দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৬
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
১৬
বিঘত পাঁচ মাস ধরে নিজেকে কেমন একটা ঘর বন্দী, নজর বন্দী লাগছে। আমি নিশ্বাস তো নিচ্ছি খোলা আকাশের নিচেই। তবে আমার মনে হচ্ছে আমার নিশ্বাস দাতা অন্য কেউ। আমার দেখা দুনিয়াটা যেন ছোট হয়ে আসছে ক্রমশয়। যেন কারও নজর বন্দীনী হয়ে আছি প্রতি মূহুর্ত। আটকা পড়েছি কোনো অদৃশ্য শিকলে। এটা আমার অনূভুতি! এমনটা আমার মনে হচ্ছে। এই বিষয়টি সম্পন্ন বুঝে উঠতে পারছি না আমি। তবে এমনটা ধারণা আমার। শুধু ধারণা হলেও চলতো। আমি মেনে নিতাম সবকিছু। কিন্তু বিষয় গুলো আমার ধারণার থেকেও কয়েক গুণ এগিয়ে। কারণ বিষয় গুলো বাস্তব। আমার চেনা পরিচিত দুনিয়াটা পাল্টে যাচ্ছে দিন বা দিন। ছোট থেকে আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে সেই পরিচিত দুনিয়াটা। কে পাশে আছে? কে নেই? তাহ জানি না তবে অদৃশ্য কিছু সবসময় নিজের পাশে ফিল করি। আমার ফিল করার মাত্রাটা খুবিই ছোট। সবকিছু ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারিনা সময়ে সময়ে। কিন্তু এই অদৃশ্য শিকলে ব্যাপারটায় আমি শত% সিওর। কারণ এতদিন এই বিষয় গুলো বুঝতে না পারলেও বিগত পাঁচ মাস ধরে বিষয় গুলো আমি বুঝতে পারছি। এখন কি আমি নিজ থেকে বুঝতে পারছি? নাকি অদৃশ্য কেউ আমাকে স্বেচ্ছায় বুঝাচ্ছেন তার উপস্থিত? সেই বিষয়টা আমার কাছে এখনো ধোঁয়াসা। তবে এবার তার বুঝানোর মাত্রাটা তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে দিন বা দিন। আজকাল আমার মনে হচ্ছে, আমি কতটা নিশ্বাস নিব সেটাও অন্য কেউ ঠিক করে দিচ্ছে। কার সাথে কতটা মেশা উচিত! কতটা কথা বলবো? সবকিছুই তাঁর হাতে। আমার এই অনূভুতি গুলো কারো সাথে শেয়ার করতে পারছি না। তাই ভাঙ্গা হাতে ডাইরির পাতায় নিজের অনূভুতির কথা গুলো ব্যক্ত করলাম।
খান বাড়িতে আছি বিগত দুই বছর চার মাস হলো আমার। এক বছর এগারো মাস অবধি সবকিছু ঠিকঠাক ছিল আমার জীবনে। কারও উপস্থিতিটা তেমন বুঝতে পারিনি আমি। আর না কারও বন্দিনী মনে হয়েছে নিজেকে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে বিগত পাঁচ মাস নিয়ে। আমি ঠিকঠাক থেকেও নিজেকে ঠিক রাখতে পারছি না। আমার সবকিছুতেই অদ্ভুত রকমের ছুঁয়া পাই। শুধু অদ্ভুত বললে ভুল হবে হাড় কাঁপানো টাইপ অদৃশ্য কিছুর ঘটে আমার সাথে। মনে বার বার উঁকি দেয় একটায় উক্তি! ব্যক্ত হয় অদৃশ্যকে নিয়ে কিছু বাক্য। মনে হয়
" সামনে থেকেও অদৃশ্য,
যাহ হাতে পেয়েও শূন্য
যেটা বাস্তব দেখেও মনে হয় কাল্পনিক চিত্র "
কেউ চারপাশে থেকেও নেই। কারও উপস্থিতিত বুঝেও ধোঁয়াসা মনে হয় আমার। এই অদ্ভুত সবকিছুই আমাকে ভিষণ ভাবে ডিস্টার্ব করে। মাঝে মাঝে তো নিজেকে এলিয়েন টাইপ কিছু মনে হয় তারও বিশেষ কিছু কারণ আছে। আমার হাতে যাদু না থাকলেও আমার সাথে সবকিছু যাদুর মতোই হয়ে থাকে আজকাল। যাহ চাইলাম তাই মূহুর্তেই হাজির। তার জন্য যাদুর কাটি ঘুরাতে হয়না আমার। হাতে কলমে একটা লিস্ট লেখায় যথেষ্ট। সেই লিস্ট দাদীর হাতে পৌঁছানোর আগে তার মধ্যে লেখা জিনিসপত্র আমি অবধি পৌঁছে যায়। মুখ ফুটে দাদীকে বলতে হয়না কোনো কিছু। শুধু নিজের রুমে বসে হাতে কলমে লিস্ট বানালেই হয়। লিস্টে যাহ চাইলাম তাই পাইলাম। তাতেই আমি যাদু ছাড়া এলিয়েন হয়ে গেলাম। আমার সর্বোত্ত পাওয়ার খান বাড়ির ভিতর চলে বাহিরে নয়। চাইলেও আগের মতো হুটহাট খান বাড়ির থেকে বাহিরে যেতে পারিনা আমি কারও সাথে। ঘটা করে দিন তারিখ করেও যেতে পারিনা। পরিবারের কারও সাথে বাহিরে গেলে উল্টো তাঁরা কোনো না কোনো ঝামেলা পড়ে যায়। যার কারণে বাধ্য হয়ে উল্টো পথে বাসায় ফিরতে হয় আমাদের। কিন্তু এই ঝামেলা গুলো সেদিনই হয় যেদিন আমি বাসা থেকে বের হয় কারও সাথে। নয়তো বাকি দিন গুলো যথাযথ স্বাভাবিক ভাবে চলে যায়। কারও কোনো সমস্যা হয়না। সবাই দিব্যি বাহির টু ঘর হতে পারে। ঝামেলা বিহীন সুন্দর ভাবে চলাফেরা করতে পারে। সব সমস্যা শুধু আমার বাহিরে যাওয়াকে ঘিরেই। প্রথম প্রথম বিষয় গুলো আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু পরপর কয়েকবার হওয়ায় বুঝতে পারলাম। শত% সিওর হওয়ার জন্য সেচ্ছায় কয়েকবার ট্রাইও করেছিলাম। ফলাফল একিই এসেছিল। তাই নিশ্চিত হলাম।
মনের কথা গুলো হাতে কলমে লিখে থামে মায়া। বুক ফুলিয়ে শ্বাস নেয়। চোখ বন্ধ করে নিজেকে স্থির করে। কিশোরী বয়সের নতুন নতুন অনূভুতি এই অদৃশ্য মানবকে ঘিরে মায়া। নিজের অনূভুতিটা ঠিক করে বুঝে উঠতে পারছে না মায়া। ভয়, বিরক্তি, ভালোলাগা সেই সাথে চাপারাগের সংমিশ্রণে এক অনূভুতি সৃষ্টি হয়েছে মায়ার এই অদৃশ্য মানবকে ঘিরে। মায়া চোখ মেলে তাকায় সামনে। দৃষ্টি শূন্যতে ভাসমান। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে পুনরায় স্থির হয় লেখনীতে। ভাঙ্গা হাতে আবারও লেখা শুরু করে।
আমার জীবনের পিছনে ফেলে আসা খান বাড়িতে কাটানো বিগত পাঁচ মাসে আমি অনেকটাই ডিস্টার্ব হয়েছি। আবার অদ্ভুত কিছু ফিলও করেছি। স্কুলের প্রথম লাইভ লেটার রবিন থেকে পাওয়া আমার। একসেপ্ট করেনি। তবে সেদিনের ঘটনার পর থেকে রবিন ও তার গ্যাংকে আমি দ্বিতীয় দিন গিয়ে স্কুলে পায়নি। তাঁরা কোথায় আছে তাও জানি না। সেকেন্ড লেটার আমি দশম শ্রেণীর সিনিয়র ভাই থেকে পেয়েছিলাম। সেটা রিদ ভাইয়ার হাতে যাওয়ার পর কি হয়েছিল তাও জানি না। তবে আমি সুস্থ হয়ে স্কুলে গিয়ে সেই সিনিয়র ভাইয়াকেও আর দেখিনি স্কুলে কোথায়! আজ পযন্ত আমার অজানা সেই সিনিয়র ভাইয়াটা কোথায় আছে সেটা নিয়ে। আমিও খোঁজ করিনি কখনো। কিন্তু সেদিনের পর থেকে রিদ ভাইয়ার ভয়ে আমিও কোনো ছেলেকে নিজের পাশে ঘেঁষতে দেয়নি। গুটিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে। তবে আমার চলার স্বাধীনতা ছিল পরোক্ষভাবে। কিন্তু বিগত পাঁচ মাস ধরে হচ্ছে তার উল্টোটা। স্বাধীনতা তো দূরে থাক। যদি কোনো ছেলে মানুষ নিজ থেকে আমার সাথে কথা বলতে আসে। ঠিক তাঁর দুমিনিটের ভিতর ভিতর তৃতীয় পক্ষ হয়ে কেউ না কেউ সেখানটায় এসে তাঁকে আমার সামনে থেকে এনিয়ে বিনিয়ে ছলে নিয়ে যাবে ঠিকই। কিন্তু দ্বিতীয় দিন সেই মানুষটাকে আর চোখে দেখতে পায় না আমি।
বাসা থেকে কোথায় যেতে পারি না সেটা আগেও বলেছি। দাদা-দাদি আমাকে কোথায় যেতে দিলেও অদ্ভুত কারণে আমি যেতে পারি না আটকা পরি খান বাড়িতেই সেটাও বলেছি। শপিং যেতে চাইলে। পর মূহুর্তে আমার শপিং এর জিনিসপত্র বাসায় হাজির থাকে। আমার করা লিস্ট অনুযায়ী সেটাও বলেছি। কিন্তু এই সবকিছুর কে করে আমার জন্য এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন? কেন করেন? কি চাই তাঁর? কি হবে আমাকে নিজের বন্দিনী বানিয়ে? এমন হাজারো প্রশ্ন মাথায় দলা পাকিয়ে আসে প্রতি মূহুর্ত। বলার মতো উপযুক্ত কাউকে পাচ্ছি না। বলতে গেলে অনেকটা ভয়েই শেয়ার করতে পারছিনা আমি বিষয় গুলো। কারণ কারও নজর আমার উপর থাকে সবসময়। যাকে বলবো তাঁর যদি কোনো ক্ষতি হয় এই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকি সবসময় নিজের মধ্যে। নিজের ভিতরও চেপে রাখতে পারছিলাম না। তাই ডাইরিতে বহিঃপ্রকাশ করলাম। প্রথম প্রথম ভাবতাম হয়তো দাদাভাই আমার কাজ গুলো করে দেয়। কিন্তু পরে পরে বুঝলাম দাদাভাই নয় অন্য কেউ করে দেয় আমার কাজ গুলো। ডেলিভারি জিনিসপত্র দাদাভাইয়ের অফিসের একজন মেয়ে সেক্রেটারি নিয়ে আসে। পার্সেল গুলো দিয়ে বিনা বাক্যে চলে যায় সবসময়। দাদা-দাদি মনে করে মেয়েটা আমার কথাতে জিনিসপত্র গুলো নিয়ে আসে আমার জন্য। কিন্তু আমি যে সেই মেয়েটাকেই চিনিনা সেটা বোধগম্য নয় দাদা-দাদির। পার্সেল দেওয়া নিয়ে উনারাও চিন্তত নয়। আর আমি মনে করতাম দাদাভাই হয়তো নিজ থেকে আমার জন্য এইসব নিয়ে আসতো। কিন্তু বিগত পাঁচ মাসে আজ বুঝতে পারলাম দাদাভাই আমার জন্য কখনোই এসব অর্ডার করতো না। বরং অবশেষে তিনি আজ আমাকে নিজ থেকে জিজ্ঞেসা করলো, পার্সেলে কি আছে? কি আনিয়েছি আমি? ফিহা আপু সাথে শপিংয়ে না গিয়ে বাসায় বসে অনলাইন অর্ডার কেন করি আমরা? চমকে উঠলাম। দাদাভাইয়ের কথায় হতভম্ব হয়েছিলাম তখন। আমার কাছে কোনো ফোন নেই। ফোনের কোনো কিছু সম্পর্কে আমি অবগত নয় আজ পযন্ত। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমার জন্য ফোন শব্দটি সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ এই খান বাড়িতে। সেখানে আমার দ্বারা অনলাইন অর্ডার ছিল আকাশ কুসুম স্বপ্ন। দাদাভাই ভেবেছিল আমি ফিহা আপুকে দিয়ে অনলাইন অর্ডার করাতাম। তাই উনার প্রশ্ন করা। কিন্তু বিষয় গুলো ভিষণ ভাবে দলা পাকিয়ে আসে আমার মাথায়। ভয় পাচ্ছিলাম নিজের মাঝে। এতদিন ধরে আমি কার পার্সেল রিসিভ করছিলাম তাহলে? আর কে বাহ আমাকে আমার লিস্ট করা অনুযায়ী পার্সেল গুলো পাঠাতো? সবকিছুই ধোঁয়াসা ছিল আমার কাছে। ভিষণ ঘোলাটে সে।
মায়ার হাত আবারও থামে। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে আবারও গুটি অক্ষরে ডাইরির পাতায় কঠিন হাতে শুধালো ‘ আমি জানতে চাই অদ্ভুত মানুষ আপনি কে? হয় আপনি আমার সামনে আসুন নয়তো আমাকে ডিস্টার্ব করার বন্ধ করুন। আমি ডিস্টার্ব হচ্ছি। আপনিময় ডিস্টার্ব। আপনি অদ্ভুত! অদ্ভুত সব আপনার কাজ। স্বাধীনতা চাই আমার। আমাকে যেতে দিন। আমি বন্দি হতে চাই না কারও হাতের। আপনারও না।
কথা গুলো লিখে হাত গুটিয়ে ন্যায় মায়া। নীল ডাইরিটা বন্ধ করে ভাজ করে তুলে রাখে ড্রয়ারে। অদ্ভুত মানুষের কথা কাউকে বলতে পারছে না সে। মনের মধ্যে খচখচ করছে ভিষণ ভাবে। কাউকে না কাউকে বলা প্রয়োজন। খান বাড়ির কাউকে বলতে পারছে না ভয়ে। যদি হেনা খান শুনে রেগে যায়। এতটা দিন বিষয় গুলো না বলার জন্য। কিন্তু এতদিন বিষয় গুলো মায়ার কাছে ধোঁয়াসা ছিল। আজই পরিষ্কার হলো। দ্বিধাহীনতায় ভুক্তভোগী হয়ে সিদ্ধান্ত ন্যায় আপাতত হেনা খানকে কিছু জানাবে না সে। নিজের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসে সবটা জানাবে সে হেনা খানকে। এই মূহুর্তে বললে হেনা খান বেঁকে বসবে। মায়াকে নিজের বাড়িতে বেড়াতে যেতে নাও দিতে পারে। মায়ার সেইফটি কথা চিন্তা করে। মায়া চুপ থাকার সিদ্ধান্ত ন্যায়। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় নিজের রুমের দেয়াল ঘড়িটার দিকে। সময়টা দেখে নিয়ে বিছানায় উঠে বসে। রাত ১১ঃ৩৭। কাল ব্রাক্ষণবাড়িয়ার যাবে। নিজের পরিবারের কাছে। এবার ঠিকঠাক যেতে পারলেই হলো। দুই মাস ধরেই ডেট হচ্ছে মায়ার যাবে যাবে বলে। কোনো না কোনো কারণে মায়া আটকা পড়ছে যেতে পারছে না। দিন কয়েক রেডি হয়েও নিরাশ হতে হয়েছে মায়াকে। যেতে পারেনি। দুইদিন ঢাকার মধ্যে রাস্তা থেকে ফিরত এসেছে খান বাড়িতে। অদ্ভুত কিছু কারণে। কারণ গুলো ধোঁয়াসা। যথাযথ প্রযোজ্য নয়। তাই কাল আরাফ খান নিজে নিয়ে যাবে মায়াকে ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে। রেখে আসবে মায়াকে নিজের বাড়িতে বেশ কিছু দিনের জন্য। এবার কোনো ঝামেলা ছাড়া ঠিকঠাক নিজ বাড়িতে যেতে পারলেই হলো। মায়া গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট টেনে শুয়ে পরলো। হাত বাড়িয়ে রুমে রুমে লাইট অফ করলো। পাড়ি জমাতে চাই নিরুদ্দেশ ঘুমের রাজ্যে। অস্থিরতা ঘুম ধরা দিচ্ছে না চোখে। মনে মনে আওড়ায় সেদিনের কথা গুলো। যেদিন রিদ মায়াকে নষ্ট মেয়ের উপাধি দিয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে ছিল। রিদের চলে যাওয়াকে ঘিরে আজ আবারও পাঁচ মাস হলো। সেদিন এক পলকের দেখা ছিল মায়ার সাথে রিদের। মূহুর্তটা ছিল মিনিট দশকের। পুনরায় স্মৃতিচারণ করলো মায়া।
সেদিন রিদ ফিরে গিয়েছিল নিজ গন্তব্যে। কেউ ফেরাতে পারেনি রিদকে। আজ পাঁচ মাস পূণ্য হলো রিদের চলে যাওয়াকে ঘিরে। তবে রিদ নিজের কথা রেখেছে। এই পাঁচ মাসে সপ্তাহে একবার করে কল আসে আরাফ খানের ফোনে। কথা হয় নিজেদের মাঝে। এটা নিয়েই ভিষণ খুশি হেনা খান। রিদ আজকাল নিজের অবস্থান জানায় সেটায় অনেক।
মায়ার পরীক্ষা শেষ আজ আড়াই মাস হলো। পরীক্ষার পূর্বে একমাস ছিল। যেদিন রিদ বাংলাদেশের ছিল। পরীক্ষা চললো দেড়মাস। সবমিলিয়ে পাঁচ মাস। মায়া ধীরে ধীরে রিদের স্বভাব সম্পর্কে অবগত হচ্ছে। মায়া এতটা সিওর যে আর যায় হোক মায়ার খারাপ রিদ ভাইয়াটা কখনোই তাঁর অদৃশ্য মানবটা হতে পারে না। কখনোই না। যে নিজের পরিবারের একটা খবর নিতে মাসের পর মাস কাটিয়ে দেয়। সেই খারাপ চরিত্রে ব্যক্তি কখনো মায়ার অদ্ভুত মানুষটি হতে পারে না। তাহলে কে হতে পারে? মায়া চোখ বন্ধ করেই ভাবে! গভীর হয় সেই চিন্তা। বন্ধ চোখের পাতায় কিছু একটা ভেবে হিসাব মেলাতেই, চট করে ধুর ফরিয়ে উঠে বসে উত্তেজনায় মায়া। অস্পষ্ট স্বরে আনমনে বলে উঠে। ‘আয়ন ভাই?
মায়া চমকায়। তরতর করে কেঁপে উঠে শরীরময়। হ্যাঁ আয়ন ভাইয়াও তো হতে পারে তার অদৃশ্য মানবটা। কেন হতে পারে না? অবশ্যই হতে পারে। হয়তো মায়ার আয়ন ভাইয়াই এতদিন ধরে এসব করছিল মায়া জন্য? সে বুঝতে পারেনি বিষয় গুলো। কিন্তু কেন করছিল এমনটা মায়ার আয়ন ভাইয়া? কি চাই তার? মায়া কম্পিত হাতে টকটক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে ন্যায়। শান্ত হয়। মায়া ভাবে তাঁর আয়ন ভাইয়া দেশে আসলে এবার সে ঠিকঠাক কথা বলবে। লক্ষ করবে তাঁর আয়ন ভাইয়াকে। বুঝতে চাইবে সত্যি কি আয়ন মায়ার অদ্ভুত মানুষটা?
আয়ন বাংলাদেশে নেই আজ দুইমাস হলো। লন্ডনে আছে ডাক্তারীর নতুন ডিগ্রির পরীক্ষার জন্য। ফিরতে আরও একমাস সময় লাগবে এবার। মায়ার এসএসসি পরীক্ষার সারাটা সময় মায়ার সাথে ছিল আয়ন। মায়ার পরীক্ষার হলে আসা নেওয়া সবটাই আয়ন নিজের করেছে। মায়ার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পনেরো দিন পর আয়ন পাড়ি জমায় লন্ডনের উদ্দেশ্য নিজের পরীক্ষার জন্য। আজ দুইমাস হলো। অবসর সময় বের করে ভিডিও কলে থাকে নিজের পরিবার ও মায়ার সাথে। সময়টা এই ভাবেই পার হয় দুটো মাস আয়নের।
অনেকটা সময় নিয়ে ঢাকা জ্যামে আটকা আছে আরাফ খান। সামনে কয়েকটি সারীবন্ধ ভাবে ট্রাক, সিএনজি অটোরিকশা নিঃশব্দে থামানো। কিন্তু তারপরও হট্টু গন্ডগোলের প্রচন্ড শব্দ আসছে তাদের কানে সামনের থেকে। কারা করছে জানা নেই। মনে হচ্ছে রাস্তা কোনো ভয়ানক টাইপের ঝামেলা চলছে এই মূহুর্তে। নিশ্চিত কোনো আজাইরা পাবলিক একে অপরের সাথে রাস্তায় মারামারি করে ঝামেলা পাকিয়েছে মধ্যরাস্তায়। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে আসে আরাফ খানের। ব্রাক্ষণবাড়িয়া যাওয়ার এইটাই সোজা রাস্তা। কিন্তু এখানের গন্ডগোল থামার নাম নেই। উল্টো জ্যাম বাধিয়ে বসে আছে। জ্যাম এতটা যে এখান থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে পিছন ফিরে যাওয়ার রাস্তাটাও বন্ধ। বামে মোড়ে ভিন্ন রাস্তা ধরে যেতে হবে। আরাফ খান বিরক্তি নিয়ে আবারও বাহিরের দিকে তাকায়। কর্ড়া রোদে খাঁ খাঁ করছে সবকিছু। ১২ঃ৫৭ বাজে। অসয্যকর পরিস্থিতি। চোখ মুখ কুঁচকে সেই বিরক্তি দৃষ্টি স্থির করে পাশে। তিক্ততার গা ঝেড়ে ড্রাইভার করে বলে উঠলো….
—” এই রাস্তায় জ্যাম লাগার কথা না। তারপরও আজকে জ্যাম লেগে বসে আসে। অসয্যকর! দেখতো এগিয়ে সামনে কি হয়েছে? এতটা গন্ডগোল কিসের আসছে সামনে থেকে। এইভাবে জ্যামে আটকে বসে থাকলে আজ সারাদিন ও মনে হয়না ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে পৌঁছাতে পারবো। যাহ এগিয়ে দেখ কি হয়েছে।
আরাফ খানের কথা অনুযায়ী সাথে সাথে সম্মতি জানায় ড্রাইভার। গাড়ি থেকে বের হয়ে পা বাড়ায় সামনের দিকে। আরাফ খান সেদিকে এক পলক তাকিয়ে থেকে বিরক্তিতে কুঁচকে আসা দৃষ্টি পিছনে ফেলতেই কোমল হয় সেই দৃষ্টি। মায়া গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। নেতিয়ে আছে মাথাটা একটা পাশে। অনেকটা সময় জ্যামে আটকে থাকায় ঘুমিয়ে পড়েছে গাড়িতে সে। আরাফ খান দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে সামনে তাকায়। গাড়ির দরজার কাঁচ নিচে নামায়। সেখানটায় মাথায় গলিয়ে উকি দেয় বাহিরে। গলা খাকিয়ে ড্রাইভারকে ডেকে বলে উঠলো…
—” জসিম তুই গাড়িতেই থাক। আমি যাচ্ছি সামনে। পরিস্থিতি খারাপ হলে তোকে ফোন করে বলবো। মায়াকে নিয়ে সোজা বাসায় চলে যাবি। আজ আর ব্রাক্ষণবাড়িয়া যাওয়া হবে না। কিন্তু ফোন না দেওয়া অবধি আমার অপেক্ষা করবি কেমন।
–” জ্বিই স্যার।
তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুমন্ত মায়ার মুখ আরও একবার দেখে ন্যায়। ড্রাইভার গাড়িতে বসতেই তিনি বের হয় সামনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। খানিকটা সময় নিয়ে ড্রাইভার গাড়িতে বসে থাকলেও আরাফ খানের কোনো ফোন আসেনি। পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় পিছনে। মায়াকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে সেও বের হয়ে যায় আরাফ খানকে খোঁজতে। অজ্ঞাত মায়া গাড়িতে একা রয়ে যায়।
বিকট শব্দ কানে আসতেই ঘুম থেকে ধর ফুরিয়ে উঠে বসে মায়া। উত্তেজনায় বুক ধরফর করছে। মৃদু কাঁপছে শরীরময়। ঘুমের তাড়নায় এক মূহুর্তের জন্য ভুলে গেছে নিজের অবস্থানের কথা। কোথায় আছে মনে করতে পারছে না। হঠাৎ করে কিসের শব্দ কানে আসলো সেটার উৎস খোঁজার আগেই আবারও একিই শব্দের ভয়ে লাফিয়ে উঠলো মায়া। সাথে সাথে মুখের উপর পড়লো কাঁচের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্ণা। মূহুর্তেই মুখের উপর আড়াআড়ি ভাবে হাত রেখে ঝুঁকে গেলো বামে। নিজেকে সেইফ রাখার চেষ্টায়। কিছু লোক গাড়িতে হকিস্টিক দিয়ে লাগাতার আঘাত করছে ভেঙ্গে ফেলার জন্য। প্রত্যেকের চেহারা হিংস্রতার চাপ। সেই সাথে হাতে গলায় রক্তের ছপছপ দাগ। বুঝা যাচ্ছে সন্ত্রাসী হামলা পড়েছে চারপাশে। মায়া ভয়ে আতংকে উঠে। বিচলিত হয়ে সাথে সাথে সিট থেকে নিচে বসে পড়ে। নিজের লুকায় সন্ত্রাসীর দৃষ্টি হতে। তরতর করে কেঁপে উঠে সারা শরীর। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সাথে মায়া পূব পরিচিত নয়। মূহুর্তে ঘাম ছুটে যায় কপাল বেয়ে গলায়। ভয়ে নিস্তর হয়ে আসে শরীরময়। কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে শব্দ করা থেকে। সন্ত্রাসীর হাতে পড়লে রক্ষা নেই। নির্ঘাত কিছু একটা করে বসবে তাঁরা। প্রাণ যাওয়াটা নিশ্চিত। গাড়িতেও কেউ নেই। মায়া মুখ চেপে নিজের কান্না আটকায়। সন্ত্রাসীরা গাড়িতে কেউ নেই ভেবে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। আশেপাশে শব্দ হতে না দেখে উত্তেজনায় মায়া চট করে গাড়ির দরজা টেলে বের হয় রাস্তায়। আতংকিত চোখ দুটো বুলাই চারপাশে। প্রত্যেকটা গাড়ি ভাঙচুর অবস্থায় রাস্তায় পড়া। কিছু গাড়িতে আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে। জায়গায় জায়গায় এলোমেলো ভাবে গাড়ির ট্রইয়ারও পুড়ছে। ভয়াবহ অবস্থা চারপাশের। সাধারণ লোকজন অনেকেই আহত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছে। সেখানটায় কিছু সন্ত্রাসীরা দলে দলে লোকজনকে বেদুম পেটাচ্ছে। সাধারণ মানুষ এদিকে ওদিক ছুটাছুটি করছে পালিয়ে বাঁচার জন্য। বুঝা যাচ্ছে দুই দলের মধ্যে বড় মাপের সংঘর্ষ চলছে তুমুল ভাবে। যার মধ্যস্হর ভুক্তভোগী হয়ে আছে সারারণ পাবলিক। লোকজন দোকানের শাটার টেনে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। মায়া পাথর মূতিই ন্যায় দৃষ্টি আওড়ায়। এই মূহুর্তে কি করবে কিছুই বোধগম্য নয়। আশেপাশে কারও কাছে আশ্রয় নিবে এমনটাও নয়। সবাই নিজের প্রাণ রক্ষাতে ছুটছে। আশ্রয় দেওয়ার মতো কেউ নেই। সেই সাথে পরিচিত মানুষ গুলোও নেই মায়ার পাশে। আরাফ খান, ড্রাইবার কেউ নেই। মায়া পাথর মূতিই ন্যায় টায় জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। কান্না পাচ্ছে না। শুধু ভযাবহ পরিস্থিতিটাতে নিজের মাথাটা কাজ করছে না। মায়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাস্তার অপর পাশ থেকে চেচিয়ে উঠলো আধবয়সী এক লোক। নিজের রক্তাক্ত কপাল ডান হাতে চেপে ধরে মায়াকে উদ্দেশ্য করে বল উঠলো….
—” এই মেয়ে! এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত পালাও। চারপাশে সন্ত্রাসীদের হামলা পড়েছে। নিজের প্রাণ বাঁচাও আগে। দৌড়ে পালাও যাও।
মায়া টায় জায়গায় দাঁড়িয়ে। লোকটি চিৎকার মায়ার কান বেধ করতে পারছে না। অনেকটা শকট হয়ে দাড়িয়ে আছে। ফেলে যাওয়া সন্ত্রাসীরা লোকটির চিৎকারে পিছনে ঘুরে তাকায় দেখতে পায় মায়াকে। সাথে সাথে চিৎকার করে জানান দেয় নিজের উপস্থিতিটাকে। পাশের জনকে বলে উঠে…
—” শালা এই মাইয়া মানুষ কই আছিল এতক্ষণ।
শাওন শালীরে ধর তাড়াতাড়ি। পালিয়ে যেতে না পারে যেন।
সন্ত্রাসীদের দল বেধে চিৎকারে মায়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় দৌড়ে আসে সন্ত্রাসীদের দিকে। পরিস্থিতির চাপে পড়ে মায়া পা দুটো জমে কাট হয়ে গেছে জায়গায়। নড়াচড়া করাটাও ভুলে গেছে মূহুর্তেই। মায়া অনল। তখনই আবারও সামনে থেকে ঐ আধবয়সী লোকের উত্তেজনার চিৎকার ভেসে আসে মায়ার কানে। তিনি চেচিয়ে বলে উঠে…
—” এই মেয়ে তাড়াতাড়ি দৌড়াও তুমি। নয়তো এরা তোমার সর্বনাশ করে ফেলবে। দাঁড়িয়ে আছো কেন?পালাও তুমি যাও।
পালাও কথাটা মায়া ছোট মস্তিষ্কের টনক নড়লো। বুঝতে পারলো এই পরিস্থিতিতে তাঁকে পালাতে হবে। কোথায় যাবে সেটা জানা নেই। তবে প্রচুর দৌড়াতে হবে তাকে। এই সন্ত্রাসীরা ধরতে না পারে ততটা দৌড়াতে হবে। মায়া উল্টো পথে প্রাণপন্য দৌড় লাগায় মূহুর্তেই। কোন দিকে যাচ্ছে জানা নেই শুধু দৌড়াচ্ছে এলোমেলো ভাবে। শরীর নিস্তিয়ে আসছে ক্রমশয়। দুর্বল চোখের পাতা টেনে খোলে রাখছে কোনো রকম। কতক্ষণ খোলে রাখতে পারবে জানা নেই মায়ার। শুধু জানে আজ তার জীবনের শেষ দিন শেষ মূহুর্ত।
চলিত….
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ২৬
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৭