দিশেহারা (৫৬)
সানা_শেখ
সোহা বলে না কিছু। শ্রবণ ওকে আরো ভালোভাবে আলিঙ্গন করে।
ছেড়ে দিয়ে দুই হাতে মুখ আগলে ধরে সোহার কাজল কালো আঁখিজোড়ায় দৃষ্টি স্থির করে বলে,
“না ঘুমিয়ে এত রাতে এই ঠাণ্ডার মধ্যে শাড়ি পরে এভাবে সেজেছিস কেন?”
“তুমি পড়তে বসেছো, আমার ঘুম আসছিল না আবার ভালোও লাগছিল না। শাড়িটা এনেছিলে কিন্তু পরা হয়নি তাই পরেছি আজ।”
“ঠাণ্ডার মধ্যে শীতের পোশাক ছাড়া আছিস, যদি ঠান্ডা লাগে?”
“রুম হিটার অন আছে তো, তাছাড়া আজকে ঠান্ডাও কম।”
শ্রবণ হুট করে সোহাকে জাপটে ধরে গোল গোল ঘুরতে শুরু করে। সোহা ভয় পেয়ে শ্রবণের গলা জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। শাড়ির আঁচল উড়ছে, খোলা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে। শ্রবণের ঘাড়ে মুখ গুঁজে আতঙ্কিত হয়ে বলে,
“নামাও আমাকে, তুমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ না।”
সোহার কথা শ্রবণের কানে প্রবেশ করেছে বলে মনে হয় না। শ্রবণ ওকে নিয়ে একই ভঙ্গিতে ঘুরছে এখনো। ঘুরতে ঘুরতে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। সোহার মাথা ভন ভন করে ঘুরছে। শ্রবণের গলা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে। এখন ছেড়ে দিলে নির্ঘাত ঠাস করে আছড়ে পড়বে ফ্লোরে।
শ্রবণ সোহাকে বিছানায় বসিয়ে দেয় আস্তে করে। সামনে দাঁড়িয়ে থেকেই জড়িয়ে রাখে নিজের সঙ্গে। ওরো মাথা গোল গোল ঘুরছে এখন তবে বেশি না। সোহা মুখ তুলে তাকাতেই শ্রবণের চকচকে উজ্জ্বল চেহারা দেখতে পায়। এর আগে শ্রবণের এমন চেহারা সোহা দেখেছে বলে ওর স্মরণ হচ্ছে না। শ্রবণকে এখন প্রাণবন্ত লাগছে। রাগী রাগী গাম্ভীর্য ভাব মুছে গেছে পুরোপুরি। বেশ ফুরফুরে মেজাজের দেখাচ্ছে এখন। চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে অনেক খুশি।
“পেটে ব্যথা পাবে না? অপারেশন হয়েছে এক মাসও হয়নি এখনো। কিছু হয়ে যেতো যদি?”
শ্রবণ সোহার কথার উত্তর না দিয়ে সোহার এলোমেলো চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে নরম সুরে বলে,
“পেট তো এখন অনেক বড়ো দেখাচ্ছে, এতদিন তো এত বড়ো দেখা যেতো না।”
“শাড়ির কারণে এমন ফোলা দেখাচ্ছে, ঠিকভাবে পড়তে পারিনি। প্রথমবার নিজে নিজে পড়েছি তো তাই এমন হয়েছে।”
“বাবু পেটে এসেছে পাঁচ মাস চলছে না?”
“হুম।”
“দারুন লাগছে তোকে। বাবু পেটে আসার পর তুই আগের চেয়েও সুন্দরী হয়ে গেছিস।”
সোহা লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নেয়।
শ্রবণ শাড়ির আঁচল তুলে সোহার মাথায় ঘোমটা টেনে দেয়। সোহা আবার মুখ তুলে তাকাতেই শ্রবণ সোহার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কিছুটা পিছিয়ে আসে উল্টো হেঁটে। দূরে দাঁড়িয়ে সোহাকে দেখতে থাকে পলকহীন।
টুল টেনে বসে পড়ে রুমের মাঝখানে।
সোহার পরনে মিষ্টি কালার শাড়ি। সোহা এমনিতেই ধবধবে ফর্সা, এই কালারে ওকে আরো বেশি ফর্সা দেখাচ্ছে। হালকা সাজ, ঘোমটা টেনে রাখায় বউ বউ লাগছে। মুক্ত থাকা চুল কতগুলো সামনে চলে এসেছে। সোহা একবার ওর দিকে তাকাচ্ছে আবার চোখ নামিয়ে নিচ্ছে, বারবার এটাই করছে তখন থেকে। চোখের তৃষ্ণা মিটিয়ে দেখছে শ্রবণ, মন মস্তিষ্কে প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। শান্ত চোখজোড়া সোহাতেই আটকে আছে, দেখছে পলকহীন।
শ্রবণের হৃৎস্পন্দন থমকে যায় আবার। শুকনো ঢোঁক গিলে চোখ নামিয়ে নেয়। ব্যস্ত পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“শাড়ি চেঞ্জ কর দ্রুত।”
সোহা মুখ শুকনো করে বলে,
“কেন? তুমি তো বললে সুন্দর লাগছে।”
“বেসামাল হয়ে যাওয়ার আগে শাড়ি চেঞ্জ কর। বেসামাল হয়ে গেলে সামলাতে পারবি না, অবশ্য তুই এখন সামলানোর মতো অবস্থায়ও নেই। মাথা নষ্ট হওয়ার আগে দ্রুত চেঞ্জ কর।”
শ্রবণের কথা শুনে সোহার গাল লাল হয়ে উঠেছে, কান গরম হয়ে গেছে। এমনিতেই লজ্জা লাগছে তখন থেকে।
“লজ্জা পরে পাস, এখন চেঞ্জ কর দ্রুত। বাবু হওয়ার আগে আর শাড়ি পরবি না, সাজবিও না। সাধারণভাবেও তুই অনেক সুন্দর।”
“কত কষ্ট করে নিজে নিজে শাড়ি পরেছি প্রথমবার, আবার সেজেছিও। চেঞ্জ করার আগে কটা ছবি তুলে দাও।”
“ওই বা/লছাল করতে পারবো না আমি। বাবু হওয়ার পর সারাদিন শাড়ি পরে থাকিস আর হাজার হাজার ছবি তুলিস।”
“বাবু হওয়ার সময় যদি ম’রে যাই তাহলে পরে কীভাবে ছবি তুলব?”
শ্রবণ কটমট করে তাকিয়ে রাম ধমক দিয়ে বলে,
“এই ডাইনির বাচ্চা, এমন একটা চড় দেবো না এই চোয়ালের দাঁত খুলে ওই চোয়ালে চলে যাবে।”
ধমক খেয়ে কেঁপে উঠেছে সোহা। চোখজোড়া পানিতে টুইটুম্বর হয়ে গেছে মুহূর্তেই। মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল শ্রবণের সামনে। আঁচল পড়ে গেছে মাথা থেকে, এলোমেলো চুল মুখের উপর এসে পড়েছে কতগুলো।
সোহার দিকে তাকিয়ে ট্রাউজারের পকেট হাতড়ে ফোন বের করে। আনলক করে ক্যামেরা অন করতে করতে গম্ভীর গলায় বলে,
“কীভাবে ছবি তুলবি পোজ দে।”
সোহা মুখ তুলে তাকায়, শ্রবণ গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। শ্রবণের সামনে থেকে সরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। শ্রবণ পুরোপুরি ঘুরে সোহার দিকে তাকায়। সোহা শাড়ির সেফটিপিন খুলছে। ওর মতিগতি বুঝতে পেরে আরেক ধমক দিয়ে বলে,
“এই ডাইনির বাচ্চা, শাড়ি খুলছিস কেন?”
সোহা মৃদু মলিন স্বরে বলে,
“তুমিই তো বললে চেঞ্জ করতে।”
শ্রবণ দাঁতে দাঁত পিষে সোহার কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। হাত থেকে ফোন রেখে সোহার হাত থেকে সেফটিপিন নিয়ে আঁচলে লাগাতে লাগাতে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
“ছবি তোলার জন্য যে পোজ দিতে বললাম সেটা কানে যায়নি?”
“তুলতে হবে না।”
“কানের নিচে দেবো একটা।”
সোহা মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে রইল। শ্রবণ আঁচল ঠিক করে দিয়ে আয়নার দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ফোন হাতে তুলে নেয়। পেছন থেকে অন্য হাতটা সোহার পেটের উপর রাখে। নিজের বুকের সঙ্গে সোহার পিঠ ঠেকিয়ে বলে,
“ফোনের দিকে তাকা।”
সোহা ফোনের দিকে না তাকিয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায় ঘাড় উল্টে। ক্যামেরা ক্লিক হওয়ার আওয়াজ হয়। সোহা ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আবার শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। শ্রবণ কপালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে বলে,
“শুয়ে শুয়ে সারারাত দেখিস, এখন ফোনের দিকে তাকা।”
সোহার অভিমান গোলে পানি হয়ে যায়। খুশি মনে তাকায় ফোনের স্ক্রিনে। দুজন এক সঙ্গে সেলফি বন্দী হয় আবার। ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে আয়নায় থাকা দুজনের প্রতিবিম্বের ছবি তোলে, যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শ্রবণের হাত সোহার উঁচু পেটের উপর, শ্রবণের হাতের উপর সোহার হাত।
সোহার সব মন খারাপেরা পালিয়েছে আবার, আনন্দ হচ্ছে, সুখ সুখ লাগছে ভীষন।
সোহার একার অনেকগুলো ছবি তুলে দিয়েছে শ্রবণ। নিজেই সোহাকে বিভিন্ন পোজে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বারবার। প্রত্যেকটা ছবি ভীষণ সুন্দর হয়েছে।
সোহার পা ব্যথা করছে এখন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে।
“আর না, অনেক হয়েছে।”
“আর একটা। পাশ ফিরে ডান হাত পেটের উপরে রাখ, বাম হাত পেটের নিচে। আমার দিকে তাকা হাসি মুখে।”
শ্রবণের কথা মতো তাই করে সোহা। শ্রবণের মন মতো না হওয়ায় নিজেই ঠিক করে দাঁড় করিয়ে দেয় আবার।
ছবি তোলা শেষ হলে সোহা চেঞ্জ করে নেয়। শ্রবণ ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পড়ে। সোহা নিজেও ফ্রেশ হয়ে এসে লাইট অফ করে শ্রবণের পাশে শুয়ে পড়ে ব্ল্যাঙ্কেটের নিচে ঢুকে। এখন ভীষণ শীত শীত লাগছে, অনেকক্ষণ ধরে শীতের পোশাক ছাড়া রয়েছে, হাত-পা সহ পুরো শরীর হিম শীতল হয়ে গেছে। শ্রবণ সোহাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“পুরো শরীর ঠাণ্ডা বরফ হয়ে রয়েছে, শুধু সর্দি কাশি হলে হয় তারপর দেখিস তোর কী করি।”
সোহা বলে না কিছু। নিজেই তো দেরি করালো, সোহা তো আরো আগেই ছবি তোলা শেষ করতে বলেছিল। তখন খুব একটা শীত শীত না লাগলেও এখন লাগছে। শ্রবণের উষ্ণ বুকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এখন আর আগের মতো করে শ্রবণের বুকের সঙ্গে মিশে যেতে পারে না, পেট বেশ অনেকটা উঁচু হয়েছে।
আজ শ্রবণের প্রথম পরীক্ষা। রেডি হওয়ার মাঝে হাসানের কল আসে। স্পিকারে দিয়ে কথা বলতে বলতে রেডি হতে থাকে।
সোহা বিছানায় বসে শ্রবণকে দেখে চলেছে। ওর মনে হচ্ছে শ্রবণ পরীক্ষা দিতে নয়, বিয়ে খেতে যাবে নতুবা বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাবে।
শ্রবণ রেডি হয়ে রুম থেকে বের হয় নিজের প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে। সোহা শ্রবণের পেছন পেছন রুম থেকে বেরিয়ে এসে ড্রয়িং রুমে দাঁড়ায়। শ্রবণ স্টাডিরুমে প্রবেশ করেছে।
হেলমেট হাতে বেরিয়ে আসতে দেখে অবাক হয়ে বলে,
“হেলমেট নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?”
“আমি কোথায় যাচ্ছি তুই জানিস না?”
“হ্যাঁ। কিন্তু হেলমেট নিয়ে যাচ্ছো কেন?”
“হেলমেট দিয়ে মানুষ কী করে?”
“তুমি বাইক নিয়ে যাবে?”
“হ্যাঁ।”
সোহা শ্রবণের কাছে এগিয়ে এসে ওর হাত থেকে হেলমেট নেওয়ার চেষ্টা করে বলে,
“একদম না। তুমি এখনো পুরোপুরি সুস্থ না, পেটের সেলাই এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, ডান হাত-ও ঠিক হয়নি। ওই ভারী বাইক চালিয়ে যাবে না তুমি।”
“আমি বাইক নিয়েই যাব, এর আগেও গেছি কিছু হয়নি। হেলমেট ছাড়।”
“না। গাড়ি নিয়ে যাও।”
“হেলমেট ছাড়তে বলেছি।”
সোহা ভয় পেলেও হেলমেট ছাড়ে না। শ্রবণকে বোঝানোর মতো করে বলে,
“বাইক অনেক ভারী, ডাক্তার তোমাকে ভারী জিনিস উঁচু করতে নিষেধ করেছেন। আমি জানি তুমি বাইক লাভার, সুস্থ হও তারপর বাইক চালাবে। এখন গাড়ি নিয়ে যাও।”
“গাড়ি চালাতে পারবো না আমি।”
“ড্রাইভারকে কল করে আসতে বলো।”
“পারবো না।”
“আমি দাদা ভাইকে কল করে বলছি ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দিতে।”
“গাড়িতে করে যাবো না আমি। দেরি হয়ে যাচ্ছে, মার খেতে না চাইলে হেলমেট ছাড়।”
“আমার আর বাবুর কোনো মূল্য নেই তোমার কাছে? তোমার কিছু হয়ে গেলে আমাদের কী হবে? তুমি বাইক নিয়ে গেলে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি টেনশনে থাকব।”
শ্রবণ চোখ দুটো ছোটো ছোটো করে বলে,
“ভালো ব্ল্যাকমেইল করা শিখে গেছিস।”
“গাড়ি নিয়ে যাও।”
“অর্ডার করছিস?”
সোহা চুপ করে থাকে। শ্রবণ হেলমেট ছেড়ে স্টাডিরুমের দিকে এগিয়ে যায়। বাইকের চাবি রেখে গাড়ির চাবি নিয়ে বেরিয়ে আসে। দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলে,
“এই ডাইনির বাচ্চা যা শুরু করেছে, কদিন পর মুততে গেলেও বউয়ের পারমিশন নিয়ে মুততে যেতে হবে।”
দরজা খুলে বেরিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে। সোহাকে জড়িয়ে ধরে চেপে চেপে চুমু খেয়ে বলে,
“দোয়া কর বেশি বেশি পরীক্ষা যেন ভালো হয়। এই বা/লের পড়াশোনা আর ভাল্লাগেনা। পরীক্ষাগুলো শেষ হলেই বাঁচি।”
বলতে বলতে ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে যায় আবার। সোহা হা করে ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল।
চলবে………
লাইক কমেন্ট করতে ভুলবেন না কেউ। যারা এখনো পেজটি ফলো দেননি তারা ফলো দিয়ে রাখবেন।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১৫
-
দিশেহারা পর্ব ৩৪
-
দিশেহারা পর্ব ৪৬
-
দিশেহারা পর্ব ৫২
-
দিশেহারা পর্ব ২৫
-
দিশেহারা পর্ব ৬৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৮
-
দিশেহারা পর্ব ২৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৩