Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৬


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

৩৬
রাত ১ঃ৪৫। তুমুল শব্দ করে হেলিকপ্টারের পাখার রাউন্ড রাউন্ড ঘুরে নামলো খান বাড়ির উম্মত বাগানে। পাখার তীব্র বাতাসে বাগানের ছোট থেকে বড় গাছের ডাল-পাতা নুইয়ে নুইয়ে পড়ছে একে অপরের সাথে। হেলিকপ্টারের তীব্র গমগম শব্দে আরাফ খান ব্যস্ত ভঙ্গিতে খান বাড়ির ড্রয়িংরুমের মেইন দরজা খুলে
দৌড়ে ছুটে যান সেদিকটায়। অনেকটা উত্তেজনায় উত্তাপ তিনি। কারণ হঠাৎ করে মায়া নিখোঁজ হওয়াটা নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু আসিফ একবেলা পর উনাকে ফোন করে জানিয়েছিল মায়া রিদের সাথে আছে। এতে তিনি শান্ত হয়নি বরং প্রচন্ড হাসফাস করছিল মনে জাগ্রত হওয়া বেশ কিছু প্রশ্ন নিয়ে। তিনি অপেক্ষা করলেন রিদের ফিরে না আসা পযন্ত। কিন্তু সারাদিন ছুটো গেল রাতটাও অর্ধেক পার হলো। রিদ মায়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে না দেখে উত্তেজিত হলেন আরাফ খান ও হেনা খান দুজনই। চিন্তিত হেনা খানকে অনেক কষ্টে তিনি ঘুমের ঔষধ দিয়ে নিগার ঘুম পাড়িয়েছেন কিছুক্ষণ হলো। তারপর থেকে তিনি একা রাত্রি যাপন করে জাগ্রত অবস্থা বসে রইলেন রিদ মায়ার অপেক্ষায়। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তিনি চিন্তিত ভঙ্গিতে ড্রয়িংরুমে বসারত অবস্থায় থাকার মধ্যে দিয়েই কানে বাজলো হেলিকপ্টারের তীব্র শব্দের টহল। ছুটে যান তিনি সেদিকে। চোখে পড়লো রিদ মায়ার দুজনের বিধস্ত ক্লান্তিমাখা চেহারা। রিদ ঘুমন্ত মায়াকে কোলে নিয়ে বের হচ্ছে উড়ন্ত যান্ত্রিক থেকে। উত্তেজনায় তিনি সেদিকটায় দৌড়ে যেতেই পরপর আরও বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার শব্দের টহল করে নামতে লাগলো খান বাড়ির বাগানে। একে একে সকল বডিগার্ডরা জড়ো হতে লাগলো। আরাফ খান হতভম্ব হলো এতটা উত্তেজিত পরিবেশ দেখে। ষষ্ঠইন্দ্রিয় জাগ্রত হলো নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছিল রিদ-মায়ার সাথে। তিনি এগিয়ে যেতেই রিদ ধুপধাপ পা ফেলে মায়াকে কোলে নিয়ে এগিয়ে আসে খান বাড়ির ভিতর প্রবেশ করার উদ্দেশ্য। কিন্তু পথমধ্যেই আরাফ খানের উত্তেজিত কন্ঠে খানিকটা থামতে হয় রিদকে। রিদ কপাল কুঁচকে আরাফ খানের দিকে তাকাতেই তিনি উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলো…

—” কি হয়েছে মায়ার? অজ্ঞান হলো কিভাবে? কোথায় ছিলি তোরা এতক্ষণ??

রিদ কিছু বললো না। তবে দৃষ্টি স্বাভাবিক করে পুনরায় হাঁটা ধরে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করার জন্য। রিদের কিছু না বলাই উদ্ধিগ্ন হন আরাফ খান। নিজের উত্তেজনায় রিদের সঙ্গ ধরে হাঁটতে হাঁটতে পুনরায় প্রশ্ন করে বললো…

—” আরে কি হয়েছে বলবি তো নাকি। টেনশনে মরে যাচ্ছি সেই সন্ধ্যা থেকেই। অথচ তোদের একটা খোঁজ পযন্ত পাচ্ছিলাম না। তোর দাদীর কান্না কাটি করতে করতে শেষ। অনেক কষ্ট ঘুম পাড়িয়ে এসেছি। এখন আবার তুই বলছিস না কি হয়েছিল, তোরা সন্ধ্যা থেকে এতক্ষণ কোথায় ছিলিস। আর তোদের এই নাজেহাল অবস্থা কেন? মায়ার গায়ে এতো কাঁদামাটি কেন?? কোথায় ছিলিস তোরা এতক্ষণ??

আরাফ খানের পরপর প্রশ্নের একটা উত্তরও করলো না রিদ। অন্তত গম্ভীর মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। এমন একটা ভাব যেন এই মূহুর্তে রিদ ছাড়া অন্য কেউ আসেপাশে নেই। কারও কথাই রিদের কান অবধি যাচ্ছে না। আরাফ খান রিদের বেপরোয়া ভঙ্গি দেখে তেতে উঠলেন মূহুর্তেই। রিদ হাত ধরে আটকিয়ে রাগি স্বরে বলে উঠেন রিদকে…

—” তোকে কিছু জিগ্যেসা করলে কখনো ঠিকঠাক উত্তর দিসনা কেন তুই?? মানুষ মনে হয়না তোর আমাদের? আমরা যে বয়স্ক মানুষ গুলো রাত জেগে তোর চিন্তায় চিন্তায় আহার ছেড়ে বসে থাকি। সেটা কি তোর কখনোই চোখ না রিদ।

আরাফ খানের রাগী স্বরের কথায় গম্ভীর থাকলো রিদ। কোনো রকম প্রতিক্রয়া জানালো না নিজের দাদাজানকে। অশান্ত মনে শুধু গম্ভীর শান্ত থাকলো। ঠান্ডা কন্ঠে বললো….

—” তোমার সোনামা বেহুশ না ঘুমিয়ে আছে আমার কোলে। দ্বিতীয়ত্ব সন্ধ্যায় ব্যস্ত ছিলাম তাই তোমাদের সাথে আমার কন্টাক্ট করা হয়নি। তৃতীয়ত্ব তোমার সোনামা নিজের পাগলামি জন্য এই অবস্থা হয়েছে তার। এখন সুস্থ আছে। ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।

—” পাগলামি করেছে মানে? ওহ তোর সাথে গেল কিভাবে??

—” আমি নিয়ে গেছিলাম তাই।

চমকে উঠে আরাফ খান রিদের সোজাসাপ্টা উত্তরে। নিজের মনে সন্দেহ পূর্ণতা নিয়ে পুনশ্চ প্রশ্ন করে বললো….

—” তুই কি মায়াকে পছন্দ করিস রিদ??

শান্ত কন্ঠে সোজাসাপ্টা উত্তর করলো রিদ…

—” নাহ!

—” তাহলে ওহ তোর কোলে কেন?? তুই তো কাউকে তোর আশেপাশে ভিড়তে দিসনা? কিন্তু আমি দেখেছি তুই মায়ার বেলায় চুপ করে সব মেনে নিস কেন?? তুই তো চুপ থাকার ছেলে না??

উত্তর করলো না রিদ। বরং বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে জায়গায় ছাড়লো মায়াকে নিয়ে। আরাফ খান রিদের যাওয়ার দিকে সন্দেহ পূর্ণতা নিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। আরাফ খানের বয়স্ক অভিজ্ঞতা ষষ্ঠইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে যে রিদ মায়ার মধ্যেকার ভিতর একটা সম্পর্ক রয়েছে। শুধু সম্পর্কে না হয়তো তার থেকে আরও বেশি কিছু। তবে সেটা কি? রিদ কি মায়াকে পছন্দ করতে শুরু করেছে নাকি পছন্দ করার থেকে বিষয়টি আরও দূরে এগিয়ে গেছে?? আরাফ চিন্তিত হলেন রিদের বেগতিক মনের অবস্থাটা ঠিকঠাক ধরতে না পেরে। সাথে এতটাও বুঝতে পারলেন রিদের এই বেগিতক মনের জন্য, খান বাড়ির সম্পর্কের মধ্যে বিশাল বড় ফাটল ধরবে। কারণ রিদ যদি মায়াকে পছন্দ করে থাকে তাহলে আয়ন কি তার ভালোবাসার মানুষকে এতো সহজে ছেড়ে দিবে রিদের জন্য? তাছাড়া আয়নের মায়ার প্রতি ভালোবাসা, যত্ন, নীরব পাগলামো সবটাই সাক্ষী হলো তারা বড়রাই। তাঁরাই তো আয়নকে বলেছিল মায়াকে বিয়ে করতে! এখন তাঁরাই বা কিভাবে বলবে মায়াকে ভুলে যেত? এটা আয়নের সাথে অন্যায় করা হবে। রিদ ও আয়ন দুজনই সমান তাদের জন্য। তাহলে এক ভাইয়ের জন্য অন্য ভাইকে কিভাবে কষ্ট দিবেন তাঁরা?? আর রিদ?? সে যে ধাঁচের মানুষ, মায়ার জন্য শুধু ভালো লাগা বা অল্প ফিলিংস নিয়ে সে কখনোই কিছু করবে না? কারণ রিদ নিজের ফিলিংস কন্ট্রোল করতে জানি। কিন্তু যদি কোনো কারণে মায়ার জন্য রিদের মনের অনূভুতি গুলো গাঢ় হয় আর নিজেকে সংযম করতে না পারে? তাহলে সে কাউকে চুল পরিমাণ ছাড় দিবে না। বরং ঝড় উঠবে খান বাড়ির প্রতিটা সম্পর্কের মধ্যে। আরাফ ভয়ার্ত হলেন খান বাড়ির ভবিষ্যতে সম্পর্ক ফাটল ধরবে সেই চিন্তায়।

~~
রাত ২ঃ৫৬। নিস্তব্ধ নিস্ক্রিয় অন্ধকারময় পরিবেশ। বিশাল আকাশটা আজ ফাঁকা। কোথাও চাঁদের খোঁজ নেই। আমাবস্যা কালো ঘুটঘুটে আঁধারের রাত। তবে চারপাশে শীতল ঠান্ডা টিরটির হওয়া বহমান। মন প্রাণ জুড়িয়ে যাওয়ার মতোন। কিন্তু রিদের অশান্ত মন প্রাণ শান্ত করতে পারলো না সেই শীতল হওয়া। রিদ অশান্ত মনে শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে বিশাল আকাশের দিকে। চারপাশের শীতল হওয়া নয় বরং চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন রিদকে ঘিরে নিলো নিজের মাঝে। রিদ নিজের রুমের খোলা বারান্দায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে। টাউজার পকেটে দুহাত গজিয়ে প্রসন্ন মনে তাকিয়ে আছে এক বিশাল আকাশের দিকে। আজ সে বড্ড অশান্ত। মনে বারবার উঁকি দিচ্ছে আজকের দিনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা গুলোর। মায়ার প্রকাশ্য মনের পাগলামো কথা গুলো। রিদ বুঝতে পারছে মায়া তাকে ভালোবাসে। কারণ আজ অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই প্রকাশ করলো মায়া নিজের মনে কথা গুলো রিদকে। আর যেটা রিদ সহজে ভাবে মেনে নিতে পারছে না বরং অশান্ত হচ্ছে এই ভেবে যে কেন তাঁকে মায়া ভালোবাসবে। সেতো ভালোবাসা নামক কিছুই করেনি মায়ার সাথে তাহলে কেন মেয়েটি তাঁকে ভালোবাসবে? ভালোবাসা কি এতোই সহজ যে বললেই হয়ে যায়? কই সে তো কাউকে ভালোবাসে না? বউ নামক রিতকে ভালোবাসে না সে? শুধু একটুখানি ভালো লাগে আর সেই ভালো লাগাটা কাটানোর জন্যই সে বিয়ে করেছিল যাতে বউয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে পারে। এমনটা নয় যে সে মায়ার সাথে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কে করতে পারতো না। হ্যাঁ সে পারতো! ভেবেছিল এই বিষয়টা নিয়ে। কিন্তু বেহায়া মন মেয়েটিকে কলঙ্কিত করতে নারাজ ছিল বলেই সে বাধ্য হয়ে বিয়ে করছে পবিত্র ভাবে ছুঁয়ার জন্য! নিজের মহো কাটানোর জন্য! নিজের মন ভরে গেলে সে মেয়েটিকে মুক্ত করে দিতো প্রাপ্ত দেনমোহর দিয়ে যা মেয়েটি সারাজীবন বসে বসে খেলেও কমতো না। সুখে থাকতো! তার মতো গ্যাংস্টার জীবনের প্রেম, ভালোবাসা একটা গল্পের কাহিনির মতো। যেটা শুনতে ভালো লাগে কিন্তু বাস্তবিক জীবনে বয়তে পীড়াদায়ক! এমনটা নয় যে সে মহৎ উত্তম চরিত্রে পুরুষ হওয়ার কথা চিন্তা করে কোনো মেয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে চাইনি। চেয়েছিল বহুবার! চেষ্টা ও করেছিল! কিন্তু কোনো বারই সফল হতে পারেনি। বরাবরই বিফল হয়েছিল। প্রথমত্ব কোনো নারীর প্রতি তার বউয়ের মতোন টান অনুভব করেনি। হয়তো পুরুষত্ব চাহিদা পুরণ জন্য কোনো মেয়েকে নিজের কাছে টানতে চাইলেও টানতে পারতো না সে, তাঁর মায়ের কথার জন্য। তার মা বলতো, সময়,কাল, স্থান, অবস্থান, যেটা যেই রুপ নিক না কেন? তুমি ছেলে হয়ে কখনো কোনো সময় মেয়ে জাতীর ইজ্জত নিয়ে খেলা করবে না, অসম্মান করবে না বিন্দুমাত্র? ইজ্জত সম্মান দিয়ে হলে একজনকে মনে রাখবে নয়তো অসম্মান করলে কাউকে রাখার দরকার নেই। তারপরও নারী জাতিকে অসম্মান করা যাবে না। আর এই একটা কথায় রিদ বারবার আঁটকে যায়। চাইলেও সে পর নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে পারতো না বরং মনে মধ্যে শুধু তিক্ততা কাজ করতো মেয়েদের নিয়ে। যার ফলে তার এই দীর্ঘ সাতাইশ-আটাইশ বছর বয়সেও সে নারী ছুঁয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে।

কিন্তু মায়ার বেলায় উল্টো ছিল প্রথম দিন থেকে তার জীবনের। কখনো মায়ার প্রতি তিক্ততা কাজ করতো না বরং আর্কষণ কাজ করতো বিপুল তার মনে। একটু ছুঁয়ে দেওয়ার তীব্র চাহিদা জাগতো মনে। আর সেই জন্যই রিদ খানবাড়িতে জেদ করে ফিরত না বছরের পর বছর। কিন্তু দীর্ঘ দেড় বছর পর যখন সে বাড়ি ফিরলো তখন সেদিন রিদ প্রথম দেখেছিল মায়ার অশ্রু সিক্ত চোখে নিজের সর্বনাশ। বৃষ্টি দিনে কাদামাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া দুটো মানুষ নিজেদের সর্বনাশ দেখেছিল একে অপরের কাছে! রিদ বিষন্নে অবাক চোখে মায়াকে দেখা, সবটাই ছিল রিদের সর্বনাশ। সেদিন রিদ দেখেছিল মায়াকে। শুধু দেখেনি খুব কাছ থেকে পযবেক্ষণ করেছিল, বুঝতে পেরেছিল মায়া ছোট নেই বড় হয়ে গেছে! ভিষণ বড় হয়ে গেছে! তার রাতের ঘুম হারাম করার মতো বড় হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরও রিদ সেদিন নিজেকে যেচে ফিরে গিয়ে ছিল নিজের গন্তব্য। মায়াকে আর দেখতে চাই না বলে। তারপরও নিজের শেষ রক্ষা হলো না রিদের। মন ছটফটে রোগটা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করলো। মায়াকে একটা নজর দেখার বাসনা মনে সৃষ্টি হতে লাগলো তীব্র থেকে তীব্র। আর সেই থেকেই অসীম পাগলামো শুরু হলো তার। পুরো শহরকে সাবধান বাণী শুনালো মায়াকে নিয়ে। সবাই কাছে মায়াকে পরিচয় দিল ‘ভাবি’ নামে। অথযা কেউ মায়ার আশেপাশে ভিড়তে না পারে সেই দিকটায়ও কঠোর নজর দারিতে রাখলো সে। নীরবে মায়ার সকল আবদার পূরণ করতে লাগলো। মায়ার সেফটি বিষয়টি সে নিজেই দেখতো। তাই মন ব্যাকুলে ছটফট করে বিগত পাঁচ মাসের মাথায় আবারও ছুটে এসেছিল রিদ বাংলাদেশে মায়ার কাছে। কিন্তু সেদিন রিদ মায়াকে বিধস্ত অবস্থায় রাস্তায় দৌড়াতে দেখে তার পাষান্ড বুক তরতর কেঁপে কেঁপে বিদ্রোহ করে জানিয়ে ছিল “এই মেয়ের কিছু হলে আমিও তোমাকে ত্যাগ করবো গ্যাংস্টার মশাই”

সেদিনের পর থেকে মেয়েটার প্রতি তার দূর্বলতা আরও একটু গাঢ় হয়। কিন্তু দুইদিন থাকতে না থাকতেই রিদের মায়ার সাথে ভুল বুঝাবুঝি নিয়ে সে আবারও চলে যায় নিজ গন্তব্যে। ভেবেছিল আর ফিরবে না বাংলাদেশে কিন্তু সেখানেও শেষ রক্ষা হলো না তার। বউয়ের টানে অবিশ্বাস্য ভাবে একমাসের মাথায় আবারও ফিরে এলো সে বাংলাদেশে। এবং মেয়েটির প্রতি মায়া মহো কাটানোর জন্য শেষ পযন্ত বিয়েটাও করে নিল রিদ নিজের ক্যারেক্টার বিরুদ্ধে গিয়ে মেয়েটিকে। আর এখন সবকিছু ঠিকঠাক চলা কথা, কিন্তু এখান এসেও বিপত্তি ঘটলো কারণ শেষ পযন্ত শুনা গেলো তার বউ তাকে ভালোবাসে। যেটা নিত্যান্তই অনৈতিক কাজ বলে মনে হয় তার। সে তো চাইনি তাঁকে কেউ ভালোবাসুক। তাহলে তার বউ তাকে কেন ভালোবাসাবে? ভালোবাসা মানুষকে আশা দেখায় কিন্তু সে কখনো কাউকে আশা দিতে রাজি নয়। তার এক কথা, এখন বউ ভালো লাগছে তাই তার সাথে কিছুদিন সে থাকবে এই সম্পর্কে। কিন্তু যখন তিক্ততা চলে আসবে তখন রিদ বাধ্য হয়ে কোনো সম্পর্কে টিকিয়ে রাখতে ইচ্ছুক নয়। কিন্তু এই মেয়েটাকে কে বুঝাবে? যে রিদ ভালোবাসায় বিশ্বাসী নয়! পরস্পরের সাথে হওয়া চুক্তিতে বিশ্বাসী। সে চুক্তি করতে চেয়েছিল মেয়েটির সাথে কিন্তু মেয়েটি তাকে মন বদলে বসে আছে! এতে রিদ বড্ড বিরক্ত ও অশান্ত। নিজেকে সংযম করাটা কঠিন মনে হচ্ছে তার। রিদ অশান্ত ভঙ্গিতে কথা গুলো নিস্ক্রিয় মনে আওড়ালো একবার। মন মস্তিষ্ক দুটোই আজ অশান্ত কিছু ভালো লাগছে না তার। আর এই ভালো না লাগার কারণটায় হলো তার বউ। বউয়ের মনের সুপ্ত অনুভূতি গুলো বুঝতে পারাটায় রিদের অশান্তি মূল কারণ।

নিজের দৃষ্টি শূন্য ভাসমান রেখে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো নীরবে রিদ। মায়াকে নিজের রুমে শুইয়ে দিয়ে এসেছে, সে প্রায় এক ঘন্টার উপর হলো। সারাদিনের ক্লান্তিময় শরীরটা ঝেড়ে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে অরেঞ্জ কালার টিশার্ট পড়ে অ্যাশ কালারের টাউজার দিয়ে। শক্তপোক্ত সাদা বলিষ্ঠ দেহের যেন কামড়িয়ে ধরে আছে গায়ের টিশার্টটি। মাথার চুল গুলো হালকা হালকা স্যাঁতস্যাঁতে ভেজা ভেজা ভাব। কিন্তু রিদের সেদিকে কোনো মনোযোগ নেই। সেই ব্যস্ত তাঁর ভাবনাতে। তক্ষুনি কানে আসলো কারও পায়েলের মৃদু ঝনঝন শব্দ৷ রিদ চমকালো না। বরং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো নিজের পিছনে। হালকা আলোয় স্পষ্ট হলো মায়ার ফুলা ফুলা চোখ মুখ। রিদ মায়াকে এতো রাতে নিজের রুমে দেখে অবাক হলো না বিন্দুমাত্র। বরং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়ালো মায়ার সামনে। আবছা আলোয় মায়াকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে উপর থেকে নিচ অবধি পযবেক্ষণ করে বারান্দার কাঁচে সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালো সে। পকেটে দুহাত গজানো অবস্থায় শান্ত মিহি কন্ঠে মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললো…

—” এতো রাতে এখানে কেন এসেছো??

মায়া অসহায় চোখ তুলে তাকায় রিদের দিকে। সাথে সাথে চোখ মিললো দুজনের। মায়া ইতস্তত ভঙ্গিতে পুনরায় নিজের চোখ নামিয়ে নেয়। নিজের গায়ে পরিহিত কালো পাপড়ি গ্রাউনটি উত্তেজনায় মায়া শীতল হাতে চেপে ধরে তৎক্ষনাৎ। চঞ্চল চোখ দুটো অন্ধকারময় রুমে এদিক সেদিক করে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে জবাব দিলো…

—” আপনি তো বলেছেন আসতে?

রিদ বুঝলো না মায়ার কথার অর্থ। স্বাভাবিক অর্থে তার মনে পড়ছে না সে আসলে কখনো মায়াকে ডেকেছে নিজের রুমে আসার জন্য। সেতো মায়াকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছিল তাহলে? বাগানের ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় আলোকিত চারপাশ। সেই আলোয় স্পষ্ট হলো মায়ার ইতস্তত মুখশ্রী রিদের চোখে। রিদ কপাল কুঁচকা মায়ার উত্তরে। প্রশ্ন করে বলে…

—” কখন?
মিনমিন গলায় বললো মায়া…

—” চিঠিতে!

রিদ থামলো আর প্রশ্ন করলো না মায়াকে। কারণ সে বুঝে গেছে মায়া আসলে তাকে কি বলতে চাইছে। হ্যাঁ রিদ মায়াকে একটা পার্সেল পাঠিয়েছিল চিরকুট দিয়ে। পার্সেলটিতে ছিল কালো গ্রাউন। আর চিঠিতে লেখা ছিল ‘ গ্রাউনটি পড়ে তার রুমে আসতে’। কিন্তু এসব কিছু আজকে নয় বরং সকালে পাঠিয়ে ছিল রিদ মায়ার রুমে সার্ভেন্ড দিয়ে। হয়তো মায়া নিজের অসাবধানতায় কারণে দেখতে পাইনি। যখন দেখলো তখনই পড়ে হাজির হলো তার সামনে। রিদ পুনরায় আবছা আলোয় সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে মায়াকে পযবেক্ষণ করতে লাগলো। কালো গ্রাউনে অসম্ভব মোহিত লাগছে মায়াকে। এলোমেলো ভেজা চুল পিঠের উপর ছেড়ে দেওয়া। চোখে মুখে সারাদিনের ক্লান্তিতে ফুলা ফুলা ভাব। কিন্তু শুদ্ধতা হয়েছে মায়ার চেহারায় মসৃণ ত্বকের মধ্যে। সদ্য গোসল করে হয়তো এসেছে তার রুমে গ্রাউনটি পড়ে। যার ফলে দীর্ঘ লম্বা চুলের পানিতে গ্রাউন সহ তার ফ্লোর ও স্যাঁতস্যাঁতে ভিজা যাচ্ছে টপটপ পানিতে। রিদ অশান্ত মন পুনরায় ছটফট করলো। উত্তেজিত হলো হাত বাড়িয়ে মায়ার মসৃণ গাল হালকা স্পর্শ করার কিন্তু সে করলো না। বরং কঠোর হলো কিছু একটা ভেবে। কঠিন মনোভাবে বললো….

—” এতো রাতে এখানে আসায় কি হতে পারে তুমি জানো??

মায়া চুপ থাকলো উত্তর করলো না। ভয়ে নত মাথায় দাঁড়িয়ে রইলো রিদের সামনে। উত্তেজনায় টানটান হয়ে নিজের গ্রাউনের দুপাশ আঁকড়ে ধরলো শক্ত করে। রিদ মায়াকে উত্তর করতে না দেখে পুনরায় শক্ত গলায় বলে উঠে?

—” নিজের ফাস্ট নাইটের জন্য এসেছো এখানে??

তুমুল উত্তেজনায় চোখ বন্ধ করে নিল মায়া। কিন্তু মুখে একটা টু শব্দও করলো না রিদের সামনে। রিদ মায়াকে কথা বলতে না দেখে বিরক্ত বোধ করলো। মায়ার নিরবতাকে সম্মতি হিসাবে ধরে নিল। সেই সাথে রাগান্বিত হলো এই ভেবে যে তার বউ তার সাথে ছলনা করতে এসেছে এই রাতে। রিদের বাড়ন্ত রাগে বিরক্তি প্রকাশ করে বিরবির করে বলে…

—” ছলনাময়ী নারী! চুরি করে বিয়েটা করেছে এখন চুরি করে বাসরটাও সেরে ফেলতে চাই। সবার সামনে নিজেকে চিরকুমারী দাবি করতে চাই।৷ এতো সহজ সবকিছু? সে ছেড়ে দিবে এই মেয়েকে? কখনোই না। বরং এমন কিছু করবে যেন সারাজীবন এই মেয়েকে আফসোস করতে হয় তার সাথে ছলনা করার দায়ে।

রিদের বিরবির করা কথা গুলো মায়া শুনলো না। টায় পুনরায় জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। রিদ মায়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পুনশ্চ শক্ত গলায় বললো…

—” করবো না আমি বাসর। যাও তুমি।

মায়া নড়লো না। বরং অসহায় চোখ তুলে তাকালো রিদের দিকে। মায়া মনে করেছিল রিদ মায়াকে নিজের ফাস্ট নাইটের জন্যই ডেকেছিল নিজের রুমে। তাই সে রিদের অবাধ্য হতে চাই না বলেই এই মূহুর্তে উপস্থিত হওয়া তার সামনে। কিন্তু হঠাৎ করে রিদের মন পরিবর্তনের কারণটা বুঝলো না মায়া। তাই নিজের বোকামির জন্য রিনরিন কন্ঠে প্রশ্ন করে ফেললো রিদকে…

—” কেন?

রিদ যেন তেতে উঠলো। মায়াকে নিয়ে নিজের ভাবনাটা সত্যি মনে করলো। সত্যিই তার বউ তার সাথে ছলনা করতে এসেছে এই রাতে। নয়তো তার যে এত সুন্দর ফকফকা ঝকঝকা একটা স্বামী আছে। সেটা কেন সে সবার সামনে লুকায়িত করতে চাইছে? সবাইকে কেন বুঝাতে চাইছে সে আসলে চিরকুমারী? কিন্তু রিদ সেটা কিছুতেই হতে দিবে না। আর কেনই বা হতে দিবে। সেতো কোনো কুমারী মেয়ে নয়। তাহলে এত ছলনা কিসের তাঁর। রিদ কঠোর মনে সিদ্ধান্ত নিল। সে কিছুতেই এই ছলনাময়ী নারীকে জিদতে দেবে না আর। তাই বাসরও করবে না এখন। আর না কোনো কিছু লুকায়িত রাখবে কারও কাছ থেকে। এবার সে সারা শহরকে ঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানিয়ে শুনিয়ে বউ বলে দাবি করবে এই মেয়েকে, তারপর নাহয় বিশ্ব জয়ীর বাসর করবে সে। এই নারীকে পরাজয়ে করে জয়ী হাসিল করবে সে। সবাইকে জানাবে সে এই ছলনাময়ী নারী তার একমাত্র বউ। এই নারী কোনো কুমারী টুমারী মেয়ে-টেয়ে নয়। এই নারী বিবাহিত মহিলা। তার স্বামী আছে। রিদ খান নিজেই এই মহিলার স্বামী। তখন নিশ্চিয় এই ছলনাময়ী নারী তাঁর কাছে হেরে যাওয়া জন্য বুক ভাসিয়ে কেঁদে বেড়াবে সবার সামনে। চিরকুমারী পদবিটা সে নষ্ট করে দেওয়াতে। আহা! তখন সে বিশ্ব জয়ীর হাসি হাসবে। এই ছলনাময়ী নারীকে হারিয়েই বুক ফুলিয়ে বাসর করবে সে। দ্বিতীয়বারে মতো আবারও হারাবে সে এই নারীকে। রিদ নিজের চিন্তায় অটুল থেকে বললো…

—” আমার মন চাইছে তাই করবো না বাসর। তুমি বের হও আমার রুম থেকে।

জেদ্দি কন্ঠে বললো মায়া…

—” যাব না আমি।

বিরক্তি কপাল কুঁচকে এলো রিদের। তিক্ততা নিয়ে বললো…

—” কেন? এখানে কি আমি মিষ্টি বিলাচ্ছি যে খাওয়ার জন্য বসে থাকবেন আপনি??

রিদের উগ্র মেজাজে কথায় গাল ফুলালো মায়া। মিনমিন স্বরে বললো…

—” আমার ক্ষুদা লেগেছে।

—” তো৷ আমার কাছে কি?? যাও নিচে গিয়ে কাউকে বলো তোমাকে খাবার দিতে। নয়তো ফ্রিজ থেকে কিছু নিয়ে খাও তাহলেই তো হয়।

নিচের দিকে তাকিয়ে নত মস্তিষ্কে বললো মায়া…

—” আপনি চলুন আমার সাথে।

—” কোন দুঃখে শুনি?

মায়া অসহায় চোখ তুলে তাকায় রিদের দিকে। রিদের হঠাৎ মোড পরিবর্তনের কারণটা ধরতে পারছে না মায়ার ছোট মস্তিষ্ক। তাই আবছা আলোয় রিদের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো…

—” আপনি খাবেন না??

—” নিজের চরকায় তেল দিন। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না আপনার? যান! আপনি আপনার রুমে যান তাহলে হবে।

রিদের কথার অপমানিত চোখ দুটো টইটম্বুর হলো অভিমানী মায়ার। কন্ঠে আসলো কান্নার জড়তা। আর দাঁড়ালো না মায়া রিদের সামনে। গ্রাউনের দুপাশ আঁকড়ে ধরে সামনের দিকে পা বাড়াতেই আবারও পিছন ডাকলো রিদ।

—” দাঁড়াও!

মায়া নত মস্তিষ্কে রিদের সামনে ঘুরে দাঁড়ালো। নিজের টইটম্বুর চোখের জল টপ করে পড়লো গাল বেয়ে গ্রাউনের উপর। মায়া ঠোঁট কামড়িয়ে কান্না আটকানো চেষ্টা করলো। তারপর পারলো না। মৃদু কেঁপে কেঁপে উঠছে কান্নায় মায়ার শরীর। রিদ মায়াকে কান্না করতে দেখে বুক ফুলিয়ে বার কয়েক শ্বাস টানলো নিজের মাঝে। আপাতত সে নিজেই বিরক্ত, নিজের চিন্তা ভাবনার উপর। তার বউকে নিয়ে কখন কি মাথায় আসে সেটা সে নিজেই বুঝতে পারছে না বিগত মাস ধরে। সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যায় বউয়ের বেলায় ডিসিশন নিতে গিয়ে তার। এতে যেন রিদ প্রচন্ড বিরক্ত। তাই নিজের বিরক্তিটা আপাতত আর বাড়াতে চাই না। মায়া রিদের সামনে ঘুরে দাঁড়াতেই রিদ মায়াকে পুনরায় ডেকে আদেশ করলো…

—” আমার কাছে আসো।

মায়া ধীরপায়ে রিদের সম্মুখে দাঁড়ায়। তখনও মায়ার অশ্রু সিক্ত চোখ দুটো টইটম্বুর করছিল নোনাজলে। রিদ সেদিকে মনোযোগী হলো না। নিজের পকেটে গজিয়ে রাখা ডানহাতটা তুলে অতি সন্তপর্ণে মায়ার মাথায় রাখলো। মায়া খানিকটা কেঁপে উঠলো। রিদ নিজেকে শান্ত করে বলতে শুরু করলো….

—” যদিও আজ আমাদের জীবনের একটা বিশেষ রাত এটা। কিন্তু আপাতত তুমি বা এই রাত নিয়ে আমার মাথায় অন্য কোনো চিন্তা ভাবনাটা নেই। তবে তোমার সম্পর্কে আমার সকাল অবধি যে মনোভাবটা স্থির করে রেখেছিলাম আমি? এখন আর সেই মনোভাবটা নেই আমার। আমার মন এখন অন্য কিছু চাইছে তোমাকে ঘিরে। মনে হয় তোমাকে ছেড়ে দেওয়াটা বুঝি আমার আর সাধ্যে নেই। তাই বলছি, আগে আমাকে বুঝতে শিখ, তাহলে তোমার আমিময় জার্নিটা সহজ হবে। নয়তো আমার সাথে জীবনে চলার পথে সূচালোর তীক্ষ্ণ কাটার সম্মুখীন হতে হবে তোমাকে। হয়তো সেই কাটা গুলো আমিই তোমার জন্য তৈরি করবো। তার কারণ আমার অবাধ্য কিছু পছন্দ না। এখন তুমি নিজ থেকে খোঁজে বের করবে কোনটা আমার বাধ্য! আর কোনটা অবাধ্য। আমার বাধ্যকতায় তোমার সর্বত্র সুখের ঠিকানা। আমার আঙ্গিনায় তোমার শেষ ঠিকানা হতে হবে। তোমার সর্বত্রই আমি। আমি ছাড়া অন্য কারও দৃষ্টিও মেনে নিব না আমি। দ্বিতীয়ত্ব আমি আমার পরিবারের কাউকে নিজের পরিবার বলে মনে করি না, একসেপ্ট! আমার দাদা-দাদি ছাড়া। বাকিরা সবাই নামমাত্র আমার রিলেটিভ। আমি তাদেরকে নিজের জীবনে ভিড়ানো প্রয়োজন মনে করি না। এবার তারা থাকলে ভালো আর না থাকলে কিছু করার নেই আমার। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে তুমিও আমার ব্যক্তিগত সদস্যদের মধ্যে একজন। আর আমার এই মনে হওয়াটায় তোমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে ভবিষ্যতে। অনেক কিছু হারাতে হবে তোমার শুধু আমাকে ছাড়া। কারণ আমি একবার কাউকে নিজের মনে করলে মৃত্যুর আগ পযন্ত তাঁকে আমার কাছ থেকে কেউ মুক্ত করতে পারবে না স্বয়ং আল্লাহ তালা ছাড়া।

কথা গুলো বলতে বলতে রিদ থামে। চোখ আওড়িয়ে তাকায় নত মস্তিষ্কের ঝুকে থাকা মায়ার দিকে। শান্তশিষ্ট মায়াকে দেখে পরপর দু’বার মায়ার মাথার উপর আদুরে আশ্বস্তের হাত বুলাই রিদ। আবছা আলোয় মায়ার দিকে পূর্ণ দৃষ্টি স্থির করে রিদ পুনরায় শ্বাস ফেলে বলতে শুরু করে…

—” আমি একজন গ্যাংস্টার মানুষ, আমার নামে রোজ কোথাও না কোথাও গুন্দাগারদি, তান্ডব, ঝামেলা মারামারি হয়েই থাকে। এটা আমার পেশা। আমি সেচ্ছায় বেঁচে নিয়েছি এই ক্ষমতা আসন। তাই অহেতুক যুক্তি দেখিয়ে জীবনে কখনো আমাকে ভয় পাওয়া যাবে না। বলা যাবে না আপনি গ্যাংস্টার মানুষ! আপনি খারাপ, আমি আপনার সাথে থাকতে চাই না হেনতেন। এমন সব কথা বার্তা বলা যাবে না আমাকে জীবনে কখনো কোনো পরিস্থিতিতে। কারণ ছাড়াছাড়ি জিনিসটা আমার পছন্দ না। আমি ধরলে ছাড়তে জানি না। আমৃত্যু পযন্ত সম্পর্ক বয়তে জানি। কিন্তু যেদিন তুমি আমাকে এসব বলার সাহস করবে সেদিন আমার গুলির প্রথম বুলেটটায় হবে তোমার নামে। তোমার সবকিছু আজীবন মেনে নিব। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ছাড়া। যদি তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে চাও তো, আমি তোমাকে জানে মেরে দিতেও দ্বিধা করবো না। এখন তুমি আমাকে পাষাণ, সেলফিশ, স্বার্থপর বললেও আমার কিছু যায় আসে না। আমি সবসময় নিজেরটায় বুঝি সবাই জানে। কারণ আমি এমনই। আমার নিজের স্বার্থের জন্যই এখন তোমাকে আমার কাছে বেঁধে রাখতে চায়ছি, রাখবোও। এজন্য তোমাকে আমি কিছু সময় দিচ্ছি নিজেকে গোছাও। আর আমিও নাহয় সে-ফাঁকে বুঝে নেয়, আসলে আমার তোমার কাছ থেকে কি চায়? ততদিন সম্পর্কটা নামহীনই থাক। আমি সেটাকে আপাতত এগোতে চাচ্ছি না। আশা করছি তুমি বুঝতে পারছো আমার কথা গুলো??

মায়া কথা বললো না শুধু নীরবে অপদস্তক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। রিদের কথা পিষ্টে আসলে মায়ার কি বলা উচিত বুঝলো না। তবে রিদের হার কাঁপানো প্রতিটা কথায় যেন মায়ার পিঠ বেয়ে শীতল কম্পন সৃষ্টি হলো। থেমে থেমে কম্পন তুললো মায়ার মনের মধ্যে। বুঝ- অবুঝের বিষয়টা যতটুকু মায়ার মাথায় ঢুকলো সেটা হলো, তার অনিশ্চিত ভবিষ্যত এখন রিদের হাতে মুঠোয় বন্দী। রিদ মায়াকে চুপ থাকতে দেখে মায়ার মাথার উপর থেকে নিজের বলিষ্ঠ হাতটা সরিয়ে নেল ধীরস্থে। নিজের পকেটে পুনরায় হাতটা ঢুকিয়ে ছোট একটি বক্স বের করে মায়ার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে শান্ত মিহি কন্ঠে বললো….

—” নাও! এটা তোমার জন্য।

মায়া চোখ তুলে তাকালো রিদের বাড়ন্ত হাতে দিকে। দুই সেকেন্ড ছোট বক্সটি দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে নিলমায়া। পরে নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে স্থির করলো রিদের আবছা আলোয় মুখশ্রীতে। গাল গড়িয়ে পড়া নোনা জলটুকু বামহাতের উল্টো পিঠে মুছতে মুছতে বললো…

—” এটা কি??

—” খোলে দেখো কি??

মায়া হাত বাড়িয়ে রিদের থেকে বক্সটি নিল। কান্নায় টইটম্বুর হয়ে নাক টানতে টানতে রিদের দেওয়া উপহার খোলে দেখলো। সেখানটায় হোয়াইট গোল্ডের মধ্যে খুব সুন্দর ছোট ডায়মন্ড পাথরের নেকলেস মিললো মায়ার। মায়া কপাল কুঁচকে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো নেকলেসটি দেখে। তৎক্ষনাৎ পুনরায় রিদের হাতে ফিরত দিতে দিতে বললো…

—” নিব না আমি এটা।

বিষন্নতা কপাল কুঁচকে এলো রিদের…

—” কেন??

রিদের কথায় গা মুড়িয়ে বাঁকা হয়ে দাড়ায় মায়া। চোখ জল মুছতে মুছতে গাল ফুলিয়ে বললো…

—” আমার নাকফুল কই??

—” সরি? নাকফুল মানে??

—” বিবাহিত মেয়েরা নাকফুল পড়তে হয় জানেন না আপনি? নয়তো!

একটা ভ্রুঁ উঁচু করে প্রশ্ন করলো রিদ…
—” নয়তো কি??

পুনরায় গাল ফুলিয়ে বললো মায়া…

—” জানি না আমি! আমার নাকফুল লাগবে এখন ব্যাস!

—” আশ্চর্য! এখন আমি নাকফুল পাবো কোথায়? এটা রাখো সকালে এনে দিব তোমার নাকফুল। নাও!

মায়া রিদের সামনে ঘুরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস করে বলে…

—” যদি না দিন তো??

রিদ বিরক্তি কপাল কুঁচকে বললো….

—” তোমার একটা নাকফুলের জন্য কি এখন আমি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাব? আজব বলছি না কাল সকালে এনে দিব।

মায়া আবার দৃঢ় কন্ঠে বললো…
—” যদি চলে যান তো?

দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে রিদ। মায়ার প্রশ্ন এরিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে…

—” এটা নিয়ে যাও। বিয়ের ফাস্ট নাইটে বউকে উপহার দিতে হয় নাকি। তাই এটা তোমার উপহার। বাকি তোমার দেনমোহর আমি বিয়ের সময় পরিশোধ করে দিয়েছি। এখন প্রথমবার বিয়ে করছি তো তাই অভিজ্ঞতা কম। বউ সাজাতে হলে কি কি প্রয়োজন তা জানা নেই। কিন্তু দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা নিয়েই করবো কেমন। নাও ধরো তোমার জিনিস।

কথা গুলো বলেই রিদ মায়ার হাতে বক্সটি গজিয়ে দিতে দিতে পুনরায় বলে…

—” রুমে যাও তুমি। সাথে তোমার যাহ যাহ লাগবে একটা লিস্ট করে নিও। সকালে পাঠিয়ে দিব আমি। এখন যাও বিরক্ত করো না আমাকে। গো!

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply