Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৯


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

৩৯
থমথমে পরিবেশ। গুমোট উত্তাপ পেরিয়ে আবারও অতি সন্তপর্ণে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো আয়ন। দীর্ঘ সময় নিয়ে নিজের মনস্তাত্ত্বিক বিষয় গুলো রয়েসয়ে ধীরস্হে সম্পূর্ণ বর্ণনা করে, চোখ তুলে তাকায় নিজের সামনে। এই মূহুর্তে বেশ কয়েক জোড়া চোখের কেন্দ্র বিন্দু সে। প্রত্যেকের চেহারায় বিস্ময়কর ভাব। হয়তো আশ্চর্য হয়েছে আয়নের কথায়। হবারই কথা। অস্বাভাবিক কিছু নয়। আয়ন নিজের চোখ নামিয়ে নিচে তাকায়। পুনরায় রয়েসয়ে বলে উঠে…

—” সেদিন আমাদের বিয়েটা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হয়েছিল। নিজেও মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম না বিয়েটা মেনে নেওয়ার জন্য। তাই তোমাদের থেকে সম্পূর্ণ বিষয়টি গোপন রাখতে চেয়েছিলাম ততদিন, যতদিন না পযন্ত আমি মানসিক ভাবে প্রস্তুত না হচ্ছি। আমার রিফ্রেশমেন্টের প্রয়োজন ছিল। তাই সেদিন লন্ডনে চলে যায়। টানা এক-দেড়মাস ভেবেচিন্তে ডিসিশন নেয় দুই বিষয়ের উপর ভিত্তি করে। প্রথমত্ব! মায়ার সাথে আমার পূব থেকেই বিয়েটা নিধারিত ছিল। পছন্দ মানুষ বিদায় বিয়েটা নিয়ে অমত পোষণ করার কারণ দেখছিলাম আমি। দ্বিতীয়ত্ব! যেহেতু আমাদের বিয়েটা হয়েই গেছে তাই আমি আমার বিয়েটাকে সামাজিক ভাবেও স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছিলাম। সংসারটা নাহয় পরেই শুরু করবো। কিন্তু বউয়ের দ্বায়িত্ব তো নিতেই পারি সামাজিক ভাবে আমি। মায়া আমার বিয়ে করা বউ! আমার যথেষ্ট পরিমাণ এবিলিটি আছে নিজের বউয়ের দায়িত্ব নেওয়ার। তাই পারিবারিক, সামাজিক দুটো ঠিক থেকেই আমি পুনরায় সম্মতি চাচ্ছি তোমাদের কাছে। আমি তোমাদের সবাইকে সেদিন রাতে ঘটে যাওয়ার সম্পূর্ণ ঘটনা গুলো কারণসহ বর্ণনা করলাম। এখন আমার মনে হয়না এরপরও তোমাদের কারও কোনো আপত্তি থাকার কথা আমাদের বিয়েটা নিয়ে নানুমা। আমি আশাবাদী তোমরা আমার বিষয়টা বুঝবে।

আয়ন দীর্ঘ টান পোড়ার কথা গুলো বলেই থামল। নত মস্তিষ্কের সোজা করে পুনরায় তাকালো নিজের সামনে উপস্থিত বসে থাকা একাধিক সদস্যের দিকে। আয়নের বাবা-মা, হেনা খান, আরাফ খান থেকে শুরু করে উপস্থিত ফিহা পযন্ত বসা তার সামনে। আয়ন রয়েসয়ে ধীরস্থির ভাবে সেদিন রাতে ঘটে যাওয়ার মায়াও আয়নের বিয়েটা সম্পর্কে জানালো তার পরিবারকে। কিন্তু সবটা শুনার পর থেকেই সবাই কেমন যেন নিস্তর, স্তব্ধ নিবাক হয়ে আছে। আয়ন বুঝলো নিজের পরিবারের শকট হয়ে যাওয়া বিষয়টি নিয়ে। কিন্তু কতক্ষণ সে এভাবে বসে থাকবে। তাদেরও কিছু বলা উচিত। হ্যাঁ না একটা কিছু তো আশা প্রয়োজন। আয়ন পুনরাবৃত্তি করে গলা ঝেড়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। সফলও হলো। নিজের আবাককতায় সামনে থেকে মুখ খুললো হেনা খান…

—” এতো কিছু ঘটে গেল অথচ তুই একটা বার আমাদের জানানোর প্রয়োজন মনে করলি না আয়ন? সবকিছু যেহেতু নিজেই ডি’সাইড করে ফেললি তাহলে এখন আমাদের অনুমতি প্রয়োজন কেন পড়ছে তোর শুনি।

—” নানুমা আমি আগেও বলেছি। আমি মানসিক ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য তোমাদের কাছ থেকে বিষয়টি গোপন রেখেছিলাম এতোদিন।

হেনা খান কিছু বলবে তার আগেই গম্ভীর মুখ খুললো মেহেরবান…

—” তোমার কি মনে হয় আয়ন? তুমি আমাদেরকে সেদিন এই বিষয়টি শেয়ার করলে আমরা তোমাকে বিয়েটা নিয়ে ফোর্স করতাম কি মায়াকে জোরপূর্বক মেনে নেওয়ার জন্য?

—” আম্মু বিষয়টি তেমন কিছু নয়ই। ফোর্স করতে কি করতে না তা জানা নেই। তবে এতটা শিওর ছিলাম জীবনে কোনো পরিস্থিতি আমি মায়াকে ছাড়তাম না। আঁকড়ে রাখতাম। বিয়ে যেহেতু করেছি সেটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতাম সারাজীবন।

—” এখন যদি আমরা নাহুচ করি তোমার বিয়েটা নিয়ে তাহলে??

চমকে উঠে তাকালো মেহেরবানের দিকে আয়ন। নিজের মায়ের তীক্ষ্ণ মাইড সম্পর্কে অবগত সে। দুর্দান্ত বাস্তবভিত্তিক মানুষ মেহেরবান। তাই সে নিজের মায়ের অমত না করে রয়েসয়ে বললো…

—” আমি আশাবাদী আম্মু। তুমি আমাকে ফিরাবে না।

ছেলের কথায় চুপ থাকলো মেহপরবান। নিজের ওজন বজায় রাখলো। বিচক্ষণতা কাজে লাগালো। মাঝেমধ্যে ছেলেমেয়ে আবদার রাখতে হয়। অন্যায় পেরিয়ে চুপ থাকতে হয়। এতে করে নিজেদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জায়গায় অতি দৃঢ় শক্ত থাকে ছেলেমেয়ে চোখে। তিনিও তাই করলেন। কিন্তু সামনে থেকে অধৈর্য মুখ খুললো হেনা খান। তিনি আয়নকে বলে উঠলেন…

—” আমি ফেরাবো তোকে। আমি তোর মা মতোন নয়। সবকিছু সহজে মেনে নিব ছেলেমেয়ের অবদার। তুই আমার কাছ থেকে সত্যিটা গোপন করে আমাকে হার্ট করেছিস আয়ন। তাছাড়া মায়া আমার সেনসেটিভ বিষয়। এই বাড়ির কাজের মানুষ থেকে শুরু করে উপস্থিত সদস্যরাও সেটা জানে। তাহলে আমি আমার সোনামাকে নিয়ে তোর সাথে আপোষ করবো কেন? আমি এতো যুদ্ধ বিগ্রহ করে মায়াকে আমার কাছে রেখে তোর সাথে আপোষ করার জন্য নয়। আমি মায়াকে তোর হাতে তুলে দিতে চেয়েছি শুধু নিজের কাছে রাখার জন্য। কিন্তু তুই বিয়ের আগেই আমার থেকে কথা গোপন করা শুরু করে দিলি। যেটা আমার কাছে মোটেও পছন্দ না। এখন যদি তোর হাতে মায়াকে তুলে দেয়, তাহলে তুই মায়াকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিজের কাছে রাখার ডিসিশন নিস আমাকে না জানিয়ে। তাহলে সেটা অবশ্যই আমি নিব না। তাই না?

হেনা খানের অযুক্তিকর কথায় বিরক্তি কন্ঠে বলে উঠলো মেহেরবান।

—” অস্বাভাবিক কিছু তো নয় মা। স্বামী সাথে স্ত্রী থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক তাই না। স্বামীর সংসার করতে গেলে সব মেয়েকেই স্বামী সাথে থাকতে হয়। এটা নিয়ম। তুমিও নিশ্চয়ই সেই নিয়মের বাহিরে কেউ নও মা?

মেহেরবানের কথায় যেন হেনা খানের শরীরময় তীব্র কেঁপে উঠলো মনস্তাত্ত্বিক বিষয় গুলো ভেবে । মায়া উনার সাথে থাকবে না এই বিষয়টি যেন আঘাত হানলো হেনা খানের মাথায়। তিনি নিজের গুমোট একাকিত্বের জীবনে পুনরায় ফিরে যেতে চাই না। আর না মায়াকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাই। হেনা খান তীব্র নাহুচ করে বসলো। আয়নের সাথে মায়ার বিয়ে তিনি দিবেন না এই নিয়ে। আয়ন বুঝলো হেনা খানের ভয়াৎ হওয়ার বিষয়টি। নিজের জায়গায় ছেড়ে গিয়ে বসলো হেনা খান পাশে। হেনা খানের দু-হাত নিজের দু’হাতে মুঠোয় নিয়ে বুঝদার গলায় বললো…

—” আমি তোমার কাছে আমাদের বিয়েটার সামাজিক স্বীকৃতি চাচ্ছি নানুমা? আমি মায়ার সাথে এখন সংসারটা শুরু করবো না। তাই মায়া তোমার সাথেই থাকবে আপাতত। তাছাড়া সামাজিক আনুষ্ঠানিক ভাবে মায়াকে আমার ঘরে উঠিয়ে নিলে গেলেও মায়া তোমার কাছে থাকবে সবসময় নানুমা। আমি হসপিটালের যাওয়া সময় তোমার কাছে মায়াকে দিয়ে যাব। আবার হসপিটালের থেকে ফিরে এসে তোমার কাছ থেকে মায়াকে নিয়ে যাব। এমনটা ওয়াদা করছি নানুমা। তুমি আমাকে অন্তত এই বিষয়টা নিয়ে বিশ্বাস করতে পারো। তাছাড়া আমি সত্যি দুঃখীত নানুমা এতদিন এই বিয়ের বিষয়টা তোমার কাছ থেকে লুকায়িত গোপন রাখার জন্য। তুমি এতটা কষ্ট পাবে জানলে আমি আরও আগেই সবটা বলে রাখতাম অন্তত তোমার সাথে।

আয়নের কথায় মন গললো হেনা খানের। নরম হয়ে আসলো নিজের মাঝে। কিন্তু আপত্তি পোষণ করলো আরাফ খান। তিনি দীর্ঘ সময় নিয়ে পরিবারের আলোচনা সভায় নীরব সদস্য ছিলেন। প্রত্যেকের দিকটা তীক্ষ্ণতার সহিত বুঝার চেষ্টা করলো। কিন্তু পরিশেষে যেটা উনার মাথায় আসলো না। সেটা হলো আয়নের বিয়ের রাতে ঘটে যাওয়ার কিছু বিষয়ের ঘটনা গুলোকে নিয়ে। তিনি অন্তত গম্ভীর মুখ খুললো আয়নের সঙ্গে। তীক্ষ্ণ কন্ঠে প্রশ্ন করলো আয়নকে….

—” তোমার কখনো অস্বাভাবিক লাগেনি আয়ন বিয়েটা নিয়ে?? আমার তো বেশ অস্বাভাবিক লাগছে সবকিছু?

—” মানে??

—” নিজের বিচক্ষণতা কাজে লাগাও আয়ন? তুমি তো অলস মস্তিষ্কের নয়? মানে প্রশ্নটা আমাকে না করে নিজেকে করো। উত্তর পাবে সেই সাথে আমাদেরও উত্তর দিতে পারবে তুমি।

চমকে তাকালো আয়ন আরাফ খানের মুখের দিকে। হঠাৎ উনার গুমোট প্রশ্নে আয়ন চমকালে ও বাকি সবাই বিস্ময়কর দৃষ্টি তাকায় আরাফ খানের দিকে। উনি মনোযোগ হলেন না কারও দৃষ্টি নিয়ে বরং আগেই ন্যায় আয়নকে প্রশ্ন করে বললো…

—” তোমার ভাষ্য মতো জুই তোমার কোলে ছিল রাইট? এখন প্রশ্ন হচ্ছে? জুই তোমার কোলে থাকলে গ্রামবাসী তোমার সাথে জুইকে না জড়িয়ে মায়াকে কেন জড়িয়ে বিয়েটা দিল? গ্রামী বাসী যেহেতু নিচু মাইন্ডের ছিল তারা তোমার সাথে জুইকে জড়ানোর কথা ছিল মায়াকে না। কারণ তাদের ভাষ্যমতে অন্তরঙ্গ অবস্থায় তোমাকে জুইয়ের সাথে পাওয়া গেছে মায়ার সাথে নয়? তাই পাত্রীর নামটা কিন্তু যুক্তিসহকারে জুইয়ের নামটায় আসার কথা। দ্বিতীয়ত্ব তুমি বলছো বিয়ের সময় তুমি পাত্রীর নামটা পযন্ত উল্লেখ করুনি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে? তুমি তাদেকে পাত্রী নাম না বললে তারা মায়ার নামটা কিভাবে বসালো তোমার পাশে? জুইয়ের নামটাতো হতে পারতো? তৃতীয় মায়ার পরিবার এখনো পযন্ত জানে মায়া রিদের বউ। মায়ার সাথে রিদের বিয়েটা বাতিল হয়ে গেছে সেটা আমরা এখনো অবধি তাদেরকে জানায়নি। এখন কেন জানায়নি সেটা অবশ্য আলাদা ভাবে আমার কাউকে কিছু বলতে হবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে? যেখানে মায়ার পরিবারের বা জুই সবাই জানে মায়া রিদের বউ সেখানে জুই এত সহজে মায়ার দ্বিতীয় বিয়েটা মেনে নেওয়ার কথা না। কারণ যেখানে জুঁই অলরেডি জানে মায়া বিবাহিত। সেখানে একটা বিবাহিত মেয়ে যে দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে পারে না সেটা বুঝার বয়স অন্তত জুঁইয়ের রয়েছে। তাই তারও সেদিন রাতে অন্তত মায়ার হয়েও আপত্তি করার কথা। চুপ থাকার তো কথা না। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে? মায়া জানে না তোমার সাথে আমরা ওর বিয়ে পূর্ব থেকেই ঠিক করে রেখেছি। তাই সেই রাতের পরিস্থিতিতে মায়াও রিয়েক্ট করার কথা ছিল তোমার মতো করে। বেশি না করলেও কম হলেও করার কথা ছিল। যেমন ধরো নূন্যতম কান্নাকাটি হলেও করার কথা বিয়েটা হুট করেই হয়ে যাওয়াতে। কিন্তু মায়া তেমন কিছুই হয়নি বরং দিব্যি হেসেখেলে ঘুরছে বাড়িতে। কেউ বলবে না মায়ার বিয়ে হয়েছে সেটা নিয়ে। নূন্যতম আপত্তিও নেই মায়ার মাঝে। আর না আছে কোনো জড়তা। এখন তুমি আমাদেরকে সেদিন রাতের বাহিরের ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোর বিশ্লেষণ করেছো। যেটা তোমার সাথে হয়েছিল। কিন্তু সেখানে আরও একটা পার্ট জানা বাকি আছে আমাদের। মায়া আর জুঁই যে ঘরে আটকা ছিল সে ঘরে আসলে সেদিন রাতে কি ঘটে ছিল সেটাও আমাদের জানা বাকি আছে আয়ন। একপক্ষ শুনে রায় করাটা যেমন ঠিক না। তেমন একপক্ষীক ঘটনা শুনে কোনো কিছু করাটাও ঠিক হবে না। তাই আমাদের সবটা জানা প্রয়োজন আয়ন।

আরাফ খানের দীর্ঘ প্রশ্নের চত্বরে টনক নড়লো আয়নের। চমকানো ভঙ্গিতে তাকালো আয়ন আরাফ খানের মুখশ্রীর দিকে। আরাফ খান বলা প্রতিটা প্রশ্নই যুক্তি সংগত। আয়ন ভেবেছিল এই বিষয়ে তবে এতটা দৃঢ়তা সঙ্গে নয়। মায়াকে স্বাভাবিক দেখায় তাঁর মাথা থেকে জুইয়ের বিষয়টা বের হয়ে গেছিল। সে অন্তত বোকামি কাজ করলো একবার অন্তত সম্পূর্ণ বিষয়টি ঘেটে দেখা দরকার ছিল আয়নের। মায়ার সাথে তার বিয়ে হয়েছে ভেবে সে সবকিছু ভুলে বসেছিল এতদিন। কিন্তু আরাফ খানের কথায় পুনরায় টনক নড়লো আয়নের। আয়ন চিন্তিত ভঙ্গিতে কিছু বলবে তার আগেই ড্রয়িংরুমে আগমন ঘটলো মায়ার। ভরদুপুরে কলেজ শেষ করেই ড্রয়িংরুমের মেইন দরজা ধরে প্রবেশ করলো মায়া। থমথমে পরিবেশ সবাইকে জড়ো হয়ে বসে থাকতে দেখে খানিকটা অপদস্তক হলো মায়া। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবাইকে পযবেক্ষণ করতেই চোখে পড়লো আয়নের মুগ্ধ করা দৃষ্টিতে। আয়নকে দেখে মায়া স্মিথ হাসলো। আশেপাশে চোখ আওড়িয়ে জুঁইকে খুজলো মনে মনে। কোথাও দেখতে না পেয়ে বুঝলো মায়ার রুমে আছে সে। মায়া সবাইকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইতস্ততার সহিত ঠোঁট প্রসারিত করে হাসতেই, সামনে থেকে নিজের কাছে ডাকলো হেনা খান। মায়া রয়েসয়ে হেনা খানের কাছে যেতেই তিনি আয়ন ও উনার মধ্যস্থে জায়গায় বসায় মায়াকে। মায়া খানিকটা ভিতু চোখে আওড়িয়ে পাশে বসা আয়নকে দেখে নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় নিজের পিছনে ড্রয়িংরুমে দরজার দিকে। রিদ দরজা ধরে প্রবেশ করছে কিনা দেখার জন্য। রিদকে দেখতে না পেরেও মায়া রিদের ভয়ে আষ্টশ হয়ে যাচ্ছে। কারণ রিদের ঘোর নিষেধ মায়া কোনো পুরুষ মানুষের ছায়াও মারতে পারবে না। মায়া অবাধ্য হতে চাই তার মিস্টার ভিলেনের। সেতো তার মিস্টার ভিলেনের বাধ্য নারী হতে চাই। আয়ন মায়ার দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছনে দরজা দিকে তাকায় কাউকে দেখতে না পেরে কপাল কুঁচকে আসে তার। আয়নের তীক্ষ্ণতার মাঝেই হেনা খান মায়ার কাঁধ থেকে কলেজ ব্যাগটা খুলে নিতে নিতে বললো….

—” আজ এতো তাড়াতাড়ি আসলি যে???

—-” আজ বৃহস্পতিবার দাদী। হাফডে ছুটি হয় তো।

—” ওহ মনে ছিল না আমার। আচ্ছা বাদ দে। কিছু খেয়েছিস ক্যান্টিনে নাকি এখনো পযন্ত না খেয়ে আছিস।

কথা গুলো বলতে বলতেই হেনা খান মায়ার কপালের ছোট ছোট চুল গুলো, নিজের আদুরের দুহাত দিয়ে টেলে মায়ার কপালের দুই পাশ করে উপরে উঠিয়ে দিচ্ছে। মায়াও নিজের বামহাতে কপালের একপাশ ঘেঁষে মাথার উপর ছোট ছোট চুল গুলো তুলে দিয়ে চুলকালো…

—” খেয়েছিলাম।

হেনা খান চমকে উঠে মায়ার বামহাত নিজের হাতে নিতে নিতে বললো…

—” আংটিটা কোথায় তো হাতের সোনামা?? নিষেধ করেছিলাম না এটা খুলতে?? তাহলে খুললি কেন??

আয়ন চমকে উঠে মায়ার বামহাতের দিকে তাকালো কপাল কুঁচকে। নিজের নামের আংটিটা মায়ার হাতে দেখতে না পেয়ে কষ্ট পেলো নিজের মন কৌটাতে। তবে মায়ার কাছে থেকে সত্যিটা জানার জন্য তীক্ষ্ণতা বজায় রাখলো নিজের দৃষ্টি ভাঁজে। মায়া ভিতু চোখে আবারও পিছনে ঘুরে দরজা দিকে তাকালো একবার। রিদকে দেখতে না পেয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে বললো…

—” উনি নিয়ে গেছেন আমার থেকে।
হেনা খান কিছু বলার আগেই প্রশ্ন করলো আয়ন…
—” উনি কে??
—” আপনার ভাই।
মায়ার মুখে আপনার ভাই শব্দটা বুঝলো না আয়ন। কারণ এই মূহুর্তে খান বাড়িতে আয়ন ছাড়া অন্য কোনো ভাই জাতীয় পুরুষ নেই। কারণ সোহাগ লন্ডনে আছে বাবা-মা সাথে। রিদও খান বাড়িতে নেই। তাই মায়া আপনার ভাই বলতে আসলে কাকে বুঝতে চাইছে সেটাও ধরতে পারলো না উপস্থিত কেউ। আয়ন তীক্ষ্ণ কন্ঠে পুনরায় প্রশ্ন করলো মায়াকে…
—‘ আমার ভাই কে?

আয়নের কথা ভিতু চোখ তুলে তাকায় সেদিকে। আয়ন রিদকে চিন্তে পারছে না বলে অনেক অসহায় হলো মায়া। পাঁচ মিনিট আগেও তো মায়া রিদের সাথে ছিল। তাহলে সবার তো জানা কথা রিদ বাংলাদেশে আছে আর মায়ার আয়নকে ‘আপনার ভাই’ শব্দটা বলতে রিদকে বুঝাতে চাইছে। মায়া রয়েসয়ে আয়নের প্রশ্নের উত্তরে একি ভঙ্গিতে বললো…

—” উনি আরকি।

মায়ার বারবার উনি বলাতে কপাল কুঁচকে আসে আয়নের। সে কিছু বলবে তার আগেই সামনে থেকে গম্ভীর মুখ খুললো আরাফ খান। তিনি অন্তত আত্মবিশ্বাসের সাথে মায়াকে বলেন…

—” রিদ নিয়েছে তোমার আংটিটা সোনামা??

মায়া তৎক্ষনাৎ ধীরস্থে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই আয়ন কপাল কুঁচকে তাকায় মায়ার দিকে। মায়ার অদ্ভুত ব্যবহার সবকিছু কেমন যেন হঠাৎ এলোমেলো লাগছে তার। মায়া কেন রিদকে ‘ভাইয়া’ বলে সম্মোধন না করে, বারবার উনি ‘উনি করছে? মায়ার কিসের এতোটা জড়তা রিদকে ভাইয়া ডাকা নিয়ে সেটাও বুঝলো না আয়ন। তাছাড়া রিদই বা কবে বাংলাদেশে আসলো। সেতো শুনেনি রিদকে বাংলাদেশে আসতে। এমনকি সে কাল রাতে লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফিরলো। সকালে খান বাড়িতে এসেও রিদকে পাইনি। তার মানে রিদ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে এসেছে খান বাড়িতে। আর সেই সময়ে মধ্যেই মায়ার হাত থেকে আয়নের নামের আংটার খুলে নেয় কিন্তু কেন? তাছাড়া আজকাল হুটহাট রিদকে বাংলাদেশের পাওয়াটাও বড় চমকের চেয়েও কম কিছু নয় তাদের জন্য। আয়ন আর কিছু ভাবতে পারলো না তার আগেই অতি উৎসাহের মুখ খুললো হেনা খান…

—” রিদ বাংলাদেশে এসেছে? তুই দেখেছিস রিদকে? রিদ কি খান বাড়িতেই আছে সোনামা??

মায়া নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে মিহি কন্ঠে বললো…
—” হুমম! উনি বাহিরেই আছেন দাদী।

মায়ার কথা মধ্যেই তীক্ষ্ণ কন্ঠে পাশ থেকে প্রশ্ন করলো মেহেরবান….
—” তাহলে তুমি কেন রিদকে তোমার হাতের আংটিটা খুলতে দিলে ? নিষধে করোনি কেন??

মায়া কিছু বললো না মেহেরবানের কথায়। বরং নত মস্তিষ্কের চুপ করে রইলো। মেহেরবান বা হেনা খান আরও কিছু প্রশ্ন করবে মায়াকে আর আগেই আরাফ খান হাতের ইশারায় আপাতত চুপ থাকতে বলেন তাদেরকে। তিনি মায়ার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি স্থির করে কিছু একটা ভাবলো মনে মনে। নিজের মনস্তাত্ত্বিক ধারণাটা সত্যায়িত যাচাই করার জন্য মায়াকে প্রশ্ন করে বললো…

—” আয়ন কাছে থেকে আমরা সেদিন রাতের ঘটনাটি শুনলাম। বিয়েটা কি সত্যি হয়েছিল সোনামা??

আরাফ খানের কথায় চমকে উঠে তাকায় মায়া আয়নের দিকে। আয়নকে এক পলক দেখে নিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকায় আরাফ খানের দিকে মায়া। সম্মতি জানিয়ে বললো…

—” হয়েছিল দাদাজানন।

—” তুমি রাজি এই বিয়েতে? না মানে তোমার সমস্যা নেই তো এই বিয়েটা নিয়ে?

সহজ সরল স্বীকারোক্তি প্রকাশে বললো…
—” আমি ছোট মানুষ আমি কি বললো দাদাজান? আমার কথায় কি কেউ মানবে এখানে? তাছাড়া আব্বু বা জুঁই আছে তাদের মতামতটা গুরুত্বপূর্ণ এখানে আমার নয়। সবচেয়ে বড় কথা আব্বু ভিষণ রেগে যাবে এই বিয়েটার কথা শুনলে দাদাজান?

মায়ার মুখের জুইয়ের নামটা শুনে আয়ন কপাল কুঁচকে কিছু বলতে নিবে তার আগেই আবারও হাতের ইশারায় থামিয়ে দেয় আরাফ খান। তিনি অন্তত কৌশলে মায়াকে আবারও প্রশ্ন…

—” তোমার আব্বুকে ম্যানেজ করার বিষয়টা নাহয় আমরা দেখবো সোনামা। কিন্তু জুঁইয়ের মতামত প্রয়োজন পড়বে কেন? তোমার সম্মতি থাকলেও তো হয়। আমরা পুনরায় তোমাদের বিয়েটা দিতে চাই দুই এক দিনের মধ্যে।

—” তোমাদের বলতে কারা দাদাজান?? এখানে আমি কিছু না। সবকিছু হলো জুঁই। তাছাড়া জুইয়ের সম্মতি না দিলে বিয়েটা হবে….

মায়া কথা গুলো বলতে বলতেই থামলো রিদের হঠাৎ আগমন। ধুপধাপ পা ফেলে রিদ ড্রয়িংরুমের দরজা ধরে প্রবেশ করতেই মায়া ঘাড় ঘুরিয়ে রিদকে দেখতে পেয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে যায়। এই ভেবে যে সে আয়নের পাশে বসে আছে। রিদ গম্ভীর মুখ প্রবেশ করতেই মূহুর্তে চোখে পড়লো উপস্থিত সদস্যের থমথমে চেহারা গুলো। রিদ কপাল কুঁচকে সবাই পযবেক্ষণ করতেই চোখ পড়লো মায়ার অবস্থানটা আয়নের পাশে। মায়া আবারও রিদের অবাধ্য হয়ে ছেলের পাশ ঘেঁষে বসতে দেখেই মূহুর্তেই রাগে রি রি করে উঠলো রিদের শরীরময়। এই নারীকে সে কিছুতেই বশে আনতে পারছে ভেবেই দু’হাত মুষ্টি বদ্ধ করলো বাড়ন্ত রাগে। কাউকে প্ররোয়া করলো না। আর না কাউকে মানলো না রিদ। প্রচন্ড রাগে রিদ মায়ার দিকে তেড়ে যেতে নিলেই, মায়া আয়নের পাশ থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে সোফা ছেড়ে। ভয়ে উত্তেজায় তুমুল গতিতে বলতে শুরু করে…

—” আমি কিছু করিনি। আমি কিছু করিনি। সত্যি বলছি আমি কিছু করিনি। দাদী বললো বসতে। আমি কিছু জানিনা। সত্যি সত্যি!

রিদ ও মায়ার হঠাৎ কান্ডে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে যায়। মায়ার ভয়কে না বুঝলো রিদের রাগটা চোখে পড়লো সবার। রিদ মায়ার হঠাৎ কান্ডে দুই সেকেন্ড থেমে গেলোও, পুনরায় তেড়ে আসতে চাই মায়ার দিকে রেগে। কিন্তু মায়া রিদের রাগটা বুঝতে পেরে উল্টো ঘুরে প্রাণপূর্ণ দৌড় লাগায় উপরে নিজের রুমের দিকে। আপাতত তার মিস্টার ভিলেন রাগ থেকে বাঁচা জরুরি। সামনে থাকলেই বিপদ।

উপস্থিত সদস্যরা রিদ মায়ার বিষয়টি বুঝতে না পারলে আরাফ খান দৃঢ় ভাবে বুঝলেন দু’জনের তীব্র অধিকার বোধের বিষয়টি একে অপরের প্রতি। তবে তিনি এতটা বুঝতে পারছেন না আয়নের সাথে যদি মায়ার বিয়েটা সত্যিই হয়ে থাকে? তাহলে তিনি রিদকে কিভাবে থামাবে তান্ডব করা থেকে। আর যাই হোক না কেন? একজন বউকে তো অন্য জন্যের হাতে তুলে দেওয়া যায়না তাই না? আবার রিদকেও থামানো মুশকিল।

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply