দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৭
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
৩৭
বিকাল ৫ঃ১৫। টানা দুই ঘন্টার রাস্তা বাইকে পাড়ি জমিয়ে অতিক্রম করে খান বাড়ির বিশাল গেইটে সামনে এসে থামলো বাইকটি। মাথার হেলমেট খুলে সামনে রাখলো। কপাল কুঁচকে হাতে থাকা ছোট কাগজের টুকরো মধ্যে লেখা গুটি অক্ষর খান বাড়ির এড্রেসটা মিলিয়ে নিল এক পলক সুদর্শন যুবকটিকে। এড্রেসটা মিলে যেতেই হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে বসে থাকা মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বললো…
—” নামতে পারবি?
মেয়েটি মাথা নাড়িয়ে যুবকটিকে সম্মতি জানিয়ে ধীর কন্ঠে বললো..
—” পারবো!
—” আমাকে ধরে নাম! নয়তো পড়ে যাবি স্লিপ করে।
বাইকের পিছনে বসে থাকা মেয়েটি নিজের একহাতে ছেলেটির শার্টের বাহু চেপে ধরে সাবধানে নেমে আসলো ফ্লোরে। তটস্থ চোখে জড়তা নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো খান বাড়ির বিশাল গেইটের দিকে একবার। ইতস্ততায় হাসফাস করলো বেশ অনেকটায় মেয়েটি। পূবের স্মৃতি মন নাড়িয়ে উঠলো তার। সুর্দশন ছেলেটি মেয়েটির দৃষ্টি অনুসরণ করে চোখ আওড়িয়ে আবারও তাকায় খান বাড়ির বিশাল গেইটের দিকে। কালো গোল্ডেন মধ্যে ডিজাইন করা প্রশস্ত গেইটের ভিতর ভরর্তি দাঁড়িয়ে আছে দুটো দারোয়ান। ছেলেটির দৃষ্টিতে সূক্ষ্ম ভাঁজ ফেলে পুনরায় একবার খান বাড়িটি দেখে নিল অপদস্তক। শিওর হওয়ার জন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো…
—” তুই শিওর আমরা ঠিক এড্রেসে এসেছি?? এই বাড়িটিই তো??
আঁড়চোখে খান বাড়িটিকে আরও একবার দেখে নিয়ে জড়াতা মাথা নাড়ালো জুঁই। নিজের ভাইকে উত্তর সাপেক্ষে সম্মতি জানিয়ে মিহি সুরে বললো…
—” হুমম এটাই!
~~
ইতস্ততার সহিত খান বাড়ির মেইন দরজা ধরে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলো আসিফ। একহাতে জুঁইয়ের কাপড়ের ব্যাগ তো অন্যহাতে জুইয়ের বামহাতটা চেপে ধরা নিজের হাতের ভাজে। কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণতার সহিত খান বাড়ির ড্রয়িংরুমটা একবার পরখ করে নিল সে। বাড়িটির ভিতর বাহির চারপাশেটায় বিশাল প্রতিপত্তি, ভরপিন্ড। বাড়ির কোণায় কোণায় যেন গাম্ভীর্য্য অহংকারীর একটা ভাব টান ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। নামি-দামি আসবাবপত্র থেকে শুধু করে সবকিছুই কেমন অহংকারী টাইপের মনে হলো আরিফের কাছে। বাড়ির ভিতর ও বাহির দুটো পরিবেশই কেমন স্নিগ্ধ শান্ত। পাহারাদার হিসাবে শত বডিগার্ড হওয়ার পরও কোনো রকম বিশৃংখলার দেখা গেলো না বিন্দুমাত্র। সবকিছু কেমন নিয়মাবর্তিতা। আরিফ গম্ভীর মুখে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো। কোন এক মনস্তাত্ত্বিক কারণে আরিফ মায়াকে খান বাড়িতে রাখতে নারাজ। এমনকি খান বাড়ির কারও সাথে সম্পর্ক রাখতে নারাজও তাঁর মন। অনেকটা বিষিয়ে আছে খান বাড়ির সাথে তার সম্পর্কটা। কিন্তু তার বাবা শফিকুল ইসলাম এবং পরিস্থিতি দায়ে পড়ে সে নিজের আদুরের ছোট বোনকে বাধ্য হয়ে এই খান বাড়িতে রাখতে হচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে কাছে। আরিফের জানা নেই এই বিষিয়ে যাওয়া সম্পর্কটা কবে ইতি ঘটবে এবং তার আদুরে বোন মুক্তি পাবে। ভাই হিসাবে সে বড্ড অসহায় সম্পর্কের বেড়াজালে। কিছু অহেতুক যুক্তি আর কসমের জন্য তার হাত-পা বাঁধা। চাইলেও মায়াকে এই অদৃশ্য শিকল হতে মুক্তি করতে পারছে না। তবে আশায় আছে যেদিন তার বোন সেচ্ছায় এসে তাকে বলবে ‘ সে এই সম্পর্কে বেড়াজাল হতে মুক্তি চাই’ সেদিন সে সবকিছুর বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও বোনকে মুক্ত করে নিবে এই বন্দী কারাগার থেকে।
বুক ভারির দীর্ঘ নিশ্বাস পুনরায় ত্যাগ করলো আরিফ। নিজেকে শান্ত করে জুঁইয়ের হাতটা চেপে ধরা অবস্থায় সূক্ষ্ম চোখ বুলিয়ে নিল চারপাশেটা। আশেপাশে কাউকে না দেখে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো জুঁইয়ের দিকে সে। হালকা কপাল কুঁচকে ধীরস্থে প্রশ্ন করে বললো জুঁইকে….
—” রিতু কোথায় হবে জুঁই? আশেপাশে তো কাউকেই দেখা যাচ্ছে না??
জড়তার চোখ বুলালো জুঁই ফাঁকা ড্রয়িংরুমে চারপাশে। দৃঢ় কন্ঠে বললো আরিফকে….
—” রিক্তা নিজের রুমে হবে ভাই। আর বাকি মনে হয় কিচেন রুমে হ…..
জুঁই কন্ঠেস্বর থামলো। থামে নয় থামতে হলো মালার উচ্চ স্বরে চিৎকার। আকস্মিক ভাবে মালা কিচেন থেকে বের হতেই চোখে পড়লো জুঁইকে। মালা আরিফকে না চিনলেও জুঁইকে বেশ ভালোভাবেই চিনে সে। গতবার জুঁই খান বাড়িতে বেড়াতে আসায় বেশ সক্ষতার ভাব জমে ছিল জুঁইয়ের সাথে মালার। যার সূত্রে ধরে এই মূহুর্তে মালা জুঁইকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনায় গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো মায়াকে। জোরে জোরে চিল্লিয়ে মায়াকে বলতে লাগলো….
—” ছোটো আফামনি গো.. দেইখা যান কেডা আইছে। জুঁই আফামনি আইছেন। তাড়াতাড়ি আয়েন গো আফা….
বিষন্নতার থমথমে খেয়ে গেলো আরিফ। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলো মালার কর্ম কান্ডের দিকে…
~~
থমথমে পরিবেশ। খান বাড়ির সাদা সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছে আরিফ। আর তাকে ঝাপটে ধরে বসে আছে গোটানো অবস্থা মায়া। দীর্ঘ টান পোড়ার আটমাস পর ভাই বোনের ফিরতি দেখা। আবেগি বোন ভাইয়ের কমড় দু’হাতে ঝাপটে ধরে বুকে মাথা রেখে সোফার উপর পা ভাঁজ করে বসে আছে। মায়া প্রথমে আরিফকে দেখে আদুরে উৎফুল্ল হয়ে কান্না বিসর্জন করলেও এখন আদুরে সহিত ল্যাপ্টে আছে ভাইয়ের প্রশস্তর বুকে। কান্না থেমে গেছে। দীর্ঘ সময় নিয়ে আরিফ থেকে থেকে মায়ার মাথায় আদুরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। মায়া মৃদু নাক টানছে অনেকটা কান্না কারণে। জুঁই আরিফের অন্যপাশটায় ঘাপটি মেরে বসা। দু’জনকে দুপাশে নিয়ে মধ্যবর্তীস্থানে আরিফের অবস্থান। ঠিক তার সামনে হেনা খান হাসি মুখে বসে আছে। উনার মুখোভাব গম্ভীর না থাকলেও খানিকটা অস্বাভাবিক জড়তা কাজ করছে আরিফের সাথে কথা বলতে উনার। তারও অবশ্য নিদিষ্ট কারণ আছে। কারণটা অহেতুক নয়। যুক্তি সংগত কারণ মায়াকে ঘিরেই। হেনা খান গোল গোল চোখে আরও একবার তিন ভাই বোনকে পরখ করে নিলেন অতি সন্তপর্ণে। মুখে টানটান হাসি রেখে আরিফকে উদ্দেশ্য করে স্নিগ্ধ ভেজা কন্ঠে মুখ খুললেন তিনি আগে…
—” শফিক আসলো না যে আরিফ? তোমাদের সাথে শফিককে নিয়ে আসলে না কেন দাদুভাই??
গম্ভীর মুখে চোখ তুলে তাকালো আরিফ হেনা খানের দিকে। অতি সুন্দর সেই মুখখানা হেনা খানের। বাড়ন্ত বয়সের সাথে গালের চামড়া বয়সের কারণে ঝুলে গেলেও চেহারা গঠন ও সৌন্দর্যতা বলছে তিনি কিশোরী বয়সে কতটা আবেদনময়ী সুন্দরী রুমনী ছিলেন। শেষ বয়সে এসেও যেন তা প্রকাশ পাচ্ছে ক্ষীণে ক্ষীণে। আরিফ গোপনে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো। নিজের সংযম শান্ত করলো। হেনা খানের কথার প্রতিত্তুরে শান্ত কন্ঠে বললো…
—” বাবার শরীরটা তেমন একটা ভালো যাচ্ছে না। তাই আমাকে আসতে হয়েছে জুঁইকে নিয়ে।
তৎক্ষনাৎ স্বর্ণাভে বলে উঠলো হেনা খান…
—” সেকি! কি হয়েছে শফিকের? সিরিয়াস কিছু নয়তো? এখন কেমন আছে তোমার বাবা?
—” জ্বিই আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে বাবা। তেমন কিছু হয়নি তবে লং জার্নি করতে হার্টের সমস্যা হয় উনার। তাই উনি আসতে পারিনি।
স্বস্তির নিঃশ্বাস বললো হেনা খান…
—” যাক আলহামদুলিল্লাহ তোমার বাবা ভলো আছে। কিছু হয়নি তাতেই অনেক। কিন্তু তুমি এসেছো যে এতে কিন্তু আমি দ্বিগুণ খুশি হয়েছি। লাস্ট তোমাকে দেখেছিলাম দুই-আড়াই বছর আগে। তাও মায়াকে খান বাড়িতে নিয়ে আসার সময়। তখন যদিও তুমি নারাজ ছিলে আমাদের উপর। কিন্তু অবশেষে তুমি মনমালিন্যতা পাশে রেখে ছোট বোন দেখতে এসেছো সেটাই অনেক আমাদের জন্য। এখন তুমি থাকবে তো আমাদের সাথে কিছুদিন দাদুভাই??
হেনা খানের কথায় আরও গম্ভীর হলো আরিফ। খান বাড়ির সাথে ঘটে যাওয়া অতীতের তিক্ত ঘটনা গুলো পুনরায় মাথা নাড়িয়ে উঠতেই বিষিয়ে গেলো আরিফের মন। তিক্ত দহনে আবারও বুক ভারি হলো তার। চুপ থাকলে। বিশৃংখলা করলো না। মায়ার মাথায় ছোট করে চুমু খেয়ে শান্ত স্বরে বললো…
—” না দাদামা থাকতে পারবো না! চট্টগ্রাম থেকে কাল রাতে এসেছিলাম জুঁইকে ঢাকা পৌছানোর জন্য। আজ আবার রাতের ট্রেনে চলে যাব। নিজের ব্যস্তায় রিতুর সাথেও দেখা হয়নি আমার অনেকটা মাস। তাই ভাবলাম আমার বোন দুটোকে একসঙ্গে দেখে যায়।
আরিফের কথায় ভাইয়ের বুকের থেকে তৎক্ষনাৎ মাথা উঠালো মায়া। আরিফের মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্টে ভারাক্রান্ত কন্ঠে বললো…
—” তুমি আজও থাকবে না ভাইয়া আমার সাথে? আবারও চলে যাবে তুমি আমাকে ছেড়ে?
মায়ার কাতর কন্ঠে হালকা স্মিথ হাসলো আরিফ। মায়ার গাল টেনে আদুরে সহিত হাসি মুখে বললো…
—” তোকে ছেড়ে কই যাব বুড়ি? আমি আবার আসবো কয়েক দিন পর তোকে আর জুঁইকে নিয়ে যেতে বাড়িতে। তখন বেশি দিনের জন্য আসবো। বাড়িতে বাবা-মা সবাই সাথে একসঙ্গে কাটাবো কেমন? এখন জুঁইকে তোর পাশে রেখে যাচ্ছি আমি। তাহলে তুই একা কোথায় শুনি??
দুই চোখের পাতা আবারও টইটম্বুর হলো মায়ার। কান্না জড়িত গলায় বললো…
—” তুমি এখনই চলে যাবে ভাই??
—” হ্যাঁ।
ঠোঁট উল্টিয়ে কান্না করে পুনরায় আরিফকে ঝাপটে ধরলো মায়া। কান্না জড়িয়ে বললো…
—” আর একটু থাকো না ভাই!
মায়ার কথায় সহমত পোষণ করে পাশ থেকে তৎক্ষনাৎ বলে উঠে হেনা খান…
—” বোনের সাথে আজ রাতটা অন্তত থেকে যেতে পারো দাদুভাই।
আরিফের মনের বিষিয়ে যাওয়া সুপ্ত অনুভূতিটা ধারণ করেও হেনা খানের উদ্দেশ্য শান্ত থাকলো। মিহি কন্ঠে বললো হেনা খানকে আরিফ…
—” বোনকে নিয়ে থাকার হলে নিজের বাসায় থাকবো দাদীমা। অন্যের বিলাসিতায় দাড়কোঠায় ঘুম আসবে না আমার। নিশ্বাস আটকে আসে দাদী আপনাদের প্রতিপত্তিতে অতলে।
আরিফের কথার মানে বুঝলো হেনা খান। ভারি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে সুপ্ত মন খারাপের রেশ টেনে বললেন তিনি..
—” তুমি এখনো নারাজ আমাদের উপর দাদুভাই??
গম্ভীর মুখে উত্তর করলো আরিফ…
—” নারাজ হওয়াটা কি অযুক্তিকর বা অস্বাভাবিক কোনো কিছু দাদীমা?? আমার জায়গায় থাকলে আপনি কি করতেন?? নিশ্চয়ই অনেক কিছু করতেন। যেটা আমি ভাই হয়ে আজও করতে পারিনি বোনের জন্য।
—” তুমি ভুল বুঝছো আমাদের আরিফ। খান বাড়ির প্রতিটা সম্পর্ক খারাপ নয়। হয়তো পরিস্থিতিটা অন্য ধাঁচের ছিল। কিন্তু তাই বলে….
—” আম্মু! আয়ন ভাইয়া আজ রাতের ফ্লাইটে…
হেনা খান কথা বলতে বলতে থামলো মেহেরবান ও ফিহার হঠাৎ আগমনে। আর ফিহা কথা বলতে বলতে থামলো বেখেয়ালি চোখ পড়ায় আরিফকে দেখে। নিজের মায়ের পিছন পিছন মুঠোফোন দেখাতে দেখাতে খান বাড়ির সদ্য দরজা ধরে প্রবেশ করেছিল সে। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে সামনের মানুষটার সাথে হঠাৎই মুখ দর্শনে অপদস্তক হলো ফিহা। থমকে গেলো যেন জায়গায়। শিরদারা বয়ে গেলো চাপা শিহরণ।
থমথমে পরিবেশটা হঠাৎই নীরব উত্তেজিত হয়ে উঠলো চাপা কষ্টে দু-প্রান্তের দুটো মনের ভিতর। এতক্ষণ যাবত খুশিতে ঝলঝল করা ফিহা চোখ দুটোতে মূহুর্তেই তীব্র ভয়ার্ত চাপা আর্তনাদ ফুটে উঠলো। টইটম্বুর হলো দুচোখের পাতা। ভর্য়াত হাত দুটোতে কম্পন সৃষ্টি হলো তৎক্ষনাৎ। যার রেশ টেনে মূহুর্তে ছিটকে পড়লো ফিহার হাতে ধরে রাখা মুঠো ফোনটি ফ্লোরে। তীব্র শব্দ হলো। ফিহার হঠাৎ কান্ডে মনোযোগ নষ্টে বিরক্তি প্রকাশ করলো মেহেরবান। মেয়েকে রাগি চোখ রাঙ্গিয়ে পা বাড়ালো সামনের হেনা খানের দিকে। মায়ের পাশে বসতে বসতে মেহেরবান হেনা খানের উদ্দেশ্য বললো…
—” ওহ কি শফিক ভাইয়ে ছেলে মা??
—” হুম! আমাদের শফিকের বড় ছেলে। মায়া জুঁইয়ের বড়ভাই।
কারও কথাই যেন মস্তিষ্ক অবধি পৌছালো না আরিফের। রাগ, দুঃখ, কষ্টে পোষণ করে টায় তাকিয়ে রইলো ফিহার ভর্য়াত মুখশ্রীতে সে। আরিফের মুখ ভঙ্গি উপর উপর থেকে শক্ত থাকলেও ভিতর দিয়ে যেন শত টুকরোয় খন্ডিত হলো প্রিয়াসীর ছলনায়! বিশ্বাসঘাতকতায়। ভালোবাসাময় দুটো মন ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হলো ক্ষণিক ক্ষণেই। কিন্তু মন ভাঙচুর হওয়ার বিকট শব্দটা বিন্দু মাত্র শুনলো না কেউ। দুটো মানুষ চোখে প্রকাশ পেল দুই ধরনের যন্ত্রণা। ফিহার চোখের ভয়ার্ত আর্তনাদ ঝলঝল করলেও আরিফের চোখে প্রকাশ পেল প্রিয়াসীর বিশ্বাসঘাতকতার তীব্র ক্রুধ।
প্রিয়াসীর বিশ্বাসঘাতকতায় যেন বুকটা দগ্ধ দহনে আগুনে পুড়ে উঠলো মূহুর্তেই আরিফের। চোখের কার্নিশ লাল হতে শুরু করলো। নিজেকে সংযম করতে সে তৎক্ষনাৎ নিজের মাথা ঝুকিয়ে নিল। দৃষ্টি স্থির করলো ফ্লোরে দিকে। আরিফের হঠাৎ নত মস্তিষ্কের কারণটা অতি সন্তপর্ণে ধরে নিল ফিহা। ভালোবাসার মানুষটির মনের ঘটে যাওয়া ঝোড়ো তান্ডবটা বুঝতে পেরে মূহুর্তেই চোখের পাতা টইটম্বুর হলো ফিহার। চোখের পানি টপ করে গাল গড়িয়ে পড়তেই দ্রুত হাতে মুছে নিল ফিহা কেউ দেখার আগেই। কিন্তু বেশিক্ষণ নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলো না সে আরিফের নত মস্তিষ্কে ঝুকে বসে থাকা দেখে। বুক কেঁপে উঠলো ভালোবাসার মানুষটির বেগিতক মনের অবস্থাটা বুঝতেই। নিজের ঠোঁট কামড়িয়ে কান্না আটকানো বৃথা চেষ্টা করলো ফিহা। কিন্তু অবশেষে সফল হতে পারবে না ভেবে তৎক্ষনাৎ পিছনে ঘুরে চলে যেতে চাইলো ড্রয়িংরুম থেকে। কিন্তু তার আগেই পিছন ডাকলো মেহেরবান….
—” ফিহা কোথায় যাচ্ছো তুমি? এদিকে আসো…
পিছন ঘুরলো না ফিহা। বরং সামনের দিকে তাকিয়ে কোনো রকম কান্না আটকিয়ে বললো মেহেরবানের উদ্দেশ্য….
—” বাহিরে যাচ্ছি আম্মু। গাড়ি মধ্যে আমি একটা পার্সেল ফেলে এসেছি। সেটা নিয়েই চলে আসব।
আর দাঁড়ালো না ফিহা। যথাসম্ভব দ্রুত হাতে ফ্লোর থেকে নিজের ফোনটি তুলে নিয়ে প্রস্হান করলো সেখান থেকে। ফিহা যেতেই তিক্ততা উঠে দাড়ালো আরিফ মায়াকে নিয়ে। নিজের চাপা কষ্ট গুলো সংযম করে মুখ ভরতি হাসি টানলো কৌশলে। জুঁই ও মায়ার মাথায় আদুরে দুহাত রেখে বুলিয়ে বলে…
—” সাবধানে থাকিস তোরা। জুঁইকে তোর কাছে রেখে যাচ্ছি রিতু। জুঁইয়ের খেয়াল রাখবি। সাথে এই বাড়ির সম্পর্কের বেড়া জালে যেন জুঁই না আটকায় সেটাও খেয়াল রাখবি ভাইয়ের হয়ে কেমন? আমি আবার আসব তোদের নিতে কিছুদিনের মধ্যেই। ভালো থাকবি কেমন।
আরিফের হঠাৎ ইঙ্গিত স্বরুপ কথার মানে বুঝলো না কেউ। তবে মায়া টলমল চোখে ভাইকে ঝাপটে ধরা অবস্থায় সম্মতি জানালো মূহুর্তেই। আরিফ ভারি নিশ্বাস ফেলো। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তার খান বাড়ির ত্রিকোঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে। নিশ্বাস আটকে আসছে। তাই সভ্য সুলভ বিদায় নিল সবাইর থেকে দ্রুত। শক্ত মনোভাব নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো খান বাড়ির চৌকাঠ মাড়িয়ে। ধুপধাপ পা ফেলে খান বাড়ির গেইটের সামনে এগিয়ে যেতেই হঠাৎই কেউ একজন আরিফকে পিছন থেকে দু’হাতে ঝাপটে ধরে পিঠে মাথা ঠেকিয়ে হু হু শব্দ কেঁদে উঠে বলতে লাগলো….
—” আই এম সরি আরিফ। আই এমন সরি। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমার জন্য তুমি এতটা কষ্ট পাচ্ছো। আমি বুঝতে পারেনি প্লিজ আমাকে ক্ষমা করো। প্লিজ!
আরিফ নড়লো না বিন্দুমাত্র টায় জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো শক্ত হয়ে। এই কন্ঠ! এই নারী! এই ছুঁয়া। বহু পরিচিত তাঁর। দীর্ঘ তিনটা বছরের সহযত্নে লালন করা ভালোবাসার মানুষটির তাঁর। যাকে ছাড়া সে প্রাণহীন মেরুদণ্ড মতো আজ সেই ভালোবাসার মানুষটি হঠাৎ করেই চির অচেনা হয়ে গেলো মূহুর্তেই। দীর্ঘ তিনটা বছরের ভালোবাসায় বিশ্বাসঘাতকতা করলো। তার সত্যিকারের ভালোবাসাটা মিথ্যা বানিয়ে দিল। কেন তার ভালোবাসাটাকে এই ভাবে মিথ্যা করে দিল প্রেয়াসীনি? কেন তার এতো বার বলার পরও, একটা বার তাকে জানানোর প্রয়োজন হলো না, যে তার ভালোবাসা মানুষটি এই খান বাড়িরই আত্মীয়ধর হয়। কেন দিনের পর দিন তাকে মিথ্যা বলে গেলো এই বলে যে, সে খান বাড়ির কেউ হয়না। কেন এতটা ছলনা করলো তার পবিত্র ভালোবাসা নিয়ে। ভাগ্য তার সহায়! সে আজ প্রিয়াসীর সত্যিটা জানতে পারলো মনের অজান্তেই। ভালোবাসার মানুষকে সারপ্রাইজ করতে গিয়ে সে নিজেই সারপ্রাইজ হলো প্রিয়াসীর ছলনায়। হয়তো সে এখানে না আসলে আজও জানতে পারতো না তার ভালোবাসার মানুষটির বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি। আরিফ ক্ষুব্ধ হলো। চোখের কার্নিশ গুলোতে লাল আভা ঝলঝল করে উঠলো মনের ক্রুধিত রাগে। কিন্তু তারপরও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলো সে। দু-হাত মুষ্টি বদ্ধ করে উপরের দিকে তাকিয়ে পরপর বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানলো। নিজের প্রশস্ত বুকের বাঁধন হতে ফিহার হাত দুটো জোর পূবক ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললো….
—” ভাগ্য আমার! তোমার মিথ্যার অতলে হারিয়ে গেল আমার সত্যিকারের ভালোবাসাটা ফিহু। আমি কাকে দোষ দিব? কাকে বললো আমাকে ক্ষমা করে দাও। ভুল হয়ে গেছে আমার। বুঝতে পারিনি। কে আমার বিশ্বাস ভালোবাসা পুনরায় ফিরিয়ে দিবে ফিহু? আমি তো শুধু তোমার ভালোবেসে ছিলাম। তোমাকে চেয়েছিলাম নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসাবে ফিহু। তাহলে তুমি কেন আমার সত্যিকারের ভালোবাসায় মিথ্যার কলঙ্কের দাগ লাগালে? আমার ভালোবাসা কি এতোই অমূল্যহীন ছিল তোমার কাছে? যে সামান্য সত্যিটুকু বলা প্রয়োজন মনে হলো না তোমার।
জোরপূর্বক নিজের থেকে ছাড়িয়ে ফিহাকে টেনে নিজের সামনে দাঁড় করায় আরিফ। কিন্তু তাও বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলো না ফিহাকে সে। কারণ ফিহা আবারও দু’হাতে ঝাপটা ধরে আরিফের বুকে মুখ গজিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো…
—” আই এমন সরি! আই এমন সরি আরিফ। তুমি আমাকে যাহ শাস্তি দিবে তাই মেনে নিব আমি
তারপর আমাকে ছেড়ে যেওনা তুমি। প্লিজ প্লিজ আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। তুমি আমার ভালোবাসা মিথ্যা বলো না। আমি মরে যাব তুমিহীনা। আমি তোমাকে মিথ্যা বলতে চাইনি। কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম তোমার ভালোবাসায়। তোমাকে হারাতে চাই না বলেই আমি তোমাকে প্রতিবার মিথ্যা বলেছিলাম যে আমি খান বাড়ির কেউ হয়না। আমি খান বাড়ির কাউকে চিনি না। আমার সাথে খান বাড়ির কোনো সম্পর্ক নেই। সত্যিটা বললে আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলতাম আরিফ। তোমাকে ছাড়া, তোমার ভালোবাসা ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না বলেই মিথ্যা পথ অবলম্বন করেছিলাম এতোদিন। এখন তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে আমি নিঃস্ব হয়ে যাব তুমিহীনা। প্লিজ এতোটা স্বার্থপর হওনা তুমি। আমাকে ক্ষমা না করো তারপরও আমাকে ছেড়ে যেওনা। প্লিজ আরিফ আমি মরে যাব।
ফিহাকে নিজের অশান্ত বুক থেকে সরানো চেষ্টা করলো না আরিফ। অস্থির মনে দুহাত রাখলো কমড়ে। আকাশের দিকে তাকিয়ে পরপর কয়েকবার বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস টানলো সে। আজ দীর্ঘ তিনটা বছরের সম্পর্ক তার ফিহার সাথে। মায়াকে খান বাড়িতে নিয়ে আসার ছয়মাস পূর্ব থেকে তাদের বন্ধুত্ব। তখন ফিহার অবস্থান লন্ডনে। তাদের দু’জনের দীর্ঘ আটমাসের বন্ধুত্বের সম্পর্কে গভীর ভালোবাসা রুপ নিল আরও দুই বছর পাঁচ মাস আগে। সবমিলিয়ে তিন বছর একমাসের পূব পরিচিত তারা। ফিহা চঞ্চল কিশোরীনি ছিল। তারপরও আরিফ অতি সন্তপর্ণে ফিহাকে নিজের মাঝে সামলে নিল। ডুবে যেতে লাগলো একে অপরের ভালোবাসায়। ফিহা বাংলাদেশে আসার পর থেকেই তাদের সময়ে অসময়ে, কারণে অকারণে একে অপরের দেখা সাক্ষাৎ বাড়লো। ভালোবাসার গভীরতাটা বাড়লো। হয় ফিহা চট্টগ্রাম গিয়ে ঘুরে আসতো আরিফের সাথে দেখা করতে, নয়তো আরিফ সময়ে অসময়ে ঢাকা এসে হাজির হতো ফিহার সাথে দেখার করতে। ভালোই চলছিল তাদের ভালোবাসাময় দিন গুলো। কিন্তু ফিহা রিলেশনের পাঁচ মাসের মাথায় হঠাৎ একদিন জানতে পারলো আরিফ থেকে যে মায়া তার আপন ছোট বোন হয়। সেই সাথে জানতে পারলো আরও একটি চরম সত্য। আরিফ খান বাড়ির কাউকে পছন্দ করে না। সেদিন আরিফ ফিহাকে আরও জানিয়ে ছিল নিজের বিষিয়ে যাওয়া মনে বক্তব্যটি। জীবনের কখনো কোনো পরিস্থিতিতে খান বাড়ির সাথে সম্পর্কে মাড়াবে না সে। এবং অপেক্ষায় আছে কখন সে নিজের বোনকেও খান বাড়ির চারদেয়াল থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে সে আশায়।
—” মিথ্যা দিয়ে শুরু সম্পর্ক গুলো দীর্ঘ স্হানীয় হয়না ফিহু। তাই আমাদেরটাও ঠিকলো না। তোমার মিথ্যা দাবিতে আমার সত্যিকারে ভালোবাসাটা আজ ইতি ঘটলো ফিহু। তুমি শুনতে পারছো আমার বুক ফাঁটা আর্তনাদটা? আমার কষ্ট হচ্ছে ফিহু ভিষণ কষ্ট হচ্ছে।
চলিত….
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩১
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৮ প্রথমাংশ
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২১
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৪
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩২
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৩
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৪