Golpo romantic golpo দিশেহারা

দিশেহারা পর্ব ৬১


দিশেহারা (৬১)

সানা_শেখ

রান্নাঘরে এসে দেখে সোহা দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা শান্ত হয়ে বলে,

“সোহা, কী হয়েছে? চিৎকার করছিস কেন এভাবে?”

সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। সোহার উঁচু করে রাখা ডান হাতের দিকে নজর পড়ল শ্রবণের। হাতের উল্টো পিঠে শিং মাছ আটকে আছে। সোহা এখনো চিৎকার করছে। শ্রবণ ছুটে এলো সোহার কাছে। হাতটা ধরে টেনে বের করল মাছের কাঁ’টা। ব্যথায় আরো বেশি ককিয়ে উঠল সোহা, বাম হাতে শক্ত করে চেপে ধরল শ্রবণের হাত। ডান হাতের ক্ষত স্থান থেকে তাজা র’ক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। শ্রবণ মাছটাকে একটা আছাড় মা’রল।

“হাতে কাঁ’টা ঢুকল কীভাবে?”

সোহা হাতটা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে,

“মাছ কা’টার জন্য ধরেছি অমনি কাঁ’টা ঢুকিয়ে দিলো।”

“অনেক ব্যথা করছে?”

“হ্যাঁ।”

শ্রবণ সোহাকে ধরে সিঙ্কের কাছে নিয়ে আসে। হাতটা ভালোভাবে ধুয়ে দিলো নিজেই। সোহা ব্যথায় কান্না করছে আর বারবার শ্রবণের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
র’ক্ত বন্ধ হচ্ছে না, ক্ষতও বেশ গভীর হয়েছে। কাঁ’টা অনেকটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
শ্রবণ ফ্লোরের দিকে তাকায়, মাছটা ম’রে পড়ে আছে। যেই জোরে আছাড়টা মা’রল, বেঁচে থাকার কথাও না। ফ্লোরে একটা সসপ্যান পড়ে আছে, তখন এটা পড়ারই শব্দ পেয়েছিল। যা ভয় পেয়েছিল, ভেবেছিল সোহা পা পিছলে পড়ে গেছে।

ক্ষত স্থান চেপে ধরে রেখে সোহাকে নিয়ে বেডরুমে আসলো শ্রবণ। সোহা শ্রবণের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আবার ঝাঁকাতে শুরু করে ব্যথায়। র’ক্ত ছিটকে ছিটকে ফ্লোরে আর বিছানার চাদরে পড়ছে।
শ্রবণ ফাস্ট এইড বক্স এনে ভেতর থেকে এন্টিসেপ্টিক আর তুলো বের করে। তুলোয় এন্টিসেপ্টিক লাগিয়ে সোহার হাতের ক্ষত স্থানে চেপে ধরে। সোহা চেঁচিয়ে উঠে বলে,

“ছাড়ো ছাড়ো, ব্যথা করছে। আআআআ, ছাড়ো।”

শ্রবণ ছাড়ে না। সোহার পাশে বসে শক্ত করে ধরে রাখে হাতটা। সোহা বাচ্চাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলে,

“আল্লাহ গো, কী ব্যথা করছে! ছাড়ছ না কেন? ছাড়ো।”

সোহার এমন কথা শুনে আর কান্না দেখেও শ্রবণ হাতটা ছাড়ছে না। যেভাবে র’ক্ত পড়ছে, বন্ধ না করলে অনেক র’ক্ত বেরিয়ে যাবে।
সোহার মনে হচ্ছে ওর হাতে মাছের কাঁ’টা বিঁধেনি, ওর হাতটাই কে’টে ফেলা হয়েছে। হাতের ব্যথায় চেহারা লাল হয়ে উঠেছে।
বাম হাতে শ্রবণের হাত সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

“আমার হাত ছাড়ো। একটুও দয়া-মায়া নেই তোমার মধ্যে? ব্যথা হাতটা এভাবে চেপে ধরে রেখেছো কেন? এই হৃদয়হীন পাষাণ পুরুষ, ছাড়ো।”

শ্রবণ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“না। দয়া-মায়া নেই আমার মধ্যে।”

সোহা ব্যথায় দিশেহারা হয়ে বাম হাত দিয়ে শ্রবণকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল তবে পারলো না। টানাটানি করে হাতটাও ছাড়াতে সক্ষম হলো না।
শ্রবণ এক-পা তুলে বসে বিছানায়। এক হাতে সোহার হাত চেপে ধরে রেখে অন্য হাতে সোহাকে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“একটু ধৈর্য ধর, ব্লিডিং বন্ধ হোক।”

“ব্লিডিং বন্ধ হতে হতে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে যন্ত্রণায়।”

“সামান্য মাছের কাঁ’টা বিঁধেছে সেজন্য এমন করতে হবে?”

“সামান্য! আমার মনে হচ্ছে হাতটাই কে’টে আলাদা করে ফেলা হয়েছে।”

শ্রবণ তুলো তুলে দেখল এখনো রক্ত বের হচ্ছে। পুনরায় তুলা চেপে ধরলো। র’ক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না কেন? হাতটাও কেমন নীল হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। হাতের রগগুলো ভেসে উঠেছে।
সোহা শ্রবণের বুকে মুখ গুঁজে গুমরে গুমরে কাঁদতে লাগল। যদি কোনভাবে জানতো এই মাছ কা’টতে গিয়ে এত ব্যথা পাবে তাহলে জীবনেও কা’টতে যেত না। এই মাছের কাঁটায় কী ভয়ঙ্কর ব্যথা!

সোহার করুণ কান্না শুনলে যে কেউ ভাববে কেউ ম’রে’ছে বা কারো বড়ো ধরনের কোনো ক্ষতি হয়েছে। সামান্য শিং মাছের কাঁটার আঘাতে এভাবে কেউ কাঁদবে বলে মনে হয় না।
সোহার কান্না থামার নাম নেই, এখনো একইভাবে কাদঁছে আর শ্রবণের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

শ্রবণ বাম হাতে নিজের চোখজোড়া মুছে সোহার চুলে হাত বুলিয়ে নরম গলায় বলে,

“ওঠ, ডাক্তারের কাছে যাব।”

সোহা বুকে মুখ গুঁজে রেখেই কাঁদতে কাঁদতে দুদিকে মাথা দুলিয়ে বলে,

“না। ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার ইনজেকশন দেবে, আমি যাবো না ডাক্তারের কাছে।”

“তাহলে কান্না থামা। কখন থেকে কাঁদছিস একভাবে?”

“ব্যথা করছে তো।”

“হসপিটালে চল।”

“উঁহু, যাবো না।”

“ইনজেকশন দেবে না।”

“না দেবে, আমি যাব না। তুমি আমার হাত ছাড়ো।”

শ্রবণ সোহাকে জড়িয়ে ধরে রেখেই তুলো সরিয়ে নেয়। এখন আর র’ক্ত বের হচ্ছে না। হাত অনেকটা ফুলে উঠেছে, নীল বর্ণ ধারণ করেছে। থরথর করে কাঁপছে হাতটা।
শ্রবণ বুক থেকে সোহার মুখ তুলে বলে,

“হাত না ঝাঁকিয়ে চুপচাপ বসে থাক, আমি নিচ থেকে আসছি।”

সোহা শুধু কেঁদে যায়, মুখে বলে না কিছু। শ্রবণ ওকে ছেড়ে ওয়ালেট পকেটে ভরে গায়ে টি-শার্ট জড়ায়। সোহার দিকে আরো একবার তাকিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় বাইরের দিকে।
সোহা হাতের কব্জি চেপে ধরে কাঁদতে লাগলো।

অল্প সময় পরেই ফ্ল্যাটে ফিরে আসে শ্রবণ। এক গ্লাস পানি আর একটা ট্যাবলেট হাতে সোহার সামনে এসে দাঁড়াল। সোহা উপুর হয়ে ফোঁপাচ্ছে এখনো।

“সোহা, পেইন কিলারটা খা ব্যথা ঠিক হয়ে যাবে।”

সোহা মুখ তুলে তাকাল। জড়ানো গলায় বলে,

“এই পেইন কিলার খেলে বাবুর যদি কিছু হয়?”

“কিছুই হবে না, বলেই এনেছি তুই প্রেগন্যান্ট।”

সোহা সোজা হয়ে বসে। শ্রবণ নিজেই খাইয়ে দেয় ট্যাবলেটটা। হাতটা এখন আরো বেশি ফুলে উঠেছে।

“শুয়ে থাক।”

সোহা শুয়ে পড়ে। শ্রবণ সোহার গায়ের উপর ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে দেয়। মপ ভিজিয়ে এনে ফ্লোর মুছে নেয়, র’ক্ত শুকিয়ে গিয়েছিল। ড্রয়িংরুমের ফ্লোরে পড়ে থাকা র’ক্তের ফোঁটাও মুছে নেয় তারপর রান্নাঘরের ফ্লোরও মুছে নেয়।
ফ্লোরে ম’রে পড়ে থাকা মাছটার দিকে তাকাল। ওর ইচ্ছে করছে মাছটাকে তুলে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করতে। মাছটাকে ফ্লোর থেকে তুলল, কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল, তারপর হাত থেকে রেখে ছুরি দিয়ে কিমা বানিয়ে ফেলল। দাঁতে দাঁত চেপে আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মাছের কিমার দিকে। এটাকে কিমা বানিয়েও ওর শান্তি লাগছে না। গরম তেলে মচমচে করে ভাজতে পারলে শান্তি লাগত। অসভ্য মাছ, কত বড়ো সাহস! ওর বউয়ের হাতে কাঁটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল!

বাকি মাছগুলোর দিকে তাকাল। ওগুলো চুপচাপ রয়েছে বোলের ভেতরে। হাত বাড়িয়ে একটা মাছ ধরতে নিতেই মাছটা দ্রুত গতিতে মাথা কাত করে শ্রবণের হাতে কাঁটা ফুটিয়ে দেয়। মাছ ছেড়ে দ্রুত হাত গুটিয়ে নেয় শ্রবণ। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো আঙুল থেকে র’ক্ত বের হতে শুরু করেছে। শ্রবণ আঙুলের দিকে তাকিয়ে রইল। এই টুকু কাঁটা ফুটিয়ে দিয়েছে তাতেই এত ব্যথা, তাহলে সোহার কী পরিমাণ ব্যথা করছে? এমনি এমনি তো আর মেয়েটা অমন পাগলের মতো আচরণ আর কান্নাকাটি করছিল না।
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সোহার কাছে ফিরে আসে। সোহা চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে এখন। শ্রবণ ওর চুলে হাত বুলিয়ে বলে,

“ব্যথা কমেছে?”

সোহা চোখ মেলে মৃদু স্বরে বলে,

“হ্যাঁ।”

“ঘুমা তাহলে একটু ভালো লাগবে।”

“মাছ কাটতে হবে, রান্না করতে হবে।”

“ওইসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, তুই ঘুমা।”

শ্রবণ নিজের ফোনটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে এলো আবার। মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকাল। ইউটিউবে ঢুকে সার্চ দিলো, “শিং মাছ কা’টার রেসিপি।”

শ্রবণ যাই লিখে সার্চ দিক না কেন কাঙ্ক্ষিত ভিডিওগুলোই সামনে এসেছে। খুঁজে খুঁজে একটা ডিভিওতে ক্লিক করল।
ভিডিওর শুরুতে দেখানো হলো কীভাবে জ্যান্ত শিং মাছকে মা’রতে হয়।
শ্রবণ হাত থেকে ফোন রেখে এক খাবলা লবণ হাতে নিয়ে বোলের ভেতরে দিয়ে অন্য একটা বোল দিয়ে ঢেকে দেয় যেন মাছ লাফিয়ে লাফিয়ে বাইরে না পড়ে।
মুহূর্তেই দুই বোলের মাঝখানে শিং মাছের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। শ্রবণ পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে মাছের লাফালাফিতে। ম’র শা’লারা, আরো দিবি কাঁটা?

চলবে……….

পর্ব ছোটো হয়েছে বলে মন খারাপ বা আমাকে বকাবকি করবেন না। আমি একটু অসুস্থ প্লাস লিখারও সময় পাইনি।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply