Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা) সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

০৫
নিজ ক্লাসে জড়সড় হয়ে বসে আছে মায়া। ক্লাস টির্চার মনোযোগ সহকারে তিনি তার পাঠদান করছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। হোয়াইট বোর্ডের কালো কালিতে ম্যাথ করছে মধ্য বয়স্ক টির্চার হাফিজুল হক। ক্লাসের ছেলে মেয়েরা দুই সারিতে বসা। মায়া প্রথম সারির তৃতীয় বেঞ্জ প্রথম সিটে বসে আছে জড়সড় হয়ে। চোখে মুখে ভিষণ ভয় আর আতংকে চাপ। ক্লাসে ক্লাস টির্চার থাকলেও ভয়ে সিঁটিয়ে আছে এই মূহুর্তে। ক্লাসের টির্চারকে ভয় পাচ্ছে এমন নয়। ভয়ে পাচ্ছে মায়ার বরাবর পাশের সারিতে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে দেখে। সেই সাথে ভয় পাচ্ছে মায়ার পিছনে বসে থাকা ছেলেটির জমজ বোনকেও। এই দুইজনকেই মায়ার বরাবর একটু বেশিই ভয় পায়। কারণে অকারণে মায়া তুলতুলে নরম শরীরে আঘাত করে তারা দুইজনই। আর আজ তো মায়াকে আঘাত করার নিদিষ্ট কারণও আছে ছেলেটির হাতে। এই যে ছেলেটি কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে সেটাও তো মায়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটির ভাষ্য মতে সে আজ মায়াকে দেখায় ব্যস্ত ছিল বলে ক্লাসে টির্চারের অংক গুলোতে মনোযোগী হতে পারেনি। যার ফল স্বরুপ তাঁকে সারা ক্লাসের মধ্যে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে ক্লাস টির্চার। এতে রবিন ভিষণ অপমান বোধ করেছে। যার ফল স্বরুপ মায়াকে বারবার চোখ রাঙ্গাচ্ছে ক্ষেপ্ত দৃষ্টিতে। ঠোঁট নাড়িয়ে শাসাচ্ছে “টির্চার গেলে মায়ার খবর আছে এমনটা বলে। ব্যাস! এতটুকুতে ভয়ে কাতপতুক মায়া। রবিন না জানি কি করবে বিষয়টি ভেবেই মায়ার শুকনো ঢুক গিলছে নিজের স্কুল ব্যাগটি দু’হাতে খামচে দিয়ে চেপে ধরে। কিছুতেই ভয়ে ছুটে ক্লাসে মনোযোগী হতে পারছে না ওহ। মায়াকে এমন হাসফাস করতে দেখে পাশ থেকে মায়ার বান্ধবী ছায়া ফিসফিসে বলে উঠে…

–” কিরে! ক্লাস না করে এমন ঝিম টিম ধরে বসে আছিস কেন? তোর কি শরীর টরিল খারাপ টারাপ লাগছে নাকি?

হালকা মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানিয়ে সবার অগোচরে ছোট শব্দে করে বললো..

— উঁহুম!

–” তোহ? ভোঁতা মেরে বসে আছিস কেন?

–” ভয়ে।

–“ভয়! কিসের ভয় টয় তোর আবার? আজকে কি স্যারদের পড়া টড়া শিখস টিখস নাই তুই? এইজন্য ভয় পাচ্ছিস? ( ফিসফিসে)

–” নাহ! রবিনকে দেখে ভয় পাচ্ছি। আমাকে মনে হয় আজও মারবে ওহ।

মায়ার কথায় মূহুর্তে চোখ তুলে তাকায় ছায়া রবিনের দিকে। রবিনের রাগী দৃষ্টি স্পষ্ট জানান দিচ্ছে সে আজ মায়াকে কিছু একটা করবেই। ছায়াও খানিকটা ভয় পায় রবিনের এমন দৃষ্টিতে। বরিন নামক ছেলেটি বড্ড উগ্র মেজাজের তাদের ক্লাসের মধ্যে। ক্লাসের প্রায় সবাইকেই কম বেশি ডিস্টার্ব করবে এটা তার রোজকার স্বভাব। দশ -বারোজনের সদস্যদের ক্লাসে তাদের একটি ছোট গ্যাং ও আছে। আর সেই দাপটে সবাই দমিয়ে রাখে নিজের কাছে। এলাকার বর্তমান মন্ত্রী ছেলেমেয়ে রবিন ও শিলা। দু’জনই জমজ ভাইবোন। দুইটায় বেশ ফাজিল ঊগচটা টাইপের। রবিনের নামের যদি কেউ টির্চারের কাছে নালিশ বসায় তো তার পরদিনই ঠিক দেখা যায় রবিন ইনিয়ে বিনিয়ে তার থেকে দ্বিগুণ টর্চার করবে সে বিচার প্রদানকারী সামনের মানুষটিকে। মায়ার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হচ্ছে তবে সেটা ভিন্ন ধাপের। রবিনের ভাষ্যমতে সে মায়া পছন্দ করে চিঠি দিয়ে প্রপোজও করেছে। কিন্তু মায়া সেই চিঠি হাতে নেই নি বরং সোজাসাপটা উত্তরে নাও করে দিয়েছে রবিনকে। এতে করে ভিষণ ক্ষেপ্ত রবিন মায়ার উপর যার রেশ টেনে রোজ মায়াকে নতুন নতুন টর্চার করে বেড়ায়। সাথে ভয় দেখায় ভিন্ন দিক দিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে। যেমন মায়া যদি রবিনের নামে কাউকে কিছু বলে বা নালিশ করে তাহলে পুরো স্কুল জুড়ে বলে বেড়াবে সে, মায়া নিজে রবিনকে প্রেমের চিঠি নিবেদন করেছে প্রেম করার জন্য। রবিনের সাক্ষী হিসাবে থাকবে রবিনের সকল বন্ধু মহল। রবিনের রগচটা বিষয়টি ভিষণ ভাবে আঘাত ফেলে মায়ার ছোট মাথায়। ভয়ে সিঁটিয়ে যায় নিজের মাঝেই। যার ফলে কাউকে কিছুই বলতে পারে না জড়তায়। যদি সবাই থাকে খারাপ ভাবে। দাদা-দাদি যদি বকাঝকা করে রবিনের এই কথা গুলো শুনে। আর এই কারণটি জন্যই মায়া স্কুলে আসতে চাই না। শুধু হেনা খানের চাপাচাপিতে আসতে হয় মায়াকে।

মায়া স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে রবিন ও রবিনের বোন শিলা মায়ার পিছনে উঠেপড়ে লেগেছে। মায়ার ভয়াৎ বিষয়টি বুঝতে পেরে ছায়া মায়ার একটা হাত চেপে ধরে আশ্বাস দিয়ে ফিসফিস করে বলে…

–” তুই চিন্তা করিস না মায়ু। আমি আছি তোর সাথে। টিফিন আগে রবিন কিছুই করতে পারবে না তোর সাথে স্যার ম্যাডাম থাকবে ক্লাসে। টিফিন পিরিয়ড হলেই সোজা আমি তোকে নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাবো একেবারে। তারপর টিফিন শেষ হলে তোকে নিয়ে আমাদের গ্রুপের ক্লাসে চলে যাবো। সেখানে রবিন আসবে না। ওর সাইন্সের আর আমরা মানবিকে স্টুডেন্ট। ঝামেলা হবে না তোর। টেনশনে করিস না তুই।

ছায়া এমন কথায় যেন মূহুর্তেই আশ্বাসত হয় মায়া। সাথে সাথে ছায়ার একটি হাত চেপে ধরে কৃতজ্ঞতা স্বরুপ। এই অপরিচিত পরিবেশে একমাত্র ছায়া আর টিয়াই মায়ার বন্ধু মহল।

পরপর সকল ক্লাস চুকিয়ে টিফিন ঘন্টার বেল বাজতেই ক্লাস টির্চারের সাথে সাথে ছায়াও মায়ার হাত চেপে ধরে এক প্রকার দৌড়ে বের হয়ে যায় ক্লাস থেকে। ওদের পিছন পিছন টিয়াও হতভম্ব হয়ে বেড়িয়ে যায়। ক্লাসের সামনে করিডোরে বারান্দা দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়, লাইব্রেরীর পিছনে ওয়াশরুমে পাশটায় এসে দাঁড়ায় তিন জনই। কমড়ে দুহাত রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে তিনজনই। রবিনের গ্যাং হতে মায়াকে বাঁচাতে পেরে নিজের ওপর খুবই গর্বিত ছায়া। মায়া প্রাণ খুলে হাসে। তৃপ্তি ছেয়ে যায় মায়ার চোখ দুটোতে। আরও একটু প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিতেই কেউ একজন মায়ার লম্বা চুলের বেনি ধরে টেনে উঠে শক্ত হাতে। তিনজনই হকচকিয়ে উঠে পাশে তাকাতেই চোখে পড়ে রবিনের রাগী দৃষ্টি। মায়া ভয়ে আতংকে উঠে শুকনো ঢুক গিলে বারকয়েক। চুলে ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠে রবিনের হাত থেকে নিজের চুল ছাড়ানোর জন্য বামহাতটা এগিয়ে দিতেই, পাশ থেকে শিলা এগিয়ে এসে মায়ার বামহাতটা শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দুহাতে। মায়ার অতিশয় তুলতুলে নরম হাতে নিজের দুইহাতে নখ ডাবিয়ে দিয়ে খামচি ধরে শিলা। অসয্য হাতের ও চুলের ব্যাথা সয্য করতে না পেরে এবার ডুকরে কেঁদে উঠে মায়া হালকা শব্দ করে। পাশ থেকে ছায়া ও টিয়া উত্তেজনায় বাঁধা দিতে গেলে পথ আটককে দাঁড়ায় রবিনের বন্ধুরা। রবিন মায়ার লম্বা চুলের একটা বেনি শক্ত হাতে জোরে টেনে ধরতেই মায়া খানিকটা ঝুঁকে যার রবিনের দিকে। রবিন রাগান্বিত কন্ঠে বলে উটলো…

–” তোকে আমি এত সহজে ছেড়ে দিব ভেবেছিস। পালিয়ে গেলে আমি তোকে খুঁজে পাবো না কোথাও? এই মনে হয় তোর? আজ তোকে আমি আচ্ছা মতো জব্দ করবো দেখ এবার। হয় তুই আজ আমার লাভ লেটার গ্রহণ করবি নয়তো তোর সব চুল কেটে দিব আমি।

পাশ থেকে ছায়া চেঁচিয়ে উঠে…

–” রবিন চুল ছাড় ওর। ব্যাথা পাচ্ছে ওহ।

সঙ্গে সঙ্গে টিয়াও চেঁচে উঠে বলে…

–” তোর নামে আজই প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে নালিশ জামাব আমরা। দেখিস তুই এবার। কি হাল করি তোর শালা!

লাইব্রেরীর পিছনে ওয়াশরুমে পাশের হালি জায়গায়টায় হওয়ায় এখানে বেশ নির্জন। এখানে সচারাচর কেউ আসে না। আর সেই সুযোগটায় যেন কাজে লাগাচ্ছে এই মূহুর্তে রবিন। ছায়া, টিয়া কথায় পাত্তা না দিয়ে দ্বিগুণ তেতে উঠে রবিন। ক্ষেপ্ত বংগিতে বলে…

–” যাহ! যা পারিস করিস তোরা। তারপরও আজকে ছাড়ছি ওকে। ওর একটা বিহিত করেই ছাড়বো আমি। ওর জন্য আমাকে আজ ম্যাথ স্যারের কাছে অপমানিত হতে হয়েছে। কান ধরতে হয়েছে ক্লাসে। ওহ যদি আমার চিঠি গ্রহণ করতো তাহলে আমি কি ক্লাসে বসে বসে ওকে দেখতাম পড়া রেখে। সব দোষ ওর। এবার ওকে আমি ছাড়বোই না।

কথা গুলো বলেই আবারও শক্ত করে মায়ার চুল টেনে ধরে রবিন। পাশ থেকে শিলাও আরও জোরে খামচে দিয়ে ধরে মায়ার হাত। মায়া ডুকরে কেঁদে উঠে নিজের ডানহাতে মুখ চেপে ধরে বলে উঠে…

–” আমি ব্যাথা পাচ্ছি রবিন।

–” লাগুক তোর ব্যাথা। ব্যাথা পাওয়ার জন্য দিচ্ছি আমি। তুই আমার লাভ লেটার ফিরিয়ে দিয়েছিস এতো বড় সাহস তোর।

হাতের, চুলের অসয্য ব্যাথায় সয্য করতে না পেরে কেঁদে ডুবুডুবু হয় মায়া। ডানহাতে নিজের মুখটা চেপে ধরে কেঁদে চলছে মায়া। সুপ্ত আশা নিয়ে আছে রবিন থেকে বেঁচে যাওয়ার। আর মায়ার সেই আশার আলো হয়ে কেউ একজন সামনে থেকে ভারি কন্ঠে বলে উঠলো..

–” কি হচ্ছে এখানে??

গম্ভীর কণ্ঠে কথাটি শব্দের উৎস ধরে সামনের দিকে তাকাতেই চমকে উঠে সবাই। ভয়ে চুপসে গিয়ে শুকনো ঢুক গিলে সবাই। মায়া রিদকে নিজের সামনে দেখে ভরসা পেয়ে আরও ডুকরে কেঁদে উঠে শব্দ করে মুখ চেপে। রিদ কপাল কুঁচকে সবাইকে পযবেক্ষণ করতেই থমকে যায় মূহুর্তেই। মায়ার এমন বিধস্ত নাজেহাল অবস্থা দেখে শীতল হয়ে যায় রিদ। বুকের কোথাও একটা অস্থিরতার তোলপাড় হয়ে মায়ার কান্না জড়িত মুখটা দেখে। রিদের তাকানোর মধ্যে দিয়েই রবিন ও শিখার ভয়ে চুপসে গিয়ে আস্তে করে মায়াকে ছেড়ে দেয়। ওদের কাছ থেকে ছাড়া পেতেই দৌড়ে গিয়ে ঝাপটে ধরে রিদকে। মায়া নিজের দুহাতে রিদের পেট শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, মুখটা চেপে ধরে রিদের বুক বরাবর। রিদকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরেই আবারও ফুপিয়ে কেঁদে উঠে রিদের বুকের ভিতর।

রিদ থমকায়। নিজের বুকটা ক্রমশয় চিনচিন ব্যাথা অনুভব করে। এমনটা তো হওয়ার কথা নয় তাঁর সাথে। তারপরও হচ্ছে। রিদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই হচ্ছে সবটা। তাঁর কেন অন্যের কান্না দেখে নিজের মধ্যে অস্থিরতা লাগবে? তাঁর বুকটা মৃদু কেঁপে কেঁপে উঠছে মায়ার কান্নায়। রিদ চোখ বন্দ করে বার কয়েক বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে ছাড়ে। নিজের দাদাভাই এক জোর করেই নিয়ে এসেছিল তাঁকে স্কুলে মধ্যে। উদ্দেশ্য দুটো ছিল এক স্কুলের ফাউন্ডার প্রতিষ্ঠাতা হয়ে স্কুলের তদারকি করার জন্য। অন্যটা হলো মায়ার তদারকি করা। রবিন ছেলেটি সম্পর্কে খুঁজ নেওয়া জন্য। স্কুলে এসেছিল তারা আরও ঘন্টা খানিকটা আগেই কিন্তু আরাফ খান স্কুলে বিষয়ক আলোচনা সমালোচনা করতে দেখে রিদ এক প্রকার বিরক্তি বের হয়ে এসেছিল মায়ার উদ্দেশ্য। মায়ার ভয় পাওয়ার বিষয়টি তদন্ত করার জন্য। টিফিন পিরিয়ডে মায়াকে হুট করেই দুটো মেয়ের সাথে দৌড়ে এদিকটায় আসতে দেখে সেও কপাল কুঁচকে তাকিয়ে ছিল মায়ার যাওয়ার দিকে। তার পরপরই যখন কিছু সংখ্যক ছেলে মেয়েদের মায়ার পিছন পিছন দৌড়াতে দেখে তখনও কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করে রিদ। খানিকটা সময় নিয়ে বুঝতেই এগিয়ে যায় কৌতুহল বশত সেই দিকে। ভিড় দেখে রিদ প্রশ্ন করতেই চোখ পড়ে মায়ার বিধস্ত নাজেহাল কান্নায় টইটম্বুর চেহারা। পরপর দুটো ছেলে মেয়ে মায়াকে আঘাত করতে দেখে মূহুর্তে থমকায় রিদ। ভিষণ ভাবে আহত হয় মন কৌটায়।

আজ ঠিক সময় আসায় হয়তো মায়াকে রক্ষা করতে পেরেছে নয়তো আরও খানিকটা বেশিই কষ্ট পেত। মায়া কষ্ট পাচ্ছে বলেই মূহুর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে আসে রিদের। মুষ্টি বদ্ধ করে নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা চালায়। ফুলে উঠা কপালে রগের সহিত সাথে সাথে চোখ খুলে তাকায় সামনে। রক্ত লাল চোখে দৃষ্টি বুলাই রবিন ও তাঁর পুরো গ্যাং এর দিকে। নিস্তব্ধতা মাঝে রিদ হঠাৎই হাঁক ছেড়ে ডেকে উঠে আসিফকে…

–” আসিফ! সম্পূর্ণ করিডোর খালি চাই আমার। মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে। এখানের পুটো গ্যাংকে নিজের দখলে আপাতত। ডু ইট ফাস্ট!

রিদ এমন হাঁক ছেড়ে চিৎকারে কেঁপে উঠে মায়া। মূহুর্তেই আরও শক্ত করে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে রিদকে। রিদের বুকে নিজের নাক মুখ চেপে ধরে আবারও ফুপিয়ে কেঁদে উঠে ভয়ে। মায়ার এই মূহুর্তে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় স্তল মনে হচ্ছে রিদকে। তাই রিদকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে ছোট মায়া আর কোনো দিক বিবেচনা না করেই ঝাপিয়ে পড়ে রিদের বুকে। রিদ শান্ত হওয়ার চেষ্টা চালায়। এই মূহুর্তে বড্ড অস্থিরতা স্বীকার হচ্ছে সে। অশান্ত হয়ে উঠছে তাঁর মন গহীনে। মায়ার কান্নারত বিধস্ত চেহারা ও রিদকে হুট করে এই ভাবে জড়িয়ে ধরাটায় বড্ড অস্থিরতার স্বীকার হচ্ছে রিদ। রিদের কথা অনুযায়ী আসিফ দ্রুত বডিগার্ডের নিয়ে রবিন ও তাঁর পুরো বাচ্চা দলবলসহ বাকি যারা করিডোর আশেপাশে ছিল সবাইকে নিয়ে মূহুর্তেই প্রাস্হান করে রিদের সামনে থেকে। রিদ শান্ত হয়। মায়ার অবস্থান বুঝতেই মায়াকে রিদের পেটের বাঁধন হতে মুক্ত করতে চাই। রিদ নিজের হালকা হাতে মায়াকে নিজের কাছ থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই ভয়ে মায়া সাথে সাথে কাঁধ ঝাঁকিয়ে রিদের হাতটি পেলে দিয়ে আরও শক্ত করে ঝাপটে ধরে রিদের পেট বরাবর। রিদ থামে। অস্থিরতা নামক ছোট শব্দটি তোলপাড় করে তুলছে রিদের ভিতর থেকে। মায়ার উষ্ণ নিশ্বাস উঠা নামা করছে রিদের বুকের মধ্যে।
অজানা অনুভূতি গুলো গ্রাস করছে রিদকে মূহুর্তেই। মায়া ছোট হলেও রিদ ছোট নয়। জড়িয়ে ধরা মেয়েটি তার বউ সেটা রিদ জানে। আর জানে বলেই সেটাই রিদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়ে এই মূহুর্তে। সারা শরীর ঝাঁকিয়ে মৃদু কেঁপে উঠছে বারবার। তাঁর এই চব্বিশ বছরের রেকর্ড ভাঙ্গছে বিগত ঘটে যাওয়া দুই মিনিটে মধ্যে, তাও তাঁর অস্বীকৃতি প্রাপ্ত বউ নামক মানুষটি দ্বারা। রিদ ওপরের দিকে মুখ করে বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে শান্ত হয়। শান্ত বংগিতে মায়ার দিকে তাকায়। মায়াকে আর নিজের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা না করে, বরং হাত বাড়িয়ে মায়ার আঘাত প্রাপ্ত বামহাতটি পেট থেকে ছাড়িয়ে নিতে চাই দেখার জন্য। কিন্তু এতেও মায়া রিদকে ছাড়তে নারাজ ভয়ে নড়েচড়ে উঠতেই রিদ স্নিগ্ধ কন্ঠে বলে…

–” ভয় নেই আমি আছি তো! জাস্ট হাতটা দেখতে দাও আমায়।

কথা গুলো বলেই রিদ নিজের কমড় থেকে মায়ার বামহাত ছাড়িয়ে নিয়ে সামনে ধরতেই শীতল চোখ বুলাই মায়ার হাতে। দশ আঙ্গুলে ডুবান্তর নখের আছড় স্পষ্ট ফুটের উঠেছে মায়ার হলদেটে হাতে। সেখান থেকে বিন্দু বিন্দু রক্তের ফুটার জমাট। রিদ হাত বাড়িয়ে মায়ার বাম হাতের জামাটা একটু উপরে তুলতেই রিদের হাতের স্পর্শে মৃদু কেঁপে মায়া, রিদকে জড়িয়ে ধরার মধ্যে দিয়েই। রিদ মায়ার কম্পন বুঝতে পারে। রিদ থামে খানিকটা সময়। অস্থিরতা তাঁকেও জেঁকে বসেছে। তারপরও নিজেকে শান্ত করে মায়ার বামহাতের জামাটা উপরে তুলে দেখতে তাঁকে সম্পূর্ণ হাতটি। ছোট অবুঝ মায়ার অল্প ব্যাথায় যেন রিদের প্রশস্ত বুকে আঘাত করছে বারবার। রিদ হাত বাড়িয়ে সেই ব্যাথা গুলো আলতো হাতে স্পর্শ করে দিতেই আবারও কেঁপে উঠে মায়া। রিদের শার্টের পিছন খামচে দিয়ে চেপে ধরতেই আবারও থামে রিদ। মায়াকে আর না ছুঁয়ে, মায়ার বামহাতটা নিজের ডানহাতের মোটোই নেয়। সাথে সাথে চমকে উঠে রিদ, কম্পিত হয় এবার রিদের শরীর। এতটা নরম তুলতুলে শরীরে অধিকারী হবে মায়া তাহ জানা ছিল না রিদের। দীর্ঘ দশ বছর পর নিজ থেকে আজ প্রথম রিদ মায়াকে ছুঁয়েছে। অনুভূতিরা সব দলা পাকিয়ে আসছে নিজের মাঝে। এবার অস্থিরতাটা বেশ হচ্ছে। সেই সাথে বিরক্তিও। সামান্য একটা মেয়ের জন্য তাঁর বারবার কেঁপে উঠা অযুক্তিকর মনে হচ্ছে। ফালতু থেকেও ফালতু মনে হচ্ছে তাঁর এই অনুভূতিটা। তাই ঝটপট মায়াকে টেনে নিজের থেকে ছাড়িয়ে সামনে দাঁড় করায়। তাড়া দিয়ে বলে উঠে…

–” আমার সাথে আসো…

কথা গুলো বলেই রিদ মায়ার দিকে আর না তাকিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে সামনে দিকে এগিয়ে যায়। পিছনে থেকে মায়া ধীরে পায়ে এগিয়ে যেতে থাকে রিদের পিছন পিছন। রিদ খানিকটা এগিয়ে যেতেই আবারও পিছন ফিরে তাকায় মায়ার দিকে। মায়াকে নিজের থেকে বেশ দূরে দেখে কপাল কুঁচকে আসে তাঁর। নিরব দৃষ্টিতে চোখ বুলাই মায়ার বিধস্ত কান্না জড়িত মুখপানে। কিছু একটা ভেবে আবারও এগিয়ে এসে মায়ার একটি হাত নিজের হাতের মোটোই চেপে ধরে নিয়ে যায় অফিস কক্ষে। জনমানবহীন নিরিবিলি ফাউন্ডার অফিস কক্ষটিতে নিয়ে মায়াকে সাদা সোফার উপর বসিয়ে ঠিক তাঁর সামনে বসে রিদ। আলতো হাতে মায়ার কাটা ছেঁড়া জায়গায় গুলো পরিষ্কার করে মহল লাগে দিয়ে চোখ তুলে তাকায় মায়ার দিকে রিদ। এখনো থেকে থেকে হালকা ফুপিয়ে কেঁদে উঠছে মায়া। অতিরিক্ত কান্নার ফলে নাক মুখ লাল হয়ে ফুলে গেছে। রিদ বিরক্তিতে চোখ বুলাই মায়ার চোখে মুখের দিকে। একটা মানুষ কতটা কান্না করতে পারে জানা নেই তাঁর। এই মূহুর্তে ভিষণ বিরক্ত হচ্ছে রিদ মায়ার উপর। নিজের সেফটি করার ন্যূনতম চেষ্টা তো করে মানুষ। কিন্তু মায়া তা না করে শুধু মার খেয়েই গেছে। এটা কোনো কথা হলো। এতটা দুর্বল হলে এই সমাজে চলবে কিভাবে মেয়েটা? সৎ সাহসীকতা অন্তত না থাকলে পদে পদে বিপদে সম্মোহীন হতে হবে তাকে! আজ না হয় সে ছিল বলে মায়াকে রক্ষা করতো পেরেছে। রোজ রোজ তো আর সে থাকবে না! আর না অন্য কেউ থাকবে না মায়াকে বাঁচানোর জন্য। তাই নিজের হিফাজত নিজের করার কৌশলটা অন্তত জানা জরুরি। তাই উপদেশ স্বরুপ বলে উঠলো রিদ…

–” লুক! আমাদের সমাজটা হলো অসভ্য সমাজ। অসভ্য সমাজে সভ্য মানুষ খুঁজাটাও বোকামো।
কারও ভয়ে, ভয় পেলে সে তোমাকে আরও দ্বিগুণ ভয় দেখাবে। এটাই নিয়ম। মানুষ হলো সুযোগ সন্ধানী। সে সুযোগ নিবেই। তাই নিজের ভয়কে জয় করতে শেখ। কেউ তোমাকে চোখ রাঙ্গলে তুমিও তাঁকে সেইম জিনিসটায় ফিরত দাও। তবুও নিজের সুযোগ অন্যকে নিতে দিও না। অসহায়ত্বের সুযোগ সবাই নিতে চাই। ক্ষমতা জিনিসটা সবাইর পছন্দ। কারও ক্ষমতা যদি গোটা দুনিয়া অবধি চলতো তাহলে সে সেটার প্রয়োগ অবশ্যই করতো এবং নিজের কাছে গোটা পৃথিবীকে দমিয়ে রাখতো। কারণ ক্ষমতা প্রয়োগের মধ্যে আলাদা একটা তৃপ্তি আসে মানুষ মনে। তাই কারও ক্ষমতা নিজ অবধি চলতে দিও কখনো এতে তোমারই ক্ষতি। সামনের মানুষটা কিন্তু ভালো থাকবে, মধ্যে থেকে তুমিই বিধস্ততা শিকার হবে।

কথা গুলো বলেই রিদ খানিকটা থেমে মায়ার চোখের দিকে নিজের দৃষ্টি স্থির করে আবারও ঠান্ডা গলায় বলে উঠলো রিদ…

–” এই অসভ্য সমাজে নম্র, ভদ্র, সভ্য মুখোশ দারী লোকের অভাব নেই। প্রত্যেকটা মানুষ নিজ স্বার্থে রুপ বদলায়। স্থান পরিবর্তন করে। কাউকে আঘাত করে, কেউকে আবার দুনিয়া থেকে বিদায় হতে হয় অপরের স্বার্থে স্বীকার হয়ে। এই সমাজে চলতে গেলে তোমাকে হতে হবে কঠোর মনের অধিকারী। আত্মনির্ভরশীল সৎ সাহসী নারী। তোমাকে বাঁচানো জন্য সবসময় কেউ না কেউ পাশ থাকবে এমনটা আশা করাও বোকামি। আজ আমি ছিলাম কাল আমি না ও থাকতে পারি। তখন তোমাকে এই অসভ্য সমাজে মানুষ সাথে নড়ায় করেই এগিয়ে যেতে হবে। নিজের দুর্বলতাটা অন্যকে বুঝতে দিও না। নিজের দুর্বলতাকে প্রকাশ করতে নয় লুকিয়ে রাখতে শেখ। যাতে কেউ তোমাকে ভেঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে না পারে। বুঝতে পারছো আমি কি বুঝাতে চাইছি তোমাকে।

রিদের কথায় মূহুর্তে নাড়িয়ে সম্মতি জানায় মায়া। যার অর্থ সে বুঝতে পেরেছে। রিদ মায়ার মাথা নাড়ানোতে কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় মায়ার দিকে। রিদের ধারণা মতে আদৌ মায়া তাঁর কথা গুলো বিন্দু মাত্র বুঝতে পেরেছে কিনা সন্দেহ। না বুঝেই রিদের কথায় মাথা দুলাচ্ছে মায়া সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে রিদ। মায়া ছোট হওয়ায় যে রিদের কোনো কথায় মায়ার ছোট মাথায় ধরে রাখতে পারেনি সেটা ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে রিদ। ফুস করে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে সোফায় গা এলিয়ে দেয় রিদ চোখ দুটো বন্ধ করে নেয় বিরক্তিতে। তিক্ততা ছেয়ে যাচ্ছে রিদের মিশ্রিত অনুভূতি সাথে।

রিদ বুঝতে পারছে মায়াকে তাঁর সেফটি দেওয়া খুব জরুরি। অবুঝ মায়ার যেকোনো সময়ই কিছু একটা হয়ে যেতে পারে অসভ্য সমাজের মানুষদের ভিড়ে। হারিয়ে যেতে পারে মায়ার কোমলতা। তাঁর মায়াকে এবার চোখে চোখে রাখতে হবে। এক কথায় মায়াকে নজর বন্দী করতে হবে তাঁর। বাঁচাতে হবে সকল আগ্রত বিপদ থেকে। ছায়া দিয়ে আঁকলিয়ে রাখতে হবে নিজের আপনজনের মতো। যেমনটা এতটা বছর ধরে নিজের দাদা-দাদিকে সিফটি দিয়ে আসছে সকল বিপদ আপদ ও শত্রুদের হাত থেকে। আজ থেকে মায়াকেও তাঁর সিফটি দিতে হবে বরং তাঁর থেকে আরও দ্বিগুন বেশি দিতে হবে। এক! মায়া ছোট, দ্বিতীয়ত্ব মায়ার মধ্যে নিজের দাদা-দাদির সুখটা দেখতে পেরেছে কাল থেকেই রিদ। তাদের জন্য হলেও মায়াকে এবার নজর বন্দী করে নিবে সে। রিদ চোখ খুলে তাকায় পাশে মায়ার মুখশ্রীতে। সাথে সাথে চোখাচোখি হয় দু’জনের। মায়া রিদের দিকে এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল। রিদ তাকাতেই চোখ নামিয়ে নেয় মায়া। রিদের দৃষ্টি স্থির মায়ার মুখপানে। কিছুক্ষণ পলক বিহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই কিছু একটা ভেবে বিরক্তিতে উঠে যায় রিদ। মায়া আশেপাশে থাকলেই তাঁর এমন হয় অবাধ্য চোখে দুটো শুধু মায়াতেই স্থির হয়ে যায়। এতে রিদ বিরক্তি। ভিষণ বিরক্ত। এই অস্থিরতা নিয়ে এখানে আর থাকা যাবে না রিদের। তাই রিদ মনে মনে ঠিক করে যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাবে সে। এখানে তাঁর আর কোনো কাজ নেই এই দুইদিন কোনো রকম পার করতে পারলেই বাঁচে। এখানে সবাই ভালোই আছে। নিজের দাদা-দাদীও ভালো আছে মায়াকে পেয়ে। তাহলে রিদের আর আসার দরকার নেই বাংলাদেশে। এবার দেশ ছাড়লে আর আসবে না সে বাংলাদেশে। দূর থেকেই সবার সেফটির ব্যবস্হা করে দিবে সে। যোগাযোগ রাখবে দাদা-দাদির সাথে তবুও বাংলাদেশে আসবে না আর সে। বছর একবার একদিনের জন্যও আসবে না আর সে। যে যার মতো ভালো থাকুক সেও তাঁর মতো থাকবে। ভালো থাকবে। কথা গুলো ভেবেই আবারও চোখ ঘুরিয়ে তাকায় মায়ার দিকে। মায়াকে এক পলক দেখে নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে চলে যায় বাহিরের দিকে।

চলবে…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply