দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫৮
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
(কার্টেসী বা কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ। শেয়ারিং ছাড়া)
৫৮
রাত একটা পনেরো। আবছা আলোয় আলোকিত কাঁচের আবদ্ধ বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচ্ছন্ন ভাবে কথা বলছে রিদ। গায়ে কালো টি-শার্ট কালো টাউজার জড়ানো। একহাত পকেটে পুড়ে অন্য কানে চেপে ধরে মনোযোগ সহকারে ধীরস্বরে ফোনে কথা বলছে সে। রিদের ব্যস্ত ফোন আলাপই প্রকাশ করছে এই ফোনটি তার জন্য কতটা জরুরি। মায়া বিনা শব্দের রিদের পিছনে এসে দাঁড়ালো। রিদকে হারানোর ভয় জেঁকে বসেছে মনে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের খেলা ঘরে দহনে পুড়ছে মায়ার মন। মন ভাঙ্গা কান্নায় তখনো দু-চোখের পাতায় ঘুম নেই। রিদ মায়াকে বিয়ে করতে চাই না। রিদের এই ছোট্ট একটা স্বীকারোক্তিতে মায়া এখনো দম মেরে আছে। গুমোট কান্নায় কান্নায় অপেক্ষা করে উপযুক্ত সময়ের জন্য। মায়া রিদের সাথে পুনরায় এই বিষয়ে কথা বলতে চাই। তাই তখন চুপ থেকে আর কথা বাড়ালো না রিদের সাথে। রিদকে ঠান্ডা পানি দিয়ে অপেক্ষা না করে নিঃশব্দে নিজের রুমে চলে এসেছিল ছন্নছাড়া পায়ে। বুক ফাটা তীব্র আর্তনাদে চাপা কান্না গুলো আটকাতে না পেরে বালিশের মুখ গুঁজে বিগত সময় ধরে কাঁদলো মায়া। রিদ মায়াকে চাই না, মেহুকে চাই! এমন একটা ভয় মায়ার মনের মধ্যে ইতিমধ্যে বেশ ঘর করে ফেলেছে রিদকে নিয়ে। ততক্ষণে রিদও গোসল সেরে ডিনার করে নিজের রুমে এসে ফোন আলাপের ব্যস্ত হয়ে পড়লো। মায়ার দিকে বিশেষ একটা মনোযোগ দিল না। মায়াকে নিজের রুমে না পেয়ে ভাবলো হয়তো মায়া ঘুমিয়ে পড়েছে। তবে মায়ার রাখা ঠান্ডা পানি পান করেছিল তখন। এরপর থেকে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোন আলাপে মগ্ন। যাহ দারুণ মায়ার উপস্থিতটাও টের পেল না। গায়ের লেমন কালার জামাটার ওড়নাটা দুই কাঁধ ছড়িয়ে পড়া মায়ার। ওড়নার একপাশ দু’হাতে মুষ্টি বদ্ধ করে বেশ কিছুক্ষণ রিদের পিছনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো। চোখ মুখ ফুলা ফুলা ভাব অনেকটা কান্নার ফলে। মায়া প্রায় দশ মিনিট সময় রিদের পিছনে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ পিছন থেকে রিদের টি-শার্ট টেনে ধরে শক্ত করে। রিদ খানিকটা চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই, আবছা আলোয় চোখে পড়লো নত মস্তিষ্কের মায়াকে। রিদ কপাল কুঁচকে মায়ার দিকে তাকালো কিন্তু তখনো টুকটাক ফোনে আলাপ চলছিল তার। রিদ নত মস্তিষ্কের মায়াকে দিকে আদুরে একহাত বাড়িয়ে দিতেই মায়া ধীরে পায়ে এগিয়ে আসলো রিদের বক্ষতলে। দু-হাতে রিদের পেট জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখলো অশান্ত মনে। রিদ নিজের একহাত মায়ার পিঠ উপর রাখলো। মায়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদুরে ঠোঁট ছুঁয়ালো মায়ার মাথায়। মায়া নড়াচড়া করলো না অশান্ত মনে স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইলো রিদকে জড়িয়ে ধরে। হয়তো রিদের ফোন আলাপ শেষ হবার অপেক্ষায় আছে সে। রিদ আরও কিছুটা সময় নিয়ে নিজের ফোন আলাপ শেষ করে, বারান্দার কাউচের উপর ফোনটি হালকা ডিল মেরে রাখলো। দু’হাতে মায়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবারও আদুরে ঠোঁট ছুঁয়ালো মায়ার মাথায়। শান্ত স্বরে বললো…
—” কি হয়েছে সোনা! ঘুম আসে না?
রিদ আদুরে গলায় ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠে মায়া। রিদের বুকে নিজের মুখ চেপে ধরে কান্না ভেজা গলায় বলে উঠলো…
—” আমরা আরেক বার বিয়ে করলে না কিহয়?
মায়ার কান্না! মায়ার আকুতি বুঝলো রিদ! কিন্তু মায়ার তীব্র ভয়টা তখনো বুঝতে পারলো না। রিদ শান্ত স্বরে পুনরায় বললো…
—” করেছি তো বিয়ে। এতো বিয়ে করে কি করবো? তুমি তো এমনই আমার বউ তাই না! বিয়ে করলেও আমার বউ থাকবে। না করলেও আমার বউ থাকবে। তাহলে এতো বিয়ের দরকার কি লক্ষী!
—” উহুম! লুকোচুরি বিয়ে নাতো! প্রকাশ্যে একটা বার বিয়ে করুন না প্লিজ! সবাইকে বলুন না আমি আপনার বউ! আর আপনি আমার সাথেই সংসার করবেন।
মায়া কথায় রিদ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মায়াকে দুনিয়ার সামনে সে কখনো আনতে পারবে না। তার নিদিষ্ট দুটো কারণের জন্য। অকারণে সে কখনো কিছু করে না। আজও করবে না। মায়াকে নিয়ে যে বিন্দু পরিমাণ রিস্ক নিতে ইচ্ছুক নয়। রিদ মায়াকে জড়িয়ে নিয়ে কাউচের উপর বসলো। মায়াকে টেনে নিজের কোলের উপর বসিয়ে, পিছন থেকে মায়ার পেট জড়িয়ে ধরে থুঁতি রাখল মায়ার কাঁধের উপর। মায়া কেঁপে উঠতেই রিদের হাতের বাঁধন আরও শক্ত করলো। মায়াকে বুঝাতে চাইল রিদ পরিস্থিতি সম্পর্কে। মায়ার উম্মুক্ত কাঁধে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে মায়ার চুলে নিজের নাক ডুবিয়ে বলে উঠে…
—” রিত! তোমাকে দুনিয়ায় সামনে নিজের বউ বলে পরিচয় দেওয়া মানেই, তোমার পায়ে শিকল পড়ানো আর নিজের মাথায় বন্দুক ঠেকানো। আমার প্রফেশন আমাকে কখনো সংসারী হতে দিবে না কারও সাথে। এমনিতেই তোমার উপর দুই দুইবার অ্যাটাক হয়েছে। আমার শত্রুর পক্ষরা আন্দাজের তোমার উপর হামলা গুলো করেছিল। তারা সিওর ছিলনা যে তোমার সাথে আদৌ আমার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। তাহলে বুঝ, যেখানে তারা আন্দাজের উপর এতটা উত্তেজিত হয়ে তোমাকে মারার চেষ্টা করে। সেখানে যদি তারা সিওর হয়, যে তুমিই আমার বউ। তাহলে তোমার বাহিরে বের হওয়া মুসকিল হয়ে যাবে। আমার না চাইতেও তোমার পড়াশোনা, তোমার বাহিরে বের হওয়াটা বন্ধ করে দিতে হবে। যেটা আমি কখনো করতে চাই না আপাতত। এমনিতেই একটা সময় সবাই জেনে যাবে আমি সংসার করছি। বার আমার বউ আছে। ততদিনে তুমি ইন্টার কমপ্লিট করে নিতে পারবে। ততদিন বিষয় অন্তত আমি লুকিয়ে রাখতে চাই তোমার সেইফটির জন্য। এই মূহুর্তে তোমাকে দুনিয়ায় সামনে নিজের বউ বলে পরিচয় দেওয়া মানেই তোমাকে আমার নজর বন্দীনি করা রাখা সারাজীবন। সারাক্ষণ টেনশনে থাকতে হবে তোমার সেইফটি নিয়ে। আর দ্বিতীয় কারণটা হলো। বিয়ে নামক শব্দটা আমার জীবনে প্রতিবারই অশুভ হয়ে এসেছে। আমি অনেক কিছু হারিয়েছি এই বিয়ে নামক শব্দটাতে জড়িয়ে। তোমার সাথে আমার প্রথম বার বিয়েতে নিজের বাবা-মাকে হারিয়েছি। আমাদের দ্বিতীয়ত্ব বিয়েতে আমরা দু’জনই অলমোস্ট মরতে মরতে বেঁচে ছিলাম সেদিন। তাই তৃতীয় বিয়েটা আমি কখনোই করতে চাই না রিত! আমি জানি এবার আমার তৃতীয় বিয়ে করা মানেই কোনো না কোনো কাল নেমে আসবে আমাদের জীবনে নিশ্চিত রুপে। নতুন করে কাউকে হারাতে পারব না আমি। বিয়ে নামক শব্দটা আমার জন্য শুভ নয় রিত। আমি বিয়ে নামক শব্দটাতে আপাতত ভয়ার্ত। জীবন পাওয়া না পাওয়া গল্প থেকেই থাকে তবে আমি এই মূহুর্তে সচ্ছ সুখী জীবন চাই। হক সেটা লুকোচুরি সংসার। আপত্তি কি তাতে।
রিদের দীর্ঘ কথায় মায়ার মন নরম হয়ে আসলেই নিজের জেদ থেকে নড়লো না মায়া। মেহু কথা গুলোই বেশ করে মাথায় রাখলো মায়া। রিদের বুঝানো কথা গুলো মায়ার মনে ধরলেও তার মাথায় ধরে রাখতে পারলো না। মায়া আপত্তি করে বলে..
—” আমার আপত্তি আছে এতে। যাহ হবার হবে আমার তারপরও আমি প্রকাশ্যে বিয়ে করতে চাই আপনাকে। পায়ে শিকল পড়ে হলেও আমি দুনিয়ায় সামনে আপনার বউ বলে পরিচিতি পেতে চাই। মরলে মরবো, বাঁচলে বাচবো! তারপরও আমাকে সমাজে সামনে নিজের স্ত্রী বলে স্বীকৃতি দিন প্লিজ।
মায়ার পরপর অবুঝ কথায়। রিদের মেজাজ বিগড়ে যাওয়া কারণ হচ্ছে এই মূহুর্তে। মায়াকে শাসিয়ে রিদ খিটখিট শক্ত গলায় বলে..
—” রিত! কেন আমাদের সুন্দর সম্পর্কটা নষ্ট করতে চাইছো তুমি। কেন নিজেকে আমার থেকে দূর করতে চাচ্ছো।
—” সমাজের কাছে আপনার স্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি চাইলে আমাদের সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাবে মিস্টার ভিলেন? আপনি আমাকে দূরে সরিয়ে দিবেন??
মায়ার কথায় কাটকাট উত্তর করলো রিদ…
—” জোড়াজুড়ি আমার পছন্দ না রিত! তুমি এবার জোড়াজুড়ি করছো। এতে করে অবশ্য আমাদের সম্পর্কটা নষ্ট হতে পারে। আমাদের মধ্যে দূরত্ব আসতে পারে যদি তুমি এই টপিকটা এখানেই বন্ধ না করো।
রিদের প্রতি তীব্র অবিশ্বাসে ঘর করলো মায়ার মনে। রিদের মায়াকে বিয়ের না করার কারণ গুলো মায়ার মস্তিষ্কে তখনো আঘাত করতে পারলো না। বরং আঘাত করেছে মেহুর বলা কথা গুলো। রিদ কখনোই রাজি হবে না মায়াকে বিয়ে করতে। বরং মায়াকে কিছু অহেতুক যুক্তি দেখিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করবে রিদ। যেমন রিদ বিয়ে করা থেকে নাহুচ করবে। সমাজের দোহায় দিবে, মায়াকে হারানোর ভয় দেখাবে ইত্যাদি। হলোও তাই। মেহুর কথা অনুযায়ী রিদ সেই সবটাই বললো, যেটা পূব থেকেই মেহু মায়াকে বলে সাবধান করেছিল। রিদের কথা সাথে, মেহুর বলা কথা গুলো অনেকটায় মিল পাওয়ায় মায়ার রিদের প্রতি অবিশ্বাস জম্ম নিল দৃঢ়। যার রেশ টেনে মায়া বলে বসলো কিছু অহেতুক অযুক্তিহীন কথা রিদকে…
—” আপনি আমার ছিলেন কবে যে দূরত্ব আসবে। আপনি আমার কখনোই ছিলেন না। আপনি মেহু আপুর ছিলেন। আজও আছেন। আমি আপনার পিছনে পড়ে আছি বলেই আপনি আমাকে নিজের কাছে ভিড়ান। দাদা-দাদির মন রক্ষাতে। আমি জানি! আপনার মন আমার প্রতি ভরে গেলে, আপনি আমাকে নিজের জীবন ছুঁড়ে ফেলবেন। আর যাতে সহজেই আমাকে ছেড়ে দিতে পারেন সেই জন্য নিজের স্ত্রী হিসাবে সমাজের কাছে আমাকে স্বীকৃতি দিতে চাইছেনা এই তো! আমি জানি আপনি আমাকে ভালোবাসেন না। আপনি শুধু আমাকে ব্যবহার….
মায়া ফুপিয়ে হু হু শব্দ করে কেঁদে উঠে কাঁধের তীব্র কামড়ের ব্যথায়। মায়ার কথায় রিদের টক-বগিয়ে উঠা রাগটা দমন করতে না পেরে হিংস্র প্রকাশ পায় মায়ার কাঁধে উপর। মায়া ঝাপটে নড়াচড়া করতে চাইল। কিন্তু রিদের হাত থেকে ছুটতে ব্যথ হয়ে হু হু করে কেঁদে হিচকি তুলে কোনো রকম বলে…
—” আ আপনি আমাকে আঘাত ককরে মারতে চাইছেন! মে-মেহু আপুকে বি বিয়ে ক করার জন্য। আমি ব বুঝি তো!
মায়ার ফুপিয়ে উঠা কাঁদার মধ্যেই রিদ মায়া কাঁধ ছেড়ে দিয়ে শক্ত হাতে মায়ার গাল চেপে ধরে আবছা আলোয় মায়াকে নিজের মুখোমুখি ধরে রাগে রি রি করে বলে..
—” একদম তাই। তোকে মারতেই চাই আমি। তোকে মেরেই আমি মেহুকে বিয়ে করবো। তোর মতো গর্দভ বেঁচে থেকে কি করবি? শুধু আমাকে টেনশন রাখবি।
রিদের শক্ত হাতের থাবায় মায়ার দুগালে মারি চেপে গিয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। মায়ার ফুলা ফুলা চোখের কানিশ বেয়ে অঝোর ধারায় জল গড়াতে লাগলো। রিদের কোলে বসে থাকা অবস্থায় মায়া জোড়াজুড়ি করে রিদ থেকে নিজের গাল ছাড়ানোর চেষ্টা করলো অশান্ত নেয় ছটফট করতে করতে।
এতে করে মায়া বিশেষ একজন সফল হলো না রিদের শক্তি সামর্থ্যের সাথে। রিদ ছাড়লো না মায়াকে। বরং রিদের হাতের বাঁধন আরও দৃঢ় হতেই মায়া নেতিয়ে পড়লো। মাথা ছেড়ে দিতেই রিদ মায়ার গাল ছেড়ে দিয়ে মাথা আঁকড়ে ধরলো পড়ে যাওয়া থেকে। রিদ রাগান্বিত হাতে মায়াকে টেনে নিজের বাহুতে ফেলতেই, মায়া বড় বড় শ্বাস ফেলে পুনরায় ডুকরে কেঁদে উঠলো রিদের বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে। কষ্ট ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলে…
—” আমাকে মারার দরকার নেই আমি এমনিতেই চলে যাব আপনার জীবন থেকে। আর কখনোই আসব না আপনার জীবনে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে। আপনার মেহু আপুকে চাই তাই তো! তাহলে উনাকে নিয়েই থাকুন। আমি আ…
মায়ার কথা গুলো আর শেষ করতে পারলো না। তার আগেই লুটিয়ে পড়লো ফ্লোরে। রিদ মায়াকে ততক্ষণে নিজের কোল থেকে ফ্লোরে ফেলে দিলো। আকস্মিক ঘটনায় খেই হারিয়ে উল্টে পড়ায় মায়ার কপাল ভাজলো ছোট টেবিলে কোণায়। তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে উঠতেই নিজের কপালে তরল কিছু আবিষ্কার করলো মায়া৷ হয়তো গরম রক্ত হবে। মায়া হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখার আগেই পুনরায় রিদের হিংস্র আঘাতের স্বীকার হলো সে। আবছা আলোয় রিদ মায়ার বাহু টেনে নিজের মুখোমুখি ধরে হিংস্র প্রকাশে করে বলে…
—” তেজ দেখাস আমার সাথে। ছেড়ে চলে যাবি ভয় দেখাস? রিদ খান তোর জন্য পাগল? তোকে ছাড়া রিদ খানের চলবে না। দিন কাটবে না। মরে যাবে সে। তোর কি মনে হয় সামান্য একটা মেয়ের জন্য রিদ খান পাগল হয়ে বসে আছে। তোকে ছাড়া থাকতে পারবো না আমি? খুব ভালো ভাবে থাকতে পারবো। তোর মতো নারীর আমার দরকার নেই। যাহ তুই!
কথাটা বলে রিদ পুনরায় মায়াকে ধাক্কা মেরে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মায়া ফ্লোরে উপুড় হয়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠে কষ্টে। নিজের ভালোবাসা, নিজের স্বপ্ন, নিজের সংসার সবকিছুই যেন সচ্ছ কাঁচের নেয় ঝরঝর করে ভেঙ্গে পড়ছে মায়ার জীবনে। রিদকে পেয়েও যেন পাওয়া হলো না মায়ার। তীব্র অবিশ্বাস মরিচীকা দেখা দিল মায়ার বিশ্বাসের উপর। মায়া রিদকে অবিশ্বাস করলো। মেহুকে তীব্র বিশ্বাসী মনো হলো। রিদ কাউচের উপর থেকে উঠে নিজের রুমের দিকে যেতে চাইল। কারণ সে এখানে আরও কিছুক্ষণ থাকলে হয়তো রাগের বশে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। এবং রাগের বশে মায়াকে আরও বেশি আঘাতে করে ফেলবে। এমনিতেই নিজের রাগটা কন্ট্রোল হচ্ছে না তার। ইচ্ছা করছে এই বাধ্য বউকে গলা টিপে মেরে ফেলতে। তাহলেই রিদের শান্তি হবে। কিন্তু না রিদ আপাতত এমন কিছুই করতে চাই না। তাই নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে দু’হাত মুষ্টি বদ্ধ করে চলে যেতে চাইল বারান্দা থেকে। কিন্তু আবারও পারলো না। মায়ার উৎকর্ষা কন্ঠের কথায়…
—” আমার সাথে এতো দিন ভালোবাসার নাটক করেছিলেন কেন মেহু আপুকে বিয়ে করার জন্য। আপনি একটা প্রতারক! মিথ্যাবাদী। আপনি আমাকে ঠকিয়েছেন। আমি আপনাকে কক্ষনো ক্ষমা করবো না।
মায়ার কথায় এবার রিদের সর্বোচ্চ ধৈর্য ভাঙ্গে। মায়ার একটার পর একটা অহেতুক কথা গুলো যেন রিদকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে তুলছে। যার রেশ ধরে রিদ সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠে, পাশ থেকে বড় ফ্লাওয়ার ভাজটি মাথার উপর তুলে স্বজোরে আছাড় মারলো ফ্লোরে। মূহুর্তেই অসংখ্য খন্ডিত টুকরো গুলো ছড়িয়ে পড়লো ফ্লোরে। মায়া চমকে উঠে ভয়ে সিঁটিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। জড়সড় হয়ে দেয়ালের কাঁচে সাথে চেপে বসলো হাঁটু মুড়ে। ভয়ে ফুপিয়ে কেঁদে কেঁদে উঠছে মায়ার শরীরও মন। রিদ থামলো না। বরং আরও ক্ষেপান্তি হলো মায়ার উপর। শক্ত হাতে মায়ার বাহু চেপে ধরে দাঁড় করিয়ে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো নিজের সাথে। মায়া রিদকে থামানোর চেষ্টা করতেই রিদ মায়াকে আবারও দেয়ালের সাথে চেপে ধরে রাগে রি রি করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে…
—” নিজেকে কি মনে করিস তুই হ্যাঁ? আমি তোকে কখনো বলেছি যে আমি তোকে ভালোবাসি? বলি নাই। তাহলে আমি ঠকবাজ! আমি প্রতারক হলাম কিভাবে? দুইদিন ভালো করে কথা বলছি বলে ভেবেছিস রিদ খান তোকে ভালোবাসে? তুই রিদ খানে যোগ্য?
রিদের কথায় তেজে অবুঝ মায়া দুচোখের পানি ঝরঝর করে ছেড়ে দিয়ে কাতর কন্ঠে বলে…
—” আমাকে আপনি ভালোবাসেন নি। আমিই তো বোকা! আপনার একটু ভালো ব্যবহারটাকে আমি নিজের ভালোবাসা ধরে নিয়েছিলাম। সত্যিই আমি আপনার যোগ্য না। কখনো হতেও পারবো না। মেহু আপুই আপনার যোগ্য বউ হবে। আপনি উনাকে বিয়ে করতে চান তাইতো? ঠিক আছে তাই হবে। আমি আর আসব না আপনাদের দু’জনের মাঝে ওয়াদা করছি।
—” একদমই তাই। তুই যাহ ভাবছিস তাই-ই। আমি মেহুকেই বিয়ে করতে চাই। আর তুই কেন দুনিয়ায় কেউ আসতে পারবে না আমাদের মাঝে। এবার যাহ তুই! বের হ আমার রুম থেকে।
রিদ মায়ার হাত টেনে ধরে ধাক্কা দিয়ে নিজের রুমে থেকে বের করে দেয়। প্রচন্ড রাগে ঠাস করে মায়ার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো। মায়াকে ভিষণ অসহায় দেখালো। দুচোখ ভরতি সাজানো গোছানো স্বপ্ন গুলো ভেঙ্গে যাওয়ায় অতি দূর্বল দেখালো। ব্যর্থ মন ও শরীরটা টেনে কোনো রকম নিজের রুম অবধি পৌছালো মায়া। কাঁপা কাঁপা হাতে দরজা লাগিয়ে বিছানার সাইডে গিয়ে ধীরস্হে বসলো ফ্লোরে। স্তব্ধ নিবাক ভঙ্গিতে বিছানার উপর মাথা ঠেকিয়ে নিশ্চুপ ফ্লোরে বসে রইলো কিছুটা সময়। মন্ত, নিশ্চুপ মায়া হঠাৎই গোঙ্গাতে গোঙ্গাতে তীব্র গুমোট কান্না ভেঙ্গে পড়লো। ধীরে ধীরে সেই কান্না ছন্ন ছাড়া হয়ে উচ্চ স্বরের চিৎকারে রুপান্তরিত হলো। নিস্তব্ধ গহীন রাতে ঝংকার তুললো সেই কান্না। তাই বিছানায় নিজের মুখ চেপে ধরে হাউমাউ চিৎকার করে কেঁদে উঠলো মায়া। রিদের প্রতিটা স্বীকারোক্তি ছিল মায়ার একেকটা স্বপ্ন ভাঙ্গার স্তুপ। আজ মায়া হেরেছে। ভিষণ বাজে ভাবে হেরে গেছে। মায়ার মিস্টার ভিলেন মায়াকে ভালোবাসেনি। সে নিজের মুখে বলেছে, সে মায়াকে কখনো ভালো বাসেনি। মায়া বোকামি করেছে। আগ বাড়িয়ে ভালোবাসা চাইতে গিয়েছে। মায়া হেরেছে। মায়ার মিস্টার ভিলেন, মায়ার কখনোই ছিল না। সে সবসময়ই মেহু আব্দুল্লাহ ছিল। আজও মেহু আব্দুল্লাহই আছে। থাকবে। আজ রিদ নিজের মুখে স্বীকারোক্তি না করলে, হয়তো মায়া আজও বোকামি করে যেত। রিদের একটু ভালো ব্যবহারকে ভালোবাসা ধরে ভুল করতো মায়া। সবাই সত্যিই বলে একজন গ্যাংস্টার কখনো একটা সাধারণ মেয়েকে ভালোবাসতে পারে না। আজতো রিদ নিজেই বললো। মায়া রিদ খানের যোগ্য নারী নয়। মেহু আব্দুল্লাহ রিদ খানের যোগ্য নারী। এখন মায়ার কি করার উচিত? সবটা মেনে নিয়ে নীরবে রিদের জীবন থেকে চলে যাওয়া উচিত না? মায়ার তার মিস্টার ভিলেনকে এবার একা ছেড়ে দেওয়া উচিত। সে নিজের জীবনে ভালো থাকতে চাই। মায়া কেন তাদের জীবনে অথযা কাটা হয়ে দাঁড়াবে? না সে কারও জীবনের কাটা হয়ে থাকবে না আর। সে চলে যাবে। আর কক্ষনোই আসবে না এই শহরে, এই বাড়ির তল্লাটে। এখানে মায়ার জন্য কিছু নেই। সবটাই শেষ হলো।
~~
দু’জনের মনমালিন্যতায় কাটলো পুরোটা দিন। রিদ রাগে জেদে একাই নাস্তা করে চলে গেল অফিসে। মায়ার খবর নিল না। তবে রিদ ভাবলো হয়তো সন্ধ্যা হতে হতে মায়ার অভিমান কমে যাবে এবং পুনরায় রিদের কাছে চলে আসবে। কিন্তু রিদের এই ধারণা করাটাই পরবর্তী ভুলের কারণ হলো। মেহু পুনরায় মায়ার সুযোগ নিল রিদের অজান্তে। রিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মিথ্যা কথা বললো। মায়াও বিষন্ন ভগ্নহৃদয় মন্ত থেকে শুনলো। বিশ্বাসও করলো। মায়া রাত থেকে সারাদিন রুম থেকে বের হলো না। ঐভাবে হেলিয়ে আছড়ে পড়ে রইলো ফ্লোরে। সকাল গেল। দুপুর হতেই হেনা খান তোড়জোড় করে দরজা ধাক্কাতে শুরু করলো ভয়ে। কারণ তিনি সকালেও বেশ কয়েক বার মায়ার রুমে দরজা ধাক্কা গিয়েছিল। কিন্তু মায়ার সারাশব্দ পায়নি। তিনি মায়াকে ঘুমন্ত ভেবে চলে গিয়েছিল। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হতেই তিনি ভয়ার্ত চিন্তত ভঙ্গিতে অনবরত মায়ার দরজা ধাক্কা লাগলো। অবশেষে না পেরে মায়া দূর্বল শরীর টেনে উঠে দরজা খুলে দিতেই তৎক্ষনাৎ প্রবেশ করলো হেনা খান। তিনি চিন্তত স্বরে মায়াকে কিছু বলবে তার আগেই মায়ার বিধস্ত চেহেরাটা দেখে মূহুর্তে আতংকে উঠে চিৎকার করে মায়াকে ঝাপটে ধরে বলে….
—” কি হয়েছে সোনামা তোর এই অবস্থা কেন? কপালে কিসের রক্তের দাগ? ব্যথা পেলি কিভাবে? চোখ মুখ ফুলে আছে কেন, কান্না করেছিস কিন্তু কেন বল না দাদীকে?
হেনা খানের পরপর প্রশ্নে একটা উত্তরও করলো না মায়া। বরং নীরবে জড়িয়ে ধরে হেনা খানের বুকে মাথা রাখলো অশান্ত মনে। চিন্তত হেনা খান মায়াকে জড়িয়ে নিয়েও লাগাতার প্রশ্ন করে যাচ্ছে। মায়া বেশ শান্ত স্বরে একটু করে বললো! সে বাথরুমে পড়ে গিয়ে কপালে ব্যথা পেয়ে, কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাই কিছু বলতে পারে না সে। হেনা খান মায়ার কথা বিশ্বাস করলো কিনা জানা নেই। তবে মায়াকে তীব্র শাসাতে শাসাতে বিছানায় বসালো। ফাস্টেড বক্স এনে মায়ার কপালের শুকিয়ে যাওয়া রক্তটা পরিস্কার করে দিতে দিতে বুঝলো মায়ার গায়ে তীব্র জ্বর বাঁধিয়েছে ততক্ষণে। উত্তেজিত হেনা খান তৎক্ষনাৎ ডাক্তার ডাকলো ফোন করে। টেনশনে টেনশনে তিনি মায়ার হাত মুখ ধুয়ে দিয়ে গায়ের পোশাক চেঞ্জ করতেই ততক্ষণে ডক্টরও চলে আসলো। দূর্বল মায়ার জ্বরটা চেক করতে থার্মোমিটারে দেখা গেল 104 ডিগ্রি জ্বর। ডক্টর মায়ার ঔষধের প্রেসক্রিপশন লিখে হেনা খানকে দিয়ে বিদায় নিলো। এবং যেতে যেতে সাজেস্ট করলো মায়ার মাথায় পানি টালতে। হেনা খান তাই করলো। সার্ভেন্ড দিয়ে প্রেসক্রিপশন পাঠালো ঔষধ আনতে। এবং মালাকে নিয়ে মায়াকে বিছানায় আড়াআড়ি ভাবে শুয়ালো মাথায় পানি দেওয়ার জন্য। দীর্ঘ সময় নিয়ে মায়ার মাথায় পানি ঢেলল। মাথা মুছে মায়াকে সোজা করে শুয়ালো। তখনো মায়া জ্বরে গোঙ্গাচ্ছিল কাঁপনি দিয়ে দিয়ে। অস্থির হেনা খান মায়াকে ব্ল্যাঙ্কেট মুড়িয়ে শুয়ালো বিছানায়। তিনি মায়াকে ঝাপটে ধরে বসে থেকে সার্ভেন্ড দিয়ে খাবার আনালো। শত চেষ্টা করেও মায়াকে তেমন কিছু খাওয়াতে পারলো না। অল্প খাবারেই ঔষধ খাওয়ালো মায়াকে। অস্থির হেনা খান তখনো বুঝতে পারলো না কেন হঠাৎ করে মায়ার জ্বর হলো। অজ্ঞাত হেনা খান মায়াকে নিয়ে বেশ অনেকক্ষণ বসে রইলো বিছানায়। কাউকে জানালো না মায়ার হঠাৎ অসুস্থতা কথাটা। বিকালের দিকে মায়ার জ্বর কিছুটা নেমে আসতেই চোখ পিটপিট করে তাকালো সে হেনা খানের বক্ষতলে। দূর্বল শরীর খানিকটা নড়েচড়ে উঠতেই হেনা খান মায়া সোজা করে বসাল। মায়া কিছু লাগবে কিনা? জিগ্যেসা করতেই মায়া জানালো সে একটু নিচে গিয়ে বসবে। রুমে বসে থাকতে অশান্তি লাগছে। মায়া কথা অনুযায়ী হেনা খান মায়াকে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসিয়ে কিচেন রুমে গেলো মায়ার জন্য সুপ বানাতে। সেই সুযোগে মায়া দূর্বল শরীরটা টেনে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে সোফা বসে রইলো বেশ কিছু সময়। হঠাৎ নিজের পাশে কারও উপস্থিতিতে বুঝতে পেরে, মায়া দূর্বল লাল লাল চোখ খুলে হাল্কা ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই চোখে পড়লো মেহুর সুন্দর হাসি মুখখানা। মায়া নড়লো না। কিছু বললো না। কোনো রকম প্রতিক্রিয়াও জানালো না মেহুকে। বরং একনিষ্ঠ ভাবে জায়গায় বসে পুনরায় ঘাড় সোজা করে চোখ বন্ধ করে নিল। মায়ার অসুস্থ বেহাল দশা চেহারাটা দেখে মেহু যা বুঝার বুঝে নিল। রিদের সাথে মনমালিন্যটাও কিছুটা আঁচ করে নিল মায়ার কপালের আঘাতটা দেখে। মেহু নিজের বিচক্ষণতা কাজে লাগিয়ে তাৎক্ষণিক জোড়ালো বুদ্ধি খাটালো মায়ার উপর। প্রথমে মায়ার সাথে কৌশল বিনিময় করলো। মায়া উত্তর না দেওয়ায় সোজাসাপ্টা বলে বসলো…
—” শুনলাম তোমার ভাইয়ের সাথে নাকি ফিহার বিয়ে। রিদই বললো আমায়। সাথে এ ও বললো আমাকে দুইদিন আগে চলে আসতে খান বাড়িতে। ভালোবাসার মানুষের কথা ফেলতে পারিনি তাই চলে আসলাম। আসলে আজ সারাদিন আমরা একসাথেই ছিলাম। দুপুরের লাঞ্চ ও একসঙ্গে করলাম। পড়ে রিদ বললো আমাকে খান বাড়িতে চলে আসতে। সেও নাকি আজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরবে আমার জন্য। ডিনার আমার সাথে করতে চাই তাই। আচ্ছা তুমি জানো তো ফিহার বিয়েটা যে এই খান বাড়ির থেকেই হচ্ছে সেটা?
মায়া মেহুর দীর্ঘ কথায় তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া জানালো না। বরং চোখ বন্ধ রেখে আস্তে করে বললো…
—” না।
—” ওহ! আমি কিন্তু আগে থেকেই জানতাম। রিদ বলেছিল। অবশ্য রিদ আমার সাথে সবকিছুই শেয়ার করে সবসময়। যেমন তোমার বিষয় গুলো করেছিল। বায় দ্যা ওয়ে! কি করবে কিছু ভেবেছ? রিদ নিশ্চয়ই তোমাকে বিয়ের জন্য না করেছে তাই তো! এমনটা হবে আমি আগেই বলেছিলাম। তাপরও তোমার ভালোর জন্য কাল তোমাকে বুঝাচ্ছিলাম এতো করে। কিন্তু তুমিই বুঝতে চাওনি। যায় হোক! এখন সত্যিটা জানার পর কি করবে কিছু ভেবেছ? দেখ! তোমার জন্য আমরা এক হতে পারছি না। রিদের দাদা-দাদি জোর করে উনারা রিদের গলায় তোমাকে বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু রিদ তার মায়ের পছন্দ মানে আমাকে সাথে সারাজীবন থাকতে চাই। এবার তুমি সেচ্ছায় আমাদের জীবন থেকে চলে গেলে সব ঝামেলা মিটে যাবে। দাদা-দাদি ও আর রিদকে জোর করতে পারবে না। এবার তুমি বলো কবে যাবে আমাদের মধ্যে থেকে?
মায়া ড্রয়িংরুমে এসেছিল শান্তির জন্য কিন্তু অশান্তির জ্বীর্ণ্য পুনরায় ছড়িয়ে পড়লো মায়ার শরীরে। ঠোঁট ভেঙ্গে আসছে কান্না গুলো। বুক ধড়ফড়ে তীব্র চাপা আর্তনাদটা জ্বলন্ত তাজা হলো মেহুর কথায়। মায়ার চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় জল গড়িয়ে পড়লো চোখের কানিশ বেয়ে। মায়া নিজের চোখের জল লুকাতে দূর্বল শরীরে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ালো। মেহুর কথার তাৎক্ষণিক উত্তর না করে চলে যেতে নিল সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমের দিকে। কয়েক কদম সামনে হেটে পিছনে না তাকিয়ে কষ্ট ধরা গলা ঝেড়ে শান্ত স্বরে মেহুর উদ্দেশ্য বললো…
—” কারও জীবনে ঝামেলা হতে চাই না আমি। তাই খুব শীঘ্রই চলে যাব আপু চিন্তা করো না। ভাইয়ার বিয়েটা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছি।
পিছন থেকে মেহু সিউরিটি জন্য বলে…
—” কথার নড়চড় করবে নাতো!
—” না।
~~
বিকাল হতেই খান বাড়ির বিয়ের ডেকোরেশনের কাজ চলছে তোড়জোড় করে। ইতিমধ্যে ফিহা, ও তার পরিবারের সবাই চলে এসেছে খান বাড়িতে। আয়ন ছাড়া। সে কাল আসবে ফিহার হলুদের অনুষ্ঠানে। হেনা খানের বড় মেয়ে শাহেবা ও তাঁর স্বামী, সন্তানদের নিয়ে হাজির হলো খান বাড়িতে। মেহুর পরিবার অনেকটা আগেই চলে এসেছিল খান বাড়িতে। কাল ফিহার হলুদ সন্ধ্যা। তাই আজকে খান পরিবারের সদস্যরা একত্রে হাজির হলো বাড়িতে। হেনা খান অনেকটা ব্যস্ত নিজের মেয়েও মেয়েদের জামাই, নাতি-নাত্তরদের নিয়ে। অসুস্থ মায়াকে তিনি সময় দিতে না পারলেও মালাকে মায়ার পাশে বসিয়ে রেখেছেন। এবং তিনিও কিছুক্ষণ পরপর মায়ার তদারকি করছে রুমে গিয়ে গিয়ে। বিকাল দিকে মায়ার জ্বরটা কমে গেলেও মেহুর সাথে কথা বলার পর, পুনরায় মায়ার গা কাঁপিয়ে জ্বর বেঁধেছে শরীরের। ফিহাও মায়ার অসুস্থতার খবর পেয়ে তখন থেকেই পাশে বসে আছে চিন্তত মুখে নিয়ে। কেন? কি-জন্য? কি কারণে? হঠাৎ করে মায়া এতটা অসুস্থ হয়ে পড়লো। সেটা কেউ ধরতে না পারলেও মেহু ঠিকই বুঝতে পারলো মায়ার অসুস্থতার কারণটা।
রিদ আসলো রাত নয়টার দিকে। মায়ার সাথে মনমালিন্যতার কারণে আজ একটু তাড়াতাড়িই বাসায় ফিরা তাঁর। সারাটা দিন তার এমনিতেই অস্থিরতায় কেটেছে বউটাকে আঘাত করে। ভালোবাসার বউ তার। হয়তো একটু অবুঝ! বুঝে কম। কিন্তু রিদ? সেতো আর অবুঝ নয়। নিজের রাগ কন্ট্রোল করে বউটাকে আঘাত না করে আরও একটু ধৈর্য ধরে বুঝানোর দরকার ছিল তার। অনুতাপে সারাটা দিন রিদের কাজেও মন বসলো না বউটার জন্য। ভিতর ভিতর ছটফট করেছে বেশ। রিদ নিজের মনমালিন্যতা পাশে রেখে খান বাড়িতে ঢুকতেই জানতে পারলো মায়ার তীব্র অসুস্থতার খবরটা। বড় বড় পা ফেলে অনেকটা দৌড়ে পৌঁছালো মায়ার রুমের দরজার সামনে। রিদের অস্থির চোখ দুটোতে ভাসলো মায়ার রুমে জমানো পরিবার সদস্যরের ছোট খাটো ভিড়টাকে। মায়ার মাথায় পুনরায় পানি টানা হচ্ছে তীব্র জ্বরে ঘোরে। হেনা খান কান্নাকাটি করছে মায়াকে নিয়ে। আরাফ খান মায়ার মাথায় অন্য পাশে বসে আছে। ফিহা, মালা মায়ার পায়ের কাছে বসা। মেহেরবান, শাহেবা, নিহা, মালিহা, আয়েশা, মেহু সবাই জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিছানা সামনে। হেনা খান মায়ার মাথায় পানি ঢালছেন। রিদ থমকে জায়গায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। মায়ার অসুস্থতার সম্পর্কে অবগত নয় সে। তাকে কেউ জানাই নি তার বউ এতটা অসুস্থ। রিদকে স্থির জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখে পড়লো আরাফ খানের। তিনি অন্তত সূক্ষ্ম কন্ঠে রিদকে ভিতরে ডাকলো। উপস্থিত সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে রিদের দিকে তাকাতেই রিদ ধীর পায়ে রুমে প্রবেশ করলো। কয়েক কদম হেঁটে মায়ার দিকে এগিয়ে আসতেই মায়া জ্বরের ঘোরে দূর্বল শরীরে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে হেনা খানে কোলে মুখ গুঁজে। বেহাল মায়া রিদের উপস্হিতি বুঝতে পেরেই পাশ ফিরে শুলো রিদকে নিজের চেহারা দেখাবে না বলে। রিদ থামে। মায়ার কান্ডে স্থির জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। নড়লো না। কিন্তু তৎক্ষনাৎ আহাজারি করে উঠলো হেনা খান। মায়ার হঠাৎ কাত হয়ে শুয়ে পড়ায় তার কানে পানি ঢুকলো অনেকটা। কিন্তু এতেও মায়া কোনো রকম প্রতিক্রিয়া জানালো না। বরং শরীর শক্ত করে খিচে পড়ে রইলো হেনা খানের কোলে মুখ গুঁজে।
হেনা শত বলেও মায়ার মাথায় পুনরায় পানি দিতে পারলো না আর। অবশেষে মায়ার ভিজা মাথায় টাওয়াল বেঁধে গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট মুড়িয়ে দিলো হেনা খান। মায়াকে নিজের কোলেই শুয়ে রাখলো ঐভাবে। একে একে সবাই রুম ছাড়লেও রিদ নড়লো না। চোখ মুখ শক্ত করে ঠায় জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। স্থির পায়ে দাঁড়িয়ে থাকলো মায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে। মায়াও রিদের উপস্থিতি বুঝে হেনা খানের কোলে মুখ গুঁজে পাশ ফিরে পড়ে রইলো। নিস্তব্ধতা পরিবেশের নীরব ভাঙ্গলো প্রথমে হেনা খান। তিনি রিদকে ফ্রেশ হতে বললেন। রিদ বিনা শব্দের রুম ছাড়লো। তবে রাগ মাটি হলো না। তিরতির মেজাজেই চলে গেল। হেনা খান আরও কিছুক্ষণ মায়াকে নিয়ে বসে থাকলো। একটা সময় তিনি মায়াকে বিছানায় ঠিকঠাক করে শুয়ে দিয়ে তিনি গেলেন নিচে। মায়াকে ঘুমাতে বলে।
বাসায় মেহমান আছে। তাদের সবাই ডিনার করাতে হবে। কাল ফিহার হলুদের অনুষ্ঠান। অনেক কাজ হাতে। আপাতত সবার ডিনার করে রেস্ট নেওয়া দরকার। সকাল থেকে সবার ব্যস্ততা শুরু হবে। সেখানে মায়ার এক্সট্রা যত্নের দরকার হবে। তাছাড়া রাত প্রায় বেশ হয়েছে মায়াকেও এবার কিছু খাইয়ে মেডিসিন খাওয়ানো দরকার উনার। নয়তো আরও অসুস্থতা বাড়ার সম্ভবনা আছে। চিন্তিত হেনা খান মায়াকে রুমে একা শুয়ে নিচে যেতেই মায়ার রুমে প্রবেশ করলো রিদ। মায়া তখনো বিছানায় হাল্কা নড়াচড়া করছিল জ্বরের অশান্তিতে। কিন্তু হঠাৎই রিদের উপস্থিত বুঝে মায়া শরীর খিঁচে চোখ বন্ধ করে বিছানায় ওপাশ হয়ে পড়ে রইলো ঘুমের ভান ধরে। রিদও মায়ার বিষয়টি বুঝতে পারলো। কিন্তু তারপরও জায়গায় থেকে নড়লো না। দরজার সামনে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো মায়ার দিকে চোখ মুখ লাল করে তাকিয়ে থেকে। দু’হাত মুষ্টি বদ্ধ করা তার। হয়তো রাগ কন্ট্রোল করছে। নিস্তব্ধ পরিবেশে দশ মিনিট! বিশ মিনিট! চল্লিশ মিনিট! প্রায় এক ঘন্টা যাবত ঠায় জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলো রিদ। নড়লো না। মায়াও হেলিয়ে বিছানায় পড়ে রইলো। একে অপরের উপস্থিতি বুঝতে পারছে দু’জনই। তারপরও রুমময় জোরে শুধু নিস্তব্ধতার বিরাজমান। দু’জনে গাঢ় নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে হঠাৎই হাজির হলো মেহু রিদের খোঁজে। রিদকে মায়ার রুমে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে তাকালো সে বিছানায় পড়ে থাকা মায়ার দিকে। মায়া ওপাশ ফিরে শুয়া। মেহু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঘুরিয়ে রিদের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে রুমে প্রবেশ করলো। রিদ মায়ার সম্পর্কের মনমালিন্যতা বুঝেও অবুঝ সেজে মেহু রিদের পাশাপাশি দাঁড়ালো। মায়াকে শুনিয়ে মিষ্টি স্বরে রিদকে জানালো মেহু ‘হেনা খান ডিনার জন্য রিদকে নিচে ডাকছে। এবং মেহুও অপেক্ষা করছে রিদের জন্য ডিনারে! একসঙ্গে খাবে বলে” রিদ মেহুর কথা গুলো শুনেও যেন শুনলো না। বরং পূর্ণ রাগি কটমট দৃষ্টি মায়ার দিকেই স্থির করা তাঁর। মেহুর পুনরায় মিষ্টি স্বরে ডাকতেই রিদ তেজ দেখিয়ে বের হয়ে যায় রুম থেকে। যাওয়া পূবে রিদের সম্পূর্ণ রাগ প্রকাশ পেল মায়ার রুমের দরজা উপর। রিদ শক্ত হাতে ঠাস করে দরজাটি লাগানোর ফলে মায়ার রুমের দেয়াল দেয়াল সহ মেঝেও খানিকটা কেঁপে উঠলো দারাম করে। আকস্মিক ঘটনায় মায়া মেহু দুজনই কেঁপে উঠেছিল। তবে মেহু নিজের কাজে সাফলতা অর্জন করতে পেরে মূহুর্তেই বাঁকা হেঁসে ঘাড় ঘুরিয়ে মায়াকে এক পলক দেখে নিয়ে সেও রিদের পিছন পিছন বের হয়ে যায় রুম থেকে। রিদ, মেহুর অনুপস্থিতি বুঝতেই মায়া বালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠলো তৎক্ষণাৎ। মায়ার কান্নার বেগে সাথে সাথে তার শরীরময়ও ঢুলছে তীব্র ফুঁপানিতে।
.
(সবাই বলে আমি নাকি বিয়ের দাওয়াত দেয়না কাউকে। তাই এবার দাওয়াত রইলো সবার। আসবেন কিন্তু।)
চলিত….
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৮০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৭৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৬
-
দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ১ গল্পের লিংক
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৩
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৮ প্রথমাংশ
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক