Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৪(প্রথমাংশ +বর্তীতাংশ)


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

৩৪_প্রথমাংশ
উদ্দেশ্য বিহীন গন্তব্যে রিদের সাথে ছুটে চলেছে মায়া। অনেকটা কান্নায় চোখ মুখ ফুলে লাল আছে মায়া। দুচোখের ঘন পাপড়িতে সিক্ত ভেজা হয়ে আছে নোনা জলের ছিটা পানিতে মায়ার। চোখের নিচে, গালে লেপ্টে আছে সেই পানিতে। থেমে থেমে এখনো ফুপিয়ে কাঁদছে মায়া। কিশোরী বয়সের আবেগটা কোনো মতোই কন্ট্রোল করতে পারছে না মায়া রিদের সামনে। তাই কেঁদে চলছে বিগত দুই ঘন্টা ধরে চুপচাপ। কান্নার কারণটা রিদকেও প্রকাশ করছে না, আর না রিদ মায়াকে কোনো রুপ প্রশ্ন করছে। আপাতত রিদ নিজের গাড়ি ছুটাতে ব্যস্ত। মায়াকে নিয়ে শহর থেকে দূরে কোথাও পাড়ি জমাতে চাচ্ছে সে। আজ রাতটা মায়াকে নিয়ে সে একান্ত ভাবে দূরে কোথাও অবস্থান করতে চাই। সেই ভাবনা অনুযায়ী রিদ মায়াকে নিয়ে একা বের হয় দূর পথে। সঙ্গে বডিগার্ড বা ডাইভার কাউকে নেয়নি সে। রিদ নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করছে মায়াকে পাশের সিটে বসিয়ে। আর তখন থেকেই মায়া কেঁদে কুঁদে বুক ভাসাচ্ছে কষ্টে। অবশ্য রিদ বার কয়েক পাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখেছিল মায়াকে কান্না করতে কিন্তু সেদিকে মনোযোগী হলো না রিদ। রিদের ধারণা, মেয়ে মানুষ কান্না করবে এটাই স্বাভাবিক! বরং কান্না না করাটা অস্বাভাবিকের কিছু। তাছাড়া নতুন বিয়ে হয়েছে তাদের! এখন যদি তার বউ না কাঁদে তাহলে তার ফিল হবে না সে বিয়ে করেছে। তাই রিদের ফিল হওয়ার জন্য হলেও তার সদ্য বিয়ে করা বউকে বেশি বেশি কাঁদতে হবে। কাঁদুক তার বউ! তাহলে তার জামাই জামাই ফিল হবে। রিদ সামনের রাস্তা ধরে তাকিয়ে একমনো ড্রাইভ করছে। গাড়ির স্পিড চল্লিশ কি পঞ্চাশ! ফাঁকা জঙ্গলের রাস্তায় সাঁ সাঁ করে গাড়ি দৌড়াচ্ছে সে। রাস্তার দুপাশে বনালি গাছগাছালিয়ে গেঁড়া। রিদ ড্রাইভ করতে করতে চোখ ঘুরিয়ে তাকায় মায়ার দিকে, মায়া তখনো থেমে থেমে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে নীরবে। মায়ার কান্নার নিদিষ্ট কারণটা জানা নেই রিদের। জানতেও চাই না সে। জানতে চাইলেই দেখা যাবে মেয়েটি বায়না ধরলো যে তাকে খান বাড়িতে রেখে আসার জন্য। তখন অহেতুক রেগে যাবে সে। আর আজ এই দিনে রিদ রাগ করতে চাই না বউয়ে সাথে। যার জন্যই সে প্রশ্নই করবে না মায়াকে। রিদ মায়াকে এক পলক দেখে নিয়ে চোখ ঘুরিয়ে পুনরায় তাকায় সামনে রাস্তার দিকে। ডানহাতে ড্রাইভিং স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে বামহাতে গাড়ির সামনে থেকে পানির মাম পটটি নিয়ে বাড়িয়ে দেয় মায়ার সামনে। ফিচেল কন্ঠে বলে…

—” কিছুক্ষণের জন্য ব্রেক নাও। কান্না থামিয়ে গ্লুকোজের পানিটা খাও। নাও! শরীরে শক্তি করে পুনরায় মনোযোগ দিয়ে কান্না করতে বসো কেমন। ধরো!

মায়ার কান্না বেগ কমলো না বরং বাড়লো রিদের লিপির্প্ত কথায়। ফুঁপানো থেকে ক্রমেই হিচকানোতে রুপান্তর হলো বুক ফাটা কষ্টে। মায়া ডিভোর্স চাইনি রিদের থেকে। মায়ার মনে রিদকে নিয়ে যে সুপ্ত অনুভূতি গুলো দলা ছিল সেটা আজ রিদ জোর করে শেষ করে দিল তার নামের ডিভোর্স পড়িয়ে মায়াকে। এতে মায়ার ভিষণ কষ্ট হচ্ছে বুকে। নিজেকে সামলিয়ে রাখতে পারছে না বলেই মায়া ফুপিয়ে কাঁদছে সেই তখন থেকে। কিন্তু রিদ বুঝলো না মায়ার মনের সুপ্ত অনুভূতি গুলো। বরং উল্টো তাঁকে বলছে গ্লুকোজের পানি খেয়ে শক্তি করে তারপর কান্না করতে মনোযোগ সহকারে। এতে মায়া ভিষণ কষ্ট শায়িত হলো। রিদের হাত থেকে পানির মাম পটটি না নিয়ে হু হু শব্দ করে কেঁদে উঠলো দু’হাতে নিজের মুখ ঢেকে। মায়ার হঠাৎ শব্দ করে কান্নায় রিদের নাক মুখ ছিটকালো বিরক্তিতে। তৎক্ষনাৎ গাড়ির ব্রেক কষে বিরক্তি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মায়ার দিকে। কপাট রাগ দেখিয়ে বললো…

—” এই মেয়ে মরার কান্না করছো কেন? স্বামী মারা গেছে তোমার হ্যাঁ??

রিদের কথায় যেন আরও কষ্ট বাড়লো মায়ার। কান্না বেগও বাড়লো খানিকটা। মায়া নিজের মুখ হতে দুহাত সরিয়ে অশ্রু ভেজা ফুলা দুচোখে তাকালো রিদের দিকে। ঠোঁট উল্টালো কান্নায়, সেই সাথে বেসামাল হিচকি তুলে কান্না করতে করতে কোনো রকম বললো রিদকে মায়া…

—” আ আমার স্বামী নে নেই তো…

মায়ার এমন কথায় কপাল কুঁচকে আসে রিদের। মায়ার কান্নার যথার্থ অর্থ বুঝার জন্য রিদ কপাল কুঁচকে পুনরায় প্রশ্ন করলো মায়াকে….

—” তোমার স্বামী নেই বলে, এই জন্য কাঁদছো তুমি এতক্ষণ যাবত???

রিদের কথা উত্তর করলো না মায়া। বরং রিদের থেকে চোখে সরিয়ে নিজের কোলো উপর দৃষ্টি স্থির করলো মায়া। ক্রমশয় হিচকি তুলে কান্নাও করতে লাগলো। রিদ নিজের করা প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে দৃষ্টি গাঢ় করলো মায়ার দিকে। খানিকটা সন্দেহ নিয়ে ঝুঁকের বশে পুনরায় প্রশ্ন করলো রিদ মায়াকে….

—” তোমার কি স্বামী দরকার?? স্বামী লাগবে??

এবারও চুপ থাকলো মায়া উত্তর করলো না রিদের পরপর প্রশ্নে। এতে করে রিদ যেন অল্পতেই বিরক্তি হয় মায়ার উপর তাই আর আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করলো না মায়াকে। বরং হাতে থাকা পানিটা মায়াকে নিতে বললো ধমক দিয়ে। মায়া রিদের ধমকে কেঁপে উঠে খানিকটা সময় নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে রিদের থেকে পানির বোতলটি নেয়। ধীরস্হে ঠোঁট লাগিয়ে মাম পট থেকে অল্প পানি খেয়ে নিতেই পুনরায় ঠান্ডা কন্ঠে মুখ খুললো রিদ। মায়াকে উদ্দেশ্য করে স্বগোতক্তিতে বললো…

—” শুনে মেয়ে কিছু কথা বলি তোমাকে! দ্বিতীয় বার বললো না এই একি কথা গুলো তোমাকে। আমি এক কথার মানুষ দুই কথা পছন্দ নয়। সবার সাথে সক্ষতা, ভাব কিছু নেই আমার। দাদা-দাদি ছাড়া আপাতত আমার পিছুটানও নেই। তুমি আমার ভালোলাগা বা মোহ হতে পারো কিন্তু পিছুটান নয়। আজ আছো কাল নাও থাকতে পারো। মোহ কেটে গেলে হয়তো তুমিও কেটে যাবে আমার জীবন থেকে। আমি আমাকে ছাড়া কাউকে প্রাধান্য দেয়নি জীবনে। মি, মাই, মাইসেল্ফ বিশ্বাসী আমি। দুনিয়ায় সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমি নিজের ভালো লাগা, ভালো থাকাটাকে প্রাধান্য দেয় প্রথমে। যার সূত্র ধরেই এই মূহুর্তে তুমি আমার পাশে বসে আছো। বিগত অনেকটা দিন ধরে তোমার জন্য আমি ডিস্টার্ব হচ্ছিলাম। কিন্তু তার কারণটাও আমার কাছে আদৌ স্পষ্ট নয়। ঘোলাটে সবকিছু! ভালোবাসা নামক শব্দটা আমার সাথে যায় না। তাই সেদিকে গেলাম না আর। এখন মেইন পয়েন্টে আসি। আমার তোমাকে দেখলে যাহ ফিল হয় বাকি আর দশটা সাধারণ মেয়েকে দেখলে তা ফিল হয়না। অসম্ভব সুন্দরী মেয়েদেরকে দেখলেও তোমার মতো করে কিছুই ফিল করতে পারিনা। সেটা আসে না ভিতর থেকে আমার। এখন আমি এসব ডিস্টার্বেন্স থেকে বের হতে চাই। আর তার জন্যই এই মূহুর্তে আমার মনে হচ্ছে, তোমার সাথে আমাকে সেক্সুয়াল বিষয় গুলাই টানে হয়তো। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমার সাথে আজ থেকে প্রতিনিয়ত ফিজিক্যাল রিলেশনশিপে জড়াবো। যতদিন না আমার তুমি নামক মোহ বা ডিস্টার্বেন্স শেষ হচ্ছে ঠিক ততদিন পযন্ত। হ্যাঁ তুমি ছোট হতে পারো বাট তোমার শারীরিক গঠন বলে তুমি ফিজিক্যাল রিলেশনশিপের জন্য সুইটেবল। সমস্যা হবে না তোমার।

একদমে কথাগুলো বলেই থামে রিদ। স্বাভাবিক ন্যায় সোজা হয়ে বসে নিজের সিটের মধ্যে পিঠ লাগিয়ে। সামনের দিকে তাকিয়ে বাকি কথা গুলোও গুছিয়ে নেয় নিজের মনের মধ্যে রিদ। কয়েক সেকেন্ড মধ্যে পুনরায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মায়ার দিকে। তখনও মায়া পাথর মূতি ন্যায় টায় জায়গায় বসে থাকে মাথা নত করে। কোনো রুপ হেলদোল নেই। তবে কান্না করছে না বিন্দুমাত্র। কান্না থেমে গেছে কিন্তু মায়াকে অনূভুতিহীন দেখালো রিদের কাছে। রিদ মায়ার অনূভুতি নিয়ে মনোযোগী হলো না বরং নিজের গুছানো কথা গুলো বলার জন্য আবারও আগের ন্যায় শান্ত মেজাজে মুখ খুললো মায়ার সামনে রিদ। বলে উঠলো…

—” আমি ভালো মানুষ না। তাই আমাকে ভালো মানুষ ভাবার মতো ভুলটা কখনোই করবে না জীবনে। আমার ধৈর্য খুবই কম। অন্যরার মতো করে তোমাকে বারবার একিই কথা বা প্রশ্ন করার মতো সময় ও ধৈর্য কোনোটাই নেই আমার। কথা হলো আমার প্রশ্ন করার সাথে সাথেই উত্তর দিতে হবে তোমার। দ্বিতীয়ত্ব আমি কথা বললে চুপ করে থাকা যাবেনা আমার সাথে কখনো। যাহ আদেশ করবো সেটাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করা চাই আমার। আমার কথা মতো চললে জীবনে সবকিছু ঠিক থাকবে তোমার চারপাশে, কিন্তু আমার কথার বিপরীতে গিয়ে আমার অবাধ্য হলে প্রথম দাপেই জান নিয়ে নিব তোমার। দ্বিতীয় দাপে তুমি সোজা কবরে থাকবে এমনকি তোমার চারপাশের মানুষজনও। আমি তোমাকে আমার লাইফে আনতে চাইনি। আমার জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত অধ্যায় তুমি। যাহ না চাইতেও এড করতে হয়েছে আমার জীবন নামক বইয়ে। জানি না কতদিন বয়তে পারবো তোমাকে? কতদিনই বা ঠিকবে তুমি আমার লাইফে। আমার মন গুছে গেলে তুমিও মুক্তি পেয়ে যাবে আমার থেকে। তবে তোমার মুক্তি পাওনা হিসাবে আমার থেকে অসমতুল্য ব্যাংক ব্যালেন্স প্রপার্টি সবই পাবে তুমি। যাহ দারুন সারাজীবন আরাম করে বসে বসে খেতে পারবে তুমি। আর একটা কথা, আমার ছুঁয়া তোমার জন্য হারাম নয় হালাল হবে। কিছুক্ষণ আগে আমাদের ডিভোর্স নয় বিয়ে হয়েছিল। এখন তুমি আমার বিবাহিত বউ। সো রিলাক্স! আমার সাথে ফিজিক্যাল সম্পর্কে জড়াতেও তোমার সমস্যা হবার কথা না। আশা করছি তুমি আমার কথা গুলো সম্পূর্ণ বুঝতে পারছো কি বলছি! না বুঝলে কিছু করার নেই আমার। তাছাড়া রাতে বাকি কাহিনীটা এমনিতেও বুঝে যাবে তুমি। তাই বাড়তি শব্দ ব্যয় করতে চাচ্ছি না এখন। আর হ্যাঁ তোমার সামনের ড্রয়ারে কিছু খাবার রাখা আছে খেয়ে নাও। তোমার প্রেশার লো হয়ে আছে সারাদিনের না খাওয়াতে। যেকোনো সময় তুমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারো। তাই বলছি কান্না পড়ে করিও, সময় পাবে তার জন্য, আগে খাবার খেয়ে নাও আপাতত। আর আমি গাড়িটা কিছুক্ষণের জন্য থামাচ্ছি এখানে৷ একটু বাহিরে খোলা ফ্রেশ নিশ্বাস নিতে যাব আমি। ততক্ষণে তুমি খাবারটা খেয়ে নাও চুপচাপ।

মায়া মন্ত ভাবলেসহীন! রিদ মায়াকে অপেক্ষা করে গাড়ির দরজা খুলে বের হয়, দুই কদম হেঁটে গাড়ি পিছনের দরজা খুলে সিটের থেকে নিজের গায়ের ব্রাউন জ্যাকেটটি তুলে নিয়ে ঠাস করে গাড়ির দরজা লাগিয়ে দেয় সে। রিদ টেনে নিজের গায়ে জ্যাকেটটি জড়াতে জড়াতে খানিকটা এগিয়ে যায় সামনের দিকে সে। কিন্তু মায়া? নিস্তব্ধ মায়া যেন একিই জায়গায় পাথর মূতির ন্যায় বসে রইলো। রিদের প্রতিটা কথার অর্থ সে বুঝেছে। ছোট হতে পারে অবুঝ নয় সে। মায়া সাথে এতটাও বুঝতে পারলো রিদের জীবনে কতটা অমূল্যহীন পাত্রী সে। মায়ার মনের সুপ্ত অনুভূতি গুলো যেন মূহুর্তেই প্রচন্ড ঘৃণায় দাবিত হলো। সেই কিশোরী মনের ঘৃণাটা নড়াচড়া দিয়ে উঠলো শরীরময়। রিদ মায়ার সাথে ফিজিক্যাল সম্পর্ক ছাড়া অন্য কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাই না। রিদের দরকার নেই মায়াকে শারীরিক চাহিদা ছাড়া! আর এই একটি কথা যেন প্রচন্ড বিষিয়ে তুললো মায়ার ছোট অবুঝ মনটি। যে নিদলে রিদের জন্য মায়া ছটফট করতো সেই নিদলে আজ বিষাক্ত বিষের কাটায় ছটফট করছে মায়া।

মায়াকে দিয়ে রিদের মন ভরে গেলে তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দুই মিনিট ভাববে না রিদ সেটাও বুঝলো মায়া। মায়ার সুপ্ত অনুভূতির দাম লাগালো রিদ তার অসীম টাকায়। মায়ার ইজ্জতের দাম লাগালো তার ব্যাংক ব্যালেন্সের। মায়া কেঁপে উঠলো। শরীরে রক্ত টগবগিয়ে উঠলো ঘৃণায়। চোখ তুলে তাকালো গাড়ির কাঁচ বেধ করে বাহিরের দিকে। রিদ গাড়ি থেকে খানিকটা দূর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে তিক্ততা নিয়ে। মায়া কষ্টে হা করে নিশ্বাস টানলো রিদের দিকে তাকিয়ে থেকে। মায়া অবুঝ নয়। সে বুঝতে শিখেছে অনেক আগেই তাও তার রিদ ভাইয়ার জন্য। আর এই বুঝাটায় যেন কাল হয়ে দাঁড়ালো রিদ মায়ার নবদম্পতি সম্পর্কের মাঝে। রিদ যতটা ছোট মনে করে মায়াকে কথা গুলো বললো তার থেকে কয়েক গুণ বড় হয়ে বুঝদার ভাবে শুনলো মায়া। মায়া শরীর পুনরায় ক্ষীণ কম্পন সৃষ্টি হলো। রিদের দিকে তাকাতেই মনের মধ্যে ছুঁয়ে গেলো বিষাক্ত এক তিক্ততা। এতক্ষণ যাবত রিদকে হারানো কষ্টে শায়িত হয়ে অশ্রু বিসর্জন দিলেও, এই মূহুর্তে মায়ার মনে প্রচন্ড উত্তেজনা সৃষ্টি হলো রিদের থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য। রিদের ধরা ছুঁয়ার বাহিরে চলে যাওয়ার জন্য। হোক পাষাণ্ড লোকটা তার স্বামী তারপরও নিজেকে কখনোই তার হাতে তুলে দিবে না মায়া। যে কোনো মূল্যেই মায়া পালাতে চাই এই মূহুর্তে রিদের থেকে। যে ভাবা সেই কাজ।

মায়া নিজের ভাবনা অনুযায়ী উত্তেজিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির দরজার হ্যান্ড চেপে ধরে, রিদের দিকে তাকিয়ে থেকে কৌশলে আস্তে করে চাপ দিয়ে কোনো রকম হালকা খুললো দরজাটি। ভয়ার্ত চোখ দুটোতে তুমুল ভাষণা রিদ থেকে পালানোর জন্য মায়ার। তরতর করে কম্পিত শরীরের মায়া আস্তে করে বের হয়ে আসে রিদের অগোচরে গাড়ির দরজা খুলে। রিদকে এক পলক দেখে নিয়ে মায়া কোনো দিক বিবেচনা না করেই চট করে সোজা উল্টো পথে দৌড় লাগায় জঙ্গলের রাস্তা ধরে মায়া। মায়া নিজের ভয়ে উত্তেজনায় এতটা আড়ষ্ট হয়ে আছে যে নিজের সামনের বিপদ পযন্ত চোখে ভিড়াতে পারলো না। কিন্তু শুকনো পাতার গমগম মচমচে শব্দে বিরক্তিতে চোখ তুলে তাকায় পিছনে ফিরে রিদ। মায়াকে জঙ্গলের রাস্তা ধরে উল্টো পথে দৌড়াতে দেখে মূহুর্তেই চমকে উঠে সে। হাতের সিগারেট টা ফেলে তৎক্ষণাৎ সতর্ক চিৎকার করে উঠে রিদ মায়াকে। উত্তেজনায় বলে উঠে….

—” রিত স্টপ রান! জঙ্গলের রাস্তাটা ভালো না। বিষাক্ত কীটপতঙ্গ আছে। রিত কথা শুনো আমার..

রিদের গলা ফাটা চিৎকার মায়ার কান অবধি বেধ করলো না। প্রাণপূণ দৌড়াতে থাকলো জঙ্গলের রাস্তা ধরেই। যার অর্থ মায়া জান দিবে তবুও রিদের হাতে ধরা দিবে না দৃঢ় শপথে অনড় মায়া। মায়ার দৌড়ানোতে উত্তেজিত হলো রিদ। মায়াকে নিয়ে ভয়ে আশংকায় সেও তৎক্ষনাৎ দৌড় লাগালো মায়ার পিছন পিছন। মায়া নিজেকে রিদ থেকে বাঁচাতে চাই তো, রিদ মায়াকে বিষাক্ত কীট থেকে বাঁচাতে চাই। মূল উদ্দেশ্য দুজনের মায়ার প্রাণে বাঁচা হলেও মৃত্যু যেন নিশ্চিত বার্তা নিয়ে হাজির হলো কারও একজনের জীবনে। রিদ বলিষ্ঠবান লম্বা চওড়ায় বেশ হওয়ার মায়াকে ধরে ফেললো কয়েক মিনিটের মাথায় দৌড়িয়ে। কিন্তু ততক্ষণে মায়া অনেকটা জঙ্গলের ভেতর ঢুকে যায়। যার কারণে ঘটে যায় এক অপ্রত্যাশিত কান্ড। রিদ মায়াকে জাবরদস্তি করে ধরতে গিয়ে মায়া নিজের তাল সামলাতে না পেরে উপুড় হয়ে পড়ে জঙ্গলে শুকনো পাতার উপর। আর তখনই ঘটলো রিদের সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি। রিদ মায়াকে বাঁচানোর জন্য তৎক্ষনাৎ টেনে তুলতে গিয়ে, শুকানো পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মাটি রঙ্গের হালকা পাতলা চিকন লম্বা সাপটি হঠাৎই লাফিয়ে উঠে রিদের হাত প্যাচিয়ে ধরে নিষ্ক্রিয় ভাবে চুবল বসায় রিদের ডানহাতে সাথে সাথে। আকস্মিক ঘটনায় রিদ প্রথমে বুঝতে না পারলেও দুই সেকেন্ডের মাথায় বুঝে যায় আসলে কি ঘটেছে তার সাথে। উত্তেজনায় রিদ সাথে সাথে মায়াকে না ধরে ছিটকে নিজের হাত ঝাড়ি মারে প্যাচানো সাপটিকে ফেলে দেওয়ার জন্য। সেই সাথে বিরক্তি ভঙ্গিতে মৃদু চিৎকার করে আওড়ালো…

—” শিট! ড্যাম ইট!

নিজের ভয়ে উত্তেজনায় মায়া রিদের দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো না পযন্ত। দেখলো না পযন্ত, রিদ যে সাপের বিষাক্ত চুবলে আক্রান্ত হয়েছে। মায়া নিজের কাতরতায় ঘুণাক্ষণেও টের পেলো না রিদের অবস্থাটা। বরং নিজেকে রিদ থেকে বাচানোর জন্য চট করে উঠে পুনরায় দৌড় লাগায় সামনের দিকে মায়া। কিন্তু কিছুটা পথ যেতেই থেমে যায় মায়া পা দুটো রিদের সশরীরে চিৎকার কানে আসতেই চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকায় মায়া রিদের দিকে। তখনই চোখে ভেসে উঠে রিদের ডানহাতে প্যাচিয়ে থাকা মাটি রঙ্গে সাপটিকে। মূহুর্তেই মায়া থমকে যায়। পাথর মূতি ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে টায় জায়গায়। নড়চড় নেই কোনো রুপ। দৃষ্টি অনড় রিদের ডানহাতে। ততক্ষণে রিদ পুনরায় মৃদু স্বরে চিৎকার করে উঠে। কারণ রিদের হাতের প্যাচানো বিষাক্ত সাপটি রিদের হাত ঝাকুনিতেও পড়লো না মাটিতে। বরং সাপটি রেগে গিয়ে পুনরায় রিদের হাতের একিই জায়গাতে কামড় বসালো তৎক্ষনাৎ। যার সূত্র ধরেই রিদ পুনরায় বিরক্তি মৃদু চিৎকার করে উঠলো মায়ার সামনে। তিক্ততা ভঙ্গিতে বলে উঠে সে…

—” শিট! শিট! শিট!

চলিত….

দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

৩৪_বর্তীতাংশ
—” শিট! শিট! শিট!
প্যাচানো বিষাক্ত সাপটি রিদের হাতের ঝাকুনিতে পড়লো না। বরং রেগে গিয়ে পুনরায় একিই জায়গায় কামড় বসালো সঙ্গে সঙ্গে। যার সূত্র ধরে রিদ পুনরায় চিৎকার করে উঠলো তৎক্ষনাৎ। মায়া পিত্তে চমকে উঠলো। উত্তেজনায় দৌড়ে আসলো মূহুর্তেই রিদের কাছে। মায়ার ভয়ার্ত চোখ দুটোতে বেসামাল আতংক ভেসে উঠলো রিদকে বিপদের সম্মুখীন হতে দেখে। নিজের কথা ভুলে এবার রিদকে বাঁচাতে চাই ছোট মায়া। কিভাবে সাপের কবল হতে রিদকে বাঁচাতে হবে তা জানা নেই মায়ার। তবে এতটা জানে সে তার মানুষকে বাঁচাবে যেভাবেই হোক! নিজের অবুঝতায় মায়া এক পাগলো করে বসলো, কোনো কিছু চিন্তা ভাবনা না করেই ভয়ে উত্তেজনায় মায়া রিদের হাতে প্যাচিয়ে থাকা বিষাক্ত সাপটিকে ধরে ফেলতে চাই দু’হাতে ঝাপটে। কিন্তু তৎক্ষনাৎ বাঁধা দিল রিদ! মায়াকে বোকামী করতে দিল না, আর না বিষাক্ত সাপের চুবল খেতে দিল। মায়া সাপটিকে দু’হাতে ঝাপটে ধরার আগেই রিদ নিজের হাতটি সরিয়ে নিয়ে অতি কৌশলে দক্ষতার সাথে অন্যহাতে সাপের গলা চেপে ধরে তৎক্ষনাৎ ছিটকে দূরে ফেললো নিজের থেকে। কিন্তু এখানে ক্ষান্ত হলো না কিছুই বরং বাড়লো।

প্রাথমিক পর্যায়ে রিদ দ্রুত নিজের বামহাত দিয়ে ডানহাতটা শক্ত করে চেপে ধরে, যাতে করে সাপের বিষ পুরোটা নিজের শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে না পারে। আপাতত হাতের বিষ শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আগে আগে তৎক্ষণাৎ প্রাথমিক চিকিৎসা দরকার রিদের। নয়তো বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে যাবে তাঁর জন্য। মায়া অস্থির হয়ে কান্না ভেঙ্গে পড়লো। এই মূহুর্তে কিভাবে কি করতে হবে কিছু বুঝলো না সে। মায়ার জীবনে এই প্রথম সে কোনো ভয়ানক বিপদের সম্মুখীন হলো। তাই এই ভয়ানক বিপদ নিরাময়ে রাস্তাটাও অজানা এই মূহুর্তে মায়ার কাছে। ভয়ে অস্থির তোলপাড় মায়া দ্রুত এগিয়ে এসে রিদের বাহু চেপে ধরতেই রিদ হাল্কা চমকে উঠে তাকায় মায়ার দিকে। মায়ার চোখ দুটো টইটম্বুর জলে। রিদ বুঝতে পারছে মায়া এই পরিস্থিতিটাকে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু রিদ সেদিকে বিশেষ একটা মনোযোগী হলো না বরং সাপের বিষ নিরাময়ের জন্য প্রাথমিক ভাবে রিদ তাৎক্ষণিক মায়ার বুকে জড়িয়ে থাকা কলেজের সাদা ওড়নাটা টেনে নিয়ে শক্তভাবে বেঁধে নেয় নিজের ডানহাতটি। শরীরে বিষ জড়িয়ে পড়ার আগেই রিদ দ্রুততা সঙ্গে মায়ার একহাত চেপে ধরে সামনের দিকে দৌড় লাগায় জঙ্গল থেকে বের হওয়ার জন্য। চারপাশটা নিরাপদ নয়। দ্রুত না বের হলে পুনরায় যেকোনো বিপদে সম্মুখীন হতে হবে তাদের। রিদ নিরাপত্তার কথা ভেবেই মায়াকে নিয়ে দৌড়ে আসে গাড়ির দিকে। কিন্তু গাড়ির কাছে আসতে আসতে কিছুটা সময়ের মধ্যেই ঝিমিয়ে পড়ে রিদ সাপের বিষে। গাড়ির দরজা টেনে ধরার আগেই রিদ ঝিমিয়ে পড়ে যায় নিঝুম রাস্তা। সাপের বিষাক্ত বিষ রিদকে ক্রমশয় কাবু করে ফেলছে ধীরে ধীরে। রিদের অল্প দৌড়ানোতে তরতর করে কম্পন সৃষ্টি হলো পুরো শরীরে। রিদ নিস্তিয়ে গেলো মূহুর্তেই। শ্বাসকষ্ট হলো ক্রময়। বন্ধ নিশ্বাস আটকে আসার কারণে রিদ হা হয়ে বড় বড় নিশ্বাস নিতে লাগলো উপুড় হয়ে দুহাতে রাস্তায় ভর করে। রিদের কপাল বেয়ে ঘাম ছুটে ধরধর। রিদ সিক্ত ব্যাথাতুর দৃষ্টিতে তাকায় রাস্তার দূর প্রান্তে সামনের দিকে। যেদিকে তাকাচ্ছে সরু রাস্তা আর দুপাশে জঙ্গল ছাড়া কিছুই চোখে পড়লো না রিদের। সে মায়াকে সেইফ করতে চাই। এই মূহুর্তে তাঁর কিছু হলে তার বউকে কে সেইফ করবে এই আগ্রত বিপদ থেকে? রিদ জীবনের প্রথম নিজেকে কিছুটা অসহায় বোধ করলো তার বউকে সেইফি কোথাও রাখতে পারছে না বলে। ব্যথাতুর রিদ ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায় মায়ার দিকে। নিজের সদ্য বিয়ে কথা বউ নামক মানুষটিকে নিভু চোখে দেখলো ছটফট করতে তার জন্য। রিদ মায়ার দিকে তাকিয়ে বার কয়েক বড় বড় নিশ্বাস টেনে পুনরায় চট করে উঠে দাঁড়ায় মায়াকে সেইফ রাখার জন্য। কাঁপা কাঁপা হাতে গাড়ির দরজা খুলে মায়াকে ভিতরে ঢুকানোর আগেই আবারও রিদ ঝিমিয়ে পড়লো রাস্তায়। তার সাথে সাথে মায়াও পড়ে রিদের পাশে। কারণ রিদ তখনো মায়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিল। রিদের বারবার ঝিমিয়ে পড়ায় মায়া ডুকরে কেঁদে উঠে। উত্তেজনায় ঝাপটে ধরে রিদকে।

সুনশান ফাঁকা নিস্তব্ধ রাস্তায় একটা কাকও উঁকি মারছে না। এমনত অবস্থায় রিদের সাপের বিষে কাতরানোটা ছিল মৃত্যুর সামিল মায়ার জন্য। অক্ষাত মায়া বুঝলো না কি করতে হবে এমনতর অবস্থায় তার। শুধু এতটা বুঝলো রিদের ইমিডিয়েটলি চিকিৎসা প্রয়োজন নয়তো বড় কোনো বিপদের সম্মুখীন হতে হবে তাদের। রিদ হাল ছাড়লো না। শক্ত থাকলো। মায়াকে একহাতে বুকে আঁকড়ে ধরলো। বড় বড় নিশ্বাস নিতে নিতে চারপাশে নিজের ব্যাথাতুর দৃষ্টিতে বুলালো নীরবে সে। নিস্তব্ধ খালি রাস্তায় চারপাশে বিপদ আর বিপদ। রিদ চকিত হলো।

তাৎক্ষণিক ভাবে মায়াকে সেইফলি বাসায় পৌঁছাতে না পারলে জঙ্গলী জানোয়ার বা পাহাড়ি নেশাক্ত বখাটে ছেলেদের হাতে পড়বে মায়া এতটা রিদের দৃঢ় বিশ্বাস। আর এই বিষয়টিই আঘাত হানলো রিদের পাষান্ড বুকে যার রেশ ধরে মূহুর্তেই অসহায় হয়ে পড়লো রিদ। এতটা অসহায় তার গ্যাংস্টার জীবনের কখনো পড়েনি। রিদ নিজেকে সংযম করতে চাই, বিষের যন্ত্রণা কাবু করে পুনরায় কোনো রকম মায়াকে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় গাড়িতে উঠার জন্য। কিন্তু এবারও ভাগ্য সহায় হলো না রিদের। কারণ ততক্ষণে রিদের শরীর আসড় হয়ে আসে বিষাক্ত বিষের তাড়নায়। গাড়ি দরজা টেনেও রিদ মায়াকে গাড়িতে উঠাতে পারলো না তার আগেই আবারও মায়াকে নিয়ে ঝিমিয়ে পড়লো রাস্তায়। তবে মায়ার হাতটা ছাড়লো না রিদ। বরং শক্ত করে চেপে ধরে রাখলো যাতে মায়া পালিয়ে যেতে না পারে। ততক্ষণে রিদের শরীরও টকটক করে পুরো দমে কেঁপে কেঁপে উঠে জানান দিচ্ছে তার বিষের বার্তা। শরীরময় ঘেমে জবজব হলো দুই মিনিটেই। অবশেষে রিদ বড় বড় নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে গাড়ির চাকার সাথে গা এলিয়ে বসে। নিজের নিভানোর দৃষ্টিতে মায়ার দিকে স্থির করে কোনো রকম বলে উঠে…

—” আমার বাম পকেটে ফোন আছে। আসিফকে কল দাও বলো আমরা বিপদে আছি। তোমাকে সেইফ করতে বলো কুইক!

আতংকিত মায়া হু হু শব্দ করে কেঁদে উঠে রিদের কথায়। ভয়ে উত্তেজনা রিদকে ঝাপটে ধরে দুহাতে। রিদের গলায় মুখ ডুবিয়ে সশব্দে কেঁদে উঠে মায়া। রিদ মায়ার ভয় বুঝতে পেরে নিজের বামহাতে মায়ার কমড় চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিতে চাই। কিন্তু অবশিষ্ট শক্তি না থাকায় পারলো না রিদ মায়াকে নিবিড়ভাবে নিজের সাথে মিশিয়ে নিতে। তবে মায়া রিদের চেষ্টাটুকু বুঝলো, তাই সে নিজেই এগিয়ে এসে রিদের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়। মিশে রয় রিদের বুকের সাথে গলায় মুখ ডুবিয়ে সশব্দে ফুপাতে ফুপাতে। রিদ মায়ার কান্ডে অল্প অবাক হলো তাই ব্যথাতুর চেহারায় হাসলোও অল্প। রিদ মায়ার কমড়ের নিজের বামহাতটা আলতো ভাবে রেখে নিজের গাল ঠেকালো মায়ার মাথার পাশে। মোলায়েম কন্ঠে বড় বড় নিশ্বাস নিতে নিতে বললো রিদ মায়াকে…

—” রিত আমার হাতে সময় কম তুমি দ্রুত আসিফকে ফোন দাও বলো এখানে আসতে।

ভয়ার্ত মায়া এই মূহুর্তে কি করবে বুঝতে পারছে না। উত্তেজনায়, অস্থিরতায় সবকিছু যেন গলিয়ে ফেলে তৎক্ষনাৎ। তাই রিদের কথা গুলো শুনেও যেন বুঝলো না মায়া। কারণ মায়ার প্রেমময় গোছানো দুনিয়াটা যেন এক মূহুর্তেই উল্টে যায় প্রিয় মানুষটিকে মৃত্যুশয্য অবস্থায় দেখে। মায়া নিজের হাতের বাঁধন আরও শক্ত গভীর করে জড়িয়ে ধরে রিদকে ডুকরে কেঁদে উঠে। রিদ তখনো থেমে থেমে বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে। তার শরীর ক্রমশয় নিস্তিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। দুই চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে গভীর ঘুমে। রিদ চেষ্টা চালালো দু’চোখে পাতা মেলে তাকানোর। কারণ সে বুঝতে পারছে তার হাতে সময় কম। মৃত্যু নিশ্চিত এবার। তাই রিদ আর এক মূহুর্তেও অপচয় করতে চাইলো না
বরং পুনরায় তাগদা দিল মায়াকে আগের ন্যায় বলে উঠলো….

—” বউ প্লিজ কথা শুনো আমার। আসিফকে ফোন দাও দ্রুত।

মায়ার আর অবাধ্য হলো না রিদের। বরং রিদের বাধ্য বউয়ের মতো চট করে স্বামীর কথা অনুযায়ী দ্রুত আসিফকে কল করলো তাৎক্ষণিক,, কয়েক সেকেন্ড রিং হওয়ার পর পরই আসিফ ফোনটি ধরলো আর্দেশের সাথে,, কিন্তু আসিফকে কিছু বলতে না দিয়ে তার আগেই উত্তেজিত মুখ খুললো মায়া। অনর্গল ভাবে বলে গেল তাদের অবস্থার কথা গুলো আসিফকে। মায়ার মুখে সবটা শুনতেই উত্তেজিত হলো আসিফ। মায়াকে সতর্কবার্তা হিসাবে বললো বেশ কিছু কথা…

–” ভাবি! আর যায় হোক না কেন? ভাইকে ঘুমাতে দিবেন না কোনো ভাবেই প্লিজ। ভাইকে বিষাক্ত সাপ কামড়িয়েছে ভাবি! যদি ভাই একবার ঘুমিয়ে পড়ে তো ভাইকে আর বাঁচানো যাবে না। প্লিজ ভাবি আল্লাহ দোহাই লাগে আমি না আসা পযন্ত ভাইকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করুন প্লিজ। আমি ততক্ষনে ডাক্তার নিয়ে পৌছে যাবো আপনাদের কাছে।

আসিফ ফোন রাখলো। মায়া ততক্ষণে রিদকে পুনরায় ঝাপটে ধরা চেষ্টা করলো। কিন্তু রিদ বাঁধা দিল। কারণ রিদ বামহাতে নিজের গায়ের ব্রাউন জ্যাকেটটা কোনো রকম টেনে খুলার চেষ্টা করলো। মায়া বুঝলো রিদের গরম লাগছে তাই কাপড় খুলতে চাচ্ছে গায়ের থেকে। মায়াও কান্না করতে করতে সাহায্য করলো রিদকে জ্যাকেটটি খুলার জন্য। কিন্তু রিদ নিজের গায়ের জ্যাকেটটি ফেলে না দিয়ে উল্টো মায়ার গায়ের জড়িয়ে দিতে দিতে বললো…

—” এটা পড়ে দ্রুত নিজেকে ঢাকো। আমার ভালো লাগছে না তোমাকে এই হট অবস্থায় দেখতে। কেমন কেমন লাগছে জানি। উফ! মারা যাচ্ছি তারপরও তোমাতে বেহাল হচ্ছি বউ।

ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো মায়া। রিদের মুখে ‘ মারা যাচ্ছি কথাটা আঘাত করলো মায়ার কলিজায়। তাই ডুকরে কেঁদে উঠে রিদকে বলে উঠে মায়া…

—” আপনার কিছু হবে না আসিফ ভাইয়া আসছে তো আমাদের নিতে। আপনি একদম ঠিক হয়ে যাবেন দেখিয়েন।

মায়ার সামনে শক্ত থাকলো রিদ। মরে যাবে এই ভেবে বিন্দুমাত্র দুর্বল দেখালো না রিদকে। বরং শক্ত মনোভাব নিয়ে কম্পিত হাতে নিজের গায়ের জ্যাকেটটা এগিয়ে দেয় মায়াকে। মায়া তৎক্ষনাৎ রিদের কথা অনুযায়ী নিজের গায়ে রিদের জ্যাকেটটি জড়িয়ে নিতেই, রিদ কম্পিত হাত বাড়িয়ে জ্যাকেটের চেইনটা মায়া গলা অবধি লাগিয়ে দেয় একটানে। পরে নিজের বামহাতে ডানহাতেটি শক্ত করে চেপে ধরে রিদ মাথা ঠেকায় গাড়ির সাথে। নিভিয়ে যাওয়া গলায় রিদ বলতে শুরু করলো মায়াকে….

—” আমরা ঢাকা থেকে অনেকটা দূরে অবস্থান করছি রিত। আমাদের কাছে আসিফের পৌঁছাতে দুই- তিন ঘন্টার সময় লাগবে অনাহেষেই। আর আমি বড় জোর পাঁচ থেকে দশ মিনিট বাঁচবো। তারপর ব্যথায় ছটফট করতে করতে মারা যাবো। তুমি গাড়ি চালাতে জানো না। তারপর আবার সন্ধ্যা হয়ে আসছে চারপাশে। জঙ্গলে নেশাক্ত বখাটে ছেলেদের যাতায়াত বেশি থাকে। সেই সাথে জঙ্গলী পশুদেরও। আমি মারা গেলেও আসিফ তুমি অবধি পৌঁছাতে পৌঁছাতে নিশ্চিত তোমারও কোনো না কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে ততক্ষণে। আমার গাড়ির চাবি জ্যাকেটের পকেটে রাখা আছে। আমি মরে গেলে, তুমি গাড়ির ভিতরে চলে যাবে এবং গাড়ির দরজা লক করে দিবে। এতে করে আসিফ না আসা অবধি তুমিও সেইফ থাকবে এই খালি রাস্তার মধ্যেও। কারণ আমার গাড়ির কাঁচ বুলেটপ্রুফ তাই চাইলেও কেউ গাড়ি ভেঙ্গে তোমাকে বের করতে পারবে না। তুমি নিরাপদ থাকবে। আমার চিন্তা করে খবরদার তুমি গাড়ি থেকে বের হবে না কিন্তু। আর না অবাধ্য হবে আমার আর্দেশের। আমার যাহ হবার হবে তারপরও তুমি গাড়ি থেকে বের হবে না। আর একটা কথা…

কথা গুলো শেষ করতে পারলো না রিদ তার আগেই হাঁপিয়ে উঠলো বিষে তাড়নায়। বড় বড় নিশ্বাস নিতে লাগলো একাধারে। মায়া থমকালো রিদের কথা গুলো শুনে। নিজের শেষ নিশ্বাসে এসেও তার স্বামী তাকে সেইফ রাখতে চাই? তাঁকে? মায়া স্তব্ধ হলো। মায়ার চোখের জলের সাথে সাথে শরীরও তরতর করে কেঁপে উঠলো দ্বিগুণ হারে। শীতল হওয়া বয়ে যেতে লাগলো মায়ার শিরা উপশিরায়। নিস্তব্ধ নিবাক মায়া শূন্য অনূভুতি নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রিদের দিকে৷ মায়ার অবাধ্য চোখের জল গাল গড়িয়ে টপটপ করে স্রোতধারায় পড়তে লাগলো রিদের পরিহিত জ্যাকেটের উপর। রিদ নিভিয়ে যাওয়া দৃষ্টিতে তাকায় মায়ার দিকে। শরীরে বিষাক্ত বিষের কাতর হয়ে খানিকটা নড়াচড়া করতে চাইলো রিদ কিন্তু নিজের দুর্বলতায় করতে পারলো না সেটা। রিদের মনের অসমাপ্ত কথাগুলো পুনরায় বলতে চাই মায়াকে। কিন্তু নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বিদায় কথা গুলোও গলায় আটকে যাচ্ছে বারবার। যার কারণে রিদের চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে গভীর ঘুমে। মায়ার টনক নড়ে রিদের অবস্থা দেখে। তৎক্ষনাৎ মনে পড়ে আসিফের বলা কথা গুলো যে ‘ রিদকে কোনো ভাবেই ঘুমাতে দেওয়া যাবে না। যদি রিদ একবার ঘুমি পড়ে তো তাঁকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে যাবে। মায়া উত্তেজিত হলো সশব্দে কেঁদে উঠলো রিদকে ঘুমাতে দেখে। দ্রুততার সঙ্গে রিদের গালে ঠায় পায় মায়ার ছোট ছোট হাত দুটোর। মায়ার বেসামাল ভঙ্গিতে রিদকে জাগ্রত রাখার জন্য মুখে আওড়ায় উত্তেজিত বুলি। দুহাতে রিদের গাল ধরে নাড়াতে নাড়াতে বলে মায়া…

—” ঘুমাবেন না প্লিজ। আমাকে দেখুন! আমার কথা গুলো শুনার চেষ্টা করুন। আপনি ঘুমালে আমি আপনাকে ফিরে পাবোনা আর। আমি আপনাকে হারাতে চাই না। আপনাকে হারানো মতো ধৈর্য আমার নেই। প্লিজ প্লিজ ঘুমাবেন না আপনি।

রিদ বন্ধ দুচোখের পাতা কোনো রকম টেনে মায়ার দিকে তাকানোর চেষ্টা করলো। নিভু নিভু চোখে দেখলো মায়ার পাগলামোর বিলাপ। রিদ মায়াকে বুকে নিতে চাই। তাই মায়ার দিকে নিজের বামহাতটা বাড়িয়ে দিতেই দ্রুত মায়া রিদের বাহুডোরে চলে আসে। রিদ মায়াকে বুকে নিয়ে আবারও বলতে শুরু করে কোনো রকম ভাবে…

—” এইভাবে সবটা শেষ হবে ভাবিনি আমি। তোমাকে গভীর ভাবে ছুঁয়া হয়নি আমার। তোমাকে স্বামীর সোহাগে পূর্ণতা করতে পারলাম না আর না পারলাম দিতে একটা সংসার। অপূর্ণতা থেকে গেলো অনেক কিছু। দুজনের না বলা কথা গুলোও শুনা হলো না রাত জেগে। ভেবে ছিলাম তোমাকে শেষ নিশ্বাস অবধি হেফাজত করবো। সেটাও হলো না। তাই আমি আমার আমানত তোমার হাতে তুলে দিয়ে গেলাম। তুমি তোমার হেফাজত করবে সর্বদা। তুমি আমার আমানত! আমার বিয়ে কথা বউ। তাই আমি স্বামী হয়ে তোমাকে নিষেধ ও আর্দেশ করে যাচ্ছি জীবন কখনো, কোনো পরিস্থিতিতে তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে না। আর না কোনো দ্বিতীয় পুরুষের ছুঁয়া তোমার গায়ে মাখবে। আমি তোমার জীবনের প্রথম পুরুষ ছিলাম তাই আমিই থাকতে চাই বাকি জীবন তোমার প্রথম পুরুষ হয়ে। যাতে মৃত্যু পর অন্তত পরকালে যেন তোমাকে আমি আমার স্ত্রী হিসাবে আল্লাহ কাছ থেকে চেয়ে নিতে পারি, আমার সাথে যেন অন্য কোনো অংশীদার দাঁড়িয়ে না থাকে তোমার দ্বিতীয় স্বামী হিসাবে তোমাকে চাওয়ার জন্য, আল্লাহ কাছে, সেটার দায়িত্বও তোমাকে দিয়ে গেলাম আমি।

দুই সেকেন্ড থেমে রিদ পুনরায় নিশ্বাস টেনে আবারও বলতে শুরু করে..

—” রিত! আমার মৃত্যুর পর তুমি আমার দাদা-দাদিকে নিয়ে সুইজারল্যান্ড চলে যাবে। আমি সব ব্যবস্হা করে রেখেছিলাম পূব থেকেই। আমার জীবনের নিশ্চয়তা ছিলনা বিদায় অনেক আগের থেকে সকল ব্যবস্হা করে রেখেছিলাম পরিবারের নিরাপত্তার জন্য। তাছাড়া আসিফ তোমাদেকে নিরাপত্তা দিবে সবসময়। সেই সাথে সুইজারল্যান্ডের সরকারও তোমাদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখবে স্বয়ং। আমি মারা যাওয়া পর তোমাদের বাংলাদেশে থাকাটা বিপদ জনক হয়ে উঠবে। কারণ আমি একজন গ্যাংস্টার মানুষ আমার বন্ধু নেই শত্রু ছাড়া। আমার মৃত্যুতে তারা আমার পরিবারের উপর অ্যাটাক করবে মরার জন্য। তাই তোমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা আছে। আসিফ বলে দিবে কি কি করতে হবে তোমাদের। তোমরা আসিফের কথা মতো কাজ করবে শুধু। আমি তোমাদের সকল বিষয়ের কাগজ পত্র করে রেখেছি সময়ে সাথে সাথে একটা একটা করে তোমাদের হাতে পাবে। সবটায় গুছিয়ে রেখেছিলাম পূর্ব থেকেই। শুধু তোমাকেই জীবনের পূর্ণতা দিতে পারলাম না বউ। তুমি বাকিটা জীবন নিঃসঙ্গহীন একা কাটাতে হবে। জানি কষ্ট হবে তোমার তারপরও তোমাকে আমি কারও সাথে ভাগাভাগি করতে রাজি নয় বউ। তাই আমি তোমাকে আল্লাহ হাতে শপে দিয়ে গেলাম। তিনি খেয়াল রাখবেন তোমার। তুমি….

রিদকে আর বলতে দিলো না মায়া। মূহুর্তেই ঝাপটে জড়িয়ে নিল রিদকে এবার নিজের বুকে মায়া। মায়া কলিজা কাপছে রিদের কথা গুলো শুনে। পাগল পাগল লাগছে মায়ার নিজেকে! যার রেশ টেনে মায়া রিদের দুগাল আঁকড়ে ধরে নিজের কপাল ঠেকালো রিদের কপালে। পাললের মতো বিলাপ করে বলে উঠলো রিদকে মায়া….

—” প্লিজ এমন করে বলবেন না আমি মরে যাব আপনাকে ছাড়া। আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমি আর অবাধ্য হবো না আপনার কথার, আর না পালাতে চাইবো আপনাকে ছাড়া কোথাও। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দেন, আমি বুঝতে পারিনি। আপনার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ি। আমি কি করবো আপনাকে ছাড়া। আমি বাঁচব না। প্লিজ প্লিজ! আপনি একটু ধৈর্য ধরুন সবঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহ আছে আমাদের সাথে তিনি রক্ষা করবেন আমাদের। আল্লাহ প্লিজ তুমি আমাদের সহায় হও। হেফাজত করো।

মায়ার পাগলের মতো বিলাপের মধ্যে দিয়েই রিদ মিহি সুরে ডাকলো মায়াকে বললো…

—” বউ।

রিদের স্নিগ্ধ ডাকে দ্রুততা সঙ্গে উত্তর বসায় মায়া। উত্তেজিত ভঙ্গিতে রিদের কপাল হতে মাথা উঠিয়ে, রিদের মুখামুখি হয় মায়া। পুনরায় পাগলের মতো করে বলতে শুরু করে মায়া…

—” এইতো!( কাঁপা কাঁপা স্বরে) এইতো আমি কলিজা। আমার কলিজার কষ্ট হচ্ছে ভিষণ। সব ঠিক হয়ে যাবে কলিজা! কিছু হবে আপানার। আমি আছি তো আপনার পাশে। আমার দিকে তাকান। আমাকে দেখার চেষ্টা করুন। আমার সাথে কথা বলতে থাকুন। ঘুমাবেন না কেমন।

মায়ার পাগলামী সূক্ষ্ম হাসার চেষ্টা করলো রিদ। কিন্তু পারলো না তার আগেই মিইয়ে গেলো যন্ত্রণায়। শ্বাস কষ্টে ভুক্তভোগী হয়েও দুষ্টমী স্বরে বললো রিদ…

—” তুমি কি আমার সাথে লাইন মারছো বউ??

রিদের দুষ্টমী স্বরে কথা গুলো মায়ার মন গলাতে পারলো না। আর না মায়ার উত্তেজনা কমাতে পারলো। মায়া আনড় পাগলামি করতে লাগলো রিদের সাথে। রিদ থেকে থেকে ঝিমিয়ে পড়ে ঘুমিয়ে যাচ্ছে মায়ার হাতে। মায়া রিদের গালে আলতো হাতে নাড়িয়ে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করছে অনবরত। কিন্তু বারবার বিফল হচ্ছে মায়া। উত্তেজনায় মায়া কি করবে বুঝতে পারছে না। কিভাবে রিদকে জাগিয়ে রাখবে ঘুম থেকে তাও বুঝতে পারছে না। আশেপাশে কোথাও গাড়ি বা মানুষের চিহ্নও পযন্ত দেখা যাচ্ছে না। সুনশান খালি সুরু রাস্তা ছাড়া। মায়া নিরুপায় হয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো শব্দ করে। কাতর কন্ঠে বললো রিদকে নিয়ে।

—” কি করবো আমি? কোথায় যাব আপনাকে নিয়ে? কিভাবে বাঁচাবো আমি আপনাকে? আপনাকে বাঁচাতে না পারলে আমি মরে যাব। আপনি আমার কলিজা, আমার রুহ, আমার সব। আমি বাঁচব না আপনাকে ছাড়া। আমার নিশ্বাসের বিনিময় হলেও আমার আপনাকে চাই কলিজা। কলিজা আমার প্লিজ ঘুমাবেন না। আপনি ঘুমালে আমি আপনাকে হারিয়ে ফেলবো চিরতরে। আমাকে দেখুন না আপনি। আমি না আপনার বউ। আমাদের না আজকে বিয়ে হয়েছে। কি করব আমি! আল্লাহ সহায় হও তুমি! আমার কষ্ট হচ্ছে ভিষণ। কলিজা আমার আপনাকে ছাড়া কি করে থাববো আমি। কলিজা! ওহ কলিজা! কথা শুনন না আমার! ওহ কলিজা।

রিদ নিভু নিভু চোখে তাকাচ্ছে মায়ার দিকে। কিন্তু কিছু বলতে পারছে না। আর না একেবারে চোখ খুলে রাখতে পারছে, ক্রমশয়ে ঘুমিয়ে পড়তে চাচ্ছে মায়ার হাতে রিদ। মায়া কি করবে বুঝলো না তাৎক্ষণিক কিন্তু কয়েক সেকেন্ডে মাথায় আসলো দারুণ এক পদ্ধতি রিদকে বাঁচানো জন্য এই অবস্থায়। মায়া দ্রুততা সঙ্গে রিদকে নিজের বাহুডোর হতে ছাড়িয়ে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে বসিয়ে, কোনো রুপ চিন্তা ভাবনা না করেই মায়া রিদের বিষাক্ত কালো হয়ে যাওয়া ডানহাতটি চেপে ধরে নিজের মুখে তৎক্ষনাৎ। মায়া সাপের বিষ নিজের মুখে চুষে নিতেই রিদ খানিকটা নড়ে উঠে মায়ার হঠাৎ কান্ডে। সাপে কাটলে প্রাথমিক চিকিৎসা অনুযায়ী সাপের বিষ মুখে চুষণ করে বের করলে আক্রান্ত ব্যক্তি বেঁচে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে অনেকটা। কিন্তু যে ব্যক্তি রোগী বিষ চুষে বের করবে, সেই ব্যক্তির জীবন ঝুকিপূর্ণ হয়ে যায়। এবং মৃত্যুর আশংকা থাকে অনেক বেশি। তাই এইসকল কাজ এক্সপার্ট ছাড়া অন্য কেউ করা মানেই মৃত্যু অবধারিত সেই ব্যক্তির।

তাছাড়া মায়া কোনো এক্সপার্ট নয়। এমনকি প্রাপ্ত বয়স্ক কোনো ব্যক্তিও নয়। সে অবুঝ! তাই মায়ার ক্ষেত্রে বিষ চুষে বের করতে গিয়ে উল্টো গিলে ফেলবে বেশি। ফলাফল হিসাবে মায়ার ও মৃত্যু অবধারিত। রিদ খানিকটা আতংকে উঠে। তাই সময় নষ্ট না করে নিজের নিস্তিয়ে যাওয়া দুর্বল বামহাতে তৎক্ষনাৎ মায়াকে ধাক্কা দেয় বিষ চুষা থেকে। মায়া খানিকটা ছিটকে উপুড় হয়ে পড়লো রিদের ছড়িয়ে রাখা পায়ে উপর। রিদের হঠাৎ ধাক্কার তাল সামলাতে না পেরে অসাবধানতার কারণে মায়ার মুখে যতটুকু বিষ চুষে ছিল রিদের হাত থেকে সেই সবটুকু বিষ গিলে ফেলে মূহুর্তেই। কিন্তু তারপরও দমে গেলো না বিন্দুমাত্রও। পুনরায় উঠে আগের ন্যায় রিদ ডানহাতটি চেপে ধরে মুখে। তবে এবার শক্ত করে চেপে ধরে মুখে যাতে রিদ ধাক্কা দিলেও উল্টে না পড়ে পাশে। রিদ পুনরায় মায়াকে থামাতে চাই। ধাক্কা দিতে চাই কিন্তু তাঁর আগেই মায়া একহাতে রিদের বামহাতটা শক্ত করে চেপে ধরে রিদের উরুতে। রিদ বার কয়েক চেষ্টা করে মায়ার হাত হতে নিজের হাতটা সরানোর, কিন্তু মায়ার সবল শক্তি সাথে রিদের দুর্বল শক্তি পেরে উঠলো না। রিদ নিজের চোখ টেনে টেনে মায়াকে দেখার চেষ্টা চালিয়ে রাখলো। কিন্তু মায়া ততক্ষণ পর্যন্ত বিষ টেনে রিদের হাত থেকে বের করলো যতক্ষণ না পযন্ত মায়া রিদের কোলে টলে পড়েছে। মায়া দীর্ঘ সময় নিয়ে রিদের হাত থাকে বিষ চুষে চুষে টেনে বের করলো। একটা সময় মায়া নিজেই সেই বিষের তাড়নায় রিদের কোলে ঢলে পড়লো। রিদের বামহাতটি চেপে ধরা অবস্থায়। রিদ নিভু নিভু চোখে দেখেছিল মায়াকে নিজের কোলে ঢলে পড়তে। কিন্তু সেও নিজের শেষ রক্ষা করতে পারলো না মায়ার। মায়ার সাথে সাথে সেও ঘুমিয়ে পড়ে গাড়ি সাথে হেলান দিয়ে।

সুনশান ফাঁকা রাস্তায় দুজন দুজনার সঙ্গী হয়ে পড়ে রইলো নিবিড়ভাবে। কেউ কাউকে বাচাতে বুক ফাটা আতনার্দ করলো না। ছটফট করলো না অসহায়ত্ব প্রকাশ করে। দু’জনই সহায় হলো একে অপরের মৃত্যুতে। এখন প্রশ্ন থাকলো মায়া কি রিদের হাত হতে সম্পূর্ণ বিষ চুষে বের করতে সক্ষম হয়েছিল?? নাকি মায়ার বিষ চুষার আগেই রিদের শরীরের সেই বিষ ছড়িয়ে পড়েছিল? তাছাড়া মায়া যে দীর্ঘ সময় নিয়ে রিদের হাত হতে বিষ চুষণ করলো তা কি সম্পূর্ণ নিখুঁত ভাবে এক্সপার্ট মতো করতে পেরেছিল?? নাকি বিষ চুষণ করতে গিয়ে মায়া নিজের অসাবধানতায় গিলে ফেলেছিল অনেকটা?? কে বাঁচবে মায়া নাকি রিদ?? নাকি দু’জনই একিই বিষের কাতর হয়ে মৃত্যুকে আঁকড়ে ধরলো?? প্রশ্ন থাকে অনেক উত্তর নেই একটারও। নিস্তব্ধ পরিবেশে সন্ধ্যা নেমে আসছে ধরনীর বুকে।

( প্লিজ কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর না ফালতু বলে বকাঝকা করবেন। এতে লেখিকা কষ্ট পায়। গল্পের নেক্সট পার্টে পরিষ্কার ভাবে বলে দেওয়া হবে সবকিছু। ধন্যবাদ সবাইকে)

#চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply