দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৯
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
১৯
—” তোমাকে নিয়ে প্রচুর ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি। মনে হচ্ছিল এই বুঝিয়ে হারিয়ে ফেলবো তোমায়। আল্লাহ বাঁচিয়েছে তোমায়। প্লিজ কিছুটা সময় থাকু আমার এই অশান্ত বুকে। বড্ড ছটফট করছে তুমিহীন বুকটা। প্লিজ দুটো মিনিট চাই আমার।
আয়নের কথায় দ্বিগুণ ছটফট করে উঠে মেয়েটি। উত্তেজনায় নিজের ছাড়ানোর চেষ্টা করে বললো…
—” প্লিজ ছাড়ুন আমাকে। কে আপনি?
অপরিচিত কন্ঠে চমকে উঠলো আয়ন। নিজের হাতটা একটু ডিল হতেই আয়নকে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে সরে গেলো মেয়েটি। চোখ মুখ ভয়ে কুঁচকানো। বিষন্নতা ভাব। চোখ গুলো চাপা রাগে ঝলঝল করে উঠে। শাসিত চোখ। আয়ন হতভম্ব হয়ে যায় অপরিচিত মেয়েকে নিজের সামনে দেখে। পিছন থেকে মেয়েটিকে মায়া ভেবে জড়িয়ে ধরেছিল। মেয়েটির শরীর জুড়ে মায়া মায়া গন্ধ আসছিল তাঁর। তাই বুঝতে পারেনি মেয়েটি মায়া নয় অন্য কেউ। অস্থিরতায় আর কিছু ভাবতে পারেনি আয়ন। এই মূহুর্তে কিছু ভাবার সময় নেই তার। শুধু মায়াকে এক পলক দেখা প্রয়োজন। তাই মেয়েটিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উল্টো পথে দৌড় লাগায় আয়ন। উদ্দেশ্য মায়ার কেবিন। আয়নের হুট করা কান্ডে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় মেয়েটি। ঠোঁট উল্টিয়ে তাকায় সেদিকে। এই মূহুর্তে তার ভিষণ কান্না পাচ্ছে। বলতে গেলে ফ্লোরে গড়াগড়ি করে কান্না করতে ইচ্ছা করছে তার। জানা নেই শোনা নেই হুটহাট একটা অসভ্য লোক এসে তাঁকে জড়িয়ে নিল। নিজের ভুল বুঝতে পেরেও তাঁকে সামান্য সরিটুকু বললো না। মেয়েটি আবারও ঠোঁট উল্টিয়ে তাকায় আয়নের দৌড়ান্ত পথের দিকে। রাগে বিরবির করে বলে উঠে…
—” অসভ্য শহরে! অসভ্য লোকের বসবাস। নোংরা লোক ছিহ।
আয়ন হতভম্ব হয়ে প্রবেশ করলো মায়ার কেবিনে। দরজা দিয়ে ঢুকতেই স্তব্ধ হয়ে যায় মূহুর্তেই। থেমে যায় অস্থির পা দুটো। কয়েক জোড়া চোখের দৃষ্টি স্থির হলো তাঁর উপর। সবার হতবাক দৃষ্টি পড়লো আয়নের উপর। উপস্থিত সবাইকে দেখে থমথমে খেয়ে যায় সে। গুটিয়ে ন্যায় নিজেকে। অপরাধী মতো এগিয়ে যায় সামনে। আয়নকে বাংলাদেশে দেখে এগিয়ে আসে মেহেরবান। এই মূহুর্তে হসপিটালে নিজের ছেলেকে আশা করেনি তিনি। তাই তিনি আয়নের সামনে দাঁড়িয়ে অবাক সুরে বলেন…
—” বাংলাদেশে কখন এসেছ আয়ন? আর তুমি বাংলাদেশে আসবে সেটা আমাকে জানাও নি কেন?
মায়ের প্রশ্নে ইতস্তত বোধ করলো আয়ন। উত্তেজনায় কাউকে জানাতে পারিনি নিজের ফিরে আসার কথা। পরিস্থিতি বুঝে চোখ আওড়ায় মায়ার শুকিয়ে যাওয়া মুখের দিকে। মায়ার দৃষ্টি স্থির আয়নের উপর। আয়নের তাকানোতে সাথে সাথে চোখাচোখি হয় দুজনের। আয়ন এক পলক সেদিকে তাকিয়ে থেকে রুমের চারপাশে চোখ বুলাই। বেশ কিছু অপরিচিত কৌতূহলী চোখও তাঁর দিকে তাকানো। আয়ন বুঝতে পারে তারা মায়ার পরিবার। বেশ কয়েকবার ফোনে কথা বলেছিল তাদের সাথে আয়ন। আরাফ খানের ফোনে তাদের ছবি দেখেছিল সে। আয়নের চুপ থাকার মধ্য দিয়ে কানে আসলো মায়ের ধারালো তীক্ষ্ণ কন্ঠ। মেহেরবান পুনরায় প্রশ্ন করে বললো…
—” তোমার না লন্ডনে এক্সাম ছিল? সেটার কি হলো?
আয়ন ইতস্তত বোধ করে মিহি সুরে বললো…
—” কিছু হয়নি মা।
আয়নের উত্তরে সন্তুষ্ট হলো না মেহেরবান। তিনি ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে বেশ পাংচুয়াল। আয়নের ক্যারিয়ার নিয়ে বেশ সচেতন। আয়নের এক্সাম রেখে এইভাবে চলে আসাটা পছন্দ হয়নি উনার।তাই অধৈর্য গলায় পুনরায় বললো…
—” কিছু হয়নি মানে? আমার জানা মতে তোমার পরীক্ষা চলছিল লন্ডনে? তাহলে?
এতটা জার্নি। ক্লান্তি শরীর, অস্থির মনের টানাপোড়া চলছে নিজের মাঝে আয়নের। তাই ঠিকঠাক উত্তর বসাতে পারছে না সে নিজের মাকে। বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিয়ে শান্ত করলো নিজেকে। ভিজা গলায় বললো…
—“এক্সামে গ্যাপ ছিল কয়েকদিন তাই চলে আসলাম মা। দুইদিন থেকে আবারও চলে যাবো। এক্সামের কোনো ক্ষতি হবে না মা। ট্রাস্ট মি।
মেহেরবান ছেলের হুটহাট ফিরে আসাতে সুষ্ঠুটি হয়নি। তাই আবারও কিছু বলবে পাশ থেকে থামিয়ে দেয় হেনা খান। মেয়েকে ধমক দিয়ে কাছে ডাকলো আয়নকে। আয়ন সেদিকে যায়। মেহেরবান পরিস্থিতি বুঝে চুপ করে যায়। আপাতত উনার চুপ থাকাটা শ্রেয় মনে হচ্ছে। মায়ার রুমে আরাফ খানকেও শিফট করেছে সকালে হেনা খানের কথায়। পাশাপাশি বেঁটে শুইয়ে আছে দু’জন। আরাফ খান সবার সাথে হাসিখুশি কথা বলছেন। মায়া নিজের মায়ের হাতে গরম গরম সুপ খাচ্ছে, আর বারবার আঁড়চোখে আয়নকে দেখছে। এখন খানিকটা সুস্থ মায়া। মায়ার পরিবার হসপিটালের আসতে আসতে রাত তিনটা বেজে গেছে। সেই থেকে তাঁরা হসপিটালেরই আছে। মায়ার মা রেহেনা বেগম সবার সাথে হাসিখুশি কথা বললেও শফিকুল ইসলাম নিজের মেয়েকে ছাড়া অন্য কারও সাথে কথা বলছেন না। অন্তত গম্ভীর মুখ বসে আছেন মেয়ের পাশে। প্রয়োজন ছাড়া নিজের স্ত্রীর সাথেও কথা বলছেন না তিনি। এতে করে মায়ার মা রেহানা বেগম স্বামীর এমন কাজে সবার সামনে খানিকটা ইতস্তত বোধ করলেও কিছু বলে না নিজের স্বামী শফিকুল ইসলামকে। বললেও কিছু হবে বলে মনে করছেন না তিনি। স্বামীর মনের চাপা রাগটা বুঝতে পারেন তিনি খান পরিবারকে নিয়ে। শফিকুল ইসলাম অনেক স্টিক মানুষ। সোজাসাপটা কথাবার্তা উনার। অন্তত গম্ভীর ন্যায় চলাফেরা তাঁর। রেহেনা বেগমের দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে। কবে যে সবকিছু ঠিকঠাক হবে সেই আশায় বুক বেঁধে আবারও চামচ ভরা সুপ তুলে দেয় মায়ার মুখে।
আরাফ খানের পাশে হেনা খান হাসি মুখে বসা। বাবার পায়ের কাছে শাহেবা বসা। মেহেরবান দাঁড়ানো। আয়ন গুটি পায়ে এগিয়ে চেয়ার টেনে বসে আরাফ খানের বেঁটে পাশে। হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে মায়াকে এক পলক দেখে নিয়ে তাকায় আরাফ খানের মুখের দিকে। সে কিছু বলবে তাঁর আগেই প্রশ্নের সম্মুখীন হয় আরাফ খানের। তিনি দুষ্ট হেঁসে ভ্রুঁ নাচিয়ে বললো…
—” ডাক্তার সাহেবের আমার জন্য এতো ভালোবাসা? একরাতে সোজা লন্ডন থেকে বাংলাদেশে। নট ব্যাড। এই ভালোবাসার দাবিদার কি আমি একাই? নাকি আরও কেউ সংযুক্ত আছে আশেপাশে ডাক্তার সাহেব?
আয়ন ইতস্তত বোধ করে। খানিকটা লজ্জাও পায় আরাফ খানের কথায়। আরাফ খানের কথায় স্পষ্ট সবাই আয়নের পাগলামোর কারণ ধরতে পেরেছে। মায়াকে ঘিরে উত্তেজনা বুঝতে পেরেছে। মায়ার সাথে তাঁর এনগেজমেন্টের বিষয়টা খান পরিবারের সবাই জানলেও মায়ার পরিবার এখানো অবগত নয়। তাই তারা বিষয়টি ভুল বুঝতে পারে এমনটা ভেবে আঁড়চোখে পাশে তাকায় আয়ন। মায়াও রেহেনা বেগমের দৃষ্টি তার উপরই। কিন্তু শফিকুল ইসলাম মেয়ের পাশে চেয়ারে বসে পত্রিকা পড়ছেন দিব্যি। সেদিকে আপাতত তার খেয়াল নেই। মনোযোগী নয় খান পরিবারের কারও কথায়। পরিবেশটা স্বাভাবিক দেখে লাজুক হেসে মাথা চুলকায় আয়ন। প্রতিউত্তরে কথা ঘুরিয়ে বললো।
—” এখন কেমন আছো নানুভাই?
—” ডাক্তার সাহেব কি নিজের কথা ঘুমাচ্ছে? ওহ তারমানে ভালোবাসা ভাগে আরও কেউ আছে তাই তো?
আয়ন ইতস্ততায় ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের মায়ের দিকে তাকায়। আরাফ খান যে তার পরিস্থিতির মজা নিচ্ছে বেশ ভালোই বুঝতে পারছে সে। তবে সেও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। কিন্তু পরিস্থিতিত চাপে পরে ভদ্র সাজতে হচ্ছে তাকে। নিজের মা আর মায়ার পরিবার পাশে আছে বলে আরাফ খানের কোনো কথার উত্তর বসাতে পারছে না সে। আর সেই সুযোগটায় লুফে নিচ্ছে আরাফ খান। দু’জন মধ্যেই বেশ দুষ্ট মিষ্টি সম্পর্ক। সবার জানা। হেনা খান মিটমিট করে হেঁসে উঠে। মেহেরবান ছেলের পরিস্থিতি বুঝে বলে উঠলো হেনা খানকে….
—” মা আমি বাহিরে যাচ্ছি একটু। মালাকে বলেছিলাম তোমাদের খাবার আনতে। ফোন করে দেখি কোথায় আছে মেয়েটা। আপা তুই আমার সাথে আয় তো একটু বাহিরে।
মেহেরবানের কথায় শাহেবা উঠে দাড়ায়। দরজার দিয়ে বের হয়ে যেতেই পিছন ডেকে উঠলো হেনা খান।
—” ফিহাকে একটু রুমে পাঠিয়ে দিস তো। ফিহার সাথে জুঁইও বাহিরে চা খেতে গেছে। মেয়ে দুটোকে ভিতরে পাঠিয়ে দিস কেমন।
—” আচ্ছা মা।
মেহেরবান চলে যেতেই নিজের মাঝে খানিকটা সহজ হয় আয়ন। চোখ ঘুরিয়ে তাকায় আরাফ খানের দিকে। দুষ্টুমী রেখে সিরিয়াস বংগিতে কপাল কুঁচকায় সে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বললো….
—” কাল কি হয়েছিল নানাভাই? হামলাকারীরা কারা ছিল বলতে পারো কিছু?
মুখের বংগি বদল হয় আরাফ খানের। তিনি ভয়াৎ চোখে তাকায় মায়ার দিকে। মায়ার চেহারায় ভয়টা স্পষ্ট। চুপসে আছে নিজের মাঝে। আয়নের কথা প্রশ্নে নিজের মাকে মুহূর্তে চেপে ধরে শক্ত করে। মেয়ের ভয়ে কারণ বুঝতে পেরে রেহানা বেগম দু’হাতে জড়িয়ে ন্যায় মায়াকে। তার সাথে সাথেই পত্রিকা থেকে চোখ তুলে তাকায় শফিকুল ইসলাম। মেয়ের হঠাৎ এতটা ভয়ে কারণ বুঝতে পারছে না। তীক্ষ্ণ সন্দেহ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মায়ার দিকে। উনাকে খান পরিবার থেকে বলার হয়েছে যে মায়ার ছোটখাটো এক্সিডেন্টের কথা। কাল মায়াকে নিয়ে ব্রাক্ষণবাড়িতে ফিরার সময় ছোটখাটো ঝামেলা হয়েছিল রাস্তায়। এতটা জানিয়েছে শফিকুল ইসলামকে হেনা খান। বিস্তারিত কিছুই জানেন না তিনি। বিস্তারিতটা উপস্থিত কেউই জানেন না। এমনকি আরাফ খানও না। হামলা হওয়ার সময় মায়ার সাথে তিনি ছিলেন না। তাই কাল মায়ার সাথে ঠিক কি কি হয়েছিল সেটাও কেউ জানে না শুধু ড্রাইভার জসিম ছাড়া। কিন্তু জসিম এই মূহুর্তে আইসিও তে ভর্তি আছে। আর বাকি রইলো রিদ। সেও কাউকে কিছু বলেনি। শুধু বলেছে রাস্তা ছোটখাটো ঝামেলা হয়েছিল। সেখানটায় আহত হয়েছিল সবাই। এক কথায় এক্সিডেন্ট বলে চালিয়েছে রিদ। ব্যাস এতটায় জানে সবাই। কিন্তু মায়া। সেতো সবটা অবগত। মূহুর্তে তাঁর চোখে ভেসে ওঠে কালকের মর্মান্তিক ঘটনা। ভয়ে সিঁটিয়ে যায় মায়ের বুকে। অশ্রু সিক্ত চোখ ঝলমল করে উঠে মূহুর্তেই। আরাফ খান সেদিকে তাকিয়ে কিছু বলবে তাঁর আগেই মুখ খোলে হেনা খান। তিনি শান্ত বংগিতে বলে উঠলো….
—” হামলাকারীরা কারা ছিল জানিনা। তবে রিদ বলেছে ছোটখাটো এক্সিডেন্ট হয়েছিল নাকি রাস্তায়। আর আসিফ বললো তোর নানাভাই নাকি গাড়িতে না থাকায় আহত হয়েছে মাঝ রাস্তায়। জসিম নাকি গাড়ির সামনে বসা ছিল তাই বেশ আহত হয়েছে কাঁচ ভাঙ্গা ঢুকে। মায়া গাড়ির পিছনে থাকায় নাকি তেমন কিছু হয়নি ওর। আঘাতও পায়নি তেমন। শুধু মাথায় একটু করে আঘাত পেয়েছে। কিন্তু মায়ার জন্য এমন পরিস্থিতিটা প্রথম ছিল বলে মস্তিষ্কের চাপ পেয়েছে একটু বেশি। ট্রমাতে আছে এখন। ডক্টর বলেছে সেটা কাটাতে বেশ কয়েকদিন সময় লাগবে সুস্থ হতে। আপাতত কথা বলতে পারছে না। বাকিটা বিস্তারিত করে কিছু বলতে পারছি না আমি। তুই নিজেই চেক করে নিস রিপোর্ট গুলো। বুঝে যাবি।
হেনা খানের কথায় চমকে উঠে আয়ন। দ্রুত পাশ ফিরে তাকায় মায়া দিকে। সে ডাক্তারি সবকিছু সম্পর্কেই অবগত। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কখনোই পেসেন্ট ট্রমাতে যায় না। কিন্তু হেনা খানের কাছে বিষয়টি ধোয়াসা। তাই তিনি ডাক্তারের সম্পূর্ণ কথা গুলো গুছিয়ে বলতে পারেনি আয়নকে। যতটুকু মনে ছিল ততটুকু বলে গেছে আয়নকে। আয়ন হাসফাস করতে লাগলো। মায়ার এমন পরিস্থিতিতে আয়ন পাশে ছিল না বলে নিজের মাঝে তীব্র অপরাধ বোধ জম্ম নিল। মায়ার পাশে একটু করে বসতে চাই সে। নিরব বংগিতে কথা বলতে চাই দুই চারটা। নিজের মনকে শান্ত করতে চাই মায়ার সাথে কথা বলে। কিন্তু তাঁর কিছুই করতে পারছিনা মায়ার উপস্থিত পরিবারের জন্য। আয়ন অসহায় দৃষ্টি বিলাই মায়ার দিকে। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে নিজের মাঝে। আপাতত তার মায়ার সম্পূর্ণ রিপোর্ট গুলো চেক করা প্রয়োজন। তখনই বুঝতে পারবে মায়ার বর্তমান অবস্থান। কোন কন্ডিশনে আছে মায়ার মস্তিষ্ক। কিন্তু রিদের এই অসময়ে বাংলাদেশের উপস্থিতটা খানিকটা আবাক করে আয়নকে। তাই চমকিত বংগিতে বললো….
—” রিদ বাংলাদেশে নানুমা?
—” হুমমম।
—“কখন এসেছে? আর ঝামেলার সময় রিদ ওদের কিভাবে পেল।
—” জানিনা তবে রিদই সবাইকে হসপিটালের নিয়ে এসেছে। আমাকেও ফোন করে জানিয়েছে সবটা। পরিস্থিতিত উত্তেজনায় পরে রিদকে কিছু জিজ্ঞেসা করা হয়ে উঠেনি আমার।
—” এখন কোথায় আছে ওহ?
—” অফিসে হয়তো। আমি একটু আগে ফোন করেছিলাম বললো আফিসে যাচ্ছে নাকি সে।
—” তারমানে রিদ কয়েকদিন থাকবে বাংলাদেশে নানুমা?
হতাশ কন্ঠে বললো হেনা খান….
—” ঠিকঠাক বলতে পারছি না তবে আশা করছি। ওকে জোর করা মুসকিল।
কথা গুলো বলেই আড়চোখে তাকায় শফিকুল ইসলামের দিকে। তিনি রিদের কথা বলতে শুনে পুনরায় মনোযোগী হয় নিজের পত্রিকা পড়ায়। রিদ সম্পর্কে কোনো কিছু শুনতে ইচ্ছুক নয় তিনি। মেয়ের জামাই হিসাবে রিদকে উনার পছন্দ না। রিদকে ছোট বেলাই পছন্দ করলেও রিদের বড় বেলাই সেই পছন্দটা বিষাক্তায় পরিণত হয়েছে উনার কাছে। তাই তিনিও সুযোগ সন্ধানে আছে। একটা সুযোগ পেলেই নিজের মেয়েকে নিয়ে যাবেন এই খান বাড়ির থেকে। কখনো ছায়াও মারতে দিবে না মেয়ের এই খান পরিবারের কাউকে। রিদকে তো আরও আগে না। এমন উগ্র বেপরোয়া ছেলে কোনো কালেই পছন্দ না উনার। কিন্তু তিনি ওয়াদা বদ্ধ। মৃত্য মানুষকে দেওয়া ওয়াদা রাখতে আজকে মেয়ের সাথে এই নিষ্ঠুর আচারণ উনার। নয়তো রিদের মতো ছেলেকে কখনোই তিনি মেয়ের জামাই হিসাবে মেনে নিতেন না। অবশ্য এখনোও মানেন না। হেনা খান শফিকুল ইসলামের বিরক্তি মাখা ফেস দেখে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে। রিদকে পছন্দ না তাঁর সেটা জানে হেনা খান। কিন্তু মায়ার সাথে রিদের সম্পর্ক নেই এই ভয়েই বলে না তিনি। মায়াকে নিজের সাথে করে নিয়ে যাবেন বলে। তাই তো তাড়াহুড়ো করে আয়নের সাথে বিয়ে দিতে চাই তিনি। কিন্তু আয়নের বলা কথার জন্য চুপ করে আছেন তিনি। এবার আল্লাহ জানে পরিস্থিতিটা কোন দিকে যায়। শেষ পযন্ত কি হয় তাদের জীবন? হেনা খান দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে আয়নকে পুনরায় বলে উঠলো।
—” ছেলেটা একা বাসায়। এতদিন পর বাড়িতে এসেছে ছেলেটা। আমরা সবাই ওর সাথেই সময় কাটাতে চাই। তুইও অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছিস। ডক্টরের সাথে কথা বল মায়া আর তোর নানাভাইকে হসপিটাল থেকে বাড়িতে শিফট করার ব্যবস্হার কর। খান বাড়ি থেকেই বাকি চিৎকার হবে দু’জনে দরকার পড়লে। তবুও বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্হাটা করে দে আজই।
হেনা খানের কথার অর্থ বুঝে আয়ন। কিন্তু দু’জনে শরীরের কন্ডিশনের রিপোর্ট দেখে বলতে হবে তাদের বাসায় শিফট করাটা সুইটেবল হবে কিনা? সে ডাক্তার মানুষ। সবকিছু বুঝে খানিকটা অসম্মতি জানাতে চাই হেনা খানের কথায়। কিন্তু মাঝখান থেকে থামিয়ে দেয় আরাফ খান তিনি স্ত্রীর কথায় সম্মতি জানিয়ে বলেন।
—” হ্যাঁ তোর নানুমা ঠিক বলেছে আয়ন। আমরা বাকিটা চিকিৎসা বাড়ি থেকেই নিতে চাই। তুই শিফট করার ব্যবস্হা করে দে দ্রুত। হসপিটালের পরিবেশ মনে ধরছে না আমার। কেমন রোগী রোগী ফিল হচ্ছে। কিন্তু আমিতো সুস্থ মানুষ তাই বাসায় যেতে চাই। কি বলো শফিক? আমাদের দেখে কি অসুস্থ মনে হয় তোমার?
উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায় আরাফ খান। সেই সাথে উপস্থিত সবার উৎসুক দৃষ্টি ভর করে উনার দিকে। আরাফ খান শফিকুলকে সহজ করতে চাইছেন। নিজের মাঝে দূরত্বটা কমাতে চাইছেন। তাই আগ বাড়িয়ে কথা উনার। কিন্তু শফিকুল ইসলাম অনড়। আরাফ খানের কথা শুনেও শুনলেন না এমন একটা ভাব। মনোযোগ সহকারে পত্রিকা পড়ায় ব্যস্ত। রেহানা বেগম স্বামীর মনস্তাত্ত্বিক ভাব দেখে দ্রুত চোখ ঘুরায় আরাফ খানের দিকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসি টানলো মুখে। আরাফ খানের উদ্দেশ্য বলে উঠলো….
—” একদমই নয় চাচা। বরং আপনাকে দেখলে মনে হয় সুস্থপোক্ত জোয়ান মানুষ হসপিটালের এসে ভিড় জানাচ্ছে শুধু শুধু। হসপিটাল হলো রোগীদের বাসা। এখানে কি সুস্থ মানুষ শোভা পায় চাচা?
রেহেনা বেগমের কথায় উপস্থিত হাসলো সবাই। তবে শফিকুল ইসলাম নির্ভীক বংগিতে বিরক্তি প্রকাশ করলো স্ত্রীর আগ বাড়িয়ে কথায়। শফিকুল ইসলামের করা কাজে চাপা কষ্ট পেলেন হেনা খান ও আরাফ খান। শফিকুলের এই রাগ আজ থেকে নয়। বরং বিগত কয়েক বছর ধরে। সেই রাগটা বাড়ছে বয় কমছে না। গোপনে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো দু’জন। চোখ ঘুরালো রেহেনার হাসি মুখের দিকে। আরাফ খান নিজেও হাসলো রেহানার হাসিতে। পরিস্থিতি সামলিয়ে নিজেও ফিচেল কন্ঠে বললো…
—” উফ! এইতো বুঝলো আমার কষ্ট কেউ? রেহেনা তুমি একটু বুঝাও তো এই ডক্টর ফক্টরকে। সবকিছুতে আগ বাড়িয়ে দুই লাইন বেশি বুঝতে চাই এরা। এইসব ডক্টরদের জন্য সুস্থ হয়েও রোগী উপাধি টানতে হচ্ছে আমার মতো ইয়াং ম্যানকে।
সবাই হাসলো। আয়ন শফিকুল ইসলাম থেকে দৃষ্টি ঘুরাই রেহেনা বেগমের মুখের দিকে। নিত্যান্তই সুন্দরী সেই মুখ। তবে মায়ার সাথে সেই মুখের বেশ একটা মেল খোঁজে পেল না সে। মায়ার সাথে চেহেরার মিল খোঁজে পেল রেহেনা বেগমের। মনে হলো মার নয় বরং বাবার কার্বন কপি মায়া। কিন্তু মায়ার গায়ের রংটা না বাবার পেল না মার। বাবা শ্যাম বর্ণের তোহ মা দুধের আলতা। কিন্তু মায়া হলো কাঁচা হলুদ ফসা। আয়ন চোখ আওড়িয়ে আর কোনো মিল করতে পারলো না কারওই। মায়া কার মতো হয়েছে সেটাও ধরতে পারলো না। তবে শফিকুল ইসলাম যে কতটা শক্ত মনের অধিকারী সেটা বেশ ধরতে পারলো আয়ন। বিগত সময় ধরে শফিকুল ইসলামের গম্ভীর্য্য ভাব। একরোখা আচরণ সবকিছুই লক্ষ করেছে আয়ন। আয়ন খানিকটা টেনশনে পড়ে যায় মায়ার আর তার বিয়ের নিয়ে। এই লোকটাকে অদৌ মানাতে পারবে কিনা সন্দেহ? প্রথমে মায়ার পরিবারকে সহজভাবে নিলেও এই মূহুর্তে নিতে পারছে না মায়ার বাবাকে দেখে। মনে হচ্ছে মায়ার বাবা সাংঘাতিক খেসারত মানুষ। মেয়ে নিয়ে ঝামেলা করবে এতটা নিশ্চিত সে। আয়ন কিছুটা টেনশনে পরে যায়। যদি মায়ার বাবা না মানে তারপরও হাল ছাড়বে না সে। দেখা যাক ভবিষ্যতে কি হয় উনাকে নিয়ে?
আয়ন এক মনে ভাবলো কথা গুলো। পাশ থেকে আরাফ খানের কথা কানে আসতেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সেদিকে। নিঃশব্দে হেঁসে সম্মতি জানায় আরাফ খানকে। আয়ন উঠে দাঁড়ায় সবকিছুর ব্যবস্হার করতে। পিছন ঘুরতেই রুমে প্রবেশ করলো ফিহা। তাঁর ঠিক পিছনে ভদ্র পায়ে প্রবেশ করলো আরও একটি মেয়ে। মেয়েটিকে দেখে মূহুর্তেই খানিকটা চমকায় আয়ন। মনে পরে তখনকার হওয়া এক্সিডেন্টের কথার। মেয়েটি প্রথমে হাসি মুখে প্রবেশ করলেও আয়নকে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সেও চমকে উঠে। থমথমে খেয়ে যায় জায়গায় দুজনই। ফিহা বেশ হাসি মুখে কথা বলছে মেয়েটির সাথে। আয়ন সেদিকে কপাল কুঁচকে তাকায়। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে মেহেরবানও মালাকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করলো। বাসা থেকে খাবার আনিয়েছেন সবার জন্য। ঘরে খাবার। ফিহা মেহেরবানের সাথে এগিয়ে যায় সামনে। কিন্তু মেয়েটি টায় জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে নড়চড় নেই। খানিকটা হাসফাস করছে আয়নকে এখানে দেখে। আয়ন সামনে এই অপরিচিত মেয়েটি কে হতে পারে? সেটা বোধগম্য হচ্ছে না তাঁর। স্বাভাবিক বংগিতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দৃষ্টি সরিয়ে পাশে রাখলো সে। পরিবারের সামনে কোনো অপরিচিত মেয়ের দিকে তাকিয়ে তাকানোটা ভালো লক্ষণ নয়। সেটা ভালো চোখে নিবে না কেউ। যতই সে ভালো চোখে দেখুক না কেন। আয়নের ভাবনার মাঝেই ডাকলো হেনা খান। তিনি বলেন….
—” জুই তুমি দরজায় দাঁড়িয়ে আছো কেন? ভিতরে আসো। ফিহার সাথে কিছু খেয়ে নিবে। আসো।
হেনা খানের কথায় জুঁই সম্মতি জানানোর আগেই নিরবতা ভাঙ্গালো শফিকুল ইসলাম। তিনি অন্তত গম্ভীর্য্য মুখে বলে উঠলো…
—” ধন্যবাদ মিসেস খান। এতটা সহানুভূতি দেখানোর জন্য। কিন্তু সেটা আপাতত রাখতে পারছিনা আমি। কারণ মেয়েকে খাওয়ার যথেষ্ট সামর্থ্য আছে আমার। আমার মেয়েকে নিয়ে এতটা চিন্তত হওয়ার প্রয়োজন নেই। যতোটা দয়া দেখাচ্ছে ততটা প্রয়োজন নেই আমার মেয়েদের। তাছাড়া আমার মেয়েদের নিয়ে অন্যের মাতামাতিটা পছন্দ না আমার।
অন্তত শক্ত গলায় বললো কথা গুলো শফিকুল ইসলাম। হেনা খানের সাথে অন্তত কঠিন বাক্য ব্যবহার করলেও তার থেকে দ্বিগুণ কোমল হলো জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে। নিজের কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে আদুরে সহিত নিজের কাছে ডাকলো জুইকে। বাবার ডাকে গুটি পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে জুঁই। শফিকুল ইসলাম পাশে দাঁড়াতেই মাথায় আদুরে হাত বুলালো তিনি। কোমল স্বরে বললো….
—” ক্ষুদ্রা পেয়েছে তোমার? কিছু খাবে তুমি? বাবাকে বলো! নিয়ে যাবো তোমায় খাওয়াতে। যাবে তুমি?
শফিকুল ইসলামের কথায় মূহুর্তেই মাথা নাড়ায় জুই। রেহেনা বেগমের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই তিনি চোখে ইশারায় বুঝায় খাওয়ার জন্য যেতে। রেহেনা বেগমের ইশারা অনুযায়ী সাথে সাথে মিহি কন্ঠে বলে উঠলো জুই….
—” যাবো আব্বু।
মেয়ের কথায় সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায় শফিকুল ইসলাম। নিজের হাতের পত্রিকাটা কর্ণার সাইডের টেবিলে রেখে গায়ের পাঞ্জাবিটা টেনে ঠিক করে। জুইয়ের অনেকটায় ক্ষিদা পেয়েছে সেটা বুঝতে পারছেন শফিকুল ইসলাম। শেষ খাবার খেয়েছিল কাল রাতে। মধ্যে রাতে মায়ার এক্সিডেন্ট এর কথা শুনে প্রায় সাথে সাথেই পাগল পাগল হয়ে বের হয়েছিল উনারা জুইকে নিয়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়া থেকে। উত্তেজনায় কিছুই খাওয়ানো হয়নি জুইকে। সারারাত না খেয়েই রয়েছে মেয়েটা। এখন সকাল এগারোটা বাজে। অনেকটা সময়ের ক্ষুদ্রা রয়েছে পেটে। আপাতত মেয়েকে কিছু খাওয়ানো দরকার। বাবা হয়ে আরও আগেই খোঁজ নেওয়া দরকার ছিল মেয়ের। খানিকটা অপরাধ বোধ কাজ করলো মনে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করলো না। অন্তত গম্ভীর মুখে চলে যেতে ন্যায় জুইকে নিয়ে। কিন্তু আবারও ঘুরে দাঁড়ায়। হুট করে কিছু মনে পড়ায় দুই কদম এগিয়ে যায় মায়ার দিকে। আদুরে হাত মায়ার মাথায় বুলিয়ে আদুরের সহিত বলে উঠে…
—” আব্বু জুইকে নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে আসবো কেমন। তোমার কিছু লাগবে রিতু? কি আনবো আব্বু তোমার জন্য?
মায়া কথা বলতে না পারাই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। যার অর্থ তার লাগবে। মেয়ে সম্মতিতে হাসলো শফিকুল ইসলাম। পাশ থেকে খাতা কলম নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো মায়াকে। বললো…
—” এটার মধ্যে লিখে ফেলো তো ফটাফট তোমার কি কি লাগবে। আব্বু আসার সময় নিয়ে আসবো তোমার জন্য।
মায়ের বুক থেকে উঠে বসে মায়া। খাতা কলম হাতে নিয়ে লেখাতেই সেদিকে উকি দেয় জুই। মায়া কি লিখছে সেটা দেখার চেষ্টা করে। মায়া নিজের লেখাটা শেষ করে শফিকুল ইসলামের দিকে এগিয়ে দেয়। কাগজের টুকরোটা হাতে নিতেই মুখ ভরতি হাসে তিনি। মায়া দিকে তাকিয়ে বললো….
—” জুঁই যাহ খাবে তাই খাবে তুমি। অন্য কিছু খাবে না? জুইয়ের যতটা আইসক্রিম, চিপস চাই তোমারও ততটাই চাই? এর থেকে কম বেশি চাই না তোমার? হুমম?
মায়া মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানায়। যার অর্থ ‘না’ শফিকুল ইসলাম প্রাণবন্তর হাসে মেয়ের কান্ডে। মায়া পাশে থাকলে সবসময়ই এমন আবদার করবে শফিকুল ইসলামের কাছে। শুধু মায়া নয় জুই ও কম যায় না। দুজনই একি রকম। উনার দুই কন্যাই চোখের মধ্যমুনি। কলিজার টুকরো। উনার কাছে সব সম্পর্ক এক দিকে দুই মেয়ের সাথে বাবা হিসাবে উনার সম্পর্ক অন্য দিকে। মেয়েদের নিয়ে কারও সাথে কম্পোমাইজ করতে চাই না। তিনি যত্নবান মেয়েদের প্রতি। তাই অসময়ে মায়াকে খান পরিবারের কাছে দিয়ে দেওয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না তিনি। বলতে গেলে উনাকে ধর্মনীতির জ্বালে ফাঁসিয়ে নিজের মেয়েকে জোর পূবক নিজেদের কাছে রেখেছেন খান পরিবারের সদস্যরা। সুযোগ সন্ধানে তিনিও বসে আছেন। সুযোগ পেলে তিনিও বুঝাবেন মেয়ে হারানোর কষ্ট। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে শফিকুল ইসলাম। আবারও মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে সম্মতি জানিয়ে চলে যান তিনি। শফিকুল ইসলাম বের হতেই এক লাফে এগিয়ে আসে জুঁই। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার চোখে মুখে মূহুর্তেই ভাসে অগাত চঞ্চলতা। হাত বাড়িয়ে চট করে গাল টানে মায়ার। চঞ্চল বংগিতে বলে উঠে…
—” তোর থেকে সবকিছু দুইটা বেশি খাব আমি। আব্বু সাথে আমি যাচ্ছি বাহিরে তুই না। তাই খাওয়ার তালিকাটাও বেশি বেশি হবে আমার। গেলাম আমি। তুই বসে বসে আফসোস কর যাহ।
জুইয়ের কথায় ক্ষেপ্ত দৃষ্টিতে তাকায় মায়া। যার অর্থ ” খবরদার তুই আমার থেকে বেশি খাওয়ার চেষ্টা করবি না জুঁই। সমান সামন খাবি। মায়ার রাগান্বিত চোখে ঠোঁট প্রসারিত করে হাঁসে জুই। পাশ থেকে রেহেনা বেগম দ্রুত তাড়া দিয়ে বললো….
—” আচ্ছা যাহ! তুই-ই বেশি খাস। এখন তোর আব্বু বাহিরে অপেক্ষা করছে তোর জন্য। দ্রুত যাহ তুই। দেরি হলে আবার রাগ করবে। যাহ।
রেহানা বেগমের কথায় মূহুর্তেই মায়াকে জিব্ব দেখিয়ে ভেঙ্গিয়ে দৌড়ায় শফিকুল ইসলামে পিছন পিছন। মায়া অসহায় বংগিতে তাকায় নিজের মায়ের দিকে। অসুস্থ না থাকলে নিশ্চিত মনে সেও যেত বাবার পিছন পিছন। মেয়ের অসহায় ফেস দেখে শান্তনা দিল রেহানা বেগম। তিনি বললো….
—” তোর আব্বু বলেছে না জুঁই যাহ খাবে তাই আনবে তোর জন্য? তাহলে ব্যাস। তাই তাই-ই আনবে তোর জন্য। একটুও কম বেশি করবে না দেখিস। এখন শুইয়ে পড় তুই। আয় এদিকে।
মায়া হালকা হাসলো। মায়ের কথা মনে ধরেছে ওর। তাই বাধ্য মেয়ের ন্যায় শুইয়ে পড়লো বেঁটে। গা ফুলালো না আর। রেহেনা বেগম মায়াকে শুয়ে পাশে তাকাতেই চোখে পড়লো কয়েক জোড়া চোখের বিষন্নতার দৃষ্টি। তিনি খানিকটা ইতস্তত বোধ করলেন। স্বামীর করার কান্ডে বারবার লজ্জিতও হচ্ছে। কিন্তু তিনিও নিরুপায়। স্বামীর মুখের উপর কথা বলার সাধ্য উনার নেই। তাই অপরাধী গলায় ক্ষমা চাইলেন সবার কাছে স্বামীর হয়ে। হেনা খানের দৃষ্টি ছলছল। অশ্রুতে টইটম্বুর হয়ে আছে আঁখি জোড়া। উপস্থিত সবাই এতক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মায়ার পরিপূর্ণ পরিবারের দিকে। শফিকুল ইসলাম মেয়েদের সাথে কতটা প্রাণবন্তর ও যত্নশীল সেটা মুগ্ধতা নিয়ে দেখছিল তাঁরা। হেনা খান বুঝতে পারে শফিকুল ইসলামের মনের ব্যথা। উনাদের জন্য শফিকুল ইসলামের সাজানো সুন্দর পরিপূর্ণ সংসারটা অপূর্ণ হয়ে আছে। কিন্তু তারাও নিরুপায়। মায়াকে ছাড়া খান পরিবারটাও তোহ অপূর্ণ। মায়াকে ফিরিয়ে দিলে তাঁরা স্বামী স্ত্রী থাকবে কি নিয়ে? তাই পরিস্থিতির দায়ে তারাও স্বার্থপর। দরকার হলে আরও হবে স্বার্থপর। তারপরও মায়াকে দিবে না শফিকুলের সাথে যেতে। শফিকুল ও তোহ একা নেই। তার তোহ আরও একটা মেয়ে আছে। তাদের ভালো থাকার কারণ এখন জুই। তাহলে তিনি কেন মায়াকে ফিরিয়ে দিবে তাদের কাছে? না তিনি দিবেন না কিছুতেই না। মনকে শক্ত করে তাকাই সামনে আয়নের দিকে আহত দৃষ্টিতে। যার অর্থ ‘ আয়ন পারবি তো মায়ার পরিবারকে রাজি করাতে? পারবি তো তুই আমার সোনামাকে আমার কাছে রাখতে?
আয়ন হেনা খান দৃষ্টি বুঝে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে। যার অর্থ সে আছে। দু’জনে চোখে চোখে কথায় বের হয়ে যায় আয়ন। মাথায় তাঁর অন্য চিন্তা। অপরিচিত মেয়েটি মায়ার বোন এতটা নিশ্চিত সে। কিন্তু কখনো এই মেয়েটি সম্পর্কে অবগত ছিল না সে। কেউ বলেনি মায়ার সমবয়সী একটা বোন আছে। আচ্ছা মেয়েটি কি মায়ার জমজ বোন? মায়ার কি টুইন বোন? দেখে তো সেটাই মনে হলো আয়নের। তার জন্যই হয়তো সকালের করা কান্ডে বুঝতে পারেনি কাকে জড়িয়ে ধরলো সে। মেয়েটির শরীর থেকে মায়া মায়া গন্ধটাও পাচ্ছিল সে। পিছন থেকেও একদম মায়ার প্রতিচ্ছবি মনে হচ্ছিল তাঁর। আয়ন দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে। সকালের কাজের জন্য অনুতপ্ত সে। কিন্তু ভিতরে টানাপোড়ার জন্য তখন সরি বলা সুযোগ পায়নি। আর এখন মেয়েটির চেহারা দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটিও আয়নকে ভয় পাচ্ছে। মেয়েটিকে সকালের করা কাজের জন্য সরি বলতে হবে। সবকিছু মিটমাট করতে হবে। কোনো কিছুই ইচ্ছাতে হয়নি। অনিচ্ছাকৃত পরিস্থিতি ছিল তখন। এখম সুযোগ পেলে সরি বলে দিবে মেয়েটিকে। যেহেতু সে মায়ার বোন তাই নিজেদের মাঝে কোনো ভুল বুঝাবুঝি চাই আয়ন। যদি এর জন্য মায়া আয়নকে ভুল বুঝে তোহ?
চলিত……
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২২
-
দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ গল্পের লিংক