দিশেহারা (৬৮)
সানা_শেখ
ঈদের নামাজ আদায় করে ফ্ল্যাটে ফিরল শ্রবণ। বেডরুমে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল। শ্রবণের আগমন টের পেয়ে সোহা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল তার দিকে। শ্রবণ হাতের জায়নামাজ বিছানার উপর ছুঁড়ে দিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে এগিয়ে এলো সোহার কাছে। বিনা বাক্যে আলিঙ্গন করল প্রিয়তমাকে। সোহা নিজেও জড়িয়ে ধরল শ্রবণকে। কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হলো দুজনের নীরবতায়। শ্রবণ সোহার এলোমেলো চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে বলল,
“দারুণ লাগছে তোকে।”
সোহা শ্রবণের বুক থেকে মুখ তুলে তাকাল। চোখে চোখ রেখে বলল,
“তোমাকেও দারুণ লাগছে।”
শ্রবণ সোহাকে পাঁজা কোলে তুলে নিল। ভয় পেয়ে সোহা শক্ত করে ধরল শ্রবণের গলা। শ্রবণ সোহাকে নিয়ে ঘুরতে শুরু করল। সোহার শাড়ির আঁচল, এলোমেলো চুল বাতাসে উড়তে লাগল। শ্রবণকে থামানোর জন্য ব্যস্ত কন্ঠে বলল,
“কী করছো! থামো, বমি চলে আসবে।”
শ্রবণ থামল তবে সোহাকে কোল থেকে নামাল না। সোহা নিজের হাত দুটোর তালু দেখিয়ে বলল,
“এগুলো কী আঁকেছো? কেমন লাগছে!”
শ্রবণ গম্ভীর গলায় বলল,
“দারুন লাগছে।”
“দারুন লাগছে? এগুলো কী ডিজাইন? না ফুল হয়েছে আর না তো জিলাপী হয়েছে। এমন অদ্ভুতভাবে কে মেহেদি দিয়ে দেয় হাতে?”
শ্রবণ আগের চেয়েও গম্ভীর গলায় বলল,
“দিয়ে দিয়েছি সেটাই তো বেশি, তুই আর কত সুন্দর চাইছিস? উপরের দুই পিঠে যে কত সুন্দর করে দিয়ে দিয়েছি সেটা চোখে পড়ছে না?”
“অ্যাহ! স্টিকার লাগিয়ে তারপর মেহেদি দিয়ে ল্যাটাপ্যাটা করে দিয়ে দিয়েছে শুধু।”
“যেভাবেই দিই, দিয়েছি তো।”
“কালার কিন্তু সুন্দর হয়েছে, তাই না?”
“দেখতে হবে না কে দিয়ে দিয়েছে!
“আমার সালামি দাও।”
“কীসের সালামি?”
“কীসের সালামি মানে? ঈদ সালামি। আজকে ঈদ না? ঈদের সালামি দিবে। এখন তাড়াতাড়ি টাকা বের করো।”
“টাকা দিয়ে তুই কী করবি?”
“জামাইকে নিয়ে ঘুরতে যাব।”
“আর?”
“দুজন মিলে ফুচকা খাব।”
“ছিহ! ওই জঘন্য খাবার আমি খাই না।”
“কাহিনী বাদ দিয়ে সালামি দাও।”
“টাকা নেই।”
“কিহ! তোমার কাছে টাকা নেই?”
“টাকা নিয়ে কী আমি শুয়ে থাকি? ক্যাশ টাকা থাকে আমার কাছে? অল্প কিছু টাকা আছে ওয়ালেটে।”
“যেই কয় টাকা আছে—সেই কয় টাকাই দাও। টাকা না দিলে কোল থেকে নামবো না।”
“শক্ত করে গলা ধর।”
সোহা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শ্রবণের গলা। শ্রবণ এক হাতে সোহাকে ধরে রেখে অন্য হাত দিয়ে দ্রুত ওয়ালেট বের করল পাঞ্জাবির পকেট থেকে।
“নে, ধর।”
সোহা ওয়ালেট হাতে নিয়ে ভেতর থেকে টাকা বের করল। তিন হাজার পাঁচশ আশি টাকা। সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“অল্প কোথায়? অনেক টাকাই তো।”
“অনেক টাকা? তুই এক দমে যত পর্যন্ত গুনতে পারবি তত হাজার দিব।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে গুনি?”
“এখন না, পরে।”
শ্রবণ রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াল দরজার দিকে। সোহা কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করে বলল,
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? নামাও, চুল তো বাঁধলাম না।”
“আর চুল বাঁধতে হবে না, এলোমেলো চুলেই বেশি সুন্দর লাগছে।”
কথাগুলো বলতে বলতে সোহাকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল। পা দিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসাল সোহাকে। শ্রবণ একটা প্লেটে খাবার বাড়তে বাড়তে বলল,
“আন্টি চলে গেছেন?”
“হ্যাঁ।”
খাবার বেড়ে হাত ধুয়ে নিজেও একটা চেয়ার টেনে বসল। পোলাও মাংস সোহার মুখের সামনে তুলে ধরে বলল,
“হাঁ কর।”
“তুমি আগে খাও।”
“খাব, তুই হাঁ কর আগে।”
সোহা আর কোনো কথা না বলে হাঁ করল। শ্রবণ তার মুখে পুরে দিয়ে নিজের মুখে পুরল।
পুনরায় সোহার মুখে তুলে দিতে দিতে বলল,
“খেয়ে ওই বাড়িতে যাব।”
“আমিও?”
“হুম।”
আনন্দে সোহার চোখ-মুখ চকচকে হয়ে উঠল। সকাল থেকে ভীষণ মন খারাপ লাগছিল বাড়ির কাউকে দেখতে পাবে না বলে। আব্বু-আম্মুকেও খুব মনে পড়ছিল।
দুজনের খাওয়া শেষে শ্রবণ বাকি সব খাবার ঢেকে রাখল। বেডরুমের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
“শাড়ি পরেই যাবি?”
সোহা দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
“না। নতুন জামা এনেছো না, ওখান থেকেই একটা পরে যাব।”
“শাড়িতে কিন্তু বেশি সুন্দর লাগছে।”
“শাড়ি বেশিক্ষণ সামলাতে পারব না।”
“আচ্ছা, তোর যেটা ভালো লাগে।”
সোহা কাবার্ড থেকে একটা সাদা রঙের জামা বের করল। ঈদ উপলক্ষে শ্রবণ যতগুলো জামা এনে দিয়েছে—সবগুলোর মধ্যে এই সাদা রঙের জামাটা বেশি পছন্দ হয়েছে। জামা তো এনেছেই, সঙ্গে দুটো শাড়িও এনেছে, একটা লাল টকটকে, আরেকটা গাঢ় নীল। নীল রঙের শাড়িটাই পরেছে সোহা।
শাড়ি চেঞ্জ করে জামাটা পরে এলো ওয়াশরুম থেকে। এলোমেলো শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট বিছানার উপর রেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে চুল আঁচড়াতে শুরু করল। তার ইচ্ছে করছে এভাবেই বাড়িতে চলে যেতে।
শ্রবণ সোহার শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট ভাঁজ করল। সটান দাঁড়িয়ে সোহাকে দেখতে লাগল আবার। সোহা ফাইভ জি গতিতে রেডি হলো। জুতোজোড়া বের করে পরে বলল,
“হয়ে গেছে আমার।”
শ্রবণ এগিয়ে এসে গাড়ির চাবি হাতে নিল। নিজেকে একবার আয়নায় দেখে নিয়ে বলল,
“চল।”
সোহা নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে শ্রবণের হাত ধরে এগোল দরজার দিকে।
শ্রবণের গাড়ি এসে দাঁড়াল গেইটের সামনে। শ্রবণের গাড়ি দেখে দারোয়ান দ্রুত গেইট খুলে দিলো।
শাহীন রেজা চৌধুরী বাড়ির বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। শ্রবণের গাড়ি দেখে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন কাছে। গাড়ির দরজা খুলে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো দুজন। বাবাকে দেখে সোহা খুশিতে জড়িয়ে ধরল ‘আব্বু’ ডেকে। শাহীন রেজা চৌধুরী নিজেও জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে। পুরো সারপ্রাইজড হয়ে গিয়েছেন। ভাবেননি শ্রবণ সোহাকে নিয়ে আজ আসবে। উনি তো ভাবছিলেন কিছুক্ষণ পর শ্রবণের ফ্ল্যাটে যাবেন মেয়েকে দেখতে।
“কেমন আছো, আব্বু?”
“ভালো, তুই কেমন আছিস?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
শাহীন রেজা চৌধুরী শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কেমন আছো, শ্রবণ?”
শ্রবণ গম্ভীর গলায় বলল,
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“ভেতরে চলো তোমরা।”
শ্রবণ সোহার হাত ধরে ভেতরের দিকে পা বাড়াল। দুজনের পেছন পেছন শাহীন রেজা চৌধুরী নিজেও পা বাড়ালেন।
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে সকলের দেখা পেল শ্রবণ আর সোহা। সবাই ড্রয়িংরুমেই উপস্থিত রয়েছে। শ্রবণকে দেখে অনিমা চৌধুরী আর তনিমা চৌধুরীর হাসি হাসি মুখ চুপসে গেল। ভয়ে যেন কেমন জড়সড়ো হয়ে গেলেন দুই বোন। দুজনের এমন রিঅ্যাকশন দেখে শ্রবণ মনে মনে পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করল। শামীম রেজা চৌধুরী বড়ো ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কেমন আছো, শ্রবণ?”
শ্রবণ উত্তর দিলো না। সোহা সকলের সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলল। অনিমা চৌধুরী মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন অপলক দৃষ্টিতে। সোহাকে ভীষণ খুশি খুশি লাগছে, হয়তো এতদিন পর নিজের পরিবারের কাছে আসতে পেরেছে সেজন্যই। দেখতেও আগের চেয়ে বেশি সুন্দর লাগছে। বড়োও লাগছে আগের চেয়ে। সোহার পরনে সাদা জামা, শ্রবণের পরনে সাদা পাঞ্জাবি পাজামা।
শ্রবণ সোহাকে নিয়ে বসল সোফায়। স্পর্শ এসে বড়ো ভাইয়ের পাশে বসল, বলল,
“ভাইয়া, আজকে কিন্তু তোমরা থাকবে এই বাড়িতে।”
শ্রবণ ছোটো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল তবে বলল না কিছু। সামাদ চৌধুরী বড়ো নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“শ্রবণ, নাশতা করতে চলো।”
“আমরা নাশতা সেরে এসেছি, দাদা ভাই।”
“অল্প খাবে আমাদের সঙ্গে, চলো।”
সোহা বলল,
“আমি কিছু খাব না এখন। ঠেসে ঠেসে অনেক খাইয়ে দিয়েছে আজ, আরো খেলে পেট ফেটে যাবে।”
সকলের দৃষ্টি এসে পড়ল দুজনের উপর। সকলকে এভাবে তাকাতে দেখে সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকাল। মৃদু স্বরে বলল,
“সবাই এভাবে তাকাচ্ছে কেন?”
শ্রবণ গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি কীভাবে বলব? সকলকে জিজ্ঞেস কর।”
সোহা বাবার মুখের দিকে তাকাল। শাহীন রেজা চৌধুরী বললেন,
“কে খাইয়ে দিয়েছে তোকে?”
সোহা আঙুল তুলে শ্রবণকে দেখাল। সিয়াম, স্পর্শ আর সামাদ চৌধুরী বাদে বাকি চারজনের চোখজোড়া অস্বাভাবিক বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। শ্রবণ চৌধুরী সোহাকে খাইয়ে দিয়েছে! আসলেই?
শ্রবণের ফোন বেজে উঠল। হাসানের কল। রিসিভ করে কানে ধরে বলল,
“বল।”
“বের হবি না আজ?”
“না। বাড়িতে এসেছি।”
“কখন গেলি?”
“একটু আগেই।”
“ওহ আচ্ছা, থাক তাহলে; রাখলাম।”
“হুম।”
কল কে’টে গেল। শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“রুমে চল।”
সোহা মিনমিন করে বলল,
“আমি থাকি এখানে?”
শ্রবণ সোহার হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। অনিমা চৌধুরী আর তনিমা চৌধুরীর দিকে একবার তাকিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। যেন নীরবে হুমকি দিয়ে গেল দুজনকে।
শ্রবণ চোখের আড়ালে চলে যেতেই অনিমা চৌধুরী মেয়ের পাশে এসে বসলেন। মেয়ের গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বললেন,
“কেমন আছিস, সোহা?”
সোহা মৃদু হেসে বলল,
“খুব ভালো।”
“আম্মুর উপর এখনো রেগে আছিস?”
সোহা কথা না বলে তাকিয়ে রইল। শামীম রেজা চৌধুরী বললেন,
“সোহা, বাবু কেমন আছে?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
“শ্রবণের মানসিক অবস্থা?”
“আগের চেয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে। এখন আর আগের মতো হুটহাট রেগে যায় না, চিৎকার করে না। অনেক শান্ত হয়ে গেছে। বেশি রাত জাগে না, ঠিক মতো ঘুমায়।”
শামীম রেজা চৌধুরী আর কিছু বললেন না। অনিমা চৌধুরী এটা সেটা জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন মেয়েকে। সোহা কিছু কথার উত্তর দিচ্ছে আবার কিছু কথার উত্তর দিচ্ছে না।
**********
আসরের নামাজ আদায় করে দাদা আর ভাইদের সঙ্গে বাড়িতে প্রবেশ করল শ্রবণ। শ্রবণকে দেখেই তনিমা চৌধুরী সোহার পাশ থেকে উঠে গেলেন। শ্রবণ সোজা হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।
স্পর্শ সোফার কাছে এগিয়ে এসে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। এত ভয়? তনিমা চৌধুরীর চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল শ্রবণকে নয়, যেন জ্যান্ত বাঘ দেখেছে নিজের সামনে।
শ্রবণ চেঞ্জ করে নিচে নেমে এলো। সোহার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“খেতে হবে না?”
“ইচ্ছে করছে না।”
“ইচ্ছে না করলেও খেতে হবে।”
“সন্ধ্যার পর খাব।”
“না। এখনই খাবি। মেইড।”
একজন মেইড ছুটে এলো রান্নাঘর থেকে।
“জি, স্যার।”
“কী রান্না হয়েছে?”
“স্যার, রাতের রান্নার প্রস্তুতি চলছে।”
“তাহলে সোহা কী খাবে এখন?”
“স্যার, বলুন কী করতে হবে। এখনই করে দিচ্ছি।”
“রান্নাঘর খালি করুন।”
“জি, স্যার?”
“রান্নাঘরে কে কে আছে, বের হতে বলুন।”
“জি, স্যার।”
মেইড চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই বিস্ময় নিয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তনিমা চৌধুরী মনে মনে ভয় পাচ্ছেন। এই ছেলে এখন না উনাকেই রান্না করতে পাঠায়। এই অনিমাটা নিচে আসছে না কেন এখনো?
মেইড তিনজন রান্নাঘর খালি করে বেরিয়ে এলো। শ্রবণ পা বাড়াল রান্নাঘরের দিকে। সামাদ চৌধুরী পিছু ডেকে বললেন,
“দাদু ভাই, তুমি রান্নাঘরে যাচ্ছো কেন?”
শ্রবণ পিছু ফিরে বলল,
“রান্না করতে।”
ছেলের কথা শুনে শামীম রেজা চৌধুরীর চোখজোড়া কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শ্রবণ করবে রান্না! সিরিয়াসলি?
শাহীন রেজা চৌধুরী বললেন,
“শ্রবণ, তুমি রান্না করতে পারো?”
শ্রবণ পিছু না ফিরেই গম্ভীর গলায় বলল,
“অবশ্যই।”
শাহীন রেজা চৌধুরী মেয়ের দিকে তাকালেন। বিস্ময় নিয়ে বললেন,
“সোহা, শ্রবণ সত্যিই রান্না করতে পারে?”
সোহা মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ। এর আগে অনেকবার রান্না করেছে। রোজার মাস বেশির ভাগ দিন ও-ই সেহেরি রান্না করেছে। আন্টির সঙ্গে মিলে ইফতারও রেডি করেছে।”
“কী বলছিস এসব? শ্রবণ এসব করেছে?”
“আরো অনেক কিছুই করেছে—যা তোমাদের কল্পনারও বাইরে।”
সিয়াম আর স্পর্শ রান্নাঘরে এলো। ভাইয়ের পাশে দাঁড়াল দুজন। স্পর্শ বলল,
“ভাইয়া, কী রান্না করবে?”
শ্রবণ ডালিমের দানা বের করতে করতে বলল,
“রান্না একটু পর করব।”
“কী কী করবে বলো, আমরাও সাহায্য করি।”
শ্রবণ ছোটো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল। সিয়াম ভীষণ এক্সসাইটেড হয়ে বলল,
“ভাইয়া, আজকে তোমার হাতের রান্না খাব।”
“আচ্ছা।”
স্পর্শ বলল,
“ভাইয়া, বলো না কী কী রান্না করবে!”
“তোমরা কী কী খেতে চাও?”
“আমি তোমার হাতের গরুর মাংস ভুনা খাব।”
সিয়াম বলল,
“আমি কাচ্চি বিরিয়ানি খাব।”
স্পর্শ বলল,
“দুপুরে না বিরিয়ানি খেলি?”
“তো কী হয়েছে? ভাইয়ার রান্না তো খাইনি।”
শ্রবণ বলল,
“মাংস, বিরিয়ানি, পোলাও অনেক খাওয়া হয়েছে আজ। রাতে শাক ভাজি, করলা ভাজি, মুসুর ডাল আর ভাত খাবি।”
ছোটো দুই ভাই একসঙ্গে বলে উঠল,
“অ্যাহ!”
শ্রবণ আপেল কা’টতে কা’টতে বলল,
“হ্যাঁ।”
সিয়ামের হাতের ধাক্কা লেগে চিংড়ি মাছের বাটি নিচে পড়ে গেল। স্পর্শ পেছাতে গিয়ে হাতের ধাক্কায় আটার ডিব্বা ফেলে দিলো চিংড়ি মাছের উপর। দুজনের কান্ডকারখানা দেখে শ্রবণ বলল,
“গুড জব।”
স্পর্শ আর সিয়াম একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। কী থেকে কী হলো! ওরা তো কিছুই করল না। এখানে আটার ডিব্বা রেখেছে কেন? তাও আবার মুখ খুলে? সিয়াম তো শুধু হাতের উপর ভর করে দাঁড়াতে নিয়েছিল, বাটিটা কীভাবে পড়ল? সে তো বাটি ধরেইনি।
শ্রবণ ফলমূল কা’টা শেষ করে বাটি নিয়ে রান্নাঘর থেকে বের হতে হতে বলল,
“এগুলো আগে পরিষ্কার কর, এই নোংড়া রান্নাঘরে আমি রান্না করব না।”
ছোটো দুই ভাই অসহায়ের মতো একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল বড়ো ভাইয়ের কথা শুনে।
**********
সময় থেমে নেই, গড়িয়ে গেছে অনেকগুলো দিন।
শ্রবণ সোহাকে নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়েছে সন্ধ্যার পর পর। সোহাকে নিয়ে পার্কে হাঁটতে এসেছিল, সঙ্গে কিছু সুন্দর মুহূর্তও কা’টাল। সোহা প্রথমে আসতে চাইছিল না, কিন্তু আসার পর থেকে বেশ ভালো লাগছে।
শ্রবণের হাত ধরে বের হলো পার্কের ভেতর থেকে। উতপ্ত প্রকৃতি আজ বেশ শীতল। হিমেল হাওয়া বইছে, আকাশে ইয়া বড়ো রূপালী চাঁদ আলো ছড়াচ্ছে।
গাড়ি নিয়ে মেইন রোডে উঠতেই সোহার নজর পড়ল একটা ছেলের দিকে। ফুল হাতে পার্কের দিকে এগিয়ে আসছে। সোহা শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওই যে দেখো ফুল।”
শ্রবণ তাকাল ছেলেটার দিকে। গাড়ি থামাল রাস্তার কিনারে। সিট বেল্ট খুলতে খুলতে বলল,
“তুই বসে থাক, আমি নিয়ে আসছি।”
সোহা বসে রইল, শ্রবণ নেমে এগিয়ে গেল ছেলেটার কাছে।
শ্রবণের আসতে দেরি হচ্ছে দেখে সোহা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। রাস্তায় তেমন একটা যানবাহনের চলাচল নেই। এসে দাঁড়াল গাড়ির পেছনে।
শ্রবণ ছেলেটার কাছ থেকে সবগুলো ফুল কিনে নিল। ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে দিতেই কানে ভেসে এলো সোহার চিৎকার,
“শ্রবণ—
সঙ্গে সঙ্গেই পেছন ফিরে তাকাল শ্রবণ। সোহাকে টেনে হিঁচড়ে একটা মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হলো শ্রবণের চোখের সামনেই। শ্রবণ গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল সোহার নাম ধরে। হিংস্র চিতার ন্যায় ছুটে এলো গাড়িটার দিকে। ততক্ষণে গাড়ি ছুটে চলেছে দ্রুত গতিতে। শ্রবণ হুশ জ্ঞান হারিয়ে সোহার নাম ধরে চিৎকার করতে করতে গাড়ির পেছনে ছুটল তবে নাগাল পেল না। মুহূর্তেই অনেকটা দূরে চলে গেছে গাড়িটা।
চলবে………..
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ২৮
-
দিশেহারা পর্ব ৪৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১৭ (অন্তিম)
-
দিশেহারা পর্ব ৪১
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ৫৯
-
দিশেহারা পর্ব ৫১
-
দিশেহারা পর্ব ৩৬
-
দিশেহারা পর্ব ২২