দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৭
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
২৭
—” কি হচ্ছে এখানে?
খুব পরিচিত কন্ঠ স্বর কানে আসতেই কেঁপে উঠলাম আমি। আমার দাপাদাপি লাফালাফি বন্ধ হলো মূহুর্তে। স্থির হলাম। শরীরময় মৃদু কেঁপে জানান দিল আমার মনের ভয়ে সুপ্ত কারণটা। আমার ভয়াৎ ব্যক্তি। যাকে আমি দুনিয়ায় সবচাইতে বেশি ভয় পায়। আমার যমরাজ। যে কথা কারণ ছাড়ায় আমাকে ঠুসঠাস লাগায়। আমার নিষ্ঠুর রিদ ভাই। এই মূহুর্তে তিনি আমার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে। হ্যাঁ আমি উনার উপস্থিত বুঝতে সক্ষম হচ্ছি। উনার শরীরের তীব্র পারফিউম ঘ্রাণটা হওয়ায় মিলল। নাক ভাজলো গভীর ভাবে। আমার স্থির থাকা শরীরটা এবার কাটা দিয়ে উঠছে ভয়ে আর অস্থিরতার। নিজেকে সংযম রাখতে না পেরে শক্ত হাতে চেপে ধরলাম ছায়া টিয়া দুজনের দুটো হাত। চোখ মুখ হিচকে বন্ধ করে নিলাম। এই মূহুর্তে উনাকে নিয়ে মনের ভিতর হওয়া অস্থিরতার কারণটা ধরতে পারছিনা। আর না নিজের ভয়টা কাটিয়ে উনার সামনে দাঁড়াতে পারছি। বুকের ভিতরটা থেকে থেকে যেন ধ্রিম ধ্রিম শব্দ করে ঢোল পিটাচ্ছে। কানে ঝংকার তুলছে উনার তিক্ততা বাণীটাও। উনি পুনরায় ধমকে উঠে পিছন থেকে। আমি কেঁপে উঠলাম স্ব শরীর। মাথা নত করলাম সেই সাথে দৃষ্টিও। ভিজা বিড়াল ছানার মতো ঘুরে দাঁড়ালাম উনার দিকে। উনি আমাকে দেখলো কি দেখলো না তা জানা নেই। তখনই কানে আসলো আসিফ ভাইয়ার ভারি কষ্টের কন্ঠখানা। নিগুঢ়ে নালিশ করে বলছেন উনাকে….
—” ভাই ভাবি আমারে মারছে।
দমিয়ে রাখা রাগটা যেন তরতর করে বেড়ে উঠলো নিজের মাঝে। আমার নামে নালিশ করছে বিষয়টি ঠিকঠাক হজম হলো না। আমি উনাকে মারতে চেয়ে ছিলাম? নাকি উনি আমাকে মিথ্যা বলে রাগিয়েছে। একে চুরি তার উপর আবার চিনাজুরি? মাথা তুলে রাগী দৃষ্টিতে আসিফ ভাইয়াকে চোখ রাঙ্গাতেই সঙ্গে সঙ্গে আবারও নালিশ করে বলে উঠলো আসিফ ভাইয়া…
—” ভাই! ভাই! দেখেন ভাবি আমারে আবার চোখ রাঙ্গাইতেছে।
আসিফ ভাইয়ার পরপর বিচারের ক্ষেপ্ত হলাম আমি। নিজের দমিয়ে রাখতে না পেরে পুনরায় তেড়ে যেতে নিলে তক্ষুনিই কানে আসলো রিদ ভাইয়ার রাম ধমক….
—” এই মেয়ে কি সমস্যা? বেয়াদবি করছো কেন? বারবার গায়ে হাত তুলছ কেন আসিফের?
থেমে গেলাম আমি। ভয়ে শিরশির করে উঠলো হাত-পায়ের তালু। আমি যে আসিফ ভাইকে বারবার মারতে চাচ্ছি সেটা উনি জানেন কিভাবে? তারমানে উনি কি এতক্ষণ যাবত আমাদের আশেপাশেই ছিল? দেখছিল সবকিছু? আচ্ছা! উনি কি জানেন আমি উনার খুঁজ করছিলাম আসিফ ভাই থেকে? হয়তো জানেন! উনার কথায় তো সেটাই প্রকাশ পাচ্ছে। মন খচখচ করলো! তার থেকে একটা কিন্তু থেকে গেলো। সেই কিন্তু থেকে অতি সন্তপর্ণে প্রশ্নের রুপ নিল। যে লুকোচুরি কেন? আমার সেদিনে থাপ্পড়ের জন্য? আমি সেটা ইচ্ছা করে দেয়নি। অজান্তেই মেরেছিলাম। আজ সেই থাপ্পড়টার জন্য সরি বলতেই তো উনার খুঁজ করছিলাম আসিফ ভাইয়া থেকে। কিন্তু আসিফ ভাইয়া জন্য কাহিনিটা কোথায় থেকে কোথায় চলে গেছে। এখন নিশ্চিত রিদ ভাইয়া আমাকে আবারও কষে কয়েকটা থাপ্পড় মেরে এখানে থেকে বিতাড়িত করবেন। মারারই কথা। এমনিতেই উনি আমাকে সয্য করতে পারে না। তার উপর আবার পুনরায় বেয়াদবি করলাম আসিফ ভাইয়ার সাথে। তাই ফ্রিতে একটা সাথে আরেকটা থাপ্পড় ফ্রি। ভয়ে চোখ মুখ খিচকে বিরবির করে বার কয়েক দোয়া দরুদ পাঠ করে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায় রিদ ভাইয়ার সম্মোহে। শুকনো গিয়ে মাথা তুলে উনার দিকে তাকাতেই চোখে পড়লো উনার প্রচন্ড মায়াবী মুখখানা। গভীর দুটো চোখের মধ্যে ভরপুর বিরক্তি রেশ। কুঞ্জিত কপালে সংখ্যক কিছু বিরক্তির ভাজ দৃশ্যমান। আমি হতবাক রিদ ভাইয়ার সৌন্দর্য দেখে লোকটা বিরক্তি আমার সাহসীকতা দেখে। একেই বলে নিয়তি আমার এতো ভয়ে মধ্যেও লোকটার সৌন্দর্য্যে তারিফ করতে মন চাচ্ছে। উনি আমাকে কয়টা থাপ্পড় মারবে সেটা প্ল্যানিং করছে। উফ! উনার শক্ত হাতে থাপ্পড়টা মনে করেই নিজেকে সংযম করালাম। মনকে বুঝালাম “মায়া অতি সুন্দরতম পুরুষ স্বাস্থ্যের জন্য হানিকারক! চোখ বন্ধ করে বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস নিলাম। নিজেকে সংযম করলাম। আর দুই সেকেন্ড উনার দিকে তাকালে, তৃতীয় সেকেন্ডের মাথায় উনি আমাকে তাকানোর দায়ে দুনিয়া থেকে আউট করে দিবে। শান্ত হয়ে পুনরায় চোখ তুলে তাকায় উনার দিকে। চোখ মিলল দুজনের। এবার উনি আমার দিকে কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হয়তো আমার মতিগতি বুঝার চেষ্টা করছে। আমি খানিকটা ভয়ে হাসফাস করতে লাগলাম। ভালো ভালো সরি বলে কেটে পড়তে চাই এখান থেকে। কিন্তু সবাই সামনে বলতে চাচ্ছি না। আমার একটু আলাদা সময় চাই উনার থেকে। কিন্তু তার আগে আমি যে নির্দোষ সেটা জানাতে চাই রিদ ভাইয়া। আমি আসিফ ভাইয়াকে এমনিই মারেনি ভাইয়া দোষ করেছে তাই মেরেছি। নিজের মনস্থির করে সাফাইয়ে কিছু বললো উনাকে তার আগেই পাশ থেকে মুখ খুললো ছায়া। আমার পেটে হালকা কুইনের গুত দিয়ে ফিসফিস করে বলে…
—” দোস্ত এরা গ্যাংস্টা লোক না? হ্ তাই তো মনে হচ্ছে। কিছুদিন আগের টিভিতে দেখছিলাম রিদ খানের লোকেরা নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পুলিশদেরও মাঝরাস্তায় মারছিল। খবরে হ্যাড লাইনেও ছিল অনেকদিন তাঁরা। রিদ খান প্রচন্ড নিষ্ঠুর, খারাপ মানুষ দোস্ত। ভুল জায়গায় পাঙ্গা নিছস মনে হয়। চল চুপচাপ এখান থেকে কেটে পড়ি ভালোই ভালোই।
ছায়ার সর্তক কথায় মাথা ঘুরে উঠলো আমার। চকিত মনে পড়লো রিদ ভাইয়া সেইদিনের নৃশংস হত্যা কান্ড গুলো। স্মৃতিচারন হলো মূহুর্তেই রিদ ভাইয়া ভালো মানুষ নয়। ভুলে যাওয়া বিষয়টি মনে পড়তেই এবার মনের ভিতরের ভয়টা চেহারায় প্রকাশ পেল জোরতালে। ভয়ে আষ্টশ হয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছায়ার একটা হাত চেপে ধরলাম উনার দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায়। উনি আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। হয়তো বুঝার চেষ্টা করছেন আমার হঠাৎ ভয় পাওয়ার কারণটা। আমি ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম। ঠিক তক্ষুনিই আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো টিয়া। কানের সামনে ঝুঁকে দ্বিগুণ ফিসফিস করে বলে উঠে….
—” মাইরি মালডা তো হেব্বি জোস মায়ু। আমি মনে হয় ক্রাস খাইছি গ্যাংস্টার উপর। উফফ! জান আমার যায়! যায় অবস্থা। ইশ! গ্যাংস্টার যদি এত সুন্দর হয় তাহলে ফিল্মের হিরো রেখে আমিতো শুধু গ্যাংস্টারের পিছনে ছুটমো সারাজীবন। মায়ু তাড়াতাড়ি দোয়া করে দে আমারে। যাতে আমার কপালেও একটা গ্যাংস্টার জুটে। নে তাড়াতাড়ি কর।
টিয়ার ফিসফিস বাক্যের মধ্যে দিয়েই কানে আসলো রিদ ভাইয়ার গম্ভীর্য্য পূর্ণ বাক্য।
—” আসিফ গাড়ি বের কর। আমি যাব।
—” জ্বিই ভাই।
উনি চলে যাবেন বিষয়টিতে টনক নড়লো আমার। উনি একবার চলে গেলে পুনরায় উনাকে খোঁজে পাওয়া মুসকিল। কখন কোথায় থাকেন? কখন কোথায় যায় কেউ জানে না। কিন্তু আমার এই মূহুর্তে উনাকে প্রয়োজন। কারণ আমার এখনো উনাকে ‘সরি’ বলা হয়নি। ক্ষমা চাওয়া হয়নি সেদিনে থাপ্পড়টার জন্য। আমার ক্ষমা চাওয়াটা অতি জরুরি। রিদ ভাইয়া দুই কদম এগোতেই পিছন ডাকলাম আমি। ভয়ে নিজের দৃষ্টি এদিক সেদিক করছিলাম। মৃদু কম্পিত হাত দুটো কচলাতে কচলাতে বলি…
—” আপনি যাবেন না প্লিজ।
চলিত পা দুটো থামে উনার। মূহুর্তেই পিছন ঘুরে আমার দিকে তাকায় ভ্রুঁ কুচকে। আঁড়চোখে তাকাতেই সাথে সাথে চোখ মিলল দুজনের। আমি নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিতেই তীক্ষ্ণ কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে বললো আমাকে…
—” কেন?
কেন? উত্তর কি দিব ভেবে পাচ্ছিলাম না। আর না উনাকে যেতে দিতে চাচ্ছিলাম। একটা সরি জন্য এতক্ষণ যাবত এতকিছু হয়েছে। এখন ‘সরি’ না বলে উনাকে যেতে দেয় কিভাবে? আবার সবার সামনে উনাকে থাপ্পড় মারার জন্য সরিও বলতে পারবো না। তাহলে রিদ ভাইয়া ছোট হয়ে যাবে। বাবা বলে “বড়দের অসম্মান করতে নেই। সবসময় সম্মান শ্রদ্ধা করতে হয়। নিজের ভুল স্বীকার করে ” ক্ষমা চাওয়াটা উত্তম।
নিরবনিচ্ছিন্ন জনমানবহীন পরিবেশ। আশেপাশে খালি চেয়ার টেবল ছাড়া অন্য কিছু চোখে পড়ছেনা আমার। নির্জন রেস্টুরেন্টে। পুরো হল খালি। আমি আর রিদ ভাইয়া ছাড়া অন্য কোনো মানবের হদিস নেই। দূরে প্রান্তে কয়েক ওয়েটার দেখা যাচ্ছে শুধু। তাঁরাও এই দিকটায় তাকানোর চেষ্টাও করছে না ভুলেও। মনের হচ্ছে কারও নিষেধাজ্ঞা আছে এইদিকটায় তাকানোর। কিন্তু কার? বোধগম্য হলো না আমার। এক গাদা খাবার সামনে নিয়ে বসে আছি আমি। আমার ঠিক সামনে বসে আছে উনি(রিদ)। শুধু যে বসে আছে তা নয়। নিজের সাচ্ছন্দ্যে সম্ভোগের খাবার খাচ্ছেন কেটে কেটে। বামহাতে নাইফ তো ডানহাতে কাটা চামচ চেপে ধরা। বামহাতের নাইফ দিয়ে ঘাস পাতা কাটছেন তো ডানহাতের কাটা চামচ দিয়ে সেটা মুখে তুলছেন পরপর। চোখে মুখে গম্ভীর্য্য ভাব। যেন খাবারটাকেও ধমকাতে ধমকাতে খাচ্ছেন। বেচারা জবানহীন ঘাসপাতা গুলোও যেন আর্দশ্যতা রক্ষা করে রিদ ভাইয়া গলদেশ পার হচ্ছে।
সেই তখন থেকে একেক পর এক চুরি চামচ চালিয়ে খেয়েই যাচ্ছে রিদ ভাইয়া। টু শব্দও করছেনা। নিজের জন্য আলাদা খাবার অর্ডার করছেন। এবং আমার জন্য আলাদা। সবগুলো খাবারই আমার ভিষণ পছন্দের। কিন্তু খেতে পাচ্ছি না। কারণ দুটো! এক উনি আমাকে খেতে না বলে নিজেই খেয়ে যাচ্ছেন। তাই বুঝতে পারছি না খাওয়া শুরু করবো কিনা? দ্বিতীয়ত্ব রিদ ভাইয়া আমার পছন্দের খাবার লিস্ট জানেন কিভাবে? সেটা জানার কৌতুহলের প্রশ্নটা পেটের ভিতর কিরবির করছে প্রতিনিয়ত। রিদ ভাইয়াকে প্রশ্নটা করবো করবো বলে বিগত পাঁচ মিনিট পার করলাম। কিন্তু বলতে পারছি না। তাই নিজের মাঝে অনেকটা সাহস নিয়ে অবশেষে বলে উঠলাম উনাকে…..
—” ভাইয়া! আপনি জানেন এই খাবার গুলো না সব আমার পছন্দের।
উত্তর আসলো না উনার থেকে। আর না উনার কোনো ভাবান্তর হলো। আমি হাসফাস করে পুনরায় ধীর কন্ঠে বলি…
—” ভাইয়া! আপনি কি আগের থেকেই জানতেন এই গুলা যে আমার পছন্দ খাবার? না মানে, আমি তো আপনাকে কিছু অর্ডার করতে বলেনি তাই।
তাকালেন না আমার দিকে চামচ কেটে খাবার খেতে খেতে বললো….
—” ডাজেন্ট ম্যাটার! খাবার পেয়েছো খেয়ে ফেল।
মুখ ভার করে বললাম…
—” এমন করছেন কেন বলুন না ভাইয়া।
খানিকটা বিরক্তি বোধ করে খেতে খেতে বললো…
—” তোমার জম্ম থেকে এখন অবধি সকল হিস্ট্রিই জানা আমার। আর দ্বিতীয়ত্ব আমাকে ভাইয়া! ভাইয়া ডাকা বন্ধ করো। আমি তোমার ভাই নয় আর না তুমি আমার কোনো কালের বোন। আমার বাবা-মা তোমাকে দত্তক বা পালক নেইনি। সেই সুবাদে তুমি আমার কোনো পাতানো বোন টোনও নও।
মাথা আওড়ালাম। ভিষণ চিন্তায় পড়লাম। কথাটা সত্য। কিন্তু আমি উনাকে ডাকবো কি তাহলে? সেই চিন্তাত চিন্তিত হয়ে বললাম…
—” তাহলে ডাকবো কি আমি?
স্বাভাবিক বংগিতে খেতে খেতে বললো…
—” এনিথিং একসেপ্ট ইউর ব্রাদার। চাইলে স্বামীও ডাকতে পারো। আই ডোন্ট মাইন্ড।
উনার কথায় মূহুর্তে বোকা বনে গেলাম আমি। মাথায় আওড়াতে পারলাম না কোনো কিছু। উনাকে আমি কোন সম্পর্কে স্বামী বলে ডাকবো সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। আমার জানা মতে আমাদের বিয়েটা দুই বছর আগেই বাতিল হয়ে গেছে তাহলে? চিন্ততা বাড়লো। মাথায় জট পাকালো উনার স্বামী নামক শব্দটি। প্রশ্ন করে বললাম।
—” স্বামী বলা যাবে আপনাকে? আমাদের বিয়েটা বাতিল না?
স্বাভাবিক বংগিতে পাশ থেকে টিস্যু নিয়ে মুখ মুছতে মুছতে চোখ তুলে তাকায় আমার দিকে। ভরাট কন্ঠে আমাকে যুক্তি দেখিয়ে বলে উঠে…
—” লুক! তোমার ছোট বেলায় আমাদের দুজনের বাবা-মা আমাদের বিয়েটা দিয়েছিল রাইট? আমার বাবা-মা কেউ জীবিত নেই। দুজনের বাবা-মা-ই জানে না আমাদের বিয়েটা বাতিল হয়ে গেছে। এখন সেই সুবাদে তোমার বাবা-মার জন্য আমি তোমার স্বামী। অপর দিকে আমার মৃত্য বাবা-মার কাছেও তুমি আমার বউ। এবং খান বাড়ির পুত্রবধূ। এখন সেই সম্পর্ক টেনে মিলাতে গেলে তুমি এখনো অবধি আমার বাবা-মার একমাত্র ছেলের একমাত্র বউ। তাই সূত্র ধরেই তুমি আমাকে স্বামী বলে ডাকতে পারো। বুঝছ?
উনার যুক্তিটা মনে ধরলো আমার। ঠিকই তো আমাদের বাবা-মা জন্য তো এখনো আমরা জামাই বউ। তাহলে আমার উনাকে স্বামী বলে ডাকা উচিত। খানিকটা ভেবে চিন্তিত হলাম আমি। ভাবান্তর কন্ঠে বললাম।
—” কিন্তু আমাদের বিয়েটা তো বাতিল হয়ে গেছে! তাহলে কি আমি আপনাকে বাতিল স্বামী বলে ডাকবো?
আমার কথায় ভাবান্তর হলো না উনার। সে এবার নিজের খাওয়ার ব্যস্ত হলো আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে। তবে উনার কপালে বলিষ্ঠ বিরক্তি ভাজ পড়া। হয়তো আমার ‘ বাতিল স্বামী’ বলাটাও পছন্দ হয়নি। কিন্তু আমি উনাকে ডাকবোটা কি? আমার গভীর চিন্তার মধ্য দিয়ে কানে আসলো উনার গম্ভীর্য্য কন্ঠ। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বললেন আমাকে….
—” খাওয়া জন্য কি আলাদা ইনভিটেশন দিতে হবে তোমায়?
কথা বাড়ালাম না। চুপচাপ খাওয়ার শুরু করলাম। তবে কাটা চামচ দিয়ে মাছ খাওয়া যাবে না তাই হাত দিয়ে শুরু করলাম। উনি কিছু বলেনি। আর না চোখ তুলে তাকিয়েছেন আমার দিকে। যেহেতু চিংড়ি মাছ সেহেতু কাটা বাছার ঝামেলাটা ছিল না আমার সাথে। মাছ আমার প্রিয় খাবার। তবে কাটা যুক্ত মাছ খেতে পারিনা। তাই আমার প্রিয় খাবারের তালিকায় চিংড়ি আর পাংকাস প্রধান। অন্যন্যা মাছ কেউ বাছায় করে দিলে খায় নয়তো না। আর এই মূহুর্তে আমার খাবার তালিকায় আছে চিকেন, ডাল, চিংড়ি, সাথে আছে কয়েক রকমের সমুদ্রিক মাছ। আমি চিংড়ি মাছ ছাড়া অন্য কিছু পাতে তুলছিনা। চিকেন খাওয়ার আপাতত ইচ্ছা নেই মাছ খাব। বাকি মাছ গুলো যেহেতু কাটা যুক্ত তাই সেগুলো খেতে মন চাইলেও পাতে তুলছি না ভয়ে। গলায় কাটা বিঁধবে। শুধু চিংড়ি মাছ খাচ্ছিলাম সাদা ভাতের সাথে। আমার সাদা ভাতও খুব পছন্দ।
আমার মনোযোগ সহকারে খাওয়ার দুই মিনিটের মাথায় সামনে থেকে একটা প্লেট এগিয়ে দেয়, আমার সদ্য নতুন হওয়া স্বামী নামক মানুষটি। আমি চমকে উঠে চকিতে তাকাতেই উনি আমার হাতটা আলতো ঝেড়ে সকল ভাত প্লেটে ফেলে আধ খাওয়া সাদা ভাতের প্লেটটা টেনে নেন উনার কাছে। এঁটো প্লেটটা এক পাশে রেখে এগিয়ে দেয় অন্য আরেকটা প্লেট। সেখানে অনেক গুলো সমুদ্রিক মাছ একসঙ্গে কাটা ছাড়িয়ে রাখা আছে অতি যত্ন সহকারে। আমি হতভম্ব হয়ে উনার দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাতেই উনি গম্ভীর মুখ বললেন….
—” এটা খাও। সমুদ্রিক মাছ তোমার সাদা ভাতের থেকে পুষ্টি পাবে ভালো। অপুষ্টিহীনতায় ভুগবে না। বড়ও হতে পারবে তাড়াতাড়ি।
উনার লাস্টা কথাটা ঠিকঠাক বুঝে আসলো না আমার। উনি কি আমাকে খুঁচা মেরে কথাটা বললো নাকি বড় হতে আর্দেশ করলো। বুঝলাম না ঠিক। আচ্ছা আমাকে কি উনার ছোট মনে হচ্ছে? আল্লাহ বলে কি? গুনে গুনে সতেরো বছর হলো আমার তারপরও উনার কাছে আমাকে ছোট মনে হয়? উনি দেখেন না আমি কলেজে উঠে গেছি। উফ! তারমানে কলেজে উঠলেও মানুষ বড় হয়না। তাহলে কবে বড় হয়? আমাকে কবে সবার মতো বড় দেখাবে? সবাই কবে আমাকে ছোট না বলে বড় মায়া বলবে? নিজের হতাশায় প্রশ্ন করলাম উনাকে…
—” স্বামী! আমি কি অপুষ্টহীন ছোট মানুষ এখনো? তাহলে বড় হবো কবে আমি?
আগের ন্যায় বলে উঠে….
—” ঠিকঠাক খেলে এতদিনে বড় হয়ে যাওয়া কথা। ছোট সেজে শুধু অন্যজনের কষ্ট বাড়ানোর ধান্দা।
স্বামীর ভারি বরগন কথা গুলো এবারও মাথার উপর দিয়ে গেল। ধরতে পারলাম না একটাও। কে কাকে ছোট সেজে কষ্ট দিচ্ছি তাও মাথায় আসলো না। তবে যেটা মাথায় আসলো সেটা হলো উনাকে আমার এখানো ‘ সরি’ বলা হয়নি। সরি শব্দটা মাথায় আসতেই মূহুর্তে খানিকটা ছটফট করে উঠলাম আমি। একটা সরি বলতেই উনার পিছন পিছন এই রেস্টুরেন্টেন অবধি এসেছি আমি। কিন্তু তারপরও বলা হয়ে উঠেনি। হাসফাস করলাম নিজের মাঝে। ইতস্তত জড়িয়ে মিনমিন গলায় বললাম ‘ সরি স্বামী ‘
আমার কথায় বেশ একটা ভাবান্তর হলো না উনার। উনি পুনরায় চাকু চালিয়ে চামচে কেটে খাবার মুখে তুলতে তুলতে বললেন…
—” ফর হোয়াট?
মাছের প্লেটে হাত রাখা অবস্থায় মাথা নত করে বসলাম উনার সামনে। অপরাধী গলায় বললাম।
—” সেদিন রাতে ইচ্ছাকৃত ভাবে থাপ্পড় মারতে চাইনি আপনায়। ভুলবশত লেগে গেছে। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি আর কক্ষনো করবো না এমনটা। সত্যি বলছি।
আমার কথা গুলো থামতে না থামতেই বলতে শুরু করেন উনি…
—” এমনটা দ্বিতীয় বার করার জন্য আপনার হাত পা আস্ত থাকতে হবে। যে হারে আপনি হাত পা চালাচ্ছেন। ভাবছি আপনার হাত পা দুটো কেটে আপনার গলায় ঝুলিয়ে রাখবো। আপাতত আপনার হাত পায়ের দরকার নেই। এইগুলো না থাকলো চলবে আপনার। এখন খেয়ে নিন। খাওয়া দাওয়া পরে কাটা কাটি শুরু হবে আপনার। একটু পাশের কাঁচ দিয়ে নিচে তাকান! দেখেন কতগুলো বডিগার্ড চাকু ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আপনার হাত পা কাঁটার জন্য। দেখুন!
উনার এমন কথায় স্ব শরীরে কম্পন সৃষ্টি হলো মূহুর্তেই। ভয়ে গলা অবধি শুকিয়ে গেল। আমার গুনধর স্বামী দ্বারা সবই সম্ভব। একটা থাপ্পড় জন্য এখন আমার হাত পা কেটে ফেলতে চাচ্ছেন উনি? আল্লাহ কতটা সাংঘাতিক উনি? কেন যে তখন উনার যেতে নিষেধ করেছিলাম আল্লাহ জানে। না তখন উনাকে যেতে নিষেধ করতাম। আর না এখানে উনি আমাকে নিয়ে আসতো। এখন নিজের পাকামোর জন্য আমার দামি দামি হাত পা দুটো হারাতে হবে। ঠোঁট ভেঙ্গে কান্না পাচ্ছে আমার উনার ভয়ানক হুমকি বাণীতে। জল এসে চোখের কোঠায় টলমল করতে লাগলো মূহুর্তেই। নিজের ভয়টা দ্বিগুণ বাড়াতে সোফা থেকে উঁকি দিল নিচে। সদ্য কাঁচ বেধ করে নিচে দেখা যাচ্ছে উনার বডিগার্ড গুলো সত্যি সত্যি ধারালো চাকু ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে পাকিং এরিয়াতে। আমরা তিনতলায় বসে আছি এয়ার কন্ডিশনে। রেস্টুরেন্টের তিনতলা হলের একপাশটা সম্পূর্ণ কাঁচে তৈরি যাহ দিয়ে অতি সন্তপর্ণে নিচের সবকিছু দেখা যায়। তিন তলার আশেপাশেও কাউকে দেখছিনা আমাদের দু’জনকে ছাড়া। এই মূহুর্তে আমাকে বাঁচানোর মতো আমি ছাড়া অন্য কেউ নাই। বুঝলাম জেনে বুঝে বাঘের গুহার মাথা ঢুকিয়েছি এবার কামড় খাওয়াটা নিশ্চিত। বাঁচার উপায় নেই। বাহিরের দিকে এক পলক উঁকি মেরে সোফায় সোজা হয়ে বসলাম আস্তে করে। উনি তখনো নিজের খাওয়ায় প্রচুর মনোযোগী। এমন একটা ভাব সে কিছু বলেনি আর না কিছু ঘটেছে এইখানে। উনাকে নির্ভীকন্নে খেতে দেখে ঠোঁট উল্টিয়ে কান্না জড়িত গলায় বললাম….
—” স্বামী! এবার মতো ক্ষমা করে দিন। বললাম তো আর মারবো না আপনায়? সত্যি বলছি?
খেতে খেতে চোখ তুলে তাকায় আমার দিকে। বলে উঠে…
—” স্বামীর ক্ষমা পাওয়া এতো সহজ নয়। তাই কেঁদে কুঁদে লাভ নেই। ঠিক করা হয়ে গেছে, আজকে তোমার হাত পা দুটো কেটেই বাসায় যাব আমি।
এবার কান্নার বাঁধ ভাঙ্গে আমার। উনার সামনে কেঁদে উঠলাম ভয়ে। বামহাতে নিজের চোখে পানি অনবরত মুছতে মুছতে বললাম….
—” স্বামী! আপনি যাহ বলবেন তাই শুনবো আমি। প্রমিস! তারপরও আপনি আমার হাত পা দুটো কাটবে না প্লিজ।
খাবার রেখে বাঁকা চোখে তাকালো আমার দিকে। নিজের বামহাতে চাকুটা হাতের মধ্যে ঘুরাতে ঘুরাতে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো….
—” বুঝিয়েন কিন্তু ম্যাডাম। যাহ বলবো তাই করতে হবে আপনাকে? আমি কিন্তু ভালো মানুষ নয়! তাই ভালো কিছু কিন্তু আমার থেকে ভুলেও আশা করা যাবে না।
মাথা নাড়িয়ে সভ্য সুলভ সম্মতি জানালাম উনাকে। যার অর্থ উনি যাহ বলবে তাই করবো আমি’ আমার মাথা নাড়ানোতে উনি খানিকটা বাঁকা হাসলো। আমি চোখ আওড়িয়ে দেখতে দেখতে সেই হাসিটা বিলীন হয়ে গেল উনার ঠোঁটের মাঝে। আমি চোখ মুছে শান্ত হয়ে খাওয়া শুরু করলাম। উনি নিজের খাবার শেষ করে আমার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। আমি ধীরস্থির খাচ্ছি উনার বাছাই করে দেওয়া মাছ গুলো। উনি বসে বসে ফোন চালাচ্ছেন মনোযোগ সহকারে। এবার আমি খাওয়া শেষ করে বসে বসে কুলফি আইসক্রিম শেষ করছিলাম। তখনই হঠাৎ মনে হলো আমার সাথে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে ইতিমধ্যে। চমকে উঠে হালকা নড়েচড়ে বসতেই সিওর হলাম আমার নিষিদ্ধ দিনের বার্তা চলছে। আজকে আমার পিরিয়ডের ডেট ছিল। সেটা একদমিই আমার মাথা থেকে বের হয়ে গেছিল। আমি খাওয়া রেখে ঘাপটি মেরে বসলাম জায়গায় নড়াচড়া বন্ধ করে। হাতে রাখা কুলফিটা টেবিলের উপর রেখে মাথা নত করে বসলাম লাল সোফায়। উনি ছেলে মানুষ। আমি মেয়ে মানুষ। কিভাবে সাহায্য চাইবো উনার থেকে মেয়েলি ব্যাপারে? এখন এই বাজে পরিস্থিতিতে আমাকে সাহায্য করবে কে? বাড়ি অবধি এই অবস্থায় যেতে পারবো না। সাদা জামা, সাদা এপ্রোন ইতিমধ্যে দাগ লেগে গেছে। উঠা সম্ভব না উনার সামনে। যত বসে থাকবো তত সমস্যা বাড়বে কম না। দুঃখ কষ্ট এবার বুক ফেটে কান্না আসছে আমার। আজকে কার মুখ দেখে সকাল সকাল উঠেছিলাম আল্লাহ জানে? মুসিবত আমার আমার পিছু ছাড়ছে না। একটার পর একটা লেগেই যাচ্ছে আমার সাথে। রাগে কথা গুলো ভেবেই মাথা নত করে ফুপিয়ে অনবরত কেঁদে যাচ্ছি আমি নিঃশব্দে। এই পরিস্থিতিতে চোখের পানি থামাতে পারছিলাম না। তাই কান্নারত অবস্থা ভাঙ্গা গলায় কোনো রকম উনাকে বলে উঠি।
—” দাদীকে একটা ফোন দিন প্লিজ। আমি কথা বলবো।
আমার হঠাৎ কান্নায় খানিকটা চমকে উঠলেন উনি। ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চকিত তাকালেন আমার দিকে। কপাল কুঁচকে বললেন….
—” কি সমস্যা? কাঁদছো কেন?
—” এমনিই! আপনি দাদীকে ফোন দিন প্লিজ। আমি কথা বলবো?
—” কেন?
—” আপনাকে বলবো না।
—” না বললে ফোনও দিব না।
—” দিন না প্লিজ। এমন করছেন কেন? আমার দাদী সাথে কথা বলাটা জরুরি। প্লিজ!
উত্তর করলেন না উনি। বিরক্তি নিয়ে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে। আমি লজ্জায় মাথা নত করে নাক ফুপিয়ে কেঁদে যাচ্ছি। উনি খানিকটা সময় মন্ত থেকে আমার কান্না মাখা ফেসটা পযবেক্ষণ করে বিরক্তি সুরে বলে উঠেন…..
—” কিরে বাবা! কি সমস্যা? বলবে তো নাকি কান্না করছো কেন?
—” বললাম তো আপনাকে বলা যাবে না। আপনি দাদীকে ফোন করে বলুন এখানে আসতে। তাহলেই হবে।
থেমে যায় উনি। কপাল কুঁচকে আমার দিকে সূক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই কিছু মনে পড়ার মতো চকিত হয়ে বলে উঠেন…
—” ওয়েট! আজকে যেন কত তারিখ?( মনে পড়তেই) শিট! তোমার না আজকে পিরিয়ডের ডেট ছিল? ভুলে গেছ রাইট? আমারও মাথা থেকে ছুটে গিয়েছিল ডেট-টা। শিট!
চলিত……
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৪
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ১ গল্পের লিংক
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৪