দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২০
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
২০
রাত ৪ঃ১১। মায়ার হাত চেপে ধরে খান বাড়ির ড্রয়িংরুমের সোফায় বসায় হেনা খান। শরীরটা খানিকটা দূর্বল। আরাফ খানকে সোজা রুমে শিফট করা হয়েছে। শরীর দুর্বল হলেও দুজনই চলাফেরা করতে পারছে খানিকটা। মায়ার মাথার চারপাশ ঘুরিয়ে বেন্ডেজ করা। শরীরের কোনো আঘাত নেই। আয়ন আরাফ খানের তদারকির জন্য সেখানটায় আছে। হেনা খান ছাড়া বাকি সবাই উপরের আরাফ খানের রুমে। মায়ার পাশে আবাক বংগিতে বসে আছে জুঁই। দৃষ্টি ওর খান বাড়ির বিলাস পূণ্যতার গুঞ্জে গুঞ্জে। প্রভাব প্রতিপত্তি নিয়ে বানানো অহংকারী বাড়িটিকে দেখছে হতবাক হয়ে। জুঁই জানতো মায়ার শশুর বাড়ি ধনী দোলালি। কিন্তু এতটা নামীদামী হবে জানা ছিল না। আবাকের শিষ্যস্থানে সে। তখন থেকে শুধু গোল গোল চোখে চারপাশটাই পযবেক্ষণ করে যাচ্ছে। মনোমুগ্ধকর এই খান বাড়ির প্রতিটা দৃশ্যপট। হেনা খান মায়াকে বসিয়ে পা বাড়ায় কিচেনে দিকে। জুই হেনা খানের যাওয়ার দিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে নিজের আবাকতায় প্রশ্ন করলো মায়াকে। বলে উঠলো..
—” মায়ারানী তোর শশুরবাড়ি তো হেবি বড়লোক? আব্বু বলে বড়লোকরা নাকি অহংকারী টাইপের হয়। তোর শশুর বাড়ি মানুষ গুলাও কি তাই? আমার কিন্তু তাই মনে হয়, মানুষ গুলাকে দেখলে কেমন অহংকারী অহংকারী টাইপ লাগে।
জুইয়ের কথায় চোখ কুঁচকে তাকায় মায়া। খান বাড়ির কেউ অহংকারী নয়।৷ সবাই প্রাণবন্তর মানুষ। খান বাড়িতে আসার পর থেকেই দেখে আসছে সবার অগাধ ভালোবাসা। কিন্তু জুঁইয়ের সেটা অবগত নয়। আজই প্রথম খান বাড়িতে পা রাখা জুঁইয়ের। খান বাড়ির মানুষ গুলোকে উপর উপর দিয়ে অহংকারী মনে হলেও ভিতর থেকে সবাই কোমল মনের মানুষ। দুদিন থাকলে জুইও বুঝে যাবে সেটা। মায়া নিবাক। আপাতত মায়ার বাকশক্তি বন্ধ। কিন্তু শ্রবণশক্তি তো ঠিকঠাক। জুই দুষ্টু হাসে। মায়াকে কথা বলতে না দেখে পুনরায় দুষ্টুমী ভাব টানলো মুখে। বলে উঠলো…
—” ওহ আমিতো ভুলে গেছিলাম তুইতো এখন প্রতিবন্ধী। মুখে তো আপাতত তালা মারা। আচ্ছা! ব্যাপার না তোর ভাগের কথা গুলো আমিই সেরে নিব নে। আমি আবার দয়ালু মানুষ। প্রতিবন্ধী মানুষদের দেখলে একটু আধটু দয়া মায়া হয় বুঝলি।
কথা গুলো বলেই বেশ ভাব নিল মায়ার সাথে জুঁই। মায়ার কুঁচকানো চোখ দুটো মূহুর্তেই রাগের আভাস ফুটে উঠলো। জুইয়ের কথা মোটেও পছন্দ হয়নি ওর। সে কোনো প্রতিবন্ধী টতিবন্ধী নয়। তাহলে কেন তাঁকে বারবার জুই প্রতিবন্ধী বলে ভেঙ্গাতক করবে। মায়া চোখ মুখ কুঁচকে রাগী দৃষ্টিতে জুইয়ের দিকে তাকাতেই ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলো কেউ। দুই বোনের দুষ্টু মিষ্টি কথাবার্তা কানে আসতেই বেখেয়ালি চোখ পরে সেদিকে। চলা পথ থামিয়ে স্থির হয় জায়গায়। পকেটে দুহাত গজিয়ে কপাল কুঁচকে তাকায় সেদিকে। অবলোকন করে মায়াকে। মায়া রাগে হাত বাড়িয়ে সোফার কুসুন ছুড়ে মারে জুইয়ের উপর। জুই দক্ষ হাতে সেটা ক্যাচ করে গায় ঘেঁষে বসলো মায়ার। হাসি থামিয়ে একটা ভ্রঁ উঁচু করে বলে উঠলো…
—” প্রতিবন্ধী হয়েও গায়ে এতো জোর? তোর জোর কি সব আমার সাথেই দেখাস নাকি স্বামী জন্য কিছু বরাদ্দ থাকে? (হঠাৎ কিছু মনে পরতেই) ওহ আচ্ছা ভালো কথা! তোর স্বামীকে তো হসপিটালের দেখলাম টেকলাম না। অবশ্য না এসে ভালোই করেছে। আব্বু কিন্তু হেবি রাগ জিজুর উপর। জিজুর সাথে তোর নামটাই শুনতে পারে না। কয়েকদিন আগে আব্বুকে বলতে শুনলাম তুই নাকি আঠারো বছরের হলে তোর স্বামীকে ছেড়ে ব্রাক্ষণবাড়িতে চলে আসবি একেবারে? কথাটা কি সত্য মায়ু? আব্বু ভয়ে কাউকে জিজ্ঞেসা করতে পারিনি বাড়িতে। এখন তুই বল সত্যি কোনটা?
জুইয়ের পরপর কথায় মাথা আওড়ায় মায়া। ক্ষেপ্ত দৃষ্টি থেকে মূহুর্তেই কপাল কুঁচকে আসে সেই দৃষ্টি। জুইয়ের এসব কথা কোনো কিছুই অবগত নয় মায়ার। তাই কি উত্তর করবে তাও জানা নেই। কিন্তু অন্তত এতটা জানে আর যাই হোক না কেন। মায়ার রিদের সাথে কখনোই থাকবে না। থাকার কথাও না। তাদের বিয়েটা বাতিল হয়ে গেছে অনেক আগেই। সেই সুবাদে রিদ ভাইয়া আর তার স্বামী নয়। আর মায়াও কারও স্ত্রী নয়। কিন্তু মায়ার পরিবার সেই সত্যিটা সম্পর্কে অবগত নয়। হেনা খান বলেছে সময় হলে তিনি জানাবেন। আপাতত এখন মায়া কাউকে কিছু না জানাতে। মায়াও কথা রেখেছে জানাইনি কাউকে। কিন্তু জুইয়ের কথার উত্তরটা বোধগম্য নয়। জুইয়ের দৃষ্টি থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে পাশে রাখতেই বেখেয়ালি চোখ পড়লো দরজার সামনে। মূহুর্তেই চমকে উঠলো মায়া। রিদের দৃষ্টি সচ্ছ। কপাল কুঁচকানো বংগিতে তাকিয়ে আছে দুইজনের দিকে। মায়া তাকানোতে সাথে সাথে চোখাচোখি হয় দুজনের। মায়া মূহুর্তেই ভয়ে একটা হাত চেপে ধরে জুইয়ের। ভয়ে উত্তেজনায় সাথে সাথে হেলিয়ে পরে জুইয়ের পিছনে। মুখ লুকায় সাথে সাথে। মায়ার হুটহাট কান্ডে নিবোর্ধ হয় জুই। হঠাৎ করে কিহলো বুঝতে না পেরে নিবোর্ধ বংগিতে তাকায় সামনে। সাথে সাথে চোখে পড়লো রিদকে। জুইয়ের দৃষ্টি বদল হয়। হা করে তাকায় রিদের মুখশ্রীতে। তার ঠিক পাশে আগমন ঘটলো হেনা খানের। রিদকে দরজা সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। তিনি হাসি মুখে কিছু বলবে তাঁর আগেই চোখে পড়লো জুইয়ের আবাক করার দৃষ্টি। মায়া ঝুঁকে তাকায় চোখে পড়লো না মায়াকে উনার। তিনি জুইয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে সাথে সাথেই তাকায় সামনে। রিদ স্বাভাবিক বংগিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে। হেনা খান চমকে উঠে দুজনের দৃষ্টি বদলে বিষয়টিতে। তিনি মনে মনে আওড়ালো রিদ কি এতটা সময় নিয়ে জুঁইকে দেখছে? তারমানে রিদের কি জুইকে মনে ধরেছে? তিনি চমকায়। অবশেষে রিদ কাউকে পছন্দ করলো এটাই অনেক। তাছাড়া দুজনের দৃষ্টি বলছে কতটা গভীর ভাবে দেখছে একে অপরকে। হেনা খান তীক্ষ্ণ সন্দেহ দৃষ্টি নিয়ে এগুতেই, রিদ সেদিকে আরও কয়েক সেকেন্ড কপাল কুঁচকে তাকিয়ে নিঃশব্দে চলে যেতে চাই রুমে। পিছন ডাকলো হেনা খান। তিনি বলে উঠলো….
—” সোনাবাবা তোর কি কিছু লাগবে? কফি পাঠাবো রুমে?
পিছন ঘুরলো না রিদ। চলে যেতে থাকলো নিজের রুমে। কিন্তু কানে আসলো একঝাঁক রাগ মিশ্রিত গলা রিদের। অকারণে রাগ প্রকাশ করে অন্তত গম্ভীর কণ্ঠে বললো রিদ….
—” কিছু লাগবে না আমার। কিছুই খাব না আমি।
রিদের হুটহাট রাগে কারণটা বুঝলো না তিনি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিক্ষেপ করলো রিদের যাওয়ার দিকে। অবুঝতায় এসে বসলো জুইয়ের পাশে। এবার জুইকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করলো তিনি। মেয়েটি অন্তত সুন্দরী একটা মেয়ে। নজরে পরা মতো। দুধের আলতা গায়ের রঙের স্লিম বডি। টানা চোখ হলেও হাসিটা একদম মায়ার মতো। মায়াবী সেই মুখ। জুইকে দেখলে যেকেউ বলে দিতে পারবে মেয়েটি মায়ার বোন। তাছাড়া দুজনের অসংখ্য মিল রয়েছে একে অপরের সাথে। হয়তো বোন বলে এতটা মিল দুজনের মধ্যে। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন তিনি গোপনে। রিদের যদি জুইকে পছন্দ হয় তাহলে তাই করবেন তিনি। যেভাবেই হোকনা কেন শফিকুল ইসলামকে মানিয়ে রিদের বউ করে আনবে জুইকে। তারপরও রিদের একটা সংসার চাই। রিদকে নিজেদের মাঝে আটকাতে চাই। বেপরোয়া থেকে দ্বায়িত্বশীল বানাতে চাই। মায়ার সাথে বিয়ে বাতিলের পর অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছিল তিনি। কিন্তু আজ রিদের দৃষ্টি বদলের বিষয়টিকে লক্ষ করে আবারও আশার আলো জেগেছে মনে উনার। দেখা যাক দু’জনের মধ্যকার বিষয়টি আসলে সত্যি কিনা? হেনা খান বিষয়টি ভালোভাবে জানতে চাই। তাই একটা আলাদা দৃষ্টি সবসময় থাকবে রিদ ও জুঁইয়ের উপর। কথা গুলো নিরবে ভেবে হঠাৎই মাথায় হাত রাখলো জুইয়ের। আদুরে একটা হাত বুলাতেই ইতস্তত বোধ করলো জুই। কিন্তু কিছু বললো না জুই চুপ থাকলো। হেনা খান কয়েক সেকেন্ডর মধ্যে মায়াকে ডাকলো। জুইয়ের পিছন থেকে উঠিয়ে বসাতেই গরম সুপ রাখলো মায়ার সামনে। মায়া ভয়াৎ দৃষ্টিতে চারপাশে চোখ বুলিয়ে কাউকে না পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। চিন্তা মুক্ত হতেই মুখে সুপ তুলে দেয় হেনা খান। নাহুচ বংগিতে চুপচাপ খেয়ে নিল সবটা। হেনা খান চলে যেতে নিলে আবারও চোখ আওড়িয়ে তাকায় জুইয়ের মুখপানে। জুই মায়ার সাথে জড়সড় হয়ে বসে আছে। হেনা খান প্রস্হান করতেই জুইয়ের চেপে ধরে রাখা আবেগটা সাথে সাথে প্রকাশ ঘটলো চেহারায়। উৎফুল্লতা সঙ্গে মুখ খুললো জুই।
—” মায়ারানী লোকটা কি জিজু ছিল? ও মাই গড! এতো সুন্দর জিজু? উফ আমিতো ক্রাশ খেইলাম মনে হয় জিজুর উপর। তুই এতো সুন্দর জিজুকে ছাড়া কেমনে থাকবি? বুক কাঁপবে না তোর? কষ্ট লাগবে না? উফ! তোর বিরহের টানাপোড়ায় তো আমার এখনই কষ্ট লাগছে। ইশ!
জুইয়ের কথায় উত্তর বসালো ফিহা। ধপাস করে মায়ার পাশে বস পড়লো। ক্লান্তিতে গা এলিয়ে দেয় সোফায়। ঘাড় ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ কন্ঠে প্রশ্ন করলো জুঁইকে….
—” কার কিসের কষ্ট লাগবে জুই? কিসের কথা বলছো তুমি?
ফিহার কথায় মূহুর্তে চুপ করে যায় জুই। আর যায় হোক নিজের আব্বুর কথা গুলো কখনোই অন্য কাউকে শুনতে দিবে না সে। অসহায় দৃষ্টি তাকায় মায়ার দিকে। মায়ার দৃষ্টিতেও অসহায় বোধ স্পষ্ট। জুই নিজের বিচক্ষণতা কাজে লাগিয়ে তাৎক্ষণিক সমাধান বলে উঠলো….
—” তেমন কিছু না আপু। মায়ার সাথে একটু মজা করছিলাম। ওহ কথা বলতে পারছিনা বলে আমি দুষ্টমী করছিলাম একটু আরকি।
—” ওহ তাই বলো। আমি মনে করলাম কিসের বিরহের টানাপোড়ার কথা শুনলাম। আচ্ছা যায় হোক মনের ভুল হবে হয়তো। কিন্তু তোমাকে যে আঙ্কেল ঢাকায় রেখে যাবে সেটা অকল্পনীয় ছিল আমার। যাহ খেসারত করেছে আঙ্কেল তোমাকে নিয়ে। কিছুতেই তোমাকে রেখে যেতে নারাজ। অবশেষে মায়ার শারীরিক কন্ডিশনের কথা চিন্তা করে রেখে গেল তোমাকে। আচ্ছা আঙ্কেল কি সবসময়ই তোমাদের নিয়ে এতো স্টিক থাকে? খুব সিরিয়াস তোমাদের নিয়ে তাই না?
ফিহার কথায় নিঃশব্দে হাসলো জুই। মায়াকে হসপিটাল থেকে রিলিজ করার সময় খান পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ দুজনের শত রিকুয়েষ্ট করার পরও জুইকে খান বাড়িতে রেখে যেতে নারাজ পোষণ করে ছিল শফিকুল ইসলাম। শুধু জুইকে নয় মায়াকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল সাথে করে তিনি। কিন্তু মায়ার এক্সিডেন্টের জন্য লং টাইম জার্নিং করাটা ঠিক হবে না বলে জানায় ডক্টর। তিনি বাধ্য হন মায়াকে রেখে যেতে। তবে কথা রইলো মায়া কিছুটা সুস্থ হলে নিজের বাড়িতে যাবে। দুই তিনদিনের ব্যাপার। কিন্তু শফিকুল ইসলাম কিছুতেই খান বাড়িতে যাবে না। আর না নিজের স্ত্রী সন্তানকে পা রাখতে দিবে খান বাড়ির চৌকাঠে। সিদ্ধান্ত নিলো হসপিটাল থেকে সোজা ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে ফিরে যাবেন তিনি। কিন্তু বিপত্তি ঘটে মায়াকে নিয়ে। সে কিছুতেই জুইকে ছাড়া খান বাড়িতে যাবে না। জুইকে নিজের সাথে রাখতে চাই বাকি দুই তিনটা দিন। সে সুস্থ হলে দু’জন একসঙ্গে ফিরতে চাই ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে। কারণ মায়া চিন্তা সে বিগত দুই মাস ধরে প্ল্যানিং করেও নিজের বাড়ি ফিরতে পারছে না আটকা পরছে বারবার খান বাড়িতে। এখন নিজের অসুস্থতার জন্য নিজের বাবা-মার সাথে বাড়িতে যেতে পারছে না। এখন যদি জুইও চলে যায় তাহলে সে আর কখনো যেতে পারবে না বাড়িতে। অদ্ভুত মানুষটা ঠিক কিছু না কিছু করে আটকিয়ে দিবে তাঁকে। সে আটকে থাকতে চাই না। তাই নিজের বাবার সামনে কেঁদেকেটে বন্যা ভাসিয়ে রাখলো জুইকে।
~~
পূর্ব দিগন্তের একফালি সোনালী রোদে আলোকিত হয়ে আছে সবকিছু। হালকা তিরতির বাতাস বয়ছে চারপাশে। চারপাশটা স্নিগ্ধময়। সকাল আটটা ছুঁই ছুঁই। খান বাড়ির বাগানের খোলা আমব্রেলা নিচে বসে আছে মায়া। আর দক্ষহাতে কাজ চালাচ্ছে আয়ন। মায়ার মাথার ব্যান্ডেজ খোলে নতুন করে ঢ্রেসিং করছে সেখানটায়। মায়ার সামনে হেনা খান বসে মনোযোগ সহকারে দেখছে সবটা। কাজ শেষে করে সাময়িক সময়ের জন্য হেনা খানকে বসিয়ে উঠে যায় আয়ন। উদ্দেশ্য নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হবে। মনোস্থির ভাবে কয়েক কদম এগোতেই চোখে পড়লো জুইকে। ঘুম ঘুম চোখ কচলাতে কচলাতে আগমন ঘটলো বাগানের মধ্যে। আয়ন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেটা লক্ষ করে চট করে পিছন ঘুরে তাকায় মায়ার দিকে। সূক্ষ চোখে মায়াকে লক্ষ করে সাথে সাথে তাকায় জুইয়ের দিকে। দু’জনের অসংখ্য মিল লক্ষ করে সে। আয়ন আরও কিছু মিল লক্ষ করবে তখনই চোখ মেলে তাকায় জুই। চোখ মিলল দুজনের। অপদস্তক হলো সে। সাথে সাথে চোখ সরিয়ে পাশে রাখে আয়ন। জুই ইতস্তত বোধ করে জড়সড় হয়ে দাড়ায় আয়নের সামনে। কাচুমাচু করে খানিকটা। আয়ন জুইয়ের অবস্থা বুঝতে পেরে নিরবে পাশ কাটিয়ে চলে যায় ভিতরে। জুই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। এই লোকটাকে মোটেও ঠিকঠাক মনে হয়না তাঁর। সাংঘাতিক লেবেলের অসভ্য লোক মনে হয় ওহ। জুঁই মাথা আওড়িয়ে আর কিছু না ভেবে গিয়ে বসলো মায়ার পাশে। জুই বসতেই হালকা হাসলো হেনা খান। কৌশল বিনিময় করে চা এগিয়ে দিলো জুইয়ের দিকে। সৌজন্য বজায় রেখে হাসি মুখে চা তুললো হাতে। চা কাপে চুমুক বসাতেই ডাক পড়লো হেনা খানের। তলব পড়েছে আরাফ খান হতে। দু’জনকে বসিয়ে রেখে হেনা খান সামনের দিকে এগুতেই চোখে পড়লো রিদকে। রিদ বাগানে কাঁচের বাংলোতে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে গম্ভীর মুখে। দৃষ্টি তার সামনের দুই কন্যাতে স্থির। হেনা খান থমকে গিয়ে সন্দেহ পূর্ণ গাঢ় দৃষ্টি ফেলেন সেদিকে। বুঝার চেষ্টা করলো রিদ কাকে দেখছে একমনে। মায়াকে নাকি জুইকে? দু’জনই পাশাপাশি বসা। তাই বুঝার উপায় নেই রিদ কাকে দেখছে? কিন্তু তিনি এতটা বুঝতে পারছেন রিদের দৃষ্টি স্বাভাবিক নয় গভীর। তিনি চট করে রাতের ঘটনা মনে করেন। এবং সেই সাথে ধরে নেন রিদ মায়াকে নয় জুইকে দেখছে। যেহেতু রিদ মায়াকে পছন্দ করে না সেহেতু রিদ জুইকেই দেখছে। হেনা খান নিজের মাঝে সিওর হয়ে প্রস্হান করেন ভিতরে। তার ঠিক সাথে সাথেই দুতলার উপর থেকে ডাক আসলো জুইয়ের। ফিহা নিজের রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে জরুরি তলবে ডাকছে জুইকে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে জুইও চলে যায় ফিহার উদ্দেশ্য। মায়া একা বসে রইলো। হাতে নিজের চায়ের কাপ। প্রকৃতির মৃদু বাতাসে দুলছে মায়ার গায়ের হলুদ ওড়নাটা। খোঁপা করা চুল গুলো থেকে এলোমেলো ভাবে কিছু চুল বের হয়ে আছড়ে পড়ছে মুখে। মায়া বাতাসের সাথে সাথে সেগুলো বারবার কানের পিছনে গজিয়ে দিচ্ছে মৃদু হাতে। থেকে থেকে কাঁপছে মসৃণ ঠোঁট জোড়া। রিদ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। আজকাল তার কি হয়েছে? সে নিজেই বুঝতে পারছে না। কাকে বুঝাবে কতটা বেখেয়ালি করে এই মেয়ের কান্ড গুলো তাকে? শান্তি কি আছে কোথাও এই মেয়েকে ছাড়া? যদি থাকে তাহলে রিদ সেখানটায় যেতে চাই। তবুও বাঁচাতে নিজের বেখেয়ালিপণা থেকে।
রিদ আনমনা হয়ে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসে মায়ার সামনে। মায়া টুকটাক কথা বলতে পারছে সবাই সাথে। অনেকটাই সুস্থ সে। রিদ নির্ভীক বংগিতে মায়ার সামনের চেয়ারটা টেনে বসলো। চেয়ারে শব্দ কানে আসতেই চমকে উঠলো মায়া। মসৃণ চেহারাটা মূহুর্তেই ভয়ে চুপসে গেলো। রিদ চোখ আওড়িয়ে সেটা দেখলো কি দেখলো না তা জানা নেই মায়ার। তবে রিদের চেহারায় অসীম বিরক্তি রেশ। কোনো কিছু নিয়ে সে প্রচুর বিরক্ত। চায়ের কেটলি থেকে নিজের জন্য চা না ঢেলে, চা কাপ টানলো মায়ার। চুমুক বসালো মায়ার চা কাপে। নির্ভীক বংগিতে পরপর চুমুক বসিয়ে সুন্দর ভাবে শেষ করলো সেটা। মায়া হতবাক দৃষ্টিতে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো রিদের মুখশ্রীতে। মায়া জানা মনে রিদ কখনোই কারও এঁটো খাবার খাওয়া তো দূর থাক, আজ অবধি কখনো চা মুখে নিয়েছে কিনা সেটা নিয়ে প্রবল সন্দেহ। চা রিদের অপছন্দ তালিকায়। মায়ার নিশ্চিত যদি হেনা খান এই লোককে তার এঁটো চা খেতে দেখতো? তাহলে মূহুর্তেই আহাজারি বিলাপ করতে করতে অবাকের শিষ্যে পৌঁছিয়ে হেনা খান জ্ঞান হারিয়ে ফেলতো এতক্ষণে। কিন্তু না মায়া জ্ঞান হারায়নি। তারমানে মায়া সাহসী নারী। রিদ ভাইয়ার কথা অনুযায়ী হসপিটাল থেকে সাহসী নারী হয়ে এসেছি সে। মায়া চোখ আওড়িয়ে নিভু নিভু চোখে তাকায় রিদের মুখশ্রীতে। রিদ নির্ভীক বংগীতে চা খাচ্ছে। মায়া ভয়ে ধীরস্থে চলে যেতে চাই। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই কানে আসলো রিদের গম্ভীর কণ্ঠ…
—” কোথাও যাবা না। চুপচাপ বসে থাক এখানে।
মায়ার হতবুদ্ধি হয়ে টায় জায়গায় বসে পরে। ভয়ে ভিতরটা ঢিপঢিপ করছে থেমে থেমে। আজকাল রিদ মায়ার মাত্রাতিক ভয়ে কারণে হয়ে দাড়িয়েছে। রিদকে দেখলে মূহুর্তেই চোখে ঝলঝল করে উঠে রিদের সেই হিংস্র চেহারাটা। মায়া ভয়ে শুকনো ঢুক গিলে। আশেপাশে চোখ আওড়ায়। কাউকে খোঁজা চেষ্টা করে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু আফসোস আশেপাশে বডিগার্ড ছাড়া বাড়ির লোক কাউকেই দেখতে পারলো না মায়া। বডিগার্ড গুলো রিদের তাই মায়াকে সাহায্য করার প্রশ্নই আসে না। ভয়ে চোখ টলমল করে উঠে মায়ার। নিজেকে গুটিয়ে মাথা নিচু করতেই কানে আসলো আবারও রিদের সেই গম্ভীর কণ্ঠ…
—” তোমার বাবাকে আমার পছন্দ না। তাই বাপের বাড়িতে দৌড়াদৌড়ি কম করবা। কারণ তোমার ধান্দাবাজ বাবার বড় বড় প্ল্যানিং আমার পছন্দ না। উনি শশুর মানুষ শশুরের মতো থাকবে। তা না করে তিনি কেন বড় বড় প্ল্যানিং করবে? বউ ছাড়ার প্ল্যানিং ছেহ! শশুরের মেয়েকেও আমার পছন্দ না। উনার মেয়ে আমার মানসিক অশান্তির কারণ। শশুরের মেয়ে ছলনাময়ী। ছলনা করে বেড়ায় আমার সাথে। ছলনাময়ী নারী।
কথা গুলো বলেই থামে রিদ। বিরক্তি রেশ টেনে চোখ তুলে তাকাই মায়ার মুখপানে। চোখ মিলল দুজনের। মায়ার হতবাক কনফিউজড দৃষ্টি। মায়ার ভাব বংগি দেখে বুঝলো মায়া রিদের কথা বিন্দুমাত্র বুঝেনি সে। এতে করে সে আরও বিরক্ত হয়। মনে মনে আওড়ায়, সামান্য বিষয়টি বুঝলো না এই নারী অথচ! কে বলবে? এই ছলনাময়ী নারী আজকাল বড় বড় প্ল্যানিং করে বেড়ায় ধান্দাবাজ বাবা সাথে মিলে। তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার প্ল্যানিং। সেকি ধরে রেখেছে এই ঠকবাজ মহিলাকে। নাকি সে কাউকে বলে বেড়াচ্ছে এই ধান্দাবাজ মহিলা তাঁকে ঠকাচ্ছে? কই সেতো কাউকে কিছু বলছে না। না এই নারীকে সে আর দেখবে না। যাক এই নারী বাপের বাড়িতে চলে। সেও আটকাবে না আর। এই অবাধ্য নারী তাঁকে বুঝে না তাই সেও আর তাকাবে না এই নারীর দিকে। একদমই তাকাবে না। দরকার পরলে তার অবাধ্য মনটাকেও এই নারীকে দিয়ে দিবে। যে মন তাঁর কথা শুনে না। সে মনও তাঁর চাই না। অবাধ্য মন অবাধ্য নারীর কাছেই থাক। সে তাঁকেই খোঁজে। তাই সে আর নিবে না এই অবাধ্য মনকে। চাপা রাগ টানলো মুখে। তিরতির মেজাজে আবারও মায়াকে কথা শুনিয়ে বলে উঠলো রিদ…
—” শুনো মেয়ে তোমার প্রতি আমার বিন্দু মাত্র ইন্টারেস্ট নেই। একদমই পছন্দ না তুমি আমার। কিন্তু আমার অবাধ্য মন তুমি তুমি। তাই তাঁকে তুমিই রাখো আমার চাই না এই অবাধ্য মন। আর না চাই তোমাকে।
কথা গুলো যে ধার্চে বললো সেই ধার্চেই গটগট করে চলে গেলো রিদ। নাক মুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে চলে গেলো গাড়িতে। গাড়ির স্টিয়ারিং বসতেই মনে পড়লো। এই নারী তো বিশ্বাস নেই। যদি সত্যি সত্যি চলে যায় তো? যে ধার্চে গাড়িতে উঠলো সেই ধার্চে সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়লো রিদ। বিরক্তি নিয়ে আবারও হাজির হলো মায়ার সামনে। এবার দ্বিগুণ বিরক্তি নিয়ে তিরস্কার কন্ঠে বললো….
—” উফ! তোমাকে বললাম না সত্যি সত্যি আমার ইন্টারেস্ট নেই তোমার প্রতি। কোনো ভালো টালো বাসিনা তোমাকে আমি। তারপরও কথা শুনছ না। সেই আবার আমাকে নিয়ে আসলে। শুনো মেয়ে! তুমি আমার এক নাম্বারে অপছন্দের তালিকায় আছ। তাই তোমাকেও দেখব না আমি আর। কিন্তু সমস্যা একটাই! শুধু তোমাকে ছাড়া আমি নিশ্বাসটা নিতে পারিনা। তাই ফিরে আসি বারবার। আমার সুস্থ নিশ্বাসের প্রয়োজন তাই তোমার বাপের বাড়ির যাওয়া ক্যান্সেল। আমার কথার অবাধ্য হলে মাথায় উপর তুলে আছাড় মারবো মনে রেখ।
কথা গুলো বলে আর এই মূহুর্তেও দাঁড়াই নি রিদ। বিরক্তি সহিত প্রস্হান করে নিজের গন্তব্যে উদ্দেশ্য। আজকাল সবকিছুর উপর হুটহাট বিরক্ত হয়ে পড়ছে সে। কোনো কিছুতে শান্তি পারছে না। অকারণে রাগটাও বেশি হয় সবকিছুতে। এতে করে সব দোষ তার এই বাতিল বউয়ের। বাতিল বউ হয়েও শান্তি দিচ্ছে না তাঁকে। সবসময়ই অশান্তির মধ্যে রাখে। এই নারীর জন্যই আজকাল অস্থিরতার টানাপোড়া থাকে তাঁর মধ্যে। এই অবাধ্য নারীর জন্য তার মন তার কথা শুনে না। আজকাল বড্ড বেহায়ার হয়ে গেছে তার মন। বেয়াদ্দব মন। বেহায়া মন! হালি অবাধ্য হয়ে বউ! বউ! করে সারাক্ষণ। এতে সে প্রচুর ডিস্টার্ব। অগণিত ডিস্টার্ব ফিল করে সে। তার মন তার কথা শুনবে। তা না করে সে কেন সারাক্ষণ বউ! বউ করবে। সেকি বুঝেনা রিদের কেনো বউ টউ চাই না। রিদের কিচ্ছু চাই না। এই নারী ছলনাময়ী নারী। এই নারী যে ধীরে ধীরে তার মনকে দখল করে নিচ্ছে। সেটা কি তার বেহায়ার মন বুঝে? না বুঝে না! কেন বুঝে না? কেন বুঝতে চাই না তার মন? তার এই অবাধ্য মনের কারণ একমাত্র তার ঐ ছলনাময়ী বউ। সব দোষ তাঁর বউয়ের। বেয়াদ্দব বউ।
মায়া হতভম্ব হয়ে বসে থাকে জায়গায়। রিদের কোনো কথায় মাথায় টুকলো না। সেতো কখনো বলেনি এই লোকটা তাকে পছন্দ করুক। তাহলে? সে নিজেও তো রিদকে পছন্দ করে না। একদমই করে না। কিন্তু রিদের লাস্ট কথা গুলোতে ঠোঁট উল্টিয়ে কান্না করে বসে সে। ভিষণ বাজে লোকটা তাকে বাপের বাড়িতে যেতে নিষেধ করেছে। তারমানে দুনিয়ায় উল্টে গেলেও সে যেতে পারবে না। সে এই খারাপ লোকটার অবাধ্য হবে না কখনোই হবে না। সেতো খারাপ রিদ ভাইয়ার বাধ্য নারী। তাহলে সে কেন অবাধ্য হবে? না মায়া অবাধ্য হবে না। কিন্তু আবারও নিজের বাড়িতে যেতে পারবে না ভেবেই কান্নায় জর্জরিত সে। আহত হয় তার বক্ষস্থল।
চলিত….
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮