দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৭
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
১৭
পালাও কথাটা মায়া ছোট মস্তিষ্কের টনক নড়লো। বুঝতে পারলো এই পরিস্থিতিতে তাঁকে পালাতে হবে। কোথায় যাবে সেটা জানা নেই। তবে প্রচুর দৌড়াতে হবে তাকে। এই সন্ত্রাসীরা ধরতে না পারে ততটা দৌড়াতে হবে। মায়া উল্টো পথে প্রাণপন্য দৌড় লাগায় মূহুর্তেই। কোন দিকে যাচ্ছে জানা নেই শুধু দৌড়াচ্ছে এলোমেলো ভাবে। শরীর নিস্তিয়ে আসছে ক্রমশয়। দুর্বল চোখের পাতা টেনে খোলে রাখছে কোনো রকম। কতক্ষণ খোলে রাখতে পারবে জানা নেই মায়ার। শুধু জানে আজ তার জীবনের শেষ দিন শেষ মূহুর্ত।
প্রাণপণ্য দৌড়িয়ে বেশ একটা সুবিধা করতে পারলো না মায়া। মাথায় তীব্র আঘাতে ছিটকে পড়লো রাস্তায়। দামান পায়ের পদতলে আটকে পরলো সে। চারপাশ থেকে ঘিরে নিলো সন্ত্রাসীরা। বিক্রম বংগিতে আওড়ালো অকট্য ভাষা। হকিস্টিক তুলে পুনরায় আঘাত করতে ঘিরে থামলো মায়ার রক্ত ঝরা ভয়াৎ মুখ দেখে। পাশের জন আঘাতকারীর ব্যক্তির হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বললো…
—” শালা থাম! মালটা তো হেব্বি জোস। কাঁচা মাল মনে হচ্ছে। ধনীর দুলালী হইবো মনে হয়। আদুর সোহাগ দিইয়া শুধু পালছেই। গায়ে ফুলের টুকাও দেয় নাই। দেখুস না কি নাদুসনুদুস। তাই আমরাও দিমু না।আমরা আদুর দিমু এইডারে। কিছুক্ষণ মজা লইয়া লই আগে মালডার সাথে। তারপর মারা যাইবো। শালা! গায়ের নাদুসনুদুস ভাব দেইখা শরীরের কাটা দিতাছে আমার। এই মাইয়ারে চিপায় নিয়া চল। গায়ের জ্বালা মিঠাই। শাওন তুল মালডারে।
কথা গুলো বলেই বিচ্ছরি বংগিতে হাসলো পাঁচ সদস্যের ছেলে গুলো। বাকিরা সম্মতি জানালো ছেলেটির কথায়। ছোট গ্যাংটি আশেপাশে সতর্ক চোখ বুলালো। পরিস্থিতি বুঝলো। আশেপাশে কেউ আপাতত তাদের দিকে লক্ষ নেই। মায়া ভয়ে তরতর করে কাঁপছে। শরীর কাটা দিচ্ছে ভয়ে। শিরা-উপশিরায় রক্ত সঞ্চালিত বন্ধ হয়ে আসছে। আতংকে জমে আসে হাত পা। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাট। মুখ দিয়ে কোনো রুপ শব্দ বের করতে পারছে না। ভালোবাসার ছায়া তলে আটকে থাকা মায়া, হুট করেই যেন উম্মুক্ত হয়ে গেল। মুখ থুবড়ে পড়লো যেন ক্ষুধাত বাঘ গুলোর সম্মোহে। ছিড়েখুঁড়ে খাওয়াটা নিশ্চিত। মায়া আঁটকে আসা গলায় চিৎকার করতে চাই। কিন্তু করতে পারলো না বিন্দু মাত্র। কপাল বেয়ে বয়তে লাগলো রক্ত আর ঘাম একসঙ্গে মিশ্রিত তরল। পাঁচ ছেলের লোভনীয় দৃষ্টি পড়লো মায়া শরীর জুড়ে। শাওন ছেলেটি এগিয়ে এসে মায়া হাত চেপে ধরে টানতে লাগলো। সেই সাথে মুখে বলে উঠলো সতর্ক বার্তা….
—” মাইয়াডারে নিইয়া যামু কই সজল? চারপাশে তো আসিফদের লোকজন আছে। সতর্ক না থাকলে আমাদের উপর হামলা পড়বে যেকোনো সময়। তাই সবাই একসঙ্গে মাইয়াডার সাথে যাওন যাইত না। একে একে যাইতে হইবো এই মাইয়ার লগে বাসরে।
—” সমস্যা নাই। পাখি যখন পাইছি জ্বালা মিঠানো যাইবো একে একে। আগে মালডারে কোনো গাড়িতে ঢোকা। পরে একজন একজন কইরা কাম সারমো নে। বাকিরা বাহিরে দাঁড়াইয়া পাহারা দিবি। এখন চল তাড়াতাড়ি।
কথা শেষে আরও একজন এগিয়ে এসে মায়ার হাত টেনে ধরলো। ধস্তাধস্তি করে টানতে লাগলো মায়াকে। মায়া গলা ফাটায়। ভয়ে চিৎকার করে ডাকলো আরাফ খানকে। নিজেকে বাঁচাতে চাই। কিন্তু নিরুপায়। আশেপাশে মায়াকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই। সবাই নিজের প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত। এদিক ওদিকে ছুটে পালাচ্ছে সন্ত্রাসীর আওতাধীন থেকে। মায়ার চিৎকারের রাগান্বিত হয় সন্ত্রাসী দল। ক্ষেপ্ত বংগিতে মায়ার ওড়না টেনে মুখ বাঁধতে চাই। মায়ার ওড়নায় হাত দিয়ে টেনে ধরতে মূহুর্তেই কেউ ঝাপিয়ে পড়লো সন্ত্রাসীদের উপর। রাস্তায় উল্টে মুখ থুবড়ে পড়লো পাঁচ সদস্যের ছোট সন্ত্রাসীর গ্যাংকে নিয়ে। মায়াও পড়ে তাদের পাশে। হঠাৎ আক্রমণে প্রস্তুত ছিল না তাঁরা। আকস্মিক ঘটনায় কেউ বুঝতে পারেনি কিহল তাদের সাথে? চোখ ঘুরে তাকাতেই ততক্ষণে মায়াকে টেনে তুললো ড্রাইভার জসিম। দ্রুততার সঙ্গে মায়াকে নিয়ে দৌড় লাগালো সামনে। আরাফ খানকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে আসতে গিয়ে আটকা পড়েছিল জসিম। ততক্ষণে চারপাশে সন্ত্রাসীদের হামলা পড়ে গিয়েছিল। কৌশলে নিজেকে বাচিয়ে মায়াকে খোঁজতে গিয়ে দেখলো মায়া সন্ত্রাসীদের কবলে। তাই কোনো কিছু চিন্তা না করেই ঝাপিয়ে পড়লো তাদের উপর। ছিটকে পড়লো সবাই। সন্ত্রাসীরা চোখ ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাতেই মায়াকে নিয়ে অনেকটা পথ এগিয়ে যায় জসিম। উদ্দেশ্য যে করেই হোক মায়াকে বাঁচাতে হবে এই সন্ত্রাসীদের হাত থেকে। কিছুতেই হারিয়ে যেতে দিবে না মায়াকে। নিজের মেয়ের মতো মায়াকে কখনোই অকালে ঝরে যেতে দিবে না হিংস্র পশুদের হাতে। উত্তেজনায় চোখ ঘুরিয়ে জসিমকে দেখে মূহুর্তেই প্রাণ ফিরে পায় মায়া। আশ্বস্ত হয় নিজের পাশে পরিচিত মুখ দেখে। উত্তেজনায় কিছু বলতে চাই জসিমকে। কিন্তু নিজের কম্পিত স্বরে কিছু বলার আগেই থামিয়ে দেয় জসিম। দৌড়াতে দৌড়াতে বলে…
–” আপামনি আগে দৌড়ান। আপনাকে বাঁচাতে হবে। কথা পরে শুনা যাবে। সন্ত্রাসীরা আমাদের পিছনেই আসছে…
পা চালিয়ে দৌড়ায় জসিমের সাথে মায়া। ভয় উত্তেজনায় বুক কাঁপছে অনবরত। গায়ের পিংক চুরিদার জামাটা ঘেমে জবজব হয়ে লেপ্টে আছে শরীরে। মায়ার মাথার পিছনে আঘাত করায় ঘাড় বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে পিঠের উপর। কপাল কেটে গেছে রাস্তা মুখ থুবড়ে পড়ায়। চোখে মুখে বিধস্ত নাজেহাল অবস্থা। তারপরও প্রাণপন্য দৌড়াচ্ছে জসিমের সাথে। কিন্তু তাতেও কপাল সহায় হলো না মায়ার। সন্ত্রাসীদের হাতের হকিস্টিক ছুঁড়ে মারায় রাস্তায় উল্টে পড়লো জসিম। মায়াও কিছুটা হুঁচট খায়। তবে পড়লো না। সামলে ন্যায় পরে যেতে যেতে। মায়া থেমে যেতে চাই। কিন্তু ততক্ষণে জসিম চেঁচিয়ে নিষেধ করলো মায়াকে। বলে উঠলো….
—” থামবেন না আপামনি দৌড়ান আপনি। আমার কিছু হবে না। ওরা আমাকে নয় আপনার ক্ষতি করতে চাই। প্লিজ আল্লাহ ওয়াস্তে সামনে দৌড়িয়ে যান। সামনে মানুষজন আছে কেউ না কেউ আপানকে ঠিকই বাঁচাবে এদের হাত থেকে। আমি ততক্ষণে এদের যতটুকু পারি আটকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু বেশিক্ষণ পারবো না। প্লিজ আপনি যান আপামনি। সামনে বড় স্যারকে পাইলেও পাইতে পারেন। সেদিকটায় আছে হয়তো তিনি। যান আপনি।
মায়া৷ অস্পষ্ট স্বরে বলতে চাই…
—” চাচা আপনি আ…
—” আল্লাহ ওয়াস্তে দৌড়ান আপামনি। এরা চলে আসছে। আমি বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারবো না। প্লিজ যান।
মায়া দৌড় লাগায় সামনে। ততক্ষণে জসিমকে ঘিরে ধরে সন্ত্রাসীরা। পরপর আঘাত বসায় শরীরের। জসিম ক্ষতবিক্ষত হয়েও আটকাতে চাই তাদের। কিন্তু শেষ পযন্ত পেরে উঠলো না কারও সাথেই। অল্প কিছু সময় আটকিয়ে রাখলেও পর মূহুর্তে হার মানতে হয় তাদের হাতে। ছেলে গুলো জসিমকে ক্ষতবিক্ষত করে দৌড় লাগায় মায়ার পিছনে। ততক্ষণে মায়া অনেকটা পথ এগিয়ে যায় দৌড়ে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে সামনের ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখে। নিস্তিয়ে আসে মায়ার নেতিয়ে যাওয়া শরীর। এলোমেলো দৌড়াতে দৌড়াতে মূল হামলার স্পটে পৌঁছে যায় মায়া। এবার চারপাশে মারামারি কাটাকাটি চলছে দক্ষ হাতে। চারদিকে থেকে চিৎকার, হুংকার, রক্তারক্তি অবস্থা। মায়ার গা গুলাই। অবশিষ্ট শক্তিটা নেতিয়ে আসে নিজের মাঝে। শরীর তরতর বেগে কাপছে। দুর্বল হয়ে আসছে চোখের পাতা। পা দুটো থেমে যায় আপনাআপনি। স্থির হয় জায়গায়। চোখে ভাসে পরিচিত এক মুখের ভয়ানক হিংস্রতা। দৃষ্টি স্থির হয় সেদিকে। পরিচিত মুখটিকে দক্ষ হাতে ছুরি চালাতে দেখে একের পর এক। দেখলো মানুষকে সবজি কাটার নেয় আহত করে রাস্তায় ফেলতে। সেই পরিচিত মুখটির শরীরে অসংখ্য রক্তের ছিটার দাগ। অ্যাশ কালারের শার্টটিতে রক্তে ভিজে কালো হয়ে আছে। স্তব্ধ নিবাক মায়া ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে জায়গায় পাথর মূতিই নেয়। আজকের এই পরিস্থিতিটা মায়ার মাথায় ব্যাপক ভাবে আঘাতখানি করেছে। যেকোনো সময় জ্ঞান হারাবার উপক্রম। দুর্বল শরীরে কোনো রকম চোখ টেনে খোলা রাখার প্রয়াশ চালালো সে। অস্পষ্ট স্বরে ডাকলো সেই পরিচিত মানুষটিকে। বলে উঠলো…
—” মিস্টার ভিলেন।
রিদ দক্ষ হাতে ছুরি চালাতে ব্যস্ত। মায়ার অস্পষ্ট স্বরে ডাকটা যেন কানে কম্পন তুললো তাঁর। ছুরি চালানোর মধ্যে দিয়েই বেখেয়ালি চোখ পড়ে পাশে। সাথে সাথে চমকে উঠলো মায়াকে এখানে দেখে। শরীর কাটা দিয়ে উঠলো মায়ার বিধস্ত চেহারা দেখে। রিদ বেখেয়ালি হতেই সামনের মানুষ আঘাত বসালো রিদের বাহুতে। তীব্র আঘাতে খানিকটা ছিটকে ঝুকে পড়লো সামনে। তারপরও রিদ অনল। সামনে ঝুঁকেও মাথা তুলে তাকায় মায়ার বিধস্ত চেহারার দিকে। মায়ার শরীর রক্তের দাগ। কপাল, গলাতেও রক্তে চাপ। রিদকে বেখেয়ালি দেখে আবারও আঘাত বসাতে চাই সামনের শত্রুপক্ষের মানুষটা। রিদ মায়াকে এই মূহুর্তে এখানে মোটেও আশা করেনি। অপ্রত্যাশিত মায়া। এই মেয়ে এখানে কেন? কি হয়েছে এই মেয়ের সাথে? রক্ত? কেউ আঘাত করেছে এই মেয়েকে? রিদ শক্ত হয়ে আসে। মায়ার বিধস্ত চেহারার দিকে তাকাতেই রিদের রাগের মাত্রা তরতর করে বেরে উঠে কয়েক গুণ। বুঝতে পারে মায়া সাথে কিছু একটা হয়েছে। মায়াকে দেখে রিদের থমকে থাকা ফেসটা হিংস্রতা থেকে আরও হিংস্র হয়ে উঠে মূহুর্তেই। রাগে শক্ত করে চেপে ধরে হাতে থাকা ছুরিটিকে। দৃষ্টি মায়াতে স্থির। সামনের মানুষটা আঘাত করতে আসার আগেই দক্ষ হাতে ছুরিটি বসায় তার ঘাড়ে। ছিটকে লুটিয়ে পড়লো লোকটি। রক্তে রঞ্জিত হলো রাস্তা। মায়া এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল সেদিকে। রিদের হিংস্র দৃষ্টি তখনও মায়াতে স্থির। দুজনের দৃষ্টি বিলাপের মধ্য দিয়েই ততক্ষণে হাজির হয় ছেলে গুলো। মায়াকে ঘিরে দাঁড়াতেই বুঝতে পারে রিদ আসলে কাহিনি কি? রিদ কপাল কুঁচকে পাঁচজন ছেলেকে দেখে নেয়। তার হিংস্র চেহারাটা যেন মূহুর্তেই কোমল ও স্বাভাবিক হয়ে আসে ছেলে গুলোর আগমন দেখে। তাই নিজের অলসতা ঝেড়ে সাথে সাথে লাফিয়ে উঠে বসে গাড়ির ডিক্কতে পা ঝুলিয়ে। মনোযোগ দেয় সামনে। যেন সে কোনো সিনামার দৃশ্য সে উপভোগ করতে বসেছে আরাম করে। সন্ত্রাসীদের চোখে তখনো রিদকে পড়লো না। মায়াকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মূহুর্তেই হাত টেনে ধরলো একজন। ততক্ষণে পাশ থেকে সজল রাগী স্বরে বলে উঠলো….
—” শালী আমাদের না দৌড়ালে এতক্ষণে বাসরটাও হয়ে যেতো সবার। মার খাওয়ার পরও তেজ কমলো না শালীর। ইচ্ছা তো করছে এখানেই মেরে পুতে ফেলতে। কিন্তু তাও পারছিনা, আগে বাসর করবো। তারপরও শালীরে মেরে মাটি চাপা দিব। এই চল শালীরে নিইয়া।
অনূভুতিহীন মায়া তখনো ঠায় শক্ত হয়ে জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল। কোনো হেলদোল হলো না। কারণ রক্তের ফোবিয়ায় থাকায় মস্তিষ্কে ইফেক্ট করেছে অনেকটা। মস্তিষ্কের ধাক্কা লেগেছে এই বিষয়টি। তাই আপাতত চারপাশের কোনো কিছুই ওর বোধগম্য হচ্ছে না। রিদ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। মনোযোগ সহকারে তাদের কথা গুলো নিরব দশক হয়ে উপভোগ করছে এমন একটা ভাব। মায়া নিস্তর দৃষ্টি রিদের উপর স্থির করা। মায়ার হেলদোল না দেখে পাশ থেকে অন্য একজন ছেলে শুধালো। ভয়াৎ গলায় বলে উঠলো…
—” বাসর কথার পড়ে চিন্তা করিস সজল। পরিস্থিতি ভালো না। আমরা অন্য এরিয়াতে চলে আসছি। যেকোনো সময় বিপদ হতে পারে। চল কেটে পরি। মেয়েটাকে পরে দেখা যাবে। চল আগে…
ছেলেটির কথায় ক্ষেপ্ত হলো সজল। রাগান্বিত কন্ঠে পলাশকে শাসিয়ে বললো….
—” বিপদ হলে হবে। শরীরের জ্বালা মিঠাতে না পারলেও এই মেয়েকে ছেড়ে যাব না। এই মেয়ের জন্য এতটা পথ দৌড়াতে হয়েছে আমাদের। বিপদেও পড়তে হইয়ে। তাই আগে একে মেরেই তারপর যাব এখান থেকে। ছুরিটা বের কর তাড়াতাড়ি।
রিদ তখনো স্বাভাবিক অবস্থায় বিষয় গুলো পযবেক্ষণ করছে কপাল কুঁচকে। যেন কোনো মজার সিন চলছে এই মূহুর্তে তার সামনে। সেটা সে মনোযোগ সহকারে উপভোগ করছে। কোনো হেলদোল নেই। পাশ থেকে একজন সজল নামক ছেলেটির হাতে ছুরিটি তুলে দিতে গিয়ে তরতর করে কেঁপে উঠে রিদের উপস্থিত দেখে। কম্পিত হাতে ছুরিটি তুলে দিতে গিয়ে ঠাস করে পরে যায় রাস্তায়। সজল বিরক্তি চোখে পলাশকে দেখে ঝুকে সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটি হাতে তুলে নিল সে। চোখ তুলে নিজের পাশের ছেলেগুলোর দিকে তাকাতেই দেখলো প্রত্যেকের ভয়াৎ দৃষ্টি। ঘাম দরদর অবস্থা। তাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই চোখে পড়লো রিদের উপস্থিতটা। সাথে সাথে ভয়ে সিঁটিয়ে যায় সে নিজেও। ততক্ষণে রিদ নির্ভীক ভঙ্গিতে বলে উঠলো….
—” মারবি? মার! মেরে ফেল এই নারীকে। এই নারীর বেঁচে থাকার কোনো দরকার নেই। এই নারী আমার কথা শুনে না। শুধু জানে অবাধ্য হতে। আমার অবাধ্য হতে হতে আজকে এখান অবধি পৌঁছে গেছে। নিজের হাল বেহাল বানিয়ে ফেলেছে অলরেডি। তুই জানিস? এই নারীকে এখানে বিধস্ত অবস্থায় দেখে আমার অবস্থাটা কেমন হয়েছে? তুই জানবি কিভাবে আমি তো বলিনি তোকে। দেখ! তাকিয়ে এই নারীর চেহারা দিকে। এক্ষনি বেহুশ হয়ে পড়বে। তুই-ই বল, আমি এই নারীকে নিয়ে কি করবো? এই নারী আমার কথা শুনে না।আমি আর পারছিনা। তাই তুই এই নারীকে মেরে দে, যাহ। শেষ কর কাহিনি। রোজ রোজ প্যারা আর ভাল্লাগছে না। যাহ মেরে ফেল।
রিদের এমন খাপছাড়া কথায় মূহুর্তে শুকনো ঢুক গিলে সবাই। তারা এতটা বুঝতে পারছে গ্যাংস্টার রিদ খানের সাথে এই মেয়ের গভীর কোনো সম্পর্ক রয়েছে। রিদের অধিকার বোধের কথায় সেটা স্পষ্ট। তাঁরা ভুল জায়গায় হাত বাড়িয়েছে। মৃত্যুটা এবার নিশ্চিত। ঠেকানোর নয়। গায়ে এবার ছেলেদের কাটা দিয়ে উঠে রিদের কথায়। কপালে ঘাম ছুটে গলা বেয়ে নিচে পরে। কি করবে কারও বোধগম্য হচ্ছে না। পালিয়েও বাঁচতে পারবে না। রিদ খান ছেড়ে দিবার নয়। পাতাল থেকেও টেনেহিঁচড়ে বের করবে তাদের। কি করবে? কি করবে? উত্তেজনায় তুঙ্গে সবাই। তখনই হিতাহিত অজ্ঞ হয়ে অপ্রত্যাশিত কাজ করে বসে সজল। হুট করে নিজের হাতের ছুরিটা চেপে ধরল মায়ার গলায়। এই মূহুর্তে রিদ থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য একমাত্র পথ হিসাবে মায়াকে অবলম্বন করল। শরীর তখনো তরতর করে কাপছে তাদের রিদের ভয়ে। রিদ সেদিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকল। মায়ার গলায় ছুরি আটকাতে দেখেও ভাবান্তর হলো না তাঁর। উল্টো নিজের হাতের রক্তাক্ত ছুরিটা গাড়ির ডেক্কির উপর রেখে সেটা মনোযোগ সহকারে ঘুরাতে ঘুরাতে ব্যস্ত। চোখ তুলে সামনে তাকিয়ে আগের ন্যায় খাপছাড়া গলায় বললো রিদ….
–“এবার ঠিক আছে। নে শুরু কর। মেরে ফেল! এই নারীকে মেরে ফেলাই উচিত। তুই মেরে ফেল এই নারীকে নয়তো আমি তোকে মেরে ফেলবো। তুই এই অবাধ্য নারীকে মেরে ফেললে আমি বাঁচি। এমনিতেও এই নারীর আমার বহু সমস্যা কারণ। এই অবাধ নারীর জন্য আমি ঠিকঠাক ঘুমাতে পারি না। আমার অঘুমে, অসুখের কারণে হয়ে দাড়িয়েছে এই নারী। আমার কঠোর নিষিদ্ধ করার পরও আমার স্বপ্নে, বাস্তবে, আমার মনে, সবখানটায় চলে আসে এই নারী। আমাকে ফলো করতে করতে এখানটায়ও চলে এসেছে দেখ! আমার স্বপ্নে আমাকে ইভটিজিং করে বেড়ায়। শান্তিতে এক দন্ডও থাকতে দেয় না। চরম ডিস্টার্ব এই নারী। তাই তুই মেরে দে নয়তো আমি তোকে মেরে দিব। নে মার শুরু কর। যাহ।
রিদের কথায় এবার অগতিক হারে কাঁপে সজলে হাত। বুঝতে পারে রিদের খানের চরম দুর্বলতা এই মেয়ে। এই মেয়ে কোনো সাধারণ মেয়ে নয়। এই মেয়ের সামান্য কিছু হলেও ছাড় পাবে না তারা। গ্যাংস্টার রিদ খান যে ঠান্ডা মাথায় তাদেরকে এই মেয়ের গুরুত্বটা তার জীবনের কতোটা সেটা বুঝাচ্ছে তা তারা হারে হারে বুঝতে পারছে এই মূহুর্তে। নিবাক, ভয়ার্ত সজলের হেলদোল না দেখে তিরতির মেজাজে রেগে বলে উঠলো রিদ…
—” হারামীর বাচ্চারা এতক্ষণ লাগে একটা মেয়ে মানুষকে মারতে তোদের? আমার সময় নষ্ট করিস। নে মারতে যখন পারবি না তো নিজেরাই মর এবার।
রাগে রি রি করতে করতে দক্ষহাতে ছুরিটা ছুরে মারে সাথে সাথে। মায়াকে বেঁধ করে গিয়ে বিধলো সজলের গলা বরাবর। সাথে সাথে মায়ার গলায় চেপে ধরে রাখা ছুরিটা হস হয়ে সজল লুটিয়ে পড়লো রাস্তায়। বাকি চারজন ছেলে সাথে সাথে এলোমেলো দৌড় লাগায়। রিদ সেদিকে একপলক তাকিয়ে গলা খাকিয়ে চিৎকার করে ডাকলো আসিফকে। বললো, সব কয়েকটা ছেলে উপস্থিতি চাই তার সামনে। কেউ যাতে পালিয়ে বাঁচতে না পারে। কথা গুলো বলেই আবারও গাড়ির ডেক্কি থেকে লাফিয়ে নামে রিদ। রাগে তিক্ততা গা ঝেড়ে তিরতির মেজাজে নিজে নিজেই বলে উঠলো….
—” শালার! হারামির বাচ্চারা এই ক্ষমতা নিয়ে আসিস বাসর করতে? তাও আবার রিদ খানের অবাধ্য নারীকে। ছেহ। নে এবার কর বাসর। সোজা রাস্তার কুকুরে পেটে গিয়ে। হারা…
রিদের আর কোনো কথা কানে আসলো না মায়ার। জোরপূর্বক টেনে খোলে রাখা চোখ জোড়া মূহুর্তেই বন্ধ হয়ে যায় নিজের সামনে লাশ দেখে। পায়ের কাছে গরম তর তাজা রক্ত দেখে সঙ্গে সঙ্গেই মায়াও রাস্তায় লুটিয়ে পড়লো লাশটির পাশে। রিদ বিরক্তিতে চোখ মুখ কুচকে ফেলে। মায়া জ্ঞান হারাবে এমনটা সে আগেই জানতো। অস্বাভাবিক কিছু না। বরং স্বাভাবিক কিছু। কিন্তু তারপরও বিরক্তি নিয়ে নিজেই বলে উঠে…
—” অবাধ্য নারী। একেতো অবাধ্য হবে তার উপর আবার রাস্তায় বেহুশ হবে। নিব না আমি এই নারীকে। থাক পরে রাস্তায়।
কথা গুলো বলতে না বলতেই। সাথে সাথে এসে মায়াকে কোলে তুলে নেয় রাস্তা থেকে। তখনো তার বিরক্তিকর চোখে গুলো মায়ার নেতিয়ে যাওয়া চেহারাটার দিকেই। আরও এক পলক দেখে নেয় মায়াকে। এই অবাধ্য নারীকে সে কখনোই কোলে তুলতো না। রাস্তায় ফেলে যেতো সে। কিন্তু এই অবাধ্য নারী ছেলে মানুষের পাশে শুইয়ে আছে রাস্তায়। বেহুশ হওয়ার আর জায়গায় পেল না। খুঁজে খুঁজে ছেলে মানুষের পাশে পরতে হবে কেন এই নারীকে। দরকার হলে দুই কদম হেঁটে তাঁর কাছে এসে বেহুশ হতো। সেকি না করতো নাকি? নাকি কিছু বলতো এই নারীকে? না সে কিছু বলতো না। বরং সে বুঝতো এই নারীর বেহুশ হতে হতেও তাঁর অবাধ্য হয়নি। কিন্তু না এই নারী আবারও তাঁর অবাধ্য হয়েছে। ইচ্ছা করেই ছেলে মানুষের লাশটির পাশে বেহুশ হয়েছে। তাকে জ্বালাতে, তার অবাধ্য হতে। কিন্তু তার মনেও আজকাল একটু দয়া-মায়া চলে এসেছে। এজন্য মূলত সেও বাধ্য হয়ে কোলে তুলেছে এই নারীকে। নয়তো কখনোই তুলতো না।
চলিত……
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২২
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ২৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৪