দিশেহারা (৭০)
সানা_শেখ
রুমের বাইরে থেকে কেউ ডাকল দুজনকে, দুজন সোহার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল দরজা লাগিয়ে দিয়ে।
সোহা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তবুও ভয় কা’টল না। নিচের উঁচু পেটের ওপর হাত বুলাল, বাবু এখন নড়াচড়া বন্ধ করে শান্ত হয়ে আছে। ধস্তাধস্তি করে গাড়িতে তুলেছিল, গাড়িতে ওঠার পরও বেশ ধস্তাধস্তি হয়েছিল। বেশ কয়েকবার পেটে চাপ লেগেছিল। বাচ্চাটা বোধহয় বুঝতে পেরেছিল মা বিপদে পড়েছে। সেও তখন নড়াচড়া অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। সে কী ব্যথাও পেয়েছে?
সোহা ডুকরে কেঁদে উঠল আবার।
রাতের এখন প্রায় তিনটা বাজে। শ্রবণ সোহার জামা-কাপড় জাপটে ধরে ফ্লোরে বসে আছে মূর্তির মতো। রাগে, ক্ষোভে, টেনশনে, উত্তেজনায় একটা ব্যাপার মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছিল, সেটা মনে পড়েছে ফ্ল্যাটে ফেরার অনেকক্ষণ পর। ব্যাংক থেকে একদিন বা দুদিনের মধ্যে একশ কোটি টাকা উত্তোলন করা সম্ভব নয়। এই ব্যাপারটা মাথায় আসতেই আরো বেশি এলোমেলো হয়ে গেছে শ্রবণ। সোহার কাপড়চোপড় জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছে, কাঁদতে কাঁদতে এখন পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। এত টাকা একদিনের মধ্যে তাকে কে দিবে? কীভাবে জোগাড় করবে? কার কাছে যাবে? সকাল হচ্ছে না কেন এখনো? আজকের রাত এত বড়ো কেন? মনে হচ্ছে সময় থমকে আছে এক জায়গায়।
শ্রবণ বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। পাঞ্জাবি পাজামা নিয়ে প্রবেশ করল ওয়াশরুমে। গোসল সেরে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে নিল। নামাজ শেষে সোহা আর বাবুর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করল। দোয়া করতে করতে ফুঁপিয়ে উঠেছে আবার। উবু হয়ে বসে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল।
**********
ব্যাংকে এসে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে শ্রবণের মনে হচ্ছে পুরো আসমান তার মাথার উপর ভেঙে পড়েছে। একশ কোটি তো দূরের কথা, এক কোটি টাকাও একদিনের মধ্যে তুলতে পারবে না। ব্যাংক টু ব্যাংক ট্রান্সফার করা যাবে কিন্তু ক্যাশ টাকা হাতে পেতে সময় লাগবে।
কোনো ব্যাংক থেকেই এত টাকা এত দ্রুত উত্তোলন করা সম্ভব নয়। ব্যাংকে এত টাকা ক্যাশ রাখা হয় না। পুরো টাকা হাতে পেতে এক সপ্তাহ থেকে পনেরো দিনের মতো সময় লাগবে।
শ্রবণ ব্যাংক থেকে যে বের হবে সেটাও বোধহয় ভুলে গেছে। সামনের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। এখন কী হবে? এত টাকা কোথায় পাবে আগামীকালের মধ্যে? ব্যাংকে আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তাও কিছুটা হলেও আশা ছিল, এতটা ভয় লাগেনি এখন যতটা লাগছে। এখন কী হবে? কার কাছে গেলে টাকার ব্যবস্থা হবে?
ম্যানেজারের কথায় হুশ ফিরল শ্রবণের। যতগুলো টাকা তুলতে পারল তুলে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে আরেক ব্যাংকে গেল।
সারাদিন পাগলের মতো দৌড়ে দৌড়ে মাত্র দুই কোটি টাকার ব্যবস্থা করতে পারল শ্রবণ। আরো আটানব্বই কোটি টাকা জোগাড় করতে এখনো বাকি। বেচারা এতক্ষণে এসে একদম ভেঙে পড়েছে। তার পরিচিত এমন কেউ নেই যে তাকে এতগুলো টাকা দিতে পারবে।
এখন কী করবে কিচ্ছু মাথায় আসছে না। দিশেহারা হয়ে কেঁদে ফেলল বেচারা। কোথায় যাবে? কার কাছে গেলে টাকা পাবে?
কাঁদতে কাঁদতে শামীম রেজা চৌধুরীর কথা মাথায় এলো। এখন সেই শ্রবণের শেষ ভরসা।
ফোন হাতে নিয়ে দ্রুত কল করল দাদা ভাইয়ের ফোনে। রিসিভ হতেই জড়ানো গলায় দ্রুত বলল,
“দাদা ভাই, তোমার বড়ো ছেলে কোথায়?”
“আমার সামনেই সোফায় বসে আছে। তোমার কী হয়েছে? গলার স্বর এমন শোনাচ্ছে কেন?”
উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন সামাদ চৌধুরী। শ্রবণ বলল,
“আমার আটানব্বই কোটি টাকা ক্যাশ লাগবে, উনাকে বলো আগামীকাল দুপুরের মধ্যে আমাকে টাকাগুলো জোগাড় করে দিতে। পনেরো দিনের মধ্যে সব টাকা ফেরত দিয়ে দিবো আমি।”
শ্রবণের কথা শুনে বিস্ফোরিত হলেন বোধহয় সামাদ চৌধুরী। বিস্মিত হয়ে বললেন,
“এত টাকা দিয়ে কী করবে? কী হয়েছে তোমার? গলার স্বর এমন শোনাচ্ছে কেন?”
“টাকাগুলো আমার খুবই প্রয়োজন, কেন প্রয়োজন সেটা এখন বলতে পারব না। পরে সবকিছু বলব, এখন দয়া করে টাকাগুলো জোগাড় করে দিতে বলো।”
শামীম রেজা চৌধুরী বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কী হয়েছে? কী বলছে শ্রবণ? কীসের টাকার কথা বলছো?”
শ্রবণ বলল,
“টাকার কথা বাড়ির সবাইকে জানানোর প্রয়োজন নেই, শুধু তোমার বড়ো ছেলেকে বলবে। আমি সব টাকা ফেরত দিয়ে দিবো। ক্যাশ নিলে ক্যাশই দিবো, আর ব্যাংকে নিলে ব্যাংকেই দিবো। আগামীকাল সন্ধ্যার আগেই টাকাগুলো লাগবে আমার। রাখছি, সাবধানে থেকো।”
কল কে’টে দিলো শ্রবণ। সামাদ চৌধুরী এখনো বিস্মিত হয়ে আছেন। শ্রবণের এত টাকা কেন লাগবে? কী করবে এত টাকা দিয়ে? এত জরুরি প্রয়োজন কেন?
শামীম রেজা চৌধুরী বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন,
“কী বলল শ্রবণ? কীসের টাকা চাইছে?”
শ্রবণ কী বলল এটা জানার আগ্রহে বাড়ির সবাই সামাদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে আছে।
সামাদ চৌধুরী বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। নিজের রুমের দিকে পা বাড়িয়ে বললেন,
“শামীম, আমার রুমে এসো।”
শামীম রেজা চৌধুরী ছোটো ভাই আর বাড়ির সকলের মুখের দিকে তাকালেন। উনাকে আলাদা করে কেন ডাকছে?
বসা থেকে উঠে বাবার পেছন পেছন পা বাড়ালেন। রুমের ভেতরে এসে বললেন,
“আলাদা করে ডাকলে কেন?”
সামাদ চৌধুরী নিচু গলায় বললেন,
“শ্রবণ আটানব্বই কোটি ক্যাশ চাইছে।”
“কিহ!”
বাবার কথা শুনে ভীষন বিস্মিত হলেন শামীম রেজা চৌধুরী। সামাদ চৌধুরী বললেন,
“হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছো। টাকার ব্যবস্থা তোমাকে করে দিতে বলেছে। আগামীকাল দুপুরের মধ্যেই টাকাগুলো ওর লাগবে।”
“একদিনের মধ্যে এত টাকা আমি কোথায় পাব? ব্যাংক থেকে তুলতে গেলেও বেশ কিছুদিন সময় লাগবে।”
“ব্যাংক থেকে তুলতে সময় লাগবে বলেই বোধহয় তোমাকে জোগাড় করে দিতে বলেছে। পরে সব টাকা পরিশোধ করে দিবে বলল। ব্যাংকে নাও আর ক্যাশ নাও, যেভাবে নিবে সেভাবেই দিবে।”
“শ্রবণের ফোনে কল দাও।”
“কেন?”
“কথা বলব আমি, কল দাও।”
সামাদ চৌধুরী নাতির ফোনে কল করলেন। রিসিভ হতেই বললেন,
“তোমার আব্বু কথা বলবে তোমার সঙ্গে।”
“দাও।”
সামাদ চৌধুরী ফোন বড়ো ছেলের হাতে দিলেন।
“শ্রবণ।”
“হ্যাঁ, বলুন।”
“এত টাকা দিয়ে কী করবে?”
“লাগবে আমার।”
“কী কাজে লাগবে? আমার জানা মতে তোমার এমন কোনো কাজ নেই যেই কাজে এত টাকা লাগতে পারে। আর তোমার গলার স্বর এমন শোনাচ্ছে কেন? কেঁদেছো? কী হয়েছে?”
“সব প্রশ্নের উত্তর দুদিন পর দিবো, এখন টাকাগুলো জোগাড় করে দিন।”
“আমি এত টাকা ক্যাশ কোথায় পাব? আমি তো এত ক্যাশ রাখি না কাছে।”
“আপনার কাছে না থাকলে আপনার পরিচিত কারো কাছ থেকে এনে দিন। আপনার তো অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয়। আমি জানি আপনি জোগাড় করতে পারবেন। আগামীকাল সন্ধ্যার আগেই টাকাগুলো লাগবে আমার।”
“আচ্ছা, দেখছি আমি।”
“দেখছি না, দিতেই হবে।”
“যদি জোগাড় করতে না পারি তবে কীভাবে দিবো?”
“জানি না আমি, কীভাবে জোগাড় করবেন সেটা আপনি জানেন। রাখছি।”
কল কে’টে দিলো শ্রবণ। শামীম রেজা চৌধুরী বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আজ শ্রবণের গলার আওয়াজে আগের সেই চিরচেনা তেজি ভাবটা ছিল না। উনার সঙ্গে যথেষ্ট নরম গলায় কথা বলল। শ্রবণ কান্না করেছে এতে শিওর উনি। সামাদ চৌধুরী বললেন,
“টাকা জোগাড় করে দিবে?”
“দেখি করতে পারি কি-না। কেউ তো এত ক্যাশ রাখে না কাছে।”
“শ্রবণ হঠাৎ এত টাকা দিয়ে কী করবে?”
“টেনশন কোরো না তুমি, আমি দেখছি ব্যাপারটা।”
শামীম রেজা চৌধুরী বাবার রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে এলেন। তনিমা চৌধুরী উনার অপেক্ষাতেই ছিলেন। রুমে প্রবেশ করতেই বললেন,
“বাবা কী বললেন?”
শামীম রেজা চৌধুরী উত্তর দিলেন না। উনাকে
কাবার্ড থেকে ড্রেস বের করতে দেখে তনিমা চৌধুরী আবার বললেন,
“সন্ধ্যায় না বাড়িতে ফিরলে, এখন আবার কোথায় যাবে?”
“কাজ আছে।”
“কী কাজ? তোমার বড়ো ছেলে কীসের টাকার কথা বলল?”
শামীম রেজা চৌধুরী উত্তর না দিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করলেন। তনিমা চৌধুরী রাগে ফুঁসে উঠলেন। এই লোক এখন কেমন যেন হয়ে গেছে। উনার কোনো কথার গুরুত্ব দেন না, কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে চান না।
শামীম রেজা চৌধুরী তৈরি হয়ে রুম থেকে বের হলেন। নিচে নেমে আসতেই শাহীন রেজা চৌধুরী বললেন,
“ভাইয়া, কোথায় যাচ্ছো?”
“দরকার আছে, আসছি।”
কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বড়ো বড়ো কদমে বাইরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
শ্রবণের ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে উঠল। শ্রবণ দ্রুত পায়ে বেডরুম থেকে বেরিয়ে এগিয়ে এলো দরজার কাছে। পিপ হোল দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল শামীম রেজা চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। শ্রবণ দ্রুত দরজা খুলে দিলো তবে দরজার সামনে থেকে সরলো না। ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
“টাকা নিয়ে এসেছেন?”
“কী হয়েছে? তোমার এই হাল কেন?”
উদ্বিগ্ন শোনাল শামীম রেজা চৌধুরীর গলার স্বর। শ্রবণ বাবার কথার উত্তর না দিয়ে বলল,
“টাকা কোথায়? টাকা নিয়ে এসেছেন?”
“না। এত দ্রুত টাকা কোথায় পাব?”
“তাহলে এখানে এসেছেন কেন?”
“আগে আমাকে বলো এত টাকা তোমার কেন প্রয়োজন, তাও এত জরুরি ভিত্তিতে।”
“বলেছি তো পরে বলব।”
উত্তেজিত হয়ে উঠল শ্রবণ। শামীম রেজা চৌধুরী শান্ত কন্ঠে বললেন,
“সোহা কোথায়?”
সোহার নাম শুনতেই শ্রবণের চোখমুখ আরো শুকিয়ে গেল। শামীম রেজা চৌধুরী ছেলের অভিব্যক্তি পরখ করে বললেন,
“শ্রবণ, সোহা কোথায়?”
শ্রবণ শুকনো ঢোঁক গিলে বলল,
“আছে ভেতরেই।”
“ডাকো ওকে।”
“ওয়াশরুমে রয়েছে।”
“প্রথমবার তোমার ফ্ল্যাটে এলাম, ভেতরে ঢুকতে দিবে না নাকি?”
“না। আগে টাকা নিয়ে আসুন।”
শামীম রেজা চৌধুরী ছেলেকে ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। শ্রবণ ঠেলাঠেলি করেও বাবাকে ফ্ল্যাট থেকে বের করতে সক্ষম হলো না। শামীম রেজা চৌধুরী সোহার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ধুপধাপ পা ফেলে বেডরুমে চলে এলেন। বেডরুমে কেউ নেই। ফ্লোরে টাকার ছড়াছড়ি, শ্রবণ গুনছিল বোধহয়। সোহার কাপড়চোপড় এলোমেলো হয়ে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ওয়াশরুমের দরজা হাট করে খোলা। সোহার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ওয়াশরুমের লাইট অন করে ভেতরে উঁকি দিলেন।
বেডরুম থেকে ড্রয়িংরুমে ফিরে এলেন। শ্রবণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের পানি মুছছে। সবসময় পরিপাটি থাকা চুলগুলো ভীষণ অগোছাল। চোখমুখের বেহাল দশা। ছেলের কাছে এগিয়ে এসে বললেন,
“শ্রবণ, সোহা কোথায়? হঠাৎ এত ক্যাশ টাকার কেন প্রয়োজন হলো তোমার?”
শ্রবণ চোখ তুলে বাবার মুখের দিকে তাকাল। শামীম রেজা চৌধুরী বললেন,
“সোহার কিছু হয়েছে?”
শ্রবণ ফুঁপিয়ে উঠল। শামীম রেজা চৌধুরী শান্ত কন্ঠে বললেন,
“তুমি যখন এতগুলো টাকা চাইলে তাও আবার ক্যাশ তখনই কিছুটা সন্দেহ তৈরি হয়েছিল আমার। তোমার গলার স্বর শুনে প্রায় শিওর হয়ে গিয়েছিলাম। পুরোপুরি শিওর হওয়ার জন্যই এখানে এসেছি। সোহা কিডন্যাপ হয়েছে তাই না? মুক্তিপণ দেওয়ার জন্যই তুমি এত টাকা ক্যাশ চাইছো তাই তো?”
শ্রবণ মাথা নাড়ল। শামীম রেজা চৌধুরী বললেন,
“কবে ঘটেছে এই ঘটনা?”
শ্রবণ চোখের পানি মুছে কান্না জড়ানো গলায় বলল,
“আমি এত কিছু বলতে পারব না, টাকা এনে দিন আপনি।”
“টাকা দিলেই সোহাকে দিয়ে দিবে এটার কোনো শিওরিটি আছে? টাকা নেওয়ার পর তোমারও কোনো ক্ষতি করবে না এর গ্যারান্টি কী? পুলিশের সাহায্য ছাড়া—
শ্রবণ বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“পুলিশকে কিছু জানানো যাবে না। পুলিশ বা অন্য কাউকে কিছু বললে ওরা সোহাকে মে’রে ফেলবে। আপনি এখানে এসেছেন এটাও ওরা জেনে গেছে নিশ্চই। চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখছে আমাদের উপর। পুলিশ বা অন্য কাউকে কিচ্ছু জানানো যাবে না। ওরা বলেছে টাকা দিলে সোহাকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে দিবে। আপনি আমাকে টাকা এনে দিন, আমি সব টাকা কিছুদিন পর পরিশোধ করে দিবো।”
“আমি তোমাকে সবসময় বলেছি সঙ্গে গার্ড রাখতে, তুমি আমার কোনো কথা কোনোদিন শোনোনি, যদি শুনতে আজ এই দিন আসত না।”
শ্রবণ করুণ সুরে বলল,
“এর পর থেকে আপনার সব কথা শুনব। আপনি উঠতে বললে উঠব, বসতে বললে বসব, শুধু টাকার ব্যবস্থা করে দিন দয়া করে। সোহার ডেলিভারির সময় হয়ে আসছে। ওর আর বাবুর কিছু হলে আমি শেষ হয়ে যাব। দয়া করুন আমার উপর, টাকার ব্যবস্থা করে দিন।”
বুক চিতিয়ে সবসময় বাঘের মতো গর্জন করা ছেলেকে এভাবে ভঙ্গুর হয়ে যেতে আর ভয় পেতে দেখে শামীম রেজা চৌধুরী নিজেও যেন কেমন এলোমেলো হয়ে গেলেন। ছেলেকে আশ্বস্ত করে বললেন,
“টাকার ব্যবস্থা করে দিবো আমি, তুমি ভয় পেও না। একদম প্যানিক করবে না, তুমি শান্ত থাকো, আর একা একা ফ্ল্যাট থেকে বের হবে না, আমি টাকার ব্যবস্থা করছি।”
শামীম রেজা চৌধুরী ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে গেলেন। শ্রবণ দরজা লাগিয়ে দিয়ে বেডরুমে ফিরে এসে টাকাগুলো গুছিয়ে নিল। কিছুটা হলেও সাহস পাচ্ছে এখন।
**********
কিছুক্ষণ পরেই আসরের আজান হবে।
শ্রবণ চৌধুরী বাড়িতে এলো। আসার পথে বেশ কয়েকবার বাবার ফোনে কল করেছে, ফোন বন্ধ বলছে। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে গলা ছেড়ে আব্বু আব্বু বলে ডাকতে শুরু করল। তার ডাক শুনে বাড়ির সবাই ড্রয়িংরুমে এসে উপস্থিত হলো কিছু মুহূর্তেই। শ্রবণ শামীম রেজা চৌধুরীকে আব্বু বলে ডাকছে এটা কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না। লাস্ট কবে আব্বু বলে ডেকেছে কারো মনে নেই। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে সবাই তার দিকে।
দাদা ভাইকে দেখে শ্রবণ ছুটে এসে তার সামনে দাঁড়াল। উত্তেজিত হয়ে বলল,
“দাদা ভাই, আব্বু কোথায়? কোথায় গেছে আব্বু?”
“শামীম তো সকাল থেকেই বাড়িতে নেই।”
ছুটে স্পর্শের কাছে এসে দাঁড়াল। তাকে ধরে বলল,
“স্পর্শ, আব্বু কোথায় গেছে? আব্বুর ফোনে কল ঢুকছে না কেন?”
“কী হয়েছে? তুমি এমন করছো কেন?”
“আমি আব্বুর সঙ্গে কথা বলব, আব্বুর সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দাও।”
স্পর্শ দৌড়ে গিয়ে নিজের রুম থেকে ফোন নিয়ে এলো। বড়ো ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“আব্বুর ফোনে তো কল ঢুকছে না।”
“আব্বুর ড্রাইভারের ফোনে কল করো তাহলে।”
ড্রাইভারের কথা ভুলেই গিয়েছিল শ্রবণ। স্পর্শ বাবার ড্রাইভারের ফোনে কল করল। বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ড্রাইভারের ফোন বিজি।”
শ্রবণ নিজের মাথার চুল খামচে ধরল। দুদিন ধরে প্রায় না খাওয়া রয়েছে, শরীর ভীষণ দূর্বল হয়ে পড়েছে, তার উপর এত মানসিক প্রেশার। খুব খারাপ লাগছে।
“ভাইয়া, কী হয়েছে? আব্বুকে খুঁজছো কেন? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?”
সামাদ চৌধুরী বড়ো নাতির হাত ধরে বললেন,
“দাদু ভাই, বসো তুমি। সারাদিন খাওনি কিছু? চোখমুখ এমন হয়ে গেছে কেন?”
“আব্বু কোথায় গেছে? ফোন বন্ধ কেন? আমি আব্বুর সঙ্গে কথা বলব।”
শ্রবণ দুই হাতে মুখ ঢেকে পাগলের মতো একই কথা বারবার বলতে লাগল বিড়বিড় করে। তার অবস্থা দেখে বুঝাই যাচ্ছে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে আবার।
বাড়ির সবাই বিস্মিত হয়ে শ্রবণের দিকে তাকিয়ে আছে। সামাদ চৌধুরীর হঠাৎ সোহার কথা স্মরণ হলো। গত দুদিন ধরে সোহার সঙ্গে কথা হয়নি, তার উপর শ্রবণ এতগুলো টাকা চাইছে, আবার এমন অদ্ভুত আচরণ করছে।
উনি সোহার কথা জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিলেন এর মধ্যে শামীম রেজা চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলেন। বাবাকে দেখে স্পর্শ বলল,
“আব্বু, কোথায় গিয়েছিলে? ভাইয়া তোমাকে খুঁজছে।”
শামীম রেজা চৌধুরী সোফায় বসে থাকা বড়ো ছেলের দিকে তাকালেন, এবং দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন কাছে। ছেলের এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে ডাকলেন,
“শ্রবণ।”
শ্রবণ ফট করে মুখ তুলে তাকাল। বাবাকে দেখেই একপ্রকার লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সোফা ছেড়ে। বাবার এক হাত দুই হাতে মুঠো করে ধরে পাগলের মতো বলতে শুরু করল,
“আব্বু, কোথায় গিয়েছিলেন আপনি? আপনার ফোন বন্ধ কেন? টাকার ব্যবস্থা হয়েছে?”
শামীম রেজা চৌধুরী ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলেন,
“তুমি শান্ত হও আগে। এমন করছো কেন? পাঁচ কোটি কম আছে—
বাবাকে বাকি কথা বলতে না দিয়েই শ্রবণ বলল,
“আমার বাড়ি, গাড়ি, টাকা-পয়সা সব দিয়ে দিবো আপনাকে। আমার নামের বিজনেসের শেয়ারও আপনার নামে লিখে দিবো আমি, শুধু আমার সোহাকে এনে দিন। আমার বউ-বাচ্চাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। বুদ্ধি হওয়ার পর আমি আপনার কাছে কোনোদিন কিছু চাইনি, আর কোনোদিন চাইবোও না। শেষ বারের মতো শুধু আমার বউ-বাচ্চাকে চাইছি, ওদের সুস্থভাবে এনে দিন আমার কাছে।”
“এনে দিবো তো, শান্ত হও তুমি। পুরো টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে আধা ঘণ্টার মধ্যে। তুমি শান্ত হও।”
“কীভাবে শান্ত হবো? আমার সোহা আমার কাছে নেই দুদিন ধরে। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারছি না, আব্বু। আমার সোহাকে এনে দিন আমার কাছে।”
উদভ্রান্তের ন্যায় কথাগুলো বলতে বলতে বাবার পা ধরার জন্য উদ্যত হলো শ্রবণ। শামীম রেজা চৌধুরী ছেলেকে থামিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন শক্ত করে। সান্তনা দিয়ে বললেন,
“আর একটু ধৈর্য ধরো, আব্বু। পুরো টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে কিছু সময়ের মধ্যেই। সোহার আর বাবুর কিছু হবে না। তুমি নিজেকে শক্ত রাখো।”
শ্রবণ বাবাকে জড়িয়ে ধরে আব্বু ডেকেই কেঁদে উঠল শব্দ করে। আর ধৈর্য ধরতে পারছে না সে। দুদিন ধরে সোহাকে দেখে না, কথা হয় না। কেমন আছে তার বউ-বাচ্চা?
বাবা ছেলের কথা শুনে বাড়ির বাকি সদস্যরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে। কী হয়েছে সোহার? সোহা কোথায় আছে দুদিন ধরে? কীসের পুরো টাকা?
অনিমা চৌধুরী দ্রুত পায়ে দুজনের কাছে এগিয়ে এসে আতঙ্কিত হয়ে বললেন,
“ভাইয়া, সোহা কোথায়? কী হয়েছে আমার মেয়ের?”
সামাদ চৌধুরী বললেন,
“শামীম, সোহা কোনো বিপদে রয়েছে? শ্রবণ এমন করছে কেন?”
শামীম রেজা চৌধুরী বললেন,
“সোহা কিডন্যাপ হয়েছে, মুক্তিপণ হিসেবে চেয়েছে একশ কোটি টাকা। টাকার ব্যবস্থা হয়ে গেছে, কিছু টাকা কম আছে, সেটাও চলে আসবে কিছু সময়ের মধ্যেই।”
অনিমা চৌধুরী ধপাস করে বসে পড়লেন সোফায়। দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
সামাদ চৌধুরীও নিজেকে সামলাতে না পেরে সোফায় বসে পড়লেন। তনিমা চৌধুরী, স্পর্শ আর সিয়াম শকড হয়ে তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে।
শামীম রেজা চৌধুরী বড়ো ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন,
“আব্বু, কিছু খেয়েছো তুমি?”
শ্রবণ বাবাকে জড়িয়ে ধরে রেখেই দুদিকে মাথা নাড়ল।
“না খেয়ে থাকলে তো তুমিই অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
“সোহাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর পানি ছাড়া কিচ্ছু খাইনি আমি।”
শামীম রেজা চৌধুরী ছোটো ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“স্পর্শ, তোমার ভাইয়ার জন্য খাবার বেড়ে নিয়ে এসো।”
শ্রবণ বাবাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
“আমি খাব না, আমার সোহাকে ছাড়া আমি খাব না। আমার সোহাকে এনে দিন আগে।”
“হ্যাঁ, এনে দিবো তো, আব্বু। বাকি টাকা আসতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগবে, ততক্ষণে তুমি খেয়ে নাও। না খেলে শক্তি পাবে কোথায়? দেখো কত দূর্বল হয়ে পড়েছো, তোমার পুরো শরীর কীভাবে থরথর করে কাঁপছে!”
স্পর্শ খাবার আনার জন্য রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। শামীম রেজা চৌধুরী ছেলেকে সোফায় বসিয়ে নিজেও বসলেন পাশে। শ্রবণ বাবার এক হাত মুঠো করে ধরে আবার বলল,
“সোহাকে সুস্থভাবে ফিরে পাব তো তাই না, আব্বু?”
“হ্যাঁ। কিছু হবে না সোহার।”
“আমি আর কোনোদিন সোহার হাত ছেড়ে এক ইঞ্চি দূরে সরবো না। সোহাকে নিয়ে বাইরেই বের হবো না আর।”
“ঠিক আছে, শান্ত হও এখন।”
শ্রবণ মাথা নিচু করে হেঁচকি তুলতে লাগল ছোটো বাচ্চাদের মতন। শামীম রেজা চৌধুরী ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কতগুলো বছর পর তার ছেলে তাকে আব্বু বলে ডাকছে আজ।
স্পর্শ খাবার বেড়ে নিয়ে এলো। শামীম রেজা চৌধুরী হাত ধুয়ে নিজ হাতে বড়ো ছেলেকে খাইয়ে দিতে শুরু করলেন। শ্রবণও বিনা বাক্যে খাওয়া শুরু করল। তার ভীষণ খিদে পেয়েছে। বাবার উপর জমে থাকা সকল রাগ, ক্ষোভ, অভিমান কোথায় যেন গায়েব হয়ে গেছে আজ।
চলবে……..
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ৫৫
-
দিশেহারা পর্ব ৪৭
-
দিশেহারা পর্ব ১১
-
দিশেহারা পর্ব ২১
-
দিশেহারা পর্ব ২৯
-
দিশেহারা পর্ব ৪৩
-
দিশেহারা পর্ব ৪৬
-
দিশেহারা পর্ব ৪৪