Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫৫


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

(কার্টেসী বা কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ। শেয়ারিং ছাড়া)
৫৫
খান বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় চলছে। বেশ অনেক দিন পর শুভবার্তা নিয়ে হাজির হলো আরিফ আর ফিহা বিয়ের সূত্র ধরে। টানা তিনটা দিন হসপিটালের কাটিয়ে অবশেষে ফিহাকে খান বাড়িতে নিয়ে এলো সবাই। আপাতত আলোচনা, সমালোচনার, জন্য খান বাড়ির পরিবেশটা উপযুক্ত মনে করায় ফিহাকে হসপিটাল থেকে সোজা খান বাড়িতে নিয়ে আসলো মেহেরবান। নিজেদের বাড়িতে না গিয়ে। খান পরিবার, ও মায়ার পরিবারের সবাই উপস্থিত বসে আসে খান বাড়ির ড্রয়িংরুমে। প্রত্যেকের বিশেষ আলোচনা আরিফ ফিহার বিয়ে নিয়ে। ফিহা মাথা নিচু করে হেনা খানের পাশে দূর্বল শরীরে চেপে বসে আছে। আরিফ নিজের মা-বাবার শাহিন, জুইকে নিয়ে একপাশে বসে আছে। মায়া আপাতত দুই পক্ষের হয়ে ডাইনিং টেবিলের বসে খাবার খাচ্ছে গোল গোল চোখে সবাইকে দেখগে দেখতে। সে দুই পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য বলে তার এই আলোচনা সভায় কাজ নেই বলেই নিরব দর্শক হলো মায়া। আয়ন নিজের বাবা-মাকে নিয়ে বিপরীত পাশে বসে আছে। হেনা খান, আরাফ খান ফিহাকে নিয়ে বসে আছে দুই পক্ষের সামনে। রিদ নেই। সে এসব পারিবারিক ঝামেলায় জড়ায় না কোনো কালেই। তাই তাকে এই সমালোচনা সভায় খুঁজাটাও বোকামি। সবার দীর্ঘ আলোচনা শেষ হলো। প্রত্যেকের সম্মতি হলো আরিফ ও ফিহার সম্পর্কটা মেনে নিয়ে। তবে ফিহা বাবা আপত্তি রাখলেন তিনি ফিহার অর্নাস কমপ্লিট করার পর বিয়ে দিবেন। এখন আপাতত দুই পক্ষের সম্মতিতে আংটিবদল করে রাখতেন। কিন্তু উনার কথায় বাঁধ সাধলো আরিফ। সে কোনো মতোই এতো লম্বা ডেট নিয়ে বিয়ে করবে না। বরং যত দ্রুত সম্ভব ফিহাকে বিয়ে করে নিয়ে যেতে চাই। শফিকুল ইসলাম ছেলের মনোভাব বুঝতে পেরে চোখ তুলে তাকালো এক পলক ফিহার দিকে। ফিহার নত অসহায় ফেসটা দেখে ঘাড় ঘুরালো আয়নের পরিবারের দিকে। অন্তত গম্ভীর মুখ রয়েসয়ে ধীরস্থে বলে উঠলেন তিনি…

—” আমার মনে হয়না এই বিয়েতে আর দেরি করাটা আমাদের কারও জন্য শোভিনীয় হবে বলে। প্রণয় পরিণতি দুটোই দেখা ইতিমধ্যে সবার। এই যুগের ছেলেমেয়ে তাঁরা। হুটহাট কখন কি করে বসবে বলা দায়। বাবা মা হিসাবে আমাদের দায়িত্বটা ভালো ভালো পালন করে ফেলাটায় শ্রেয়। ছেলেমেয়ে দু’জন দু’জনকে যেহেতু পূর্ব থেকেই পছন্দ করে তাই আমার মনে হয়না এতো কিছুর পরও বিয়ের ডেট পিছানোটা ঠিক হবে। সংসার তাঁরা করবে। ভালো মন্দও তারা বুঝবে। আমরা বড়রা শুধু দায়িত্ব পালন করব। আজ তাঁরা আমাদের সম্মতির অপেক্ষায় বসে থাকলেও কাল এমনটা নাও হতে পারে, দুজন আমাদের সম্মতির ছাড়ায় কিছু একটা করে বসলো। তখন আমরা বড়দের আর মুখ থাকবে না। তাই বলছি! যেহেতু পারিবারিক ভাবে মেনে নেওয়া হয়েছে তাই বিয়েটাও আমরা এই সাপ্তাহই করতে চাচ্ছি। তবে ছেলের জন্য বউ নয়! নিজেদের জন্য একটা মেয়ে নিয়ে যাব এই বাড়ির থেকে ইনশাআল্লাহ।

মেহেরবান নিরব দর্শক সাজলেন এই মূহুর্তে। তিনি কোনো রকম প্রতিক্রিয়া জানালো না কোনো কিছুতে। মেয়ে শান্তি তো তিনিও শান্তি। বাড়াবাড়ি ফল তিনি ইতিমধ্যে পেয়েছেন। মেয়েকে হারাতে বসেছিল। একমাত্র রিদের জন্য ফিহাকে নিজের কাছে ফিরে ফেল নয়তো দেখা যেত সেদিন রিদের সাথে দেখা করে তিনি সোজা স্বামীর অফিসে চলে যেত স্বামীর দেখা করতে। সেদিন রিদ সর্তক না করলে হয়তো নিশ্চয়ই এতক্ষণে উনার মেয়েকে কবরে পাওয়া যেত। তিনিও সন্তান হারা হতেন। তাছাড়া সেদিন রিদের বলা কথা গুলো ও ফিহার সুইসাইডের বিষয়টি মেহেরবানের মস্তিষ্কে টনক নড়েছে তুমুল ভাবে। মেয়েকে হারানো চেয়ে সম্মতি দেওয়াটাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত মনে করলেন তিনি। তবে শফিকুল ইসলামে কথায় কেউ আপত্তি না জানালেও পুনরায় ফিহা বাবা আপত্তি রাখতে চাইলেন কিন্তু তাতেও বাধ সাধলো আয়ন। অন্তত হাসির মুখে নিজের বাবাকে চোখের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো শফিকুল ইসলামের গম্ভীর মুখের দিকে। শফিকুল ইসলামকে দেখে সম্মতিসূচক হাসি মুখে বলে উঠে আয়ন…

—” ফিহার পরিবার হিসাবে আমাদের কারও কোনো আপত্তি নেই আঙ্কেল। আমরা সবাই রাজি। বোনের পছন্দ আমাদেরও পছন্দ। আপনারা বড়রা মিলে বিয়েটা সামনের সাপ্তাহই ঠিক করুন। আমরা যথানিয়মে বোনকে তুলে দিব।

মোটা ফ্রেমের চশমার ফাঁকে আয়নের দিকে নিজের ক্ষীণ দৃষ্টি স্থির করলো শফিকুল ইসলাম। আয়ন নামক ছেলেটিকে অন্তত পছন্দ উনার। সভ্য সুন্দর মার্জিত ব্যবহার। তিনি হসপিটালে থাকাকালীন ডক্টর হিসাবেও বেশ ভালোভাবে তদারকি করেছিল উনার। এই খান বাড়ির সদস্যদের মাঝে শফিকুল ইসলামে ফিহা আর আয়নকে বেশ ভালো লাগল। বাকি সবাইকে রাজনীতি চালক মনে হলো। ফিহাকে নিসন্দেহে ভালো মেয়ে তাই উনার ফিহাকে নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু মায়াকে খান বাড়িতে রেখে যাওয়া নিয়ে আপত্তি আছে। আপাতত ছেলের বিয়েটা শেষ হলেও তিনি মায়াকে নিজেদের কাছে নিয়ে যাবেন চুড়ান্ত ভাবে। যথারীতি আরিফ ফিহার বিয়ের ডেট ফিক্সড হলো ছয় দিন পর সামনে শুক্রবারে। বিয়ের জন্য অল্প সময় হওয়ার মায়ার পরিবার আজ রাতেই ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলা আশুগঞ্জ ফিরবে। শফিকুল ইসলাম চলে যাওয়ার তোড়জোড় করতেই আপত্তি জানায় হেনা খান ও আরাফ খান। বিয়ে যেহেতু ঠিক হয়েছে তাই দুই পরিবার একসঙ্গে ডিনারের প্রস্তাব রাখলো তাঁরা। শফিকুল ইসলাম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ মনমালিন্যতা একপাশে রেখে নীরবে সম্মতি জানালো। যথারীতি সবাই একসঙ্গে ডিনার করে তারপর মায়ার পরিবার বাড়িতে ফিরবে রাতেই। যেহেতু আনুষ্ঠানিক ভাবে বিয়েটা হবে তাই হাতের কাজটা বেশি। তোড়জোড় করে সবাইকে বিয়ের কার্ড দিয়ে বাড়ি বাড়ি দাওয়াত দিতে হবে। শপিং করতে! সামর্থ্য অনুযায়ী গহনাপত্র করতে হবে ছেলের বউয়ের জন্য। তাছাড়া আজ বাদে দুইদিন পর আরিফকে পুনরায় ঢাকা আসতে হবে নিজের পরিবারকে নিয়ে ফিহাকে বিয়ের শপিং করানোর জন্য। হাতে কাজ থাকলো অনেক। সমাধানও হলো সবকিছু। কিন্তু মায়াকে নিয়ে মনমালিন্যতা থেকে গেলো নীরবে নিষ্প্রভতায় শফিকুল ইসলাম মনে।
~~
রাত দশটা। ড্রাইনিং টেবিলে গোল হয়ে চারপাশে খাবার আয়োজন করা হয়েছে। দুই পরিবারের ছোট বড় সবাই একত্রে বসলো ডিনারের জন্য হেনা খান বাদে। তিনি বসলেন না রিদের জন্য। রিদকে ছাড়া কখনোই তিনি একা খাবার খায় না। আজও তাই হলো। তবে আরাফ খান সৌজন্যতা বজায় রাখতে সবার সাথে বসলো। হেনা খান সারিবদ্ধভাবে সার্ভেন্ডের দিয়ে সবাইকে খাবার সার্ভ করছে। মায়া শফিকুল ইসলাম ও আরাফ খান মধ্য চেয়ারে বসলো খেতে। শফিকুল ইসলামের পাশে রেহেনা বেগম আর তার পাশে ফিহাকে বসাল তিনি। ফিহার পাশে পাত্র হিসাবে আরিফ বসলো। আরিফের পাশে শাহিন। শাহিন পাশে জুঁই বসতে গিয়েও পারলো না আয়নের জন্য। কোথা থেকে হুট করে আয়ন এসে বসে পড়লো শাহিনের পাশের চেয়ারটায়। ইতস্তত জুই আর খালি জায়গায় খুঁজে পেয়ে ভয়ে ভয়ে বসলো আয়ন আর মেহেরবানে মধ্য চেয়ারে। মেহেরবান স্বাভাবিক দৃষ্টিতে জুইকে এক দেখে নিজের খাওয়া মন দিল। মেহেরবানের পাশের চেয়ারটায় উনার স্বামী বসে আছে। তার পাশে আরাফ খান বসা। একত্রে গোল হয়ে সবাই যার যার মতো খেতে লাগলো। আরিফ কিছু বলছে না তবে টুকটাক হাতে ফিহার বাটিতে সুপ তুলে দিতে সাহায্য করছে। অসুস্থতার জন্য ফিহা সুপ ছাড়া অন্য কিছুতে হাত দিল না। মায়া খাওয়া বাদ দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে গোল গোল চোখে পরখ করছে সবটা। সে বেশ আনন্দিত ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে। তাই এই মূহুর্তে রিদকে ভুলে গেছে সে। বিগত দুইদিন ধরে এমনিতেও রিদের সাথে মায়ার কথা হয়না। যেহেতু রিদ মায়াকে মেরেছে তাই মায়া রিদের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে না। কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছে আপাতত। তবে সকাল বিকাল করে দুজনের মধ্যে দেখা হচ্ছে দূর থেকে। রিদ কপাল কুঁচকে মায়াকে দেখে চলে যায় অফিসে। কিছু বলে না। ভুলন্ত মায়া আরিফ হতে দৃষ্টি সরিয়ে নিজের খাবারের মনোযোগী হতে গিয়েও চোখ আটকালো জুই আর আয়নের দিকে। এবার পূর্ণ খাবার-দাবার বন্ধ করে দিয়ে জহির দৃষ্টিতে তাকাল সেদিকে কপাল কুঁচকে। দুজনের কেমিস্ট্রিটা আপাতত বুঝতে পারছে না মায়া। ইতস্তত জুই কাচুমাচু করছে আর আয়ন তার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে, আবার মাথা নত করে টুকটাক ধীর স্বরে জিগ্যেসা করছে জুঁইয়ের আরও কিছু লাগবে কিনা? তাও সবার সামনে। পর মূহুর্তে চোখ ঘুরিয়ে নিজের মাকেও জিগ্যেসা করছে তার কিছু লাগবে কিনা? মা-বউ দুজনেরই খাতিরযত্ন করছে সমান তালে। ভয়ার্ত ইতস্তত জুই কাচুমাচু করে খাবার নাড়াচাড়া করে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই চোখাচোখি হলো মায়ার জোহরি দৃষ্টি সাথে। জুই অসহায় বোধ করতেই মায়া ভ্রুর নাচালো ‘ কি চলে ‘ জিগ্যেসা করে। জুই মায়ার দৃষ্টি বুঝে খানিকটা হাসফাস করতেই পাশ থেকে আয়নের ধীর কন্ঠেস্বর শুনা গেল..

—” আপনি খাচ্ছেন কেন জুই??

বিভ্রান্তিতে মাথা নত করলো জুঁই। তবে আড়চোখে মেহেরবানের দিকে তাকালো। মেহেরবান গম্ভীর স্বাভাবিক ভাবে খাবার খাচ্ছেন। যেন আয়নের কথা শুনেও শুনেননি তিনি। মেহেরবানকে স্বাভাবিক দেখে জুঁই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। চোখ তুলে সামনে তাকিয়ে মায়াকে দেখলো একবার। মায়ার অবুঝ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পরিস্থিতি বুঝার তীব্র চেষ্টা।
~~
রাতের প্রহরেই মায়ার পরিবার চলে গেল নিজেদের বাড়িতে। মায়াকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল আরিফ বিয়ে উপলক্ষে কিন্তু মায়া অবশিষ্ট দুটো পরীক্ষা চলাকালীন যেতে পারলো না। আজ কাল দুই দিন দুটো পরীক্ষা দিয়ে মায়াও চলে যাবে নিজের বাড়িতে ভাইয়ের বিয়ে জন্য। পরশুদিন মায়ার পরিবার পুনরায় ঢাকায় আসবে বিয়ের শপিং করতে তখন সবার সাথে মায়াও চলে যাবে আশুগঞ্জ এমনটা ঠিক করল মায়ার পরিবার। এতে অবশ্য বিশেষ কেউ আপত্তি জানায় নি শুধু হেনা খান ছাড়া। কিন্তু শফিকুল ইসলামের ইচ্ছা উনার সকল ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে দেখতে চাই বিয়ের উপলক্ষে। এতে মায়ার ও সম্মতি ছিল বেশ উৎফুল্লতার সঙ্গে। মায়ার দিকে তাকিয়ে হেনা খানও বিষন্ন মনে মেনে নিল বিষয়টি। মায়াকে ছাড়া উনার খান বাড়িতে ভালো লাগে না কোনো কিছুতে। কিন্তু মায়ার খুশিতে তিনিও আর নাহুচ করলেন না। যথাযথ ভাবে ঠিকঠাক হলো মায়া নিজের ভাইয়ের বরযাত্রী হয়ে আসবে আয়নদের বাড়িতে। ফিহা বিয়েটা তাদের চৌধুরী বাড়ি থেকেই হবে। হেনা খান আরাফ খান আসা যাওয়া করবে খান বাড়ির থেকে চৌধুরী বাড়িতে বিগত কয়েকদিন। সবকিছুই ঠিকঠাক। কারও কোনো অসম্মতির অবশিষ্ট রইলো না। রাতে বারোটা দিকে রিদ বাসায় আসলে তাকেও হেনা খান জানালো আরিফ ফিহার বিয়ের বিষয়টি। তবে মায়ার চলে যাওয়া বিষয়টি তখনো রিদকে জানানো হল না। রিদ নীরবে শুনে গেল সবটা। উত্তরে হুম, হা কিছুই বলল না। এখন সকাল ৮ঃ৩৫। নয়টার দিকে মায়ার পরীক্ষা। বোরকা পড়ে হাতে ফাইল পত্র নিয়ে এক প্রকার দৌড়ে নামল সিঁড়ি বেয়ে। রিদ অর্ধ খাওয়া নাস্তা রেখে ডাইনিং টেবিলের থেকে কপাল কুঁচকে তাকালো দৌড়ান্ত মায়ার দিকে। মায়া ফাইল হাতে দৌড়ে সোজা ড্রয়িংরুমে দিয়ে বের হতে লাগল কোনো দিক না তাকিয়ে। উত্তেজনায় রিদকেও দেখল না। তবে তৎক্ষণাৎ পিছন ডাকলো হেনা খান মায়াকে…
—” সোনামা কই যাচ্ছিস তুই? এই ভাবে দৌড়াচ্ছিস কেন? এদিকে আয়! খেয়ে যা!

মায়া পিছনে ঘুরলো না। সামনে দৌড়ে চেঁচিয়ে বলে..
—” খাব না আমি দাদী। তোমার নাতির অসভ্য কুত্তাটা আমার পাখি খেয়ে ফেলতেছে।

মায়া কথা বুঝলো না কেউ। রিদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মায়ার যাওয়া দিকে তাকিয়ে নীরবে নিজের খাবারটা শেষ করলো। টিস্যু দিয়ে নিজের মুখ মুছে সেও চলে গেল বাহিরে উদ্দেশ্য। আপাতত তার বউটাকে দরকার। বিগত দুইটা দিন ধরে বউ তার সাথে কথা বলে না। অভিমান করেছে। গাল ফুলিয়ে বেড়ায় তাঁকে দেখে। ব্যস্ততায় সেও দুইটা দিন ঠিকঠাক সময় দিতে পারেনি বউকে। আজ যেহেতু সামনেই আছে একটু কথা না বললেই নয়। রিদ গায়ের কোটটা হাতে উপর ভাজ করে বাহিরে আসল। দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা বজায় রেখে চারপাশে মায়াকে খুঁজল। মায়াকে দেখতে পেল বাগানের একপাশে ভয়ার্ত মুখে একটা পাখির খাঁচা দু’হাতে বুকে ঝাপটে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার ঠিক সামনে কিছুটা দূরে রিদের ব্যাম্বু কুকুরটার দিকে বেরোখ মুখ করে তাকিয়ে আছে। রিদ সামনে এগোল। মায়ার পিছনে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ বিষয়টি সূক্ষ্ম চোখে বুঝে নিল। মায়ার খাঁচা বন্দী পাখিটিকে রিদের কুকুরটি তাড়া করেছিল খাওয়ার জন্য। যেটা মায়া নিজের রুমের বারান্দা থেকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে নিচে আসলো বাঁচানোর জন্য। রিদ নিজের কুকুরটি দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেই কুকুরটি লেজ গুটিয়ে সুন্দর করে বসে পড়লো জায়গায়। আর ঘেউ ঘেউ করলো না মায়ার উপর। রিদ নিজের কুকুরটি শিকল ধরে আটকে রাখা বডিগার্ডকে চোখের ইশারায় বুঝাল এখান থেকে চলে যেতে। রিদের ইশারা অনুযায়ী বডিগার্ডটি কুকুরটি নিয়ে চলে গেল অন্যর্থে। রিদ এগোল। মায়ার বাহু টেনে নিজের দিকে ফেরাল। মায়া রিদকে দেখেও কিছু বলল না। বরং গাল ফুলিয়ে পুনরায় বামে মুড়ে গেল গাঢ় অভিমানে খাঁচা নিয়ে। রিদ হালকা স্বরে ডাকল একজন বডিগার্ডকে। যথারীতি বডিগার্ডটি রিদের সামনে আসতেই নিজের হাতে কোটটি দিল তার হাতে। মায়ার ঝাপটে ধরা পাখির খাঁচাটিও টেনে নিয়ে বডিগার্ডের হাতে তুলে দিতেই মায়া বিদ্রুপ করে উঠে তৎক্ষনাৎ…

—” দিন আমার পাখি দিন। আপনার অসভ্য কুকুর আমার পাখি খেয়ে ফেলব। দিন!

কথাটা বলতে বলতে মায়া পুনরায় দু’হাতে পাখি খাঁচাটিকে ধরতে চাইল ঝাপটে। কিন্তু বাঁধ সাধলো রিদ। মায়ার দুহাত নিজের দু’হাতে আটকে ধরে মাথা নাড়িয়ে ইশারা করল বডিগার্ডকে চলে যেতে। ইশারা অনুযায়ী বডিগার্ড চলে যেতে পাখির জন্য ছটফট করলো মায়া। রিদ মায়ার ছটফট বুঝে চারপাশে তাকাল। সে আপাতত বউকে একটু আদুর করতে চাই। কিন্তু চারপাশের ভরপুর বডিগার্ডের সামনে নয়। বউ মানেই রিদের খুব পারসোনাল ও সেনসিটিভ বিষয়। তাই মায়ার সাথে নরমাল কথা বলার সময়ও রিদ কাউকে নিজের আশেপাশে রাখতে চাই না। চলে যেতে বলে সবাইকে। যেখানে তার কথা গুলো কাউকে শুনাতে ইচ্ছুক না। সেখানে অবশ্যই রিদ সবার সামনে বউকে আদুর করবে না। মায়া দীর্ঘ ছটফটের মধ্যে রিদ হুট করেই মায়াকে কোলে তুলে নিল। আকস্মিক ঘটনায় মায়া খেই হারিয়ে রিদের গলা জড়িয়ে ধরল ভয়ে। নিজেকে রিদের কোলে আবিষ্কার করতেই তেতে উঠলো মায়া। দ্বিগুণ থেকে দ্বিগুণ ছটফট করলো রিদের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য। রিদ ছাড়লো না। বরং শক্ত হাতে মায়াকে কোলে নিয়ে এগিয়ে গেল পাকিং এরিয়ার দিকে। মায়াকে নিজের গাড়ির সামনে দাঁড় করাতেই পালাতে চাইল মায়া। রিদ মায়া পেট চেপে ধরে নিজের গাড়ির সাথে আটকাল। দু-হাত দুই দিকে দিয়ে মায়াকে নিজের মধ্যস্থতায় আটকে রেখে ঝুকে পড়লো মায়ার মুখের উপর। ভ্রুর নাচিয়ে মায়াকে প্রশ্ন করে রিদ…

—” কি ম্যাডাম? কি চলে? আজকাল পালানোর ধান্দায় থাকেন মনে হচ্ছে? দেখা সাক্ষাৎ পাওয়া যাচ্ছে না আপনার। পায়ে শিকল পড়াতে হবে ধরে রাখার জন্য হুমম?

রিদের কথা গুলো কানে তুলল না মায়া। বরং গাঢ় অভিমানে অনল রয়ে মায়া গাল ফুলিয়ে শরীর বেঁকে মুড়ে গেল ডানে রিদের হাতের ভিতর। কিছু না বলে নিঃশব্দে নিজের অভিমান প্রকাশ করলো রিদের কাছে। রিদ বুঝল! হাসতে গিয়েও হাসল না। গম্ভীর থাকল। দেখা যাবে রিদ এই মূহুর্তে হাসতে তার বউ আরও বেঁকে বসবে। ভাববে তাকে নিয়ে রিদ মজা করছে। তাই রিদ হাসল না। তবে একহাতে মায়ার বাহু টেনে সোজা করলো। পুনরায় নিজের মুখমুখি দাঁড়া করালো রিদ। মায়াকে কথা বলতে না দেখে রিদ কপালের একপাশ চুলকে বললো…
—” কি ম্যাডাম কথা বলবেন না?
মায়া গাল ফুলিয়ে উত্তর করলো…
—” নাহ!
—” সিওর?
–” হুম!
মায়ার গাঢ় অভিমানটা বুঝে রিদ কুটনৈতিক বুদ্ধি খাটালো। যেহেতু দুজনের হাতেই সময় কম যার যার কাজে যেতে হবে। রিদের অসিফ! মায়ার পরীক্ষা নয়টায় তাই রিদ দ্রুত মায়ার রাগ ভাঙ্গাতে চাইল। রিদ জোরপূর্বক মায়াকে আদুর করে গেলে দেখা যাবে মায়ার অভিমান কমবে না উল্টো আরও বাড়বে। ভুল বুঝতেও পারে। তাই রিদ সরাসরি কিছু বলে মায়ার রাগ ভাঙ্গাল না। বোকাসোকা অল্প বয়সী কিশোরীরা খুবই অভিমানী হয়। তাছাড়া রিদ যেহেতু শক্তহাতে বউকে মেরেছে তাহলে নরম হাতে বউয়ের অভিমানটা তো ভাঙ্গানোর দরকার তাই না। রিদ কুটনীতি বুদ্ধি খাটিয়ে অন্তত গম্ভীর ভারি মুখে বলল..

—” আজকাল আপনি আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিছেন। আমার খবর-টবর নেওয়াও ছেড়ে দিছেন। স্বামীর দরকার নাই তাই নেন না। ভালো কথা! আপনি তো আর জানেন না আমার সাথে কি হচ্ছে আজকাল! একা ঘুমাতেও ভয় লাগে। উফ! কিযে অসহায় হয়ে পড়ি তখন আমি। কাকে যে বুঝাই!

রিদের অসহায় চেহারায় টনক নড়লো মায়ার। তার স্বামীও আজকাল অসহায় হয়ে পড়ছে সেটা কি মায়ার জন্য কম বড় চমক নাকি। মায়ার নিজের রাগ অভিমান সব ভুলে গেল এক মূহুর্তেই। শুধু মাথায় থাকলো রিদ ও রিদের অসহায়ত্বে কারণ জানাটা। মায়ার মিস্টার ভিলেনও বুঝি কখনো অসহায় হয়? একা ঘুমাতে ভয় পায়? সাংঘাতিক বিষয় না এটি? মায়ার জানা দরকার না! মায়ার চমকে উঠে তৎক্ষনাৎ উত্তেজিত কন্ঠে বললো রিদকে…

—” আমাকে বুঝান! আমাকে বুঝান! আমি বুঝব! আমাকে বলুন কি হচ্ছে আপনার সাথে।
রিদের ফেসে ভিষণ কষ্টভার দেখা গেল মায়ার চোখে। রিদ নিজের কুটনৈতিক বুদ্ধি জোরালো ভাবে প্রখর করে বললো…

—” তুমিই তো বুঝবে বউ! তুমি ছাড়া তো আর কেউ বুঝবে না আমার এই গুরুতর সমস্যাটা? তুমি আমার আপন বউ না?
বুঝে না বুঝে মায়া তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়ালো। রিদ এবার সোজা হয়ে দাড়িয়ে ভারি কন্ঠে বললো…

—” বুঝলে বউ আজকাল রাতে স্বপ্নে দেখি। একটা অপরিচিত মেয়ে আমাকে জোরপূর্বক চুমু খায়।
রিদের কথা শেষ করার আগেই মায়া চোখ বড় বড় করে আশ্চর্য হয়ে বলে…
—” কিহহ?
—” হুমমম।
—” আপনি কি করছিলেন? থামান নি কেন মেয়েটিকে।

—” সুযোগ পায়নি থামানোর। খুবই নিরুপায় ছিলাম স্বপ্নে আমি। সাথে লজ্জাও পাচ্ছিলাম একটু আকটু। মেয়েটি খুবই নির্লজ্জ ছিল বউ বলতে হবে। তোমাকে বলে বুঝানো যাবে না কতটা নির্লজ্জ ছিল মেয়েটি। তবে তুমি চাইলে আমি তোমাকে প্র্যাকটিক্যাল করে বুঝাতে পারি। তোমাকে করে দেখায় বউ! আমি কতটা লজ্জা পেয়েছিলাম স্বপ্নে?

রিদের মুখ ভার করা কথায় ও কষ্টে, মায়াও কষ্টে জর্জরিত হলো সমান ভাবে। তার মিস্টার ভিলেন বলছে মায়া সব সত্য! মিথ্যা কোনো কিছু হতেই পারে না। চোখ বন্ধ করে বিশ্বাসী মায়া তার মিস্টার ভিলেনের সব কথায়। রিদ যেহেতু বলছে সে স্বপ্নে অসহায় ছিল মানে সত্যি ছিল। মায়া বিশ্বাস! মায়া রিদের কথার অর্থ না বুঝেই পুনরায় সম্মতি জানায় করে দেখানোর। রিদ বাঁকা হাসে। উপর উপর দিয়ে রিদ কষ্টভরা চেহারা টানলো মুখে। আরও এগিয়ে আসলো মায়ার সামনে। মায়ার দুগাল আঁকড়ে ধরে নিজের সাথে মেশাল। মায়ার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে শব্দ করে অধরের পরশ বুলাল ছোট ছোট চুমুতে সারা মুখে। মায়া কেঁপে কেঁপে উঠে তৎক্ষনাৎ নিজের দু-হাতে খামচে দিয়ে ধরলো রিদের কমড়ের দুপাশের শার্টের অংশটুকু। রিদ নির্ভীক। নিজের কাজে অনড়। নিজের মন মতো বউকে আদুর করে চোখ তুলে তাকায় মায়ার বন্ধ চোখে পাতার দিকে। রিদ পিছিয়ে গেল না। ঠায় জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল মায়ার সাথে মিশে। মায়া কম্পিত শরীর নিয়ে ধীরে চোখ খোলে তাকায় রিদের মুখশ্রীতে দিকে। চোখাচোখি হলো দুজনের। রিদ মায়াকে তাকাতে দেখে পুনরায় মুখ ভার করে সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো…
—” দেখলে তো বউ আমি কতটা লজ্জা পেয়েছিলাম স্বপ্নে। আমাকে বাঁচানোর মতো কেউ ছিল না স্বপ্নে।

রিদের মন খারাপের কথায় তলে মূহুর্তে মায়া ভুলে গেল রিদের করা কান্ড গুলো তার সাথে। রিদের অসহায়ত্বের সাথে সমান ভাবে অসহায় হয়ে বলে উঠলো মায়া…
—” তাহলে আমাকে ডাকলেন না কেন স্বপ্নে?
—” আমি ডেকেছিলাম তুমি আসুনি।
মায়া ঠোঁট উল্টো বলে…

—” রাতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বেশি। এইজন্যে আপনার ডাক শুনতে পারিনি। কিন্তু এবার সতর্ক থাকব। মেয়েটি আবার আপনার স্বপ্নে আসলে আমাকে ডাকবেন । আমি জাগে থাকব! ঘুমাব না। আপনাকে চুমু খাওয়ার দায়ে ঠাস করে মাথা ফাটিয়ে দিব মেয়েটির। শুধু একবার আমাকে ডাকবেন কেমন।

—” আচ্ছা।
মায়া রাগ অভিমান ভুলে রিদের টেনশনে রইলো। রিদ মায়াকে সাথে করে নিয়ে কলেজে ড্রপ করে দিল। ফাঁকে গাড়ির মধ্যে খাবারও খাওয়াল মায়াকে। মায়া নিজের পরীক্ষা ফাইল পত্র নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যাওয়া পূবে, রিদ পুনরায় মায়ার বাহু টেনে নিজের কাছে টানল। যত্ন সহকারে মায়ার কপালে ভালোবাসা অধর ছুয়ে ছেড়ে দিল। রিদ ফুরফুরে মেজাজে অফিসে গেলও মায়া ভিষণ টেনশনে রইলো রিদকে নিয়ে। তার স্বামীকে কেউ এইভাবে চুমু খেয়ে চলে যাচ্ছে! তাতে মায়ার টেনশন হওয়ার কথা নয়? মায়াকে ভিষণ টেনশনে দেখাল। টেনশনে টেনশনে নিজের পরীক্ষা শেষ করে বাসায় ফিরল। রাতে দীর্ঘ সময় বসে রইল রিদের আশায় নিজের রুমে ঘাপটি মেরে। কিন্তু রিদ বাসায় আসতে আসতে রাত একটা বেজে গেল। ততক্ষণে মায়াও ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে ঘুম ভাঙ্গতে উত্তেজনায় দৌড়ে গেল রিদের রুমে! রিদ তখন আসিফের জন্য রেডি হয়ে কফি হাতে দাঁড়িয়ে ফাইল চেক করছিল। রিদ মায়াকে হতভম্ব হয়ে নিজের রুমে ঢুকতে দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সেদিকে। রিদের গম্ভীর চোখে ভাসলো মায়ার ঘুমন্ত চেহারা স্নিগ্ধতা। রিদ শান্ত চোখে মায়াকে পরখ করে খানিকটা কপাল কুঁচকে প্রশ্নত্তোর দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকায়। মায়া সময় নষ্ট না করে উত্তেজিত হয়ে জানতে চাইল! রিদের স্বপ্নে মেয়েটি আজেও এসেছিল কিনা? চুমু খেয়েছে কি?
রিদ নিজের কাজের ব্যস্ততা ভুলে গিয়েছিল কাল মায়াকে বলা মিথ্যা কথা গুলো। মায়ার উত্তেজিতর পরপর প্রশ্নে ঠোঁট কামড়িয়ে হাসলো রিদ। ধীরকন্ঠে অস্থির মায়াকে ডাকল নিজের কাছে। মায়া কাছে আসতেই রিদ নিজের হাতে ফাইল পত্র, কফি টেবিলের উপর রেখে দিয়ে মায়ার হাত টেনে নিজের কাছে আনল। আঁজলে মায়া গাল দু’হাতে আঁকড়ে ধরে ভালোবাসা অধর ছুয়াল মায়ার কপালে। মায়াকে দুহাতে বুকের জড়িয়ে নিতে নিতে আগের ন্যায় জানালো, আজকে নাকি মেয়েটি রিদের স্বপ্নে এসেছিল! রিদও মায়াকে ডেকেছিল! কিন্তু মায়া রিদের ডাকে আসেনি তার কাছে। রিদের ভারি অসহায়ত্বটাও দেখেনি।

রিদের কূটনীতিক বুদ্ধি তলে মায়া এবার ঠোঁট উল্টে কেঁদে বসল রিদের বক্ষতলে। মায়ার স্বামীকে কেন কোনো মেয়ে এইভাবে চুমু খেয়ে চলে যাবে। আর সে পড়ে পড়ে ঘুমাবে। মায়ার এতো ঘুম কিসের যে স্বামীর খবর নিতে পারে না। মায়া বেশ করে কাঁদল রিদের বুকে পড়ে পড়ে। রিদও থামালো না। বরং জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো কিছুটা সময়। রিদ কুটনৈতিক বুদ্ধি না খাটিয়ে যদি ভালো করে মায়াকে কাছে টানতে চাইতো, তাহলে হয়তো মায়া লজ্জায় রিদের কাছে আসতো চাইতো না। রিদ থেকে দূরে দূরে পালিয়ে বেড়াত। রিদ চাইলেও অফিস টাইম করে বউয়ের রিদ হালকা স্বরে ডাকল একজন বডিগার্ডকে। যথারীতি বডিগার্ডটি সামনে আসতেই নিজের হাতে কোটটি দিল তার হাতে। মায়ার ঝাপটে ধরা পাখির খাঁচাটিও টেনে নিয়ে বডিগার্ডের হাতে তুলে দিতেই মায়া বিদ্রুপ করে উঠে তৎক্ষনাৎ…

—” দিন আমার পাখি দিন। আপনার অসভ্য কুকুর আমার পাখি খেয়ে ফেলব।

কথাটা বলতে বলতে মায়া পুনরায় দু’হাতে পাখি খাঁচাটিকে ধরতে চাইল ঝাপটে। কিন্তু বাঁধ সাধলো রিদ। মায়ার দুহাত নিজের দু’হাতে আটকে ধরে মাথা নাড়িয়ে ইশারা করল বডিগার্ডকে চলে যেতে। ইশারা অনুযায়ী বডিগার্ড চলে যেতে পাখির জন্য ছটফট করলো মায়া। রিদ মায়ার ছটফট বুঝে চারপাশে তাকাল। সে আপাতত বউকে আদুর করতে চাই। কিন্তু চারপাশের ভরপুর বডিগার্ডের সামনে নয়। বউ মানেই রিদের খুব পারসোনাল ও সেনসিটিভ। তাই মায়ার সাথে নরমাল কথা বলার সময়ও রিদ কাউকে নিজের আশেপাশে রাখে না। চলে যেতে বলে সবাই। সেখানে অবশ্যই রিদ সবার সামনে বাচ্চা বউকে আদুর করবে না। মায়া দীর্ঘ ছটফটের মধ্যে রিদ হুট করেই মায়াকে কোলে তুলে নিল। আকস্মিক ঘটনায় খেই হারিয়ে রিদের গলা জড়িয়ে ধরল ভয়ে। নিজেকে রিদের কোলে আবিষ্কার করতেই তেতে উঠলো মায়া। দ্বিগুণ থেকে দ্বিগুণ ছটফট করলো মায়া রিদ থেকে ছাড়ানোর জন্য। রিদ ছাড়লো না। বরং শক্ত হাতে মায়াকে কোলে নিয়ে এগিয়ে গেল পাকিং এরিয়ার দিকে। মায়াকে নিজের গাড়ির সামনে দাঁড় করাতেই পালাতে চাইল মায়া। রিদ মায়া পেট চেপে ধরে নিজের গাড়ির সাথে আটকাল। দুহাত দুই দিকে দিয়ে মধ্যস্থতায় মায়াকে আটকে রেখে ঝুকে পড়লো রিদ মায়ার মুখের উপর। নিজের ভ্রুর নাচিয়ে মায়াকে বলে উঠে রিদ…

—” কি ম্যাডাম? কি চলে? আজকাল আপনার দেখা সাক্ষাৎ পাওয়া যায়না কেন? কি ব্যাপার বলুনত?

রিদের কথায় মায়া গাল ফুলিয়ে শরীর বেঁকে মুড়ে ডানে ঘুরল রিদের হাতের ভিতর। কিছু না বলে নিজের অভিমান প্রকাশ করলো রিদের সাথে। রিদ হাসতে চাইল কিন্তু হাসল না। হাসতে তার বউ আরও বেঁকে বসবে। ভাববে তাকে নিয়ে রিদ মজা করছে। তাই রিদ হাসল না। তবে একহাতে মায়ার টেনে সোজা করে পুনরায় নিজের মুখমুখি করলো রিদ। কপালের একপাশ চুলকে বলে…
—” কি ম্যাডাম কথা বলবেন না?
মায়া গাল ফুলিয়ে উত্তর করলো…
—” নাহ!

মায়ার গাঢ় অভিমান বুঝে রিদ কুটনৈতিক বুদ্ধি খাটালো। যেহেতু দুজনের হাতেই সময় কম যার যার কাজে যেতে হবে। রিদের অসিফ! মায়ার পরীক্ষা নয়টায় তাই রিদ দ্রুত মায়ার রাগ ভাঙ্গাতে চাইল। রিদ জোরপূর্বক মায়াকে আদুর করে গেলেও মায়ার অভিমান কমবে না উল্টো আরও চেপে ধরে বসবে কেন রিদ মায়ার রাগ ভাঙ্গাল না। বোকাসোকা অল্প বয়সী কিশোরীরা খুবই অভিমানী হয়। তাছাড়া রিদ যেহেতু শক্তহাতে বউকে মেরেছে তাহলে নরম হাতে বউয়ের অভিমানটা তো ভাঙ্গানোর দরকার তাই না। রিদ কুটনীতি বুদ্ধি খাটিয়ে অন্তত গম্ভীর ভারি মুখে বলল..

—” আজকাল তো আপনি আমার খবর-টবর নেওয়া ছেড়ে দিছেন। স্বামীর দরকার নাই তাই নেন না। ভালো কথা! আপনি তো আর জানেন না আমার সাথে কি হচ্ছে আজকাল! একা ঘুমাতেই ভয় লাগে। উফ! কিযে অসহায় হয়ে পড়ি আমি। কাকে যে বুঝাই!

রিদের অসহায়ত্ব চেহারায় টনক নড়লো মায়ার। তার স্বামী আজকাল অসহায় হয়ে পড়ছে সেটা কি মায়ার জন্য কম চমক নাকি। মায়ার নিজের রাগ অভিমান ভুলে গেল মূহুর্তে। শুধু মাথায় থাকলো রিদ ও রিদের অসহায়ত্বে কারণ জানা। তার মিস্টার ভিলেনও বুঝি কখনো অসহায় হয়? সাংঘাতিক বিষয় না? মায়ার জানা দরকার না! মায়ার চমকে উঠে তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন করলো রিদকে…

—” আমাকে বুঝান! আমাকে বলুন না কি হচ্ছে আপনার সাথে?
রিদের ফেসে ভিষণ কষ্টভার দেখা গেল মায়ার চোখে। রিদ নিজের কুটনৈতিক বুদ্ধি জোরালো ভাবে প্রখর করে বলে…
—” তুমিই তো বুঝবে বউ! তুমি ছাড়া তো আর কেউ বুঝবে না আমার এই গুরুতর সমস্যাটা? তুমি আমার আপন বউ না?
বুঝে না বুঝে মায়া তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়ালো। রিদ এবার সোজা হয়ে দাড়িয়ে ভারি কন্ঠে বলে…

—” বুঝলে বউ আজকাল দু-রাতে স্বপ্নে দেখলাম। একটা অপরিচিত মেয়ে আমাকে চুমু খাচ্ছে।
রিদের কথা শেষ করার আগেই মায়া চোখ বড় বড় করে আশ্চর্য হয়ে বলে…
—” কিহহ?
—” হুমমম।
—” আপনি কি করছিলেন? থামান নি মেয়েটিকে।

—” সুযোগ পায়নি থামানোর। খুবই নিরুপায় ছিলাম স্বপ্নে আমি। সাথে লজ্জাও পাচ্ছিলাম। মেয়েটি খুবই নির্লজ্জ ছিল বলতে হবে বউ। তোমাকে বলে বুঝানো যাবে না কতটা নির্লজ্জ ছিল মেয়েটি। তুমি চাইলে আমি তোমাকে প্র্যাকটিক্যাল করে বুঝাতে পারি। তোমাকে করে দেখায় বউ! আমি কতটা লজ্জা পেয়েছিলাম স্বপ্নে?

রিদের মুখ ভার করা কষ্টে মায়াও কষ্টে জর্জরিত হলো। রিদের কথার অর্থ না বুঝেই সম্মতি জানায় করে দেখানোর। রিদ বাঁকা হাসে। উপর উপর দিয়ে রিদ কষ্টভরা চেহারা টানলো মুখে। আরও এগিয়ে যায় মায়ার সামনে। মায়ার দুগাল আঁকড়ে ধরে নিজের সাথে মেশাল। মায়ার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে শব্দ করে ছোট ছোট চুমু খেল সারা মুখে। মায়া কেঁপে কেঁপে উঠে। তৎক্ষনাৎ নিজের দু-হাতে খামচে দিয়ে ধরলো রিদের কমড়ের দুপাশের শার্টের অংশটুকু। রিদ নির্ভীক। নিজের কাজে অনড়। নিজের মন মতো বউকে আদুর করে চোখ তুলে তাকায় মায়ার বন্ধ চোখে পাতার দিকে। রিদ পিছিয়ে গেল না। ঠায় জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল মায়ার সাথে মিশে। মায়া কম্পিত শরীর নিয়ে ধীরে চোখ খোলে তাকায় রিদের মুখশ্রীতে দিকে। চোখাচোখি হয় দুজনের। রিদ মায়াকে তাকাতে দেখে পুনরায় মুখ ভার করে সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো…
—” দেখলে তো বউ আমি কতটা লজ্জা পেয়েছিলাম স্বপ্নে। আমাকে বাঁচানোর মতো কেউ ছিল না স্বপ্নে।
রিদের মন খারাপের কথায় তলে মূহুর্তে মায়া ভুলে গেল রিদের করা কান্ড গুলো তার সাথে। রিদের অসহায়ত্বের সাথে সমান ভাবে অসহায় হয়ে বলে উঠলো মায়া…

—” তাহলে আমাকে ডাকলেন না কেন স্বপ্নে?
—” আমি ডেকেছিলাম তুমি আসোনি।
মায়া ঠোঁট উল্টো বলে…

—” রাতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বেশি। এইজন্যে আপনার ডাক শুনতে পারিনি। কিন্তু এবার সতর্ক থাকব। মেয়েটি আবার আপনার স্বপ্নে আসলে আমাকে ডাকবেন। আমি জাগে থাকব! ঘুমাব না। আপনাকে চুমু খাওয়ার দায়ে ঠাস করে মাথা ফাটিয়ে দিব মেয়েটির। শুধু একবার আমাকে ডাকবেন কেমন।
—” আচ্ছা।

মায়া রাগ অভিমান ভুলে রিদের টেনশনে রইলো। রিদ মায়াকে সাথে করে নিয়ে কলেজে ড্রপ করে দিল। ফাঁকে গাড়ির মধ্যে খাবারও খাওয়াল মায়াকে। মায়া নিজের পরীক্ষা ফাইল পত্র নিয়ে রিদের গাড়ি থেকে নেমে যাওয়া পূবে রিদ পুনরায় মায়ার বাহু টেনে নিজের কাছে টানল। যত্ন সহকারে মায়ার কপালে ভালোবাসা অধর ছুয়ে ছেড়ে দিল। রিদ ফুরফুরে মেজাজে অফিসে গেলও মায়া ভিষণ টেনশনে রইলো রিদকে নিয়ে। তার স্বামীকে কেউ এইভাবে চুমু খেয়ে চলে যাচ্ছে! তাতে মায়ার টেনশন হওয়ার কথা নয়? মায়াকে ভিষণ টেনশনে দেখাল। টেনশনে টেনশনে নিজের পরীক্ষা শেষ করে বাসায় ফিরল। রাতে দীর্ঘ সময় বসে রইল রিদের আশায় নিজের রুমে। কিন্তু রিদ বাসায় আসতে আসতে রাত একটা বেজে গেল। ততক্ষণে মায়াও ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে ঘুম ভাঙ্গতে উত্তেজনায় দৌড়ে গেল রিদের রুমে! রিদ তখন আসিফের জন্য রেডি হয়ে কফি হাতে দাঁড়িয়ে ফাইল চেক করছে। মায়াকে হতভম্ব হয়ে নিজের রুমে ঢুকতে দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সেই দিকে। রিদ মায়ার ঘুমন্ত চেহারা দেখে কপাল কুঁচকাতেই মায়া জানতে চাইল! রিদের স্বপ্ন মেয়েটি আজেও এসেছিল কিনা? রিদ নিজের কাজের ব্যস্ততা ভুলে গিয়েছিল নিজের বলা মিথ্যা কথা গুলো। কিন্তু মায়াকে উত্তেজিত হতে দেখে ঠোঁট কামিয়ে হেঁসে পুনরায় ডাকল মায়াকে নিজের কাছে। নিজের হাতে ফাইল, কফিটা টেবিলের উপর রেখে মায়ার হাত টেনে নিজের কাছে আনল। আঁজলে মায়া গাল দু’হাতে আঁকড়ে ধরে ভালোবাসা অধর ছুয়াল মায়ার কপালে। মায়াকে দুহাতে বুকের জড়িয়ে নিতে নিতে আগের ন্যায় জানালো আজকে মেয়ে রিদের স্বপ্নে এসেছিল! এবং মায়াকে ডেকেছিল রিদ! মায়া আসেনি তাই রিদ ভারি অসহায় হয়ে পড়েছিল। রিদের কূটনীতিক বুদ্ধি তলে মায়া ঠোঁট উল্টে কেঁদে বসল রিদের বক্ষতলে। মায়া স্বামীকে কেন কোনো মেয়ে এইভাবে চুমু খেয়ে চলে যাবে। আর সে পড়ে পড়ে ঘুমাবে। মায়ার এতো ঘুম কিসের যে স্বামীর খবর নিতে পারে না। রিদ মায়াকে থামাল না। বরং শক্ত করে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকল বেশ কিছুক্ষণ। বউকে সে ইচ্ছা করেই মিথ্যা বলেছে। কারণ সকাল ছাড়া বউয়ের সাথে দেখা হয়না তার। অফিসে যাওয়ার আগে যদি বউয়ের সানিধ্য একটু করে পাওয়া না যায় তাহলে সারাদিনই অস্থিরতায় কাটে তাঁর। বউকে মিথ্যা না বলে সুন্দর করে বললে হয়তো রিদের কাছে আসতো না লজ্জায় দূরে দূরে থাকতো। রিদ একটু আদুর করতে চাইলে দেখা যেত লজ্জায় বউ তার এক সাপ্তাহ তার চোখের সামনেই আসবে না। রিদ নিজের কুটনৈতিক বুদ্ধিতে অটল থাকল। মিথ্যা বলে বলে ঠিক একই ভাবে রিদ মায়া থেকে গত দুইদিন নিজের ভালোবাসা আদায় করলো। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো তৃতীয় রাত নিয়ে। মায়া সারাদিন এই চিন্তায় চিন্তায় পার করলো যে রিদকে অন্য মেয়ে চুমু খাচ্ছে স্বপ্নে। এবার আমরা যেটা সারাদিন চিন্তা করে করে পার করি ফল স্বরুপ আমরা প্রায়ই সেটা নিয়ে স্বপ্নে দেখে থাকি। মায়ার ক্ষেত্রেও হলো ঠিক তাই। রিদের চিন্তা চিন্তা মায়া রাতে রিদকে নিয়েই স্বপ্ন দেখল, যে রিদ অন্য মেয়েকে চুমু খাচ্ছে সেচ্ছায়। স্বপ্নের ভয়াবহতায় মায়া গভীর ঘুম থেকে ধর-ফরিয়ে উঠে বসে বিছানায়। তখন রাত একটা কি দুইটা বাজে। রিদ নিজের রুমে গভীর ঘুমে আছন্ন। মায়াও গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিল এতক্ষণ। কিন্তু হঠাৎ দুঃস্বপ্নের ঘুম ছুটে গেল। এসির মধ্যেও গা ভিজে উঠলো তরতর ঘামে। চোখে মুখে ভিষণ রাগের আভাস ফুটে উঠলো তৎক্ষনাৎ। বিছানার পাশ থেকে দুম করে নিজের ওড়নাটি বুকে জড়াতে জড়াতে দরজা খুলে দৌড় দিল রিদের রুমের উদ্দেশ্য।
~~~
তীব্র বুকের ব্যথায় ছটফট করে ক্রমশয় ঘুমটা ভেঙে যায় রিদের। হঠাৎ বুকের অসহনীয় ব্যথায় গভীর ঘুমে আছন্ন রিদ ধুর ফুরিয়ে উঠে বসতে চাইল বিছানায়। কিন্তু বসতে পারলো না পেট বরাবর শক্ত ভারি কিছু বসে থাকায়। রিদ বসতে গিয়েও পুনরায় ধপাস করে বিছানায় পড়ে যায় বুকের তীব্র আঘাতে। রিদ ঘুমে লেগে থাকা চোখে অনুভব করলো পেট বরাবর কেউ বসে আছে এবং তার বুক থেকে পেট অবধি নখ দাবিয়ে বড় বড় আঁচড় কাটছে প্রতিনিয়ত রাগে। রিদ নিজের ঘুমের রেশ কাটিয়ে বুকের তীব্র ব্যথাটা পরখ করতেই চোখে পড়ল মায়াকে। তাঁর পেট বরাবর উঠে বসে আছে দু-পা দু-পাশে দিয়ে। সাথে অতিরিক্ত রাগে রিদের শার্ট টেনে ছিঁড়ে তাঁর উম্মুক্ত গলা থেকে বুক, বুক থেকে পেট অবধি, নখ দাবিয়ে ধরে আড়াআড়ি ভাবে লম্বা লম্বা আঁচড় কাটছে। সেই সাথে মুখে আওড়াচ্ছে অস্পষ্ট স্বরে বুলি। আবছা আলোয় রিদের চোখে মায়ার চেহারাটা স্পষ্ট হলো। তীব্র বুক ব্যথায় সয্য করতে না পেরে রিদ শুইয়ে থাকা অবস্থায় নিজের দু’হাতে মায়ার দুহাত চেপে ধরে আটকিয়ে তৎক্ষনাৎ উঠে বসল বিছানায়, মায়াকে কোলে নিয়ে। অশান্ত মায়া শান্ত হলো না। বরং দ্বিগুণ বাড়লো পাগলামি। রিদের সাথে জোড়াজুড়ি করল ছাড়া পাওয়ার জন্য। ছটফট করলো রিদকে পুনরায় আঘাত করার জন্য। রিদ বুঝলো না মায়া হঠাৎ রাগের কারণটা। কিন্তু আপাতত মায়াকে শান্ত করতে চাইল রিদ। আর এতেই যেন বিপত্তি ঘটে। রিদের হালকা নরম হয়ে আসার কারণে মায়া তৎক্ষনাৎ নিজের একটা হাত ছুটিয়ে নিল রিদের বন্ধন থেকে। এবং নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পুনরায় রিদকে বিছানায় চেপে ধরে রাগে তৎক্ষনাৎ রিদের গলায় কামড়ে ধরলো শক্ত করে। মায়ার কামড়ের প্রখরটা ছিল তীব্র থেকে তীব্র। রিদের সয্যের বাঁধ ভাঙ্গল। রাগে তেতে উঠে শক্ত করে মায়াকে নিয়ে পুনরায় উঠে বসল বিছানায়। মায়ার মুখ নিজের গলা থেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে রাগী স্বরে বলে উঠলো রি….

–” কিরে বাবা! কি সমস্যা? কামড়াচ্ছো কেন বলবে তো নাকি?

মায়া রিদের কোলেই থাকল। তবে রিদ শক্তি প্রয়োগ করে মায়াকে আটকাল। মায়ার দুহাত নিজের দুহাতে মুচড়ে পিছনে দিয়ে মায়াকে বন্দী করল নিজের বাহুডোরের মধ্যে। রিদের ঝাপটে ধরায় মায়ার মুখে চেপে থাকে রিদের উম্মত বুকে মধ্যে। রিদ মায়াকে শান্ত করতে চাইল। জানতে চাইল মায়ার এমনটা করার কারণ কি? কিন্তু অধৈর্য মায়া রিদের শক্ত সাথে উঠতে না পেরে জোড়াজুড়ি করে রাগে রি রি করে বলে…

–” আপনি ঐ মেয়েটাকে চুমু খেলেন কেন?
রিদের বিরক্তি বাড়ে। সকালের পর তার সাথে মায়ার দেখায় হয়নি। যেখানে দেখা-দেখিই হয়নি দুজনের সেখানে রিদ কাকে কখন চুমু খেল? মায়ার কথা গুলো সম্পূর্ণ বুঝলো না রিদ।

–” আরে! কি আশ্চর্য! কখন কাকে চুমু খেলাম আমি। তোমাকে বলে… আহহ!

তীব্র বুকের ব্যথায় মৃদু আর্তনাদ করল রিদ। মায়া তখনো কামড়ে ধরে আছে রিদের উম্মুক্ত বুকের বাম পাশ। রিদের কথা গুলো শেষ হলো না। তীব্র বুকের ব্যথায় রিদের এবার আর সয্য হলো না যেন বিষয়টি। মায়া ধাঁচে তাকে কামড়ে ধরে আছে, ঠিক একই ধাঁচে রিদ এবার মায়াকে উল্টে ঘুরিয়ে বিছানার সাথে চেপে ধরলো। রিদ উপরে থাকলো মায়া নিচে। ততক্ষণে মায়ার কামড় হতে নিজেকে ছাড়াল রিদ। মায়া ছটফট কমলো না একটুও। এবার রিদের চোখে মুখেও রাগের আভাস ফুটে উঠলো। অকারণে একটা পর একটা কামড় খাচ্ছে বউয়ের। সেটাও মেনে নিবে রিদ? শোধবোধ করার দরকার না তার? রিদ তো ভালো মানুষ না তাহলে ছেড়ে দেওয়ার দরকার কি? মায়া ছটফটে সঙ্গে রিদ ঝুকে পড়লো মায়ার মুখোমুখি। নিজের আছড়ে পড়া নিশ্বাসের সঙ্গে মায়া দুহাত বিছানায় চেপে ধরে বলে…
–” এবার আমি একটা খায়? দেখায় কেমন লাগে কামড় খেতে?
ছটফট করতে করতে মায়া বলল…
—” আপনি আমার সামনে ঐ মেয়েটাকে চুমু খেলেন কেন?
—” কখন খেলাম!
—” আমি দেখেছি আপনি খেয়েছেন।
—” কখ.. উহুহহ!
মায়া শুনল না রিদের কথা। বরং রিদের বক্ষতলে আটকে থাকার মধ্যে দিয়ে মাথ উঠিয়ে হঠাৎই রিদের ঠোঁট কামড়িয়ে ধরলো আকস্মিক ভাবে। হতভম্ব রিদ ঠোঁটে তীব্র ব্যথা অনুভব করতেই দক্ষ হাতে মায়ার গাল চেপে ধরে নিজেকে ছাড়াল মায়ার থেকে। সেইহাতে মায়ার মুখে চেপে ধরল কামড় না দেওয়া থেকে। অন্যহাতে মায়ার দু’হাতে একত্রে আটকাল বিছানায়। দাঁতে দাঁত চেপে বললো…
—” আর একটা কামড় দিবে তো এবার আমি শুরু করব। বুঝিও কিন্তু! আমি শুরু করলে কিন্তু খবর আছে তোমার। ছাড় পাবে না ভুলেও! এই মধ্যে রাতে কামড়াকামড়ি খেলার শখ মেটাবো তোমার।

মায়া অশান্ত নেয় ছটফট করতে করতে এবার রিদের চেপে হাতে কামড়ে ধরলো। রিদ নিজের হাতটা ঝাড়ি মেরে মায়ার মুখ থেকে ছাড়িয়ে সোজা হয়ে উঠে বসল বিছানার উপর। শুয়া অবস্থায় হাত বাড়িয়ে মায়া পুনরায় রিদের শার্ট টেনে ধরতেই ক্ষেপে যায় রিদ। যে ধাঁচে মায়ার রিদের শার্ট টেনে ধরলো ঠিক একিই ধাঁচে রিদ মায়াকে পুনরায় বিছানায় চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলো….

—” “ম্যাডাম বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। হিতের বিপরীত কিছু ঘটবে তাহলে। আমাকে কন্ট্রোললেস করে শান্তিটা আপনিও পাবেন না। আমি কন্ট্রোললেন্স হলে কিন্তু আপনার কাছেই আসবো কন্ট্রোল হওয়ার জন্য। বউকে গুনে গুনে দুই দুইবার বিয়ে করেছি। এবার হাতে ধরে বাসরটাও সেরে ফেলবো। এমনিতেই আমার দুইটা বাসর রাত পেন্ডিংয়ে পড়ে আছে। আর কত অপেক্ষা করবো। জন্ম সূত্রের বউ আপনি আমার। চলুন শুরু করি।

হিম শীতল পানির ন্যায় শান্ত হলো মায়া। তৎক্ষনাৎ ছটফটও করা বন্ধ হলো। ভয়াৎ দৃষ্টি মেলল রিদের দিকে। মায়া চোখে মুখে ভয়টা এবার স্পষ্ট হলো রিদের চোখে। রিদ আরও কিছু বলবে তখন আতঙ্কিত গলার স্বর শুনা যায় মায়ার। রিদের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে…
–” র রক্ত! ঠোঁটে র রক্ত!

রিদ মায়াকে ছেড়ে উঠে বসলো সোজা হয়ে। হাত বাড়িয়ে রুমের ল্যামপের লাইট জ্বালাল। পাশ থেকে টিস্যু তুলে ঠোঁটের গড়িয়ে পড়া রক্তটা মুছতে মুছতে মায়ার দিকে তাকালো। ততক্ষণে মায়াও উঠে বসলো রিদের পাশে। রিদ কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠে…

–” মধ্যে রাতে আপনার কামড়াকামড়ি খেলার শখ হয়ছে বুঝি? বেশ ভালো কথা! এবার আমি শুরু করার আগে আপনার কামড়াকামড়ির খেলার কারণটা বলুন। দ্রুত!
–” আপনি তখন ঐ মেয়েটাকে স্বপ্নে চুমু খেলেন কেন? আমি দেখেছি আপনাকে ঐ মেয়েকে চুমু খেতে।

রিদ কপাল কুঁচকে আসে মায়ার কথায়। আজব! সে নাহয় একটু মজা করলো দুইদিন তার সাথে বউয়ের সাথে অভিমান ভুলাতে। তাই বলে এই মেয়ে সত্যি সত্যি ধরে নিল রিদ কাউকে চুমু খাবে? রিদ খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলে..

—” তুমি সাথে ছিলে না তাই স্বপ্নে অন্য মেয়েকে চুমু খেয়েছি। এখন তুমি আমার সাথে আছো তাই আসো তোমাকে খায়! সামান্য একটা চুমু জন্য এত কামড় খেতে হবে জানলে স্বপ্ন চুমুটা আমি তোমাকেই খেয়ে আসতাম। ফাজিল! আসো!

রিদ খানিকটা বিরক্তি নিয়ে এমনি এমনি হাত বাড়ালো মায়ার দিকে। মায়া রিদের ভয়ে ততক্ষণে এক লাফে বিছানা ছেড়ে অপর পাশে দাঁড়িয়ে পরে। রিদের কপালের ভাজ গুলো আরও দৃঢ় হয়। সে মায়াকে এমনিতেও কিছু করবে না। ব্যাস পাশে বসিয়ে একটু বুঝাবে। কিন্তু মায়া বুঝলো উল্টোটা। রিদ চোখ রাঙ্গিয়ে শক্ত গলায় বলে…

—” এদিকে আসো বলছি!
মায়ার ঝটপট উত্তর…
—” নাহ!
—” রিত বেশি বেশি হচ্ছে কিন্তু! কাছে আসো!
—” একদম না!
কথাটা বলেই মায়া দৌড়ে পালাতে চাইল। কিন্তু পারল না। ততক্ষণে রিদ হাত বাড়িয়ে মায়ার ওড়নাটা টেনে ধরে আটকালো। মায়ার গলায় টান অনুভব করতে পিছন ঘুরে দেখল, রিদ মায়ার ওড়না টেনে ধরে বিছানা থেকে নেমে আসছে মায়াকে ধরার জন্য। ভয়ার্ত মায়া আরও ভয়ার্ত হলো। মাথায় উল্টপাল্টা চিন্তা ভাবনা এঁটে, উত্তেজিত ভঙ্গিতে ওড়না ছেড়ে দিয়ে দৌড় লাগালো বাহিরে দিকে। ততক্ষণে রিদও বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো মায়াকে ধরার জন্য। মায়ার ভয়টা বুঝতে পেরে রিদের মুড চেঞ্জ হলো তৎক্ষনাৎ। বউ তার রোমাঞ্চকর বিষয় ভেবে ভয় পাচ্ছে। তাহলে রিদের উচিত না বউয়ের ভয়টাকে আপাতত কাজে লাগানো। অবশ্যই উচিত! যাও রিদ বউকে বুঝানোর জন্য কাছে ডাকছিল! এবার নাহয় সে আর বউকে বুঝানোর জন্য কাছে টানবে না। বরং বউয়ের ভয়ের সদ্ব্যবহার করবে বলে কাছে টানবে। এমনিতেও বউ তার
পাগলামি করে করে তাকে নেগেটিভ ফিল দিচ্ছে! এখন নাহয় বউয়ের ভয়টাকেই সত্যি করবে রিদ। নিজের হাতের ভাঁজে চেপে ধরা মায়ার ওড়নাটা তৎক্ষনাৎ ফ্লোরে ফেলে ঠোঁট কামড়িয়ে হেঁসে মায়ার পিছন পিছন রিদও দৌড়ালো। মায়া খালি পায়ে নুপুরের ঝংকার তুললো নিস্তব্ধ আবছা আলোয় করিডোর জুড়ে। রিদ মায়ার পিছন পিছন দৌড়ে রুমে বাহিরে এসে মায়াকে পিছন ডেকে বলে…

—” রিত! রিত দাঁড়াও বলছি! ধরতে পারলে ভালো হবে না কিন্তু! রিত!

মায়া শুনল না রিদের কথা। বরং সামনে দৌড়াল ভয়ার্ত মুখে। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখলেও রিদকে নিজের পিছন পিছন দৌড়ে আসতে। ভয়ার্ত মায়া আরও দৌড়াতে চাইল কিন্তু ততক্ষণে আটকা পড়ে গেল রিদের বাহুডোরে। রিদ দৌড়ে পিছন থেকে মায়ার পেট ঝাপটে ধরে শূন্যে তুলে নিল। মায়া হাত পা ছুটিয়ে চিৎকার করতে নিলেই রিদ একহাতে মায়ার মুখ চেপে ধরে অন্য হাতে মায়ার পেট। মায়ার পিঠ ঠেকলো রিদের বুকে বরাবর। বাঁকা হেঁসে মায়ার কানে কাছে মুখ নিয়ে রিদ ফিসফিসে বলে…

—” আপনাকে এতো সহজে ছেড়ে দিব ম্যাডাম! আমার আরামের ঘুম হারাম করে পালিয়ে বাঁচবেন আপনি? ভাবলেন কি করে আপনাকে ভালোই ভালোই যেতে দিব আমি! চলেন আমার সাথে। শোধবোধ বলতে একটা কথা আছে না? চলেন! চলেন!

উত্তেজিত মায়া চমকালো, ভড়কালো, হকচকিয়ে গেল ভয়ে। হিতাহিত অজ্ঞ হয়ে পুনরায় মায়া রিদের হাতে কামড় বসালো। রিদ আবারও হাত ঝাড়ি মেরে ছেড়ে দিল মায়াকে। সেই সুযোগ মায়া পুনরায় দৌড়ে পালাতে চাইল কিন্তু আবারও আটকা পড়ল রিদের বাহুডোরে। রিদ মায়ার হাত টেনে পিছনে থেকে মায়াকে জড়িয়ে ধরতেই ছটফট ভঙ্গিতে মুখ খুললো মায়া…

—” ছাড়ুন আমাকে! আমি যাব না আপনার সাথে! ওহ দাদী! ওহ দাদ..

মায়া চিৎকার করে হেনা খানকে ডাকতে চাইলো। কিন্তু বাঁধ সাধলো রিদ। মায়া সাথে জোর খাটিয়ে রিদ শক্ত হাতে মুখ চেপে ধরে শূন্য তুলে নিল মায়াকে। এই মধ্যে রাতে মায়ার সামান্য চিৎকার ও ঝংকার তুলছে নিস্তব্ধ পরিবেশে। মায়ার তীব্র ছটফট করার মধ্যে দিয়ে রিদ মায়াকে নিজের রুমে বিছানায় এক প্রকার ছুঁড়ে ফেলে তৎক্ষনাৎ দরজা লক করল। ঘুরে মায়ার দিকে তাকালো বাঁকা হেঁসে। ভয়ার্ত মায়া এক লাফিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল গুটি মেরে। আপাতত তার ভয় লাগছে প্রচন্ড। রিদ মায়ার মনোভাব বুঝে নিজের গায়ের শার্টের দিকে তাকাল। সব কয়েকটা বোতামই ছেঁড়া অবশিষ্ট লাস্ট দুটো বোতামটা ছাড়া। রিদ চেঞ্জ করলো না। বরং দুই কদম এগিয়ে ফ্লোর থেকে মায়ার ওড়নাটা তুলে ডিল মেরে ফেল দিল সোফার উপর। রিদ মায়া কাছে আসতেই মায়া পুনরায় ভয়ে দুই কদম পিছাতে চাইল। রিদ খানিকটা রাগে জোরে করে মায়াকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। একহাতে ল্যামপের লাইট বন্ধ করে পুনরায় অন্ধকার করল রুমটি। মায়া গুটি মেরে রিদের পাশে শুয়ে থাকতেই রিদ মায়াকে টেনে নিজের আরও কাছে আনলো। মায়া গলায় নিজের মুখ গুঁজে শরীর ছেড়ে দিল মায়ার উপর। রিদের স্পর্শে মায়া ভয়ংকর ভাবে তরতর করে কেঁপে উঠতেই রিদ খানিকটা শক্ত গলায় শুধালো মায়াকে…

—” রিত! ঘুমাতে চাইছি! ঘুমাতে দাও! আর নেগেটিভ ফিল দিবা না প্লিজ! কন্ট্রোল হারাতে চাচ্ছি না আপাতত।

কথা গুলো বলতে বলতে রিদ একহাতে মায়ার পেট জড়িয়ে ধরে একপা তুলে দিল মায়ার শরীরে। মায়াকে ঝাপটে ধরে শুতেই রিদের শরীরে ওজনে মায়ার দাঁতে দাঁত চেপে আসছে আড়ষ্ট হয়ে। মায়া ছোট শরীরে গোঙ্গাল অস্পষ্ট স্বরে। নড়েচড়া করতে চেয়ে কাপা কাপা হাতে ধাক্কা দিয়ে বলতে চাইল…

—” উঠুন প্লিজ! আপনি অনেক ভার। আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি এইভাবে ঘুমাতে পারব না। আমার রুমে যাব! সরুন আপনি!

রিদ না উঠলো! না নড়লো! না কোনো প্রতিক্রিয়া জানালো! বরং শক্ত হাতে মায়াকে আরও জড়িয়ে নিতে নিতে বললো…

—” জীবনের সতেরোটা বছর তুমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পার করছো। আমি তোমাকে বিরক্ত করছি! করি নাই! তাই তুমিও আমাকে আর বিরক্ত করতে পারবে না জীবনের বাকি ষাট বছর পযন্ত। আমি এই ভাবেই ঘুমাব জীবনের বাকি ষাট বছর। আমার ভার নিতে শিখে যাও! এতে কষ্ট কম হবে তোমার। নয়তো তুমি জীবনের বাকি রাত গুলো না ঘুমিয়ে কাটালেও আমার কিছুই করার থাকবে না। কারণ আমি নিজের ষোল আনা খুব ভালো বুঝি! তাই তুমি আমার থেকে এক আনাও ছাড় পাবে না জীবনে। আমি নিজের সুখ নিয়ে বিন্দুমাত্র কম্প্রোমাইজ করবো না রিত!
.

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply