Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৮


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

২৮
—” বললাম তো আপনাকে বলা যাবে না। আপনি দাদীকে ফোন করে বলুন এখানে আসতে। তাহলেই হবে।

থেমে যায় উনি। কপাল কুঁচকে আমার দিকে সূক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই কিছু মনে পড়ার মতো চকিত হয়ে বলে উঠেন…

—” ওয়েট! আজকে যেন কত তারিখ?( মনে পড়তেই) শিট! তোমার না আজকে পিরিয়ডের ডেট ছিল? ভুলে গেছ রাইট? আমারও মাথা থেকে ছুটে গিয়েছিল ডেট-টা। শিট!

কানে যেন ঝংকার তুললো উনার কথা গুলো। স্তব্ধ নিবাক হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। মাথা আমার এক মূহুর্তের জন্য হ্যাং হয়ে গেলো যেন। উনি কি বললো? আমার পিরিয়ডের ডেট উনার মাথা থেকে ছুটে গেছে? তারমানে উনার আমার এই সম্পর্কে ও অবগত ছিল? কিন্তু কখন থেকে জানেন আমার এই বিষয়ে গুলো? কে বলেছে আমার এসব বিষয়ে উনাকে? ছিঃ ছিঃ কি লজ্জাজনক পরিস্থিতি। ছেলে হয়ে মেয়েদের বিষয় গুলো খুঁজ খবর রাখে কতটা বাজে আমার বাতিল স্বামীটা ছিই। লজ্জায়, সংকোচে চোখ তুলতে পারলাম না উনার সামনে। কান্না থেমে গেলেও লজ্জা মাথা নত করে বসলাম। নাক মুখ ছিটকে বলে উঠলাম….

—” ছিই! কতটা বাজে আপনি! ছেলে হয়ে মেয়েদের পার্সোনাল বিষয়ে জানেন আপনি। ছিই!

হয়তো আমার নাক মুখ ছিটকানোতে অসন্তুষ্টি হয়েছেন উনি। উনার স্বাভাবিক থাকা বংগিটা রুপ নিল রাগের। তেতে উঠে আমাকে উদ্দেশ্য করে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো….

—” সেই!! তুমি নিজের ডেট মনে রাখতে পারো না। সেটাতে দোষ নেই। আমি ছেলে হয়ে মেয়েদের পার্সোনাল বিষয় জানি বলে দোষ?

চট করে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বললাম…

—” হুমম দোষ! ছেলেদের মেয়েলি বিষয় জানতে নেই। যে ছেলেরা মেয়েদের এইসব বিষয়ে খোঁজ খবর রাখে তাঁরা কক্ষনো ভালো ছেলে হয়না। আপনিও বাজে ছেলে। আমার বিষয়ে জানেন আপনি। সাংঘাতিক বাজে আপনি!

তেতে উঠে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো…

—” শাট আপ ইডিয়ট! মুখে যাহ আসে তাই বলা আজকাল স্বভাব হয়ে দাড়িয়েছে তোমার। মুখ আমি সেলাই করে দিব। আজকে বাসায় যেয়ে নিই একবার। মুখটা ভেঙ্গে হাতে ধরিয়ে দিব তোমার। দেখিও!

ভয়ে কেঁপে উঠলাম আমি। উনার কটমট করা দৃষ্টিতে অসহায় চোখ তুলে তাকাই আমি। আমাকে তাকাতে দেখে পুনরায় আগের ন্যায় বলে উঠলো উনি(রিদ)…

—” ইডিয়ট! মেয়েদের বিষয়ে জানা খারাপ কে বললো তোমায়? অবশ্য হাঁটু নিচে বুদ্ধি নিয়ে ঘুরলে এমনই হয়। ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন! তোমার জম্মের আগ থেকেই মেয়েদের পিরিয়ড সব সম্পর্কে জানা আমার। আমার সাথে তোমার যখন বিয়ে হয়, তখন তোমার বয়স ছয় বছর হলেও আমার ছিল ষোল বছর। তোমার থেকে দশ বছরের বড় আমি। সাথে সাইন্সের স্টুডেন্ট ছিলাম। অতি সহজেই সবকিছুর আয়ত্তে ছিল আমার। তোমার এখনো যে সম্পর্কে জানা, বুঝা, ধারণা নেই। আমার তখন সেই সকল বিষয়েই জানা, বুঝা, ধারণা হয়ে গেছিল। কলেজের স্টুডেন্ট ছিলাম তখন। এস এস সি পরীক্ষা শেষ করে তোমাকে বিয়ে করেছিলাম আমি। অনাহেষেই সকল বিষয়ের জানা ছিল আমার। ভিডিও দেখেছিলাম বেশ। তাই প্র্যাকটিক্যালি অভিজ্ঞতা না থাকলেও টেকনিক্যালি অভিজ্ঞতাটা বেশিই ছিল আমার।

উত্তেজিত কন্ঠে চট করে বলে বসলাম….

—” কিসের ভিডিও? পিরিয়ডে ভিডিও থাকে ছিই!

—” ছিই কি আছে? সবাই দেখে আমি দেখছি। ভালো তো ছিলাম না কখনোই। তাই খারাপটায় করছি।পিরিয়ডের ভিডিও দেখতে যাব কেন? আমার কি খেয়ে দেয়ে আর কাজ নাই নাকি? গভীর ভিডিও দেখছি তখন বুঝছো। কিসের ভিডিও দেখছি সেটা আমার সেকেন্ড টাইম বাসরে বলবো প্র্যাকটিক্যালি কেমন। আপাতত অপেক্ষায় থাকু।

কপাল কুঁচকে এলো উনার খাপছাড়া কথায়। আশ্চর্য! একটা ভিডিও সম্পর্কে জানতে আমাকে উনার বিয়ে অবধি অপেক্ষা করতে হবে? কি এমন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে ভিডিওতে যে বিয়ে ছাড়া বলা যাবে না? হঠাৎ চমকে উঠলাম নিজের মাঝে। ভাবলাম! আচ্ছা উনি কি আবারও বিয়ে করতে চাচ্ছেন কাউকে? কিন্তু কাকে? উনার কি গার্লফ্রেন্ড আছে? হয়তো বা আছে! উনার(রিদ) পুনরায় বিয়ে, গার্লফ্রেন্ড, সম্পর্কে মাথায় আসতেই ক্যাচ করে উঠলো বুকের ভিতরটা আমার। অজানা অস্থিরতা তোলপাড় শুরু হলো মনে কোঠায়। নিজের সংযম করতে না পেরে চট করে প্রশ্ন করে উঠলাম উনাকে…

—” আপনি আবারও বিয়ে করবেন?

কপাল কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বললো…

—” আপাতত চিন্তা করি নাই কিছু। তবে কথা যেতে পারে মনে হয়।

উনার ছোট একটা উত্তরের বুক ভারি হয়ে আসলো আমার। কথা বাড়ালাম না আর। জানতেও চাইলাম না আর কিছু। প্রচন্ড কষ্ট নিয়ে দৃষ্টি নত করলাম। মনের অজান্তেই চোখ টলমল করে উঠলো আমার। বুঝলাম না কষ্ট কিসের লাগছে আমার। তবে তীব্র কষ্টে গলা ভারি হয়ে আসছে ক্রমাগত। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে রাশি ভারি কন্ঠে কোনো রকম বলে উঠলাম…

—” প্লিজ দাদীকে ফোন করুন আসতে। আমি বাসায় যাব।

একরোখা কন্ঠে বললো…

—” পারবো না আমি কাউকে ফোন করতে।

—” তাহলে ফোনটা আমাকে দিন। আমি নিজেই দাদীকে কল করে নিব। দিন!

—” আমার ফোনে টাকা নেই। ব্যালেন্স শেষ!

টলমল চোখ তুলে তাকালাম উনার দিকে। উনি আমার সাথে এমন করছে কেন? উনি কি বুঝতে পারছে না আমার পরিস্থিতিটা? এখানে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারবো না। ধীরে ধীরে সমস্যা বাড়বে বয় কমবে না।

—” আপনি বুঝতে পারছেন না আমার সমস্যা হচ্ছে এখানে বসে থাকতে? প্লিজ ফোনটা দিন। নয়তো আমাকে বাসায় নিয়ে যান এখান থেকে।

আমার কথা গুলো যেন পছন্দ হলো না উনার। এক মূহুর্তেই রেগে গেলেন আমার কথায়। তেতে উঠে পুনরায় আমাকে উদ্দেশ্য করে ঝাঁঝালো কণ্ঠের বললো…

—” হোক সমস্যা! নিব না তোমাকে আমি বাসায়। সামান্য একটা ডেট মনে রাখতে পারো না তুমি? এতটা কেয়ারলেস? চল! আজকে তোমাকে আমি এই অবস্থায় হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে বাসায় নিয়ে যাব সবার সামনে দিয়ে। এটা তোমার শাস্তি। উঠু!

উনার কথা আতংকে উঠলাম আমি। মনে মধ্যে ভয়রা বাসায় বাঁধলো ঝাঁকে ঝাঁকে। উনি আমাকে এই অবস্থায় বাহিরে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন তাও আবার পায়ে হাঁটিয়ে? চারপাশের লোকজন আমাকে বাজে নজরে দেখবে! খারাপ কথা বলবে! সেটা কি উনি বুঝতে পারছেন না? এতটা নিষ্ঠুর কেন উনি? সামান্য দয়া মায়াটুকু কি লাগে না আমার জন্য? এতটা অপছন্দ অপ্রিয় আমি উনার(রিদ) কাছে? নিজের ডেট কি আমি ইচ্ছা করে ভুলে গেছি? নাকি মনে ছিল না আমার। কিভাবে বুঝাবো সেটা তাঁকে আমি? বুঝবে সে আমার কথা? নিজের অজান্তে দুই ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। ছলছল নয়নে তার দিকে তাকিয়ে থেকে অসহায় কন্ঠে বলে উঠলাম।

—” আমি ইচ্ছা করে ডেট ভুলেনি। ভুল করে ভুলে গেছি! আপনি দাদীকে ফোন কুরুন প্লিজ! আমি কথা বললো দাদীর সাথে। আমার সম…..

—” স্যার আপনার পার্সেল! সাথে মেডিসিন!

আমার কথার ইতি ঘটলো না তার আগেই আগমন ঘটে অতি সুন্দরী হোটেলের মেনেজার কন্যাটির। আমার কথা মধ্যেই প্রবেশ ঘটলো মেয়েটির। হাতে কালো পলিথিন মোড়ানো একটা প্যাকেট রয়েছে। সেই সাথে রইয়েছে একপাতা মেডিসিনের ট্যাবলেট। সভ্য সূলভ হাসি মুখে উনার দিকে তাকিয়ে জিনিস গুলো এগিয়ে দিচ্ছেন মেয়েটি। উনি ঘুরে তাকালো না মেয়েটির দিকে, উনার(রিদ) রাগান্বিত দৃষ্টি স্থির আমার উপর। মেয়েটির কন্ঠ শুনে গম্ভীর মুখে আমাকে ইশারায় করে মেয়েটিকে বলে উঠলো….

—” মেডিসিন আমাকে, আর পার্সেলটা ম্যাডামকে দিন।

কথা মতো মেডিসিনের পাতাটি উনার হাতের পাশে টেবিলে রাখে মেয়েটি। উনাকে দেখে নিয়ে চোখ আওড়িয়ে তাকালো আমার দিকে। আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম মেয়েটির দিকে। মেয়েটি আমার দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। আমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হয়তো মেয়েটি অপদস্তক হলো যেটা চেহেরায় স্পষ্ট জানান দিচ্ছে তার। নিজের অস্বস্তিতা নিয়ে মেনেজার মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে সভ্য সূলভ হাসি দেওয়ার চেষ্টা করে। কালো ব্যাগের পার্সেলটি আমার হাতে তুলে দিয়ে নিঃশব্দে চলে যায় নিজ গন্তব্যে উদ্দেশ্য বিনাবাক্য ব্যয়ে। কিন্তু যেতে যেতেও বার কয়েক আড়চোখে তাকায় আমার বাতিল স্বামীর দিকে। যেটা আমার মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না। কিন্তু তারপরও চুপ থাকলাম। আমি মেয়েটির চলে যাওয়া দেখছিলাম তখনই খচখচ শব্দ কানে আসলো আমার। আমি চোখ ঘুরিয়ে উনার(রিদ) দিকে তাকাতেই উনি মেডিসিন পাতা থেকে একটি ট্যাবলেট ছাড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে শান্ত বংগিতে বললো….

—” এটা খেয়ে নাও পেটে ব্যথা করবে না। আর পার্সেলের মধ্যে তোমার প্রয়োজনীয় সবকিছু রাখা আছে। ওয়াশরুম গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসু যাও।

উনার এমন কথায় মাথা ঘুরে উঠলো আমার। হা হয়ে বড় বড় চোখ করে উনার দিকে তাকালাম। আল্লাহ! উনি এসব কখন ব্যবস্হা করেছেন আমার জন্য।
উনিতো এতক্ষণ যাবত আমার সামনেই বসা ছিল তাহলে? উনি কি আমার সাথে কথা বলার সময় হোটেল ম্যানেজমেন্টে মেসেজ করেছিল মেয়েটিকে আমার জন্য এসব আনার? এই মেয়েকে দিয়ে আমার জন্য মেয়েলি জিনিসপত্র আনিয়েছেন শুধু কি আমার বিষয় গুলো গোপন রাখার জন্য? তারমানে উনি আমাকে এতক্ষণ যাবত কম্ফোর্টেবল ফিল করানোর জন্য, আমাকে একা রেখে বাহিরে যায়নি? আমার ভাবনা গুলো কি সত্যি? তাহলে কি সত্যি উনি এতটা চিন্তা করেন আমার জন্য! নাকি অন্য কিছু? প্রশ্ন করবো? না থাক এই মূহুর্তে প্রশ্ন না করায় ব্যাটার। আগে নিজেকে গুছিয়ে নেই তারপর নাহয় প্রশ্ন করা যাবে উনাকে। কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ উনার হাত থেকে মেডিসিন নিয়ে খেয়ে নিলাম। প্যাকেটটি হাতে নিয়ে দাঁড়াতেই পিছনে দিক লক্ষ করে সাথে সাথে বসে গেলাম জায়গায়। আমার সাদা জামা, সাদা এপ্রোনটায় লাল দাগ লেগে গেছে অনেকটা। এই অবস্থায় উনার সামনে দিয়ে হেঁটে ওয়াশরুম অবধি যেতে পারবো না লজ্জা সংকোচে। আমি মাথা নত করে পুনরায় বসে পড়তেই খানিকটা কপাল কুঁচকে আসে উনার। আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠে…

—” কি? যাও না কেন?

আমি উত্তর দিলাম না। অস্বস্তিতে হাসফাস করতে লাগলাম৷ আড়চোখে তাকালাম উনার দিকে। সাথে সাথে চোখাচোখি হলো উনার সাথে আমার। কারণ উনি এতক্ষণ যাবত আমার দিকেই কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল৷ আমি তাকানোতেই সাথে সাথে চোখ মিলল দুজনের। উনি আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে তাকার পর চট করে উঠে দাঁড়িয়ে আমার সামনে এসে হাজির হলো। নিজের গায়ের কালো কোটটা টেনে খুলতে খুলতে আমাকে উদ্দেশ্য করে ধমক স্বরে বললো….

—” এই মেয়ে উঠু…

কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ আমি উঠে দাঁড়াতেই, উনি চট করে উনার গায়ের কোটটা সাথে সাথে আমার কমড়ে বেঁধে দিতে দিতে বলে উঠে….

—” বিনা মূল্যে সুতাও আগলাই না আমি। সেবা যত্ন করেছি আপনার । তার পারিশ্রমিক চাই আমার। পারিশ্রমিক না পেলে নেক্সট টাইম আপনাকে বেঁধে রাখবো আমি। মনে রাখবেন ম্যাডাম। যান এবার আপনি।


কারো তীব্র গুন গুন করা শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো আমার। তীব্র বিরক্তিতে বন্ধ চোখের পাতা দুটো কুঁচকে এলো মূহুর্তেই। ঘুমের রেশ কাটিয়ে চোখ মেলে দেখতে পারছিনা গুন গুন কারী ব্যক্তিটি কে? তারপরও কোনো রকম ঘুমের চোখ টেনে মেলে সামনে তাকায়। কিছুটা সময় লাগলো চারপাশের পরিস্থিতিটা বুঝতে। নিজের অবস্থান বুঝতে পারলাম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। কাত হয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে আছি আমি। বিকালের দিকে বাসায় ফিরে গোসল করে ক্লান্তিতে বিছানা হাত পা গুটিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন কয়টা বাজে তা জানা নেই। তাই হালকা মাথাটা উঁচু করে দেয়াল ঘড়ির সময়টা দেখে নিলাম। রাত এগারোটা বাজে। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে অসময় করে ঘুমিয়ে ছিলাম। তাই উঠতে উঠতে রাত হয়ে গেলো। কিন্তু আশ্চর্য কেউ আমাকে ডাকলো না কেন ঘুম থেকে উনার জন্য? অন্য সময় হলে তো দাদী আমার অসময়ে ঘুমের জন্য ডেকে তুলে দেন। তাহলে আজ ডাকলো না কেন? চিনচিন মাথা ব্যথায় বিরক্তিতে মাথা চেপে ধরে উঠে বসলাম নিজের বিছানায়। মাথা দুপাশ ঢলতে ঢলতে চারপাশে চোখ বুলালাম নীরবে। আমার রুমে আপাতত কেউ নেই। তাহলে গুন গুন শব্দটা আসছে কোথায় থেকে। শব্দের উৎস ধরে বারান্দার দিকে তাকাতেই বুঝলাম কেউ আমার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আর সেই ব্যক্তিই শব্দটা করছে। বিছানা থেকে নেমে বারান্দা দরজার সামনে গিয়ে দাড়ালাম। দেখলাম ফিহা আপু কারও সাথে গুন গুন শব্দ করে ফোনে কথা বলছে হেঁসে হেঁসে। বিষয়টি আমার কাছে বেশ একটা সুবিধা মনে হলো না। সর্তক কান খাড়া করতেই শুনলাম। ফিহা আপু কাউকে জান! জান! বলে সম্মোধন করে কথা বলছে। ফিহা আপুর কথা ধরণে বুঝলাম আপু কারও এই মূহুর্তে গভীর প্রেম করছে তাই আমার উপস্থিতটা ধরতে পারছেন না এখনো।

—” কার সাথে কথা বলছো আপু?

আমার হঠাৎ কথায় থমথমে খেয়ে যায় ফিহা আপু। চমকে উঠে আমার দিকে ঘুরে উত্তেজিত বংগিতে চট করে নিজের কলটি কেটে দেয় সঙ্গে সঙ্গে। বলে উঠে..

—” তেমন কারও সাথে না। একটা ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছিলাম আরকি।

কথা গুলো বলতে বলতেই আমার দিকে এগিয়ে আসলো ফিহা আপু। আমার কপালে একটা হাত রেখে চেক করে বললো….

—” এখন কেমন লাগছে তোর? জ্বর সেরেছে? সন্ধ্যার দিকে শুনলাম তোর নাকি হালকা জ্বল এসেছিল?

জ্বরে কথা শুনতে কপাল কুঁচকালাম। আমার জ্বর এসেছিল কবে? কিছু মনে পড়ছে না। যতটুকু মনে আছে রেস্টুরেন্টে থেকে উনি আমাকে খান বাড়ির গেইট অবধি দিয়ে চলে যায় নিজের কাজে। বাড়ির ভিতরে আসেনি। তারপর আমি রুমের এসে ফ্রেশ হয়ে লম্বা ঘুমে এইমাত্র উঠলাম। এর মধ্যে জ্বর আসলো কবে?

—” আমার জ্বর হয়েছিল কবে?

—” সন্ধ্যা থেকেই। নানুমাকে দেখলাম তোর পাশে বসে থাকতে। টেনশন করছিল তোর জন্য। তোর নাকি হঠাৎ জ্বর হলে অবস্থা খারাপ হয়ে যায় নানুমা বললো? এতক্ষণ যাবত তোর সাথেই ছিল বসা। কিছুক্ষণ আগে রিদ ভাইয়া বাসায় আসলো। তাই নানুমা রিদ ভাইয়ার কাছে গেছে? আমাকে তোর কাছে বসিয়ে দিয়ে গেছে তোর খেয়াল রাখতে।

ফিহা আপু কথায় ছোট করে উত্তর ‘ওহ’ বলে পুনরায় রুমে এসে বিছানা বসলাম পা ঝুলিয়ে। আমার পিছন পিছন ফিহা আপুও রুমে এসে আমার পাশে বসতে বসতে বলে উঠে…

—” জানিস? রিদ ভাইয়ের হঠাৎ বাড়ি ফিরে আসাতে নানুমা কত খুশি? খুশিতে পারে না রিদ ভাইয়াকে কোলে নিয়ে রাখতে। তোর দেখা দরকার ছিল। আর হবেই না কেন বল? যেখানে রিদ ভাইকে দুই বছরে একবারও বাংলাদেশে মাটিতে টচ মেরে পাওয়া যায়না। সেখানে রিদ ভাই ছয় মাসে দুইবার চলে আসছে বাংলাদেশ। প্রথমে পাঁচ মাসে আসলো। এবারতো একমাসে চলে আসছে বাড়িতে। রিদ ভাইয়ের হঠাৎ এতটা পরিবর্তন ভাবা যায় বল? তাই নানুমাও খুশিতে কাঁদে আর রাঁধে রিদ ভাইয়ের জন্য। তুই কিচেনই পাবি দাদীকে এই মূহুর্তে। চল নিচে যায়।

ফিহা আপু সঙ্গ নিয়ে নিচে চলে আসলাম। মাথার সাথে সাথে তলপেটের চিনচিন ব্যথাও করছে তীব্র। চোখে মুখে ঘুমের রেশ তখনো কাটেনি আমার। হালকা ফোলা ফোলা ভাবটা তখনো ছিল। দীর্ঘ সময় অবেলা ঘুমানোর কারণে চোখ মুখ ফোলে গেছে। নিচে আসার সময় নিজের রুমের আয়নাটা দেখে এসেছিলাম আমি। গায়ে আমার হালকা পেস্ট কালারের কুর্তি জড়ানো। হালকা ভেজা চুল গুলো এলোমেলো ভাবে হাত খোপা করে গায়ে লম্বালম্বি ভাবে ওড়ানো জড়ালাম। দুহাতে পেস্ট কালারের রেশমি চুড়ি। নিচে আসার সময় পড়ে এসেছিলাম। দাদীর আমার চুড়ির শব্দটা নাকি বেশ পছন্দ তাই সবসময়ই চুড়ি পড়ে থাকতে হয় আমাকে। আমার বেশ পছন্দ চুড়ি পড়া। তাই কখনো চুড়ি পড়া নিয়ে অমত বা বিরক্তিবোধ করি না। সাচ্ছন্দ্যে পড়ে বেড়ায়। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে ড্রয়িংরুমে চারপাশে নিরবে চোখ বুলিয়ে নিলাম। পুরো ড্রয়িংরুম খালি কেউ নেই কোথাও। আমি ফিহা আপু সাথে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে পড়লাম। দুর্বলতায় সোফায় গা এলিয়ে দিতে কানে আসলো ফিহা আপুর কথা। সে বলে উঠে….

—” কফি খাবি?

চোখ বন্ধ করে ছোট উত্তরে বললাম…

—” হুমমম

—” কি সোনামা জ্বর সেরেছে তোমার? নিচে চলে আসলে যে।

হঠাৎ দাদাজানের কন্ঠে খানিকটা চমকালেও চোখ খোলে তাকালাম না সামনে দুর্বলতায়। নিজের চোখ বন্ধ রেখেই মৃদু হেঁসে বললাম…

—” আমার জ্বর টর কিছু হয়নি দাদাজান। আমি ঠিক আছি। উল্টো তোমার বউ আমার নামের মিথ্যা কথা রটাচ্ছে আজকাল।

চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় বুঝতে পারলাম দাদাজান আমার পাশে বসছেন। আমার কপালে হাত রেখে তাপমাত্রা চেক করতে করতে বলছেন….

—” জ্বরটা নেই তেমন। শরীরটা কি দুর্বল লাগছে তোমার?

—” একটু!

কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা কানে আসলো না আমার। কিন্তু ঠিক তার কিছুক্ষণ পরই দাদাজান বলে উঠে…

—” শুনলাম! আজকে নাকি তুমি বান্ধবীদের সাথে পায়ে হেঁটে বাসায় এসেছো? এটা কি ঠিক বলো। যদি কোনো সমস্যা হতো তাহলে? তুমি এখনো ছোট। একা চলাচলের বয়স হয়নি তোমার এখনো সোনামা। তাহলে এই ধরনের পাগলামো কেন করো বলতো?

—” আমি ছোট না। আমি বড় হয়ে গেছি দাদাজান। তাই এখন কলেজ শেষ করে একটা বড় চাকরিও নিয়ে নিব এবার।

আমার কথায় যেন চমকালো ফিহা আপু। দাদাজান কথা বলতে না পারলেও ফিহা আপু হতবাক সুর কানে আসলো আমার…

—” তুই চাকরি করতে চাস মায়া?

চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় ছোট উত্তরে বললাম…

—” হুমমম।

দ্রুততার সঙ্গে বলে উঠলো ফিহা আপু….
—” মানে? ইন্টার পাস করে কি চাকরি করবি তুই?

—” রিদ ভাইয়ের বাচ্চাদের টিউটর হবো।

মূহুর্তেই চিৎকার আসলো কানে ফিহা আপুর। মৃদু চিৎকারে বলে উঠলো…

—” কি?
বিরক্তি নিয়ে বললাম…
—” ফিহা আপু তুমি কি কানে কম শুনো নাকি ইংলিশ কম বুঝ? কোনটা? বললাম তো রিদ ভাইয়ের বাচ্চা কাচ্চাদের টিউশন মাস্টার হবে।

অবশেষে পাশ থেকে দাদাজানের হতবাক কন্ঠ কানে আসলো আমার। তিনি বললেন….

—” পড়াশোনা করে মানুষ ডাক্তার, ইন্জিনিয়া, বা দেশের বিভিন্ন উচ্চ পদে যাওয়া স্বপ্ন দেখে আর তুমি রিদের বাচ্চার টিউশন মাস্টার হওয়া স্বপ্ন দেখু? কিন্তু কেন???

এবার চোখ মেলে তাকায় পাশে বসে থাকা দাদাজানের দিকে। সোজা হয়ে বসে দাদাজানকে উদ্দেশ্য করে বললাম….

—” কারণ দুটো দাদাজান। প্রথমত্ব তোমার বউ রোজ বিশবার করে হলেও রিদ ভাইয়া নামে আমাকে খুঁটা দেয় পড়া নিয়ে। রিদ ভাইয়া মেধাবী স্টুডেন্ট ছিল, আমি কেন রিদ ভাইয়ার মতো মেধাবী হতে পারিনা। এই একটা খুঁটা শুনতে শুনতে আমি ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছি। তাই রিদ ভাইয়াকে কিছু করার মতো ক্ষমতা আমার নেই। উনি বড় মানুষ আর আমি ছোট মানুষ তাই। কিন্তু রিদ ভাইয়া বাচ্চা কাচ্চা গুলো তো আমার থেকে ছোট থাকবে তাই না?? আমার রিদ ভাইয়ার উপর হওয়া সকল রাগ উনার বাচ্চাদের উপর দিয়ে প্রতিশোধ নিব। পড়া না পারলে ঠুসঠাস মারবো। সারাদিন পড়াবো আর সারাদিন বকবো। বলবো তোমরা গাধা। আমার ট্যাগ রিদ ভাইয়ার বাচ্চাদের উপর চাপিয়ে দিব মনে শান্তিতে। দ্বিতীয়ত্ব রিদ ভাইয়া হলো বড়লোক মানুষ। উনার টাকা বেশি। আমি ফাঁকিও দিব বেশি। ছয় নয় করে উনার টাকা মেরে খাব। দাদীকে তোমাকে অধেক অধেক ভাগ দিব দাদাজান। উনার একটা বাচ্চায় এক লক্ষ নিব। আর দশটা বাচ্চা পড়াবো দশ লাক্ষ নিব। দশ হাজার টাকার টিউশনিতে উনার থেকে দশ লাক্ষ টাকা নিব আমি। রিদ ভাইয়া বুঝতেই পারবে না আমি কিভাবে উনার টাকা মেরে দিব। হলো না গ্রেড বুদ্ধি!

আমি আর কিছু বলতে যাব তার আগেই পাশ থেকে ফিহা আপু আমার একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরে থামিয়ে দিয়ে বলে….

—” চেপে যাহ বইন। এবার অন্তত আর বলিস না। তোর যে এতো বড় বড় প্ল্যানিং ছিল পেটে। সেটা বের করার আগে পাশে একটা বার অন্তত দেখে নিতি বইন। নিজেও বাঁচতি নিজের প্ল্যানিংটাও বাঁচাতে পারতি।

ফিহা আপুর কথা গুলো বোধগম্য হলো বা আমার। তাই কৌতূহল চোখে তাকিয়ে তাকলাম আপুর দিকে। তখনই কানে আসলো দাদাজানের উচ্চ শব্দে হাসির সুর। আমি পাশ তাকাতেই দাদাজান হাসতে হাসতে বললো…

—” প্ল্যানিংটা সেই ছিল সোনামা। সমস্যা নেই আমি রেফার করে দিব রিদের দশ বাচ্চাকে পড়ানোর জন্য তোমায়। টাকাও আমরা দশ লক্ষই নিব রিদের থেকে। কি রিদ দিবিনা তোর দশ বাচ্চাকে পড়ানোর জন্য দশ লক্ষ টাকা আমাদের হ্যাঁ??

দাদাজানে এমন কথায় মূহুর্তে চমকে উঠলাম আমি। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই চোখে পড়লো উনি(রিদ) সোফার একপাশে পায়ে উপর পা তুলে বসে আছে ফোন হাতে নিয়ে। তবে দৃষ্টি উনার ফোনে নয় আমার দিকে তাক করা কপাল কুঁচকে। আমি ভয়ে শুকনো ঢুক গিলে ফিহা আপুকে মূহুর্তেই ফিসফিস করে বললাম…

—” আপু উনি কবে আসলো এখানে?

—” শুরু থেকে এখানেই ছিল রিদ ভাই। তুইই দেখিসনি গাধী। নানাভাইয়ের সাথে এসেছিল। তোর প্রতিটা কথায় শুনছে রিদ ভাই।

ভয়ে গলা শুকিয়ে কাট আমার। আল্লাহ উনি যে রাগী মানুষ। এখন নিশ্চিত আমাকে একা পেলে মাথার উপর তুলে আছাড় মারবে। ভয়ে শুকনো ঢুক গিললাম কয়েকবার তখনই কানে আসলো আবারও দাদাজানের মাস্তির কথা…

—” রিদ তোর দশটা বাচ্চার টিউশন মাস্টার কিন্তু আমার সোনামাই হবে মনে রাখিস। তোর বাচ্চাদের টিউশন মাস্টার খোঁজা হয়ে গেছি বুঝলি। তুই শুধু টাকা গুলো আমাদের একটু বেশি করে পুষিয়ে দিবি কেমন।

অসহায় চোখ আওড়ালাম দাদাজানের উপর। এক পলক দাদাজানকে দেখে নিয়ে পুনরায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় উনার(রিদ) দিকে। উনি তখনও কপাল কুঁচকে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। গম্ভীর মনোভাব তার। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উনার দৃষ্টি আমার থেকে সরিয়ে নিজের ফোনে স্থির করলো বিরক্তিতে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কানে আসলো উনার অস্পষ্ট সুরের ধ্বনি।

—” স্টুপিড!

চলিত…….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply