দিশেহারা (৫৮)
সানা_শেখ
চোখ মুছতে মুছতে খাওয়া শুরু করলেও গলা দিয়ে খাবার নামছে না সোহার। আশ্চর্য! আজ এমন হচ্ছে কেন? শ্রবণ তো ওকে কত কষ্ট দিয়েছে তখন তো এমন হতো না।
মন খারাপেরা জেঁকে ধরেছে, খাবার গলা দিয়ে নামছেই না। পানি দিয়ে গিলে গিলে খাওয়া শেষ করে কোনো রকমে। টেবিলের উপর থাকা সবকিছু ঢেকে রেখে বেডরুমে ফিরে আসে। এই প্রথম ওর নিজের উপর আর শ্রবণের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে।
শ্রবণের ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা পার হয়ে গেছে। বেডরুমে এসে দেখে সোহা ঘুমিয়ে আছে। সন্ধ্যার পরই সোহাকে মেসেজ করে বলে দিয়েছিল রাতে খাবার খেয়ে ঔষুধ খেয়ে যেন শুয়ে পড়ে ওর অপেক্ষা না করে, ওর ফিরতে লেট হবে।
ফোন, ওয়ালেট আর চাবি রেখে বিছানার কাছে এগিয়ে আসে। বিছানায় বসে সোহার পাশে। ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে সোহার পেটের উপর হাত রাখে। হঠাৎ শ্রবণের চোখজোড়া বড়ো বড়ো হয়ে যায়। বাবু কী নড়ল? হ্যাঁ, নড়ল তো। ও পেটের উপর হাত রাখতেই মৃদু নড়ে উঠল। শ্রবণ আরো কিছুক্ষন পেটের উপর হাত চেপে বসে রইল তবে বাবু আর নড়ল না। সোহা বেশ কয়েকবার বলেছে বাবু একটু একটু নড়ে, ও বুঝতে পারে। তবে শ্রবণ পেটের উপর হাত রেখে অনুভব করতে পারেনি অনাগত সন্তানের মুভমেন্ট। আজকে প্রথম অনুভব করল। এবারের জন্মদিনে একের পর এক সারপ্রাইজ পেয়েই চলেছে।
পেটের উপর হাত বুলিতে চুমু খায় বেশ কয়েকটা। ভালোভাবে ঢেকে দিয়ে সোহার মুখের দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত সোহার মুখের দিকে। হাত বাড়িয়ে সোহার চুলে হাত বুলিয়ে আদর করে, কপালে চুমু খেয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। প্যান্টের বেল্ট খুলতে খুলতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। আয়নায় নিজেকে দেখে আবার সোহার দিকে তাকায়। এমনিতেই সোহার ঘুম ভারী, বাবু পেটে আসার পর ঘুম আরো ভারী হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে আবার ভীষণ পাতলা ঘুম, একটু শব্দেই জেগে ওঠে।
ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে আসে। আজকে সারাদিন দৌড়াদৌড়ির উপরেই ছিল, এখন ক্লান্ত লাগছে। মেইন লাইট অফ করে সোহার পাশে শুয়ে পড়ে ওকে জড়িয়ে ধরে। শ্রবণের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সোহার ঘুম ভেঙে যায়। চোখের পাতা টেনে তোলার চেষ্টা করে ঘুম জড়ানো ব্যস্ত গলায় বলে,
“শুয়ে পড়ছো কেন? খেয়েছ?”
“হ্যাঁ, খেয়েছি।”
সোহার ব্যস্ত কন্ঠ এবার মলিন হয়।
“বাইরে থেকে খেয়ে এসেছ?”
শ্রবণ সোহাকে ভালোভাবে আলিঙ্গন করে বলে,
“তোর রান্নাই খেয়েছি, ঘুমা।”
“ছাড়ো, খাবার তুলে ফ্রিজে রেখে আসি নয়তো নষ্ট হয়ে যাবে।”
“আমি ফ্রিজে তুলে রেখে এসেছি সব।”
সোহা শ্রবণের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কিছুটা দূরে সরে যায়। শ্রবণ অবাক হয়ে বলে,
“কী হয়েছে? ওদিকে যাচ্ছিস কেন এভাবে?”
সোহা অভিমান ভরা কন্ঠে বলে,
“আমি তোমার জন্য কত কষ্ট করে রান্না করেছিলাম, কিন্তু তুমি খেতে আসোনি দুপুরে।”
শ্রবণ দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“এই অবস্থায় এত কষ্ট করে তোকে এত পদ খাবার রান্না করতে বলেছে কে?”
সোহা হেঁচকি তুলে অভিমানী কন্ঠে বলে,
“তুমি একটুও ভালোবাসো না আমাকে, সবসময় শুধু বোকো আর ধমকে ধমকে কথা বলো।”
শ্রবণ বিস্মিত হয়ে বলে,
“এই তোর কী হয়েছে? আবার কাঁদছিস কেন?”
“বাবুকে ভালোবাসো কিন্তু আমাকে ভালোবাসো না। সবসময় শুধু মা’রতে তেড়ে আসো, ধমক দাও, বকা দাও, রাগী চোখে তাকাও। দুপুরে খাওয়ার জন্য আসতে বলেছিলাম বলে রাগ দেখিয়েছ।”
শ্রবণ সোহার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,
“এই ডাইনির বাচ্চা, এদিকে আয়।”
সোহা গা ঝাঁকি দিয়ে শ্রবণের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আরো কিছুটা সরে যায় শ্রবণের কাছ থেকে। শ্রবণ অবাকের উপর অবাক হচ্ছে, চরম লেভেলের অবাক। সোহা এমন করছে! বিশ্বাসই হচ্ছে না।
শোয়া থেকে উঠে বসে সোহার দিকে আগায়। ওকে টেনে তুলে বসানোর চেষ্টা করে রাগী গলায় বলে,
“তোর তো সাহস কম না, তুই আমার সঙ্গে এমন করছিস?”
“বকা দেওয়ার সময় মনে থাকে না?”
“এই ডাইনির বাচ্চা, তুই ঠিক আছিস? ভূত প্রেত কিছু ধরেছে নাকি?”
শ্রবণ শকড সোহার আচরণে। সোহা তো ওর সঙ্গে এমন আচরণ করার মেয়ে না। সত্যি সত্যিই কী ভূত প্রেত কিছু ধরেছে?
বিছানা ছেড়ে নেমে দ্রুত মেইন লাইট অন করে। সোহা শুয়ে পড়েছে আবার। শ্রবণ বিছানায় উঠে বসে সোহার গায়ের উপর থেকে ব্ল্যাঙ্কেট টেনে সরিয়ে নেয়। সোহা তাকায় না ওর দিকে, ভীষণ অভিমান করেছে শ্রবণের উপর। সবসময় ওকে কষ্ট দেয়, একটুও ওর কথা ভাবে না।
শ্রবণ সোহার গালে হাত রেখে বলে,
“রাতে খেয়েছিস?”
সোহা জড়ানো গলায় বলে,
“হ্যাঁ।”
“ঔষুধ?”
“খেয়েছি।”
“ওঠ, দেখি কী হয়েছে তোর।”
সোহা শোয়া থেকে উঠে বসে চোখ মুছে বলে,
“তুমি একটুও ভালোবাসো না আমাকে, শুধু বাবুকে ভালোবাসো, আর ওর কথাই ভাবো। আমার কোনো কথা শোনো না তুমি, শুধু নিজের কথা আমাকে শোনাও। আমি কত আশা নিয়ে তোমার জন্য রান্না করেছিলাম, ভেবেছিলাম নিজ হাতে বেড়ে খাওয়াবো তোমাকে কিন্তু তুমি আসোনি। রাতে এসে নিজে নিজে খেয়ে নিয়েছ, আমাকে ডাকোনি।”
কথাগুলো বলে গাল ফুলিয়ে বসে রইল সোহা। মেজাজ ভীষণ খিটখিটে হয়ে আছে আজ। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শ্রবণের উপর চিৎকার চেঁচামেচিও করে ফেলতে পারে, বিশ্বাস নেই।
শ্রবণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সোহার মুখের দিকে। এই সোহাকে শ্রবণ চেনে না, একটুও চেনে না। ওর বউয়ের শরীরে ভূত ভর করেছে নিশ্চই। ওর বউয়ের কোনোদিন সাহস হবে না ওর মুখের উপর এত কথা বলার।
কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসে থাকার পর বিছানা ছেড়ে নেমে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। সোহা দরজার দিকে তাকিয়ে হেঁচকি তুলতে তুলতে চোখ মোছে। দুপুর থেকে ওর কী হয়েছে ও নিজেই বুঝতে পারছে না। কান্না পাচ্ছে, রাগ হচ্ছে, চিৎকার চেঁচামেচি করতে ইচ্ছে করছে। সোহার সঙ্গে এরকম কোনোদিন হয়নি আজকের আগে।
দুই মিনিট পরেই রুমে ফিরে আসে শ্রবণ। ওর হাতে একগুচ্ছ লাল টকটকে টাটকা গোলাপ ফুল। শ্রবণ বিছানায় উঠে সোহার পাশে বসে আবার। ফুলগুলো সোহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
“নে, এগুলো তোর।”
সোহা আগের চেয়েও বেশি অভিমানী হয়ে বলে,
“অন্যের আনা ফুল আমি কেন নেব?”
শ্রবণ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“আমি অন্য মানুষ?”
“আমি তোমার কথা বলেছি? এগুলো হাসান ভাইয়ারা কেকের সঙ্গে এনেছিল সেগুলো না?”
“তোকে কে বলেছে এগুলো সেই ফুল? সেই ফুলগুলো এমন ছিল? এগুলো আমি আসার পথে তোর জন্য কিনে নিয়ে এসেছি, তুই ঘুমিয়ে গিয়েছিলি বলে ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলাম।”
সোহা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে,
“রোজ ডে তো চলে গেছে, তখন ফুল না দিয়ে এখন দিচ্ছ কেন?”
রাগে শ্রবণের ফর্সা চেহারা লাল হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে করছে সোহার ফর্সা তুলতুলে নরম গাল চড় দিয়ে লাল বানিয়ে দিতে, কখন যেন মেজাজ হারিয়ে সত্যি সত্যিই চড় বসিয়ে দেয়। কটমট করে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“কানশা বরাবর দেবো একটা? কী হয়েছে তোর আজকে? এখন কিছু বলি না বলে সাহস বেড়ে গেছে? যত নরম হচ্ছি তত তোর নাটক বাড়ছে। ওই সব ফালতু কিস ডে, হাগ ডে, রোজ ডে, প্রপোজ ডে, ভ্যালেন্টাইন ডে অন্যদের জন্য আমাদের জন্য না। আমাদের জন্য রোজই কিস ডে, হাগ ডে, রোজ ডে, প্রপোজ ডে, ভ্যালেন্টাইন ডে। এই নে রোজ, এই যে কিস, এই যে হাগ করছি, আয় এখন ভালোবাসাও দেই।”
ফুল হাতে শ্রবণের বুকের সঙ্গে মিশে বসে রইল সোহা। কয়েক সেকেন্ডে ফুলগুলো হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঝড়ের গতিতে শোয়া থেকে তুলে চুমু খেয়ে জড়িয়ে ধরেছে। মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকাতেই শ্রবণ সোহার মুখের ওপর থেকে এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে কপালে, গালে, ঠোঁটে আলতো করে চুমু খায়। গালে হাত রেখে বলে,
“হয়েছে নাকি আরো ভালোবাসা লাগবে?”
সোহা ফ্যালফ্যাল করে শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সোহার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ও ছোটো একটা বাচ্চা, যার সঙ্গে কী হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না। কেমন অবুঝের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে শ্রবণের মুখের দিকে। শ্রবণ ওকে বুক থেকে সরিয়ে বিছানা ছেড়ে নামতে নামতে বলে,
“আয়, খাবার খাব।”
“তুমি না বললে খেয়েছ?”
শ্রবণ পেছন ফিরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“খেয়েছি, আবার খাব। যা যা রান্না করেছিস সব খেয়ে ফেলব। এখন দ্রুত আয়।”
বলতে বলতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। সোহা শ্রবণের যাওয়ার পথে তাকিয়ে হাতে থাকা ফুলগুলোর দিকে তাকায়। কী সুন্দর ফুলগুলো! ফুলগুলোতে নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ টেনে নেয় ভেতরে। শ্রবণ ওর জন্য ফুল এনেছে ভেবেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। ফুলগুলো বিছানার উপর রেখে দ্রুত বিছানা ছেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। শ্রবণকে ড্রয়িং রুমে না পেয়ে স্টাডিরুমের দিকে তাকায়। স্টাডিরুমের লাইট অফ করা। রান্নাঘর থেকে টুকটাক শব্দ ভেসে আসছে, বুঝতে পারে শ্রবণ রান্নাঘরে রয়েছে। দ্রুত পা চালিয়ে রান্না ঘরে আসে। শ্রবণ খাবার গরম করছে। এই দৃশ্য দেখে সোহার চোখজোড়া বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। শ্রবণ চৌধুরী করছে খাবার গরম! এটাও সম্ভব?
“ওভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে কী দেখছিস? বোস চেয়ারে।”
সোহা চেয়ারে বসে পড়ে। শ্রবণ মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজ করছে। সোহাকে দেখে দেখে গ্যাসের চুলা অন অফ করা শিখে গেছে। মাইক্রোওভেন ব্যবহার করাও শিখেছে।
সোহা শ্রবণের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই সোহা মুখ নামিয়ে নেয়।
সব খাবার গরম করে ডাইনিং টেবিল সাজায় শ্রবণ নিজেই। হাত ধুয়ে সোহাকে নিয়ে এসে বসে চেয়ার টেনে। দুজনের সামনে প্লেট নিয়ে বলে,
“বেড়ে দিবি নাকি আমি দেব?”
“তুমি দাও।”
শ্রবণ বিনা বাক্যে দুজনের প্লেটে খাবার বেড়ে নেয়। গ্লাসে পানি ঢেলে দিয়ে বলে,
“খাওয়া শুরু কর।”
সোহা অল্প পোলাও তুলে মুখে নেয়। শ্রবণ মাংস তুলে মুখে পুরে চিবুতে শুরু করে সোহার দিকে তাকিয়ে।
সোহার চোখজোড়া ভিজে উঠছে বারবার। ওড়না দিয়ে চোখজোড়া মুছতে মুছতে খাচ্ছে।
শ্রবণ পোলাও মাংস হাতে নিয়ে সোহার মুখের দিকে বাড়িয়ে দেয়। সোহা মুখ তুলে শ্রবণের হাতের দিকে তাকিয়ে মুখের দিকে তাকায়। শ্রবণ গম্ভীর চোখমুখ বানিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সোহা শ্রবণের হাত থেকে মুখে নেয় খাবার। শ্রবণ শসার পিস এগিয়ে ধরে আবার সোহার মুখের সামনে।
এভাবে বেশ কয়েক লোকমা সোহাকে খাইয়ে দেয় শ্রবণ নিজ হাতে। সোহার চোখজোড়া দিয়ে গলগল করে পানি গড়িয়ে পড়ছে এখন। হেঁচকি উঠে গেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।
শ্রবণ ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে নিজের প্লেটের দিকে তাকায়। চুপচাপ নিজের প্লেটের খাবার শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বাকি সব খাবার ঢেকে রেখে রান্নাঘরের দিকে আগায়। রান্নাঘরে এসে দেখে সোহা এখনো হেঁচকি তুলে কাঁদছে উল্টো ফিরে দাঁড়িয়ে। শ্রবণের আগমন টের পেয়েও তাকাচ্ছে না ওর দিকে।
শ্রবণ কোনোকিছু না বলে হাত ধুয়ে নেয়। টিস্যু পেপার দিয়ে হাত মুছে সোহার সামনে এসে দাঁড়ায়, সোহা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। শ্রবণ মুখে কিছু না বলে সোহার মুখ তুলে ধরে দুই হাতে। কাঁদতে কাঁদতে চেহারা লাল হয়ে গেছে সোহার। শ্রবণ সোহার ওড়না দিয়েই সোহার চোখমুখ মুছিয়ে দেয়। গম্ভীর গলায় বলে,
“আমি জানি আমি খারাপ মানুষ, এভাবে কেঁদে কেঁদে বোঝাতে হবে না।”
সোহা শ্রবণকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“তুমি খারাপ মানুষ না, তুমি খুব ভালো মানুষ।”
“আমি খারাপ মানুষ না?”
“না, একদম না।”
“তাহলে এভাবে ম’রা কান্না করছিস কেন?”
সোহা কথা বলে না। শ্রবণ সোহার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে ফ্রিজ খুলে বড়ো বড়ো দুই প্যাকেট চকলেট বের করে সোহার হাতে দেয়। নিজের সবচেয়ে পছন্দের চকলেট পেয়ে সোহার কান্না আরো বেড়ে যায়।
“কী শুরু করেছিস আজ?”
সোহা কান্না বন্ধ করার চেষ্টা করে চোখমুখ মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যায়। শ্রবণ ফোস করে শ্বাস ছেড়ে রান্নাঘরের লাইট অফ করে সোহার পেছন পেছন রুমের দিকে এগিয়ে যায়।
এই মেয়েকে বিয়ে করে নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে দিন দিন। আগের শ্রবণ মরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। যেই শ্রবণ আগে সোহার একটা প্রশ্নের উত্তর দিতো না উল্টো কিছু জিজ্ঞেস করলে ভয় দেখিয়ে তটস্থ করে দিত, সেই শ্রবণ এখন এক্সপ্লেইন করে সোহার কাছে। যেই শ্রবণের চোখের ইশারায় সোহা উঠবস করতো, এখন সেই শ্রবণ সোহার প্রায় সব কথাই শোনে। কেন এমন করে শ্রবণ নিজেও জানে না। নিজের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসছে ধীরে ধীরে।
সোহা ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পড়েছে। এখনো হেঁচকি তুলে কাঁদছে। শ্রবণের বিরক্ত হওয়ার কথা থাকলেও আজ বিরক্ত হতে পারছে না। লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে সোহার পাশে, আলগোছে সোহাকে আগলে ধরে বুকে। শ্রবণ জড়িয়ে ধরতেই সোহা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। শ্রবণ হতাশার শ্বাস ফেলে আরো ভালোভাবে আগলে ধরে সোহাকে। নরম সুরে বলে,
“আজকে কান্না করে রাত পার করার প্রতিজ্ঞা করেছিস নাকি? নাকি কান্নার প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছিস? এমন করছিস কেন আজ? চুপ কর।”
সোহা কথা বলে না। শ্রবণের পরিবর্তন তাও এত দ্রুত এটা কল্পনা তো দূর, সোহা অসম্ভব বলেই ধরে নিয়েছিল। শ্রবণের টিশার্ট খামচে ধরে ওর বুকে মুখ গুঁজে রেখে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতে থাকে। সোহা নিজেও বুঝতে পারছে না আজ ওর কী হয়েছে। অনেকদিনের জমিয়ে রাখা কান্না আজ প্রকাশ পাচ্ছে বোধহয়।
***********
দুদিন পার হয়ে গেছে মাঝখানে। বেলা এগারটার দিকে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল শ্রবণ। ঘুম থেকে জেগে নিজেকে ধাতস্থ করতে কিছুটা সময় লাগে। ফোন হাতে নিয়ে টাইম দেখে নেয়, দেড়টা বেজে গেছে। ফোন রেখে ঝিম ধরে বসে থাকে কিছুক্ষণ। মাথা ভার ভার হয়ে গেছে, বেশি ঘুমিয়ে চোখমুখও ফুলে গেছে বোধহয়।
চোখ বন্ধ রেখেই ঘুম জড়ানো গলায় সোহাকে ডাকে।
শ্রবণ ডাকতেই সোহা ব্যালকনি থেকে রুমে ফিরে আসে।
“বলো।”
“আমাকে একা রেখে কোথায় গেছিস?”
বলতে বলতে চোখ তুলে সোহার দিকে তাকায়। সোহাকে দেখে চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে যায়, বন্ধ করে আবার তাকায় তখনই। ফিক করে হেসে ওঠে গা ঝাঁকিয়ে। হাসতে হাসতে বলে,
“তুই দিন দুপুরে নাইটি পরেছিস কেন? নাইটি যদি পরতেই হয় তাহলে রাতে পরবি।”
শ্রবণের হাসি আর কথা শুনে সোহা চোখ দুটো ছোটো ছোটো করে বলে,
“এটা নাইটি না।”
“দেখতে তো নাইটির মতোই লাগছে। নাইটি না হলে কী এটা?”
“এটা মেক্সি।”
“মেক্সি? তুই এটা কোথায় পেলি? আমার যত দূর মনে পড়ছে আমি এই নাইটি হোক আর মেক্সি, এটা আমি কিনে আনিনি কোনোদিন।”
“মাজেদা আন্টি এনে দিয়েছেন।”
“টাকা?”
“তোমার কাছ থেকে একদিন নিয়েছিলাম মনে নেই?”
শ্রবণ সোহার আগাগোড়া ভালোভাবে দেখতে থাকে আবার। এই মেক্সি পরনে খারাপ লাগছে না। শুধু ভালো নয়, ভীষণ ভালো লাগছে দেখতে।
শ্রবণ পা ঝুলিয়ে বসে সোহাকে কাছে ডাকে হাতের ইশারায়। সোহা এগিয়ে আসতেই উঁচু পেটের ওপর হাত বুলিয়ে বলে,
“এসব পরার বুদ্ধি কে দিয়েছে তোকে?”
সোহা শ্রবণের এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিতে দিতে বলে,
“মাজেদা আন্টি।”
শ্রবণ পেটের ওপর চুমু খেয়ে মুখ তুলে সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“গত দুই মাসে এমনিই মুটিয়ে গেছিস, এখন মেক্সি পরনে আরো মুটকি লাগছে, একদম গোল আলুর মতো।”
সোহা গাল ফুলিয়ে বলে,
“কীহ! আমি মুটকি, গোল আলু?”
“নাহ। তুই রসগোল্লা, টসটসে রসালো।”
শ্রবণের কথা শুনে সোহার কাশি উঠে গেছে। নিজেকে সামলে শ্রবণের হাত থেকে ছোটার চেষ্টা করে বলে,
“ছাড়ো। গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আসো।”
“তোকে সুন্দর লাগছে নাইটিটা পরে।”
“এটা নাইটি না, মেক্সি।”
“নাইটি।”
“মেক্সি মেক্সি মেক্সি।”
শ্রবণ সোহাকে ঘুরিয়ে নিজের কোলের ওপর বসায়। সোহার ঘাড়ে মুখ গুঁজে সোহার নিজস্ব সত্তার মাতাল করা সুবাস টেনে নেয় নিজের ভেতর। শ্রবণ বেসামাল হওয়ার আগেই সোহা তাড়াহুড়ো করে শ্রবণের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে,
“কী করছো? ছাড়ো আমাকে, গোসল করে আসো খাবার খাব।”
“আমার তো তোকে—
এই বাবু নড়ল! আবার নড়ছে।”
সোহা ঘাড় উল্টে শ্রবণের মুখ দেখার চেষ্টা করে বলে,
“হ্যাঁ। কিছুক্ষণ আগে আরো জোরে জোরে নড়ছিল।”
শ্রবণ খুশিতে আত্মহারা। ওর চোখ দুটো রাতের আকাশে জ্বলতে থাকা উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে। হার্টবিট বেড়ে গেছে।
চলবে……..
গল্প পড়া শেষে লাইক কমেন্ট করতে ভুলবেন না।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা। আমার কিছু ভুল হয়েছে। আগের দুই পর্বে শ্রবণের পরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল সেই দুই পর্ব আমি এডিট করে নেব। আপাতত শ্রবণের কোনো পরীক্ষা হচ্ছে না। সামনের কোনো পর্ব পড়ে যেন বিভ্রান্তিতে না পড়েন সেজন্য জানিয়ে দিলাম।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার সঙ্গে এক জনম গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ৩৩
-
দিশেহারা পর্ব ২৬
-
দিশেহারা গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ৪৯
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ১৭
-
দিশেহারা পর্ব ৩৭
-
দিশেহারা পর্ব ৪০
-
দিশেহারা পর্ব ১