জন্য।
~~
পরদিন আরিফের বউভাত হলো। খান বাড়ির থেকে সবাই আসল। রিদ ছাড়া। আয়নও আসল। ভালোই ভালোই বউভাতের অনুষ্ঠান শেষ করল মেরেজ হলে। মায়া বউভাতের অনুষ্ঠানে গেল সাদামাটা হয়ে। ফিহা জুই মায়াকে অসুস্থ বলে চালাল সবার সামনে। সবাই বিশ্বাসও করল। কারণ তখনো মায়ার গায়ে বেশ জ্বর ছিল। হেনা খান আরাফ খান মায়াকে নিজের পাশে নিয়েই থাকল সারাটা সময়। নিজেদের থেকে আলাদা করল না। যাওয়া সময় মায়াকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু মায়া যেতে চাইনি। হেনা খান মনে করলেন ভাইয়ের বিয়ের জন্য মায়া হয়তো আরও কিছু দিন বেড়িয়ে ফেরবে খান বাড়িতে। মায়া চুপচাপ হেনা খানের পাশে বসে সারাটা সময় পার করল। মায়া হেনা খানের মুখে শুনেছিল রিদ নাকি দেশে নেই। ফিহার বিয়ের দিন রাতেই নাকি দেশের বাহিরে চলে গেছে। কবে ফিরবে বলে যায়নি। মায়া চুপচাপ শুনলো হেনা খানের কথা গুলো। কষ্ট কান্নায় মায়ার চোখ গুলো তখনই ভিজে উঠেছিল। মায়া নিজেকে সংযম করতে হেনা খানের কাঁধে মাথা হেলিয়ে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বসেছিল বেশক্ষণ। একটা সময় মায়া শান্তও হলো। নিজের কান্না আটকালো। তবে নিয়ম অনুযায়ী ফিহাকে নিয়ে আরিফ ‘চৌধুরী বাড়িতে’ ফ্রিরযাত্রায় যেতে হবে। গেলও। যাওয়ার সময় ফিহা জুইকে আর মায়াকে সাথে করে নিতে চাইল। কিন্তু মায়া গেল না। নিজের বাড়িতেই থাকল। জুইও মায়ার জন্য প্রথমে যেতে চাইনি কিন্তু মায়া আশস্ত করল যেতে। অগাত মায়াকে রেখে সবাই চলে গিয়েছিল সেদিন। ফিহাকে নিয়ে আরিফ তাদের বাড়িতে দুদিন থেকে পুনরায় নিজের বাড়িতে চলে এসেছিল। এসেই আরিফ ফিহাকে নিয়ে চট্টগ্রাম চলে যেতে চাইল। কিন্তু ফিহা গেল না বরং স্পষ্ট ভাষায় জানাল আরিফকে” আরিফের সাথে সে কোথাও যাবে না। আরিফের যেখানে খুশি সেখানে যেতে।
আরিফ ক্ষুব্ধ মনে সেদিন একাই চলে গিয়েছিল চট্টগ্রামে ব্যবসার চাপে পরে। শফিকুল ইসলামকে নিয়ে দশদিন হসপিটালের থাকা। তারপর নিজের বিয়ে, ফিহাকে তার পুনরায় হসপিটালের থাকা। সবকিছু মিলিয়ে আরিফের ব্যবসার দিকে বিগত কয়েক দিন মনোযোগ হতে পারেনি। তাই ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে ভেবে অনেকটা বাধ্য হয়েই সে চলে যায়। দিন এভাবেই চলতে থাকে। সবার সকল ব্যস্ত পার হয়ে স্বাভাবিক দিনে পরিবর্তন হলো। মায়াও চঞ্চল হরিণীর থেকে অতিব্য শান্ত হয়ে উঠল। সারাদিন যায় তার রুমের ভিতর। কারও সাথে বেশ একটা কথা বলতে চাই না। রাতটা পার হয় কান্নায়। মায়া খান বাড়ির থেকে এসেছে আজ গোটা বিশ দিন হলো। আজকাল জুইও নিজের কলেজে যেতে শুরু করেছে। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে সে মায়া সাথে বাকিটা সময় কাটায়। ফিহাও মায়ার সঙ্গে দেয়। মায়া যেন হুট করেই বড় হতে শিখে গেল। অপ্রয়োজনীয় কথা বা আচরণ কোনোটায় নেই তার মাঝে। এর মধ্যে খান বাড়ির থেকে রোজ কল আসে মায়ার চলে যাওয়া নিয়ে। মায়া সবার সাথে নরমাল কথা বললেও খান বাড়িতে যাবে এমনটা বলে না। এরিমধ্যে শফিকুল ইসলামও একটা ডিসিশন নেন। মায়ার সাথে তিনি বিগত কয়েক দিন ধরে কথা বলবে, বলবে ভেবেও বলা হয় না উনার। তবে আজ উনি মনোস্থির করলেন মায়ার সঙ্গে কথা বলবেই।
রাত দশ-টা। নিচ তলায় ডাইনিং টেবিলের গোল করে একত্রে বসে আছে সবাই। শফিকুল ইসলাম তিনি রেহেনা বেগমের, জুই, মায়া,ও ফিহাকে নিয়ে একত্রে বসলো খাবার টেবিলে। খাওয়া দাওয়া চলল ধীরে ধীরে। মায়া মাথা নত মস্তিষ্কের খাবার খাচ্ছে। আপাতত আশেপাশে চিন্তা সে করছে না। শফিকুল ইসলাম খাবার প্লেটে নিয়ে চোখ তুলে তাকাল মায়ার দিকে। হালকা গলা কেশে মায়ার মনোযোগ আর্কষণ করল। মায়া বাদে সবাই তাকাল উনার দিকে। তিনি উদাসীন মায়াকে নিজের দিকে তাকাতে না দেখে এবার নাম ধরে ডাকল। মায়া খাবার রেখে শান্ত চোখে তাকাল উনার দিকে। উনি স্নেহ কন্ঠে বলে উঠেন…

—” তোমার সাথে কিছু কথা ছিল আম্মু। আব্বু কিছু বললে তুমি রাখবে আব্বুর কথা?

মায়া শান্ত দৃষ্টির, শান্ত সমেত উত্তর…
—” জ্বিই আব্বু রাখব।
তিনি পুনরায় আগের ন্যায় বলল…
—” আব্বু উপর বিশ্বাস আছে তো তোমার?
—” জ্বিই।
—” বেশ! আব্বু একটা ডিসিশন নিয়েছি তোমার জন্য। আমি আর কখনোই তোমাকে খান বাড়িতে পাঠাতে চাই না। ঐ বাড়ির সাথে তোমার সম্পর্কটা ভেঙ্গে দিতে চাচ্ছি। ঐ বাড়ির ছেলেকে আমার তোমার জন্য পছন্দ না। তাই তোমাদের ডিভোর্স নিতে চাইছিলাম। উকিলের সাথে আমার কথা হয়েছে। এই বিষয়ে আমি, তোমার মা, আর আরিফকে জানিয়ে ছিলাম অনেক আগেই। তারা অমত করেনি। আশা করি তুমিও করবে না। আশা করছি, আব্বুকে সম্মান দিয়ে হলেও আমার ডিসিশন মেনে নিবে তুমি। এখন বলো তোমার কি কোনো আপত্তি আছে আমার কথাতে।

শফিকুল ইসলাম কথায় সমস্ত সত্তা নাড়িয়ে কেঁপে উঠে মায়া। ভাতের প্লেটের হাতটাও মৃদু কেঁপে উঠে। জুই ফিহা চমকে উঠে ভয়ার্ত চোখে তাকাল মায়ার দিকে। মায়া তৎক্ষনাৎ কিছু বলতে পারলো না কান্না। গলা ভারি হয়ে আসলো দলা পাকিয়ে আসা কান্নায়। নত মস্তিষ্কের হলো। পরপর কয়েক বার ঢুক গিলে কান্নাটাও গিলে ফেলার চেষ্টা করলো মায়া। চোখের পাতা ভিজে আসল ততক্ষণে। অন্য সময় হলে এতক্ষণে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলতো মায়া রিদের সাথে ডিভোর্সের বিষয়টি শুনে। অমতও জানাত। কিন্তু এখন অমত করার প্রশ্নই উঠে না মায়ার। মায়ার সম্পর্কটা আরও আগে শেষ হয়ে গেছে। এখানে নতুন করে শেষ হওয়ার মতো কিছুই নেই। রিদ নিজেই সম্পকটা শেষ করে গেছে সেখানে আবার কিসের কি? মায়া এক গ্লাস পানি পান করে নিজের শান্ত রাখা চেষ্টা চালাল। খুবই ধীর স্বরে শফিকুল ইসলামের কথার সম্মতি দিয়ে বলল…

—” তোমাদের যেটা ভালো মনে হয় সেটা করো আব্বু। আমার কিছু বলার নেই। তোমরা যা বলবে তাই হবে।

মায়া কথা গম্ভীর হলেন শফিকুল ইসলাম।
—” তোমার সম্মতিতে অন্তত খুশি হলাম আম্মু। কালই তোমার কলেজ ট্রান্সফারের বিষয়টি নিয়ে ঢাকা যাব আমি। সবকিছু আমি আগেই রেডি করে রেখেছিলাম। তোমাকে জুঁইয়ের কলেজে ভর্তি করাব। দুবোন একসঙ্গে পড়বে। তুমি কাল একবার জুইয়ের সাথে কলেজে ঘুরে আসো। মনও ভালো থাকবে। কলেজটাও চিনে নিলে কেমন।
—” জ্বিই আব্বু।

মায়ার আর খাওয়া দাওয়া চলল না। ততক্ষণ খাবার নিয়ে টেবিলে বসে থাকল, যতক্ষণ শফিকুল ইসলাম ডাইনিং টেবিলের বসে ছিল। তিনি যেতেই মায়া না খেয়ে উঠে গেল। কাউকে কিছু না বলে সোজা ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে বাহিরর সিঁড়ি ধরে উপরের নিজের রুমে চলে গেল। রেহেনা বেগমের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেয়ে যাওয়ার দিকে। মায়ার হঠাৎ শান্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ভালো ঠেকছে না উনার। উনি জানে উনার মেয়ে কেমন। মায়ার অস্বাভাবিক আরচণের উনার সন্দেহ আরও গাঢ় করছে। এমনটা নয়তো যে খান বাড়িতে থাকতে থাকতে ঐ বাড়ির ছেলেকেও ভালোবাসে ফেলেছে মায়া। হতে পারে! অস্বাভাবিক কিছু না। দুজনকে একসাথে দেখেছেন তিনি। এখন যদি ভালোবাসেই থাকে? তাহলে নিজের বাবার কথায় রাজি হলো কেন? অস্বীকার না করে। তাছাড়া খান বাড়িতে তো সে সেচ্ছায় যেতে চাচ্ছেনা। আচ্ছা কোনো সমস্যা হয়েছে কি উনার ছোট মেয়েটার জীবনে।

মায়া পিছন পিছন জুই রুমে এসে দেখল মায়া কাঁথা মুড়িয়ে বিছানা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। রুমের লাইট অফ। জুই জালাল না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মায়া ঘুমায় নি সেটা জুই জানে। হয়তো নীরবে চোখের জল ফেলছে সেই জন্য ঘুমের বাহানা মারছে। মায়া গোটা বিশ দিন ধরে এমন আচরণ করছে। স্বাভাবিক থেকেও অস্বাভাবিক। মাত্রাতিক চুপচাপ হয়ে যাওয়া। হুটহাট অকারণে রেগে যাওয়া। ছোট ছোট বিষয় ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠা। দিন দিন কেমন অদ্ভুত আচরণ করে বেড়ায় সে। রোজ গভীর রাতে গুনগুন শব্দের কান্নায় প্রায়শয় ঘুম ভাঙ্গে জুইয়ের। জুই হতাশ মনে মায়া পাশে শুয়ে পড়ে। কথা বলল না। এখন মায়ার সাথে কথা বলতে চাইলেই হুট করে রেগে যাবে। নয়তো উত্তর করবে না। জুই মায়ার স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করতে করতে একটা সময় ঘুমিয়ে পড়ল। রাতে গভীরতা বাড়তেই তীব্র গুনগুন শব্দের কান্নায় ঘুম ভেঙ্গে গেল জুইয়ের। ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসতেই বুঝল বারান্দা থেকে কান্না শব্দ আসছে। জুই দৌড়ায় সেদিকে। মায়াকে বারান্দায় দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মুখ ঢেকে কান্না করতে দেখে, অস্থির ভঙ্গিতে মায়ার সামনে বসল জুই। মায়া টেনে দাঁড় করিয়ে বসাল বে’তের সোফায়। নিজেও মায়ার পাশে বসল জুই। মায়াকে তখনো হিচকি তুলে কাঁদতে দেখে জুই অস্থিরে বলে উঠে….
—” সারাক্ষণ এতো কাঁদিস কেন তুই? তোর এই কান্নার মানে কি? তুই কি আবারও খান বাড়িতে ফিরে যেতে চাস ভাইয়ে কাছে রিতু।

জুইয়ের দিকে তাকাল মায়া। হিচকি তুলা কান্না তখনো ঠিক করে কথা বলতে পারছে না সে। জুই অসহায় হলো। মায়া কান্না ভেজা মুখটা দেখে ওর চোখেও পানি আলে আসল। এতটা আদুরে হয়েও ভালোবাসা কাছে কিভাবে অসহায় গেল মেয়েটা। জুই দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আদুরে হাতে মায়ার চোখের পানি মুছে দিতেই মায়া হিচকি তুলে কান্না করতে করতে বলল…

—” আমি উনার কাছে আর যেতে চাই না জুই। আমিও মুক্তি চাই উনার থেকে।
—” তাহলে এতো কাঁদছিস কেন?
মায়া ঠোঁট ভেঙে কাঁদে বলে…
—” আমি কি করব জুন্নু? এতোদিনেও নিজের উপর! নিজের ফিলিংসের উপর! কন্ট্রোল করতে পারছিনা। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে জুই। কিছু ভালো লাগে না। কারও সঙ্গও ভালো লাগে না। আবার উনাকে ভুলতে পারছিনা। আমার সবসময় মনে হয় উনি আমার আশেপাশে আছেন। আমি কল্পনা করি উনাকে।

—” তুই একবার বাবার সাথে কথা বলে খান বাড়িতে যাহ। এমনটাও তো হতে পারে তোর কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। তুই যেটা ভাবছিস তেমনটা নাও হতে পারে।

হুট কান্না থেমে যায় মায়ার। চেহারা স্পষ্ট রাগের তেজ ফুটে উঠে। মায়া চেতে উঠে রাগী স্বরে বলে উঠে…

—” একদম না। আমি যাব না ঐ বাড়িতে। কখনো না। আমার ভুল হলেও সঠিক করবো না কখনো। সারাজীবন ভুল নিয়েই থাকব তারপর খান বাড়ির চৌকাঠ মাড়বো না। আমার উনাকে চাই না। বাবা আমার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমার মুক্তি চাই। ডিভোর্স উত্তম মাধ্যম আমার মুক্তির। আমি অযোগ্য! আমাকে এক রাতের সঙ্গী করা! আমি নিচু লেবেলের গরীব মানুষ। আমি একটা কথাও ভুলিনি জুই। বিষয়টা এবার আমার আত্মসম্মানে। তাই কখনো উনার সাথে সংসার বাধব না আমি। বাবা যাহ করতে চাই করুক। তাতে আমার সম্মতি থাকবে জোড়ালো ভাবে। তুই আজকে পর এমনটা আমায় ভুলেও বলবি না আর। আমি কিন্তু মেনে নিব না।

মায়াকে রেগে যেতে দেখে অস্থির ভঙ্গিতে শান্ত করল জুই। মায়ার কথার সম্মতি দিয়ে বলল…

—“রিল্যাক্স আমি আর তোকে কখনো এ বিষয়ে কোনো কিছু বলবো না। প্লিজ শান্ত হ। আমরা আছি তোর পাশে। তোর সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত হবে। প্লিজ এবার শান্ত হ।

জুই কথা মায়া শান্ত হয়ে সোফায় গায়ে এলিয়ে বসল মায়া। জুই পুনরায় বলল…
—” সিদ্ধান্ত তোর। জীবন তোর। তাহলে এভাবে আর কত দিন কাঁদবি বন্ধ রুমের ভিতরে। তুই জানিস! তুই যে আজকাল অস্বাভাবিক আরচণ করছিস সবার সাথে। মাঝেমধ্যে নিজেকেও আঘাত করে ফেলিস। দেখ তোর হাতে কতটা খামচি আছড়ে দাগ। এই গুলো তুই নিজে করেছিস। এতটা অস্বাভাবিক আচারণ কেন? কবে নিজেকে তুই স্বাভাবিক করবি? কবে সবার সাথে হাসিখুশি থাকবি। অনেক তো হলো। এবার না-হয় স্বাভাবিক হ। আমার সাথে বাহিরে চল। মুভ অন কর। ভাইকে ভুলে নতুন করে শুরু কর জীবনটা। দেখবি সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে তোর সাথে। মানসিক চাপ থেকে বের হতে পারবি। কাল যাবি আমার সাথে কলেজে?

মায়া বন্ধ চোখের পাতা কানিশ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল অঝোরে। কান্না শব্দ হচ্ছে না। হালকা নাক টানার শব্দ হচ্ছে। জুইয়ের কথা সম্মতি দিল মায়া। যে যাবে কলেজে। রিদকে ভুলার চেষ্টাও করবে। সফল হতে পারবে কিনা জানা না থাকলেও চেষ্টা চালিয়ে যাবে ক্রমাগত। হয়তো একটা দিন সফল হয়ে যাবে কারণ জীবন কারও জন্য থেমে থাকে না। মায়ার জন্যও থেমে থাকবে না।
~~

শফিকুল ইসলাম পর দিন ঢাকা গিয়ে খান বাড়ির জানাল মায়া আর ফিরবে না এই বিষয়টি। কথায় কথায় রিদের সাথে মায়ার ডিভোর্সের বিষয়টিও জানিয়ে আসল। তবে মায়ার কলেজ ট্রান্সফারের বিষয়টিতে জটিলতা দেখে দিল। কোনো মতেই ট্রান্সফার করতে পারল না। অগাত শফিকুল ইসলাম সেদিন ব্যথ হয়ে চলে আসে বাড়িতে। তারপর আরও কিছু দিন পর মায়ার ট্রান্সফারে বিষয়টি চেষ্টা করে। এতেও সফল হতে না পেরে। মায়া সাধারণ একটা কলেজে ভর্তি করায় শফিকুল ইসলাম যেহেতু কলেজ শুধু হওয়ার বেশি দিন পাড় হয়নি। মাত্র তিনমাস পাড় হয়েছিল তাই। হেনা খান রোজ রোজ করে মায়ার জন্য আহাজারি করে কান্না বিলাপ করে। একবার নিজের স্বামী কাছে তো অন্যবার ফোন দিয়ে রিদের কাছে। রিদ শুনলো তার আর মায়ার ডিভোর্সের বিষয়টি। কিন্তু শুনেও না শুনার মতো করেই থাকল। প্রতিক্রিয়া জানাল না। বরং হেনা খানের রোজ রোজ ফোনে বিরক্ত হয়ে এখন ফোন বন্ধ করে রেখেছে সে। বিগত প্রথম প্রথম কয়েক দিন হেনা খান সাথে রিদের যোগাযোগ থাকলেও এখন আর নেই। রিদের সাথে বর্তমান কারও যোগাযোগ নেই। সে কোথায় আছে? কিভাবে আছে? কারও জানা নেই।
.
(রি-চেক করিনি)

চলিত…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply