দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১২
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
১২
ওটিতে টানটান করে শুয়ানো লাশে সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়ন। আট থেকে দশজন জনের একটি ছোট গ্রুপ রয়েছে সাথে। প্রত্যেকের মুখের অবস্থা প্রায় বিকৃতভাষ্য। টানা তিনঘন্টা যাবত রিসার্চ করছে এই লাশ নিয়ে। রিসার্চ অফ ইনস্টিটিউড ল্যাবে মধ্যে। তাদের ঠিক সামনে দক্ষ হাতে কাজ চালাচ্ছেন প্রফেসর সুয়াংমা। আর তাকে মূলত অ্যাসিস্ট্যান্ট করছে উপস্থিত এই ছোট গ্রুপটি। লাশটিকে ঘিরে চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে তরুণ দলের ডক্টররা। আয়ন অন্তত মনোযোগ সহকারে বিষয় গুলো রিসার্চ করছে আর ফাইলে নোট করছে। উপস্থিত সবাই একিই কাজ করছে। তবে অনেকটা সময় নিয়ে লাশের সাথে থাকায় অনেকেই অবস্থা নাজেহাল। আয়ন নিজেকে গম্ভীর রাখে। দক্ষ হাতে বরাবর প্রফেসরের দেখানো বিষয় গুলো নোট করছে। আজকে শেষ রিসার্চ করা লন্ডনে তার। এরপর বাংলাদেশে ফিরে যাবে পনেরো বিশ দিনের মধ্যেই। সেখান থেকে ফিরে লন্ডন হসপিটালের জয়েন করবে সে। তাই আপাতত আজকের রিসার্চটা মনোযোগ সহকারে শেষ করে নিচ্ছে। আরও ঘন্টা খানিকটা সময় নিয়ে বের হয় ল্যাব থেকে সবাই। ঘুড়ির কাঁটায় সময়টা দেখে ন্যায় আয়ন ১ঃ৫০ বাজে। মাথার উপর কাঠ ফাটা রোদ। গায়ের এপ্রোনটা টেনে খোলে হাতে ন্যায়। টানা চার ঘন্টা লাশের সাথে কাটিয়ে শরীরটা যেন যাবারত অবস্থা। রি রি করছে পুরো শরীর। খ্যাত খ্যাত করছে মন মস্তিষ্ক দুটোই। আপাতত লম্বা একটা শাওয়ার প্রয়োজন তার। বন্ধুদের থেকে বিদায় নিয়ে পাকিং এরিয়াতে আসে। নিজের গাড়ির দরজা খুলে স্বর্পণে হাতে থাকা ফাইল ও এপ্রোনটি রেখে দেয় একপাশে। ক্লান্তিতে উঠে বসে ড্রাইভিং সিটে। হাতের রাখা ফোনটি গাড়ির সামনে রেখে স্টার্ট দেয় গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। খানিকটা সময় যেতেই বারবার ফোনের লাইট জ্বলে কম্পন তুলে ব্রাইবিট করছিল থেমে থেমে ফোনটি। আয়ন চোখ আওড়িয়ে সামনে রাখা ফোনটি এক পলক দেখে ন্যায় ড্রাইভ করতে করতে। ফোন স্কিন ফিহার নামটি ঝলমল করছে। হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল। আয়ন ভ্রুঁ কুঁচকে তাকায় সেদিকে। এই সময় ভিডিও কল হঠাৎ? বাংলাদেশ টাইম এখন প্রায় আটটা বাজে। লন্ডন থেকে বাংলাদেশ টাইম ছয় ঘন্টা ডিফেরেন্স। এই টাইমে আয়নের লন্ডনে ক্লাসের সময়। সেটা জেনেও ফিহার বারবার ভিডিও কল করাটা খানিকটা ভ্রুঁ কুঁচকায় আয়ন। গত এক বছর ধরেই বোনটা তার বাংলাদেশে যাওয়ার পর থেকে সময়ে অসময়ে ভিডিও কল করবে তাকে। সেই সাথে রাজ্যের সব অদ্ভুত বিষয় তাকে দেখাবে, বলবে। এখনও নিশ্চয়ই সেরকমই কিছু দেখাতে ভিডিও কল করছে ফিহা। কলটি রিসিভ করলো না সে। মনোযোগ দিল ড্রাইব করাতে। লন্ডনে ড্রাইভ করার সময় ফোন চালানো নিষিদ্ধ। তাই সে ফোনটি তুলেনি। এমনিতেও শরীরটা রি রি করছে। কথা বলার মতো এনার্জি পাচ্ছে না। আপাতত বাসায় গিয়ে লম্বা শাওয়ার নিয়ে বোনকে কল করা যাবে সময় নিয়ে। ভাবনা অনুযায়ী কাজ করলো আয়ন। পরপর কয়েকবার নিজের ফোনটি রিং হয়ে কেটে যায়। একটা সময় কল আসা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তার ঠিক পর মূহুর্তেই বেশকিছু মেসেজের টুকরো কম্পন সৃষ্টি হলো তার ফোনে। আয়ন বুঝতে পারে ফিহা মেসেজ করছে ওকে। এক পলক সেদিকে তাকিয়ে পূনরায় নীরবে ড্রাইভিং এ মনোযোগী হয় সে।
টানা চল্লিশ মিনিট শাওয়ার নিয়ে বের হয় আয়ন। পড়নে অ্যাশ কালারের টাউজার ও কালো গেঞ্জি পরিহিত। টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হয় সে। টিকটিক করা দেয়াল ঘুড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে ৩ঃ১০ মিনিট। লাঞ্চ টাইম অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। লম্বা শাওয়ার নেওয়াতে প্রচন্ড ক্ষিদাও পেয়েছে এই মূহুর্তে। আপাতত পেট পূজা করা দরকার। আসার সময় বাহির থেকে খাবার নিয়ে এসেছিল রেস্টুরেন্টে থেকে। ডাইনিং এ রেখে এসেছিল সে। হালকা পাতলা মাথাটা মুছে নিয়ে হাতের ফোনটি চেপে ধরে পা বাড়ায় ড্রয়িংরুমের দিকে। লন্ডন অ্যাপার্টমেন্টটিতে একা থাকে সে। পরিবারের সবাই যাওয়ার পর থেকে বাহিরের খাবার খায় সে। মাঝে মধ্যে সময় হলে নিজের রান্না করে টুকটাক। তেমন কিছুই রান্না করতে জানে না। তবে চাল, টাল, চিকেন, নিজের জন্য কফি, এতটাই আয়ত্তে এসেছে এতদিনে। ডাইনিং এর সামনে দাঁড়িয়ে ফিহাকে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও করে। খাবার গুলো প্যাকেট থেকে একে একে ছাড়াতে থাকে। নিজের প্লেটে খাবার নিতে নিতে ফোনের স্কিনে ভাষ্যমান হয় ফিহার হাস্যজ্জল চেহারাটি। আয়নকে ফোনের স্কিনে দেখতে পেয়েই লাফিয়ে উঠে ফিহা। প্রায় সাথে সাথেই চঞ্চল বংগিতে বলে উঠলো…
–” ভাই! এতক্ষণ লাগে একটা ফোন করতে তোমার? সেই কখন থেকে তোমার অপেক্ষায় বসে আছি আমি।
প্যাকেট থেকে খাবার ছাড়াতে ছাড়াতে ক্লান্তিতে দারুণ হাসলো আয়ন। ফোনের স্কিনে বোনের উত্তেজিত ফেস দেখে দুষ্ট কণ্ঠে বললো…
—” বাহ! যেই বয়সে মেয়েরা জামাই জামাই করে, সেই বয়সে বোন আমার ভাই ভাই করছে। ব্যাপর কি বলতো ফিহু?
আয়নের কথায় সাথে সাথে ক্ষেপ্ত বংগিতে চিৎকার করে উঠলো ফিহা….
–” ভাই।
ফিহা চিৎকারে ফোনের স্কিনে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকায় আয়ন। নিজের একটা ভ্রুঁ উঁচু করে বলে উঠে…
–” ভাই কি? এর পরেরটা বল শুনি! তোর মতলবটা আমার ঠিকঠাক মনে হচ্ছে না। নিশ্চিত কিছু খোয়ানোর দাবিতে কল করেছিস আমায়। তোর অপেক্ষার মানেটায় হলো ঝুড়ি ভরা আবদার! এবার পয়েন্টে আয়। ফটাফট মতলবটা প্রকাশ কর শুনি।
আয়নের কথায় এবার নড়েচড়ে বসে ফিহা। বিষয়টা সত্যি ওর কিছু চাই। আর তার জন্যই ব্যস্ত বংগিতে একের পর এক কল করছে আয়নকে। তবে যে শুধু নিজের চাওয়া থেকে কল করছে এমনটা নয়। আরও একটা বিষয় আছে। সেটা হলো মায়া। আয়নের সাথে মায়ার বিয়ে ঠিক করা হয়েছে আজ। সেই খুশির সংবাদটায় ভাইকে প্রথম জানাতে চাই ফিহা। গত একবছর ধরেই ফিহা জানে আয়নের জন্য মায়াকে ঠিক করে রেখেছেন নিজের নানুমা হেনা খান। ফিহাদের বাংলাদেশে আসার বেশ কয়েকদিন পরই এই কথাটি জানতে পারে সে। নিজের মা ও নানুমাকে এই বিষয়ে আলোচনা করতে শুনতে পায়। সেও চুপিসারে পিছনে দাঁড়িয়ে কথা গুলো শুনেছিল সেদিন। আয়নের মাও আপত্তি করেনি সেদিন। বলেছিল আয়ন রাজি হলে তারও কোনো আপত্তি নেই মায়াকে ছেলের বউ বানাতে। তবে আয়ন দেশে না আসা অবধি তাকে এই বিষয়ে কিছু জানাতে নিষেধ করেছিল মেহেরবান। হেনা খানও রাজি হয়েছিল এই বিষয়ে। আয়নের জানা নেই ঘটিত বিষয়ে কথা গুলো। আয়ন মায়ার বিয়ের ঠিক করার কথা গুলো। তবে সেদিন ফিহাও বেশ খুশি হয়েছিল। মায়াকেও বেশ মনে ধরেছিল তার। রিদ মায়ার বিয়েটা বাতিল হওয়াতে বেশ কষ্টও পেয়েছিল ফিহা মায়ার জন্য। কিন্তু পর মূহুর্তে আয়নের সাথে মায়ার বিয়ে নিয়ে কথা বলাতে বেশ খুশিও হয়েছিল ফিহা। আর সেদিন থেকেই ফিহা মায়ার সাথে বেশি বেশি মেলামেশার চেষ্টা করে। একটা বন্ধু মহলও বানায় মায়ার সাথে। মায়ার নানান মূহুর্তের ছবি ইচ্ছাকৃত ভাবে পাঠাতো আয়নের ফোনে। তবে মায়ার একান্ত একা কোনো ছবি আয়নকে পাঠাতো না। পরিবারের সবার সাথে দলবদ্ধ ভাবেই থাকতো এমন ছবি পাঠাতো ফিহা। প্রতিটা ছবিতে মায়ার সাথে কেউ না থাকবেই। তবে ফিহা এমনটাও ইচ্ছাকৃত ভাবে করতো। আয়নের মনের অবস্তা জানতে। যাতে আয়ন স্বেচ্ছায় ফিহার কাছে মায়ার সিঙ্গেল ছবি চাই সেই জন্য। কিন্তু আজ পযন্তও আয়ন সেটা করেনি কখনো। মায়ার কোনো সিঙ্গেল পিক চাইনি ওর কাছে! এতে ফিহা বেশ হতাশ হতো। তবে তার ঠিক পর মূহুর্তে এতটা বুঝতে পারতো! আয়ন ফিহার কাছে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে চাই না। ব্যাস এতটুকুই। আয়নের মনের সুপ্ত অনুভূতি আছে মায়ার জন্য। সেটারও বেশ কয়েক ভাবেই প্রমাণ পেয়েছে সে। এই যেমন! ফিহা আয়নকে এতো এতো পিক পাঠানোর পরও আয়ন কোনো দিন ফিহাকে বলেনি যে, ‘ফিহা তুই এসব পিক কখনো পাঠাবি না আমাকে। তোর এতো পিক পাঠাতে হবে আমাকে হ্যাঁ? একদম বাজে লাগে আমার কাছে। ছেলে মানুষের ফোনে এতো পিক থাকতে নেই। জানিস না তুই?
কক্ষনো বলেনি আয়ন। বরং ফিহার পাঠানো পিকগুলো দীর্ঘ সময় নিয়ে আয়ন অনলাইনে বসে বসে দেখতো তাহ ঠিক বুঝতে পারতো ফিহা। পিক পাঠানোর পর অনেকটা সময় নিয়ে আয়নকে অনলাইন দেখতে পেতো সে। ফিহার ধারণা, আয়ন এতটা সময় নিয়ে অনলাইনে বসে বসে তোহ আর নিজের বোন, মা, নানুমা, নানাভাইকে দেখবে না মায়ার পাশে তাই না? অবশ্যই তাদের রেখে শুধু মায়াকে দেখবে এতটাই স্বাভাবিক।
ফিহার প্রতিবার পিক পাঠানোর সাথে সাথে সিন করতো আয়ন। শত ব্যস্ততার মধ্যেও। ভিডিও কলে যখন আয়নকে রেখে ফিহা মাঝেমধ্যে মায়ার কথা বলতো? তখন আয়ন চুপ করে তাহ শুনার চেষ্টা করতো। হয়তো মায়ার কন্ঠ শুনার চেষ্টা করতো আয়ন। ফিহা বুঝতে পারতো সবকিছু তারপরও ধরা দিতো না নিজের ভাইকে। কারণ ফিহা চাই আয়ন ওকে নিজ থেকে বলুক, যে সে মায়ার সাথে ভিডিও কলে সামনাসামনি কথা বলতে চাই সেটা। যতদিন না বলবে, সেও ততদিন আগ বাড়িয়ে দিবে না মায়াকে দেখতে। কিছুতেই না। আগে আয়ন বলবে তারপর সবকিছু। ফিহা নড়েচড়ে বসে বললো…
—” মতলবটা খুবই অল্প ভাই। আপাতত আমার কিছু ড্রেস লাগবে ডিজাইনার। তুমি আসার সময় লন্ডন থেকে নিয়ে আসবে। আমি তোমাকে হোয়াটসঅ্যাপে ড্রেস গুলো ছবি পাঠিয়েছি। চেক করো।
ফিহার মতলবের কথা শুনে হাসলো আয়ন। ডাইনিং চেয়ার টেনে বসে পড়ে। প্লেটের উপর চামচ চালাতে চালাতে বললো…
—” আমি কারও জন্য ড্রেস ট্রেস নিতে পারবো না। সরি! তোর প্রয়োজন হলে আম্মুকে নিয়ে চলে আয় এখানে। নিজের কাজ নিজে কর। আমাকে খাটানোর ধান্ধা ছেড়ে দে। আমি মহা ব্যস্ত মানুষ। নিজের জানটা নিয়ে কোনো রকম বাংলাদেশে আসবো সেটাই অনেক! আমাকে জ্বালাস না। তোর ফালতো ব্যাগ বহন করার সময় আমার নেই। বুঝলি।
আয়নের কথায় ক্ষেপ্ত দৃষ্টিতে তাকায় ফিহা। সামান্য কয়েকটা ড্রেস আনবে তাতেই তার জান বের হয়ে যাবে। কথা শুনে গাল জ্বলে উঠলো ফিহা। নিজের ভাইয়ের বিয়েতে পড়ার জন্য কয়েকটা ডিজাইনার ড্রেস চাই ওর। সেই সামান্য আবদার টুকু রাখতে নারাজ তার পাষাণ্ড ভাই। ফিহা নিজের রাগ দমন করতে না পেরে চট করে রাগী গলায় বলে ফেললো…
–” ভাই আমার ড্রেস গুলো তোমার কাছে ফালতো মনে হচ্ছে? হ্যা? সামনে বিয়ে। তাই আমার এই ডিজাইনার ড্রেস গুলো চাই-ই চাই। তুমি নিয়ে আসবে আমার ড্রেস গুলো সেখান থেকে। আমি এতো অল্প সময়ে মধ্যে যেতে পারবো না লন্ডনে। শপিং নিয়ে লন্ডন টু বাংলাদেশ দৌড়াদৌড়ি করলে, এদিকে বিয়ে দিন পার হয়ে যাবে আমার। আম্মু মানবে না বিষয়টা। বুঝতেই পারছো ঝামেলায় আছি আমি। তুমি আমার ড্রেস গুলো না আনলে বিয়েতে আমাকে ড্রেস ছাড়ায় ঘুরতে হবে। তাই বুঝতে পারছো কতটা জটিল সমস্যায় সমাহিত আমি। তাই সমস্যাটি আর না বাড়িয়ে সমাধান করো জলদি প্লিজ।
ফিহার মুখে বারবার বিয়ে শব্দটি কানে আসতেই চমকে উঠে আয়ন। চামচ তুলে খাবার মুখে নিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় সেদিকে। কৌতহল বশে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করে ফিহার উদ্দেশ্য…
–” বুঝলাম! তোর জটিল ও কঠিন সমস্যাটা। কিন্তু বিয়ে? কিসের বিয়ে? কার বিয়ের কথা বলছিস তুই সেটা বল আগে? কার বিয়েতে তোকে ড্রেস ছাড়া ঘুরতে হবে শুনি সেটা? তারপর নাহয় ভেবে চিন্তে দেখা যাবে কি করা যায় তোর কঠিন ও তরল সমস্যাটার। হে?
কি থেকে? কি বলে ফেলেছে আয়নকে। বিষয়টি বোধগম্য হতেই কাচুমাচু করে ফিহা। আয়নকে কিছুতেই বলা যাবে না মায়ার সাথে তার বিয়ের বিষয়টি চলছে। বললে হেনা খান আস্ত রাখবে না ফিহাকে। কর্ড়া নিষেধ আছে হেনা খানের আয়নকে এই বিষয়ে কিছু না বলার জন্য। কিন্তু ফিহার মুখ ফস্কে আয়নকে বিয়ে কথাটি বলে ফেললো। এখন নিশ্চিত আয়ন এটি নিয়ে প্যাঁচাবে। আয়ন অনেক বিচক্ষণতার মানুষ। এই বিষয়ে বেশি কথা বললেই ধরা খেয়ে যাবে সে। আবার এড়াতে গেলেও যদি নিজের মার কাছে ফোন করে জানতে চাই? যে বাড়িতে কার বিয়ে হচ্ছে সেটা নিয়ে? তাহলে ফিহা সাংঘাতিক বাজেভাবে ফেঁসে যাবে সবার কাছে। তাই ফিহা এনিয়ে বিনিয়ে থমথমে গলায় বললো….
—” আছে একজনের। তোমাকে বলা যাবে না। তুমি শুধু ড্রেস গুলো এনে দাও আমার তাহলেই হবে।
নির্বিঘ্নে খাবার মুখে তুলতে তুলতে বললো আয়ন।
–” তাহলে ড্রেসের কথা ভুলে যাহ।
কাচুমাচু করে আবারও একিই কথা বললো ফিহা।
–” বললাম তো ভাই তোমাকে বলা যাবে না। সমস্যা আছে।
–“কেন বলা যাবে না? (কপাল কুঁচকে)
–” এমনি।
ফিহার কথা তেমন একটা গুরুত্ব দিল না আয়ন। নির্বিঘ্নে খেতে খেতে আবারও স্বাভাবিক কন্ঠে বললো আয়ন।
–” আচ্ছা! তোকে আর বলতে হবে না। যাহ! আমি নিজেই আম্মুকে ফোন করে জেনে নিব বাংলাদেশে কার বিয়ে হচ্ছে সেটা।
ভয়ে চমকে উঠে দ্রুত বললো ফিহা…
–” ভাই খবরদার! একদমই আম্মুকে ফোন করবে না তুমি এই বিষয়ে।
সন্দিহা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো…
—” কেন করবো না? আর তোর কথা আমাকে কেন শুনতে হবে শুনি?
ভয়ে হাসফাস করতে করতে বললো ফিহা….
–” আমি তোমার কেন উত্তরটা দিলে, তুমি কিন্তু আম্মু বা বাড়ির কাউকে ফোন করে কিছু বলতে পারবে না ভাই। প্রমিস করো।
ফিহার হাসফাস দেখে। সিরিয়াস হয় আয়ন। কিছুতো একটা চলছে বাংলাদেশে যাহ তার অবগত নয়। কিন্তু সেটা কি? ফিহাই বা কার বিয়ে নিয়ে এতটা উত্তেজিত। আয়ন মুখে খাবার তুলে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো…
—” ডান! বল এবার।
খানিকটা মিনমিন করে বলে উঠে….
—” মায়ার বিয়ে। ত..
আতংকে উঠলো আয়ন। হাত থেকে স্বশব্দে চামচটি পড়ে গেলো প্লেটের উপর। শরীরটা যেন মূহুর্তে কম্পন সৃষ্টি হলো তার। ফিহার বাকি কথাটা শুনার আগেই আতংকিত কন্ঠে বললো….
–” মায়ার বিয়ে?
মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বললো….
—” হুমমম।
চাপা কন্ঠে বললো…
–” হোয়াট? কখন? কবে?
–” কিছুদিনের মধ্যেই।
রাগে রি রি করে উঠে আয়ন। নিজের পরিবারের উপর রাগ হচ্ছে ভিষণ। সামন্য ছোট একটা মেয়েকে বারবার বিয়ে দেওয়া নিয়ে, নিজের পরিবারের এতটা উত্তেজিত হওয়াটাকে ভিষণ বিরক্তি কারণ হয়ে দাড়িয়েছে আয়নে। মায়া খুব ছোট। পড়াশোনা করার বয়স ওর। আগে পড়াশোনাটা শেষ করুক। তারপর নাহয় বিয়ে নিয়ে চিন্তা করা যাবে। আপাতত ইন্টার পাসটা তো করুক। মায়াও বড় হোক। তারপর নাহয় বিয়ে। তাছাড়া যার তাঁর কাছে কেন বিয়ে দিবে মায়াকে? তার মতামত নিয়েছে মায়াকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিচ্ছে সেটা নিয়ে? নেই নি তোহ! তাই আয়নেরও মত নেই এই বিয়েতে। বিয়েটা ক্যান্সেল এখানেই। কিছুতেই এই বিয়েটা হতে দিবে না সে। হোক যত ভালো ছেলে। তারপরও মায়াকে অন্য ছেলের সাথে বিয়ে দিবে না। বাংলাদেশে কি ভালো ছেলে অভাব আছে নাকি মায়ার জন্য। আয়ন ও তোহ একজন ভালো ছেলে তাহলে?
একটা বছর ধরেই সে মায়ার সবকিছু পযবেক্ষণ করছে নীরবে। নিজের আপনজনদের মধ্যে একজন ভাবতেও শুরু করেছে সে। আর মায়া আপনজন হলে আয়নেরও অধিকার আছে মায়ার সকল ছোট বড় বিষয়ে কথা বলা। মানছে! সে সবার সামনে মায়ার নাম মুখে নেই না। মায়ার সাথে কখনো ফোনে কথা বলেনি। মায়াকে সরাসরি ভিডিও কলে একটা নজর দেখতে চাইনি। তার মানে এই না, সে মায়াকে কখনো ফিল করতে পারেনি। আয়ন চাই মায়াকে সরাসরি দেখতে। খুব কাছ থেকে মায়াকে দাঁড় করিয়ে মন ভরে দেখতে। তাই সে ভিডিও কলে কখনো দেখার আবদার করেনি ফিহার কাছে। ফিহার পাঠানো হাজারটা ছবি আছে তার ফোনে। একটু সময় পেলেই বসে যায় মায়ার ছবি গুলো দেখতে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মায়ার প্রতিটি মনোমুগ্ধকর ছবিতে। প্রতিটি ছবিই কথা বলে। ফিহার সাথে আড্ডায় মায়ার মুক্ত জড়া হাসিতে কথা বলা ধরণ। হেনা খানের পড়ানোর সময় মায়ার গাল ফুলিয়ে রাখা। আরাফ খানের সাথে বাগানে মধ্যে মায়ার চায়ের আড্ডায় গল্প করা। কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে স্কুল ড্রেসে মালাকে সাথে নেওয়া। এই রকম কথা বলে অংসখ্য ছবি আছে মায়ার আয়নের ফোনে। মায়ার প্রতিটি ছবিতে মুগ্ধ হতো আয়ন। ফিহা ইচ্ছাকৃত ভাবেই আয়নকে যে মায়ার ছবি গুলো বেশি বেশি পাঠাতো তা ঠিক বুঝতে পারতো সে। প্রথম যেদিন মায়াকে দেখেছিল আয়ন ছবিতে। তখন মায়া আয়নদের বাসায় ছিল। সোফার মধ্যে হেনা খানের পাশে সাদা ফ্রকে জড়সড় হয়ে বসেছিল মায়া। আয়ন বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল মায়ার গোল গোল চেহারায়। তখনও আয়ন স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু অস্বাভাবিক হতে লাগলো ফিহার রোজকার কর্মকান্ডে। রোজ আয়নকে নিয়ম মাফিক পিক পাঠানো, মায়ার সম্পর্কে রোজ দুষ্ট মিষ্টি কথা গুলো আয়নকে ফোন করে শুনানো। মায়ার মন খারাপের কথা গুলো ভয়েস করে আয়নকে পাঠানো। সবকিছুই ছিল আয়নের জন্য অস্বাভাবিক হয়ে উঠার কারণ। না চাইতেও আয়ন একটু একটু করে ফিল করতে থাকে মায়াকে। সেই অনূভুতিটা গত একটা বছরের অনেকটায় গাঢ় হয় মায়াকে নিয়ে। আজকাল মায়া ছবি না দেখে ঘুমটাও হয় না তার। নিজের এই কঠিন গুরুতর সমস্যা মধ্যে দিয়ে হুট করেই শুনতে পায় মায়ার বিয়ের সংবাদটি। যেটা সে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছে না এই মূহুর্তে। আয়ন নিজেকে শক্ত রাখে ফিহার সামনে। অন্ত গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বললো….
—” মেয়েটা এখনো ছোট। এই বয়সে কিসের বিয়ে ওর। কোনো বিয়ে টিয়ে হবে না ওর। সবকিছু ক্যান্সেল করতে বল নানুমাকে। আমাকে কেন এই বিষয়ে আগে জানানো হয়নি। আমি কি কিছুই না পরিবারে মধ্যে? সবাই আমাকে বাদ রেখে কাজ করতে চাই কেন?
মায়ার বর নামটা আয়ন। সেটি গোপন রাখলো ফিহা। আয়নকে বাজানোর জন্য দ্রুততা সঙ্গে বললো….
—“একদম বিয়ে ক্যান্সেল করা যাবে না বলে দিলাম ভাই। এক বছর ধরেই মায়ার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে একজনের সাথে। এখন হুট করে বিয়ে ক্যান্সেল করার প্রশ্নই আসে না। আর তোমাকেই বা কেন বলতে হবে মায়ার বিষয়ে হ্যাঁ? তুমি কি মায়াকে নিয়ে কোনো দিন, কোনো বিষয়ে কথা বলেছো! যে আজ তোমাকে মায়ার বিয়ের বিষয়টা জানাতে হবে আমাদের। তাছাড়া তুমি দেশে আসতে চাও না। সেখানে আমরা কি করবো বলো? তাই আমরা সবাই ভাবলাম! তুমি দেশে আসার আগেই, আমরা মায়ার বিয়েটা সেরে ফেলবো তাড়াতাড়ি করে। কিন্তু আমার বোকামির জন্য তোমাকে বলে ফেললাম আমি। এখন তুমি কিন্তু আমাকে প্রমিস করেছো মাকে বলা যাবে না এই বিষয়ে। কথাটা মনে রেখো কিন্তু।
আয়নের রাগ বাড়ে। বাড়ন্ত রাগে কটমট করে চাপা কন্ঠে বললো আয়ন…..
—” ফোন রাখ তুই।
কথাটা বলেই ফিহার অপেক্ষা না করে নিজেই কলটি কেটে দেয়। নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা চালায়। বড় বড় নিশ্বাস নিয়ে। তার মধ্যেই আবারও টুং করে মেসেজের শব্দ কানে আসে আয়নে। ফিহা মেসেজ করে কিছু পাঠিয়েছে আবার। আয়ন সেটা সিন করতেই চোখে পড়লো হেনা খানের পাশে বসে থাকা লাল জামা জড়ানো মায়াকে। খানিকটা বউদের মতো লাগছে মায়াকে। চোখে মুখে হাসি হাসি ভাব। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেখা। তাঁর পাশে আয়নের মা বসে আছে কিছু গয়নার বক্স নিয়ে। সেটা দেখে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে মায়াকে আজ পাত্র পক্ষ দেখতে এসেছিল খান বাড়িতে। আয়নের বাড়ন্ত রাগের মধ্যে বালতি ভরে ঘী ঢেলে দেয় ফিহার ছোট মেসেজটি…
—” দেখতো ভাই! একদম বউ বউ লাগছে না আমাদের মায়াকে। আহ! পুতুল বউ আমাদের।
ব্যাস! সাথে সাথে সুউচ্চ স্বরে ঘর্ষণে সাথে লুটপাট খায় আয়নের খাবার প্লেটটি ফ্লোরে। হাত বাড়িয়ে ধাপধাপ করে একে একে সব ছুঁড়ে মারে ফ্লোরে উপর। নিজের হাতে থাকা ফোনটিও সজোরে আছাড় মারে ফ্লোরে। রাগে ফুসফুস করতে করতে বের হয়ে যায় অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। উদ্দেশ্য আজ রাতেই ফিরবে সে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের টিকেট নিয়েই আসবে রুমে তার আগে নয়। কাল বাংলাদেশে পৌছিয়ে সবার আগে মায়ার বিয়েটা ক্যান্সেল করবে সে। মায়ার এই বিয়েটা কিভাবে হয় সেও দেখবে এবার। নিজের পরিবারের এমন ফাজলামি আর সয্য হচ্ছে না আয়নের।
চলিত…
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১২
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১০+ বর্তীতাংশ
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৯