Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২২


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা) সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

২২
উত্তেজনায় টানটান পরিবেশ। চারপাশে কালো নিষ্ক্রিয় অন্ধকার। মধ্যবর্তী উঠানে একপাশে একমুঠো সোনালী আলো আলোকিত চারপাশ। একশো পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে টিনের ছাউনিতে। রাত আটটা কি নয়টা। সেই আলোকে ঘিরে বসে আছে গ্রামের গণ্য মান্য ব্যক্তিরা। থমথমে বিদ্রুপ পরিবেশ। তিক্ততা ঝেকে আছে উপস্থিত মুরুব্বিগণের মধ্যে। গ্রামের মূল কেন্দ্র বিন্দু চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান মাথা ঝুকে ধ্যানরত অবস্থায় বসে আছে। কিছু নিয়ে তীব্র ভাবনা চিন্তা চলছে নিজের মাঝে উনার। উপস্থিত ছোট বড় সবাই উনার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। তারপর কি হবে? সেটা জানার তীব্র আকাঙ্খা বিস্তর সবার মাঝে ! কিন্তু তিনি মন্ত। সময় নিয়ে উত্তরটা গোছালেন নিজে মধ্যে। চোখ তুলে তাকালো সামনের চেয়ারে বিধস্ত অবস্থা বসা শক্তপোক্ত সুঠাম দেহের অধিকারী মানবটির দিকে। কত নিবিড় সে দৃষ্টি। এতকিছুর পরও বিন্দুমাত্র তেজ কমেনি ছেলেটির চোখে। ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে শক্ত হয়ে বসে আছে টায় জায়গায় ছেলেটি। নিজের সিদ্ধান্তে সে অটুট। আর তাঁকে ঘিরেই চারপাশে এতো উত্তেজনার রেশ। উপস্থিত গ্রামবাসী অনেক মধ্যে রাগ, ক্রুদ্ধে ফেটে পড়ছে এই ছেলেটিকে মারার জন্য। কিন্তু তারপরও ছেলেটির সেদিকে খেয়াল নেই। বিন্দু মাত্র ভয় নেই নিজের মাঝে ছেলেটির। শামসুজ্জামান অন্তত মুগ্ধ হলেন ছেলেটির
দুর্দান্ত সাহসী পরায়নতা দেখে। কিন্তু মুখে আওড়ালেন না সেটি। কারণ এই মূহুর্তে ছেলেটিকে ঘিরে চারপাশের উত্তেজনা সামলাতে হবে উনাকে। যদি এই ছেলেটি উপস্থিত গ্রামবাসি সবার কথা মেনে না নেই তাহলে চেয়ারম্যান হিসাবে তাঁকে কঠিন দণ্ডায়মান করতে হবে এই ছেলেটিকে। তিনি আরও একবার নিরব চোখ বুলালেন ছেলেটির দিকে। পরে অন্তত গম্ভীর্য্য ভাব টানলো মুখে। গম্ভীরতা নিয়ে বলে উঠলো ছেলেটিকে….

—” আমাদের গ্রামের কিছু রীতিনীতি আছে যেটা তুমি ইতিমধ্যে কয়েকবার বঙ্গ করেছ। আবার আমাদের গ্রামের ছেলেদের গায়েও হাত তুলেছ। এখন তাঁরা হসপিটালের আছে। অবস্থা সূচনীয় তাদের। তারপর তোমার সাথেও দুইটা সুন্দরী মেয়ে আছে। একজনের সাথে তোমাকে নাকি অন্তরঙ্গ অবস্থায় পাওয়া গেছে সেটা আমাকে জানালো গ্রামবাসী। যদিও আমি সচক্ষে দেখিনি বিষয়টি। কিন্তু গ্রামের চেয়ারম্যান হিসাবে আমি আমার গ্রামবাসীর কথায় আগে শুনবো এবং সেটা বিশ্বাস করবো এটাই স্বাভাবিক। তবে তুমি ভিন্নদেশী বলে যে তোমার কোনো কথায় যে গ্রহণ যোগ্য হবে না সেটাও না। আমি তোমার কথা মেনে নিলাম। ছেড়েও দিব তোমাদের তাও যথেষ্ট সম্মানের সহিত। যদিও তুমি আমাদের গ্রামবাসীর শর্ত গুলো মেনে নাও তাহলে। নয়তো…

দুহাত মুষ্টি বদ্ধ করে শক্ত গম্ভীর গলায় বললো ছেলেটি।

—” নয়তো কি?

তিনি আবারও চোখ আওড়ালেন ছেলেটির শক্ত হয়ে থাকা মুখের দিকে। ছেলেটি সাহসী সাথে সাথে বেশ সুদর্শন ও বটে। অন্তত মায়াবী চেহারার অধিকার এই ছেলেটি। যেকোনো মানুষের নজর ও মন কারতে স্বক্ষম। তিনি পুনরায় নিজের গম্ভীর করে তুলে বলে উঠলো…

—” তুমি অন্তত সাহসী ও বুদ্ধিমান একজন পুরুষ সেটা এতক্ষণে আমার সাথে সাথে এলাকাবাসীও বুঝে গেছে। তুমি যে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে এতক্ষণ যাবত গ্রামবাসীর ভিড়েও সুস্থ সাপেক্ষে দাঁড়িয়ে আছো। এবং কেউ তোমার কিছুই করতে পারেনি। সেখানেই তোমার বুদ্ধিমত্তর পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রামবাসী বেশিভাগ মানুষই স্বল্প শিক্ষিত মানুষ। তাঁরা হাতে কলমের ভাষা খুব কম বুঝে যেটা বুঝে সেটা হলো আবেগ, ভালোবাসা কথা৷ যেটার দুটো দিক থেকেই তুমি তাদের কষ্ট দিয়েছো। এখন তাঁরা সবাই তোমার উপর প্রচন্ড ভাবে ক্ষেপ্ত। মারতে চাই তেমাকে। এতক্ষণ পযন্ত আমি এলাকাবাসীকে দমিয়ে রাখলেও বেশিক্ষণ সেটা পারব না। তোমার সাথে সাথে মেয়ে দুটোও কতক্ষণ যাবত সুস্থ থাকবে তাও বলতে পারছি না। তুমি বুদ্ধিমান ছেলে তাই তোমাকে পুনরায় বুঝিয়ে বলার মতো কিছু দেখছি না আমি। এখন ভালো সেটাই হবে যদি তুমি গ্রামবাসির দাবি মেনে নাও।

এতক্ষণ যাবত ঠান্ডা মস্তিষ্কের পরিবেশটা সামলালেও ধীরে ধীরে যেন আয়নের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গছে গ্রামবাসীর উদ্ভট শর্তে। কিছুতেই নিজেকে কন্ট্রোল করার সম্ভব হচ্ছে না। রাগে যেন ভিতর ফেটে ফেটে পড়ছে মূহুর্তেই। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে ঠান্ডা মাথায় বিগত তিন ঘন্টা যাবত সবকিছু ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছে আয়ন। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু ঠিক হচ্ছে না। বরং হিতের বিপরীতে যাচ্ছে পরিস্থিতিটা। সেই সন্ধ্যা ছয়টা থেকে এই গ্রামবাসী কাহিনি শুরু হয়েছে এখন বাজে রাত নয়টা। তারপর তাদের ছাড়ার নাম নেই। আটকিয়ে রাখা রয়েছে জোর পূবক তাদের তিনজনকে। তারপর আবার ফালতু সব শর্ত। বিয়ে করতে হবে। আয়ন রাগে হাতের মুষ্টিটা আরও শক্ত করে। বিরক্তি নিশ্বাস ফেলে শব্দ করে। এই ঘটনাটা শুরু হয়েছে সন্ধ্যা থেকে। আয়ন আজ বিকাল করে মায়া আর জুইকে নিয়ে ঢাকা থেকে বের হয়েছিল ব্রাক্ষণবাড়িয়ার উদ্দেশ্য। মায়া আর জুঁইকে নিজের বাড়িতে রেখে আসার প্রধান দ্বায়িত্বটা নিয়েছিল আয়ন। সেই দ্বায়িত্ব পালনের জন্য বিকাল চারটা করে খান বাড়ির থেকে রওয়ানাও হয়েছিল আয়ন মায়া আর জুঁইকে নিয়ে। ড্রাইভার সাথে আনেনি। আয়ন নিজেই ড্রাইভ করছিল গাড়ি। হঠাৎ মধ্যে রাস্তায় গাড়িটি আপনাআপনি থেমে যায়। আয়ন গাড়িটি ভালো করে চেক করাতে বুঝতে পারে গাড়ির মধ্যে তৈল শেষ। গাড়িটিকে নিয়ে আসার সময় তৈল আছে কিনা সেটা চেক করেনি সে। অসময়ে গাড়ির তেল শেষ হওয়া বিরক্তি হয় আয়ন। মায়া আর জুঁইকে বুঝিয়ে রেখে সে কিছু দূর এগিয়ে গিয়েছিল তেলের খুঁজে। ব্যথা হয়ে ফিরে এসে দেখে মায়া, জুইয়ের বিধস্ত অবস্থা। গ্রামের দুটো বখাটে ছেলে মায়া আর জুঁইকে উক্তক্ত করছে। হাত ধরে টানাটানি করছে কোথাও নিয়ে যাওয়া জন্য। এমন দৃশ্য দেখে আয়নের রাগটা কন্ট্রোল হয়নি। দক্ষ হাতে বেদুম পেটালো ছেলে দুটোকে। এরি মধ্যে একটি ছেলে এসে আঘাত করে বসলো জুঁইয়ের পায়ে। পায়ের আঘাতে ছটফট করে উঠে জুই। সাথে সাথেই ছেলে দুটোকে ছেড়ে জুইকে কোলে তুলে ন্যায় আয়ন। বেশি কিছু ভাবলো না সে এই মূহুর্তে জুইয়ের রক্ত পড়া দ্রুত থামাতে হবে। তাই হসপিটালের উদ্দেশ্য গ্রামের ভিতর প্রবেশ করেছিল সাহায্যের জন্য আয়ন। কিন্তু হলো তার বিপরীতে। বখাটে ছেলে দুটো সেখানেও হাজির হলো। আয়নকে আঘাত করতে গিয়ে আবারও আঘাত করলো জুইয়ের পায়ে। আয়ন রাগের বশে জুইকে রেখে আবারও বেদুম পেটালো ছেলে দুটোকে। এবার আর ছেড়ে দেয়নি বরং ছেলে দুটোকে জানে মেরে ফেলার উপক্রম করলো আয়ন। খানিকটা সময়ের ব্যবধানে গ্রামবাসী এসে সেখানটায় হাজির হয়। এবং আয়নকে আটকায়। এবং বাঁচায় ছেলে দুটোকে। আয়ন কিছু বলার আগেই ছেলে দুটো ব্যথায় কাতরিয়ে মিথ্যা কাহিনি সাজিয়ে জানালো গ্রামবাসীদের। আয়ন নাকি দুই মেয়েকে নিয়ে এই গ্রামের মধ্যে এসেছিল ফষ্টিনষ্টি করতে। ছেলে দুটো নাকি বাঁধা দেওয়ায় আয়ন তাদেরকে বেদুম পেটালো। তখন গ্রামবাসী আর আয়নের কথা গুলো বিশ্বাস করেনি, করেছিল বখাটে ছেলে দুটোর কথা। আর সেই কাহিনিকে ঘিরেই এই জনসভা বসানো হয়েছে আয়নের বিরুদ্ধে। আর এটা চলছে বিগত তিন ঘন্টা ধরে। হাঙ্গামা, হৈচৈ, চিৎকার, চেচামেচি, সবকিছু এতক্ষণ যাবত চলে যাচ্ছে তার সাথে। আয়ন কথা গুলো ভেবে তিক্ততা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে।

দাঁতে দাঁত চেপে ধরে নিজের রাগটাও কন্ট্রোল করলো। এই মূহুর্তে রাগ করা মানেই বিপদ। আয়ন একা থাকলে তাও একটা কথা ছিল। কিন্তু সে একা নয় সাথে আছে মায়াও জুঁই। তাই বোকা করা যাবে না মোটেও। এলাকাবাসী আয়নের কিছু করতে না পারলেও মায়া ও জুঁইয়ের ঠিকই ক্ষতি করে বসতে পারে। আয়ন সবটা ভেবে নিরব বংগিতে তাকায় চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দিকে। পরে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো….

—” আপনার এলাকাবাসীর ফালতু উদ্ভট সব শর্ত গুলো মেনে নেওয়াটা যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে না চেয়ারম্যান সাহেব। আমি বুদ্ধিমান হতে পারি বোকা নয়। কারও অহেতুক যুক্তিহীন শর্ত মেনে নেওয়াটাও পাপ। যেটা আপাতত করতে চাচ্ছি না আমি। ক্ষতি পূরণ দিতে রাজি থাকলেও বিয়ের শর্তে রাজি নয়। এখন আপনার এলাকাবাসীদের যা করার তাহ করতে বলুন। আপত্তি নেই কোনো কিছুতে আমার। তবে শুধুমাত্র আমাকে তার আগে একটা কল করতে দেন। নয়তো আপনারাও কল করতে পারেন আমার হয়ে। হয় আমার পরিবারকে কল দেন নয়তো আপনাদের স্হানীয় পুলিশ স্টেশনের কমিশনারের কাছে কল করুন। এবং আমার সাথে বলিয়ে দেন বাকিটা আমি বুঝে নিব।

আয়ন গম্ভীর মুখের কথায় পিত্তে জ্বলে উঠে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাঠিয়াল ছেলেটি। অন্তত রাগী কন্ঠে গর্জনে বলে উঠলো আয়নকে…

—” চুপ শালা! টাকার গরম দেখাস আমডারে। চেয়ারম্যান সাহেব হের সাথে এতো কথা কিয়ের? কন আমডারে হেরে এহনি জ্যান্ত পুঁত্তালামো মাটিত। দুই মাইয়া নিইয়া নষ্টমী করতে ফারে হে, বিইয়া করতে ফারে না। শালাপুত!

ছেলেটির অজোপাড়া কথায় গা জ্বলে উঠে রাগে আয়নের। অগ্নি দৃষ্টিতে তাকায় লাঠিয়াল ছেলেটির দিকে সে। লাঠিয়াল ছেলেটি আয়নের দৃষ্টি বুঝে আরও ক্ষেপ্ত হলো। অকট ভাষায় আরও কিছু আওড়াবে তার আগেই হাতের ইশারায় থামতে বলে চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান। লাঠিয়াল ছেলেটি মূহুর্তেই থেমে গেল কিন্তু ক্ষেপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আয়নের দিকে। আয়নের অগ্নিদৃষ্টিও সেদিকেই ছিল লাঠিয়াল ছেলেটির উপর। কিন্তু ঘোর ভাঙ্গলো আবারও চেয়ারম্যান শামসুজ্জামানের কথায়। আয়ন বিরক্তির দৃষ্টি ঘুরিয়ে চেয়ারম্যান দিকে তাকায়। তিনি আবারও গম্ভীর মুখে বলে উঠলো আয়নকে….

—” তোমার কোনো কথা যে এই মূহুর্তে রাখা হবে না, সেটা নিশ্চয়ই স্পষ্ট তুমি বুঝতে পারছ। তোমার ফোনও এই মূহুর্তে গ্রামবাসীর দখলে। সেই সাথে দুটো মেয়েও আমাদের কাছে বন্দি। এখন হয় তুমি দুটোর মেয়ের মধ্যে যেকোনো একজনকে বিয়ে করে সম্মানের সহিত বাসায় ফিরে যাও। নয়তো দুটো মেয়েকেই এই গ্রামের আটকে রাখবো আমরা। বিয়েও দিব দুটো মেয়েকে আমাদের গ্রামের দুটো ছেলের সাথে, যাদের তুমি মেরে হাত পা ভেঙ্গে হসপিটালের পাঠিয়েছো তাদের সাথে। এমনিতেই তাদের অবস্থা করুন। জীবনে ভালো মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে কিনা সন্দেহ। তাই তুমি যেহেতু হাত পা ভেঙ্গেই ফেলেছো তাই তুমিই ক্ষতি পূরণ দিবে তাদের। তোমার সাথে আসা দুটো মেয়েকে আমরা বিয়ে করিয়ে রেখে দিব এই গ্রামের। হয় সেচ্ছায় নাহয় জোরে। এখন তুমি ঠিক করো! যে তুমি কি করবে।

এতক্ষণে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গলো আয়নের। খানিকটা চমকায় চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান কথায়। রাগে রি রি করে উঠলো নিজের মাঝে। সেই রাগটা প্রকাশও পেলো নিজের চেহারায়। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে বলে উঠে আয়ন….

—” ফাজলামো পেয়েছেন আপনারা? সবকিছু এতো সোজা মনে হয় আপনাদের কাছে? চিনেন আমাদের? জায়গায় বসে থেকে একটা ফোনের মাধ্যমে আপনার পুরো গ্রামবাসীর নাজেহাল অবস্থা করে ফেলতে পারি আমি। পুরো গ্রামবাসী সারাজীবন থানা-পুলিশ কোট কাচারি করেও রেহাই পাবেনা চেয়ারম্যান সাহেব। এতটা বিধস্ত অবস্থা হবে তাদের। আর তাছাড়া কতবার বলবো মেয়ে দুটোর মধ্যে একজন আমার ফিয়ন্সে হয়। তার সাথে আমার বিয়ে পারিবারিক ভাবে ঠিক করা। সময় মতো আমরা বিয়েও করবো। এখন আক্টি পড়িয়ে রেখেছি পারিবারিক ভাবে। তাও বিশ্বাস হচ্ছে না আপনাদের। এখন আমরা পরিবারকে না জানিয়ে হুট করে বিয়েটা করাও সম্ভব নয়। আমার পরিবার কষ্ট পাবে সেটাতে। আর রইলো আমাকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় পাওয়া তো, সেটা নিয়েও আমি বেশ কয়েক বার বুঝিয়েছি আপনাদের যে, আমার ফিয়ন্সের বোনের বাম পায়ে প্রচন্ড আঘাত পাওয়া আমি বাঁধ্য হয়ে তাঁকে কোলে নিয়েছিলাম হসপিটালের নিয়ে যাওয়া উদ্দেশ্য এবং মেয়েটিকে কোলে নিয়ে গ্রামের ভিতর প্রবেশ করি কিন্তু পথে মধ্যেই আপনার সবাই আমাদের আটকিয়ে দিলেন। এবং বন্দী করে রাখলেন এখানে তিন ঘন্টা ধরে। আর তাছাড়া আপনাদের এলাকার ঐ ছেলে দুটো জন্যই আজ এই অবস্থা হয়েছে জুঁইয়ের। অসভ্যতামী করছিল আমার ফিয়ন্সে ও তার বোনের সাথে। আর আমি সেই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই বেদুম মারলাম তাদের। ইচ্ছা প্রবল ছিল ছেলে দুটোকে জানে মেরে ফেলার। কিন্তু করিনি। দয়া দেখিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম তখন। আর এখন তাদের হাতেই আমার ফিয়ন্সে ও তার বোনকে তুলে দিতে বলছেন চেয়ারম্যান সাহেব? আপনার মনে হয়না এবার বাড়িবাড়িটা বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে?

আয়নের কথায় গুলো অন্তত মনোযোগ সহকারে শুনলেন উপস্থিত সবাই। কিন্তু কানে তুললো না কেউ। চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান কিছু বলবে তার আগেই পাশ থেকে বলে উঠলো বয়স্ক বৃদ্ধা লোকটি।…

—” এই পোলা শইল্লের জোর দেখাস আমডার লগে। আমডার গ্রামে থাইক্কা কস আমরা গ্রামের পোলারে জানে মাইরা লাইবে। আমরা কি ক্ষুদি ক্ষুদি(শুধু) বইয়া রইছি এন। সাহস দেখাস আমডার লগে?

আয়ন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো লোকটির দিকে। বয়স্ক লোক। ঢিলঢাল সাদা পুরাতন একটা পাঞ্জাবি পড়া লুঙ্গির সাথে। মুখ ভতি লাল লাল দাঁড়ি। হয়তো মেহেদী দিয়ে পাকা দাড়ি লাল করে রেখেছে। আয়ন বেশ বুঝতে পারলো এখানের উপস্থিত কেউই তার কথা গুলো কানে নিচ্ছে না। বরং তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে আটকে আছে। আয়ন বিরক্তি নিয়ে কিছু বলবে, তার আগেই আবারও পাশ থেকে অন্য একজন বয়স্ক বৃদ্ধা লোক মুখে পান চিবুতে চিবুতে বলে উঠলো…

—” এই পোলার অতলা(এতো) কথা ক্ষুনার(শুনার) কোনো দরকার আছেনি চেয়ারম্যান। আমরা গ্রামবাসী যাহ কুমু তাই ক্ষুনবো এই পোলা। অতলা কথা না কইয়া তাড়াতাড়ি বিয়েটা করাই দেও চেয়ারম্যান। আমডার এলাকার পোলার লগেই দাও বিয়াডা। তাও কাহিনি শেষ কর। তিন ঘন্টা ধইরা বইয়া রইছি এহানে। তামাশা দেখতাছি এই পোলার। এহন আমার কমড়টা ব্যাথ্যা করতাছে। বাইত যামুগা। আমার পাওয়ের ভাঁতের ব্যাথাডা আবার শুরু অইতাছে। তাড়াতাড়ি শেষ করো তামশাডা।

বৃদ্ধা মুরুব্বি রসিয়ে রসিয়ে কথায় মূহুর্তেই স্বজোরে সম্মতি জানালো এলাকাবাসী। তীক্ষ্ণ গর্জনে জানালো মায়া আর জুঁইয়ের বিয়েটা করিয়ে দিতে আঘাত প্রাপ্ত ছেলে দুটোর সাথে। আয়ন বুক কেঁপে উঠে এক মূহুর্তে জন্য। এটা সে কিছুতেই করতে দিবে না কাউকে। আয়ন অস্থির বংগিতে হুমকি স্বরুপ বলে উঠলো….

—” মাথা ঠিক আছে আপনাদের কারও? আপনাদের ধারণা আছে আমরা কারা? আর কি করতে পারি আপনাদের গ্রামের সাথে? আপনারা যে আমাদের আটকিয়ে রেখেছেন এবং জোর পূবক বিয়ে দিতে চাচ্ছেন তার জন্য আইন আপনাদের কতটা ভয়াবহ শাস্তি দিতে পারে সেই ধারণা আছে আপনাদের কারও? আমরা এখান থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আপনাদের কি হাল করবো আমি, সেই ধারণা একটাবারও করেছেন কেউ?

আয়নের কথা গুলো পছন্দ হলো না কারও। উপস্থিত সবাই বিদ্রুপ দৃষ্টি স্থির আয়নের উপর। যার রেশ টেনে পাশ থেকে কয়েকটি লাঠিয়াল ছেলে রেগে তেড়ে আসতে চাই আয়নকে মারতে। পরিস্থিতি প্রায় দস্তাদুস্তিতে চলে গেছে। মারামারি নিশ্চিত। এতে করেও আয়নের ভাবাবেগ হলো না বিন্দু মাত্র। চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দ্রুত উঠে থামিয়ে দেয় লাঠিয়াল ছেলে গুলোকে। পরিস্থিতিটা সামলে ন্যায়। এবং ধমক স্বরুপ বলে এই মূহুর্তে চুপ থাকতে। তিনি কথা বলছেন। পুনরায় গিয়ে বসলো নিজের জায়গায়। অন্তত হিটমিট মেজাজে বললো…

—” দেখো ছেলে! পুলিশ, টাকা, ক্ষমতা আপাতত কোনো কিছু তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না এই মূহুর্তে। কারণ গ্রামবাসী প্রচন্ড রাগান্বিত তোমার উপর। তুমি এই এলাকায় ঢুকেছ মেয়ে নিয়ে তারও আবার অশ্লীল বংগিতে। তোমার এই নোংরা কাজের আমাদের গ্রামের ছেলে মেয়েরাও ভবিষ্যতে এমন অশ্লীল কাজ কাম করে বেড়াতে পারে, যদি এখন আমরা মুরুব্বিরা তার সঠিক বিচার না করি তো। চেয়ারম্যান হয়ে আমি আমার গ্রামের ভবিষ্যত নিয়ে আগে চিন্তা করবো এটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত্ব তুমি আমাদের গ্রামের ছেলেদের মারধর করছো ব্যাপক। একেবারে হাত পা ভেঙ্গে হসপিটালের পাঠিয়েছ। তৃতীয়ত্ব তুমি আমাদের এলাকার কিছু দোকান পার্টও নষ্ট করেছ বাজে ভাবে। এখন তুমি সেই দোকান গুলোর ক্ষতি পূরণ করতে হবে নয়তো ছাড়াছাড়ি নেই। আর রইলো তোমার আমাদের ভয় দেখানো নিয়ে। তাহলে সেটা তুমি এখান থেকে ছাড়া পাওয়ার পর করবে। মানে আমরা তোমাকে ছাড়লে তখন গিয়ে নিজের ক্ষমতা দেখাবে আমাদের উপর। কিন্তু না ছাড়লে দেখাবে কোথায় থেকে? আমাদের গ্রামে প্রায় তিন হাজার মানুষের বসবাস। এই মূহুর্তে এই জনসভায় তোমার সামনে উপস্থিত আছে ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় হাজার বারোশ মতো মানুষ জন হবে। এখন তুমি একা হয়ে নিশ্চয়ই বোকামি করে সবার সাথে জোর দেখিয়ে লড়াই করতে যাবে না, তাই না? যদি করতে চাও তাহলে আমি আর বাঁধা দিব না কাউকে। তবে তোমাকে মেরে যে মেয়ে দুটোকে গ্রামবাসী আটকিয়ে রাখবে এটাও নিশ্চিত। এখন ডিসিশন তোমার। যাও গিয়ে লড়াই করো বারোশ মানুষের সাথে। আর নয়তো বুদ্ধিমান ছেলের মতো আমাদের কথা মেনে নাও।

আয়ন থমকে যায় মূহুর্তে। সারা শরীর হিম হয়ে কাটা দিয়ে উঠে। এতক্ষণ যাবত শক্ত থাকা হাতটি মূহুর্তেই নরম হয়ে যায়। আয়ন নিজের জন্য চিন্তা করছে না। সে চিন্তা করছে মায়াও জুঁইকে নিয়ে। এই বাজে পরিস্থিতিতে যদি আয়ন গ্রামবাসীর কথা মেনে না নেই তাহলে মায়া ও জুঁই দু’জনকেই হারাতে হবে তাঁকে। যেটা সে কখনোই চাই না। হারানোর ভয়ে আয়নের শক্তপোক্ত শরীরটা মূহুর্তেই মৃদু কেঁপে উঠে। সেই সাথে কেঁপে উঠে আয়নে বুক। অস্থির উত্তেজনায় কম্পিত হচ্ছে কলিজাসহ। বিগত তিন ঘন্টা যাবত মায়াও জুঁইকে দেখতে পারছে না আয়ন। গ্রামের মহিলারা জোর পূর্বক আয়ন থেকে মায়া ও জুঁইকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে গ্রামের আসার পর পরই। তাই আয়নের জানা নেই তাঁরা দুজন এখন কেমন আছে? ভালো আছে নাকি গ্রামের মহিলারা কিছু করেছে তাদের সাথে? এক মূহুর্তের জন্য আয়নের মনে উঁকি দিল জুঁইয়ের পায়ের অবস্থাটা জানার জন্য। বাম পায়ের গভীর আঘাতে ছটফট করছিল মেয়েটা। অঝোর রক্তপাত হচ্ছিল পায়ের মধ্যে। আচ্ছা এখন কি ঠিক আছে মেয়েটা নাকি প্রচুর রক্তপাতে বেহুশ হয়ে গেছে মেয়েটা? আয়ন মনে মনে নিজেকে তীব্র ধিক্কার জানালো। সামান্য দুটো মেয়েকে সে সেইফ রাখতে পারলো না? আয়নের মাঝে তীব্র অপরাধ বোধও সৃষ্টি হলো অনেকটা। মনে ছটফট দ্বিগুণ হলো। কিন্তু আয়নকে যেতে দিলো কেউ মায়াও জুঁইয়ের কাছে। অক্ষাত আয়ন রাজি হলো বিয়ে করতে মায়াকে। মনে মনে ভাবলো একদিন তো সে এমনিই মায়াকে বিয়ে করে নিতো। আজ নাহয় পরিস্থিতি দায়ে বিয়েটা করে নিক। তাছাড়া সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো ভালোবাসার মানুষটিকেই সে বিয়ে করছে অন্য কাউকে নয়। আয়ন শান্ত হলো। সেই সাথে শান্ত হলো আয়নের অস্থির তোলপাড় মন। ঠান্ডা মেজাজে সম্মতি জানালো এলাকাবাসী কথায়। মেনে নিল গ্রামবাসীর দেওয়া সকল শর্ত।

—” আমি আপনাদের দেওয়া সব শর্ত মেনে নিলাম চেয়ারম্যান সাহেব। তবে আমারও একটা শর্ত আছে। আমার ফিয়ন্সে ও তার বোনের সাথে আমার দেখা করতে দিবেন একটু। আমি দেখতে চাই তাঁরা সুস্থ আছে কিনা?

আয়নের কথায় মূহুর্তে সবাই মেনে ন্যায়। আপত্তি করলো না কোনো কিছুতে। চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান সম্মতি জানিয়ে বললো….

—” সমস্যা নেই মেয়ে দুটোই আপাতত ঠিক আছে টেনশনে কিছু নেই। তবে একটা মেয়ের অবস্থা একটু খারাপ। বিশেষ করে তাঁর বাম পায়ের অবস্থাটা। আমাদের গ্রামে বিশেষ কোনো হসপিটালের নেই। তাই ডাক্তার এখনো দেখানো হয়নি। তবে ফার্মেসির ডাক্তার দেখানো হবে মেয়েটিকে। রক্ত…

চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান কথা গুলো শেষ করার আগেই উত্তেজিত বংগিতে বলে উঠলো আয়ন।

—” শিট! তার কোনো দরকার নেই চেয়ারম্যান সাহেব। আমি নিজেই একজন ডক্টর। আমি দেখে নিব তাঁকে। আপনি শুধু আমার বলার ঔষধ গুলো ফার্মেসী থেকে আনিয়ে দিন তাহলেও হবে। প্লিজ আমার এতটুকু কাজ করে দিন। মেয়েটার বাম পায়ের ক্ষতটা বেশ গভীর। দ্রুত চিকিৎসা দরকার তার। এমনিতেই এসব ঝামেলার জন্য বেশি দেরি হয়ে গেছে। তিন ঘন্টা ধরে মেয়েটি পায়ের ব্যথায় ছটফট করছে। প্লিজ আমাকে ওদের কাছে নিয়ে চলুন।

উপস্থিত জনসভা হৈচৈয় বেড়ে ওঠে। কানাকানি ফিসফিস শব্দ হয় জোর তালে। আয়নের বিষয়টি ভালো ভাবে নিচ্ছেন না তাঁরা। চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান বিষয়টি বুঝে সবাইকে শান্ত করলেন। পর মূহুর্তে আয়নকে বলে উঠলো…

—” আগে বিয়েটা করে নাও। তারপর মেয়েটির সেবা করো কেউ আটকাবে না।

—” পাগল হয়ে গেছেন আপনার? একটা মেয়ে অসুস্থ অবস্থায় তিন ঘন্টা ধরে পায়ের ব্যথায় ছটফট করছে। আমি ডাক্তার হয়েও তাঁকে চিকিৎসা করতে দিচ্ছেন না। আপনাদের কাছে কি মানুষের জানের চেয়ে এই বিয়েটা বড় হয়ে গেছে? মানবতার বলতে কিছু নেই আপনাদের মধ্যে?

আয়নের অসহায়ত্বের সুযোগ নিল পাশের সেই লাঠিয়াল ছেলেটির। জোর গলায় বললো…

—” না নাই মানবতার টানবতা। তোরই আছে যা। এহন বিইয়াডা তাড়াতাড়ি কর। নাইলে থাক তুই এহানে বইয়া। তারপরও বিইয়া না কইরা মাইয়ার কাছে যাইতাম দিতাম না। তুই বিইয়া করতে দেরি করবি তো আমডাও দেরি করুম। তারপরও যাইতাম দিতাম না তোরে।

আয়নের রাগ বাড়ে তরতর করে। অশিক্ষিত মূর্খ বলদের সমান। তাদের বুঝিয়ে ও কোনো লাভ নেই তারা বুঝবে না বরং উল্টে হামলা করে বসবে। আয়ন কিছু বলার আগেই পাশ থেকে বলে উঠলো চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান। তিনি অন্তত গম্ভীর মুখে বলে উঠলো…

—” কথা বাড়িয়ে লাভ নেই ছেলে। তোমার কথা কেউ আপাতত শুনবে না। তাছাড়া আমরা তোমাকে কিছুক্ষণ আগেই সম্মতি দিয়েছে মেয়েটির সাথে দেখা করার। তবে সেটা বিয়ে করার পর। মসজিদের ইমাম সাহেব এখানেই বসে আছে। তিনি তোমার সাথে তোমার হবু বউয়ের বিয়েটা পড়াবেন এখন। তাই তুমি কথা না বাড়িয়ে দ্রুত বিয়েটা করে নাও এবং আহত মেয়েটার কাছে চলে যাও। মেয়েটার ভালো চিকিৎসা দরকার। আমি ফার্মেসী থেকে তোমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনানোর ব্যবস্থা করছি। ততক্ষণে তুমি বিয়ের করে নাই। দেরি করলে অসুস্থ মেয়েটার ক্ষতি অন্য কারও না।

মানবতাহীন মানুষ কাজে গা জ্বলে উঠে আয়নের। রাগে সারা শরীর তরতর করে কাঁপছে। ইচ্ছা করছে সব কয়েকটাকে নিজের হাত ধরে বেঁধে শাস্তি দিতে। কিন্তু সে এই মূহুর্তে নিরুপায়। দুহাত মুষ্টি বদ্ধ করে টায় জায়গায় বসে থাকে শক্ত হয়ে। কথা বলছে না কারও সাথে। আপাতত সেও দ্রুত বিয়েটা করে ঝামেলাটা চুকাতে চাইছে। এখান থেকে বের হতে চাচ্ছে আগে বাকিটা পড়ে দেখা যাবে। আয়নের রাগের মধ্যে দিয়েই কানে আসলো মসজিদে ইমাম সাহেব গরগর করে বলা কিছু বাক্য। আয়ন চোখ তুলে সেদিকে তাকাতেই। ইমাম সাহেব বলে উঠলো…

—” বাবা বলেন কবুল?

আয়ন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো ইমাম সাহেবের দিকে। পাত্র পাত্রী বাবার নাম, পাত্র পাত্রী নিজের নাম জিজ্ঞেসা না করেই তাঁকে সোজা কবুল বলতে বলছে? এ কেমন বিয়ে দিচ্ছে তাঁরা আয়নের? সে যতদূর জানে এসব ছাড়া তো বিয়ে হওয়ার কথা না। তাহলে? সন্দেহ পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো আয়ন ইমাম সাহেবের দিকে?

—” পাত্র পাত্রীর নিজের নাম, বাবার নাম, ছাড়া কি বিয়ে হয় ইমাম সাহেবের?

এক মূহুর্তে জন্য থমথমে খেয়ে গেলেন ইমাম সাহেবের। নিজের হাতে থাকা বিয়ের রেজিস্ট্রাি কাগজে চোখ বুলিয়ে বললো…

—” পাত্র পাত্রী নিজের নাম বাবা নাম তো লেখা আছে এখানে। এই নাম গুলো নিয়েই তো বিয়েটা পড়াচ্ছি আমি।

আয়নের মনে তীব্র সন্দেহ পূর্ণতা জাগলো। কার না কার নাম নিয়ে আয়নের বিয়ে দিচ্ছে তাঁরা আল্লাহ জানে। তাছাড়া আয়ন তো এখনো পযন্ত কাউকে বলেনি নিজের নামটা তাহলে?

—” আমি এখনো পযন্ত কাউকে নিজের নামটা বলেনি ইমাম সাহেবের। তাহলে আপনি কোথায় পেলেন আমার নাম ঠিকানা হুম?

পাশ থেকে দ্রুত গলায় বলে উঠলো চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান…

—” আমি দিয়েছি তোমার নাম ঠিকানা। তোমার ওয়ালেটে ভিজিটিং কার্ডে তোমার নাম ঠিকানা ছিল। সেটাই দিলাম। সেই সাথে ওয়ালেটের মধ্যে তোমার একটা ভিসার কাগজও পেয়েছিলাম। সেখান থেকে তোমার বাবার নামটাও যোগ করলাম। আর রইলো তোমার ফিয়ন্সের নাম? তাহলে সে নিজেই বলেছে। আমি মহিলা দিয়ে জিজ্ঞেসা করেছিলাম। মেয়ের নাম রিক্তা ইসলাম মায়া এবং বাবা নাম শফিকুল ইসলাম। বাকি আর কিছু জানার প্রয়োজন আছে বলে মনে হচ্ছে না আয়ন সাহেব।

আয়ন আর কিছু নিয়ে মাথা ঘামালো না। যেহেতু মায়ার সাথে তার বিয়েটা হচ্ছে সেহেতু আর কিছু দেখার প্রয়োজন হলো না তাঁর। আপাতত দ্রুত বিয়েটা সেরে এখান থেকে সোজা ঢাকা ফিরতে চাই আয়ন জুঁইকে ভালো চিকিৎসা দেওয়া দরকার। আজ এতো কিছুর পর কোনো ভাবেই মায়া আর জুঁইক নিয়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়া যাওয়া যাবে না তাহলে বড়সড় ঝামেলা পড়বে আবারও। জুঁইয়ের অবস্থাটা করুণ। তাই চেয়ারম্যান শামসুজ্জামানের কথায় আয়ন মূহুর্তে চুপ করে গিয়ে শান্ত বংগিতে বসে রইলো। ইমাম সাহেবের কথায় দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে কয়েক সেকেন্ড লম্বা একটা দম নিয়ে ঠান্ডা ভিজা গলায় বললো….

—‘ কবুল।

পাশ থেকে মুরুব্বিরা একত্রে শব্দ করে বলে উঠলো…

—” আলহামদুলিল্লাহ!

সময় নিয়ে বিয়েটা সম্পূর্ণ হলো। আয়নকেও নিয়ে যাওয়া হলো মায়ার কাছে। মায়া ভয়াৎ বংগিতে জুঁইকে আঁকড়ে ধরে বসে আছে। জুঁই বিধস্ত অবস্থা ঢলে পড়ে আছে মায়ার বুকের। নিজের দুহাতে মায়ার কমড় আঁকড়ে ধরা। বেহুশ হয়নি। হুঁশেই আছে। নিভু নিভু চোখে আওড়াচ্ছে সবকিছু। আয়ন টিনের ছোট ঘরটিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো মায়া ও জুঁইয়ের বিধস্ত চেহারা। থমকে যায় আয়ন। বুক কেঁপে উঠে মূহুর্তেই। সে অধম্ম! নিজের আপন জন্যদের রক্ষা করতে অনেকটা সময় লেগেছে তাঁর। আয়ন অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় সেদিকে। ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া মুখ দুটোতে দেখে কাতর দৃষ্টিতে। বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যায় মায়া ও জুঁই কাছে। চেয়ার টেনে বসে মায়াও জুঁই সামনে। সাথে সাথে আয়নের প্রশস্ত বুকে ঢলে পড়ে মায়াও জুঁই একত্রে। ভয়ে আষ্টশ হয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে দু’জন একত্রে। আয়ন নিজের ঠোঁট কামড়িয়ে স্থির হয়ে বসে তাকে। বুঝতে পারে মায়া ও জুঁইয়ের সাংঘাতিক ভয়ের কারণটা। এতক্ষণ যাবত অপরিচিত মানুষদের মাঝে নিজেদের অসহায় মনে করছিল মায়া ও জুঁই। কান্নাও করেছিল ভিষণ ভাবে। অনুরোধও করছিল মায়া গ্রামের মহিলাদের যে তাদের আয়নের কাছে যেতে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কেউ দেয়নি বরং মায়াও জুঁইকে ভয় দেখিয়ে ধমকিয়ে বসে রেখেছিল এতক্ষণ যাবত গ্রামের বয়স্ক মহিলারা। তাই এখন হুট করে আয়নকে নিজেদের সামনে দেখে আশ্বস্ত হয় দু’জনই। নিজেদের ভরসা স্থল আয়নকে মনে করে মূহুর্তেই দু’জনই আয়নের ঝাপটে ধরে ভয়ে। আয়ন সম্পূর্ণ বিষয়টি বুঝে ভরসার হাত রাখলো মায়াও জুঁইয়ের মাথার উপর।

চলিত…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply