দিশেহারা (৭৫)
সানা_শেখ
শ্রবণ আসরের নামাজ আদায় করে এসে দেখল শান ব্রেস্ট ফিডিং করছে শুয়ে শুয়ে। শ্রবণ ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“শান, কী করছো, আব্বু?”
শান খাওয়া থামিয়ে বাবার দিকে তাকাল। হেসে দিয়ে বলল,
“দুদু দুদু।”
“দুদু খাও?”
শান হাসি মুখে আবার খেতে ব্যস্ত হলো। শ্রবণ সোহার উপর ঝুঁকে তাকে আদর দিলো তারপর ছেলের হাত ধরে টেনে বলল,
“আর খেতে হবে না, ওঠো এখন।”
শান খাওয়া বন্ধ করল না, মাকে ছাড়লও না। শ্রবণ ছেলের হাত ধরে কিছুক্ষণ টানাটানি করে বলল,
“আসবে না আমার কাছে?”
শান দুদিকে মাথা নাড়ল। সে এখন খেতে ব্যস্ত, যা হয়ে যাক না কেন সে এখন কিছুতেই মাকে ছাড়বে না মন ভরে খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত। দুনিয়ার সবকিছু একদিকে আর তার মায়ের বুকের দুধ খাওয়া আরেক দিকে। এমনিতেই মা এখন দুধ খেতে দিতে চায় না। দুধ খেতে চাইলেই বলে বড়ো হয়ে গেছো, দুধ খাওয়া বাদ দিতে হবে। সে মোটেও বড়ো হয়নি এখনো, কিন্তু মা বুঝতে চায় না। অনেক কান্নাকাটি করার পর এখন খাওয়ার সুযোগ পেয়েছে, সহজে ছাড়ছে না।
শ্রবণ মাজায় হাত দিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল। বেশ কয়েকবার ডাকল ছেলেকে তবে শান তেমন রেসপন্স করল না আর। বেশ সময় নিয়ে নিজের খাওয়া শেষ করে মাকে ছেড়ে উঠে বসে বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো কোলে যাওয়ার জন্য। সোহা গায়ের পোশাক ঠিক করে উঠে বসতেই শ্রবণ সোহাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমাকে আর নিবো না আমি। খুব দাম বেড়ে গিয়েছিল তাই না? এতক্ষণ ধরে ডাকছি পাত্তাই দিলে না। তুমি কী ভেবেছিলে তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই? আমার বউ আছে। এখন থাকো তুমি একা একা।”
শান কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল বাবার মুখের দিকে। সোহা শ্রবণের গলা জড়িয়ে ধরে শানের দিকে তাকিয়ে আছে। শান ফুঁপিয়ে কেঁদে দিয়ে মায়ের দিকে আঙুল তাক করে বলল,
“আমার আমার, আমার আম্মু।”
শ্রবণ হাসি মুখে বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ। তোমার আম্মু, কিন্তু বউটা আমার।”
শান তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়াল। শ্রবণ সোহাকে কোলে নিয়ে ছুটল বাইরের দিকে। শান চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বাবা-মায়ের পেছন পেছন ছুটল। করিডোরে এসে বাবার দুই পা জড়িয়ে ধরে ঝুলে রইল। শ্রবণ বারবার বলছে তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কিন্তু শান না ছেড়ে কেঁদে চলেছে।
সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“ছাড়ো আমাকে নয়তো কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যাবে এখন।”
শ্রবণ সোহাকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। শান বাবার কোলে উঠে মায়ের দিকে তাকাল একবার তারপর বাবার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে ফোঁপাতে লাগল। শ্রবণ ছেলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে চুমু খেলো অনেকগুলো। শান্ত করার চেষ্টা করে আদর করতে করতে বলল,
“কাঁদে না, আব্বু। মজা করলাম তো।”
শান শান্ত হলো বেশ কিছুক্ষণ পর। ফরসা চেহারা পুরো লাল হয়ে উঠেছে। ছেলেকে খুশি করার জন্য বলল,
“চলো বাইক নিয়ে ঘুরতে যাই।”
বাইকের কথা শুনতেই শানের চোখজোড়া চকচকে হয়ে উঠল। বাইকে চড়তে তার ভীষণ ভালো লাগে। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“আরেকটু বড়ো হও, তোমাকেও বাইক কিনে দিবো, মিনি বাইক। হেলমেটও কিনে দিবো।”
শ্রবণের কথা শুনে সোহা শক্ত কন্ঠে বলল,
“ছেলেকে কোনো বাইক কিনে দিতে পারবে না। আর এখন বাইক নিয়ে কোথাও যাওয়া যাবে না।”
শ্রবণ সোহার ফোলা ফোলা গাল টেনে বলল,
“জান, তুইও চল; মজা হবে।”
“না। আমিও যাব না, তোমরাও যাবে না।”
“সরি, জান। আমরা তো এখন যাবই।”
শ্রবণ সোহার গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় শুরু করল। সোহা পিছু পিছু যেতে যেতে গলা ছেড়ে বলল,
“সেদিন যে চিৎপটাং হয়ে পড়ে গিয়েছিলে বাইক নিয়ে সেটা ভুলে গেছো? আজকে ছেলেকে নিয়ে পড়ার শখ জেগেছে?”
“কিছু হবে না, জান। তুই নিশ্চিন্তে থাক, সন্ধ্যার পরেই ফিরে আসব।”
শ্রবণ ড্রয়িংরুমে এসে বাইকের চাবি আর হেলমেট নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল তাড়াহুড়ো করে।
সোহা সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে মেইন দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। এই লোকের মাথা থেকে বাইকের ভূত কিছুতেই নামাতে পারল না সে। ছেলেটাও বাবার মতো বাইক পাগল হচ্ছে দিন দিন। বাইকের কথা শুনলে ছেলেরও হুশ থাকে না, বাবারও হুশ থাকে না। এই দুজনকে নিয়ে তার হয়েছে যত জ্বালা!
এখন রাত প্রায় নয়টা। সোহা ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু শান ঘুমোচ্ছে না। বারবার শোয়া থেকে উঠে বসছে আর ‘আব্বু আব্বু’ ডাকছে। শ্রবণ রয়েছে স্টাডিরুমে, অফিসের কাজ করছে। সে গত বছরই অফিসে জয়েন করেছে। সোহা আগামী বছর পড়াশোনা আবার স্টার্ট করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ততদিনে শান আরো কিছুটা বড়ো হয়ে যাবে। শ্রবণ চেয়েছিল সোহা এ বছরই পড়াশোনা শুরু করুক কিন্তু সোহা রাজি হয়নি, তার এক কথা; আগামী বছর শুরু করবে।
ছেলের কান্নাকাটি শুনে স্টাডিরুম থেকে বেডরুমে ফিরে এলো শ্রবণ। বিছানার দিকে এগিয়ে বলল,
“কী হয়েছে আমার আব্বুর, কাদঁছে কেন?”
শান বাবাকে দেখে ঠোঁট উল্টে কাঁদতে কাঁদতে আব্বু আব্বু ডাকল মুখ ভরে। শ্রবণ কাছে এগিয়ে এসেই ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে শান্ত করল। সোহা শুয়ে থেকেই শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাপের সঙ্গে মিলে অকাজ করতে পারছে না তাই তার শান্তি লাগছে না।”
“আমি আর আমার আব্বু মিলে শুধু অকাজই করি?”
“হ্যাঁ।”
“এই ডাইনির বাচ্চা, একদম মিথ্যা বলবি না। আমরা সবসম—
শ্রবণের কথার মাঝেই শান বলল,
“ডাইনির বাচ্চা।”
ছেলের কথা শুনে শ্রবণ হা হা করে হেসে উঠল। সোহা নাকমুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল দুজনের দিকে। শান আবার বলল,
“ডাইনি যাব।”
সোহা চেঁচিয়ে উঠল। কর্কশ গলায় বলল,
“ছেলের সামনে উল্টাপাল্টা কথা বলতে নিষেধ করেছি না?”
শ্রবণ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“উল্টোপাল্টা কথা কোথায় বললাম? যা সত্য তাই তো বললাম। তোর মা-খালা-নানি সবাই ডাইনি, শুধু আমার বউ বাদে।”
সোহা চোখজোড়া ছোটো ছোটো করে বলল,
“তোমার বউ ডাইনি নয় কেন?”
“কারণ সে আমার বউ। কোনো ডাইনি আমার বউ হবে এটা অসম্ভব।”
সোহা আরো কিছু বলতে নিয়েছিল কিন্তু সেই মুহূর্তেই তার ফোন বেজে উঠল। ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল মায়ের কল। শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ডাইনির কথা বলতে বলতেই ডাইনির কল এসে হাজির।”
সোহা শ্রবণের দিকে কঠিন এক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কল রিসিভ করে মুখের সামনে ধরল। মায়ের হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেও হেসে বলল,
“কেমন আছো, আম্মু?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুই কেমন আছিস?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
“আমার নানা ভাই কোথায়? ঘুমিয়ে পড়েছে?”
“না। ঘুমোয়নি এখনো।”
সোহা ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে শ্রবণ আর শানকে দেখাল। অনিমা চৌধুরী নাতিকে দেখে নানা ভাই বলে ডেকে উঠলেন। শানও সঙ্গে সঙ্গেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে ডাইনি বলে ডেকে উঠল।
শানের ডাক শুনে চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে থাকা সকলে অট্টহাসিতে ফেঁটে পড়ল। শ্রবণ নিজেও হেসে উঠেছে। সোহা দুজনের দিকে তাকিয়ে ফুঁসছে।
স্পর্শ ক্যামেরার সামনে এসে তাড়াহুড়ো করে বলল,
“শান যেন না ঘুমায়, আমি আসছি।”
সিয়াম নিজেও সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমিও আসছি।”
শামীম রেজা চৌধুরীও উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
“আমিও আসছি।”
তিনজনের কথা শুনে শ্রবণ বলল,
“কাউকেই আসতে হবে না, আমরাই আসছি।”
“তাহলে দ্রুত চলে আসো নয়তো শান ঘুমিয়ে পড়বে।”
“আসছি এক্ষণই। এই ছোটো ডাইনির দুই নাম্বার বাচ্চা, ওঠ।”
শান আবার বলল,
“ডাইনির দুই বাচ্চা।”
শ্রবণ ছেলেকে কোলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে বলল,
“দুই বাচ্চা না, আব্বু। ডাইনির দুই নাম্বার বাচ্চা, মানে দ্বিতীয় ছাও।”
“দিতয় ছাও।”
শ্রবণ হাসল আবার। সোহা কল কেটে চেঁচাতে চেঁচাতে দুজনের পেছন পেছন এগোল। শ্রবণ দাঁড়িয়ে পড়ল সিঁড়ির কাছে এসে। সোহা পাশে এসে দাঁড়াতেই শ্রবণ সোহার গাল টেনে আদুরে গলায় বলল,
“কী হয়েছে, জান? এমন ক্ষেপেছিস কেন?”
সোহা শ্রবণের হাত সরিয়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“ছেলেকে কী শেখাচ্ছো এসব?”
শ্রবণ সোহার মাথায় নিজের মাথা দিয়ে গুতা দিয়ে বলল,
“সত্যি কথা শেখাই, জান…..।”
সুর ধরে জান ডাকল শ্রবণ। সোহা সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলল,
“এই যে আজকে যাচ্ছি, আর আসব না তোমাদের কাছে।”
শ্রবণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“এইরে তোমার মা রেগে গেছে।”
শান বাবার মুখের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মায়ের যাওয়ার পথে তাকাল। শ্রবণ সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে শক্ত গলায় বলল,
“দেখ, জান। উল্টাপাল্টা কথা বলবি না, ঠ্যাং ভেঙে ফেলব কিন্তু।”
“উল্টাপাল্টা কথা বললে মানুষ মুখ ভাঙতে চায়, তুমি ঠ্যাং ভাঙতে চাইছো কেন?”
শ্রবণ দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“যেন আমাদের ছেড়ে যেতে না পারিস।”
***********
স্পর্শের ফোনে একের পর এক কল আসছে তখন থেকে। বারবার মেসেজও আসছে। ফোন সাইলেন্ট করা থাকলেও নজর এড়াল না শ্রবণের। ছোটো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“স্পর্শ, কে কল করছে?”
বড়ো ভাইয়ের কথায় হকচকিয়ে গেল স্পর্শ। ফোন আড়াল করে রেখে বলল,
“কেউ না, রং নাম্বার।”
শ্রবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ভাইয়ের মুখের দিকে। স্পর্শের চোখেমুখে চোর চোর ভাব। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“দেখি, কে বারবার বিরক্ত করছে।”
স্পর্শের কলিজা যেন লাফিয়ে উঠল। ভাইয়ের বাড়িয়ে রাখা হাতে দিয়ে দিলো নিজের ফোনটা। পুনরায় কল এলো। শ্রবণ ফোনের স্ক্রিনে তাকাল, ‘যন্ত্রণা’ নাম দিয়ে সেভ করা নাম্বারটা। কল রিসিভ করে ফোন কানে ধরল। সঙ্গে সঙ্গেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক মেয়েলি কন্ঠস্বর।
“হাই বেইবি, জান, সোনা পাখি, কেমন আছো তুমি?”
বিস্ময়ে শ্রবণের চোখজোড়া কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। স্পর্শের দিকে তাকিয়ে দেখল বেচারা অসহায় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। শ্রবণ নিজেকে সামলে রাশ ভারী গলায় বলল,
“কে?”
শ্রবণের গলার স্বর শুনে চমকাল বোধহয় মেয়েটা। কিছুটা সময় চুপ থেকে বলল,
“আপনি কে?”
“আপনি কে আর কাকে কল করেছেন?”
“আমি তৃষ্ণা এহসান। কল করেছি স্পর্শ চৌধুরীকে। বাই দ্যা ওয়ে, আপনি কে?”
শ্রবণ আগের ভাব বজায় রেখে বলল,
“স্পর্শের বড়ো ভাই।”
“ওহ, ভাসুর ভাই! আসসালামু আলাইকুম, ভাসুর ভাই, কেমন আছেন?”
কান থেকে ফোন সরিয়ে ফেলল শ্রবণ। ফোনের ওপাশে কোন পাগল? স্পর্শ চিন্তিত হয়ে বলল,
“কী বলছে, ভাইয়া? উল্টাপাল্টা কিছু বলছে?”
শ্রবণ ফোন আবার কানে ধরতেই মেয়েটার গলার স্বর শুনতে পেল।
“সালামের জবাব দিলেন না যে, ভাসুর ভাই?”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আপনার বাবার নাম কী? বাড়ি কোথায়?”
“কেন? বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসবেন? তাহলে দ্রুত চলে আসুন, তার আগে আপনার ছোটো ভাইকে রাজি করান, ভাসুর ভাই। আপনার ছোটো ভাই ভীষণ জেদি আর একরোখা ঘাড় ত্যাড়া মানুষ। এতগুলো দিন ধরে তার পিছু লেগে আছি কিছুতেই তার মন গলছে না। পাত্তাই দেয় না আমাকে।”
শ্রবণ কিছু না বলে ফোন স্পিকারে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। শ্রবণ কিছু বলছে না দেখে মেয়েটা আবার বলল,
“কী হলো, ভাসুর ভাই? কথা বলছেন না কেন?”
শ্রবণ স্পর্শের দিকে তাকিয়ে বলল,
“স্পর্শ, কে এই মেয়ে?”
স্পর্শ থমথমে গলায় বলল,
“তুহিন এহসান আঙ্কেলের একমাত্র বাচাল মেয়ে। এই মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে। দিনরাত কল আর মেসেজ দিয়ে দিয়ে আমাকে পাগল বানিয়ে দিচ্ছে। এই মেয়ের যন্ত্রণায় আমি রাতে ঠিক মতো ঘুমোতেও পারি না। রাত নেই, দিন নেই যখন তখন কল করে, মেসেজ দেয়। এই মেয়ে সারারাত ঘুমায় না নাকি?”
তৃষ্ণা ব্যাকুল সুরে বলল,
“না। ঘুমাই না, জান। তোমার কথা ভাবতে ভাবতে আমার ঘুম আসে না। তুমি ভালো হয়ে যাও, আমাকে একসেপ্ট করে নাও, তাহলে আমি আর এত বেশি যন্ত্রণা করব না তোমাকে।”
স্পর্শ বাজখাঁই গলায় বলল,
“এই মেয়ে লজ্জা লাগে না একটা ছেলেকে এসব কথা বলতে? আঙ্কেলকে আজই সব বলে দিবো আমি।”
“সমস্যা নেই, বলে দাও।”
শ্রবণ বলল,
“এত কাল শুনে এসেছি ছেলেরা মেয়েদের বিরক্ত করে, আজ প্রথম দেখলাম মেয়েরাও ছেলেদের বিরক্ত করে। কেমন দিন এলোরে, ভাই!”
“ভাসুর ভাই, আপনার ভাইকে বলুন আমার ভালোবাসা একসেপ্ট করে নিতে, তাহলে আমি আর বিরক্ত করব না, সত্যি কথা বলছি। আপনার ভাইয়ের প্রেমে পড়ে আমি ভদ্র সভ্য একটা মেয়ে থেকে নির্লজ্জ বেশরম হয়ে গেছি, এখন পাগলও হয়ে যাচ্ছি। বিশ্বাস করুন, ভাসুর ভাই, আমি আগে মোটেও এমন মেয়ে ছিলাম না। সব আপনার ভাইয়ের দোষ, তার প্রেমে পড়ে আমি এমন হয়ে গেছি, সে ইচ্ছে করে আমাকে পাগল করেছে। একুশ বছরের জীবনে কোনোদিন কোনো ছেলেকে মনে ধরেনি আমার। বাইশ বছরের জীবনে প্রথমবারের মতন আপনার ভাইকে মনে ধরেছিল। গত একটা বছর ধরে আমি আপনার ভাইয়ের পেছনে পড়ে আছি অথচ আপনার ভাই আমাকে পাত্তা দেয় না। এই দুঃখ আমি কই রাখি! হাই স্কুল থেকে শুরু করে ভার্সিটি, কত কত ছেলের কাছে প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছি, আমার মন টানেনি কখনো সে সবে। কতগুলো ছেলেকে ফিরিয়ে দিয়েছি, মন ভেঙেছি। ছেলেগুলোর অভিশাপ লেগেছে বোধহয় তাই তো আপনার ভাইয়ের মতো কিউট, সুইট, হ্যান্ডসাম একটা ছেলে আমাকে পাত্তা দিচ্ছে না। আপনার ভাইয়ের প্রেমে পড়ে কী থেকে কী হয়ে গেলাম আমি, আহারে তৃষ্ণা!”
শ্রবণ বিড়বিড় করে বলল,
“মেয়েটা কত কথা বলে!”
স্পর্শ বলল,
“এই মেয়েকে আমি সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিয়েছিলাম, কিন্তু এই মেয়ে থামার নয়। আঙ্কেলের ফোন দিয়ে কল আর মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করে। আঙ্কেলকে তো চাইলেও একেবারে ব্লক করতে পারি না। মাঝেমধ্যে তো এর বড়ো ভাইয়ের ফোন দিয়েও দেয়।”
“আঙ্কেল বা ভাইয়া কিছু বলে না?”
“জানলে তো বলবে। তারা তো জানেই না এই মেয়ে তাদের ফোন নিয়ে কী করে। আমার মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করে এই মেয়েকে ধরে নিয়ে পাবনা পাগলা গারদে রেখে আসি নয়তো নিজেই চলে যাই। আমার জীবনটা তেজপাতা বানিয়ে দিলো, ভাল্লাগেনা।”
“জান, আমারো ভাল্লাগেনা।”
“এই মেয়ে, ফোন রাখ। অসভ্য মেয়ে, সামনে পেলে কানশা বরাবর দিবো দুটো।”
ভাইয়ের হাত থেকে ফোন নিয়ে কল কে’টে দিলো স্পর্শ। বেচারার চোয়াল শক্ত হয়ে রয়েছে। বজ্জাত মেয়ে, বড়ো ভাইয়ের সামনে কীভাবে জান বলে ডাকছিল!
শ্রবণ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সে ছোটো ভাইকে খুব কমই দেখেছে রেগে এমন চোয়াল শক্ত করে থাকতে। যা হোক তৃষ্ণাকে তার ভালো লেগেছে। মেয়েটা যে তার ভাইকে পাগলের মতো ভালোবাসে তা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। তৃষ্ণাকে অনেকবার সামনে থেকে দেখা হয়েছে তবে কথা হয়নি কখনো। মেয়েটা বেশ সুন্দরী আর ভালো পরিবারের। যতবার সামনে থেকে দেখেছে মেয়েটাকে ভীষণ শান্তশিষ্ট আর কম কথা বলা মনে হয়েছে। কিন্তু চোখের আড়ালে তো মেয়েটা ভীষণ দুষ্টু প্রকৃতির আর চঞ্চল, বাচালও বটে।
স্পর্শের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কাহিনী কী?”
“কীসের কাহিনী?”
“কীসের কাহিনী মানে?”
“মানে কী?”
“ভালোবাসো?”
“কাকে?”
“তুহিন আঙ্কেলের একমাত্র বাচাল মেয়েকে।”
“পাগল নাকি? ওই পাগলকে কেন আমি ভালোবাসতে যাব?”
“তৃষ্ণা তো বলল, তোমাকে ভালোবেসে সে পাগল হয়েছে।”
“ও আগে থেকেই পাগল।”
“হুম, বুঝতে পারলাম।”
“কী?”
“তুমিও ভালোবাসো।”
“একদম না।”
“একদমই এটাই। ভালো না বাসলে নাম্বার ব্লক না করে সেভ করে রেখেছো কেন?”
“এর নাম্বার ব্লক করে রাখলে পুরো গুষ্টির ফোন দিয়ে কল করে।”
“আচ্ছা আব্বুকে বলছি।”
স্পর্শ ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
“কী?”
“তুমি বিয়ে করবে।”
“হ্যাঁ! না, একদম না। ভাইয়া, দাঁড়াও।”
স্পর্শ শ্রবণের পেছন পেছন দৌড় শুরু করেছে তাকে ধরার জন্য। করিডোরে এসে শ্রবণকে পেছন থেকে জাপটে ধরে যেন বাবার কাছে যেতে না পারে। শ্রবণ স্পর্শের কাছ থেকে ছোটার জন্য একপ্রকার লাফালাফি শুরু করেছে কিন্তু ছুটতে পারছে না। স্পর্শ এমন শক্ত করে জাপটে ধরেছে যে ছাড়ছেই না। শ্রবণ স্পর্শকে নিয়েই সামনের দিকে আগায়। স্পর্শ ভাইকে থামানোর জন্য উঁচু করে নিয়ে উল্টো হাঁটা ধরল। দুজনের ধস্তাধস্তি আর উচ্চ স্বরে বলা কথা শুনে শামীম রেজা চৌধুরী নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি কিছুক্ষণ আগেই শুয়েছিলেন ঘুমোনোর জন্য। করিডোরে এসে দুই ভাইকে এভাবে দেখে বিস্মিত হয়ে বললেন,
“এত বড়ো হয়ে ছোটো বাচ্চাদের মতন এসব কী করছো দুই ভাই মিলে?”
বাবার কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল স্পর্শ। এই সুযোগে শ্রবণ স্পর্শের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। কী শক্ত করেই না ধরেছিল!
“কী হয়েছে তোমাদের দুই ভাইয়ের?”
স্পর্শ কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল কিন্তু সে কিছু বলার আগেই শ্রবণ বলল,
“স্পর্শ বিয়ে করতে চাইছে কিন্তু লজ্জায় বলতে পারছে না তোমাদের কাউকে।”
স্পর্শ হাঁ করে চাইল বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে। বাবার দিকে তাকিয়ে দ্রুত দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
“না না। আমি এমন কিছুই বলিনি, ভাইয়া মিথ্যা বলছে। ভাইয়া, এসব কী বলছো?”
“যা সত্যি তাই তো বলছি। আব্বু, স্পর্শ গত এক বছর ধরে তৃষ্ণা নামের এক মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে। তলে তলে টেম্পু ঠিকই চালায়, শুধু আমরা বললেই বলে হরতাল।”
স্পর্শ যেন সাত আসমান উপর থেকে ধপ করে জমিনে পড়ল। এমন ডাহা মিথ্যা কথা কীভাবে বলছে তার বড়ো ভাই? সে কবে তৃষ্ণার সঙ্গে প্রেম করল?
শামীম রেজা চৌধুরী বললেন,
“এটা কোন তৃষ্ণা?”
স্পর্শকে কিছু বলতে না দিয়ে শ্রবণ নিজেই বলল,
“তুহিন এহসানের মেয়ে তৃষ্ণা এহসান।”
শামীম রেজা চৌধুরী ছোটো ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। স্পর্শ বাবা আর ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তার ইচ্ছে করছে ফ্লোর দুই ভাগ করে নিচে চলে যেতে, নয়তো অলৌকিক কোনো ক্ষমতা বলে অদৃশ্য হয়ে যেতে। কোনো বড়ো ভাই ইচ্ছে করে ছোটো ভাইকে এভাবে বেকায়দায় ফেলে?
শামীম রেজা চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন,
“তুমি তৃষ্ণাকে বিয়ে করতে চাইছো?”
স্পর্শ বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল। শ্রবণ উপর নিচ মাথা নেড়ে স্পর্শকে একই কাজ করতে বলল ইশারায়। স্পর্শ উপর নিচ মাথা নেড়ে মুহূর্তেই আবার দুদিকে মাথা নেড়ে দ্রুত বলল,
“না না না, একদম না।”
শ্রবণ বলল,
“কীসের না না? আব্বু, তুমি আঙ্কেলদের সঙ্গে আলোচনা করো, দেখো তারা কী বলে।”
স্পর্শ কিছু বলতে নিয়েছিল কিন্তু তার আগেই শামীম রেজা চৌধুরী বললেন,
“যদি তোমার পছন্দ থাকে, ভালোবাসো তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই। তুমি সংসার করবে, সারা জীবন পার করবে, তাই তুমি যা চাইবে তা-ই হবে।”
স্পর্শ আর কিছু বলল না। শামীম রেজা চৌধুরী রুমের দিকে ঘুরে হাঁটা শুরু করে বললেন,
“অনেক রাত হয়েছে, গিয়ে শুয়ে পড়ো দুই ভাই। এই বিষয়ে আমরা আগামীকাল সকালে আলোচনা করব।”
দুই ভাই বাবার যাওয়ার পথে তাকিয়ে তনিমা চৌধুরীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেল। তিনি এখনো শ্রবণের কাছাকাছি আসার সাহস পান না। শ্রবণের দৃষ্টিকে এখনো ভয় পান। শ্রবণকে দেখলে সবসময় দূরে দূরেই থাকেন।
শ্রবণ স্পর্শকে রুমে যেতে বলে নিজেও নিজের রুমের দিকে এগোল। সোহা শানকে নিয়ে ঘুমিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। আজ সিয়ামের মাথা ব্যথা থাকায় সেও ঔষুধ খেয়ে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছিল। সবাই যার যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ার পর শ্রবণ আর স্পর্শ ড্রয়িংরুমে বসে ছিল আর সেই মুহূর্তেই স্পর্শের ফোনে বারবার মেসেজ আর কল আসছিল।
শ্রবণ রুমে এসে দরজা লাগিয়ে বিছানার দিকে এগোল। এই দুজন মানুষকে দেখলে তার অন্তর যে কতটা শীতল হয়ে যায় কাউকে বুঝাতে পারবে না শ্রবণ। তার ভালো থাকা, তার শান্তির উৎসই এরা দুজন। শেষ পর্যন্ত দিশেহারা শ্রবণ চৌধুরী দিশা খুঁজে পেয়েছে।
সে বাড়ির সকলের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করলেও তিনজনের একজনকেও মন থেকে মাফ করতে পারেনি, পারবেও না কোনোদিন। মাফ করা মহৎ গুণ, তবে এই মহৎ কাজটা শ্রবণ চৌধুরী করতে পারেনি এখন পর্যন্ত। তার ধারণা এই তিনজনকে মাফ করে দিলে তার বোন আর মায়ের সঙ্গে অন্যায় করা হবে, যা শ্রবণ কোনোদিন করবে না। সোহার পাশে শুয়ে আলগোছে জড়িয়ে ধরল তাকে। সোহা আর শান বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।
স্পর্শ ওয়াশরুম থেকে বেরুতেই তার ফোনটা আবারো শব্দ করে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল যন্ত্রণা কল করেছে। মেয়েটাকে প্রথম প্রথম তার ভীষণ অসহ্য লাগত। একটা মেয়ে এত ছ্যাচড়া হয় কীভাবে? কিন্তু আস্তে আস্তে তার পাগলামিগুলো স্পর্শের মনে দাগ কা’টতে শুরু করে। একটা সময় পর গিয়ে স্পর্শ নিজের অজান্তেই প্রেমে পড়ে এই পাগল আর বাচাল মেয়েটার। যদি সত্যি সত্যিই মেয়েটা তাকে ভালো না বাসত তাহলে এত পাগলামি কখনোই করত না। স্পর্শ কপাল চাপড়ায়, শেষ পর্যন্ত একটা পাগলকে ভালোবেসে ফেলেছে সে।
রিং বাজতে বাজতে কল একবার কে’টে গিয়ে আবার এলো। স্পর্শ রুম অন্ধকার করে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো মিষ্টি গলার আওয়াজ।
“হ্যালো।”
স্পর্শ কথা না বলে চুপ রইল। বেশ কয়েকবার হ্যালো হ্যালো বলল তৃষ্ণা। স্পর্শের কোনো রেসপন্স না পেয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই লোক কল রিসিভ করে কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে? এই যে মিস্টার ঘাড় ত্যাড়া চৌধুরী, শুনছো?”
“হুম।”
ছলাত করে লাফিয়ে উঠল তৃষ্ণার হৃৎপিণ্ড। বুকের বাঁ পাশে হাত চেপে বলল,
“এতক্ষণ কথা বলছিলে না কেন?”
“শুনছিলাম।”
“কী?”
“কথা।”
“কার?”
“যে বলছিল।”
“কে বলছিল?”
“এখন যে বলছে।”
“আমি?”
“হুম।”
“সত্যি!”
স্পর্শ চুপ রইল। তৃষ্ণা একা একাই বকবক করল অনেকক্ষণ, স্পর্শ চুপ করে শুনল সব কথা। তৃষ্ণা কথা থামিয়ে বলল,
“শুনছো নাকি ঘুমিয়ে পড়েছো?”
“শুনছি।”
তৃষ্ণা ভীষণ খুশি হলো। এই প্রথম স্পর্শ তার সব কথা শুনেছে, অন্যদিনগুলোতে তো কল রিসিভ করে ধমকিধামকি দিয়ে কল কে’টে দেয়। খুশিতে আত্মহারা হয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে নাচতে শুরু করল। স্পর্শ বুঝতে পারল তৃষ্ণার উচ্ছ্বাস। মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলল,
“আসলেই পাগল।”
নেচে গেয়ে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ল তৃষ্ণা। ব্যাকুল সুরে বলল,
“এই ঘাড় ত্যাড়া চৌধুরী, একসেপ্ট করে নাও না আমার ভালোবাসা আর আমাকে।”
“নিয়ে নিলে কী হবে?”
“ভীষণ ভালোবাসবো তোমায়, একটুও যন্ত্রণা করব না আর।”
“আর যদি না নেই?”
“তাহলে সারা জীবন যন্ত্রণা করব।”
“কেন?”
“কারণ তুমি আমাকে যন্ত্রণার উপরে রেখেছো। আমি কিছুতেই শান্তি পাই না, কিছু ভালো লাগে না। সবসময় শুধু তোমাকে মনে পড়ে, আর নিজেকে পাগল পাগল লাগে।”
“ঘুমাও এখন, অনেক রাত হয়েছে।”
“কী বললে!”
“ঘুমোতে বলেছি।”
“পুরো কথাটা বলো।”
“ঘুমাও এখন, অনেক রাত হয়েছে।”
“আয়ায়ায়া, ফাইনালি তুমি আমাকে তুমি করে বলেছো। ইয়াহু, কী যে খুশি লাগছে! উম্মাহ, জান।”
স্পর্শ কল কে’টে দিলো। তৃষ্ণা ফোনটা বুকের উপর রেখে চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ হয়ে রইল।
শ্রবণ কল রিসিভ করে কানে ধরল। হাসান কল করেছে।
“আসসালামু আলাইকুম, বেয়াই সাহেব, কেমন আছেন?”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুই কেমন আছিস?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
“আমাকে বেয়াই ডাকবি না তুই।”
“কেন?”
“কারণ আমি আমার মেয়েকে তোর ছেলের কাছে বিয়ে দিবো না।”
“না দিলে না দিবি, আমি আর আমার ছেলে গিয়ে নিয়ে আসব।”
“আমি দিলে না তুই নিতে পারবি।”
“তোর মেয়ে কবে কোনদিক দিয়ে আমার ছেলের সঙ্গে চলে আসবে তুই টেরও পাবি না। তো কী করছে আমার ছেলের হবু বউ?”
“খাচ্ছে। তার খাওয়া আর হাগু-মুতু করা ছাড়া কোন কাজ আছে এই রাতের বেলা? দিনের বেলায় পড়ে পড়ে ঘুমায় আর রাত হলে জেগে থাকে। ভাল্লাগেনা। নিয়ে যা তোর ছেলের বউকে, তোরাই যখন নিয়ে যাবি তাহলে আর এত কষ্ট করে আমরা বড়ো করব কেন?”
হাসানের কথা আর বলার ধরন দেখে শব্দ করে হেসে ফেলল শ্রবণ। হাসান বলল,
“হাসি পাচ্ছে তোর?”
“না। কষ্ট হচ্ছে।”
“কেন?”
“বউ ঘুমিয়ে গেছে।”
সোহা ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
“কী হয়েছে?”
“তোকে বলছি না।”
“কাকে বলছো?”
“হাসান কল করেছে। তোর ছেলের বউ জেগে রয়েছে, তাকেই পাহারা দিচ্ছে বেচারা নিজের ঘুম হারাম করে।”
হাসান বলল,
“তোর কষ্ট কমল।”
“কেন?”
“তোর বউ জেগে গেছে, রাখছি।”
কল কেটে দিলো হাসান। রিতা ঘুমিয়ে গেছে, আর মেয়ে চুকচুক করে খাচ্ছে।
সোহা শ্রবণের দিকে ফিরে শ্রবণের বুকে মুখ গুঁজে নিশ্চুপ হয়ে রইল। শ্রবণ সোহাকে আগলে নিয়ে বলল,
“দুদিন পর তো বাড়িতে বিয়ে।”
সোহা বুকে মুখ গুঁজে রেখেই বলল,
“কার বিয়ে?”
“স্পর্শের।”
সোহা বুক থেকে মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকাল। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলল,
“আসলেই?”
“হ্যাঁ।”
“এই অসম্ভবটা সম্ভব হলো কীভাবে?”
শ্রবণ খুলে বলল সবটা। শুনে সোহা খুশি হলো বেশ। শ্রবণের বুকে পুনরায় মুখ গুঁজে বলল,
“তাহলে একেবারে বিয়ে শেষ করে বাড়িতে ফিরব আমরা।”
“এখনো মেয়ের বাড়ির লোকের সঙ্গে কথাই হলো না, আর এ বিয়ে শেষ করে বাড়িতে ফিরবে। আমরা আগামীকালই ফিরব।”
“তুমি না বললে দুদিন পর বিয়ে?”
“ওটা তো কথার কথা বলেছি।”
“যাই বলো তুমি, আমি একেবারে বিয়ে শেষ করেই যাব। এবার এমনিতেই অনেকদিন পর এসেছি।”
“ঘুমা।”
“জান বলো।”
“জান, ঘুমা।”
“আবার বলো।”
“জান জান জান, ঘুমা, জানপাখি।”
সোহা হেসে ফেলল তারপর শ্রবণকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তুমি এভাবে জড়িয়ে ধরলে অনেক শান্তি লাগে।”
“আমারো।”
সোহা চুপ হয়ে রইল। শ্রবণ সোহাকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে বলল,
“আল্লাহ তায়ালা চাইলে একদিন আমরা বয়সের ভারে নুয়ে যাব, চামড়া কুঁচকে যাবে, চুল পেকে যাবে, চলা ফেরায় বেগ পেতে হবে, তখনো তুই আমার বুকেই ঘুমাবি। আমি, এই শ্রবণ চৌধুরী যতদিন বেঁচে আছি তোকে আগলে রাখব। এক ফোঁটা দুঃখ কষ্ট তোকে ছোঁয়ার সাহস করবে না। তুই আমার রানি, এই শ্রবণ চৌধুরীর এক এবং অদ্বিতীয় রানি, আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ, আমার সন্তানের মা, আমার জান।”
(সমাপ্ত)
4k রিয়েক্ট পূরণ না হলে পরবর্তী পার্ট আসবে না 🙂। পুরো গল্পটা কেমন লেগেছে অবশ্যই মতামত জানাবেন সবাই।
অনেকেই হয়তো বলবেন যে শামীম রেজা চৌধুরী, তনিমা চৌধুরী আর অনিমা চৌধুরীকে কেন শাস্তি দেওয়া হলো না। আবার অনেকেই বলেছেন তারা শ্রবণের মা এবং বোনকে খু’ন করেছে। আমি গল্পে পুরো বিষয়টা ক্লিয়ার করেছিলাম আপনারা হয়তো মন দিয়ে পড়েননি। তিনজনের মধ্যে একজনও ইচ্ছাকৃত ভাবে শ্রবণের মা এবং বোনকে মা’রেনি, হ্যাঁ দোষ তারা অবশ্যই করেছে। শ্রবণের মা বিশ্বাসঘাতকতা সহ্য করতে না পেরে স্ট্রোক করে মা’রা যায়, আর শ্রবণের বোনের শ্বাস নালীতে দুধ আটকে মা’রা যায়। দুজনকে কেউই ইচ্ছাকৃত ভাবে খু’ন করেনি। শ্রবণ চাইলেও তিনজনের একজনকেও নিজ হাতে ফাঁসি দিতে পারবে না, বা খু’ন করতেও পারবে না। এসব করলে সে কী ছাড়া পাবে? যদি বলা হয় আইন শাস্তি দিবে, তবে সেটা কীভাবে? বাস্তবেও অহরহ এমন ঘটনা ঘটে, ঘটছে। ন্যায় বিচার কজনের ভাগ্যে জোটে? কেউ মানিয়ে নেয়, কেউ মানিয়ে নিতে না পেরে ছেড়ে দেয়। শ্রবণ প্রথমে মানতে না পেরে ছেড়ে দিয়েছিল, এখন মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সে বুঝতে পেরে গেছে সে চাইলেও তেমন কিছুই করতে পারবে না তিনজনের। তাছাড়া শামীম রেজা চৌধুরী আর অনিমা চৌধুরী শ্রবণের কাছে মাফও চেয়েছে।
আপনাদের ভালোভাবে বুঝাতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে তাই এই পর্যন্তই থাকুক।
দেখা হচ্ছে পরবর্তী কোনো গল্পে।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৩৪
-
দিশেহারা পর্ব ২৮
-
দিশেহারা পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ২৩
-
দিশেহারা গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ২০
-
দিশেহারা পর্ব ৬০
-
দিশেহারা পর্ব ৫২
-
দিশেহারা পর্ব ১৫
-
দিশেহারা পর্ব ১১